Main menu

বদ্রিয়ারে পড়া’র রিস্ক Featured

বদ্রিয়ারে পড়া একধরণের রিস্ক নেয়া। আপনি চাইলে নিতে পারেন, নাও নিতে পারেন। জ্য বদ্রিয়া, ফরাসি দার্শনিক, যার সিমুলেশন-সিমুলাক্রামের রেফারেন্স আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া আর অটোমেশনের যুগে হরদম টানা হয়, তার এই ইন্টারভিউগুলা “ফরগেট ফুকো”-নামের বইয়ে ১৯৭৭ সালে পাবলিশ করা হইছিল। অবশ্য তার আগে প্রায় নয় বছর আগে বদ্রিয়ার পিএইডি থিসিস “সিস্টেম অফ অবজেক্টস” পাবলিশ হয়, ১৯৬৮ সালে- সেইখানে তিনি অবজেক্টসের সিস্টেমের এনালাইসিস করছিলেন মডার্ন কনজুমার সোসাইটিরে সামনে রেখে। সিস্টেম, অবজেক্টস, মিডিয়া এইসব থেকে বদ্রিয়া গেছেন এরপরে আরও নানা জায়গায়, ইল্যুশনস, কনজুমারিজম, যুদ্ধসহ আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে।

বাংলা ভাষায় বদ্রিয়া পরিচিত না। পরিচিত না হওয়ার কারণে বদ্রিয়ারে ভুলভাবে ইন্টারপ্রেট করবার অনেক সুযোগ আছে। আর ইন্টারভিউ যেহেতু কনটেক্সট ধরে আসে না, এইখানে এই আশংকা আরও বেশি। এই কারণে, বদ্রিয়া পড়াটা একধরণের রিস্ক। আর বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় ফিলোসফি, দর্শনচর্চার হালহাকিকত খুব করুণ, শোচনীয়। সামাজিকভাবে অত্যাচারিত হইতে হইতে এখন প্রায় মৃতপ্রায়। বাংলায় ফিলোসফির এই মরণের পিছনে নানাবিধ কারণ আছে। প্রথমত, আমাদের দেশের যে কয়টা জ্ঞান-উৎপাদনকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাতে ফিলোসফি/দর্শন কখনোই মৌলিক পাঠ হিসাবে বেড়ে উঠতে পারে নাই। এর কারণ আছে। তবে উন্নতবিশ্বে ফিলোসফি যে খুব উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে তাও কিন্তু বলা যাবে না। ফিলোসফি পড়ে গ্র্যাজুয়েট হলে অটোমেশনের যুগে চাকরির কোন নিশ্চয়তা নাই কিন্তু। আবার গুটিকয়েক ফিলোসফার যাদেরকে আমরা বেশি করে চিনি, তারা যে একটা বড় সোসাইটিকে প্রতিনিধিত্ব করে তাও কিন্তু না। যে কারণে লেইড-ব্যাক বা আর্মচেয়ার ফিলোসফার নামক গালি চালু আছে, এবং পোস্টমডার্ন ফিলোসফারদের ক্ষেত্রে যা আরও বেশি করে শোনা যায়, ফিলোসফারদের কাজ কেবল একাডেমিক গেইম খেলা, নাথিং এলস। বিভিন্ন মিনিং, হাইপোথিসিস তৈরি করে এমন এক অ্যাবস্ট্র্যাকশনের দুনিয়ায় তারা হারায়ে যান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা রিয়ালিটিরেও ছাড়ায়ে যায়।

উন্নত বিশ্বে এই ধরণের সমালোচনা থাকলেও, ইউনিভার্সিটিগুলো কিন্তু সেই সমালোচনার ধার ধরে ফিলোসফিকে পাঠ্যতালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেয় নাই। কারণ, সেই এগারশ বারশ শতাব্দী থেকে চলে আসা যে জ্ঞানের সিলসিলা সেই পরিক্রমায় ইউনিভার্সিটিগুলো ঠিকই জানে, কোনও বিষয়ে স্পেশালিস্ট/একাডেমিক/এক্সপার্ট বাইর করতে হলে তার শুরুতেই জ্ঞানের একদম বেসিক ক্লিয়ার থাকতে হবে। এবং সেই বেসিক আদতে ফিলোসফিরই বেসিক পাঠ। তাই নানাবিধ সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও সোশ্যাল সায়েন্স, ইকোনমিক্স, সায়েন্স কোন জ্ঞানকান্ডেই আমরা থিওরি ছাড়া আলাপ হতে দেখি না। এবং এই থিওরির পিতা-মাতারা মূলত বিজ্ঞানী, দার্শনিকেরাই। তবে একাডেমিয়ার পিতা-মাতা দার্শনিক হলেও তাদের যে ক্রিটিসাইজ করা যাবে না, এমন কিন্তু নয়। একাডেমিয়ার পিতা-মাতার জ্ঞানেভাবে অনেক তত্ত্ব কপচাতে পারেন আবার একইসাথে রাজনৈতিকভাবে কোন মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন আবার রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হতে পারেন। মাঝেমধ্যে এই ঘুঁটি হওয়ার অভ্যাস বদ্রিয়ার ভাষায় চরমে পৌঁছে যায়- বাংলাদেশ তার সেরা একটি উদাহরণ। এইখানে রাজনৈতিকভাবে আমলাতন্ত্র এতটাই শক্তিশালী যে, সামাজিকভাবে স্বীকৃত মতাদর্শের বাইরে নতুন কিছু করা কঠিন। সেই অর্থে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশ আসলে একটি কনজার্ভেটিভ রাষ্ট্রব্যবস্থা। শক্তিশালী সমাজ, শক্তিশালী আমলার বাইরে গিয়ে ফিলোসফি বেশি টিকতে পারে নাই। তাই দর্শনচর্চা শেকড় হারাইছে। Continue reading

