Main menu

ফিল্ম হইলো সত্যের জন্য সেকেন্ডে চব্বিশবার মিথ্যা বলা – মিশাইল হানেকে

মিখাইল হানেকে জন্মাইছিলেন ১৯৪২ সালে, জার্মান বাপ আর অস্ট্রিয়ান মায়ের ঘরে। ভিয়েনায় সাইকোলজি, ফিলসফি আর ড্রামা নিয়া পড়তে যাওয়ার আগে উনি তার কৈশোর কাটাইছিলেন উইনার নয়স্টাটে, তার খালা আর নানীর কাছে। এর কয়েকবছর পরেই হানেকে নিজের ফার্স্ট ফিচার ফিল্ম বানাইছিলেন। ডের সিয়েবেনতে কন্টিনেন্টের কাহিনী (দ্যা সেভেনথ কন্টিনেন্ট) একটা জুয়ান আর সচ্ছল ফ্যামিলির অস্ট্রেলিয়াতে ইমিগ্রেশন করার স্বপ্ন নিয়া। এটা বুঝায়ই যায় শেষপর্যন্ত এই স্বপ্ন যে পূরণ হয় না (হানেকের কাজের লগে পরিচিতমাত্রই বুঝবেন)। ওরা ওদের টাকাগুলা টয়লেটে ফ্লাশ কইরা দেয়, গোল্ডফিশগুলারে মাইরা ফেলে, শেষে নিজেরাও মইরা যায়।

এরপর থেকেই হানেকে উনার ফিল্মে টপিক চয়েজ আর সিনেমার দুর্দান্ত ভাষা নির্মান, দুইদিক দিয়াই সমানতালে মুন্সিয়ানা দেখায়া যাইতেছেন ৷ এইটা উনার জন্য সমালোচনা আর হাততালি দুইটাই আইনা দিছে। কারো কাছে উনি ভয়-ডরের মন্ত্রী, কারো কাছে হররের মাস্টার, ইউরোপের সেরা আর্টিস্ট বা কারো কাছে স্রেফ একজন স্যাডিস্ট। হানেকের ফিল্মগুলারে যদিও ভায়োলেন্ট কওয়া হয়, কিন্তু উনার ফিল্মের বেশিরভাগ ভায়োলেন্সই হয় অফস্ক্রিনে। হানেকের ক্যামেরা উইন্ডশিল্ডে থ্যাতলানো মগজের মতো ক্লিশে বা হলিউডের টর্চার পর্নরে ফলো করে না ৷ এগুলা বরং হালকা চালের, ডেইলি লাইফের নানা জিনিসের মধ্যে যে নিষ্ঠুরতা থাকে সেগুলা নিয়াই, যেগুলার প্রতি দর্শকরা এখনো নাম্ব না। এরমধ্যে আছে ছোটখাটো বুলিং, কারো কথা কেউ না শুনা, ক্লাস আর প্রিভিলিজের ডিল্যুসনগুলা।

হানেকের প্রথমদিকের মুভিগুলা, যেমন বেন্নি’স ভিডিও (১৯৯২) আর ৭১ ফ্যাগমান্তে আইনার ক্রনোলগি ডেস জুফালস (৭১ ফ্র‍্যাগমেন্টস অফ আ ক্রনোলজি অফ চান্স) (১৯৯৪) –  ইন্টারন্যাশনাল দর্শকদের কাছে তেমনভাবে পৌছায়ই নাই। এরপর ২০০১ সালে হানেকে যখন এলফ্রিডে জেলিনেকের নোভেলের এডাপ্টেশন লা পিয়ানিস্তে বা ‘দ্যা পিয়ানো টিচার’ বানায়, সেটা  কানে গ্র‍্যান্ড প্রিক্স জিইতা নেয়। এটাই হানেকেরে তাবৎ দুনিয়ার কাছে পরিচয় করায়ে দেয়। এরপরের বছরগুলাতে ক্যাসে (২০০৫), আর ফানি গেমসের (২০০৭) আমেরিকান রিমেক বাইর হয়। ফানি গেইমস হানেকের সবচেয় বেশি সিনিকাল কাজ, যেটার আগের অস্ট্রিয়ান ভার্সনটা বাইর হইছিল ১৯৯৭ সালে। ডাস উইবে ব্যান্ড (দ্যা হোয়াইট রিবন) (২০০৯) আর আমর (২০১২) – এই দুইটার জন্য হানেকে কানে পাম ডি’অর পাইছিলেন। আমর পরে সেরা বিদেশি সিনেমার জন্য একাডেমি এওয়ার্ডও জিতে। সিনেমা বানানোর পাশাপাশি হানেকে অপেরায় ডিরেকশন দেন আর ফিল্মেকাডেমি উইনে মাস্টরি করান।

