Main menu

রেখাপা: একটি স্কেচ

বান্না’র গল্পের যে রিয়ালিটি এমন না যে এইটা আমরা জানি না; কিন্তু আমাদের কাছে যিনি গরিব এবং মাইয়া, তার ডিগনিটি নাই কোন। এইরকম একজন রেখাপা’র কথা বান্না বলতে চাইছেন তবু আমাদের কাছেই, আমাদের ভাষাতে, আমরা যারা আরবান মিডল ক্লাশ, ইউনির্ভাসিটিতে পড়ছি, এখন চাকরি করি। রেখাপা’রে আমরা যতোটা না দেখি নাই, তার চাইতে বেশি দেখতে চাই নাই আসলে। কিন্তু আমরা ট্রাই করতে পারি, বান্নার মতো, দেখার; আমাদের ভাষার ভিতর রেখাপা’রে কট্টুক দেখা যায়।

————————————–

 

জানালার পাশে ভিক্ষুকের টোকায় সম্বিত ফিরলে তাকিয়ে দেখি লোকটা আমার চেনা। একই লাইনের লোক। মাঝে মাঝে আড্ডায় দেখা হয়েছে তবে পরিচয় হয় নাই বলে নাম জানিনা। লোকটাও গর্তে বসে যাওয়া চোখে আমাকে চিনতে পেরে কিছুটা যেন অপ্রস্তুত হয়ে যায়। আমি পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করতে যেয়ে-মায়া লাগছিল একই লাইনের বলে ─ বের না করে, (মায়ার মোহ ততক্ষণে কেটে গেছে) কিছু একটা ভেবে একটা ১ টাকার কয়েন লোকটার হাতে গুঁজে দিতে দিতে ও ডানচোখের ঈশারায় বিদায় নিতে নিতে, সিগন্যাল ছেড়ে বাস চলতে শুরু করে। দেয়ার জন্য ১ টাকার কয়েন সিলেক্ট করার সময় ভাবছিলাম, ‘কে বেশী পাগল? হৃদয় না বুদ্ধি?’ তখনকার মত একটা সন্তোষজনক জবাব খুঁজে পেলেও অপ্রাসঙ্গিক হওয়ায় পাঠককে বিরক্ত করব না।[pullquote][AWD_comments][/pullquote]

শ্যামলী নেমে রিকশায় সোজা চলে আসি বিয়েনপি বাজারের পেছনে ও পাশে, উচ্ছেদকৃত বিয়েনপি বস্তির বিস্তীর্ণ উঁচু-নীচু পতিত জমি/মাঠের, শেষপ্রান্তে অবস্থিত আড্ডায়। বিচিত্র এ জগত। সমাজছুটদের। সমাজের সব পেশা-শ্রেণী-ধর্মের মানুষের মিলনমেলা এই আসল সাম্যবাদী আড্ডা। ‘আমারাতো ভাই সবাই এ্যাডিক্ট,’ এখানকার প্রায়োচ্চারিত বাক্যগুলার একটা, গোটা পঁচিশেক বাঁশ/লাঠির চারকোনার খুঁটির উপর ঠেকে ও চারপাশ পেঁচিয়ে পলিথিন বা পরিত্যক্ত ব্যানারের কাপড় দিয়ে তৈরী, মোটামুটি ৩০/৪০ বর্গফুটের আড্ডাগুলা। ভেতরের তিন হাত উচ্চতার জন্য, ঢুকলে পরে, সোজা হয়ে দাঁড়ানোর উপায় নাই। সোজা যেয়ে মান্নান ভাইয়ের আড্ডায় ঢুকে যাই। আড্ডায় প্রবেশ পথে ঝুলন্ত চটের পর্দার পাশে বসে খালা (মান্নান ভাইয়ের মা) যথারীতি তিল্লি কাঁটছে নিখুঁত শৈল্পিক দক্ষতায়। অন্যদিনের চেয়ে ভীড় কম, ফলত: দমবন্ধ করা বিড়ির কড়া গন্ধও কম। উত্তর-পশ্চিম কোনে এক আপা ও এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক মাল খাচ্ছে, আরকপাশে আড্ডার কর্মচারী ভুলু বসে বসে ঝিমাচ্ছে। ওকে জাগিয়ে মান্নান ভাইকে বলে (যাতে ভুলু টাকা নিয়ে ভাগলেও পরে দায়িত্ব মান্নান ভাইয়ের ঘাড়ে যায়-) ১২০ টাকা দিয়ে দুটা মাল আনতে দেই। এমনিতে দাম ৫০ টাকা করে, কিন্তু কিছুক্সণ আগে আবগারী রেইড পড়ায় মূল সেলস বন্ধ। কোন কোন আড্ডাঅলা মাল কিনে স্টক করে রাখে, এরকম ক্রাইসিসে কিছু লাভ করার আশায়। চটের পর্দা উঠিয়ে ভুলু বের হতে যাবে, এমন সময় উত্তর-পশ্চিম কোনার ভদ্রলোক ডেকে উঠে, ‘ঐ ভুলু মাল আনতে যাস, আমার লেইগাও একটা আনিস।’ আমি লক্ষ্য করলাম মান্নান ভাই ভদ্রলোককে চোখের কোনা দিয়ে কিছু একটা ঈশারা করছে, কিন্তু ভুলুর দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে টাকা বের করতে থাকায় ভদ্রলোক তা খেয়াল করেনা, ভুলু মাল আনতে চলে গেলে মান্নান ভাই ভদ্রলোককে ধমকে উঠে, ‘ঐ মিয়া কী খান মনে আছে? হিরোইন। হিরনচীর বিশ্বাস নাই। যারে আনতে দিলেন সেও হিরনচী। এই ভাই, আমারে দেখাইয়া, ২টা আনতে দিছে, ২টার দায় নেওয়া যায়, কিন্তু ৩টার দায় নেয়া যায়? যদি টাকা নিয়া ভাগে, বলা তো যায় না, হিরনচী জাত। যত পুরান কর্মচারী হোক না কেন।

‘আরে নাহ্’, কন্ঠে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে এতক্ষণ চুপ করে থাকা কোনার আপা বলে ওঠে, ‘যাবে না, ঠিকই ফেরত আসবে।’ মেয়েটার কন্ঠের দৃঢ়তায়, বিশ্বাসের গভীর ছাপ লক্ষ্য করে, আমি চমকে উঠি। এতক্ষণে চোখ তুলে ভালভাবে চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখি রেখা আপা।

‘আরে আপনে! আমি তো এতক্ষণ খেয়ালেই করি নাই, সরি,’ কন্ঠে বিনয় আর ভঙ্গিতে লজ্জা মিশিয়ে বলি। ‘ঠিক আছে, অসুবিদা নাই’ স্বভাবসুলভ হেসে বলে রেখাপা।

ভুলুর আসতে কতক্ষণ লাগে কে জানে! মান্নান ভাইয়ের কাছে বেচার মত ভরপুর পাইপ আছে কি না জানতে চাই (এই পাইপও মালেরই আরেক ধরন। যে এলমুনিয়াম ফয়েলে তৈরী পাইপের মাধ্যমে ঠোঁটে চেপে আমরা ধোঁয়াটা ভেতরে টেনে নেই, সেই পাইপের ভেতরে ৭/৮টা পুরিয়া মাল খাওয়ার পর মালের তরল একটা স্তর জমে। আড্ডাঅলারা তখন ঐ পাইপ খুলে ৫০/১০০/১৫০ টাকায় বিক্রি করে ও নিজেদের খাওয়ার মালটুকু পায়।) মান্নান ভাইয়ের কাছ থেকে ১০ মিনিট দরদামের পর ৯০ টাকায় একটা পাইপ কিনে খুব সাবধানে খুলে, ২ মাথার তরল জমিয়ে, মাঝামাঝি এনে গোল করে, ভুলুর আসার অপেক্ষায় বসে থাকি। কেননা মালের সাথে পাইপের মাল মিশিয়ে খাওয়ার নিয়ম। এটা এই অতি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংস্কৃতিরই অংশ। একটা ধর্মীয় অনুশাসনের মত, আর সব সাংস্কৃতিক ─ সে সু বা কু। যা-ই হোকনা কেন! – সংস্কারের মত এটাও অঘোষিতভাবে অলঙ্ঘ্যনীয়। প্রায় ২০ মিনিট কেটে গেলেও ভুলু আসে না। আমি মান্নান ভাইকে ভেতরে উদ্বেগ ও কন্ঠে ঠাট্টা নিয়ে বলি, ‘নাকি আপনি যা সন্দেহ করছেন তা-ই হচ্ছে?’ ‘মানে?’ প্রশ্নের ভঙ্গিতে ভুরু উঁচিয়ে মান্নান ভাই আমার দিকে জিজ্ঞাসু তাকায়। আমি স্মরণ করিয়ে দিলে সে হেসে বলে, ‘আরে না, যাইব না মনে হয়, হিরনচী তো! বিশ্বাসের ঠিক নাই। তাই আর কী বলছিলাম।’ এসময় আড্ডায় উপস্থি ৭/৮ জনের প্রত্যেকেই, রেখাপা বাদে, এই নির্দিষ্ট প্রসঙ্গে তাদের মতামত, দৃঢ় বিশ্বাস, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ইত্যাদি একত্রে সশব্দে বলতে শুরু করে।