বাঙ্গালির উৎপত্তি – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (শর্ট ভার্সন) Featured

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই লেখাটা বঙ্গদর্শন পত্রিকার (পৌষ, ১২৮৭ থিকা জৈষ্ঠ্য ১২৮৮, বাংলা সন) ছয়টা সংখ্যায় ছাপা হইছিল। সময়ের হিসাবে, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ই হইতেছেন পয়লা লোক, যিনি বাংলা-ভাষায় বাঙ্গালি জাতির ইতিহাস নিয়া লেখছেন (বঙ্গে ব্রাাহ্মণাধিকার, ১৮৭২ সন)। উনার আগে, কলোনিয়াল পিরিয়ডের হিস্ট্রি-চর্চায় John Clark‘র হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল (১৯৩৫)-ই মেবি একমাত্র বই ছিল। ভূদেব মুখোপাধ্যায় হিস্ট্রিক্যালি বঙ্কিমের সিনিয়র হইলেও উনার লেখা দুইটা দেখা যাইতেছে বই হিসাবে ছাপা হইছিল অনেক পরেই [বাঙ্গালার ইতিহাস (১৯০৪) বা সামাজিক প্রবন্ধ (১৮৯২)]; তো, লেখার সময় পরে না হইলেও কাছাকাছি সময়ের ঘটনাই হওয়ার কথা। [অন্য কোন ঘটনার কথা আমাদের জানা নাই, কেউ জানাইলে এই স্টেটম্যান্ট তো রিভিউ করাই যায়।]

কিন্তু এইখানে এই দাবি মনেহয় করা যায় যে, “বাঙ্গালি মুসলমান” – এই টার্ম উনার আগে বাংলা-ভাষায় কেউ বলেন নাই, এবং একটা আইডেন্টিটি হিসাবে ক্যাটাগোরাইজ করেন নাই।

ব্যাপারটা এইরকম না যে, এই দাবি’টা আমরাই ফার্স্ট করতেছি। আমাদের ধারণা, এর আগে অনেকেই বইলা থাকতে পারেন। কিন্তু যেই জায়গা থিকা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখালেখি ও চিন্তা-ভাবনারে সিগনিফাই করা হয়, সেইখানে এই দাবি’টা তেমন কোন মিনিং তৈরি করতে পারে না। উনারে আইডেন্টিফাই করা হয় মুসলিম-বিদ্বেষী এবং ‘হিন্দু পুর্নজাগরণের’ লোক হিসাবে। যেইটা খুবই আন-ফরচুনেট ঘটনা-ই না, বরং খুবই ভুল একটা পারসপেক্টিভ।

যখন ‘সেক্যুলার’ হইতে গিয়া ধর্মের হিস্ট্রিক্যাল সিগনিফেকন্সরেই আমরা বাদ দিয়া দিতে চাইতেছি সেইখানে বঙ্কিমের দাবি হইতেছে ধর্ম ছাড়া তো কোন সমাজ হইতে পারে না, মানুশও হইতে পারে না! আরো মুশকিল হইতেছে, ইউরোপিয়ান অর্থে যেই ‘রিলিজিয়ন’রে আমরা ‘ধর্ম’ হিসাবে দেখি, ‘ধর্ম’ তো অই জিনিস না; এর মিনিং আরো ব্যাপক। এখন এই রেফারেন্সিয়াল ডিফরেন্সগুলারে আমলে না নিলে বঙ্কিমের রিডিং ভুল হইতে আসলে বাধ্য। ইউরোপিয়ান মিনিং যখন একমাত্র মিনিং আমাদের সময়ে, তখন বঙ্কিম হয়া উঠেন ভিলেন আমাদের কাছে! অথচ এই মিনিংয়ের জায়গাটাতেই ফাইট’টা উনি করতে চাইছেন। এই জায়গাটা থিকা দেখতে পারলে বেটার।

কিন্তু যেহেতু একটা ইউরোপিয়ান ন্যারেটিভের লগে ফাইট করতে হইতেছে, সেই ফ্রেমওয়ার্কটারেই নিছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; জাতি’র বিচার করছেন রেসিয়াল জায়গা থিকা – কে আর্য্য, কে অনার্য্য? যেইটার কোন ভ্যালিডিটি এখন আর নাই। কিন্তু কলোনিয়াল আমলে এইটা ছিল একটা সেন্ট্রাল কোশ্চেন। প্রশ্নটারে ডিল করতে গিয়া উনি যেই সিদ্ধান্তগুলা নিছেন, সেইগুলা খুবই অ্যামেজিং! যেমন, বাঙালি বহুজাতি এবং সবাই হিন্দু না; হিন্দুধর্মে জাতির ইনক্লুশন হয় এবং হয়া আসতেছে। যেইগুলা এখনকার সময়েও রেভ্যুলেশনারি চিন্তা।

ন্যাশনালিজমের মারা যাওয়ার এই টাইমে, ‘জাতি-প্রশ্ন’টারে রিভিউ করার এই সময়ে, আমরা মনে করি, বঙ্কিমের এই আলাপ এখনো রিলিভেন্ট এই অর্থে যে, ইতিহাস-বিচারে যেইভাবে প্রশ্নগুলারে উনি সামনে আনছেন এবং এর উত্তর দেয়ার চেষ্টা করছেন, সেইটা খেয়াল করার মতো একটা ঘটনা।