………………………

ইন্টারভিউয়ার: আপনি যখন জুয়ান ছিলেন, মানে টিনএজার- কখনো ভাবছিলেন একদিন বড় হয়া ফিল্মমেকার হইবেন? নাকি আপনের ফোকাস অন্যান্য আর্টের দিকে ছিল?

হানেকে: বেশিরভাগ মানুষের মতোই টিনএজের জ্বালাযন্ত্রণার মধ্যে থাইকা, আমি কবিতা লেখতে শুরু করছিলাম। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমার এক্টর হিসেব ট্রেইনিং নেওয়ার জন্য  স্কুল থেকে ড্রপ আউট হওয়ার ধান্দা ছিল। আমি আসলে এক্টিং করে এমন মানুষে ভর্তি একটা ফ্যামিলি থেকে আসছি, আমার আম্মা অভিনয় করতেন, আমার আব্বাও এক্টর আর ডিরেক্টর ছিলেন। একদিন তো আমি স্কুল পালায়া মাক্স রাইনহার্ড সেমিনারে অডিশন দেওয়ার জন্য ভিয়েনার উইনার নয়স্টাটে যাওয়ার ডিসিশন নিছিলাম। ওইখানে সবাই আমার আম্মারে চিনতো, আমার নিজেরে খুবই লাকি মনে হইত। কিন্তু ওরা সেইসময় আমারে অভিনয়ে নেয় নাই, খুবই প্যারা খায়া গেছিলাম আমি। শেষপর্যন্ত হাইস্কুলের ডিপ্লোমা নিতে হইছিল আমারে। তো এইসময় স্টুডেন্ট হিসেবে আমি লেখালেখি নিয়া বেশি সিরিয়াস হইয়া উঠছিলাম। আমি রেডিও আর কয়েকটা ম্যাগাজিনে ক্রিটিক হিসাবেও কাজ নিছিলাম। সেইসময় আমি সাহিত্য আর ফিল্মের রিভিউ লেখার কাজগুলা করতাম, যদিও এগুলা নিয়া আমি নিজেই খুব বেশি জানতাম না।

এই একই সময়েই, আমি ছোটগল্প লেখা শুরু করছিলাম। যেইসময় আমার ছেলে হইলো, আমার আব্বা-আম্মা সিদ্ধান্ত নিছিল আমার থেকে আলাদা হয়া যাবে, তো আমার জন্য ইনকাম করা জরুরী হয়া গেছিল। আমি কোন প্রকাশনীতে চাকরি খুজতেছিলাম, কিন্তু শেষে  এক নামকরা পাব্লিকেশন  হাউজে নিজের কয়েকটা গল্প পাঠায়ে দিছিলাম। ওরা সাথে সাথেই আমারে আরো গল্প দিতে বলছিল। কিন্তু আমি তো আসলে চাইছিলাম এডিটরের চাকরি। কিন্তু ওইখানে কোন চাকরি ছিল না। ওইসময়ে আমি খুবই আপসেট ছিলাম, কিন্তু সিম্পলি আমার লেখালেখিও চালায়ে যাইতেছিলাম।

…………….

 

ইন্টারভিউয়ার: …ছেচল্লিশ বছর বয়সে আপনার ফার্স্ট ফিচার ফিল্ম যখন বাইর হয়, এই লেখালেখির ব্যাপারটা ছিল তারও অনেক আগে। আপনে কেমনে এই লেখালেখির জিনিসগুলা শিখছিলেন?

