Main menu

এলিস মুনরো’র ইন্টারভিউ (সিলেক্টেড অংশ)

এলিস মুনরো’র এই ইন্টারভিউ’র বইটাসহ ইন্টারভিউ সিরিজের ১৮টা বই কিনতে এই লিংকে ক্লিক করেন। কিনতে পারেন রকমারি থিকাও।


…………………

এলিস মুনরোকে আমি ভালবাসি

যেকোনো লেখকই তার নিজের মতো লেখকদের খুইজা বেড়াইতে থাকে৷ আমার যখন ফিকশন লেখার ইচ্ছা জন্মাইতে থাকে, তখনোই মুনরোর কিছু গল্প পড়তে পারছিলাম। উনারে মনে হইছিল নিজের মনের মতো লেখক। মানে গল্প নিয়া আমার যা যা ইচ্ছা ও বোঝাপড়া, তার অনেককিছু পাইছিলাম এলিস মুনরোর গল্পগুলাতে। এইজন্য এলিস মুনরোর সাক্ষাতকার অনুবাদ করতে পারাটা আমার জন্য বড় একটা ঘটনাই ছিল। এই সাক্ষাতকারে মুনরো নিজের লাইফ নিয়া অনেক কথা বলছেন, কথা বলছেন লেখালেখির সাথে তার এতোদিনের সম্পর্ক নিয়াও।

একজন লেখকের লেখাপত্র বুঝার জন্য ওর জীবন নিয়া জানা অনিবার্য কিছু না। কিন্তু কখনো কখনো এইগুলা আমাদের  গল্পের বোঝাপড়ায় কাজে লাগতে পারে।  মুনরোর ক্ষেত্রে কথাটা একটু বেশি খাটে। কারণ মুনরোর গল্পগুলা খুবই মিমেটিক, কাফকা বা বোর্হেসের মতো না৷ উনার গল্পে কাহিনী ইম্পর্টেন্ট। কাহিনী নিজেই রিডারের লগে কথা কইতে থাকে। 

নিজের অভিজ্ঞতা আর আশেপাশের জগত নিয়াই বেশি লেখছেন মুনরো। এইজন্য অন্টারিওর আশেপাশের এলাকাগুলা তার গল্পে খুবই ইম্পর্টেন্ট। মুনরোরে অনেকে ফকনারের মতো রিজিওনাল লেখকও বলেন।

এই অভিজ্ঞতার উপর একটু বেশি নির্ভরশীলতার কারণেই হয়তো উনার গল্পে একই চরিত্ররা বিভিন্ন জায়গায় ঘুইরা ফিইরা আসে। যেমন কয়েকটা গল্পের মধ্যেই থাকে একই লাইব্রেরিয়ানের ক্যারেক্টার। আবার মুনরোর গল্পে  প্লেস খুবই ইম্পর্ট্যান্ট একটা ব্যাপার৷ উনি একজায়গায় বলছিলেন মফস্বলের প্রান্তিক মানুষদের নিয়াই উনার বেশিরভাগ গল্প লেখা৷ মুনরোর নিজের লাইফের বেশিরভাগ সময়ও থাকছেন অন্টারিওর এক মফস্বলে। এইসব ল্যান্ডস্কেপ আর মানুষেরা তার গল্পের পরতে পরতে আছে। 

এইসব কিছুর জন্যই উনার গল্পে অটোবায়োগ্রাফিক্যাল উপাদান বেশি৷  তবে কোন লেখারে শুধুমাত্র অটোবায়োগ্রাফিক্যাল হিসেবে পড়ার যে ঝামেলা, সেটার কথাও উল্লেখ করছেন উনি এই সাক্ষাতকারে৷ আসলে যেকোনো ভালো লেখাই তো খালি অভিজ্ঞতার অনুকরন না, বরং অভিজ্ঞতার সাথে সাথে মাত্রাজ্ঞান, এস্থেটিক সেন্স, লিটারারি সেন্সসহ আরো অনেককিছুর মিশ্রন। 