তবে পুরা আলাপে একটা জিনিস খেয়াল করার মতো, বৌদ্ধধর্মের নাম একবারও নেন নাই বঙ্কিম। একটা কারণ মেবি এইটা যে, বঙ্কিম যেহেতু ফোকাস করছেন ‘কি আছে’ – এই জায়গাটাতে, যার ফলে ‘যা আছে’, সেইটা ‘কিভাবে আছে’ সেইটাই যাচাইয়ের জায়গা ছিল উনার, যা নাই – সেই জায়গাটাতে উনি যান নাই । আর সেকেন্ড একটা ঘটনা মেবি, উনার একটা গ্রান্ড প্রজেক্ট ছিল একটা ইউরোপিয়ান রেফারেন্সের বিপরীতে একটা ইন্ডিয়ান রেফারেন্সের জায়গারে রিলিভেন্ট কইরা তোলা, সেইখানে অনেকগুলা ন্যারেটিভ থাকতে পারে – এইটা উনার কনসার্নের জায়গা ছিল না; বা অনেকগুলা ন্যারেটিভ মিইলা যে একটাই ‘ইন্ডিয়ান’ ন্যারেটিভ সেই পজিশন থিকা কথা বলতে চাইছেন।

আর পলিটিক্যাল জায়গা থিকা সেইটা যে একটা ‘হিন্দু ন্যারেটিভে’ পরিণত হইছে, সেইখানে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বলাবলির চাইতে তার টেক্সটের রিডিংয়ের কন্ট্রিবিউশনটাই গ্রেটার বইলা মনেহয়, আমাদের কাছে। তো, এই লেখাটারে উনার ইন্ডিয়ান-ন্যারেটিভের একটা রেফারেন্স হিসাবে পড়া যাইতে পারে।

২.
পুরা লেখাটা যে অ-দরকারি – তা না, বরং মোর রিডেবল একটা ভার্সন আমরা এইখানে রাখতে চাইছি। আর পুরা লেখাটা  অনলাইনে অনেকগুলা ওয়েবসাইটে পাইবেন। আমরা দুইটা লিংক রিকমেন্ড করতেছি:

১.  বাঙ্গালীর উৎপত্তি | বাঙ্গালীর উৎপত্তি | বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | এডুলিচার পাঠশালা (eduliture.com)

২. পাতা:বিবিধ-বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৯৫৯).pdf/৩১৮ – উইকিসংকলন একটি মুক্ত পাঠাগার (wikisource.org)

এডিটর, বাছবিচার

………

প্রথম পরিচ্ছেদ

অনেকে—বাঙ্গালীর উৎপত্তি কি?—এই প্রশ্ন শুনিয়া বিস্মিত হইতে পারেন। অনেকের ধারণা আছে যে, বাঙ্গালায় চিরকাল বাঙ্গালী আছে, তাহাদিগের উৎপত্তি আবার খুঁজিয়া কি হইবে? তাহাদিগের অপেক্ষা শিক্ষায় যাঁহারা একটু উন্নত, তাঁহারা বিবেচনা করেন, বাঙ্গালীর উৎপত্তি ত জানাই আছে; আমরা প্রাচীন হিন্দুগণ হইতে উৎপন্ন হইয়াছে।… বাঙ্গালীর উৎপত্তি খুঁজিয়া কি হইবে?

…লোকসংখ্যা গণনায় স্থির হইয়াছে যে, যাহাদিগকে বাঙ্গালী বলা যায়, যাহারা বাঙ্গালাদেশে বাস করে, বাঙ্গালাভাষায় কথা কয়, তাহাদিগের মধ্যে অর্দ্ধেক মুসলমান। ইহারা বাঙ্গালী বটে, কিন্তু ইহারাও কি সেই প্রাচীন বৈদিকধর্ম্মাবলম্বী জাতির সন্ততি? হাড়ি, কাওরা, ডোম ও মুচি; কৈবর্ত্ত, জেলে, কোঁচ, পলি, ইহারাও কি তাঁহাদিগের সন্ততি? তাহা যদি নিশ্চিত না হয়, তবে অনুসন্ধানের প্রয়োজন আছে। কেবল ব্রাহ্মণ কায়স্থে বাঙ্গালা পরিপূর্ণ নহে, ব্রাহ্মণ কায়স্থ বাঙ্গালীর অতি অল্পভাগ। বাঙ্গালীর মধ্যে যাহারা সংখ্যায় প্রবল, তাহাদিগেরই উৎপত্তিতত্ত্ব অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন।

যে প্রাচীন হিন্দুজাতি হইতে উৎপন্ন বলিয়া আমরা মনে মনে স্পর্দ্ধা করি, তাঁহারা বেদে আপনাদিগকে আর্য্য বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। এখন ত অনেক দিনের পর ইউরোপ হইতে ‘আর্য্য’ শব্দ আসিয়া আবার ব্যবহৃত হইতেছে। প্রাচীন হিন্দুরা আর্য্য ছিলেন; অথবা তাঁহাদিগের সন্তান। এজন্য আমরা আর্য্যবংশ। কিন্তু এই আর্য্য শব্দ আর বেদের আর্য্য শব্দ ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। বৈদিক ঋষিরা বলেন, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, এই তিনটি আর্য্যবর্ণ। এখনকার পাশ্চাত্ত্য পণ্ডিতেরা এবং তাঁহাদিগের অনুবর্ত্তী হইয়া ভারতীয় আধুনিকেরাও বলিয়া থাকেন, ইংরেজ, ফরাসী, জর্ম্মান্, রুষ, যবন, পারসিক, রোমক, হিন্দু, সকলই আর্য্য। আবার ভারতবর্ষের সকল অধিবাসী এ নামের অধিকারী হয় না; হিন্দুরা আর্য্য বলিয়া খ্যাত, কিন্তু কোল, ভীল, সাঁওতাল আর্য্য নহে। তবে আর্য্য শব্দের অর্থ কি?