হানেকে: আমি যখন জুয়ান ছিলাম, প্রতি সপ্তাহে তিনবার সিনেমা দেখতে যাইতাম। আমি এখনকার তুলনায় তখন ভালোই সিনেমাপাগল ছিলাম। সিনেমা নিয়া আমি যা যা জানি সবই সেইসময়গুলাতে কেয়ারফুল্লি দেইখা দেইখা শিখছি। আমি প্রায়ই আমার স্টুডেন্টদেরকে বলি যে তারা কত সুবিধা পাইতেছে। এখন তো আপনি একটা ডিভিডি কিনে প্রত্যেকটা শট আলাদা কইরা দেখতে পারবেন। আমাদের জুয়ানকালে তো এগুলা সম্ভব ছিল না। যদি এমন কিছু হয় – ধরেন আপনে সিনেমার কিছু একটা ধরতে পারলেন না, বা কোন সিকোয়েন্স ক্লিয়ার হইলো না, আপনেরে হয়তো দশবার আবার সিনেমাটায় ফিইরা যাইতে হবে। এখনকার দিনে তো আপনে ঘরের মধ্যে আরামে বইসা সবকিছু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে পারেন। যাই হোক, আমি যখন জুয়ান ছিলাম, সত্যিকারের সিনেমাখোর ছিলাম একটা। 

পাব্লিকেশন হাউজটা আমারে রিজেক্ট করার পর আমি ব্যাডেন-ব্যাডেনের (Baden-Baden) একটা টিভি স্টেশনে ইন্টার্নি করছিলাম। ওরা নতুন একজন নাটকের ডিরেক্টর  খুজতেছিল, আর শেষপর্যন্ত আমারেই ওই কাজ দিছিল, কারণ আমার আগে এখানে খালি বেক্কলরাই কাজ করছে। আমি হইয়া গেলাম জার্মানির সবচেয়ে কমবয়সী টিভি নাট্যকার, আর সাথে সাথে ফিল্মের উপর আরো আমার বেশি প্রফেশনাল ইন্টারেস্ট জন্মাইতে থাকলো। ওই তিনবছরের সময়টাতে আমার স্ক্রিপ্টরাইটিং নিয়া যা যা শিখার ছিল সব শিখা হইয়া গেছিল। আর সবকিছুর মধ্যে আমার যেটা বেশি কাজে লাগছিল সেটা হইলো বিরক্তিকর স্ক্রিপ্টগুলা পড়া। ওই তিনছরের মধ্যে দুইবছরই আমার জন্য প্রতিদিন ওইসব স্ক্রিপ্টগুলা (যেগুলারে বলা যায় অদরকারী ম্যানুস্ক্রিপ্ট) ওয়েট করতো । খারাপগুলাই ছিল বেশি উপকারী। ধরেন প্রথমে আপনে ভাবলেন এই লেখায় কিছু একটা কাজ করতাছে না। আপনে নিজেরে জিগাবেন, কেন কাজ করতেছে না। টেরিবল স্ক্রিপ্ট পড়া আপনারে অনেককিছু শিখাইতে পারে। আর ভালো একটা দুইটা এতোই আনন্দ দিত যে আপনে ওইটা খুজতে ভুইলা যাবেন যে কেন এটারে ভাল্লাগতাছে। যদি এইসময়ে কেউ আমারে নিয়া বলে, যে আমার স্ক্রিপ্টগুলা খুবই প্রফেশনাল, এইটা হইছে মেইনলি ওইসময়ের কাজগুলার জন্যই। আমারে অনেক হেল্প করছে এটা , যদিও একটুও মজা পাই নাই কাজগুলা কইরা। আসলেই এগুলা খুব বিরক্তিকর ছিল – সারদিন গুয়ের মধ্য দিয়া হালচাষের মতো।

ব্যাডেন ব্যাডেনে থাকার সময় আরেকটা যেটা শিখছিলাম সেটা হইলো ডাইরেক্টিং। আমার প্রথম কাজ শুরু হইছিল একটা লোকাল থিয়েটারে, একজন এক্ট্রেসের লগে ইনভলব্ড ছিলাম আমি। আপনারে মাথায় রাখতে হবে যে ব্যাডেন ব্যাডেন হইলো একটা সত্যিকারের মার্কামারা জায়গা। এক্টরগুলা সব ছিল মিডিওকার, আমার এটা বুঝতেই অনেক সময় লাইগা গেছিল আমি কেমনে ওগোরে ঠিকভাবে কাজে লাগামু। ডাইরেক্টিং, মানুষের লগে ডিল করা – এগুলা আসলে অভিজ্ঞতার মামলা। আর এই কাজগুলাই আমি একটা মার্কামারা শহর থেকে অনেক কঠিন অবস্থার মধ্যে শিখছি। যদ্দুর জানি আমেরিকায় এমন অনেক স্কুল আছে যারা লেখালেখি আর ডাইরেক্টিং দেওয়া শিখায়। আর এইসব বিষয়ের উপর হাজার হাজার বইও আছে। কিন্তু শুধুমাত্র এগুলাতেই আসলে কাজ হয় না। আপনে লেখার মাধ্যমেই লেখা শিখেন, ডাইরেক্টিং- এর মাধ্যমেই ডাইরেক্ট দেওয়া শিখেন। আমারে ভুল বুইঝেন না আবার, ভালো বইগুলা গ্রেট – কিন্তু সব আর্টেই প্র্যাকটিসটা লাগে। 