মান্নান ভাইয়ের কথার ৫ মিনিটের মাথায় চটের পর্দা উঠিয়ে ভুলু ঢোকে। আমার এবং কোনার লোকটার মনে স্বস্তি ফিরে আসে, সেটা বোঝা যায় লোকটাকে হাসতে দেখে ও আমার বলা, ‘বল্লাম না! যাবে না, ঠিকই আসবে’ কথায়। বলার সময় আড়চোখে রেখাপার দিকে তাকিয়ে দেখি সে আমার কথা খেয়াল করছে কি না, কথাটা আসলে বানানো বলেই তার চোহরার, বন্ধ চোখের খুটিতে হেলান দেয়া ভঙ্গিতে কিছুই বোঝা যায় না।

এরপর মালে পিন মারা নেই দেখে আমি ক্ষেপে উঠলে যে ঝগড়া, ভুলু-আমি-মান্নান ভাই ও কোনার লোকটার মাঝে মাঝে অংশগ্রহণে শুরু হয় তা চলে প্রায় ৪০/৪৫ মিনিট। এর মধ্যে আমি অভিযোগ করি ভুলুর এত দেরীর কারণ ও মাল কাটছে; ভুলু বার বার কোরান ছুঁয়ে কসম খাওয়ার প্রতিজ্ঞা করে, আর কোনার লোকটা তার মতামত মাঝপথে বদলে মালের পরিমাণ দেখিয়ে আমাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে। শেষমেষ রেখাপার হস্তক্ষেপে ও আমার ভুল স্বীকার ও হাতজোড় ক্ষমা প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে ঝগড়া থামে। আমি মাল খাওয়া শুরু করি।

ধীরে ধীরে পলিথিনের বেড়া ও ছাদ দেয়া ঘরে ১/২ জন করে বাড়তে বাড়তে ১৬/১৭ জনে পরিণত হয়। এখন রুমটা আর বসোপযোগী স্বাভাবিক নাই। বিড়ির ধোঁয়ার কটু গন্ধে ও ঝাপসা ধোঁয়াশার পর্দায় ৩/৪ হাত দূরের লোকের চেহারাও স্পষ্ট না। আমি যেখানে বসেছি তার বিপরীত কোনে ভদ্রলোকের পাশে বসা রেখা আপাক দেখা যাচ্ছিল না, মাঝখানের খোরদের ভিড়ে। অবশ্য এতক্ষণে ঘন্টা দেড়েক কেটে যাওয়ায় তার কথা মনেও ছিল না।

ছবি: গুগুল সার্চ থিকা নেয়া।

ছবি: গুগুল সার্চ থিকা নেয়া।

 

কিন্তু হঠাৎ সকলের সম্মিলিত হট্টগোলের মধ্যেও রেখাপার উচু গলা শুনতে পাই, কাকে যেন বলছে রাগত স্বরে, ‘মাজা ব্যথা করব না? সারাদিন হাটঁতে হয় না? দুই হাতে ৩০ থেকে ৪০ কেজি মাল নিয়া, রোদের মধ্যে ঘুইরা ঘুইরা বাড়ী বাড়ী যাইয়া, তারপর কাস্টমার পাওয়া লাগে, ব্যাথা করব না? ভোদাইয়ের মত কথা কন কেন?’ যাকে বলা হয়েছে সে সম্ভবত আসলেই ভোদাই হয়ে গেছে, কেননা কোন জবাব শোনা যায় না। অথবা মিনমিন করে কোন জবাব দিলেও সবার হৈচৈ-কথাবার্তার উচ্চশব্দে  তা শোনা যায় না। আমার কৌতূহল হলে মাথা উচুঁ করে, ততটুকু যাতে রেখাপাকে দেখা যায়, জোরে বলি, “রেখাপা বাড়ী বাড়ী মানে? বুঝলাম না, আপনে কি করেন?”

প্রায় ৪৫ সেকেন্ড পর জবাব দে সে, এতক্ষণ কথা বলার অবস্থা ছিলনা মুখে পাইপ দিয়ে মাল টানতে থাকায়, তদুপরি টান শেষ হলে কাল ঠোঁট থেকে পাইপ নামিয়ে সামনের রাংতা কাগজের ওপর থেকে বিড়ি নিয়ে, মুখভর্তি দীর্ঘ টানের পর আরো কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রেখে পেছনের মটিতে হেলান দিয়ে, কিছুক্ষণ স্থির নিশ্চল বসে থেকে গলগল করে একরাশ ধোয়া ছেড়ে ধাতস্থ হয়ে বলে, ‘হোম সার্ভিসের কাজ করি। আমরা বিভিন্ন মহল্লায় মহল্লায়, বিভিন্ন বাড়িতে। মনে করেন, মেমসাহেবগো অনেকেরাই বাইরে যাইতে পারে না,’ বলতে বলতে কেন যেন একটু হেসে এবং দ্রুত তা থামিয়ে আবার বলতে থাকে, ‘হেগো কাছে তেল-সাবান, পেষ্ট-কলম এরকম অনেক রকম মাল বেচি।’

হাতের পান্নি সামনে নীচে রেখে তার দিকে ঘুরে বসি ভালভাবে, ‘আচ্ছা এই যে বিভিন্ন অপরিচিত বাসায় যান, কাউরে চিনেন না, এতে কোন সমস্যা হয় না। চোখের কোনে বিশেষ ইঙ্গিত ফুঁটিয়ে তুলে জিগ্যেস করি। সে তা লক্ষ্যও করে না, আমি দেখি। সে বলে, ‘অসুবিধাতো হয়ই, কত রকম অসুবিধা।’ আমার ভেতরের সেই অদম্য, নির্মল, অস্থির, নিষ্পাপ, আর একই সাথে ক্রুর কৌতুহল জেগে উঠে। আমি জিগ্যেস করি, ‘আচ্ছা আপনার ডেইলি রোজগার কত ─ মানে গড়ে আর কী?

‘এইটার কোন ঠিক নাই, কোন কোন দিন ৪০০/৫০০ হয়। আর শুক্রবারে সাহেবরা বাসায় থাকে, সেইদিন ৮০০/৯০০ হয়, বা, হরতালের দিনও বেশী হয়। কোন ঠিক নাই,’ কথা শেষ করে আবার পাইপ মুখে তুলে নেয় সে।

আমার পাইপ-পান্নি এখনো নিচে, হাতে তুলে নেয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু আমার মাথায় অন্য চিন্তা। অন্য প্ল্যান, অবশ্য প্ল্যান বলা যায় না বোধহয়। কারন এসব ক্ষেত্রে আসলে আমার কোন প্ল্যান থাকে না। শুধু মানুষের কথা শুনতে চাওয়ার হৃদয়ের অদম্য বাসনা। তাকে জানতে চাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা। চিনি না, জানি না, রাস্তায় পরিচয়; অথচ তার জীবনের সব, স-ব, জানার অদম্য, অকেজো, আন্তরিক ইচ্ছা। কিছুটা প্রতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে, ফালতু আত্ম-প্রবঞ্চনা আরকী আমি ভাবি ওকে নিয়ে একটা ফিচার লেখা যায় ‘কর্মজীবী নারীর হাসি-কান্না’ বা ‘দারিদ্র্য রেখার সংগ্রামের ইতিহাস,’ এমন কোন নাম দেয়া যায় যার সাথে যাবে রেখাপার দুই হাতে মোট ৪০ কেজী ওজনের ব্যাগ হাতে, প্রাক্তন বিশ্ব সুন্দরী থেকে শীর্ষ নায়িকার গোলাপী গালের মত গোলাপী সাবানের বিশাল সাইবোর্ড ব্যাকগ্রাউন্ডে নিয়ে রেখার ক্লান্তিহীন মুখশ্রীর ছবি। নীচে ক্যাপশন, ‘নারীর ক্ষমতায়নের দীর্ঘ সংগ্রামী ইতিহাসের এক সাহসী….. বালছাল,’ চিন্তার ভন্ডামীকে সহ্য করতে না পেরে আমার ভেতরটা ভাবনার বাক্যটা এভাবেই শেষ করে।

এসব প্ল্যান, করতে করতে আবার মাথা ও গলা উচুঁ করে রেখাপাকে বলি, ‘রেখাপা আপনের সাথে আমার কথা আছে। মাল খাওয়া শেষ হলে বাইরে টেকিতে গাছতলায় একটু নিরিবিলি বলতে চাই।’

আমার প্রস্তাবের পুরা অর্থ, অল্প-আধা-পুরা কোনটাই, জানতে না চেয়েই বলে, ‘ঠিকাছে বলা যাবে, আমার আর মাত্র ১০ মিনিট লাগবে। আপনার কি অবস্থা।

‘আমার তার আগেই হয়ে যাবে,’ বলে একটু থেমে কিছু একটা ভেবে যোগ করি, “কথা মানে, আমি আপনার সাক্ষাৎকার নিতে চাই। মানে, এই যে হোম সার্ভিসের কাজ করেন, এতে আপনার কী কী সুবিধা অসুবিধা হয়, কী কী বাজে অভিজ্ঞতা বা কী কী ভাল অভিজ্ঞতা (যদি সেটা সত্যিই হয়ে থাকে) হয়। ধরেন কোন বাড়িতে গেলেন তখন সেখানে ৩/৪ জন পুরুষ আছে শুধু, তারা আপনার সাথে তখন কেমন ব্যাবহার করে- এই সব আর কী?”

রেখাপা কোন জবাব না দিয়ে ইঙ্গিতে, ‘কোন অসুবিধা নাই আলাপ করা যাবে’ জানালে আরেকদিক থেকে একজন জিজ্ঞেস করে, ‘আপনে কি সাংবাদিক? কি ধরনের ফিচার লেখবেন? ফিচারের নাম কি? কর্মজীবী হিরনচী?