এই প্রভেদের কারণ কি? কতকগুলি দেশীয় লোক আর্য্যবংশীয়, কতকগুলি অনার্য্যবংশীয়, এরূপ বিবেচনা করিবার কারণ কি? আর্য্য কাহারা,—কোথা হইতেই বা আসিল? অনার্য্য কাহারা, কোথা হইতেই বা আসিল? এক দেশে দুইপ্রকার মনুষ্যবংশ কেন? আর্য্যের দেশে অনার্য্য আসিয়া বাস করিয়াছে, না অনার্য্যের দেশে আর্য্য আসিয়া বাস করিয়াছে? বাঙ্গালার ইতিহাসের এই প্রথম কথা।

ইহার মীমাংসা জন্য ভাষাবিজ্ঞানের আশ্রয় গ্রহণ করিতে হয়।… Continue reading

স্লটারহাউজ-ফাইভ: বুক রিভিউ? আই গ্যেস… Featured

স্লটারহাউজ-ফাইভ, যদি তকমা দিতেই হয়, একটা যুদ্ধবিরোধী বই। কার্ট ভনেগাট নিজে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ড্রেসডেনে ছিলেন। ড্রেসডেন, যেই শহরে ইংল্যান্ড-আমেরিকা কর্তৃক তিনদিন ধরে ৩৯০০ টন বোমা ফেলা হয়। কার্ট ভনেগাট তখন একটা আন্ডারগ্রাউন্ড কসাইখানায় আশ্রয় নেন। বের হয়ে এসে দেখেন ১৭০০ একর জমি নাই হয়ে গেসে।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছু বছর পর ভাবলেন এই নিয়া তিনি একটা বই লিখবেন। কিন্তু কী লেখা যায়? কেমন শব্দ তার দেখা বীভৎসতার প্রতি সুবিচার করতে পারে? গেলেন এক পুরনো বন্ধুর কাছে, যে তার সাথে যুদ্ধে ছিল। যুদ্ধ নিয়া বই লিখবেন শুনে বন্ধুর বউ তার প্রতি পুরাপুরি শীতল আচরণ শুরু করলেন। কারণ তিনি জানেন এইসব লেখকেরা যুদ্ধের কথা কত রসায়ে রসায়ে লেখে, বীরত্ব আর দেশপ্রেমের মোড়কে। কিন্তু যুদ্ধ নিয়া বই লেখার কিছু নাই। যুদ্ধ হচ্ছে যেইখানে ছোট ছোট বাচ্চাদের পাঠানো হয় খুন হওয়ার জন্য। ভনেগাট সেই মহিলারে কথা দিয়াসছিলেন, তিনি যুদ্ধ নিয়া রোম্যান্টিক কোনো বই লিখবেন না। আর বইটার বিকল্প নাম রাখলেন, Children’s Crusade.
আরেক বন্ধুর সাথে আলাপ করায় তিনি বললেন, “যুদ্ধবিরোধী বই যারা লিখতে চায় তাদের আমি কী বলি জানো? তারচেয়ে বরং তোমরা তুষারস্রোতের বিরুদ্ধে একটা বই লেখো।” অর্থাৎ স্রোত কখনো থামবে না, যুদ্ধও না। কী লাভ?

তবু একটা বই লিখলেন ভনেগাট। বইয়ের প্রথম চ্যাপ্টারেই উপরের এইসব কথা লেখেন উনি। যেকোনো বইয়ের প্রথম লাইন গোটা বইয়ের পূর্বাভাস দিয়ে দেয়। এই বইয়ের প্রথম লাইন, “All of this happened, more or less. The war parts, anyway, are pretty much true.” প্রথম লাইনেই উনি ফিকশন আর রিয়ালিটির বর্ডারে এসে দাঁড়াইলেন। ফিকশন থেকে আমরা চাই একটা নিরাপদ দূরত্বে থেকে ক্যাথার্সিস গেইন করতে। কিন্তু এই বই উনি আমাদের নিখাদ ফিকশন হিসেবে এঞ্জয় করতে দিবেন না, আবার নিতান্ত তথ্যনির্ভকর ডকুমেন্টারিও না। এইটা তাইলে কী? সম্ভবত ভনেগাট নিজেও জানেনা।

উপন্যাস শুরু হয় দ্বিতীয় চ্যাপ্টারে: “Billy Pilgrim has come unstuck in time.” বিলি পিলগ্রিম সময়ের বাঁধন হতে খুলে গেসেন, এবং পুরা বইতে বিলি পিলগ্রিম এক সময়কাল হতে আরেক সময়কালে পড়ে যেতে থাকবেন। কখনো বারো বছর বয়সে বাবা-মায়ের সাথে প্রথমবার গ্র‍্যান্ড ক্যানিয়ন দেখতে যাওয়ার সময় হতে ড্রেসডেনে যুদ্ধবন্দী হিসেবে কসাইখানার পথে শুয়ারের মত জীবনে, কিংবা নিজের মৃত্যু হতে ট্রাল্ফামাডোরের চিড়িয়াখানায় বাস করার সময়।