……………..

ইন্টারভিউয়ার: আপনি কি সিনেমা বানানি আর নোভেল লেখার ডিফারেন্সটা নিয়া আরেকটু ভালো কইরা বলতে পারবেন?

হানেকে: ফিল্মের মধ্যে টাইমিং এর ব্যাপারটা পুরাপুরি সিধা রাখতে হয়, কারণ এখানে টাইমিংই সবকিছু। সাহিত্যে আবার এই ব্যাপারটা আলাদা। আমার খুবই প্রিয় একটা বই, মুসিলের ‘দ্যা ম্যান উইথআউট কোয়ালিটি’তে দেখা যায় টাইমিং এখানে এতো ইম্পর্টেন্ট কিছু না। আপনে যদি প্রত্যেকটা ছোট ছোট ডিটেইল আর বিভিন্ন কাহিনীর অংশে আগ্রহী না হন, তাইলে উপন্যাস পড়ার তেমন কোনো ফায়দা নাই। অন্যদিকে একটা সিনেমা হয় খালি দেড় থেকে দুই ঘন্টা, এই সময়টার মধ্যেই আপনারে পুরা গল্পটা কইতে হবে। প্রত্যেকটা সিংগেল মিনিটরেও কাজে লাগাইতে হয়। এটাই সিনেমা বানানির আর্ট আসলে, এটা কইতে পারা যে –  কোন জিনিসটা কাজ করবে আর কোনটা করবে না। এটা যেকোনো আর্টিস্টদের ক্ষেত্রেই হয়, আপনি একইলগে নিজের ক্রিয়েটিভ কাজগুলা নিয়া খুবই সন্দেহপ্রবণ হইয়া উঠবেন, তার লগে লগে প্রত্যেকটা সিংগেল আইডিয়ার মায়াও কাটাইতে পারবেন না। আমার একটা পছন্দের কথা হইলো, ‘ডার্লিংরে মাইরা ফেলো’; যেটা আমি সবসময়  আমার স্টুডেন্টদেরও শিখাইতে চাই। মাথা দিয়া যা বাইর হয়, সেটারেই সিরিয়াসলি নিয়া নিও না। ভাইবো তুমি নিজেই যদি জিনিসটা দেখতা, তখন তোমার রিয়েকশন কী হইতো।

আপনে যদি রিয়ালিস্ট ফিল্ম বানান আমার মতো, তাইলে আপনের কাজ হবে গল্পটারে যত বেশি পারা যায় অরিজিনাল আর বাস্তবিক কইরা তোলা। এখানে প্লটের ক্ষেত্রে মূল বিষয়টাই হইলো আপনার গল্পটা বিশ্বাস করা যাইতেছে কিনা সেটা। এরপর থাকে এক্টররা – ওরা কি গল্পটারে এমনভাবে  ধারণ করতে পারে যেটা আপনের কাছে রিয়ালিস্টিক লাগে? যদি ওরা এটা ঠিকমতো করতে না পারে, তাইলে দর্শকরা কোনোদিনই সিনটা দেইখা পছন্দ করে না – সে যতো ভালো করেই আপনে লেখেন। এটাই আমার কাজের সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার – আপনেরে রিয়ালিটির সাথে বারবার সংঘাতে জড়াইতে হবে শেষপর্যন্ত। আপনে সবসময়ই আপনের দর্শকেদের পার্সোনাল অভিজ্ঞতার বিপরীতে খাড়ায়া থাকেন। একটা লোক বাস্তবে গোসল করার সময় বা দরজা খুইলা বাইরে যাওয়ার সময় তারে কেমন লাগে – এই দৃশ্যের লগে প্রত্যেকটা দর্শক পরিচিত। ওদের নিজস্ব অভিজ্ঞতাগুলার জন্যই ওরা একটা সিন ঠিকঠাক কাজ করতেছে কিনা সেটা বুইঝা ফেলে। তো এইজন্যই আপনের গল্প যদি ঠিকঠাকমতো না দাঁড়ায়, ওরা কেউই ওইটা বিশ্বাস করবে না। আপনেরে প্রচুর যত্ন নিয়া কাজটা করতে হবে – খালি স্ক্রিপ্ট না, প্রত্যেকটা সিংগেল ডিটেলই৷

……………..

