Main menu

সিনেমা রেপ্রিজেন্টেশন: বোমা-জঙ্গি-মাদ্রাসা-ইসলাম এবং বাংলাদেশ

যোগাযোগ পত্রিকার ১১ নম্বর সংখ্যায় (ডিসেম্বর, ২০১৩) এই লেখাটা প্রথম ছাপা হইছিল। লেখকের অনুমতি নিয়া বাছবিচার-এ আপলোড করা হইলো। 

_______________________

For millennia, man remained what he was for Aristotle: a living animal with the additional capacity for a political existence; modern man is an animal whose politics places his existence as a living being in question. (Foucault 1980: 143)

১.

মহাশয় কার্ল মার্কসের জবানে একটা প্রবাদ জগতময় চালু আছে: ‘ধর্ম মানুষের জন্য আফিমের মতো।’ আর এ অপমানে ধর্মবিশ্বাসীগণ, লড়াইয়ের ইতিহাসজুড়ে, এই প্রবাদ জাবর কাটিয়া, মার্কসকে নরকবাসী করেছেন এবং মার্কসপন্থী সকলকে ‘ঘৃণ্য’ নাস্তিকের কাতারে সামিল করেছেন। অন্যদিকে, মার্কসবাদীগণ – আহা! মহামতি কার্ল মার্কস নিজেকে যদিও মার্কসবাদী ভাবেন নাই কোনো কালে, তবু – তাকে নাস্তিক্যবাদের দেবতা বানাইয়াছেন। অথচ, আলাদাভাবে কোনোদিন কোথাও ঘুণাক্ষরেও তিনি বলেন নাই যে ‘ধর্ম মানুষের জন্য আফিমের মতো।’ জগতে ধর্মের ভূমিকা পর্যালোচনাকলে তিনি বলেছিলেন এই কথাগুলো: ‘ধর্ম হলো নিপীড়িতের দীর্ঘশ্বাস, এই নির্দয় দুনিয়ার হৃদয়, আত্মাহীন পরিস্থিতির আত্মা- ধর্ম মানুষের জন্য আফিমের মতো।’ (মার্কস, ১৮৪৪)

সুতরাং, ধর্ম ও আধুনিক রাজনীতির অন্তরঙ্গতা নিয়ে আলাপ তুলবার বিপদ আছে। মার্কস ধর্মকে ‘নিপীড়িতের দীর্ঘশ্বাস’, ‘নির্দয় দুনিয়ার হৃদয়,’ ‘আত্মাহীন পরিস্থিতির আত্মা’ রূপে দেখে যে কাব্যিকতা করেছিলেন, কদর করে তা বুঝবার চেষ্টা কেউ করলো না, বরং খন্ডিতভাবে উদ্ধৃত করে তাকে অনন্ত কলঙ্কের ভাগিদার করে চলেছে। এ লেখার উদ্দেশ্য বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী, ধার্মিক, অধার্মিক, বিধর্মী, কিংবা নাস্তিকের পক্ষে অবস্থান গ্রহণের জন্য নয়; সেকুলারপন্থা বা ধর্মপন্থাকে জগত ও জীবন পরিচালনার সহি রাস্তা হিসেবে সিদ্ধান্ত জারি করতেও এ লেখা নিয়োজিত নয়। বলবো, বহু পন্থা ও -পন্থীদের বৈচিত্র ধারণে সক্ষম সহনশীল সমাজ কায়েমের জন্য মার্জিনে চলতে থাকা লড়াই কেন্দ্রে নিয়ে আসার তৎপরতায় এ লেখা সামিল হতে চায়। তবে, এ লেখায় বিষয়বস্ত্ত অতি নাজুক, স্পর্শকাতর। ফিল্মি-রেপ্রিজেন্টেশনের নিশানা ধরে জঙ্গিপনার রাজনৈতিকতা, জনপরিসরে ধর্ম/ইসলামের উপস্থিতি ও তান্ডবনৃত্য, এবং সর্বোপরি আধুনিকতাগামী রাষ্ট্র ও তার সেকুলারপন্থার সঙ্কট এখানে আলোচনায় আসবে। পারমানবিক বোমাধারী প্রবলের দুনিয়ায় আত্মঘাতী হামলাকারীর লড়াইকৌশল অবশ্যই ন্যায্য- তালাল আসাদেরi এরূপ আচানক দাবি ও যুক্তিবিন্যাসও এ লেখায় থাকবে। বলপ্রয়োগে রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠবে- ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের যুক্তি ধরে আইনের শাসন জারি রাখবার উপায় হিসেবে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের বৈধ্যতা এবং তার বিপরীতে জুলুমবাজ রাষ্ট্রের আইনী কাঠামো বদলে দেবার বা নতুন আইন নির্মাণের উপায় হিসেবে দল বা গোষ্ঠীর বলপ্রয়োগ নীতির ন্যায্যতার বিচার এখানে উঠবে।ii ফলে, বাংলাদেশের আজকের পরিস্থিতিতে এধরনের আলাপ তুলে লেখক হিসেবে নিজেকে নাজুক টার্গেটে পরিণত করার সমূহ ঝুঁকি রয়েছে। তবু, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সঙ্কটের স্বরূপ সন্ধান এবং সমাজে সহনশীলতার চর্চা চাইলে স্পর্শকাতর আলাপ তোলাটাও জরুরি কাজ বটে।

 

পরিপ্রেক্ষিতের সন্ধানে

যারা আল্লাহর আইন অনুযায়ী বিচার করে না আমি তাদের হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছি। …মানুষের তৈরি আইনের চেখে আমি হয়তো অপরাধী, কিন্তু আল্লাহর আইনে নয়। …আমি এ বিচার মানি না। আমি চাই আল্লাহর আইনে আমার বিচার করা হোক। আমি নিজেকে অপরাধী মনে করি না। আমরা তাগুতি বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি; আমরা বিচারক ও পুলিশ হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি আল্লাহর নির্দেশে দল গঠন করেছি, এবং তাদেরকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছি।

[শায়খ আবদুর রহমান,হাই কোর্টের রায়, ডেথ রেফারেন্স নং: ৪৭, ২০০৬, ৩১ আগস্ট ২০০৬, পৃষ্ঠা: ১০।]

বিচারক হত্যা ষড়যন্ত্রের দায়ে শায়খ আবদুর রহমানসহ জামা’তুল মুজাহিদিনের ছয় শীর্ষ নেতাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে। আদালতে দাঁড়িয়ে জেএমবি প্রধান আবদুর রহমান আইন-আদালত ও রাষ্ট্রের বৈধতা সবকিছু তুচ্ছ করে দুঃসাহসী কণ্ঠে উপর্যুক্ত কথাগুলো বলেছিলেন। কথাগুলোকে আদালত ‘ধর্মোন্মত্ততা’ এবং আধুনিক রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে তার ‘অজ্ঞতা’ ও ‘অন্ধতা’ হিসেবে রায়ে উল্লেখ করেছিলেন। আদালতের দৃষ্টিতে- ‘ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা’ করে তারা বিপথগামী হয়েছে, অন্যদেরকে বিপথগামী করেছে এবং জনগণের জীবন বিপন্ন করেছে। প্রশ্ন হলো: মৃত্যভয় তুচ্ছকারী এই বক্তব্যর অর্থ ও তাৎপর্য কি ‘ধর্মোন্মত্ততা’ ‘অজ্ঞতা’ ও ‘অন্ধতা’ প্রত্যয়ের সুনির্দিষ্ট সীমানা টেনে আটকে রাখা সম্ভব? যেহেতু আমরা জানি সিগনিফায়ার ও সিগনিফায়েডের সম্পর্ক সবসময় স্বেচ্ছাচারী, যেহেতু আবদুর রহমান নামটিও প্রতীক জগতে একটা ‘চিহ্ন’ হয়ে উঠে নতুন নতুন অর্থ তৈরির সম্ভাবনা জারি রাখে, সেহেতু বিভিন্ন প্রত্যাশিত-অপ্রত্যাশিত কিংবা অভূতপূর্ব অর্থসম্ভাবনা বিচারে নেয়া আমাদের কর্তব্য।

কেউই চায় না নিজের জীবন বিপন্ন করে মৃত্যুর দুয়ারে হেঁটে বেড়াতে। অথচ আমরা দেখবো, তারা তবু তাই করেছেন- তিনি বা অন্য কেউ আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য উকিল নিয়োগ করেননি; বিদ্যমান আইন-আদালতকে তুচ্ছ করেছেন; এবং পত্রিকায় প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে, ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাবার আগেও তাদের মধ্যে কোনোরূপ অনুতাপ, চিত্তচাঞ্চল্য বা ভয় দেখা যায়নি (ডেইলি স্টার: ২০০৭)। মৃত্যুভয় তুচ্ছ করেছিল তারা কি কেবলই ‘ধর্মরূপ আফিম’ সেবনে ‘উন্মাদনার’ বশে? রনজিৎ গুহ জানাচ্ছেন, ঔপনিবেশিক আধা-সামমত্মতান্ত্রিক ভারতে সাঁওতাল হুলের কারণ হিসেবে পত্রপত্রিকায় ‘ধর্মোন্মাদনাকেই’ চিহ্নিত করা হয়েছিল। তিনি এই ব্যাখ্যাকে ‘জঙ্গি চৈতন্যের ভুল পাঠ’ হিসেবে শনাক্ত করেছেন। তিনি মনে করেছেন, এঘটনায় ধর্মভাব ও ক্ষমতা ‘ব্যাপক সহিংসতার ভাষার ভিতরে দ্যোতক ও দ্যোতিতের ন্যায় একাকার হয়ে মিশে ছিল’iii (গুহ, ১৯৮৩: ৩৪)। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ধর্মবোধের একদেহ প্রাপ্তির এই নজির মাথায় রেখে আমরা প্রশ্ন করতে পারি: উপনিবেশোত্তর বাংলাদেশে, বিশেষত নাইন-ইলেভেন পরবর্তী ডিসকার্সিভ পরিসরে, জেএমবির আইন-আদালত-রাষ্ট্র তুচ্ছকারী বোমাবাজি ও মৃত্যুখেলাকে কি সাঁওতাল হুলের সাথে তুলনা করা যাবে; এবং জেএমবি জঙ্গিপনা নিয়ে বিদ্যমান সর্বসম্মত বিশ্বাসকে কি আমরা, রনজিৎ গুহর মতো,‘জঙ্গি চৈতন্যের ভুল পাঠ’ বলে ধরে নেব? আমার প্রস্তাব হলো, সেকুলার মডার্নিটি নির্ধারিত পাবলিক-প্রাইভেট ও পশ্চাৎপদতা-অগ্রসরতা বৈপরীত্যময় ঠুলি চোখ থেকে নামিয়ে রনজিৎ গুহর বক্তব্যের তত্ত্বীয় সম্ভাবনা আমলে নিয়ে ক্ষমতাবিন্যাসের নতুন পরিসরে ঘটনাটির রাজনৈতিকতা বিচার করলে হয়তো আমরা রাষ্ট্রীয় সঙ্কট চিহ্নিত করার পথেও কিছুটা এগিয়ে যেতে পারবো।