ট্রাল্ফামাডোর হচ্ছে পৃথিবী হতে ৪৪৬,১২০,০০০,০০০,০০০,০০০ মাইল দূরের একটা গ্রহ। সেই গ্রহের অধিবাসীরা বিলি পিলগ্রিমকে তুলে নিয়ে যায় নিজেদের গ্রহে। “আমাকেই কেন?”, জিজ্ঞেস করলো বিলি পিলগ্রিম; “কেন কোনোকিছুই?”, উত্তর দিলো ট্রাল্ফামাডোরিয়ান। “কেন”র মত ফালতু প্রশ্ন নিয়া তারা ভাবে না। ট্রাল্ফামোডোদিয়ানরা চতুর্মাত্রিক প্রাণী, তারা সকল মুহূর্ত একসাথে ঘটতে দেখে। তারা একইসাথে দেখতে পায় আকাশের প্রতিটা নক্ষত্র কোথায় ছিল, কোথায় আছে এবং কোথায় যাচ্ছে। তাই রাত্রির আকাশ তাদের কাছে অনেকগুলা নক্ষত্রের বিশাল ন্যুডলসের মত দেখায়। আর তারা যেহেতু সকল সময় একইসাথে দেখতে পায়, তাই যাকিছু ঘটবে তার সবটাই তারা আগে থেকে জানে, এমনকি মহাবিশ্বের ধ্বংসও। কিন্তু তারা এইসব ঠেকাইতে কিছুই করে না। কারণ যা কিছু হওয়ার তা এমনিই ঘটে-ঘটসে-ঘটবে, চিরকাল, বারবার। তাইলে কি কারো স্বাধীন ইচ্ছা নাই? ট্রাল্ফামোডোরিয়ানরা জানায়, তারা মহাবিশ্বের ১১০টা গ্রহের প্রাণীদের সাথে যোগাযোগ করসে, একমাত্র পৃথিবীর একটা প্রজাতির মধ্যেই “স্বাধীন ইচ্ছা” নামক হাস্যকর জিনিসের ধারণা আছে। তাদেরও নিজস্ব সাহিত্য আছে। Continue reading

সেন্সরশিপ আর সাইলেন্স – উমবের্তো একো

[ইতালিয়ান ভাষায় লেখাটা ছাপা হইছিল ২০১১ সালে। ইংলিশে ট্রান্সলেট হইছিল ২০১২ সালে। ইতালিয়ান থিকা ইংলিশে ট্রান্সলেট করছেন Richard Dixon.]

আজকে আপনার যারা বয়সে ইয়াং, ভাবতে পারেন যে, veline হইতেছে সুন্দরী মেয়ে যারা টেলিভশন শো’গুলাতে নাচে, আর যে casino হইতেছে একটা হাউকাউের জায়গা।* আমার জেনারেশনের যে কেউই জানে যে, ক্যাসিনো শব্দ দিয়া বুঝাইতো ‘মাগিপাড়া’ আর এর পরেই, কনোটেশন দিয়া, এইটার মানে আইসা দাঁড়াইছে ‘কেওটিক কোন জায়গা’, এখন যেহেতু এইটা তার আদি মানে হারায়া ফেলছে, আর আজকে যে কেউ, ইভেন একজ বিশপও, বিশৃঙ্খলা বুঝাইতে এইটা ইউজ করেন। একইরকমভাবে, bordello ছিল একটা বেশ্যাপাড়া, কিন্তু আমার গ্রান্ডমা, যিনি খুবই কঠিন মোরালিটি মহিলা ছিলেন, প্রায়ই বলতেন যে, ‘একটা bordello বানাইও না’; মানে হইতেছে, বেশি হৈ চৈ করবা না’; এই শব্দটা তার অরিজিনাল মিনিং পুরাপুরি হারায়া ফেলছে। আপনাদের মধ্যে যারা ইয়াং এইটা নাও জানতে পারেন যে, ফ্যাসিস্ট আমলে, veline ছিল হইতেছে কয়েকটা কাগজের শিট যেইটা দিয়া গর্ভমেন্টের যেই ডিপার্টমেন্ট (বলা হইতো মিনিস্ট্রি অফ পপুলার কালচার, শর্ট ফর্মে মিনিকালপপ – এইরকমের একটা রহস্যময় আওয়াজের নাম এভয়েড করার মতো হিউমার অদের ছিল না) কালচার কন্ট্রোল করতো, নিউজপেপারে পাঠাইতো। অই পাতলা কাগজের শিটগুলাতে লেখা থাকতো নিউজপেপারগুলার কোন কোন জিনিস নিয়া চুপ কইরা থাকতে হবে আর কোন কোন জিনিস অরা ছাপাইতে পারবে। এইভাবে, velina’টা, জার্নালিস্টিক জার্গনে, আসছে সেন্সরশিপ’রে সিম্বল হিসাবে দেখাইতে, কি গোপন করতে হবে, কোন ইনফরমেশন গায়েব কইরা দিতে হবে, সেইটা বুঝাইতে।