ইন্টারভিউয়ার: আপনি প্রায়ই এমন অনেক জেন্টলম্যান টাইপের বুর্জোয়া ক্যারেক্টাররে আনেন, যাদের অনেকেই আর্টিস্ট, মিউজিশিয়ান, লিটারারি ক্রিটিক – এমনসব মানুষ যারা নিজেদের একটা সার্টেইন লেভেলের সেন্সিবিলিটি আছে বইলা ধইরা নেয়, গভীরভাবে চিন্তা করতে পারে বইলাও ধইরা নেয় ওরা।  তবুও আপনে এইসব সেন্সিটিভ বুদ্ধিজীবীদের বাস্তবতা নিয়া এমনভাবে অন্ধ হিসেবে দেখান, মনে হয় যেন ওরা সব বুঝে। তো আমার মনে হয় পলিটিক্সের বাইরে, এখানে একটা সোসিওলজিক্যাল ইন্টারেস্টও থাকতে পারে। 

হানেকে: এটা সিম্পলিই একটা ট্রু, কারণ আমিও তো একজন বুর্জোয়ারই সন্তান। আমি খালি এমনসব জিনিস নিয়াই লেখি যেগুলার সাথে আমি নিজে ভালোভাবে বান্ধা আছি ৷ আমি কোনোদিনই একটা ডকইয়ার্ডের শ্রমিকরে নিয়া সিনেমা বানাবো না, উদাহরণ হিসেবে বললাম আরকি, কারণ আমার তো ওর সাইকোলজি নিয়া কোন ধারণাই নাই। আমি যেসব টপিকের লগে পরিচিত না, এসব নিয়া কোনো ফিল্ম বানাইতে পারবো না। আমার মেইন কনসার্নের জায়গা হইলো মানুষের কমন প্রবলেমগুলা, যেমন গিল্ট, রেকলেস কাজকারবার – ডেইলি লাইফের জিনিসগুলা। আমি অবশ্য সবসময়ই এমনসব কনটেক্সট নিয়া কিছু বানাইতে চাই, যেগুলা আলাদা আগ্রহ তৈরি করবে। ক্যাসে আর হোয়াইট রিবনে আমি যেমনে করছিলাম, এমনকিছু করার যদি সুযোগ থাকে তাহলে আমার খুবই ভাল্লাগে। তবে আমার মেইন জায়গাটা হইলো মানুষ একে অন্যের সাথে রিলেটটা কেমনে করে। সামগ্রিক ভাবে এটাই আমার আর্টের আগ্রহের জায়গা।

ইন্টারভিউয়ার: কিন্তু নিজের এক্সপেরিয়েন্স আর ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে কিছু করা কি সবসময় ভালো – বা জরুরি বিষয়?

হানেকে: যেসব মানুষ এমনসব কাজ করতে চায় যেটা নিয়া তাদের সরাসরি কোন জানাবুঝা নাই, ওদের যে রেজাল্টটা ভালো আসে না, সেটা আমি সবসময়ই খেয়াল করছি। ওরা হয়তো আফগানিস্তান নিয়া কথা বলবে, বা আফ্রিকার বাচ্চাদের নিয়া – কিন্তু দিনশেষে ওরা খালি টিভিতে যা দেখায় বা পত্রিকায় যা লেখে- অদ্দুরই জানে। আর এদিকে ওরা ভান কইরা যায়, এমন কি নিজের কাছেও তারা ভান করে যেন তারা যা বলতেছে সেসব তারা সবই বুঝতেছে। কিন্তু এই ব্যাপারটাই বুলশিট। আমি মোটামুটি এটাই মানি যে আমার চারপাশে যা হইতেছে, আমি ডেইলি লাইফে যা দেখতেছি আর বুঝতেছি, আর জীবনে যেসব অভিজ্ঞতা পাইছি এই পর্যন্ত – এর বাইরে আমি আর কিছু জানি না। এগুলাই এমনসব বিষয় যেগুলার উপরে খালি আমি আস্থা রাখতে পারি। এর বাইরে সবকিছুই হইলো অগভীর ধারনা নিয়া জ্ঞানের ভান করা। অবশ্য আমি এমন না যে আমার জীবনে যা ঘটছে এগুলাই সিধা সিধা লেইখা দেই একদম- কিছু করি কিছু করি না। তবে আমার একটা চেষ্টা থাকে এমন জায়গা থেকে গল্পগুলা বাইর কইরা আনা, যেগুলা আমি পার্সোনাল্লি আইডিন্টিফাই করতে পারি।