কেউ কেউ উনারে তুলনা করেন চেখভের সাথে। এক অর্থে এটা সত্যি। যে কেউই উনার গল্পে চেখভিয়ান জিনিসপাতি খুইজা পাবেন। মুনরোর  ক্যারেক্টারগুলার মধ্যে যে আইরনির হদিস পাওয়া যায় মাঝেমাঝে, সেটা অনেকসময় চেখভের কথাই মনে করায়া দেয়৷ তবে আমার মনে হয় মুনরো গল্পে অনেক ডিটেইলস দিতে পছন্দ করেন, উনার গল্পে মানুষের লাইফের একটা বৃহৎ ক্যানভাস থাকে, যেখানে চেখভ তুলনামূলক বেশি কৌশলী আর মিনিমালিস্ট৷ এইজন্য মুনরো গল্পে সিম্বল বা খুব সূক্ষ্ম জিনিসগুলা হাজির করেন না সবসময়, পুরা গল্পটারেই একটা  কন্টিনিউয়াস লাইফের অংশ আকারে হাজির করেন। 

মুনরোরে নিয়া আরো অনেককিছুই বলা যায়। উনারে নিয়া কইতে গেলে আমি কিঞ্চিত আবেগীও হইয়া পড়ি। অনেকদিন ধইরাই উনার গল্পগুলার সাথে বাইচা আছি। যেকোনো কিছু পড়া আসলে একটা রিফ্লেক্সিভ প্রক্রিয়া। লেখা অথবা অনুবাদও তাই৷ সুতরাং, এখানে আমিই শুধু অনুবাদটা করি নাই, এই অনুবাদটাও আমারে করছে। 

তাসনিম রিফাত

…………………………..

ইন্টারভিউয়ারঃ আপনি কি কখনো কোন লেখা পাবলিশ হওয়ার পরেও এডিট করছেন? যেমন ধরেন , প্রস্ত ওর মইরা যাওয়ার কিছুদিন আগে ‘রিমেম্ব্রান্স অফ থিংস পাস্ট’ বইয়ের প্রথম ভলিউমটা আবার লেখছিলেন। 

মুনরোঃ হ্যাঁ, করি। সাধারণ আর সহজে বুঝা যায় এমন লেখাগুলা হেনরি জেমস রিরাইট করে সেগুলারে ধোঁয়াটে আর কঠিন কইরা তুলতেন। আমিও এই ধরনের কাজ  করতেছি রিসেন্টলি। আমার ‘ক্যারিড  অ্যাওয়ে’ গল্পটা ১৯৯১ সালের বেস্ট আমেরিকান শর্ট স্টোরির সংকলনে জায়গা পাইছিল। গল্পটা কেমন হইছে সেটা দেখার জন্য আমি সংকলন থেকে আবার পড়তেছিলাম।  আর একটা প্যারাগ্রাফ খুইজা পাইছিলাম যেটায় কিছু ঝামেলা আছে মনে হইছিল। প্যারাগ্রাফটা খুবই ছোট ছিল, মেইবি দুইটা বাক্যের মাত্র, কিন্তু গল্পটার জন্য খুবই ইম্পর্টেন্ট।  আমি একটা কলম নিয়া ওই সংকলনের মার্জিনেই জিনিসটারে রিরাইট করছিলাম, যাতে পরে বইতে প্যারাগ্রাফটা ঠিক ভাবে লেখা যায়। আমি যখনই এমনে কোন গল্প রিভিশন দিতে যাই, তখনই কোন না কোন ঝামেলা খুইজা পাই। এটা সম্ভবত হয় লেখার সময় যে রিদমটা থাকে, এডিটের সময় ওই রিদমটায় আর না থাকার কারণে। কারণ একটা সম্পূর্ণ লেখা আপনি অনেক শ্রম দিয়া লেখেন, এডিটের সময় ক্ষুদ্র একটা অংশে মনোযোগ দেন মাত্র।  আমি সাধারণত লেখার সময়ই দেখি কোনো অংশ ঠিকঠাক ভাবে আছে কিনা, কোনো জায়গায় ঝামেলা বাঁধলে সেটা ঠিক কইরা নেই। কিন্তু সব শেষ কইরা যখন আমি গল্পটা আবার পড়তে যাই, তখনোই ব্যাপারটা সমস্যাজনক লাগে ৷ তো আমি এইসব জিনিস নিয়া কখনোই খুব নিশ্চিত হইতে পারি না ৷ হয়তো লেখালেখির ক্ষেত্রে এই ধরনের অভ্যাসগুলা বাদ দিলেই ভালো হয়। 