লোকটার কথায় মাথায় রক্ত চড়ে গেলেও, একমাত্র ইশ্বরই জানে কীভাবে লোকটা আমার গালির হাত থেকে সে বাঁচলো, তাও আবার মাল খাওয়ার পর মানসিকভাবে যখন আমি চেঙ্গিস খান।

শান্তভাবে, কন্ঠস্বরে আমার ভেতরের রক্ত টগবগ করা রাগ সামান্য বুঝতে না দিয়ে, আড়চোখে রেখাপার ব্যথিত চোখজোড়া একবার মুহুর্তের ভগ্নাংশের জন্য দেখে নিয়ে, আমি লোকটাকে বলি, ‘শোনেন ভাই এখানে যে ১৫/১৬ জন আছে তারা সবাই-ই কর্মজীবি হিরনচী, পার্থক্য শুধু চোর আর গাঁটকাটার । কেউ ভীড় বাসে কাজ করে, কেউ ভিক্ষুকের বেসে ভদ্রলোকদের বাসায় ভাত চাইতে গিয়ে সুযোগ বুঝে কাজ করে। এমনও আছে ৮/১০ বাসায় ঘুরে ঘুরে ভাত ভিক্ষা করে, আড্ডায় এসে ৭/৮ টাকায় প্যাকেজ বিক্রি করে, সেই টাকায় মাল খায় ─ কর্মজীবী, হঁহ্। আপনেত সিনজিতে ফিটিং দেন। (লোকটাকে আমি আগে থেকে চিনতাম। একদিন আড্ডায় পাশাপাশি বসে মাল খাওয়ার সময় লোকটা তার পাশের বন্ধুর সাথে কিভাবে ‘সিনজি নির্জন গলিতে নিয়ে ছিনতাই করে টাকা নিয়ে নেয় সে গল্প করছিল। আমি পাশ থেকে শুনছিলাম। অবশ্য সেও আমাকে চেহারায় চিনে, তবে পেশা জানেনা) ঐটাও কর্ম। কাজের হিসাব করলে আপনার চেয়ে ১০ গুণ বেশী মর্যাদাবান কাজ করেন উনি।  ‘কর্মজীবি হিরনচীর’, কাজেই, ইন্টারভিউ নিতে হলে আগে আপনারটা নিতে হয়, বুঝছেন? সিএনজির ব্যাপারটা আমি কিভাবে জানি এটা ভেবে সম্ভবত লোকটা বিস্মিত, বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে লোকটা জিগ্যেস করে, আমার কথায় সবাই হেসে উঠেছিল বলে কিছুটা লজ্জ্বিত ভঙ্গিতে, না, মানে কী নিয়া ফিচার লেখবেন সেইটা জিগাইছিলাম আর কী’।

সেটা ভালভাবে বললেই হয়, আমার ফিচার হবে ‘কর্মজীবী নারী’, মানে কাজ করতে গেল মেয়েদের বিশেষ করে উনার কী কী অসুবিধা হয়, সরকারের কাছে তাদের কোন দাবী আছে কি না এইসব নিয়ে। এছাড়া ফজলে হাসান আবেদ বা খুশী কবির, এদের কাছ থেকে কি করলে সমাজের এই সেন্টারের উন্নতি হবে সে ‘ব্যপারেও কমেন্ট থাকবে। ক্রেতাদের আচরণ সুন্দর না কুৎসিত এই সব নিয়ে।’ লোকটা আর প্রশ্ন করে না, চুপ করে থাকে।

এদিকে আমার খাওয়া শেষ হলে আমি রেখাপাকে জিগ্যেস করি, ‘আমার তো শেষ আপনার আর কতক্ষণ লাগবে। এই তো আর দশ মিনিট। মিনিট পাঁচেক (এখানকার পার্মানেন্ট লোকদের ভাষায় টেকির আড্ডা, নামের উৎস/অর্থ আল্লা  এবং হয়ত কোন বিশেষ জেলার লোকেরাই জানে) আগে দেয়া একই জবাব দেয়।

আমি বাইরের চায়ের দোকানে আপনে তাড়াতাড়ি শেষ কইরা আসেন, আমি কিন্তু আপনের লেইগা অপেক্ষা করতাছি। আইসেন কিন্তু।

রেখাপার সাথে পরিচয় মাস চারেকও নয়, তখন, সেলসের এইসব আড্ডা (বিশাল ঢাকা শহরের তৎকালীন  বৃহত্তম বিয়েনপি বস্তির স্থলাভিষিক্ত বর্তমান মাঠে) ছাড়াও রেডিও অফিসের পশ্চিমের একতলা ছোট মসজিদের পাশের ১২/১৪ ঘরের ছোট বস্তির প্রায় সব ঘরেই বসত। ঐ সব ঘরের খালারা মূল সেল থেকে মাল কিনে ১০ টাকা বেশী দরে বিক্রি করে নিজেদের ঘরের আড্ডায় বসাত। এছাড়া পাইপের মালিকানা তাদের, এবং তাদের পাইপে খাওয়া বাধ্যতামূলক। (কেননা পাইপের ভেতরে জমা মাল পাইপ খোলার পর বিক্রি করে তারা বাড়তি উপার্জন করত।) পলিথিনের বেড় দেয়া আড্ডা থেকে বস্তির ঘর অনেক অভিজাত  বলে, অনেকেই সেখানে যেত, এই বস্তির এক বুড়ি খালার ঘরে একরুম (হোগলার বেড়াঅলা বস্তিঘরটাকে সাবলেট দেয়ার জন্য মাঝখানে হোগলার বেড়ার পাটিশন দিয়ে, দুই রুম করা হয়েছে) ভাড়া নিয়ে স্বামীসহ থাকে রেখাপা। তো, সেই বুড়ী খালার আড্ডায় প্রায়ই যেতাম। মাস দুয়েক আগে বস্তির আড্ডাগুলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত। তখন দেখা হলেও, ‘কেমন আছেন? ছাড়া আর কোন অর্থহীন, নির্মম, যন্ত্রনা বাড়িয়ে দেয়া কুশল বিনিময়ের ছদ্মবেশে এমন কোন, বা আদৌ কোন কথা হতো না, তাও জবাবের জন্য খুব একটা আগ্রহ আছে বলে মনে হত না, সেরকম বিশেষ স্বরে। তবে উনি খুব নিখুঁতভাবে তিল্লি কাটঁতে পারতেন। আড্ডার কর্মচারী রাসেল ছিল অকর্মার ঢেকি। আড্ডার ছেপ-কফ ভর্তি কনডেন্সড মিল্কের ডিব্বা পরিষ্কার থেকে শুরু করে ঝাড়ু দেয়া পর্যন্ত সব কাজই দেখতাম রেখাপাকে শব্দহীন করে যেতে। স্বল্পবাক শব্দটা উনার জন্যই, আমার তখন মনে হত।

উনার জামাই ছিল বেকার হিরনচি। ফলে রেখাপাকে একাই দুইজনের মালের টাকা যোগার করতে হত। বুড়ীখালার আড্ডায় তখন জিগ্যেস করি নাই কিভাবে জোগাড় হত। মনে মনে আমি ভেবে নিয়েছিলাম, সম্ভবত: বেশ্যাবৃত্তির মাধ্যমে।

এখন, আজ জানলাম, তার হোম সার্ভিসের পেশার কথা।

আড্ডাগুচ্ছের এক কোনায়, চত্বরে গায়ে ঝোলান-সস্তা বিস্কিট-ও-মোয়াসহ ফ্লাক্সভর্তি চা নিয়ে বসে আছে তিনজন ভ্রাম্যমান দোকানদার। ভ্রাম্যমান, কেননা র‌্যাব বা পুলিশের রেইড পড়লে, আড্ডার মালিকদের পলিথিনের বোঁচকা ও বাঁশের খুটি মাথা নিয়ে দৌড়ের মত এইসব চায়ের/সিগ্রেটের দোকানদারদেরও দোকানের মালসদায় মাথায় নিয়ে উত্তরমুখী বিয়েনপি বাজারের দিকে দৌড়াতে হয়।

চা খেয়ে তারপর ১টা সিগ্রেট শেষ হয়ে এলেও রেখাপার আসার নামগন্ধও নাই দেখে, আমি আবার মান্নান ভাইয়ের আড্ডায় যেয়ে উঁকি মারি, আমাকে দেখেরেখাপা জবাব দেয়, ‘ইট্টু খাড়ান বাইরে আইতাছি। আর ২ মিনিট।’

এবার সত্যি সত্যি ২ মিনিটের মাথায় রেখাপা বেরিয়ে আসে। আমি বলি, চলেন রেডিও অফিসের পাশের গ্যারেজের অপজিটে হোটেলে বসে আলাপ করি। রেখাপা সম্মতি দেন।