আজকে আমরা যেইটারে veline হিসাবে জানি – টেলিভিশনের শো-গার্লরা – হইতেছে, হাউএভার, পুরা অপজিট: অরা হইতেছে, যেইরকম আমরা জানি, বাহ্যিক দেখনদারির, ভিজিবিলিটির সেলিব্রেশন, আসলে খাঁটি ভিজিবিলিটির ভিতর দিয়া ফেইম এচিভ করার জিনিস, যেইখানে এপিয়েরেন্সটাই এক্সিলেন্সটারে ফুটায়া তোলে – এমনকি এইরকমের এপিয়েরেন্সরে একটা সময়ে কুরুচির ব্যাপার বইলাই ভাবা হইতো।

আমরা দুই ধরণের velina এইখানে পাইতেছি, যেইটারে আমি দুই ধরণের সেন্সরশিপের ফর্মের লগে তুলনা করতে চাই। পয়লা সেন্সরশিপ’টা হইতেছে সাইলেন্সের ভিতর দিয়া, সেকেন্ড সেন্সরশিপ হইতেছে হাউকাউয়ের ভিতর দিয়া; আমি এই কারণে velina শব্দটারে ইউজ করতেছি টেলিভিশনের ঘটনাটার একটা সিম্বল হিসাবে, শো’টা, এন্টারটেইনমেন্ট, নিউজ কাভারেজ, আর এইরকম কিছু দিয়া।

ফ্যাসিজম এইটা বুঝছে (যেইরকম ডিক্টেটর’রা জেনারেলি করে) যে, মিডিয়া যত কাভারেজ দেয় পথভ্রষ্ট ব্যবহার তত বাড়ে। যেমন ধরেন, velina কইলো, “সুইসাইড নিয়া লেখবা না’ কারণ সুইসাইড নিয়া কোন কথা কইলেই কয়দিন পরে এইটা দেইখা কারো সুইসাইড করার কথা মনে হইতে পারে। এইটা পুরাপুরি ঠিক – আমাদের এইটা ধইরা নেয়া ঠিক হবে না যে, ফ্যাসিস্ট হায়ার্কির মনে যা আসে তার সবকিছুই ভুল – আর এইটা খুবই সত্যি যে যেইসব ঘটনারে আমরা ন্যাশনাল সিগনিফিকেন্স ভাবি ঘটছে খালি মিডিয়াতে এইগুলা নিয়া কথা-বার্তা হইছে বইলা। যেমন ধরেন, ১৮৭৭ আর ১৯৮৯ সালের স্টুডেন্ট প্রটেস্ট; অইগুলা ছিল অল্প-সময়ের ঘটনা যেইগুলারে ভাবা হইছিল ১৯৬৮’র প্রটেস্টের আবার ঘটা, কারণ নিউজপেপারগুলা বলা শুরু করছিল ‘১৯৬৮ ফিরা আসতেছে।’ অইসব ঘটনাগুলাতে যারা জড়িত ছিল তারা ভালো কইরাই জানেন প্রেস অই ঘটনাগুলারে তৈরি করছিল, একইরকমভাবে প্রেস জেনারেট করে রিভেঞ্জ এটাকস, সুইসাইড, ক্লাসরুম শুটিং – একটা স্কুলে শুটিংয়ের নিউজ আরেকটা স্কুলের শুটিং’রে প্রভোক করে, আর অনেক রোমানিয়ানরা বুড়া মহিলাদেরকে রেইপ করার ব্যাপারে এনকারেজড হয় কারণ নিউজপেপারগুলা অদেরকে বলে যে, এইটা ইমিগ্রেন্টদের স্পেশালিটি আর এইটা করাটা সহজ: আপনারে যেইটা করা লাগবে কোন হাঁটা-চলার পথের ধারে, কোন রেলস্টেশনের কাছে বা এইরকম কোন জায়গা খালি একটু ঘুর ঘুর করা লাগবে।

পুরান-স্টাইলের velina বলবে যে, ‘যেইসব জিনিস বাজে হইতে পারে, সেইসব জিনিস এভেয়ড করার লাইগা, অইগুলা নিয়া কথা বলবা না’, আজকের দিনের velina কালচার বলবে যে, ‘বাজে জিনিসগুলা নিয়া কথা বলা এভেয় করার লাইগা অনেক বেশি অন্য জিনিস নিয়া কথা বলবা।’ আমি সবসময় এই ভিউ’টা নিছি যে, যদি কোন চান্স থাকে, আমি টের পাই যে আমার কোন আকামের কথা নিউজপেপার জাইনা গেছে আর আগামীকালকে ছাপা হইতে পারে, যেইটা নিয়া কঠিন বিপদে পড়তে পারি আমি তাইলে ফার্স্ট কাজ আমি যেইটা করবো, লোকাল পুলিশ হেডকোয়ার্টার বা রেলওয়ে স্টেশনের সামনে গিয়া একটা বোমা পুঁইতা আসবো। তাইলে পরের দিনের নিউজপেপারের ফন্টপেইজ ভরা থাকবে অইটা দিয়া আর আমার পারসোনাল আকাম’টা ভিতরের একটা ছোট স্টোরি হয়া থাকবে। আর কে জানে কতগুলা সত্যিকারের বোমা পুঁইতা রাখা হয় অন্য ফ্রন্ট-পেইজ স্টোরিগুলারে মুইছা দেয়ার জন্য। এই বোমাটার উদাহারণটা আওয়াজের দিক দিয়াও ঠিকঠাক, যেহেতু এইটা এমন একটা বিশাল নয়েজের উদাহারণ যা অন্য সবকিছুরে চুপ করায়া ফেলে। Continue reading