এই আত্মহননাকাঙ্ক্ষা রাজনৈতিক। হানা আরেন্থ বলবেন ‘বডিপলিটিক্স’। সাধারণভাবে মৃত্যুর সামনে সকলেই সমান। কিন্তু তারা কথায় ও কর্মে এমন এক মৃত্যু কামনা করেছেন যেন ‘মৃত্যুপরবর্তীকালেও মৃত্যুহীন চিরন্তন খ্যাতির ভাগিদার তারা হতে পারেন’ (আরেন্থ, ১৯৭০: ৬৮)। ধর্ম ঐতিহাসিক, ধর্ম সামজিক, ধর্ম সাংস্কৃতিক, ধর্ম রাজনৈতিক; এবং সেহেতু ‘ধর্মোন্মত্ততা’ ওহি নাজেল হবার মতো হঠাৎ টুপ করে আসমান থেকে পড়ে না; এবং কেবল বিশেষ কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে তাদের স্বভাবগত বা ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যগত কারণে ইতিহাসনিরপেক্ষভাবে উন্মাদনা বা মৌলবাদিতা দেখা দেয় না- বিশেষ ঐতিহাসিক কালখন্ডে, বিশেষ স্থানিক-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিসরেই এর আবির্ভাব ঘটে; এবং ক্ষমতা ও আত্মপরিচয়ের রাজনীতির সাথে তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। তাই, সর্বব্যাপী প্যানপটিকন নাজরদারিiv ও রাখালি ক্ষমতাv চর্চার এই যুগে, ত্রাস ও সন্ত্রাসের অর্থনীতির এই কালে ‘ধর্মোন্মাদনার’ রাজনৈতিকতা বোঝা, বিশেষত আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে, অত্যন্ত জরুরি কাজ বটে।

 

২.মিথের জগত

‘ইসলামী’ জঙ্গি নেতাদের কর্মকান্ডের উদ্দেশ্য, আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্যতার গুরুতর প্রশ্নগুলো আমরা তুলবো সিনেমা রেপ্রিজেন্টেশনের সূত্র ধরে। ‘ধর্মোন্মাদনার’ পরিস্থিতি পুনর্নির্মাণ ও শিক্ষণীয় করে তুলতে বাংলাদেশে চারটি কাহিনি-সিনেমা তৈরি হয়েছে: অপেক্ষা (আবু সাইয়ীদ ২০১০), রানওয়ে (তারেক মাসুদ ২০১০), জী হুজুর (জাকির হোসেন রাজু ২০১২), এবং টেলিভিশন (মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী ২০১৩)। দুইটা টেলিভশন নাটকও তৈরি হয়েছে- মায়া ম্যাডাম (সৈয়দ আওলাদ ২০১০), ফেরার পথ নাই, থাকে না কোনো কালে (মেজবাউর রহমান সুমন ২০১০) । আমি প্রথমোক্ত তিনটি সিনেমার বক্তব্য আমলে নিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও তার মতাদর্শিক অঙ্গ, এবং জঙ্গি বিষয়ী (সাবজেক্ট) সম্পর্কে বক্তব্য হাজির করবো; টেলিভিশন সিনেমাটি নিয়ে অন্যত্র স্বতন্ত্র আলাপ তোলা যাবে। মোটাদাগে, অপেক্ষা ও রানওয়েকে স্বাধীন ধরার সিনেমা হিসেবে এবং জী হুজুরকে ঢাকা সিনে-ইন্ডাস্ট্রির লোকরঞ্জক সিনেমা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তিনটি ভিন্ন ভিন্ন গল্প, তিনটি ভিন্ন কাহিনী। আলোচনায় আমি এই তিনটি কাহিনীর খুঁটিনাটি বিচার করতে যাবো না, বরং তিনটি স্বতন্ত্র কাহিনীর নাড়ি বুঝে একই সূতোয় সেলাই করে একটা অতি-কাহিনী, একটা মিথ বা পুরানকথা হাজির করবো- যে মিথ রাখালি ক্ষমতা বিচ্চুরণকারী রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রাণভোমরা।

আর, এরূপ পুরানকথার কলকাকলিতেই, আমরা দেখতে পাবো, মাতৃভূমি ও রাষ্ট্র একাকার হয়ে দাখিল হয় এক সীমানায়, ব্যক্তির দেশপ্রেম আত্মসাত হয়ে যায় আধুনিক রাষ্ট্রপ্রেমের পতাকাতলে, ঘটনার রাজনৈতিকতা হারিয়ে যায় ব্যক্তির ‘অপরাধ’ কাহিনীর আড়ালে।

ক। বেপথু সন্তানের অপেক্ষা চলে বুকভাসা জলে

ক্লান্তিকর একঘেঁয়েভাবে একই কথা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ফুলিয়ে-ফাপিয়ে বলে ভুল ভাঙার অপেক্ষা চলে তার সিনেমাজুড়ে।

ক্লান্তিকর একঘেঁয়েভাবে একই কথা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ফুলিয়ে-ফাপিয়ে বলে ভুল ভাঙার অপেক্ষা চলে তার সিনেমাজুড়ে।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইসলাম ক্ষেত্রটি বিকশিত হয়ে ওঠে, বস্ত্তত, মার্কিন দেশে টুইন-টাওয়ার ধ্বংসের ঘটনার পরে। নাইন-ইলেভেন পরবর্তী স্থানিক-কালিক একটা পরিসর, এই সূত্রে, আমরা চিহ্নিত করতে পারি- যখন মার্কিনি উদ্যোগে আন্তর্জাতিকভাবে ‘শুভ ও অশুভ’র লড়াই শুরম্ন হয়েছে। আফগানদের দেশে ‘তালিবান’ এবং সাদ্দামের দেশে ‘পারমানবিক অস্ত্র’ ধ্বংস ও গণতন্ত্র ফেরানোর অজুহাতে দেশ দু’টিকে সমূহ বিনাশের মাধ্যমে প্রসত্মর যুগে পাঠানো হচ্ছে, হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ-শিশু জীবনের বিনিময়ে পরিশোধ করছে তথাকথিত ‘গণতান্ত্রিক ও সভ্য’ পশ্চিমের সাম্রাজিক বাসনার মাসুল। তখন, ডিসকার্সিভ অভিঘাতে বাংলাদেশে জেএমবি এবং অন্যান্য ভয়ঙ্কর জঙ্গি সংগঠন জাতীয় জীবন বিপন্ন করতে শুরু করেছে- বোমা ফুটছে, মানুষ মরছে। নিউজ-মিডিয়ায় জঙ্গিদের আসত্মানা, তাদের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য-তৎপরতা থেকে রাষ্ট্রের করণীয় ইত্যাদি বিচিত্র বিষয়ে হাজারটা প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। জঙ্গি এক্সপার্ট তৈরি হচ্ছে, গবেষকরা ভুরিভুরি গবেষণাপত্র প্রকাশ করছেন। র‌্যাব-পুলিশের মার্কিনি কাউন্টার-ইন্সার্জেন্সি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষ দল সম্ভাব্য জঙ্গি ধরছে এবং নিয়মিত সংবাদ-শিরোনাম হচ্ছে। দেশমার্তৃকার প্রিয় সমত্মানেরা বিপথগামী হয়ে জঙ্গি খাতায় নাম লেখাচ্ছে, কয়েদখানাগুলো ভরে উঠছে ‘জঙ্গি’ লেবেলযুক্ত দাড়ি-টুপি-পাঞ্জাবিতে।vi সবমিলিয়ে দেশেজুড়ে এক জরুরি পরিস্থিতি। জঙ্গি উৎপাদন উদারনৈতিক পুঁজিবাদের বর্তমান কালখন্ডে অত্যন্ত জরুরি বটে। অনন্ত লড়ায়ের মেশিন যেহেতু আমাদের দেশেও সচল হয়েছে, তাই শুনি প্রধানমন্ত্রীতনয় সজীব ওয়াজেদ জয় একাত্তর টেলিভশনকে বলছেন, ‘আমরা জঙ্গি দমন করেছি। প্রতি সপ্তাহেই আমরা জঙ্গি ধরছি! [একাত্তর টিভি: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩] আতঙ্কের রাজনীতি বা ‘পলিটিক্স অব প্যারানোইয়া’ আধুনিক শাসনের প্রাণভোমরা।