২১ বছর বয়সী রেখাপার জন্ম টাঙ্গাইলের মীর্জাপুর থানাধীন কড়াইলপাড়া ইউনিয়নের সুলতানা গ্রামে। রেখাপা যখন তার মার গর্ভে ৩ মাস বয়সী, তখন বাবা মাকে ফেলে পালিয়ে যায় আরেকজনকে বিয়ে করে। রেখাপার দাদা, অবশ্য, চোধুরী বংশের ছেলে হয়ে ২য় বিয়ে গেরস্থ বাড়ীর মেয়েকে করায়, ছেলেকে ত্যাজ্যপুত্র করেন। এদিকে স্বামী-পরিত্যক্ত রেখাপার মা-বাবার বাড়ীতে আশ্রয় নিলে তার বড় হওয়া সম্পন্ন হয় নানা বাড়ীতে। জীবনে ২/৩ বারের বেশী দাদাবাড়ী যাননি। ত্যাজ্যপুত্র হওয়ার পর বাবা ঘরজামাই হিসেবে থাকতে শুরু করেন এই জেলার নগরপুর থানাধীন সালিমাবাদ গ্রামে। রেখাপার নানাবাড়ীও আবার একই থানার বাওসাইদ গ্রামে।

খুবই ছোটখাট, মাত্র তিনটা কাঠের টেবিলের হেলান দেয়ার সুবিধাঅলা বেঞ্চসহ, জীর্ণশীর্ণ একটা হোটেল। টেবিলের চারপায়ের সাইজ বিভিন্নরকম বলে কোন কোন পায়ের নিচে ইটের ঠেক দেয়া, দুইপাশে হোগলার বেড়া। সামনে, হোটেলে ঢোকার মুখে, ডানদিকে ক্যাশিয়ার। ক্যাশ ম্যানেজার মান্ধাতা আমলের একটা ক্যাসেট প্লেয়ার, মূল স্বর-সুর থেকে বহু দূরবর্তী, অদ্ভুত, গুম গুম করা সাউন্ডে বাজাচ্ছে চলতি হিন্দি হিট। মাটির মেঝের উপর শুধু দুপাশে হোগলার বেড়ার হোটেল। পেছনের রান্নাঘরে সশব্দে শোঁ শোঁ জ্বলছে কেরোসিনের চূলা। রান্নাঘর আর এপাশের টেবিলগুলার মাঝখানে, একপাল্লা নাই এমন, মিটসেলফের পার্টিশন। মোট তিনটা শেলফে থরে থরে বড় গামলায় সাজান বিভিন্ন ধরনের রান্না করা তরকারী, মাছ-মাংস, ডাল, প্রচুর তেলে ভাসতে থাকা লালচে-সোনালী তীব্র রঙ্গিন ঝোলঅলা বিশাল গামলায় তেলে ভাসা মাছের তরকারী। মিডিয়াম সাইজের ডেকচিতে ডাল, এককোনায় একজন ভাত খাচ্ছে টিনের প্লেটে। ম্যানেজারের সামনের টেবিলে বিশাল রূপালী গামলায় শাদা ভাত।

বাইরে রোদের তেজ আর রঙ ক্রমশ মিয়মান, আর মলিন হয়ে আসছে চারপাশ। বিকাল হয়ে গেছে আরো আগে। তবু চারপাশ যেন দুপুরের প্রচন্ড গরমের ঘোর থেকে এখনো বেরতে পারে নাই। কেমন ঝিমধরা পরিবেশ। হোটেলে বিপরীত পাশে রাস্তার ওপারে ইসমাইল ভাইয়ের মটর সারাইর গ্যারেজ থেকে আসা বিরতিছাড়া তীক্ষè যান্ত্রিক শব্দ আর হাতুড়ির আওয়াজ সত্বেও কোনার টেবিলের কোনার চেয়ারে বসে রেকাপা শেলফের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসা।

যাই হোক, রেখাপার কথা শুনছিলাম। দুজনের সামনে চায়ের কাপ, অনুরোধ করেও অন্য কিছু (পুরি, সমুচা) খাওয়ান যায় নি তাকে।

‘জানেন জন্মের পর ১১ বছর বয়সে প্রথম বাবারে দেখি।’ ‘এমনত হতেই পারে, অনেকেরই হয়, কেউ কেউত জীবনেও দেখে না,’ আমি হাসতে হাসতে বলি, ইচ্ছা করেই তার প্রতিক্রিয়া জানতে। সহমর্মীতা, নিষ্ঠুরতা এমনকি ভালবাসাও অবসর সময় উত্তেজনায় ও বির্তকে কাঠানর জন্য এসব আমি জানি। কাজেই অন্য কোন কোমল মন্তব্যেও বাস্তবতার কোন হেরফের হয় না বলে, আমার কোন ‘মানবিক’ আদিখ্যেতাও ছিল না। তার প্রতিক্রিয়া দেখতে চাইছিলাম, তার চোখে চোখ রেখে। আশ্চর্য, উনি আমাকে বুঝতে পারলেন। অন্তত: এতটা আশা করিনি। হতচকিৎ অবস্থা কাঠিয়ে ওঠার পর্যাপ্ত সময় দিয়ে, শুধু ঠোঁটের কোনে র্দুবোধ্য একটা হাসি আর চোখে প্রশ্রয় নিয়ে অপেক্ষা করে সে, আমার বিস্ময়বোধ আত্মস্থ হতে শুরু করলে (তখন আর চোখে চোখ ছিলনা, আমার দৃষ্টি তখন টেবিলের একটা ফাটল বেয়ে নিচ থেকে উপরে উঠে আসা পিঁপড়ার  উপর) তাকে বলতে শুনলাম।

‘এর মধ্যে বাবা মাঝে-মধ্যে জামা-কাপড় বা টাকা পাঠাত তবে কখনো আসত না। জড়তায় শরমে আর দ্রারিদ্র্যের কারণে। বছরে দুইবার দুই ঈদে। আমরা শুধু জানতাম, আর দেখতাম, বাবা টাকা পাঠিয়েছে। জানেন? অনেকদিক পর্যন্ত আমি বাবা অর্থ বুঝতাম না। ক্লাশে মেয়েদের মুখে বাবা শব্দটা শুনতাম, সবার আছে অথচ আমার নাই বলে খারাপ লাগত। মাকে জবাব-না-পাওয়া প্রশ্ন করতাম। নানাকে বাবা ডাকতাম এর জন্য মা খুব রাগ করত, মাঝে মাঝে মারতও, কিন্তু বাবা মানে আসলে বুঝতাম না। আর এই বুঝতাম যে না এটা জানতাম বলে। লজ্জ্বাও লাগত। তাই কাউকে জিগ্যেস করতেও পারতাম না। বিয়ের পরে আসলে আমি বাবা মানে বুঝি। মানি মানুষ কেমনে বাবা হয়। খালি সেইটা না।’

এটুকু বলে রেখাপা কেন যেন আমার চোখে চোখ রেখে তাকায়, আমি তার চোখের ভাষা বুঝতে পারি, আশা নিয়ে, যেন আমি বুঝি প্রজনন ছাড়া আরো কী কী অর্থ সে বোঝাচ্ছে। আমি কী বুঝি। আমি কী আদৌ কিছু বুঝি। সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ হলেও, আমি শুধু চোখের ভাষায় জানিয়ে দেই আমি বুঝতে পারছি; ইঙ্গিত করি তাকে চালিয়ে যেতে।

বাবা চাকরী করতেন সাভারের এক গার্মেন্সে। সেই ৭/৮ বছর বয়সে, যখন আমি আজকের এই লাথখোর আমি না, বাবাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করত তখন। যদিও মা মাঝে মাঝে বলত আমার একজন বাবা আছে। বলত, তোর আরেকটা মা আছে, তার সাথে থাকে। আবার কয়েকদিন আগের বলা কথা নিজেই ভুলে গিয়ে, কেন তা জনি না, বলত শহরে চাকরী করেত, হিয়ার লাই আইতম পারে না। আবার কখনবা সত্য-মিথ্যার বিভেদরেখাকে এমুড়ো-ওমুড়ো চিরে বলত, শহরে চাকরী করেতো তাই ঐ বাড়ীতে থাকে, এসব যে সাত্বনা তা আমি বুঝতাম বলে খুব কাঁদতাম তখন। মাঝে মাঝে নানাকে ‘বাবা’ বলে ডাকতাম, নিজের আনন্দের জন্য, কী যে ভাল লাগত! কিন্তু, ঐ যে বললাম মা বকা দিত। কিন্তু, মা তো জানেনা। শুধু মা কেন দুনিয়ার কেউ জানেনা। জীবনেও কাউকে বলি নাই, কেন জানি না আজকে ৩২ বছরের মাথায় আপনারে বললাম, কারণ যাই হোক, বলতে ইচ্ছা হইছে বললাম। লাভ না হোক, লস তো নাই।

হস্তক্ষেপ করে কিছু বলার ভঙ্গীতে হাত তুলে আমার মনে মনে তৈরী করা সংলাপটা ও শেষ দু’বাক্যে বলে ফেললে, আমি হঠাৎ কী বলব সেই কথা খুজে না পাওয়া মানুষের  অস্বস্তিকর নীরবতার মধ্যে পড়ে যাই। রেখাপা তা বুঝতেও পারে; আমাকে ধাতস্ত হওয়ার সময় দেয়। চুপচাপ অপেক্ষা করে।

হোটেলের লোক সংখ্যা একটু বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন টেবিলের অসমান পায়ের ইট ও ইট জাতীয় কিছু দেয়ার ─ একটা টেবিলের নীচে দেখলাম কাগজের ঠেক ─ পরও খট্খটানিও বেড়েছে। বেড়েছে শোরগোল, ম্যানেজার হাঁকডাকের সাথে সাথে বেড়েছে তীব্র চকচকে ও প্রচন্ড রঙীন বিভিন্ন তরকারীর বিতরণ। রেখাপা কিছু খাবেইনা।

‘সমস্যা কী টাকা?’