আমার স্টুডেন্টরা যদিও খালি কড়া টপিকগুলাই বাইছা নেয়। ওদের জন্য সবচেয়ে কমন টপিক হইলো হলোকাস্ট। আমি প্রায়ই বলি ওদেরঃ বাদ দাও এগুলা। তোমাদের কোনো আইডিয়া নাই কি নিয়া কথা বলতেছো তোমরা। তোমরা খালি যা পড়ছ, যা কোথাও থেকে শুনছ ওইটা থেকেই রিপ্রডিউস করতে পারবা জিনিসগুলা। অন্য যারা এই সময়গুলার মধ্যে  নিজেরা যাপন করছিলো তারা তোমার থেকে অনেক ভালো বলতে পারবে এগুলা নিয়া। এমন কিছু বানানির ট্রাই কর যেটা তোমাদের মধ্য থেকে অর্গানিকভাবেই বাইর হবে। শুধুমাত্র সেসময়ই কাজটার জেনুইনলি ইন্টারেস্টিং হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। আসলেই এইজন্যই  এই সময়ে ডেভেলপিং দেশগুলা থেকে আসা কাজগুলা এতো ইন্টারেস্টিং হয়। এই ফিল্মগুলা খাটি অভিজ্ঞতাগুলারে ফুটায়া তুলতে পারে, যেহেতু একদম খাটি আবেগ থেকে বানানি হয় এগুলা, আর এদিকে আমাদের দর্শকরা যেগুলা দেখে সেগুলা সেকেন্ডহ্যান্ড, কখনোবা থার্ডহ্যান্ড বোঝাপড়া থেকে করা।  এবং এখনো, একজন দর্শক হিসেবে কেউ সবসময়ই ফিল করতে পারে কোনো একটা জিনিস বাস্তব কিনা, সে ঠিকই ওই সার্টেইন সিনের আনন্দ বা দুঃখটা ফিল করতে পারে। আমরা আমাদের বদ্ধ আর ছোট দুনিয়াটায় আরো অনেক বেশি নাম্ব, কারণ কারণ আমরা প্রতিদিন কোন ডেঞ্জার না দেখার সৌভাগ্যেরর মধ্যে থাকি। খুব সম্ভবত এইজন্যই হয়তো ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডের ফিল্মগুলা এতো একঘেয়ে। এখানে একই জিনিস বারবার উৎপাদিত হয়। আমাদের খাটি অভিজ্ঞতগুলা তুইলা ধরার তেমন কোনো সুযোগ নাই, কারণ আমাদের অভিজ্ঞতার ভান্ডটাই খুব ছোট। সর্বোচ্চ বেসিক লেভেলেও আমরা সবাই বিষয় সম্পত্তি আর সেক্সের বাসনা নিয়াই কনসার্নড। আমাদের জীবনগুলায় এরচেয়ে বেশিকিছু আর নাই৷

…………..