ইন্টারভিউয়ারঃ আপনে একবার বলছিলেন যে আপনে লেখার মাঝামাঝি সময়ে কাউরে নিজের কাজগুলা দেখান না।

মুনরোঃ হ্যাঁ, এটা সত্য। কোন লেখা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি কাউরে সেটা দেখাই না।

ইন্টারভিউয়ারঃ আপনে সম্পাদকদের উপর কতটুক ভরসা রাখেন? 

মুনরোঃ দ্যা নিউ ইয়র্কারে কাজ করার ক্ষেত্রেই আমার প্রথম সিরিয়াস এডিটিং নিয়া অভিজ্ঞতা হইছিল। এর আগে আমি শুধু পান্ডুলিপি বানানোর সময় সম্পাদকদের কাছ থেকে টুকটাক পরামর্শ নিতাম। সম্পাদনার সময় কি কি করা যায়, তা নিয়া সম্পাদক আর লেখকের মধ্যে বোঝাপড়া থাকা দরকার। যেমন, আমার এক এডিটর ছিল যে ভাবতো উইলিয়াম ম্যাক্সওয়েলের (একজন আম্রিকান লেখক) গল্পগুলা কিছু হয় নাই, কিন্তু আমার কাছে এই কথার কোন গুরুত্ব নাই। একজন সম্পাদকের অবশ্যই চোখা নজর থাকা উচিত, যাতে আমি তারে বিশ্বাস করতে পারি।  আমার নিউ ইয়র্কারের সম্পাদক ছিল চিফ ম্যাকগ্রাথ। উনিই ছিলেন আমার প্রথম এডিটর। খুবই জোস একটা লোক।  আমি মাঝেমাঝে অবাক হইয়া যাইতাম, আমি যেসব কাজ করতে চাইতাম লেখায়, সেগুলা একটা লোক কেমনে এমন গভীরভাবে বুঝতে পারে। সবসময় যে উনি আমার লেখা ইডিট করতেন সেটা না, মাঝেমাঝে অনেক পথও দেখাইতেন। আমি আমার ‘দ্যা টার্কিশ সিজন’ নামে একটা গল্প রিরাইট করছিলাম, যেটার পুরান ভার্সনটা উনি আগেই পড়ছিলেন। আমি ভাবছিলাম নয়া ভার্সনটা নর্মালিই নিবেন উনি। কিন্তু উনি আমারে বললেন, ‘নতুন ভার্সনে কিছু জিনিস আছে যেগুলা আমার পছন্দ, আর পুরানোটায়ও কিছু জিনিস আমার ভাল্লাগছে। আমরা তো আরেকবার দেখতে পারি গল্পটা?’ উনি কখনোই কিছু বদলানোর জন্য জোর দিতেন না, কিছু অপশন দেখাইতেন আরকি। তো, এইভাবে আমরা গল্পটা নিয়া আবার বসছিলাম আর মেবি আরো বেটার একটা আউটপুট পাইছিলাম।

…………………………..


ইন্টারভিউয়ারঃ আপনার কি লেখালেখির কোন নির্দিষ্ট টাইম আছে?