এরূপ একটা সীমানায় দাঁড়িয়ে আবু সাইয়ীদ, বন্দুকের মতো, ক্যামেরা তাক করে ধরেন এবং জঙ্গি বোমাবাজ হয়ে-ওঠা বিপথগামী আত্মজর জন্য অপেক্ষার কাহিনী বলেন। কেন্দ্রীয় চরিত্র নিরীহ গোছের সফেদ পাজামা-পাঞ্জাবি-টুপিধারী রেজাউল করিম রঞ্জু কলেজের ভালো ছাত্র। গেরুয়া পোশাকী বাউল শিল্পীদের নিয়ে ‘বাংলা বাউল’ সংগঠন আয়োজিত ‘শিকড় সন্ধানের গান’ অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় জড়িত হয়ে পড়ে। আর সেই হামলায় আরেক গ্রামের নিঃসঙ্গ ও স্মৃতিশক্তি লোপ-পেতে-থাকা এক বৃদ্ধার নাতি রবিউল – গানের প্রথম এ্যলবামটা প্রকাশের প্রস্ত্ততি নিতে গিয়ে যে দাদিকে দেখতে যাবার সময়টুকুও পাচ্ছ না – নিহত হয়। কুশিলবদের নাম দেখানোর পরে পরেই বোমা হামলার এই ঘটনা মূলত কাহিনী সূত্রপাতের মুহূর্ত (যেকোনো ন্যারেটিভেই, রোঁলা বার্থের জবানে, এরকম ‘রিস্কি মোমেন্ট’ থাকে যা কাহিনীর গতিমুখ নির্ধারণ করে দেয়)। রক্তাক্ত আহত-নিহতদের নিয়ে হাসপাতালে ছোটাছুটি। সংবাদপত্র ছাপা হয়, টেলিভিশন সাংবাদিকরা সরেজমিন সরাসরি প্রতিবেদন দাখিল করেন- ময়মনসিংহ সিনেমা হলে বোমা হামলা, সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলার মতোই এই বোমা হামলায় জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতা আর বিভিন্ন স্তরের মানুষের ধিক্কারের বাণী পরিবেশিত হয়। পলাশতলী গ্রামে দাদির কুঠিরে শহর থেকে রবিউলের লাশ আসে। সঙ্গে আসা সাংবাদিক গ্রামের পরিস্থিতি বর্ণনা এবং নিরীহ জনগণের ওপরে এই ‘নৃশংস’ হামলাকারী ‘অমানুষ’ ‘পশুদের’ প্রতি ঘৃণা বর্ষণ করতে থাকেন। টেলিভিশনে শোকার্ত মানুষের আহাজারি সরাসরি প্রদর্শিত হয়। রাতের দুঃস্বপ্নে এবং দিনের বিস্মরণে স্মৃতিভ্রষ্ট দাদির মনে নিহত রবিউল নিত্য হানা দিতে থাকেন, এবং তিনি রবিউলের ঠিকানায় নিয়মিত চিঠি লিখিয়ে পাঠান। নাতির জন্য অনন্ত অপেক্ষার প্রতীক হয়ে তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন স্থানীয় বাসস্ট্যান্ডে।

অন্যদিকে, আরেক গ্রামে মাঝরাতে পুলিশ হানা দেয় রঞ্জুর খোঁজে। ন্যায়নিষ্ঠ বিহবল পিতা আতাউল করিমের চোখের সামনে রঞ্জুর ঘর থেকে খানাতল্লাশীতে বেরিয়ে আসে ‘জিহাদ’ কায়েমের প্রচারপুস্তিকা। বোমাহামলা করে নিরীহ মানুষ মারার দায়ে পুলিশ তাকে ‘টেরোরিস্ট’ হিসেবে ধিক্কার জানায়। রঞ্জু জেআরবি’র সদস্য! বিপন্ন পিতা ছোটেন কলেজ প্রিন্সিপালের কাছে সন্তানের খোঁজে। জানতে পারেন, কিছুদিন হলো রঞ্জু ক্লাস-পরীক্ষা সবই ছেড়েছে- ‘ফিরিবার পথহীন’ সন্ত্রাসের পথে পা বাড়িয়েছে। তিনি ঢাকায় গিয়ে এক সাংবাদিকের সহায়তায় খোঁজ নিতে থাকেন রঞ্জুর। অপেক্ষার পালা আর শেষ হয় না। কিন্তু, ওদিকে আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে রঞ্জু বেশ গুরুত্বপূর্ণ বোমাবিশারদ পাক্কা জিহাদি কর্মী হয়ে উঠেছে। ক্রমোন্নতি করতে-থাকা রঞ্জুকে শেষদিকে দেখা যায় এক কিশোরের শরীরে বোমাসজ্জিত জ্যাকেট পরিয়ে দিতে, কাজের গুণে তাকে একটা এলাকার কমান্ডার বানিয়ে দেয়া হয়। মাদ্রাসায় জেহাদি নের্তৃবৃন্দেরও সাক্ষাৎ মেলে একটা দৃশ্যে, আফগানিস্থান ও কাশ্মিরে যুদ্ধ করা মুজাহিদরাও সেখানে সামিল। বিপুল অস্ত্রের চালান ও ডলার নিয়ে এক পাকিস্তানি জিহাদি আসে। আর এই সকল প্ররোচনাতেই রঞ্জুর মতো মেধাবী যুবকেরা ‘জিহাদ’ নামের ধ্বংসাত্মক বি-পথে চালিত হয়। বাবা আতাউল, সাংবাদিকসহ অনেক কণ্ঠে ধ্বনিত হয়: ন্যাশনালি এবং ইন্টারন্যাশনালি ওরা ঘৃণ্য রাজনীতির শিকার, ওরা এসব করে ইসলামের বরং ক্ষতিই করছে, ইসলামের শান্তির বাণীকেও বিনষ্ট করছে। বিভিন্ন হাতফিরতা হয়ে পৌঁছানো বাবার চিঠিতে মায়ের অসুখের কথা জেনে রঞ্জু ক্ষণিকের জন্য এলাকায় ফিরবার কল্পনা করে, ছোটবেলার স্মৃতি হানা দেয়। কিন্তু তাকে আমরা জঙ্গি-বোমার দুনিয়া থেকে ফিরতে দেখি না। বাবা-মায়ের অপেক্ষা চলতেই থাকে; ওদিকে, নিহত নাতির অপেক্ষায় লাঠি ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন দাদি মরিয়ম।

এই হলো: অপেক্ষা। খুবই সাদামাটা একটা গল্প, খুবই সাদামাটা সিনেমা ভাষায় পরিবেশিত- প্রায় গতিহীন। যাহোক, পরিবেশনার কলাকৌশল, শিল্পমান বা গল্পের বুনোন আমার মনোযোগের বিষয় না। আমার আগ্রহ বরং অপেক্ষা কী বলতে চায় সেইটা নিয়ে। ‘বাউল’vii আমাদের শেকড়। আর সেই শেকড় সন্ধানের জন্য যে গানের আসর আয়োজন করা হয়েছে সেখানেই বোমা হামলা ঘটে, আরও অনেকের সাথে নিহত হয় বাউল শিল্পি রবিউল- যেন বোমা হামলা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শেকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলতে চায়। আর, শেকড়ে বিষাক্ত কীটের মতো দংশন করে রেজাউল করিম রঞ্জু ও তার জঙ্গিবাহিনী। পিতা আতাউল করিমের চোখেমুখে আমরা অপরাধবোধ ফুটে উঠতে দেখি­- রাষ্ট্রীয়-সাংস্কৃতিক মানব্যাঞ্জক মূল্যবোধ রপ্ত করতে না-পারার আপরাধ। বলা চলে, সিনেমাটিতে দুই ধরনের বেদনাদীর্ণ অপেক্ষা একাকার হয়ে যায়: দাদির অপেক্ষা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ফেরা বা পুনরুজ্জীবনের বাসনারূপে হাজির হয়; অন্যদিকে বাবা-মায়ের অপেক্ষা- সন্তান ফিরবে, মাতৃসম দেখভালকারী রাষ্ট্রের নিয়মনীতির অনুগত সুনাগরিক হয়ে ফিরে আসবে। সুতরাং, ভালো ছেলেটা কেন জঙ্গি হয়ে উঠলো তার একটাই ব্যাখ্যা পাই আমরা- ধর্মের ‘ভুল ব্যাখ্যা’ করে সে বিপথগামী হয়েছে। সিনেমাটিতে আধুনিকতার একরৈখিক প্রগতির গল্পগাছাকে আপ্তবিশ্বাস হিসেবে ধরে নেয়া হয়- ধর্মের স্থান হতে হবে প্রাইভেট স্ফিয়ারে, ধর্ম একটা বিশ্বাস ও পশ্চাৎপদ মানসিকতা বৈ আর কিছু না, সেকুলার আধুনিকতাগামী কল্যাণকামী রাষ্ট্রব্যবস্থাই পবিত্র ও চূড়ামত্ম গমত্মব্য ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলে আবু সাইয়ীদ খেয়ালও করেন না, ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবন ও ধর্মের ‘সঠিক’ ব্যাখ্যার ঠিকাদারী কোন ফাঁকে আধুনিক অনুশাসনতন্ত্র ও জৈবরাজনৈতিক বিষয়ী উৎপাদনকারী রাষ্ট্রের হাতে চলে যায়- মানুষের ঘরে ঘরে, শরীরে-মনে-মগজে রাষ্ট্রের বিচিত্র অভিযান ও দখলের কাহিনী হারিয়ে যায়। সুতরাং ক্লান্তিকর একঘেঁয়েভাবে একই কথা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ফুলিয়ে-ফাপিয়ে বলে ভুল ভাঙার অপেক্ষা চলে তার সিনেমাজুড়ে।

