Main menu

ক্রনিকলস অফ অ্যা লিকুইড সোসাইটি।। উমবের্তো একো ।।

বইটার প্রথম ইংরেজি প্রকাশঃ ২০১৭।

এই শতাব্দীর প্রথম দেড় দশকে যে সকল ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে আগাইছে ইউরোপ তথা ইটালি, ‘ক্রনিকলস অফ অ্যা লিকুইড সোসাইটি’ সেগুলারই বয়ান। এই ইউরোপ গ্রেকো-রোমান কালচার থেকে ইহুদিদের কাল্ট বইয়ের ভেতর দিয়ে যেই খ্রিষ্টান আইডেন্টিটি নিয়া দাঁড়ায়া আছে, তার সেই রঙিন আউটলুক নানা ঘটনার প্যাঁচে গত শতাব্দীর শেষে আর এই শতাব্দীর শুরুতে টালমাটাল হয়ে গেছে। আধুনিকতা নামের যে গ্র্যান্ড আইডিয়া ইউরোপ জন্ম দিছিলো একসময়, তার ফাঁক ফোকর দিয়ে হাজির হইছে বিচিত্র ধরণের সংকট আর অভিনব প্রেক্ষাপট। এই সংকট আর প্রেক্ষাপট মোকাবেলার জন্যে পুরানা চিন্তাপদ্ধতি একেবারেই কার্যকর না।

একোর প্রস্তাবনা এইখান থেকেই শুরু।

পঞ্চাশ বছর আগে একো ভবিষৎবাণী করছিলেন আগামীর ইউরোপ হবে নানা রঙের, নানা অতীতের, নানা শেকড়ের মানুষের। তার ভবিষ্যৎবাণী, যেভাবেই হোক সত্য প্রমাণিত হইছে। পলিটিক্সের পাকচক্রে ক্রমবর্ধমান একীভূতকরণ ইউরোপের ঘুম হারাম করে দিলেও একো  বারবার বলতেছে, ইউরোপের দরোজা সবার জন্যে খোলা রাখা হোক। কারণ খোলা রাখলেই লাভ বেশি মানবমণ্ডলের, তাতে ফিতনা এড়ানো যায়। দরোজা বন্ধ করার কথা শুনলেই একোর মনে পইড়া যায় তার শৈশবের ফ্যাসিস্টদের কথা। এই ফ্যাসিস্টরাই বলতো, ইটালিয়ানরা সবার আগে। ধর্মীয় পোলারাইজেশনে আক্রান্ত সদাপৃথিবীতে ইউরোপ কীভাবে আরও উন্মুক্ত হইতে পারে সবার জন্যে, এই বইয়ে সে তাই বলার চেষ্টা করছে ইতিহাসের রেফারেন্সে, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির সংজ্ঞায়নে। তার বয়ানের উপস্থাপন আর চিন্তাপদ্ধতি ইতিহাসবিচ্যুত ট্র্যাডিশনাল আধুনিকদের মতো না, যারা আধুনিক পশ্চিমা সমাজকে পাঠ করতে চায় ধর্মাতীত এক অলীক ও আদর্শ ঘটনার ফলাফল হিশাবে। ইউরোপীয় চিন্তাবিদ হিশাবে একো মেনে নিছে সমাজ আর ধর্মের অবিচ্ছেদ্যতা। এই শতাব্দীতে তা চিহ্নিত করতে পারাই সংকট মোকাবেলার প্রথম ধাপ।

অবশ্য এই ওপেননেসের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রতিকূলতাও বর্তমান। একদিকে চরম তরলতায় আক্রান্ত স্পিরিটহীন ইউরোপিয়ান সমাজ আর তার আদর্শিক তারল্য, অপরদিকে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ইউরোপিয়ান ভূখণ্ডে পাড়ি জমানো আদমিদের হাজিরা সংকটের মাত্রা আরও ফ্যানায়া তুলছে। একোর মতে, এরকম একটা মুহূর্তে আদর্শিক সংকট নতুন রকমের ফ্যাসিজমের জন্য আদর্শ উর্বর জমি। একো অ্যালার্ম বাজাইতেছে ক্রমাগত – এই আদর্শিক সংকটের কারণে পপুলিজমই একমাত্র রাজনৈতিক আদর্শ হিশাবে গণ্য হইতেছে চারদিকে – এটাই ফ্যাসিজম আসার  প্রতিধ্বনি, সাবধান।