মুনরোঃ বাচ্চারা যখন ছোট ছিল, তখন ওরা স্কুলে যাওয়ার পরপরই আমি লেখতে বসতাম। ওই দিনগুলাতে আমি খুবই খাটাখাটি করতাম। তখন আমি আর আমার জামাই মিইল্যা একটা বুকস্টোর  চালাইতাম, আমি ওইখানে কাজটাজ করতাম। তবে দুপুর পর্যন্ত ঘরেই থাকতাম। ওই সময়  ঘরের কাজ করতাম আর এর সাথে সাথে লেখতামও। এরপরে যখন বুকস্টোরে প্রতিদিন কাজ করা বন্ধ কইরা দিলাম, সে সময়টায় সবাই লাঞ্চের জন্য বাসায় আসার আগ পর্যন্ত লেখালেখি চালাইয়া যাইতাম। লাঞ্চের পরে ওরা যখন চইল্যা যাইতো, আমি প্রায় আড়াইটা পর্যন্ত লেখতাম আবার।  এরপরেই আমি তাড়াতাড়ি এক কাপ কফি বানাইয়া বাড়ির কাজ শুরু কইরা দিতাম। সন্ধার আগেই সব কাজ শেষ করার ট্রাই করতাম। 

ইন্টারভিউয়ারঃ আপনার মেয়েরা স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে কি করতেন?

মুনরোঃ ওরা ঘুমাইত।

ইন্টারভিউয়ারঃ ওরা যখন ঘুমাইতো, তখন আপনি লেখতেন?

মুনরোঃ হ্যা। দুপুর একটা থেকে তিনটা পর্যন্ত৷ আমি তখন প্রচুর লেখতাম, যেগুলা তেমন ভালো হইতো না। তবে  ভালোই প্রোডাক্টিভ ছিলাম ৷ আমার দ্বিতীয় বই ‘লাইভস অফ গার্লস এন্ড ওমেন’ যখন লিখি তখন খুবই প্রোডাক্টিভ ছিলাম ৷ সেইসময় আমার বাসায় চারটা বাচ্চা থাকতো। মেয়েদের এক বন্ধুও আমাদের সাথে থাকতো। আমি সপ্তাহে দুইদিন স্টোরে কাজ করতাম। সেই সময়টাতে প্রতিদিন রাতে প্রায় একটা পর্যন্ত কাজ করতাম, আবার ভোর ছয়টার মধ্যেই উইঠা যাইতাম। আমার মনে পড়ে, ওই দিনগুলাতে আমি কি ভয়ংকর সব জিনিস ভাবতাম !  কখনো ভাবতাম আমি মইরা যামু বা আমার হার্ট এটাক হবে। আমার  বয়স যদিও তখন  উনচল্লিশ ছিল, তারপরও এসব চিন্তা কইরা বেড়াইতাম। এরপর ভাবতাম, আচ্ছা এরকমই যদি হয়, কিছু যায় আসে না। অনেকগুলা পেজ আমি ইতোমধ্যেই লেইখা ফেলছি ৷ মানুষ এগুলা নিয়াই কথাবার্তা বলতে পারবে ৷  তখন লেখালেখির জন্য একটা জানপ্রাণ দেওয়ার মতো আবেগ ছিল।  এখন আর সেই আগের মতো এনার্জি নাই আমার।

………………………………

 

ইন্টারভিউয়ারঃ আপনার গল্পে অনেক মায়ের ক্যারেক্টার থাকে। কিছু কিছু মায়ের ক্যারেক্টার ঘুইরা ফিইরা অন্য গল্পেও আসে ৷ আর ক্যারেক্টারগুলাও খুব রিয়াল লাগে ৷ যেমন ‘দ্যা বেগার মেইড’ গল্পের রোজের সৎমা ফ্লোয়ের চরিত্রটা ৷ 