খ। রানওয়ে ধরে, ফিরে এসো ঘরে

আরিফ ও রুহুলের মধ্যেই আমরা পেয়ে যাই আধুনিক জৈবরাজনৈতিক বিষয়ীর প্রকৃষ্ট নমুনা। এ রাজনীতি জীবন হরণে আগ্রহী নয়। বায়োপলিটিক্স হলো, আমরা হয়তো অনেকেই জানি, ‘জীবন বিনির্মাণের রাজনীতি’, কিংবা বলা যায়, ‘রাজনীতির সেই পরিসর যা জীবনের পরিসরকে পরিব্যাপ্ত করে রাখে’।

আরিফ ও রুহুলের মধ্যেই আমরা পেয়ে যাই আধুনিক জৈবরাজনৈতিক বিষয়ীর প্রকৃষ্ট নমুনা। এ রাজনীতি জীবন হরণে আগ্রহী নয়। বায়োপলিটিক্স হলো, আমরা হয়তো অনেকেই জানি, ‘জীবন বিনির্মাণের রাজনীতি’, কিংবা বলা যায়, ‘রাজনীতির সেই পরিসর যা জীবনের পরিসরকে পরিব্যাপ্ত করে রাখে’।

যে সন্তান ভুলেভরা পথের টানে ঘরছাড়া হয়েছে, রানওয়ে মারফত সে ফিরে আসে মায়ের কোলে। বলা চলে তারেক মাসুদ মা-মাটি-দেশের হৃদয় উৎসারিত ভালোবাসার প্রবল হ্যাচ্কা টানে সেই সন্তানকে ‘ধর্মোন্মত্তার ভুল পথ’ থেকে ফিরিয়ে আনেন। আবু সাইয়ীদ যখন ব্যাখ্যাহীনভাবে ভুল পথের বয়ান হাজির করেন, তখন তারেক মাসুদ ধর্মের ‘ভুল ব্যাখ্যা’র কারণ অনুসন্ধান করেন। কোন পরিস্থিতিতে, কোন বাস্তবতায় আমাদের সমাজে ধর্মের ‘ভুল ব্যাখ্যা’ তৈয়ার হয় এবং রুহুলের মতো মাদ্রাসা-পড়া যুবকরা তাতে মোহাচ্ছন্ন হন তার ইশতেহার হাজির করেন।

বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশে ঝুপড়িঘরে আশ্রয় নেয়া নদী ভাঙ্গনের শিকার এক দরিদ্র পরিবারের গল্প ‘রানওয়ে’; পোশাক শ্রমিকদের বেতন-বঞ্চনা ও ভোগান্তির গল্প, কাজের সন্ধানে বিদেশে যাওয়া শ্রমিকদের কষ্টের গল্প, ক্ষুদ্রঋণনির্ভর এনজিও কার্যক্রমের গল্প। আর এই বিভিন্ন গল্পর শাখা-প্রশাখায় জড়িয়ে মূল যে কহতব্য, রোঁলা বার্থের জবানে ‘মাস্টার ন্যারেটিভ’, কান্ড কিংবা কান্ডজ্ঞান হিসেবে এই সিনেমায় হাজির হয় তা হলো: দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ, দেশীয় রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা ধর্মের/ইসলামের ‘সহী’ রাস্তা সন্ধানী মাদ্রাসাপড়া সহজ-সরল অভাবী ছেলেকে উগ্রপন্থী করে তোলে; এবং এর ফলে তার নিজের জীবনে ও পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে বিপর্যয় নেমে আসে। এবং অবশেষে ছেলেটি তার ভুল বুঝতে পারে, আধুনিকতাগামী কল্যাণকামী রাষ্ট্র নির্দেশিত ও নিধারিত ধর্মের/ইসলামের ‘সহী’ রাস্তা খুঁজে পেয়ে মায়ের কোলে ফিরে আসে।

প্রধান চরিত্র রুহুলের বাবা মধ্যপ্রাচ্যে অভিবাসী শ্রমিক, মা একটি এনজিও থেকে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে গাভি কিনেছেন, ছোট বোন ফাতেমা গার্মেন্ট শ্রমিক, পরিবারে আরেক সদস্য বৃদ্ধ দাদা। মাদ্রাসা থেকে ঝরে-পড়া বেকার রুহুল মাঝেমধ্যে মামার সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে টুকটাক কম্পিউটার-ইন্টারনেট শেখে। সেখানেই তরুণ আরিফের সঙ্গে রুহুলের বন্ধুত্ব। শ্মশ্রমন্ডিত ও সুশ্রী-স্মার্ট আরিফের সঙ্গে ইসলামের সঠিক পথ কোনটা, তা নিয়ে আলাপ করতে করতে আরিফদের জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে রুহুল পরিচিত হয়- জঙ্গিপনায় হাতেখড়ি ঘটে। আফগানিস্তান-কাশ্মীর ফেরত মুজাহিদ ‘উর্দু ভাই’য়ের দেখা মেলে- সে জঙ্গি দলটি পরিচালনা করে, তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেয় এবং অবশেষে ‘মুক্তাঞ্চল’ গড়ে তোলে। আর, রুহুল বদলে যেতে থাকে; বোন ফাতেমার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চায়- টেলিভিশনে সংবাদ ছাড়া আর কিছুই দেখা যাবে না! মাকে প্রস্তাব করে গাভি বিক্রি করে এনজিওর ঋণ শোধ করার মাধ্যমে সুদের ব্যবসা থেকে সরে আসতে। পরহেজগার রুহুলের এই কট্টরপনা পরিবারের কেউই অনুমোদন করে না; প্রতিরোধ ও তিরস্কারের মুখে রুহুলের ঘরবিমুখতা বাড়তে থকে। ওদিকে আরিফরা সিনেমা হলে বোমা হামলা করে। জঙ্গিনেতা ‘উর্দু ভাই’ দাবি করে তাদের তৎপরতার কারণেই যাত্রা, মাজারের ওরশ, পালাগান ইত্যাদি নাজায়েজ-নাফরমানি কাজকাম বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি নিজেদের ‘মুক্তাঞ্চলে’ শরিয়া আইন মোতাবেক সবকিছু চালানোর ঘোষণা দেন। আর এই ‘বাড়াবাড়ি’তে বিব্রত সরকারের ক্ষমতাধর মন্ত্রী জঙ্গিদের ডেকে বকাঝকা করেন। এ রকম বাড়াবাড়ি করলে যে আর ‘প্রটেকশন’ দেয়া যাবে না, সেকথা স্পষ্ট জানিয়ে দেন। বিচারকদের যেন কিছু না করা হয়, তাও আলাদা করে নির্দেশ দেন। জঙ্গিনেতা ‘উর্দু ভাই’ও ওই কর্তাব্যক্তির ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন: তারা মুখে ইসলামি জাতীয়তাবাদের কথা বললেও কাজের সময় দাতাদের মন জুগিয়ে চলেন। ‘উর্দু ভাই’ ও ‘বড় হুজুর’ (এই দুই চরিত্রের ছায়ায় শায়খ আবদুর রহমান এবং তার প্রধান সিপাহসালার বাংলা ভাইয়ের অবয়ব চিনতে আমাদের অসুবিধা হবার কথা নয়) শেষপর্যন্ত সরকারের অবাধ্য হয়- বিচারক হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। আদালত প্রাঙ্গণে বিচারকদের ওপর বোমাহামলার মিশন সফল করতে গিয়ে গুরুতর আহত হয় আরিফ। টেলিভিশনের পর্দায় ক্ষত-বিক্ষত আরিফকে দেখে জঙ্গিরা ভাবে, হাসপাতালে একটু সুস্থ হলেই আরিফ সব বলে দিতে পারে। তাই তারা সেই রাতেই সটকে পড়ে। বন্ধু আরিফের এই পরিণতি রুহুল মানতে পারে না। হাসপাতাল করিডোরের আলোআঁধারীতে নার্সদের তত্ত্বাবধানে ক্ষতবিক্ষত আরিফের নিশ্চল দেহ বয়ে নেবার দৃশ্য জীবনের কলকাকলিমুখরিত পৃথিবী থেকে হীমশিতল মৃত্যুর দেশে চলে যাবার প্রতীকি ভয় জাগিয়ে তোলে। দ্বিধান্বিত রুহুল সেখানেই থেকে যায়, রাতভর অন্তর্দন্দ্ব চলতে থাকে তার মনে।