সে ম্লান হেসে জানায়, ‘রিপন আসুক এক সাথে খাব, তাছাড়া, এখন, একটু পর তো আবার যায়া বাসায় রান্না করব।’ আমরা প্রথম বসার সময় করা নির্ধারিত শর্তসমূহ ─  আবার বলতে গেলে, বলা সে শুধু মাথা নেড়ে হু-হাঁ করে জানাচ্ছিল ─ অনুযায়ী এখন একষ্ট্রা এক ঘন্টা পেরিয়ে গেছে; রেখাপা তা আমাকে মনে করিয়ে দেয় না, হাসি মুখে অপেক্ষা করতে থাকে আমি কী বলি।

রেখাপা যখন লাভ লসের কথা বলছিল একটু আগে তখন থেকেই একটা সংলাপ মাথার মধ্যে ঘুরছিল। বলতে চেয়েও না বলে, আলতু-ফালতু কথা বলছিলাম। তারপর একসময় আবার সেই কুৎসিত ‘কোথায় হাত রাখবো বুঝতে না পারা নীরবতা’ নেমে এল দুটা প্রাণের মাঝে; ‘আমি বলতে চাই’ আর ‘আমিত শুধু শুনব এই ২ সম্মিলিত ইচ্ছা মাথা কুটে মরছে কে জানে কার পায়ে।

হঠাৎ কোন প্রসঙ্গ ছাড়াই, যেন হঠাৎ মাথায় এল প্রশ্নটা এমন ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বলি ‘লাভ আছে’, এবং বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করি, এতক্ষণ আমি যা ভাবছিলাম তা ভুল, রেখাপা ঠিকই ধরতে পারে, পাঁচ মিনিট পর বলা পূর্বের প্রসঙ্গের কথাটা। তার অভিব্যক্তিহীন চেহারা দ্রুত যেন কোন প্রশ্ন শোনার অপেক্ষায় আছে, এমন ভঙ্গি থেকে বিষন্ন থেকে মলিন হয়ে অবশেষে হাসিমুখে পরিণত হয়, একটা ড্যান্স হলের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিবর্ণ কিন্তু প্রচন্ড রঙীন রঙের মত দ্রুততায়। হাতে একটা খালি গ্লাস নিয়ে গ্লাসের ভেতরে তাকিয়ে বলে, ভাইয়া আমি অন্যের মাল খাইনা, মিথ্যা বলছে কি না তা নির্ণয়ের প্রচলিত পদ্ধতিতে আমি সত্য টের পেয়ে বিস্ময়ে অবাক হয়ে যাই।

এই গল্প সমাজের খুবই নির্দিষ্ট ও অল্প কিছু বিষয়ে জানা পাঠকের জন্য না, কেন না? অত কথা বলার, টাইম নাই বিস্মিত হয়ে যাওয়ার কারণ যারা বুঝতে পারবেন তারা এও বুঝবেন এই বিশেষ সমাজে কতখানি দূর্লভ, তার মত মেয়ে দূর্লভ, হাজারে একজন। তাও আছে কি না সন্দেহ!

‘আপনে ভুল বুঝছেন, লস্ নাই মানে আপনের না, আমার কথা বুঝাইছি আমি,’ হাসিমুখে আমি বলি। রেখাপা তার নিজস্ব প্রকাশভঙ্গিতে লজ্জা পেয়ে, দ্রুত সামলে স্বাভাবিক হয়ে চলতে থাকা আলাপের প্রসঙ্গে আবার কথা শুরু করে।

‘মায় তো জানে না। বললাম না কেউ জানত না কেন। কেউ জানত না শুধু বাবা ডাকতে পারলে, সে যাকেই ডাকি না কেন, আমার মন কী যে গভীর আনন্দে ভরে যায়।’

প্রয়োজনীয়, এক্ষেত্রে, সময়েরও কম চুপ করে থেকে আবার বলতে থাকে, ‘আমার স্বামী একজন মোটর সারাইর গ্যারেজের মেকানিক। মনে করেন, প্লেন ছাড়া সব গাড়ি চালাইতে পারে। আমার স্বামীর মত মানুষ হয় না। আমি জানি তার গল্প শুনে আপনে তারে একটা অমানুষই বলবেন, তবু বললাম। না বললে আপনে জানবেন কেমনে আপনের ধারনা ঠিক না? আর আমার চেয়ে বেশি তো আপনে তারে চিনেন না, বেশি কী, চিনেনই না। আমি তো তারে চিনি। যে তারে চিনবে সে তারে ভাল না বাইসা পারবে না। কিন্তু সে কাউকে বাসে না। বাসবেও না, আমাকেও না। কেন ভালবাসে না? ও আমার জন্য খুব কষ্ট পায়।

‘বুঝলাম না, তাহলে তো আরো বেশী করে ভালবাসার কথা। মমতার গলিপথ দিয়েই তো, আমি যদ্দুর বুঝি রেখাপা, প্রেমের রাজপথে, পোঁছায় মানুষ। আপনের জন্য একজন কষ্ট পায় আর আপনাকে একজন ভালবাসে এর মধ্যে তফাৎ কী?’

‘তফাৎ আছে।’

অপ্রতাশিত, আমার ধারনার সম্পূর্ণ বিপরীত এ মতবাদ শুনে প্রথমে হতচকিত হয়ে গেলেও, তাৎক্ষণিক কোন ব্যাখ্যা না চেয়ে, নিজের জীবনে লব্ধ অভিজ্ঞতার স্মৃতিভান্ডার ঘেটেই হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারি রেখাপার কথার মানের সত্যতা, বাস্তবতা। অথচ, হায়! নিজের সেই স্মৃতি থেকেই আসল বিস্মিত হয়ে জানতে পারি, গত ছয়  বছর ধরে তা বুঝিনি। বিভিন্ন মিশ্র অনুভূতির খিচূড়িকে শাদা ভাত জেনে এসেছি এতদিন। কিন্তু সে ভিন্ন প্রসঙ্গ । কিন্তু বাস্তবে সাতমন  তেলও পোড়ে না রাধাও নাচে না; আজকাল।

‘একদিন ছাদে বসেছিলাম দুপুরের রোদ পোহাতে। আমাকে নিচে ঘুমাতে পাঠাল। কড়া রোদে আমি অসুস্থ হতে পারি এই অজুহাতে। গরম প্রচন্ড ছিল সেদিন, ফ্যান ছেড়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। একসময় ঘুমিয়েও পড়লাম। কতক্ষণ পর জানিনা, প্রচন্ড গরমে ঘেমে ঘুম ভেঙে গেল আমার। চেয়ে দেখি ফ্যান বন্ধ, ওয়ার্ডডোরের সামনে দাঁড়িয়ে, মোম জ্বেলে ও কী যেন করছে। দরজা-জানালা বন্ধ করা রুম ধোঁয়ায় ভর্তি, আর জীবনে ৩য় বারের মত নাকে এস ঢুকল সেই গন্ধ। ডাইল-তামুক তো ও আমার সামনেই খাইত। আমার মন বলে উঠল,‘ঐ যে কৈছিলাম বুকটা ছ্যাত্ করে উঠার দিন, এইটা সেই নেশাদ্রব্য, মদও আমি চিনি, তবে ইঞ্জেকশনের কথা শুনলেও তখন চিনি না, কিন্তু এইটা যে ইঞ্জেকশন না, তা বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় বাস্তব জ্ঞান আমার ছিল। তাইলে? বাকি থাকে কোনটা। এইটা তাইলে কী নেশা!

প্রথমদিকে বাসত, রেখাপা আবার শুরু করে। এখনও বাসে, শুধু চোখে তা বোঝা যায়, কিন্তু অন্য কোনভাবে প্রকাশ করে না, বরং উল্টোটাই করে, আর এখন যেইটা বাসে সেইটা অন্যরকম ভালবাসা। সবাইরে মানুষ যেইটা বাসে। সাধারণ ভালবাসা এখন সে হিরনচী হোক আর যাই হোক, সে তো অন্যদের মত চুরি বা ওরকম কাজ করতে যায় না, বেড়ায় মৈরা যাইব, তবু আমার লেইগা শুইয়া থাকব; কহন আহুম, কারো কাছে তো হাতও পাতে না, আমি ফিরলেই ফেরত দিয়া দিমু জাইনাও।’ যেন প্রমান দেখাচ্ছে স্বামীর ভালত্বের এবং আমার না মানার, আমার স্বভাবজাত সংশয়ের পক্ষে কোন যুক্তি খুজে পাচ্ছে না সে ─ এমনভাবে জবাবের দাবীতে চেয়ে থাকে রেখাপা।

সত্যিকার আন্তরিকতায় আমি বলি, ‘না, না খারাপ হবে কেন? সে একজন ভাল মানুষ এটা হতেই পারে, যদিও ততক্ষণে লোকটা সম্পর্কে  আমার আগে ভালই আইডিয়া আছে বউয়ের আয়ের উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল, বস্তির বাড়ি ভাড়া, বাজার-সদায়, পরার কাপড়, পকেট খরচ সবসহ-একজন অমায়িক হিরনচি সে। রেখাপার মূল দাবীগুলো সত্য। সব আমি বুড়ি খালার আড্ডায়, যার  বস্তির বাড়িতে হোগলার বেড়ার পার্টিশন দিয়ে আলাদা করা রুমে সাবলেট থাকত রেখাপারা, তখনই খেয়াল করেছি।’

‘নানার ইচ্ছায় দশ বছর বয়সে খালাত ভাই রফিকের সাথে বিয়ে হয় আমার,’ একটু থেমে, দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে না ছেড়ে, ‘জন্মটাও দুঃখের বিয়েটাও সুঃখের হল না।’ তার চোখ বা চেহারা থেকে ভেতরের বর্তমান ভাবনা বা অনুভূতি বুঝতে চেষ্টা করতে করলে শুরু করলে, সে আমাকে পড়ে ফেলে, এবং ক্রুজ মিসাইলের মত প্রশ্নটা মানসিকভাবে আমার জন্য সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত আমাকে করে বসে, ‘পৃথিবীতে এমন হল কেন?’