মুনরোঃ ফ্লো কিন্তু রিয়াল কোন মানুষ ছিল না ৷ উনি এমন একটা ক্যারেক্টার যার সাথে আমার চেনাজানা অনেক মানুষের মিল আছে। তবে ফ্লো আসলে সেই ধরণের কম্পোসিট ক্যারেক্টার যাদের নিয়া একজন লেখক কথা বলতে চায় সবসময়। ফ্লোয়ের ক্যারেক্টারটা আমার জন্য একটা ফোর্সের মতো ছিল৷ কারণ গল্পটা আমি যখন লেখছি, তখন আমি ২৩ বছর বাইরে থাকার পর এখানে আবার ফিরা আসছিলাম। এইখানকার পুরা কালচার আমারে শক দিছিল ৷ আমি যখন অনেকদিন পর ফিরা আসলাম আর আসল জিনিসগুলা দেখলাম, বুঝলাম যে আমি এতোদিন ধইরা যা লেইখা আসছি আমার ছোটবেলা নিয়া, সবই আসলে আমার স্মৃতির একটা কল্পনামার্কা ব্যাপার। ফ্লো আছিল একটা সত্যিকারের অভিজ্ঞতার ফসল। আমি এখন  স্মৃতি থেইকা যা যা মনে করতে পারি, তার চেয়েও বেশি চোখা। 

ইন্টারভিয়ারঃ আপনে তো অনেক ঘুরছেন টুরছেন। কিন্তু আপনার কাজগুলা খুবই লোকাল ব্যাপারস্যাপার দিয়া আক্রান্ত মনে হয়। আপনি কি এখানে যেসব গল্পগুলা খুইজা পান এগুলারে বেশি আপন মনে করেন, নাকি শহরে থাকার সময় যেসব জিনিস-পাতি খুইজা পাইছেন এগুলাও সমানতালে ইউজ করছেন?

মুনরোঃ যখন আপনে একটা ছোট শহরে থাকবেন তখন আপনে সব টাইপের মানুষ নিয়া অনেক কিছু শুনতে পাইবেন। আর বড় শহরগুলাতে মেইনলি আপনার মতো স্যাম সার্কেলের মানুষগুলার গল্পই ঘুইরা ফিইরা আসে ৷ আর আপনি যদি মেয়ে হন, তাইলে বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে এসব গল্প পাওয়ার সম্ভাবনা আরো বাইড়া যায়। আমি ভিক্টোরিয়াতে যে লাইফ কাটাইছি, তার থেকেই ‘ডিফারেন্টলি’ গল্পটার জিনিসপাতি পাইছি। ‘হোয়াইট ডাম্প’ গল্পটার অনেক কিছুও ওইখান থেকে পাওয়া। আর ‘ফিটস’ গল্পটার কাহিনী এখানেই ঘইটা যাওয়া একটা সত্য আর ভয়ানক কাহিনী থেকে পাইছি; ষাট বছর বয়সে এক কাপলের মার্ডার-সুইসাইড।  একটা বড় শহর হইলে আমি এসব কাহিনী কেবল পেপারেই পড়তে পারতাম, এর ভিতরের সব কাহিনীগুলা জানতাম না। 

……………………..

 

ইন্টারভিউয়ারঃ বইয়ের রিভিউরে আপনার কাছে গুরত্বপূর্ণ মনে হয়? আপনার মনে হয় এগুলা থেকে শিখতে পারেন কিছু? আপনি কখনো কোন রিভিউ নিয়া প্যারা খাইছেন?

মুনরোঃ হ্যাঁ এবং না। কারণ আপনে রিভিউ থেকে অনেককিছু শিখতে পারবেন না, উল্টা অনেকসময় প্যারা খাইতে পারেন একটা রিভিউ নিয়া। খারাপ রিভিউগুলার ক্ষেত্রে একটা পাবলিক হিউমিলিয়েশনের ফিলিংস হয় ৷ যদিও এইসব জিনিস খুব একটা ম্যাটার করে না, তবে গালাগালি খাওয়ার চেয়ে হাততালি পাওয়া সবসময়ই ভালো ৷ 

ইন্টারভিউয়ারঃ  আপনি কি খুব কড়া রিডার? আপনারে কি কোনো লেখা ইনফ্লুয়েন্স করছে?