এই পপুলিস্ট জুলুমের টার্গেট কারা? অবধারিতভাবেই সংখ্যালঘুরা। ফলে প্রশ্ন আসে, এই সংকটের সময়ে ‘অপর’দের কীভাবে ট্রিট করবে ইউরোপ? সনাতনী সেকুলার আইডেন্টিটির বয়ান তো তার উত্তর দিতে পারতেছে না। দেখা যাইতেছে, শুধুমাত্র ‘সিটিজেন’ হিশাবে আদমকে ট্রিট করলেই তার ঐতিহাসিক পরিচয় বিলীন হয়ে যায় না। সোশ্যাল  ইন্টিগ্রেশনের এক পর্যায়ে যখন আইডেন্টিটর প্রশ্ন সামনে আসে নবাগত ইউরোপীয়দের জন্যে – একো তখন আবার তার অতীতকেও অস্বীকার করতে অপারগ। একো মানে, এই অতীতের একটা ধারাবাহিকতা আছেঃ ধর্মগত, ঐতিহ্যগত, বিশ্বাস আর অবিশ্বাসগত। ফলে ইটালিয়ান ক্লাসরুমে ক্রুশ রাখা হবে কী না এই বিষয়ে সে বিচলিত – কোন উত্তর না দিয়ে বলতেছেন তর্ক আগায়া নিতে। কারণ চিহ্নতত্ত্বের একো ব্যাখ্যা করতেছেন ক্রুশের ‘সেকুলার’ সিম্বল হয়ে ওঠার কথা। আর দেশের লিস্ট দিতেছে ধরায়া – যেইখানে চাঁদতারা উপস্থিত বহাল তবিয়তে। একোর প্রশ্ন, এইসব সিম্বলেই কি  একটা রাষ্ট্র ধর্মীয় রাষ্ট্র হয়ে ওঠে? না কী সিম্বলের সংজ্ঞায়ন সামাজিক ইতিহাস আর সম্পর্কের ভিত্তিতে জন্ম নেয়? ধর্মরাষ্ট্র বলতে কী বুঝায়?

এই প্রশ্নের উত্তর একো পরিষ্কারভাবে বইতে না দিলেও অন্তত এইটুকু বুঝে নেয়া যায় – নানা প্রেক্ষাপট ও মাত্রায় সেকুলার আর কনজারভেটিভের ডেফিনিশনের অদলবদলে রাষ্ট্র আর ইতিহাসবিদদের ভূমিকায় যে চেইঞ্জ আসতেছে – সেটা নিয়ে সে বিলকূল সজাগ। সমাজে ধর্মবিশ্বাসের স্বাভাবিকতাকে বাদ দিয়ে একো আগাইতে চাইতেছেন না কোনভাবেই – হোক সেটা ইউরোপিয় খ্রিষ্টান ধর্ম বা ইউরোপের নবাগত খ্রিষ্টান,বৌদ্ধ, মুসলিমদের ধর্ম। সে বিচরাইতেছে কীভাবে আরেকটু সহনশীল হওয়া যায় একজনের আরেকজনের প্রতি। কারণ, একমাত্র তাতেই ইন্টিগ্রেশনের প্রশ্নটা ইউরোপ নতুন কোন হলোকাস্ট আর ধর্মযুদ্ধ ছাড়াইপার হইতে পারবে।