নিশ্চুপ।

চোখে ‘মানে?’ প্রশ্ন নিয়ে।

‘এই যে সবাই সবার যার যার নিজের স্বার্থের কথা ভাবে?’

আবারো নিঃশ্চুপ।

তাকে দেবার মত কোন জবাব স্টকে নাই বলে।

আমি লক্ষ্য করি সকল জড়তা, যা ভাণ অন্ততঃ রেখাপার ক্ষেত্রে, কাটিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করে ফেলেছে সে নিজেকে মেলে ধরার জন্য, এবং তা আপাদ-মস্তক। আমি নড়ে চড়ে বসি। এরপর থেকে আমি প্রশ্ন করা একদম বন্ধ করে দেই, ক্লেয়ারিফাই হওয়ার জন্য দু’য়েকটা ছাড়া, তা-ও সংক্ষেপে, এতক্ষণে নিজে নিজেই এক কাপ চায়ের অর্ডার দেয় সে। তার কাছে যে কোন টাকা নাই, এটা ইতোমধ্যে, অনেক আগেই আমাকে জানিয়েছে। আমি, খুব সতর্কভাবে সাথে একটা পরাটা নিতে বললে, মুখে কিছু না বলে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে রাজীও হয়।

‘নানার ইচ্ছায় বিয়ে হয়েছিল। আগেই তো বলেছি, আমি বিয়ের পর সাবালক হয়েছি। ভালবাসাত ছিল, বললাম না? এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, ভালবাসা তো দূরের কথা….বাক্য শেষ না করে কিছুক্ষণ থেমে থেকে, ‘একটা যন্ত্রের মত গাড়ির ইঞ্জিনের… আবারও বাক্য শেষ না করে, ভাবলেশহীন মুখে শুণ্য চোখে কিছুক্ষণ বসে থাকে।

প্রথম মাসিক হওয়ার দেড় মাসের মাথায় পেটে সন্তান আসে। ও তখন আমার চেয়ে ২০ বছর বড়। ততদিনে নানা মারা গেছে। আমাদের কোন উপায় ছিল না… স্লোমোশনে বাম চোখ থেকে প্রথম অশ্র“র ফোঁটাটা নামা শেষ হওয়ার আগেই, ‘নষ্ট করে ফেলতে…’ বাক্যটা বলতে যেয়েও শেষ করতে পারে না রেখাপা। আমি হাত বাড়িয়ে দিয়ে ফালতু সান্তনার চেষ্টা করি। কোন লাভ হয় না। নিঃশব্দে ঝর ঝর করে ৩ মিনিট কাঁদে রেখাপা। তারপর সামলে উঠে, আমার সাজেশনে মুখ ধুয়ে ধাতস্থ হয়ে বসে। নির্বাক অপেক্ষা করতে থাকি আমি।

হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গীতে, জানেন! মাঝে মাঝে এইসব কথা ভাবতে ভাবতে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কোন খেয়াল ঠিক থাকে না, তিনবার গাড়ির তলে পড়তে নিছিলাম। একবার তো একটা জীপের নিচে প্রায় পড়েই গেছিলাম, ড্রাইভার কড়া ব্রেক করায় খালি বেঁচে যাই। লোকটা ভাল ছিল। কোন গালি দেয় নাই, জ্ঞান থাকা পর্যন্ত অন্তত:। ধাক্কা খেয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে মেইন ব্যথা লাগে মাথায়, ৩ দিন তো হুঁশ ছিল না, ঘরেই ছিলাম।

আবার, প্রসঙ্গ পাল্টে, আমার স্বামীও মাল খায়, এইটাত জানেনই। অথচ ঘটনা কী জানেন? ও হিরনচী সহ্য পর্যন্ত করতে পারত না। কে যেন একবার আমারে কইছিল, ─ ‘যে নিন্দে তার গায়েই বিন্দে’ ─ কথাটায় মজা পেয়ে তখন হাসছিলাম, আসল মানে খেয়াল করি নাই। আমার জীবন দিয়া এখন করতাছি। আমি নাইলে খেয়াল করি নাই, করলে প্রথমেই সাবধান হইতে পারতাম; কিন্তু, কথা হইতেছে কেউ না কেউ তো আছে যে শোনার লগে লগেই করব। আসল মানে বোজবো, যে বলছিল তারে সালাম।

‘শেষ ৩টা বাক্য শুরু করার পর থেকে কান খাড়া করে গভীর মনযোগে তার উচ্চারিত প্রতিটা শব্দ-বাক্য শুনছিলাম। ‘আশাবাদী-হতাশাবাদী’ জাতীয় অর্থহীন ফালতু কথাবর্তার পুটকি মারি আমি,’ ভাবতে ভাবতে  আত্মার গভীর ভিতরে পাহাড়ের চূড়া ঢেকে রাখা কুয়াশার পর্দা একটু নড়ে উঠল আমার, কিছুটা গললো যেন চূড়া ঢেকে রাখা বরফের হৃদয়। সত্যিই কি আছে কিছু প্রাণশক্তি বলে!

‘একবার ৭ বছর আগে, তখন আমরা কাজীপাড়ায় ভাড়া থাকতাম, দোতলা একটা বিল্ডিংয়ের দোতলায়, সামনে ছোট্ট একটা উঠানও আছিল। আমি রান্নাঘরে নাস্তা তৈরী করে নিচে তারে ডাকতে গেছি, দেখি একজনকে সে মারতেছে। লাথ্যি মারতেছে। তার ঐ চেহারা আমি আগে দেখি নাই।

‘কী ব্যাপার?’ আমি বললাম। আমাকে পেয়ে যেন হাতে প্রাণ ফিরে পেল রক্তাক্ত-ক্ষতাক্ত, প্রচন্ড ময়লা কয়েকটা বোতাম ছেঁড়া জামা আর এদিক-ওদিক ছেঁড়া লুঙ্গি পড়া লোকটা, আমার পেছনে লুকিয়ে মাইরের হাত থেকে বাঁচার লুকোচুরি চেষ্টা করছিল, ‘মারতাছেন কেন লোকটাকে? কী করছে?’

‘আরে! ওকে ছুঁয়োনা, একটা হিরণচি ব্যাটা,’ জবাব দিল ও, লোকটার কলারের পিছনে ধরে টেনে আমার কাছ থেকে সরানর চেষ্টা করতে করতে। জীবনে প্রথম শুনলাম আমি সেদিন শব্দটা, মানে জানা তো পরের কথা।

আসলে মূল ঘটনাটা ছিল; লোকটা আমাদের এলাকার কোন বাড়িতেই, শাড়ি-ঘড়ি বা ইত্যাদি যা কিছু সম্ভব, চুরি করতে যেয়ে দৌড়ানি খেয়ে, কিছুটা গণপিটুনি খেয়েও, মরণ কামড় দেয়া চেষ্টায় তা থেকে উতরে যেয়ে, আরো মাইরের ভয়ে ভীত অবস্থায় আমাদের গেট খোলা পেয়ে ভেতরে ঢুকে উনার কাছে পা ধরে আশ্রয় চাইছিল; সোজা কথায় বাঁচাতে বলছিল।

‘লোকটা যে-ই হোক, যত খারাপ-ই হোক, তোমার কাছে তো সে সাহায্য চেয়েছে, তা যদি দিতে নাও পার, তাকে বের করে দাও। বল, ‘ভাই’ এই বাসায় হৈবো না, অন্য কোথাও যান। তার বদলে তুমি নিজেই কি না তাকে মারছ!’