মুনরোঃ আমার ত্রিশ বছরের আগে, পড়ালেখাই ছিল জীবন। আমি বইয়ের মধ্যেই বাইচ্যা থাকতাম। দক্ষিণ আম্রিকার লেখকরা আমারে প্রথম খুবই ধাক্কা দিছিল। ওদের থেকে শিখছিলাম,  একটা ছোট  শহর, গ্রামের মানুষ বা আমি যেসব জিনিস দেখি আশেপাশে – এসব নিয়া কেমনে লেখা যায়৷ তবে দক্ষিণের রাইটারদের ক্ষেত্রে একটা মজার ব্যাপার হইলো, আমি যাদের পছন্দ করতাম তারা সবাই ছিল নারী। এটা যে সচেতনভাবে হইছে এমন না। আমি ফকনাররে খুব একটা পছন্দ করি না। আমার ভাল্লাগে ইউডোরা ওয়েল্টি, ফ্লেনারি ও’কনার, কাথ্যরিন এন পর্টার, কার্সন ম্যাককুলারসদের ৷ আমার মনে হইতো একটু আজব কিসিমের আর মার্জিনাল মানুষদের নিয়া নারীরাই লেখতে পারে। 

ইন্টারভিউয়ারঃ যেটা আপনেও সবসময় করছেন। 

মুনরোঃ হ্যাঁ, এইটা আমার শক্তির জায়গা ছিল। আমি এটা অনুভব করতাম, যে কোনো বড় উপন্যাসে যে টেরিটরি, এগুলা আসলে পুরুষদের টেরিটরি ৷ আমি জানি না প্রান্তিক জায়গায় থাকার ফিলিংটা আমি কেমনে পাইছি। এমন না যে আমারে ঠেইলা দেওয়া হইছে। সম্ভবত এই কারণে হইতে পারে যে আমি একটু সাইডে থেকে বড় হইছি। আমি জানি গ্রেট রাইটারদের এমন অনেক ব্যাপার থাকে, যেগুলা আমি ঠিক বুঝি না, জানি না এটা আসলে কী। আমি ডি.এইচ লরেন্স প্রথমবার পড়ার সময় ওরে নিয়া খুবই বিরক্ত ছিলাম। আমি বেশিরভাগ সময়ই লেখকদের ফিমেইল সেক্সুয়ালিটি নিয়া আইডিয়া দেইখা বিরক্ত হই। 

ইন্টারভিউয়ারঃ ঠিক কোন জিনিসটা আপনারে বিরক্ত করছে, একটু বুঝাইয়া বলবেন?

মুনরোঃ এটা হইলো, আমি কেমনে একজন লেখক হইতে পারি যদি আমি অন্য লেখকগো কাছে অবজেক্ট হইয়া থাকি?

…………………..


ইন্টারভিউয়ারঃ
বাইচা থাকতে আপনার আম্মা আপনার কোন লেখা পড়ছিলেন?

মুনরোঃ না পড়েন নাই। পড়লে হয়তো উনি এগুলা পছন্দ করতেন না ৷ আমার মনে হয় সেক্স আর খারাপ শব্দগুলা উনি নিতে পারতেন না ৷  আম্মা যদি বাইচা থাকতেন, তাইলে কোনোকিছু পাবলিশ করার জন্য অনেক হ্যাপা পোহাইতে হইতো, হয়তো ফ্যামিলির থেকে আলাদা হইয়া যাইতে হইতো ৷ 

ইন্টারভিউয়ারঃ আপনার মনে হয় আপনি এটা করতেন?