ভোরে সে বাড়ি ফিরে আসে: ফিরে আসে জীবনের আলোবাতাসে। মহা ক্লান্তির ঘুম থেকে উঠে বিকেলে ঘরের বাইরে এসে সে বসে, চারপাশের প্রকৃতিতে ঘটে-চলা জীবনের প্রবাহ দেখতে থাকে: নরম আলোয় ঘাসফুলের ওপর ফড়িং এসে বসছে, ভেসালের জালে আটকে থাকা পানিতে চিকচিকে আলো প্রতিফলিত হচ্ছে, জালে পড়া কিছু ছোট মাছ লাফাচ্ছে, পিঁপড়ার দল সারি বেঁধে যাচ্ছে, ঝিঙে ফুল বাতাসে দুলছে, মা দুধ দোয়াচ্ছে। আলাদাভাবে এ দৃশ্যগুলোর কোনো মূল্য নাই। কিন্তু যখনই দৃশ্যগুলো ছেলেটির জীবনের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে যুক্ত করে দেখা হবে, তখনই আলাদা দৃশ্যখ-গুলো অর্থময়তায় ভরে উঠবে। প্রাকৃতির যে জীবনের বুনোন তা থেকে রুহুল ও আরিফের মতো ছেলেরা ছিটকে পড়েছিল। আরিফ আর ফিরতে পারেনি, তার যাত্রা ঘটেছে হীমশীতল মৃত্যুর দেশে। কিন্তু রুহুল আবার প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক জীবনের বুনোনে ফিরে আসতে পেরেছে- রাষ্ট্র সেটাই চায়। সেকারণে মাতৃভূমিতুল্য মা দুধ দোয়ানো শেষ করে বাটিতে করে দুধ নিয়ে ছেলের কাছে এসে তার কল্যাণময়ী হাতে মুখ ধুইয়ে দিতে থাকে। আমাদের লোকসমাজে প্রচলিত এ আচারের মাধমে রুহুলকে পরিশুদ্ধ করে তোলা হয়। তার পুনরুজ্জীবন ঘটে। নতুনভাবে স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক জীবনের সম্ভাবনায় রুহুলের চোখেমুখে আলো ফুটে ওঠে।

রাষ্ট্রও প্রাকৃতিক নয়, প্রকৃতিও ‘প্রাকৃতিক’ বলতে যা আমরা বুঝি তা নয়। প্রাকৃতিক জীবন বলে আদপে কিছু নেই এযুগে, প্রযুক্তির মধ্যস্ততায়ই তার অস্তিত্ব ও ক্রিয়াশীলতা। যাহোক, আরিফ ও রুহুলের মধ্যেই আমরা পেয়ে যাই আধুনিক জৈবরাজনৈতিক বিষয়ীর প্রকৃষ্ট নমুনা। এ রাজনীতি জীবন হরণে আগ্রহী নয়। বায়োপলিটিক্স হলো, আমরা হয়তো অনেকেই জানি,‘জীবন বিনির্মাণের রাজনীতি’, কিংবা বলা যায়, ‘রাজনীতির সেই পরিসর যা জীবনের পরিসরকে পরিব্যাপ্ত করে রাখে’। ফুকো বায়োপলিটিক্স শব্দটি সুনির্দিষ্টভাবে প্রয়োগ করে বলেন, অষ্টাদশ শতক থেকে মানবজীবন টিকিয়ে রাখার শর্তগুলো পরিষ্কারভাবে রাজনীতির বিষয়বস্ত্ত হয়ে ওঠে (স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জনসংখ্যার হিসাব ইত্যাদি)। সম্প্রতি শব্দটির অর্থ আরও বিস্তৃত হয়েছে। বায়োপলিটিক্স বলতে এখন বুঝতে হবে: প্রাকৃতিক জীবনকে আরও নিয়ন্ত্রীত ব্যবস্থাপনার আওতাধীন করে তোলার রাজনীতি- যা এখন পর্যন্ত সেকুলার মডার্ন রাষ্ট্রকেন্দ্রিক (ন্যান্সি ২০০৭: ৯৩)। রাষ্ট্র বহুবিধ কল্যাণমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে তার জনসমষ্টিকে শক্তিশালী ও উৎপাদনশীল করে তুলতে চায়। একইসাথে, নিয়মিত পরিশুদ্ধি অভিযানও চালাতে হয় জাতির জমিন আগাছামুক্ত রাখতে।

গ। ঝাঁপিয়ে পড়ো রাষ্ট্রসেবায়- বলো, জী হুজুর

পথের অভিজ্ঞতা হয়েছে, ভুল ও সঠিকের বিচার করতে শিখেছে সন্তান। এবার সঠিক পথের নিশানা ধরে সে হাঁটবে- জীবনযাপনে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দেশের সকলকে আহবান করবে সেই পথে। জাকির হোসেন রাজু ধর্মের ‘সঠিক ব্যাখ্যা’ বা ‘সহি’ রাস্তা মেলে ধরেন আমাদের সামনে- যে রাস্তা রাষ্ট্র-অনুমোদিত, রাষ্ট্র আরাধ্যও বটে।

জী হুজুর-এর মূল চরিত্র মাদ্রাসা পাশ আবদুর রহমান। ঢাকা শহরে চাকুরীতে যোগ দিতে এসে বাবার বন্ধুর বাড়িতে উঠেছে বসবাসের জন্য। সেই বাড়িতে আবদুর রহমান বিপরীত সাংস্কৃতিক পরিবেশের মুখোমুখি হয়- বহিরঙ্গে সংক্ষিপ্তবসনা বান্টি ও বাবলি এবং তাদের বাবার ‘অ-ইসলামী’ জীবনযাপন সাচ্চা বিশ্বাসী আবদুর রহমানকে সঙ্কুচিত করে রাখে। তবে আবদুর রহমান তার অমায়িক আচারব্যবহার, পরিশীলিত জীবনাচার এবং গভীর ধর্মনিষ্ঠার নজির স্থাপন করে পরিবারের সকলকেই ভিতর থেকে আমূল রূপান্তরের কারিগর হয়ে ওঠে। সমান্তরালে চলতে থাকা আরেক কাহিনীতে থাকেন দেশপ্রেমিক সৎ এবং নিষ্ঠাবান পুলিশ অফিসার ফারুক। রাজনৈতিক তদবিরের কারণে যেহেতু সন্ত্রাসীদের ধরলেও বারবার ছেড়ে দিতে হয়, তাই তিনি দেশের মানুষের সুখশান্তি নিশ্চিত করতে সন্ত্রাসীদেরকে ক্রয়ফায়ারে হত্যা করার সহজ রাস্তা গ্রহণ করেন। সন্ত্রাসীদের চক্ষুশুল হয়ে ওঠা এই পুলিশ অফিসার ফারুক সেহেতু সন্ত্রাসীদের আক্রমণে নিহত হন। কিন্তু এ হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষদর্শী একজন থেকে যায়- সে আবদুর রহমান। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হত্যা মামলার সাক্ষি হন আবদুর রহমান। একজন ঈমানদার মানুষ হিসেবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা তার জন্য ফরজ কাজ বটে!

আর সাক্ষী হবার সুবাদেই আবদুর রহমান মুখোমুখি হয়ে পড়েন আন্তর্জাতিক ক্রাইম সিন্ডিকেটের। এদের কাছে সব রাজনৈতিক দলই সমান। এই সিন্ডেকেটের কাজ হলো আমাদের দেশের ভেতর সবসময় অস্থিরতা জারি রাখা। আর এই সুযোগে শক্তিশালী দেশগুলো আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করে নেয়। সুতরাং, আবদুর রহমান আল্লাহর বান্দা হয়ে সমাজে ও রাষ্ট্রে নিজের দায় নিয়ে হাজির হয়। পুলিশের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে ছিন্নভিন্ন করে দেয় রাষ্ট্রবিরোধী সব ষড়যন্ত্রের জাল।

সেকুলারবাদী রাষ্ট্রের সঙ্কট বুঝতে জী হুজুর-এর বয়ান খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলেই আমার মনে হয়েছে। কিন্তু, এফডিসি বস্তাপচা সিনেমা বানায়- এরকম আপ্ত ধরণা থেকেই হয়তো আমাদের অতন্দ্র প্রহরীগণ জী হুজুরের খোঁজও রাখেন নাই। জী হুজুর-এর পুরো পর্দাজুড়ে সফেদ পাজামা-পাঞ্জাবী-টুপি আর দাড়িসমেত মাদ্রাসা বয় আবদুর রহমানের দাপুটে উপস্থিতি যেভাবে ধার্মিকতার মহত্ব জাহির করে সেরকম বোধহয় আর কোথাও আগে দেখা যায়নি। আমাদের চেনা হিরোদের জগতে ­- সিনেমার রূপালী পর্দা আর জাতীয় রাজনীতির মঞ্চ – আবদুর রহমান একটা মূর্তিমান বিশৃঙ্খলা হিসেবে হাজির হয়। কিন্তু একটু পিছনে ফিরে তাকালে দেখা যাবে জী হুজুরের আবদুর রহমান বস্ত্তত আমাদের ইমেজ জগতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই নিয়োজিত। যে আবদুর রহমানকে ২০০৭-এ ফাঁসিতে চড়ানো হয়েছিল সে এই রাষ্ট্রব্যবস্থার আইন-কানুন মানতো না, এগুলোকে বলতো ‘তাগুতি’ মানে শয়তানের আইন। ফাঁসি হবে জেনেও আদালতে দাঁড়িয়ে সে স্পর্ধিত উচ্চকণ্ঠে বলেছিল, ‘‘আমি বিচারকদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছি, কারণ তারা আল্লাহর আইন মেনে বিচার করে না। মানুষের তৈরি আইনে আমি হয়তো অপরাধী গণ্য হবো, আল্লাহর আইনে নয়।’’ কিন্তু এর বিপরীতে জী হুজুরের আবদুর রহমান আল্লাহর রাহে জীবন উৎসর্গ করলেও মানুষের তৈরি রাষ্ট্র ও আইন-কানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সত্যনিষ্ঠ, এবং সর্বোপরি অন্য যেকোনো জাতীয়তাবাদী রঙের দেশেপ্রেমিকের মতোই একজন প্রকৃষ্ট দেশপ্রেমিক। ফলে, ঘৃণ্য ধর্মোন্মাদ হিসেবে শায়খ আবদুর রহমানের নেতিবাচকতাদুষ্ট ইমেজ আমাদের ‘দেশপ্রেম’ (রাষ্ট্রভক্তি হিসেবে পাঠ করতে হবে) অনুভূতিতে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছিল তা প্রতিরোধে অনুকরণীয় ধার্মিকতার ইমেজ হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় জী হুজুরের আবদুর রহমান, যা সেকুলারবাদী রাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত।