ইন্টারভিউয়ার: আপনার মতো যারা রিয়ালিস্ট কাজ করার চেষ্টা করে তাদের ক্ষেত্রে তো এটা আরো বেশি সত্য।

হানেকে: হ্যাঁ, অবশ্যই। তবে যে রিয়ালিটিটা আমি হোল্ড করি সেটা আসলে কেবল আর্টিফ্যাক্ট। অবশ্য রিয়ালিটি আসলে এক্সিস্টই করে না, আর এটা এখানে রিসলভ করার মতো কিছু নাই। ফিল্মীয় রিয়ালিটি কাজ করে ইল্যুশনের মধ্য দিয়া, আর এই ইল্যুশন দেখার জন্যই দর্শকরা বুথে টাকা খরচ করে, টিকেট কাটে। এটা ওরে আরামদায়ক চেয়ারে বইসা শান্তিমতো এমনসব জিনিসের অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ দেয়, এমনসব এডভেঞ্চার যেইটা আসলে সে রিয়াল লাইফে এক্সপেরিয়েন্স করতে পারে না। এবং যেকোন সময় সে চাইলে সিনেমা ছাইড়া উইঠা যাইতে পারে। এটাই হইলো ডাইরেক্টর আর দর্শকের মধ্যে সবচেয়ে বেসিক চুক্তি, অথবা দর্শক আর প্রোডাক্টের মধ্যে। সিনেমা শেষ পর্যন্ত একটা একটা বিক্রি হওয়া জিনিসই। 

আমরা মিডিয়ার রাক্ষুসে প্রভাবের যুগে বাইচা আছি, এবং আমার মনে হয় এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ভালো হইল দর্শকদের মধ্যে ধইরা নেওয়া রিয়ালিটিগুলারে নিয়া সংশয় তৈরি করা। এটাই আসলে আমি করতে চাই। শুধুমাত্র খারাপ সিনেমাই সবকিছুর উত্তর আর ব্যাখ্যা দিতে চায়। কিন্তু বাস্তব জীবন তো অনেক আলাদা। আমারে বলেন, আপনের প্রতিবেশীদের নিয়া আপনি কদ্দুর জানেন? হয়তো কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ ডেসক্রিপশন, কিন্তু আমি নিশ্চিত ওদের চিন্তাভাবনা নিয়া আপনার কোন ধারণাই নাই। এরপর আপনারা হের মেয়ার আর হের মুল্যার নিয়া শুনেন। আর হতবাক হইয়া যান- কী করলো ও ! এটা তো অসম্ভব! কিন্তু আপনি এতো চমকায়া উঠেন কেন? আপনে তো ওরে নিয়া কিছুই জানেন না। আমরা আসলে নিজেদের নিয়াও এতোকিছু জানি না। আমরা যখন জার্মানি আর অস্ট্রিয়ার নাজি পিরিয়ড নিয়া কথা বলি, মানুষ খুব তাড়াতাড়ি দাবি কইরা বসে যে আমি হইলে কখনোই এমনকিছু করতাম না! কিন্তু আমরা তো সেখানে ছিলাম না, আমরা আসলে যেকোন কিছু কইরা ফেলতে পারতাম – আমরা প্রত্যেকেই। আসলে সিচুয়েশনের কারণেই এমন হইয়া যাইতে পারতো । আর এটাই আমার কাজের মূল জিনিস – যে মিডিয়ার এই ডিক্টেটরশিপের দিনে জ্ঞান আর বাস্তবতা বইলা যেসব জিনিসরে দেখানো হয় সেগুলা কতটুকু সন্দেহের বিষয়, সেসব নিয়া আসলে আমরা কত কম জানি, এই ব্যাপারগুলারে রিভিল করা। 

ইন্টারভিউয়ার: আপনে কি স্বীকার করবেন যে আপনে কিছুটা উপদেশ দেওয়া আর্টিস্ট?

হানেকে: না, আমি মোটেই উপদেশ দেওয়া লোক না। দুনিয়া এখন যে অবস্থায় আছে এটা আমারে রাগাইয়া তোলে, আর রাগ উঠে এটা ভাবলে যে আসলে আমার কোন পাওয়ার নাই। আমি আমার কাজের মধ্য নিয়া নিজের অপিনিয়নগুলা দেই, তবে কখনোই কাউরে কোনদিকে টানার জন্য কিছু করি না। আমি আসলে জানিও না তাদেরকে কোনদিকে টানা লাগবে। আমার মধ্যে খালি ভীতি আর বিরক্তিটাই আছে, যেটা আমি শেয়ার করতে পারি। এগুলাই শেষপর্যন্ত করতে পারি আমি।

(সিলেক্টেড অংশ)

 

The following two tabs change content below.

তাসনিম রিফাত

জন্ম ১৯৯৮ সাল। ঢাকায় থাকেন। সাহিত্য ও নৃবিজ্ঞান নিয়া পড়াশোনা করতে পছন্দ করেন।
[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য