আমার কথায় লোকটা আশার আলো দেখতে পেয়ে, ওর হাত থেকে ছুটে বার বার আমার পা ধরে, আমি যতই বাঁধা দিচ্ছিলাম পা ধরতে, ততই প্রাণপনে সে তার চেষ্টা করতে করতে, আবার কখনো ওর হাতের চেলা কাঠের বাড়ি ও লাথি থেকে বাঁচার জন্য আমার পেছনে লুকানর চেষ্টা করতে করতে, বলছিল, একটা কথাই বার বার, ‘আপা বাঁচান, আপা আমারে বাঁচান, আমারে জানে মাইরা ফালাইব। আর করুম না।’

‘উনি তখন আমাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে লোকটার পেটে আরেকটা লাথ্যি মারল। আর আমার কেমন যে লাগল সেইটা আমি বৈলা বুঝাইতে পারবো না। শুধু লোকটার জন্য মায়ার কথা বলতেছি না; আমার কেমন যে লাগল! বুকটা য্যান ছ্যাৎ কৈরা ওঠল অজানা, ভয়ংকর, ভবিষ্যত কোন আশংকায়। পরিস্থিতির জন্য উত্তেজনায় কাঁপতে থাকলেও, আসলে ভিতরে ভিতরে ঠান্ডা হৈয়া গেলাম আমি ভয়ে। আজকে আমি বুঝি, ঐ মূহুর্তেই আমি আসলে স্পষ্ট টের পাইছিলাম আমার কপাল। তখন কিছুই বুঝি নাই, এত ভয় লাগতাছে ক্যান? কিন্তু মনের মইদ্যে ঠিকই বুঝছিলাম, ঐ হিরনচী লোকটার কথাই, এমন কী সে তা বলার আগেই আমি টের পাইছিলাম, একদিন পুরাপুরি ফলবে। চোখের সামনে না দেখেলেও, আমি পষ্ট যেন দেখলাম, আমার কলিজার টুকরারে উনার মত করেই লাথ্যি মারছে অন্য কোন মানুষ। এতকিছু, পুরাটাই সেই মূহুর্তে পরিস্কার না বুঝে ঝাপসা করে বুঝলেও, বুঝছিলাম কিন্তু ঠিকই।’

আজকে ৭ বছর পরও পষ্ট মনে আছে রেখাপার লোকটার কথাগুলো ‘হিরনছি বৈলা আজকে ভাই আপনে প্যাডে লাথ্যি মারলেন! আল্লা না করুক, একদিন আপনেও আমার মত হিরনচি হৈতে পারেন,’ বলতে বলতে গেট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া রক্তাক্ত কাপড়, ছেঁড়া লোকটার অপমানিত, আহত, ব্যথিত, অভিশাপমাখা দৃষ্টি। রেখাপা বুঝতে পেরেছিল, ‘আল্লা না করুক’- বাক্যটা শুধু কথার কথা মাত্র। বলার জন্য বলা। কোন শুভাকাঙ্খা থেকে না।

দেখেন আল্লার কী লীলা। এই ঘটানার ঠিক পাঁচ দিনের মাথায় আমার সাথে ঝগড়া করে ও শেওড়াপাড়ায় ওর বন্ধুর বাসায় ওঠে। ঝগড়া আগেও হৈছে, এইটা তো হয়ই, যে কারো; কিন্তু এই প্রথম ও ঝগড়া করে বেরিয়ে যাবার পর রাতে বাড়ি ফিরল না। ঐ বন্ধুর বাসায় আমি নিজেও গেছি। ওখানেই যেতে পারে আন্দাজ করে, পরদিন সকালে আমি যেয়ে হাজির হই। কিন্তু অনেক কাকুতি-মিনতির পরও আমার সাথে রাগ দেখিয়ে ও ফেরে না। ফেরে পাঁচ দিন পর। পরে জানছি, ও-ই আমারে বলছে, প্রথম রাতেই তার বউনি হয়, হিরোইনে। এই জন্য লজ্জায় ─ রাগ টাগ আসলে উসিলা ─ ফিরে নাই। ৫ দিন পর ফিরছে, এর মধ্যে আর একদিনও খায় নাই, খালি অনুতাপে জ্বলছে।

একটু থেমে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিয়ে আবার, ‘ওর ঐ বন্ধু ছিল খুব ধনী। নানারকম ব্যবসা ছিল তার। তার মধ্যে ডিশের ব্যবসাও একটা। যার দায়িত্ব সে আমার হাজব্যান্ডের হাতে তুলে দেয়। আমার হাজবেন্ডের সততার ব্যাপারে কারো ─ বন্ধু-বান্ধব থিকা আত্মীয়-স্বজন সবাই ─  কারো কোন সন্দেহ ছিল না। বললাম না, ওর মত মানুষ হয় না? তাই ঐ বন্ধুরও চিন্তার কোন কারণ নাই। কিন্তু সমস্যা  ছিল, ওর ঐ বন্ধু ছিল হিরনচি।

আমার স্বামীর সমস্যা হচ্ছে ও খারাপ মানুষ সহ্য করতে পারত না, হিরনচিদের তো ঘৃণাই করত, অথচ সে-ই কি না, টাকার জন্য ─ আমাদের তখন খুব খারাপ অবস্থা আমি রাইত-দিন টিউশনি কৈরা কোনরকমে মাটি কামড়ায়া সংসারডা টিকাইয়া রাখছি, আর ও ৩ বছর ধৈরা আপ্রাণ চেষ্টার পরও বেকার ─ সব মাইনা নিল। আপনে বিশ্বাস করেন আর না করেন; আমার মুখ চাইয়া। নানারকম যন্ত্রপাতি ভর্তি যেই রুমে ওরে দিনে ১৪ ঘন্টা কাজ করতে হত, সেই রুমেই প্রচন্ড গরম থাকলেও দরজা-জানালা-ফ্যান বন্ধ করে, দরদর করে ঘামতে ঘামতে ওর পাশে বসেই ৪/৫ ঘন্টা করে দিনে মাল খেত ওর বন্ধুরা। ও খেত না, নিজের কাজে ব্যস্ত থাকত।

গল্পের মধ্যে ডুবে ছিলাম। তাই রেখাপার হঠাৎ করা অপ্রাসঙ্গিক, অন্তত: তখন মনে হয়েছিল, প্রশ্নে কিছুটা হতচকিত হয়ে যাই।

‘আচ্ছা ভাই! একটা কথা বলবেন? মানুষ বদলায় এটা তো সবাই জানে, কিন্তু কেমনে বদলায়?’

প্রকৃত উত্তর দেয়ার আসল সামর্থ নাই বলে, সংক্ষেপে জবাবই দেই, ‘জানি না।’

‘কেউই আসলে জানে না,’ স্বগতোক্তির ঢঙ্গে বলে রেখাপা। নিজের হৃদয়ের গভীরের কোন ক্ষত নতুন করে রক্তাক্ত হওয়া যার উৎস, এমন কোন ভাবনায় ডুবে যেয়ে, আনমনে; চোখের দৃষ্টি দেখে আমি বুঝি। তাই নিশ্চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করি।

মাত্র ১০/১২ দিন আগের ঘৃণা তখন, পরিস্থিতির দরকারে টাকার প্রয়োজনের কাছে কোথায় হারিয়ে গেছে।

এরপরের ঘটনার জন্য আমি ওকে দোষ দেই না। মানুষ কতদিন পারে? কৌতূহল দমিয়ে রাখতে। ধীরে ধীরে মাত্র   মাস সময়ের মধ্যে পাল্টে যায় ও। মাসের মাথায় ২য় বারের মত ও সেই বন্ধুর সাথে মাত্র দুই টান দেয়। কিন্তু, আপনে তো বোঝেন সব, চাক্কা চালু হয়ে গেল। এর আগে অবশ্য সে শুধু গাঁজা আর ফেন্সি খেত। কিন্তু হিরোইনে ২ টান দেয়ার পর ওর মনে হল, ফেন্সিতে ফিলিংস আসতে লাগে ১/  ঘন্টা, অথচ পাতায় মাত্র ৫ মিনিট, আর একবার হৈলেও যে খাইছে সে জানে হিরোইনের মজাই আলাদা, এর কোন বিকল্প নাই। দুধের স্বাদ দুধেই মিটে, ঘোলে তো আর না। আবার, আরেকদিকে, ১ বোতল ডাইলের দাম ৫/৬’শ টাকা তখন, অথচ এক পুরিয়া পাতা মাত্র ২৫ টাকা, চিন্তা করেন কত সাশ্রয়ী! ওর কী দোষ?

২য় বার খাওয়ার ২ দিনের মাথায় সে নিজে স্পটে এসে ২৫ টাকার একটা পাতা কিনে নিয়ে যায়। এরপর শুরু হয় রাতে বাইরে থাকা। প্রথমদিকে সপ্তায় ১/২ দিন দিয়ে শুরু করে ৩/৪ হয়ে টানা ১০/১২ দিনে গিয়ে দাঁড়ায় মাত্র ৩ মাসে। কিছু জিগ্যেস করলে নাইট শিফটের দোহাই দেয়, আমি তো এমনেই ডিশ বুঝিনা, আমাদের বাসায় টিভি ছিল না; অথচ প্রথম দিকে, মাস ২ আগেও, নাইট শিফট শব্দটা শুনি নাই।

সেই শুরু, রাতে বন্ধুর ডিশের অফিসে থেকে যাওয়া বাড়তেই থাকে, বাড়তেই থাকে। টানা ১০/১২ দিন হয়ে গেলে আমি যেয়ে কান্নাকাটি করে নিয়া আসতাম। একবার তো টানা ৭ মাস কাটায়া দিল। আমার কোন খরবরও নিত না। বাইচা আছি, না মরছি। মাঝে মাঝে শেওড়াপাড়া থেকে চিঠি পাঠাত লোক মারফত, কী যে অর্থ সেই চিঠির, কেন যে ঐসব লিখত তার মাথা-মুন্ডু কিছুই আমি বুঝতাম না।

বেয়ারার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে আরো এক গ্লাস ফিল্টার পানি খায় রেখাপা, আমার অনুমতির তোয়াক্কা না করে। দুই কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে, যথারীতি নিশ্চুপ, নিশ্চল বসে থেকে অপেক্ষা করি আমি, মেলে ধরা হৃদয়ের ক্ষতের নবোদ্যমে বের হওয়া পুঁজ নিমগ্ন, নিবিষ্ট মনে দেখার আশায়; ঝলমলে দোকানে শাড়ির পাড়ের ডিজাইন যেভাবে দেখে ক্রেতারা, খুঁতিয়ে খুঁতিয়ে।

‘কী লেখা থাকত চিঠি-গুলোয়?’