বই: “সবারে নমি আমি” কানন (বালা) দেবী (সিলেক্টেড অংশ) – ২

কানন (বালা) দেবী (১৯১৬ – ১৯৯২) হইতেছেন ইন্ডিয়ান ফিল্মের শুরু’র দিকের নায়িকা, কলকাতার। ১৯২৬ থিকা ১৯৪৯ পর্যন্ত মোটামুটি এক্টিভ ছিলেন, সিনেমায়। তখনকার ইন্ডিয়ার ফিল্ম-স্টুডিওগুলা কলকাতা-বেইজড ছিল। গায়িকা হিসাবেও উনার সুনাম ছিল অনেক। ১৯৭৩ সনে (বাংলা সন ১৩৮০) উনার অটোবায়োগ্রাফি “সবারে নমি আমি” ছাপা হয়। সন্ধ্যা সেন উনার বয়ানে এই বইটা লেখেন। অই বইটা থিকা কিছু অংশ ছাপাইতেছি আমরা এইখানে।

………

ফার্স্ট পার্ট

………

মালিক ভগবান

এও এক অভিজ্ঞতা। দুপুর থেকে স্টুডিওতে গিয়ে বসে আছি ত আছিই। কেউ কথাও বলে না, বার্তাও না। আর সকলের সে কি গর্বিত চালচলন। যেন মাটিতে পা ই পড়ে না। সবসময় যেন গোঁফে তা দেওয়া ভাব। বেয়ারা থেকে শুরু করে হোমরাচোমরা অবধি সকলের। আমরা কি যে সে লোক? এন-টি ব্যানারে কাজ করি। এই ভাবেই ডগমগ। দিন গড়িয়ে বিকেল এল। বিকেলের পর সন্ধ্যা। হঠাৎ যেন ‘সাজ সাজ’ রব উঠল। “কি ব্যাপার?” “না, সাহেব আসছেন।’ ‘সাহেব’?—অবাক হয়ে তাকাতেই এক বেয়ারা আমার অজ্ঞতা দেখে কৃপা পরবশ হয়ে এগিয়ে এসে চুপিচুপি বলল, ‘সাহেব হলেন বি এন সরকার—নিউ থিয়েটার্সের ভগবান, এটা জেনে রাখুন। বলেই শশব্যস্তে কোমরের বেল্ট, মাথার ক্যাপ ঠিক করে মুখে বৈষ্ণবী বিনয়ের গদগদভাব ফুটিয়ে সাহেবের গাড়ির দিকে ছুটল। অন্যান্য সবাইও সাহেবের সম্মুখীন হবার আগে ঠিক ফার্নিচার ঝাড়ার মতই নিজেদের যথাসম্ভব ঝাড়পৌঁছ করে নিলেন। স্যুট পরিহিতরা টাই-এর নটটা একটু টাইট করে রুমাল দিয়ে মুখটা মুছে নিলেন। কেউ বা সার্টের কলারটা একটু সোজা করে নিলেন। আবার ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিতরা হাতের ভাজ টান টান করে কেঁাচাটা ধরে ঠিক খেলার মাঠে দৌড়োনোর প্রতিযোগিতায় নামার মত বেগে ধাবিত হলেন বি এন সরকারের গাড়ির দিকে। তারপর প্রতিযোগিতা হোলো কে সবচেয়ে আগে স্যারের চোখে পড়তে পারেন এবং কার অভিবাদনে আনুগত্যর প্রকাশ স্যারের কতটা বেশী প্রসন্ন দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে? সারাদিন বসে থাকার বিরুক্তি ও ক্লান্তির বাধা ঠেলেও মনটা যেন মুহূর্তের জন্য কৌতুকে নেচে উঠল। নিজের অজ্ঞাতে কখন উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে এগোতে শুরু করেছি বুঝতেই পারিনি। হঠাৎই এই জায়গায় দাঁড়িয়ে ঠিক তামাশা শুরু করেছি বুন্টুতেই পারিনি। হঠাৎই এই জায়গায় দাঁড়িয়ে ঠিক তামাশা দেখা মতই উপভোগ করলাম অবস্থা বিশেষে বয়স্ক মানুষও কেমন ছেলেমানুষের মত হয়ে যায়। এন-টির পদস্থ ব্যক্তিরা পরস্পরকে ধাক্কা দিয়ে প্রায় পাঁচজনে মিলে স্যারের গাড়ির দরজা খুললেন। স্যার গাড়ি থেকে মাটিতে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে দু-পাশের অনুগতের দল তার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করেন। তার আগে অবশ্য দুহাত জোড় করে প্রায় মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে নমস্কার করা হয়ে গেছে। আমি তারই প্রোডাকশনের একজন শিল্পী, সেইদিনই প্রথম কাজে যোগ দিয়েছি, সারাদিন বসে আছি। অথচ আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় করানোরও একটা প্রয়োজন আছে একথা কারো চিন্তাতেও স্থান পেয়েছে বলে মনে হোলো না। যে যার নিজের ভাবনাতেই বিভোর। আমার মত সামান্য মানুষের দিকে তাকাবার তাঁদের সময় কই? আমি ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ হয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়েই বুঝতে পারলাম তাঁর সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য দাঁড়িয়ে থাকাটা বিড়ম্বনা ছাড়া আর কিছুই নয়। গরজ করে একাজ সম্পন্ন করার মত কোনো মধ্যস্থা ব্যক্তি এতবড় প্রতিষ্ঠানেও নেই, এ অভিজ্ঞতা যেমন বিস্ময়ের তেমনই বেদনার। যাই হোক, দূর থেকে দুহাত জোড় করে তাঁকে নমস্কার জানিয়ে অন্য ঘরে চলে এলাম। সে নমস্কার সহস্র ভক্তের ভীড়ের আড়াল অতিক্রম করে স্যার বি এন সরকারের চোখে পড়েছিলো কিনা জানি না। কিন্তু তাঁরই প্রতিষ্ঠানের শিল্পী হয়ে যখন সেইদিনই প্রথম প্রবেশ করলাম এ কর্তব্য না করলে সে অ-সৌজন্য নিজেকেই পীড়া দিত। যাই হোক, আরো ঘণ্টা দুয়েক বসে মিঃ পি এন রায়কে ‘আমি এখন যেতে পারি?”—বলতেই খুব অবাক হয়ে তিনি বললেন, ‘সে কি! আপনি এখনও বসে?’- মনটা খুবই দমে গেল।