মুনরোঃ আমার মনে হয় করতাম। ওই যে বলছিলাম আমি অনেক শক্ত মনের মানুষ। আমার আম্মার প্রতি এখন যে আবেগটা ফিল করি, আগে অনেকটা সময় এমন কোনকিছু ফিল হয় নাই। আমি জানি না, আমার কোন মেয়ে যদি আমারে নিয়া লেখে, তাইলে ওইটা নিয়া আমি কেমন ফিল করবো। ওদের এখন মোটামুটি বয়স হইছে, এই বয়সে নিজের ছোটবেলার এক্সপেরিয়েন্সগুলা নিয়া উপন্যাস লেখা যায় ৷

নিজের সন্তানের কোন উপন্যাসের চরিত্র হওয়া আমার কাছে খুব ভয়ংকর একটা এক্সপেরিয়েন্স। মানুষ রিভিউতে নির্বিচারে অনেক মন খারাপ কইরা দেওয়া কথা লেখে ৷ যেমন আমার বাপ ছিল অসহায় এক চাষী বা আমাদের গরীবি হালতের কথা লেখে ৷ এক ফেমিনিস্ট লেখক আমার ‘লাইভস অব গার্লস এন্ড ওমেন’ বইয়ের ‘দ্যা ফাদার’ গল্পটারে পুরা একটা অটোবায়োয়োগ্রাফিক্যাল কাহিনী হিসেবে ইন্টারপ্রেট করছে ৷  সে এমনভাবে ব্যাখ্যা করছে, যেখানে আমি খুবই করুণ অবস্থা থেকে উইঠা আসছি, কারণ আমার বাপ ছিল অকর্মা। সে কানাডার একজন একাডেমিক লোক ছিল। এটা দেইখা আমার মেজাজ খুবই খারাপ হইয়া গেছিল, ভাবতেছিলাম কেমনে তার নামে আইনি নোটিশ পাঠানো যায় ৷ আমি এসব নিয়া খুবই প্যারায় ছিলাম, বুঝতেছিলাম না কি করমু। ভাবছিলাম এসব নিয়া তো এতো পাত্তা দেওয়ার দরকার নাই। লেখক হিসেবে সবধরনের সফলতাই আমি পাইছি। যতোই হোক উনি আমার বাপ। উনি মইরা গেছে। আমার লেখার জন্য উনি একটা অকর্মা বাপ হিসেবে পরিচয় পাবেন? পরে বুঝছি সে একাডেমিক হইলো ইয়ংগার জেনারেশনেরই একজন, যারা আমার থেকে অনেক আলাদা ইকোনমিক বাস্তবতায় বাইড়া উঠছে ৷ ওরা এখন একটা ওয়েলফেয়ার স্টেটে থাকে, যেখানে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায়। ওরা জানে না, রোগ-বালাইয়ের মতো জিনিসপাতি  কেমনে পুরা একটা ফ্যামিলিরে ধ্বংস কইরা দিতে পারতো। প্রকৃতপক্ষে ওরা কখনোই টাকা-পয়সার সমস্যার যে বাস্তবতা, তার মধ্য দিয়া কখনো যায় নাই। ওরা একটা ফ্যামিলিরে গরীব দেইখা ভাবে, এটা মনে হয় ওদের নিজেদের ভুলের জন্যই ৷ ওরা ভাবে নিজের অবস্থার উন্নতি করতে না চাওয়া হইলো একধরণের আকাইম্যা আর বেক্কলের মতো কাজ। 

…………………………

এলিস মুনরো’র এই ইন্টারভিউ’র বইটাসহ ইন্টারভিউ সিরিজের ১৮টা বই কিনতে এই লিংকে ক্লিক করেন। কিনতে পারেন রকমারি থিকাও।

 

The following two tabs change content below.

তাসনিম রিফাত

জন্ম ১৯৯৮ সাল। ঢাকায় থাকেন। সাহিত্য ও নৃবিজ্ঞান নিয়া পড়াশোনা করতে পছন্দ করেন।
[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য