আমরা রঙ্গ করে এভাবেও বলতে পারি যে রাষ্ট্র-কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচকতা ধারণ করে জী হুজুর-এ বস্ত্তত শায়খ আবদুর রহমানই ফিরে আসে, কিংবা রাষ্ট্র তাকে ফিরিয়ে আনে। রাষ্ট্র আবদুর রহমানদেরকে সমূলে নিপাত করতে চায় না, পারেও না। কারণ সেকুলাররাদী রাষ্ট্রর কাছে নন-সেকুলার আবদুর রহমানদের প্রয়োজন কখনো ফুরায় না। ‘অসভ্য-অনাধুনিক’ আয়না ছাড়া ‘সভ্য-আধুনিক’ নিজের চেহারা দেখতে পায় না। সেই প্রয়োজন থেকেই অনুকরণীয়, শিক্ষণীয় এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রভক্তির প্রতীক হিসেবে নতুন রূপে নির্মিত হন ‘আবদুর রহমান’, যে নামের অর্থ আমরা এক্ষণে স্মরণ করতে পারি- পরম দয়ালু আল্লাহর বান্দা। তার মানে, আমরা সকলেই বস্ত্তত ‘আবদুর রহমান’! কিংবা এই নামের ভিতর দিয়ে রাষ্ট্রের এরূপ সুপ্ত বাসনা প্রকাশিত হয় যে আমরা সকলেই জী হুজুর-এর আবদুর রহমানের মতো হয়ে উঠবো। রাষ্ট্র আবদুর রহমানদের বিচরণের পরিসর ও ভূমিকা নির্দিষ্ট করে দেয় বটে, কিন্তু একইসাথে নিজের ভঙ্গুরতা এবং ঝুঁকিও জারি রাখে। কারণ যেকোনো পরিসরের প্রান্তেই নাজুকতা থাকে, ভূমিকায় দ্ব্যার্থকতা থাকে। আবদুর রহমানরা যেকোনো সময় সীমানা ডিঙাতে পারে, অনাকাঙ্ক্ষিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে। আর সঙ্কট রোধ করতে সেকুলারবাদী রাষ্ট্রকে জারি রাখতে হয় প্রিএমটিভ অনন্ত লড়াই।

 

৩. রাখালি ক্ষমতা ও গভার্ন-মেন্টালিটি: অতঃপর অনন্ত লড়াই

জঙ্গি সঙ্কট বা ধর্মোন্মাদনা নিয়ে একজন আবু সাইয়ীদ বা একজন তারেক মাসুদের উদ্বেগ এবং তাদেরকে আবারও ‘ডোসাইল সাবজেক্ট’ হিসেবে গড়ে তুলবার আন্তরিকতা চোখে পড়ার মতো। এবং তারপরে সেই ডোসাইল সাবজেক্টকে রাষ্ট্রসেবায় নিয়োজিত করতে একজন জাকির হোসেন রাজুর আন্তরিক প্রচেষ্টাও আমাদের নজর এড়াবে না। শায়খ আবদুর রহমান ও অন্যান্য জেএমবি নেতাদের ফাঁসির রায় ঘোষণাকালে বাংলাদেশের উচ্চ আদালত যে সিদ্ধান্ত জারি করে, আবু সাইয়ীদের অপেক্ষা, তারেক মাসুদের রানওয়ে এবং জাকির হোসেন রাজুর জী হুজুর সেই সিদ্ধান্তকেই তামিল করে। ফলে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রের আইন এবং সিনেমার ক্যামেরা একই ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছে: অপেক্ষা ধর্মের ‘ভুল ব্যাখ্যা’র দৃশ্যকল্প হাজির করে, রানওয়ে ধর্মের ভুল পথ থেকে ফিরে আসবার প্রাকৃতিক/রাষ্ট্রীয় কৃৎকানুন শিখিয়ে দেয় সম্ভাব্য জঙ্গিদেরকে; এবং অবশেষে জী হুজুর রাষ্ট্রের মতাদর্শিক খুপরিতে বশীকৃত ইসলামের ‘সহি রাস্তা’ বাৎলে দেয়।

সিনেমা, আদালত, সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং সর্বোপরি রাষ্ট্র- একই ভাষায় কথা বলে কেন? এখানেই আধুনিক যুক্তিনির্ভর সমাজে ক্ষমতার নতুন বিন্যাস, ফুকো কথিত, রাখালি ক্ষমতা ও গভার্ন-মেন্টালিটি আমাদের একটু বুঝবার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। রাখালি ক্ষমতার চর্চা তখনই সবচেয়ে কার্যকরী যখন তা জনগণের মধ্যে অনুশাসনের ‘মেন্টালিটি’ গড়ে তুলতে পারে। আর, এ এমন এক মেন্টালিটি যার সুবাদে বন্দি বিষয়ী নিজেই নিজের পাহারাদার হয়ে ওঠে- ক্ষমতার পুনরুৎপাদন করে চলে। সভ্যতার প্রবৃদ্ধির জন্য নিরন্তর সংশোধন ও পরিশুদ্ধি অভিযান চালিয়ে যেতে হয়, অসভ্যদের উৎপাটন করতে হয়- এবং সর্বসম্মতভাবেই আমরা এই সিদ্ধান্তে একমত হয়ে বসে থাকি। আধুনিক মিথের ক্রিয়াশীলতাও এখানেই। মিথ কেবল প্রাগাধুনিক না, আধুনিক সমাজেও হরদম তৈরি হচ্ছে- যেকারণে সবাই একই সুরে কথা বলে, একই নজরে জগত দেখে। বস্ত্তত, আধুনিকতা নিজেই একটা মিথ। সর্বদাই প্রাকৃতিক-সাংস্কৃতিক আদিম ও আধুনিকের সংমিশ্রন ঘটে চলেছে। আর, এইসব দেখেশুনেই, ব্রুনো লাটুর বলে ফেলেন, আমরা কস্মিনকালেও আধুনিক ছিলাম না (লাটুর ১৯৯৩: ১৩০)। গোড়া থেকেই আধুনিকতা নিজেকে দেখেছে এক অসম্পূর্ণ যাত্রার উপমায়। আর এই উপমার জোরেই এক ‘সময়-রাজনীতি’ সে ফেঁদে বসতে পেরেছে। নিজের ওপর চলেছে অনর্গল মাস্টারি: এই বুঝি ফেলে-আসা প্রাক-আধুনিক অতীত মাথচাড়া দিয়ে উঠছে, সজাগ থাকতে হবে তাই সর্বক্ষণ! অসভ্যকে সভ্য করার, প্রাক-আধুনিককে খর্ব করার, সমূলে উৎখাত করবার জাহিরিতেই আধুনিকতার মাহাত্ম্য- আধুনিকতার এই রাজনীতিটুকু আমাদের জন্য বুঝে নেয়া জরুরি।

শহীদ তিতুর কথাতো আমরা সকলেই জানি। ইতিহাসকাররা নানা রঙে সাজিয়েছেন ‘বাঁশের কেল্লা’ viii বানিয়ে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসক-জমিদার-নীলকর ত্রয়ী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এই বীরকে। বিলাসী জমিদার-সেবক লাঠিয়াল তিতুমীর মক্কা থেকে হজ্জ করে ফিরে ভিন্ন মানুষ বনে গেলেন। দল বাঁধতে শুরু করলেন ‘তরিকা-ই-মহম্মদীয়া’র পতাকাতলে। দাড়ি রাখলেন (তাই তাদেরকে তাচ্ছিল্য করে ‘দেড়ে’ নামে ডাকা শুরু হলো), তাদের মুখে ‘হাদিস-কোরানের কথা গিজ-গিজ করে’ (তাই তাদেরকে সমাজের বিনাশযোগ্য ‘কীট’ হিসেবে দেখা শুরু হলো)। বৃটিশ ঔপনিবেশিক নজরে তারা হলেন ‘ধর্মোন্মাদ’, বৃটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী নজরে তারা হলেন ‘স্বাধীনতাকামী জাতীয় বীর’, ইসলামী পুনরুত্থানবাদীদের নজরে হলেন দার-উল-হারাবের ‘জিহাদী’, এবং মার্কসবাদী বিচারকদের নজরে হলেন শ্রেণীসংগ্রামী সর্বহারা ‘বিপ্লবী’।