এই প্রসঙ্গে একটা কথা জানানো দরকার। আমার নিউ থিয়েটার্সে যোগ দেবার প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা বর্ণনার কাহিনীর মধ্যে যেন স্যার বি এন সরকারের প্রতি বিন্দুমাত্র কটাক্ষ বা শ্লেষ আছে ভেবে নিয়ে আমার প্রতি অবিচার না করেন। কারণ এখানে আমার আলোচ্য তাঁর পরিপার্শ্বিক, তিনি নন।

কাজী নজরুল ইসলাম

কাজী সাহেবের উল্লেখ না করলে ‘বিদ্যাপতি’র অধ্যায় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আগেই বলেছি ‘বিদ্যাপতি’ চিত্রে অনুরাধা চরিত্র-যোজনা কাজী সাহেবেরই পরিকল্পনা।

বোধহয় ‘বিদ্যাপতিতে কাজ করারও অনেক আগে মেগাফোনের রিহাস্যাল রুমে জে এন ঘোষ আমার সঙ্গে নজরুলের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। এর আগে তাঁর খ্যাতির সঙ্গে পরিচয় ছিল। কিন্তু মানুষটির সঙ্গে পরিচয় সেইদিনই। প্রথমটায় তাকাতেই ভয় করছিলো। উনি কত বড় কবি, আর আমি সামান্য একটি মেয়ে। কিন্তু ভয়ের যে সত্যিকার কোনো কারণ ছিলো না, সে-কথা বুঝতে পারলাম কয়েক মুহূর্তেই। চেয়ে দেখি পাঞ্জাবি পরা বাবরী-চুল এক ভদ্রলোক আস্তে আস্তে হার্মোনিয়াম বাজাতে বাজাতে গুন-গুন করে সুর ভাঁজছেন চোখদুটি বুজে। মাঝে মাঝে চোখ খুলে এদিক-ওদিক অন্যমনস্কভাবে তাকাচ্ছেন, কিন্তু মনটা যে অন্য জগতে, চাউনি দেখেই সেটা বোঝা যাচ্ছিল। এক সময় হার্মোনিয়ম থামিয়ে আমাদের দিকে যখন তাকালেন, বিরাট দুটি চোখের উজ্জ্বলতা যেন তার অন্তরটি মেলে ধরল। আমায় সঙ্কুচিত দেখে পরিবেশ সহজ করে তোলবার জন্যই বোধহয় উচ্ছ্বসিত হয়ে আমার গান গলা ও চেহারার প্রশংসা শুরু করে হাসির হুল্লোড়ে সারা ঘর মাতিয়ে দিলেন। অপরিচয়ের কুণ্ঠা মুহূর্তেই যেন উড়ে গেল। তারপর জে এন ঘোষের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার ত খিদে পেয়েইছে— মুখ দেখে মনে হচ্ছে কাননেরও খিদে পেয়েছে। দাদা, এ-বিষয়ে একটু তৎপর হন।’ কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই আবার সেই হাসি। জে এন ঘোষ ব্যস্তসমস্তভাবে উঠে গিয়ে মস্তবড় থালাভর্তি খাবার, মিষ্টি, আর একটা বড় প্লেটে পান জর্দার স্তূপ এনে হাজির করতেই ‘খাও’ বলে আমার হাতে গোটা দশ-বারো তুলে দিয়ে নিমেষের মধ্যে সব খাবার নিঃশেষ করে শুধু থালাটিই বাকী রাখলেন। আনন্দময় মানুষটি হৈ-চৈ করে যেমন বিস্ময়কর পরিমাণ খেতে পারতেন ঠিক তেমনই বিস্ময়করভাবেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা নাওয়া-খাওয়া ভুলে শুধুমাত্র গান রচনা নিয়েই মেতে থাকতে পারতেন। আর সে কি আশ্চর্যভাবে মেতে থাকা! কখনও যদি কোনো সুর মনে এল সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে কথা বসানো, আবার কখনও বা কথার তাগিদে সুর। রাগরাগিণীর সম্বন্ধে প্রগাঢ় জ্ঞান হয়ত আমার ছিল না, কিন্তু লক্ষ্য না করে উপায় ছিলো না, কি ব্যাকুল আবেগে তিনি কথার ভাবের সঙ্গে মেলাবার জন্য হার্মোনিয়ম তোলপাড় করে সুর খুঁজে বেড়াতেন। এ যেন ঠিক রাগের মর্ম থেকে কথার উপযুক্ত দোসর অন্বেষণ। Continue reading

[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য