‘উল্টা-পাল্টা সব কথা, আমি তো এখন ধরা খেয়ে গেছি, আমি তো শেষ হয়ে গেছি, আমি তো এখন বাতিল, তোমার কোন কাজে আসব না। কাজেই, আমাকে ভুলে যেও- এই সব কথাবার্তা। যার কিছুই বুঝতাম না আমি। শেষ হয়ে গেছি মানে কী? বাতিল মানি কী?’

আমি জবাব পাঠালাম: কবে আমি তোমারে কাজ করতে বলছি। আমার সাথে থাকই তোমার একমাত্র কাজ। রোজগারের চিন্তাপাতি তুমি অযথা কেন করতে গেলা, রোজগারের চিন্তা আমার, এইটা তো তোমারে আমি যেদিন থেকে চিনছি সেদিনই বলছি। শুধু পাশে থাক। কিছু করতে হবে না তোমার এতদিন চালাই নাই আমি, একা? সারাজীবনও পারব। তুমি শুধু পাশে থাক। আমার পাশে থাক। আর কিছু চাই না আমি তোমার কাছে।

চিঠিতেও কাজ না হলে ৭ মাসের মাথায় আমি নিজে একদিন যাই ─ আগেও গেছিলাম কয়েকবার, দরজা না খুইলা ভিতর থিকা অন্য লোক দিয়া কওয়াইছে, ও না কি ভিতরে নাই ─ এবং দরজা খোলা পেয়ে  সরাসরি ভিতরে ঢুকে পড়ি। তারপর যা দেখার দেখি, যদিও রুমের অবস্থা এমন কেন তার আগা-মাথা কিছুই না বুঝলেও হাড়ে হাড়ে আমি টের পাই ওর চিঠির কথাগুলা একবর্ণও মিথ্যা না। তা দেখি। আসলে মাত্র এক রাউন্ড শেষ হয়েছিল। দরজা-জানালা-ফ্যান সবকিছু খোলা থাকার পরও একটা দম বন্ধ করা গুমোট কড়া গন্ধ, ওড়নায় নাক-মুখ চেপে আমি কোন রকমে বমি সামলে, আর সিগারেটের কড়া ধোঁয়া  থাকা সত্বেও, শুকিয়ে হাড্ডিসার হয়ে যাওয়ার পরও উপস্থিত ৪/৫ জনের মধ্যে, কোনায় পাতা বিছানার এক কোনে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বসে আছে ও। ওর গায়ে, পরে জানছি, ৮০০ টাকার সার্ট, পায়ে ২০০০ টাকার কেটস্, অথচ আমার সেই প্রিয় চামড়া আর নাই, ওর মুখ দেখে আমি জানি।’

‘চামড়া মানে?’

স্পষ্টত:ই , এই প্রথম, বিরক্ত হয় রেখাপা, অনাকাংখিত হস্তক্ষেপে, তবু দ্রুত সামলে প্রকাশভঙ্গি পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে বলতে থাকে, ‘খুব বেশি যে ফর্শা ছিল তা না, তবে ওর গায়ের রঙকে আমি ডাকতাম সোনালী বলে, অবশ্য দুইজনে একা থাকলে শুধু। আসলে তো সোনালী না, কিন্তু ভাই, কী বলব? কী যে এক রঙ সেই চামড়ার, কী যে সুন্দর! সেই রঙ। এতক্ষনে হৃদয়কে তার আলো-অন্ধকারসহ পুরাটা মেলে ধরতে ধরতে বলতে থাকে সে, ‘আমার সবচেয়ে ভাল লাগত ঘাড়টায় চুমা দিতে, অন্য জায়গাগুলার আনন্দ তো আছেই, সেটা আমি অস্বীকার করতেছি না, কিন‘ ওর ঘাড়ের যে বিশেষ জায়গাটায় আমি লক্ষ লক্ষ চুমা দিছিলাম, তার প্রমান কেমনে উইঠা গেল?’ ৪/৫ সেকেন্ড দাড়ায়া থাকার পর, তখনও ও একবারো আমার দিকে তাকায় নাই, যখন বাম চোখ দিয়া পানির প্রথম ফোঁটাটা গড়ায়া পড়তাছিল তখন আমি ঠিক এইটা ভাবতাছিলাম, আমার এখনও মনে আছে।

 

[youtube id=”yiVq2qeWlm8″]

 

সকাল ১১ টায়ও ওর চোখে তখন কেতুর লেগে আছে। মনকে বোঝালাম, বোধহয় ময়লা জায়গায় ঘুমিয়েছে। ঈশ্! তখনও যদি জানতাম। তাইলে হয়ত, অন্তত…শব্দ খুঁজে না পেয়ে বাক্য শেষ না করে, প্রসঙ্গ পাল্টে বলে, ২ ঘন্টা হাতে পায়ে ধৈরা বুঝায়া, অনেক কাইন্দা-কাইট্টা বাসায় নিয়া এলাম। প্রথম ২দিন ও ভাল ছিল, তবে চুপচাপ থাকত, আর শুধু তামুক খেত। তবে ৩য় দিন থেকে বাথরুমে দীর্ঘ সময় কাটানর পর্বটা শুরু হল, যা আমি ২য় বারের সময়ই লক্ষ্য করলাম। কিন্তু ভয়ে কোন প্রশ্ন করলাম না। ওর ভয়ে না, এক না-চিনা ভয়ে।

আমার মনে জাগল, এতক্ষণ কী করে? আমাদের সেই বাসায় ছিল ২টা বাথরুম পাশাপাশি, যদিও ২ রুমে দরজা। তো, এই দুই বাথরুমের মাঝখানের কমন দেয়ালের একটা ৬/৪ ইঞ্চি দেয়ালের ফাঁকের মাধ্যমে, সিলিংয়ের সাথে, ইটের মাঝে একটা বাল্ব লাগানর জায়গাটা, যাতে এক বাল্বেই দুই বাথরুমের কাজ চলে, বাথরুমে তো এতক্ষণ লাগেনা, ‘কী করে? তা জানার আর কোন উপায় না পাইয়া একদিন ও বাসায় ফেরার পর ৫ম কী ৬ষ্ঠ দিন হবে, পাশের বাথরুম থেকে উঁকি দিয়ে দেখি রুমভর্তি সিগারেটের ধোঁয়া, মেঝেতে বসে মাল খাচ্ছিল বলে ওকে দেখা যাচ্ছিল না। আমি কিছুই বুঝলাম না। এত ধোঁয়া কেন? বাথরুমে আধাঘন্টার উপরে থেকে কয়টা সিগারেট খায় সে? বুঝলাম না পায়খানা না করে বাথরুমে মেঝেতে বসে বসে সিগারেট খায় কেন? বাসার রুমে খেতে কী অসুবিধা? অন্য সময় তো রুমেই খায়, এখন কেন বাথরুমে খেতে হবে, কিছুই বুঝলাম না আমি। এছাড়া যে বিশ্রী দম-বন্ধ-করা গন্ধ সেটাই বা কিসের? ওর ডিশের অফিসেও যে গন্ধটা আমি পেয়েছিলাম।

তিন বছরের চেনা, যা এত ঘন, এত যুথবদ্ধ যে রেখাপা তখন গভীরভাবে বিশ্বাস করে, মুখে বলেও, মনে মনে না শুধু, সারাজীবনের জন্য তার স্বামীকে চেনা হয়ে গেছে তার। এমন কী, ঠান্ডা মাথায়, মৌখিক প্রতিশ্র“তও দেয় রেখাপা; সারাজীবন একত্রে কাটানর। রেখাপা, অবশ্য, এখনো বিশ্বাস করে, কোন স্বল্পস্থায়ী ও গভীর মোহপূর্ণ হয়ে না, বরং লোকটাকে যথার্থ চিনতে পেরেই সে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

যে মানুষ কথা বলতে বলতে রাত পার করে দেয়, সে কি না এখন পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে থাকে বিছানায় যাবার সাথে সাথে যে সময়টার জন্য রেখাপা মনে মনে প্রতীক্ষা করে সারাদিন। মনে মনে, গভীর প্রত্যাশায় অপেক্ষা করে যে আজকের আলাপে সব ঠিক হয়ে যাবে।

রফিক ভাইকে আমি দেখেছি, পঞ্চাশোর্ধ, কঙ্কালসার একটা শরীর। মাস তিনেক আগে যখন শেষ দেখেছিলাম তখন আমার কাছে মনে হয়েছিল, বেশিদিন লাস্টিং করবে না। অবশ্য এই অবস্থায়ই আমি তাকে বছরখানেক আগেও দেখেছিলাম, বুড়ি খালার বস্তিঘরে। আবার কে জানে, প্রাণশক্তি বলে যদি সত্যি সত্যি কিছু থেকে থাকে, তবে রেখাপা হয়ত, আশা করি আরো দীর্ঘকাল সুখে-শান্তিতে-প্রেমে ‘সংসার’ করে যাবে।

 

[youtube id=”JoVkReLGpBk”]

 

The following two tabs change content below.

তারিক আল বান্না

গল্পকার, সাংবাদিক। জন্ম ১৯৭২ এ। মেট্রিক পাশ করছেন ১৯৯০-এ, ঢাকা রেসিডেন্সশিয়াল স্কুল থিকা। পড়াশোনা করছেন জাহাঙ্গীরনগর ইউনির্ভাসিটির ইংলিশ ডির্পাটমেন্টে। এখন কাজ করেন নিউজবাংলাদেশডটকম-এ সিটি এডিটর পজিশনে। থাকেন ঢাকায়, মোহাম্মদপুরে।

Latest posts by তারিক আল বান্না (see all)

  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য