কোন গুণে ভুষিত করবো তিতুকে- ধর্মোন্মাদ? স্বাধীনতাকামী জাতীয় বীর? জিহাদী? নাকি সর্বহারা বিপ্লবী? হয়তো এই সবগুলো রঙের ছোপ ছোপ দাগ তার শরীরে চিহ্নিত করা যাবে। তবে আমি ঔপনিবেশিক, জাতীয়তাবাদী, জিহাদী, কিংবা বিপ্লবী বয়ান হাজির করে ‘বাঁশের কেল্লা’র জয়গানে লিপ্ত হতে রাজি নই। কারণ, এরূপ বয়ানে তিতুর রাজনৈতিকতা খন্ডিত হয়, ক্ষমতার স্থানিক-সাংস্কৃতিক-সাময়িক পরিসর হারিয়ে যায়। রাজনৈতিকতার বিচারে ক্যামেরার লেন্সটাকে যদি একশত বছর পরে স্বাধীন বাংলাদেশের আজকের, নাইন-ইলেভেন পরবর্তী, পরিসরে ফোকাস করি তাহলেও অনেকটা একই রকম পরিস্থিতি দেখা যাবে- ক্ষমতাবিন্যাসের চেনা চিহ্নের জগতে একটা ফাটল ধরেছে- নতুন চিহ্নধারীরা হিস্যা চাইছে। ধর্মোন্মাদ বা জিহাদ কোনো বর্গ দিয়েই তাকে আঁটা যায় না। ন্যায় বা ন্যায্যতার প্রশ্ন সবসময় আইনের সীমা ছাপিয়ে যায়। আর সেকারণের ন্যায়ের প্রশ্নে এক দলের সাথে অন্য দলের মিমাংসা কখনোই সাঙ্গ হয় না, সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। শায়খ আবদুর রহমানের কথা ও কাজ সেরকম আইনের সীমা ছাপিয়ে যায় ‘ন্যায়ের’ প্রশ্নে- আর ত্রাস ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে এই প্রশ্ন তিনি তোলেন, কারণ তিনি জানেন- নতুন আইন মানেই ক্ষমতার নতুন বিন্যাস। ফুকো বলবেন, সমাজ যুদ্ধে দীর্ণ- আমরা সবাই যুদ্ধে লিপ্ত আছি। এ যুদ্ধর ভাষা কী হবে তা নির্ভর করে পরিস্থিতির ওপর- মুখের কথা, লাঠিগুলি নাকি পারমাণবিক বোমার বিপরীতে মানববোমা। সংঘাত সীমিত রাখতে চাইলে রাউল বলবেন ‘মিনিমাল কমন গ্রাউন্ড’র কথা, যার ওপর দাঁড়িয়ে একে অপরের সাথে কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়া যাবে।

কিন্তু যে সিনেমাগুলো আলোচনা করলাম তা, শেষবিচারে, রাষ্ট্রনির্দেশিত বায়োপলিটিক্যাল সবজেক্ট নির্মাণ প্রকল্পের অংশ হয়ে পড়ে, আধুনিক মিথ নির্মাণ করে রাখালি ক্ষমতার বাঁশি বাজায়। ফলে সংঘাত, ত্রাস ও সন্ত্রাস চলছে, চলবে অবিরাম। ‘

এখন, ২০০৭ সালের মার্চ মাসে শায়খ আবদুর রহমানসহ অর্ধডজন শীর্ষস্থানীয় জেএমবি নেতার ফাঁসিপরবর্তী দমনমূলক অনন্ত লড়াইয়ে প্রস্ত্তত তথাকথিত সেকুলার বাংলাদেশের দিকে একটু নজর ফেরাতে পারি। ‘অচিন পাখি’ নামের বাউল ভাষ্কর্যর কাহিনী আমরা নিশ্চয় ভুলে যায়নি। ২০০৮ সালের শেষপ্রান্তে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে বাউল গাতকদের ৫টি ভাষ্কর্য একটা বেদিতে বসানোর কাজ প্রায় শেষ করে এনেছিলেন মৃণাল হক। এমন সময় আশপাশের মাদ্রাসা ছাত্র-শিক্ষক ও মসজিদের ইমামরা দলবদ্ধ হয়ে ‘বিমানবন্দর গোলচত্ত্বর মূর্তি প্রতিরোধ কমিটি’ গড়ে তোলে, ভাষ্কর্যটির ওপর হামলা চালায় এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভাষ্কর্যটি, যা তাদের জবানে অ-ইসলামী মূর্তিপুজোর সামিল, সরিয়ে ফেলার সময়সীমা বেঁধে দেয়। তাদের দাবির মুখে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১৫ই অক্টোবর ভাষ্কর্যটি সরিয়ে ফেলে।

এঘটনাকে আবহমান বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপর হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার শিল্পি, বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিক্ষক, ছাত্র, সংস্কৃতি কর্মী সমন্বয়ে ‘সচেতন শিল্পিসমাজ’ ব্যানারে আন্দোলন গড়ে ওঠে। তারা গোলচত্ত্বরে ভাষ্কর্যটি পুনঃস্থাপন ও ‘লালন চত্ত্বর’ নামকরণের দাবি করে এবং মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে জনগণের প্রতি প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানান। অন্যদিকে, ‘র্মূর্তি প্রতিরোধ কমিটির’ নেতৃত্বদানকারী খতমে নবুওত আন্দোলনের প্রধান মাওলানা নূর হোসেন নূরানী ‘মসজিদের শহর’ ঢাকার সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য বিমানবন্দর গোলচত্ত্বরে একটা হজ্জ মিনার নির্মাণ না-করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবার হুমকি দেন এবং ইসলামী ঐক্যজোটের একটি অংশের নেতা ফজলুল হক আমিনী ‘শিখা অনির্বাণ’ ও ‘শিখা চিরমত্মন’সহ ‘ভয়ঙ্করভাবে অ-ইসলামী’ সকল ভাষ্কর্য-স্মৃতিসৌধ গুড়িয়ে দেবে বলে শাসাতে থাকেন।

আমরা হয়তো এও জানি যে প্রগতিশীল ‘বাঙালি’ সংস্কৃতিওয়ালাদের দাবি উপেক্ষিত হয়েছে, সরিয়ে ফেলা ‘অচিন পাখি’ ভাষ্কর্যটি আর পুনঃস্থাপিত হয়নি। বরং, সেকুলারবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১০ সালে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন তার নাম হজরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। আর, হজ্জ মিনারও একটি নির্মিত হয়েছে পর্যটক, পথচারী ও হজ্জ যাত্রীদের দৃষ্টিনন্দনের জন্য। বিমানবন্দরে হজরত শাহজালাল ও হজ্জ মিনারের ইসলামী দৃশ্যরূপে আপ্যায়িত হয়ে আমরা চলে আসতে পারি মূল শহরে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে: আরবি হরফে শুভ্র উজ্জ্বল মেটালে লেখা ‘আল্লাহু’ দুপাশে নিয়ে বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান একটি আবক্ষ ভাষ্কর্য হয়ে ফোয়ারার জলে অবিরাম শিক্ত হয়ে চলেছেন।

ইতোমধ্যে আমরা বাংলাদেশ সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী পেয়েছি। ‘ধর্মীয়’ মৌলবাদ ও সন্ত্রাসমুক্ত ‘সেকুলার’ ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ কায়েমে অঙ্গীকারাবদ্ধ বর্তমান সরকার অন্যান্য ধর্মবিশ্বাসী বাংলাদেশীদের তোয়াক্কা না-করে সংবিধানের ডগায় ‘রাষ্ট্রধর্ম’ হিসেবে ‘ইসলাম’ ঝুলিয়ে রেখেছে- যা স্বৈরাচারী এরশাদের মনজয় কৌশলের নিকৃষ্ট এক নিশানা। একই কায়দায় প্রবল বাঙালি জাতীয়তাবাদের দাপুটেপনায় বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর জাত-পরিচয় অস্বীকার করে চতুর্দশ সংশোধনীতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সকল নাগরিক বাঙালি হিসেবে পরিচিত হবে!

যুদ্ধাপরাধ বিচারের সাম্প্রতিক ডামাডোলে নাস্তিক্যবাদ সমর্থন ও ইসলাম অবমাননার ঢালাও প্রচারণার আওয়ামী লীগ একটু কোনঠাসা হয়ে পড়েছে বটে; তবে উপর্যুক্ত ঘটনাগুলো বলে দেয় ক্ষমতা-ভোট রাজনীতির স্বার্থে তারা সেকুলার জাতীয়তাবাদী তরিকা ও ধর্মবাদী ইসলামপ্রীতি- দু’ই জলেই নৌকা বেয়ে চলে। তাদের ইসলামপ্রীতি ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের তুলনায় কোনো অংশেই কম নয়। যুদ্ধাপরাধ বিচারের তৎপরতাও এরকম ভোট-ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ক্যালকুলেশন। সেইমতোই আদালত রায় দিয়ে চলেছিল। গণজাগরণ মঞ্চের প্রণোদনা ও প্ররোচনা সেই ক্যালকুলেশনে তালগোল পাকিয়ে দিল। শাহবাগকে বাগে এনে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সঞ্চালিত করতে পারলেও ‘গণজাগরণ মঞ্চের’ কতিপয় ব্লগারের ইসলাম ধর্ম ও মহানবী হযরত মোহাম্মদকে (সঃ) নিয়ে অবমাননাকর লেখালেখি বিপাকে ফেলে দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একচ্ছত্র স্বত্ব দখলকারী দলটিকে। ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল ও মিডিয়া এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সফলভাবে জনগণের মনে শঙ্কা ও বিক্ষোভ জাগিয়ে তুলতে পেরেছে যে বর্তমান সরকার জালেম, নাস্তিক্যবাদী, ইসলামবিরোধী। আর, এই প্রচারণার তোড়ে ক্ষমতা-ভোটের বৈতরণী পাড়ের কড়ি নিশ্চিত করতে সরকার নাস্তিক্যবাদ প্রচারের অভিযোগে কয়েকজন ব্লগলেখককে গ্রেপ্তার করেছে; এমনকি শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন যে দেশ ‘মদিনা সনদ’ অনুযায়ী পরিচালিত হবে। (বিডিনিউজ২৪: ২০১৩)

সেহেতু, ‘ধর্মোন্মাদনা’ বা ‘সাম্প্রদায়িক’ মানসিকতা – যা ধর্মগত কারণেই প্রাচীন কাল থেকে মুসলমানদের স্বভাবের অংশ বলে ধরা হয়- ধারণা দিয়ে এসব ঘটনা ব্যাখ্যা করা যায় না। ‘সেকুলার’ রাষ্ট্র কায়েম থাকলে সব মুসকিল আসান হয়ে যেত- এমন ধারণাও ঠিক না। মনে রাখা দরকার সেকুলারিত্ব তার বিপরীত ‘ননসেকুলারিত্ব’র ওপর নির্ভরশীল ও সাপেক্ষ একটি পদ- পরস্পরকে প্রতিনিয়তই রসদ যোগায়, চাগিয়ে রাখে। ধর্মকে প্রাইভেট স্পেসে বন্দি রাখাও যায় না; রাজনীতি-সংস্কৃতি-অর্থনীতি-রাষ্ট্রকেন্দ্রিক চর্চাগুলোয় তা থাকবার প্রমাণও ইতিহাসে নাই। ‘ধর্মোন্মাদনা’ বা ‘সাম্প্রদায়িকতা’ ধারণা দুটি আধুনিক রাষ্ট্র ও শাসনচর্চার পরিসরেই বিকাশিত, চর্চিত ও লালিতপালিত। সেহেতু বর্তমান সময়ের রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক চর্চার পরিসর থেকেই এসব ঘটনা দেখতে হবে। কেবল ‘ধর্মোন্মত্ত’ ও ‘সাম্প্রদায়িক’ মানিসকতাসম্পন্ন কিছু মানুষ ও ধর্ম ব্যবহারকারী কিছু গোষ্ঠীর কাজ বলে দায় সারার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। এইরূপ দায়-ঠ্যালার চর্চা ভাবনার বস্ত্ত বটে। কারণ এর মাধ্যমে প্রথমত, ধর্ম-বিশ্বাসীরা ‘কিছু’ মানুষ ও গোষ্ঠীর ওপর দায় চাপিয়ে ধর্মের ‘নিষ্কলুষতা’ ও ‘রাজনীতিনিরপেক্ষতার’ পক্ষে সাফাই গাইতে থাকেন, যদিও ধর্ম চর্চা বা ধর্মীয় পরিচয় কোনোকালেই রাজনীতি ও ক্ষমতার ময়দানের বাইরে থাকেনি। দ্বিতীয়ত, (সহিংস ও অহিংস) ধর্মপন্থীরা সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধিময় তথাকথিত ধর্মরাষ্ট্র কায়েম করার রাজনীতি চালিয়ে যান, যা বিধর্মী ও অধর্মীদেরকে অপর করে। তৃতীয়ত, সেকুলারবাদীরা এরূপ আখ্যাদানের মাধ্যমে নিজেদের ধর্মকেন্দ্রিক চর্চার কাহিনী এবং একইসাথে অপরায়ন ও শত্রু নির্মাণের পদ্ধতি আড়াল করেন। ফলে, ধর্ম ও জাতিগত বিদ্ধেষপ্রসূত নির্যাতন-সংঘাত-বঞ্চনার অবসান ঘটে না। বলা দরকার, এই দুই প্রত্যয় ব্যবহারে আধুনিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চর্চা ধর্মমুক্ত হয় না, দায়মুক্তও হয় না- বরং, ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্যই আড়াল হয়ে যায়।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, বর্তমান সময়ের রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক চর্চার পরিসরে ধর্মপন্থা বনাম সেকুলারপন্থার লড়াই প্রবলভাবেই জাগ্রত। যদিও, স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে সেকুলার রাষ্ট্র কায়েম করে আমরা এর সুরাহা করতে পেরেছিলাম বলেই ধরে নিয়েছিলাম। কেবল আমরা নই, এখনও সকল দেশের ‘প্রগতিশীলরা’ মনে করেন যে জনপরিসরে রাষ্ট্রীক তৎপরতায় কাদের গলা শোনা যাবে বহুকাল আগেই তার সুরাহা হয়ে গেছে। কেবল সেকুলার চিন্তা ও চর্চাগুলোই সেখানে স্বর উঁচু করতে পারবে। ‘ধর্মের’ স্থান হতে হবে প্রাইভেট স্ফিয়ারে; ‘ভালো’ ‘নৈতিক’ ‘সু’ নাগরিক সৃষ্টিতে ধর্মকে উৎসাহিত করা চললেও, ‘পাবলিক স্ফিয়ারে’ তার কোনো ভূমিকা থাকা চলবে না। সেকুলার আধুনিকতা ও তার যুক্তিবাদই হতে হবে রাষ্ট্রপন্থা ও সমাজের গন্তব্য। কিন্তু এই সীমানা বরাবরই লঙ্ঘিত হয়েছে। ধর্ম কেবলমাত্র প্রাইভেট পরিসরের বিষয় নয়, সম্পূর্ণত অযৌক্তিক বিষয়ও নয়। আর, জনপরিসর (পাবলিক স্ফিয়ার) সর্বোতভাবে যৌক্তিক পরিবেশনার ক্ষেত্র কিংবা মতামত প্রকাশের মসৃণ বলপ্রয়োগহীন পরিসরও নয়।ফলত, ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে আজ ভুল বিশ্বাসের মাশুল গুনতে হচ্ছে। তারা তাই বহুত্ববাদী সমাজের পক্ষে ওকালতি করতে শুরু করেছে। রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মের প্রশ্ন সুরাহা করতে ব্যার্থ এদেশের শাসককূলকেও তা করতে হবে।

আমার বক্তব্য হলো: যে-কোনো বিশ্বাস চর্চার গণতান্ত্রিক সুযোগ এবং সেই বিশ্বাসীদের হেয় না করে সম্মান জানানোর মতো সহনশীলতার সংস্কৃতি সমাজে গড়ে তোলা আমাদের কর্তব্য। স্বীকৃত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম একটা বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক চর্চা। জগতের কোটি কোটি মানুষ সেই বিশ্বাস ও সংস্কৃতির চোখ দিয়ে জীবনকে সাজায় ও পরিচালনা করে। কিন্তু আধুনিক সমাজে ধর্মবিশ্বাসই মানুষের একচ্ছত্র অধিপতি নয়। এর বাইরেও অনেক রকমের বিশ্বাস আছে- যেমন প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা নানা রকমের লৌকিক সাধনা ধারা, আধুনিক কালের নানা রকমের সেকুলার নৈতিক বিশ্বাস, নাসিত্মক্যবাদে বিশ্বাস ইত্যাদি। মানুষ হিসেবে এই সকল প্রকার বিশ্বাসীদেরই অধিকার আছে, অন্যকে আহত না করে, নিজেদের বিশ্বাস চর্চা করে জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলার। আধুনিক সমাজ বহু মত, বিশ্বাস ও পন্থার। কোনো একটি বিশ্বাসকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেবার বলপ্রয়োগ-নীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিশোধ ও বলপ্রয়োগের নীতির অনুসারী হয়ে আজ আমরা এক সঙ্কটময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছি। কিন্তু আমাদের সমাজে এমন এক সাংস্কৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন যেখানে বদ্ধ-প্রতিক্রিয়াশীল ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাস আপনাআপনি কোনঠাসা হয়ে পড়ে। বতর্মান সময়ে জাত্যাভিমান-ঘৃণা-বিদ্বেষ-সংঘাত-পীড়ন-বঞ্চনা পুনরুৎপাদনকারী ধর্মপন্থী এবং/বা সেকুলারপন্থী রাজনীতির বাইরে এসে দাঁড়িয়ে নতুন রাজনৈতিক বক্তব্য হাজির করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। ধর্মীয়, বিধর্মীয়, অ-ধর্মীয়, ধর্মহীন, বাঙালি, চাকমা, মারমা, গারো, সাঁওতাল, রাখাইন ইত্যাদি বহুজাতের ‘পশ্চাদপদ’ ও আধুনিক সকল মানুষের জন্য কোনো ‘ধর্মীয়’ রাষ্ট্র নয়, কোনো ‘সেকুলার’ রাষ্ট্র নয়, কোনো ‘বাঙালি’ জাতীয় রাষ্ট্র নয়- আমাদের তৎপরতা চালিত হোক বহুসাংস্কৃতিক সহনশীল একটা সমাজ ও রাষ্ট্র কায়েমের রাস্তায়।

 

তথ্যসূত্র:

মিশেল ফুকো। ১৯৮০। দ্য হিস্ট্রি অব সেক্সুয়ালিটি, ভলিউম ১। নিউ ইয়র্ক: ভিনটেজ বুকস।

কার্ল মার্কস। এ কন্ট্রিবিউশন টু দ্যা ক্রিটিক অব হেগেল’স ফিলসফি অব রাইট। প্রথম প্রকাশ: প্যারিস ১৮৪৪। http://www.marxists.org/archive/marx/works/1843/critique-hpr/intro.htm

ডেইলি স্টার। ৩১ মার্চ ২০০৭। http://www.thedailystar.net/2007/03/31/d7033101011.htm

রনজিত গুহ। ১৯৮৩। ‘প্রজ অব কাউন্টার ইন্সার্জেন্সি’। সাবঅলটার্ন স্টাডিজ P,নতুন দিলস্নী।

হানা আরেন্থ। ১৯৭০। অন ভায়োলেন্স। হারকোর্ট, ব্রেস এন্ড ওয়াল্ড ইন্স., নিউ ইয়র্ক।

একাত্তর টিভি,http://www.youtube.com/watch?v=MVAeOshqvyE

শেখ হাসিনা, বিডিনিউজ২৪: http://bangla.bdnews24.com/politics/article613154.bdnews

জাঁ-লুক ন্যান্সি। ২০০৭। দ্য ক্রিয়েশন অব দ্য ওয়ার্ল্ড অর গেস্নাবালাইজেশন। স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক প্রেস।

ব্রুনো লাটুর। ১৯৯৩। উই হ্যাভ নেভার বিন মডার্ন। হার্ভাড ইউনিভার্সিটি প্রেস।

 

 

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
আ-আল মামুন

আ-আল মামুন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.