এই সহনশীলতার বয়ান হয়তো নতুন কিছু না, তার দোহাইয়ে ইউরোপ সবসময়ই যা করার করে গেছে, কিন্তু তাদের সাথে একোর পার্থক্যটা হইতেছে – একো এটলিস্ট ইউরোপীয় সভ্যতায় খ্রিষ্টানদের প্রভাব, প্রতিপত্তি ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য অস্বীকার করেন নাই। একোর ধারণা – আধুনিকতার পতনের সাথে নব্য ভোগবাদ আর পুঁজিবাদে নষ্ট হইতে থাকা তরল ইউরোপের যে আধ্যাত্মিক সংকট দেখা দিছে – তা মোকাবেলা করার জন্যে নতুন স্পিরিটের আমদানি ধর্ম থেকে আসতে পারে। এটাই সহজাত এবং তাই সূচনা করতে পারে নতুন ধরণের সহনশীলতার বয়ান, যেখানে কালা-ধলা-হিন্দু-মুসলিম-ইহুদি আর অ্যালবিনোদের আপনায়া নেয়া যাবে ইজিলি। একো এও বলতে চান, ইউরোপিয়ান ইতিহাসে তা নতুন কিছু না।

আরেকদিকে লক্ষ্য করা জরুরী, সহনশীলতার বয়ান দিলেও ইসরায়েল রাষ্ট্রের ভ্যালিডিটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সামর্থ্য উনি কোথাও রাখতে পারেন নাই। তার মতে, ‘ইহুদিদের পূর্ণ ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় অধিকার আছে সেখানে বসতি স্থাপনের’। এই স্টেইটমেন্ট দেয়ার সাথে সাথে প্যালেস্টাইনের মুসলিমদের কী করা যায় সেটা নিয়ে তারে কিছু বলতে দেখা যায় না এই বইয়ে (আশা করি অন্য বইগুলা পড়লে এর উত্তর পাওয়া যাবে)। এমন কী, দুই হাজার এগারো সালে ইসরায়েল বয়কট আন্দোলনেরও একজন কঠোর সমালোচক ছিলেন তিনি। তার কারণ, ‘একজন স্কলার বা প্রাইভেট সিটিজেনকে তার সরকারের রাজনীতির সাথে মিলায়া দেখা ফান্ডামেন্টালি খুবই রেসিস্ট একটা চিন্তা’। কথায় যুক্তি আছে, কিন্তু তার থেকেও বড় বিষয় হইতেছে প্যালেস্টাইনের মুসলিম নিয়ে একোর নীরবতা। এন্টিসেমিটিজমের জুজু আক্রান্ত একো কি প্যালেস্টাইনের মুসলিমদের  ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ন্যায্যতা নিয়ে কোথাও কিছু বলার চেষ্টা করছেন কখনো?

জানি না। দিনের শেষে একো একজন ইউরোপিয়ান চিন্তাবিদের সীমাবদ্ধতা নিয়েই চিন্তা করেন, আর সেটাই তার যথার্থতা, মেই বি সৌন্দর্যও! আপাতত লিকুইড সোসাইটির ধর্ম, প্রবণতা, সেলফোন, কম্পিউটার, উইন্ডোজ ভিস্তা, ইন্টারনেট, পর্ন, জিসাস, বই, ডিজিটাল মিডিয়া, মিস ওয়ার্ল্ড, পলিটিক্যাল কারেক্টনেস, কোকেইন, পোপ, নব্য নাৎসিবাদ, ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন, পেনড্রাইভ, আইফোন, ভোগ, এভোল্যুশন, আগামেনন, বুশ ইত্যাদি- এগুলা নিয়েই পড়া যাক অনুবাদগুলা।

 

শফিউল জয়

 

 

দ্যা লিকুইড সোসাইটি (২০১৫)

‘লিকুইড’ মডার্নিটি বা সোসাইটি ভাবের প্রবক্তা জিগমুন্ট বাউম্যান। যারা এই ভাবের নানাদিক নিয়ে বুঝতে আগ্রহী, তারা বাউম্যান আর বর্দনির ‘স্টেইট অফ ক্রাইসিস’ পড়ে দেখতে পারেন। উক্ত লেখায় বাউম্যান আর কার্লো বর্দনি এই ভাব আর তার নানা দিক নিয়ে আলাপ করছেন।

বলা যাইতে পারে, উত্তরাধুনিকতা আন্দোলন শুরু হওয়ার সাথে সাথেই লিকুইড সোসাইটি গঠনের প্রক্রিয়াটা শুরু হয়ে গেছিলো। উত্তরাধুনিকতা একটা ব্যাপক টার্ম- স্থাপত্য থেকে শুরু করে দর্শন, সাহিত্য সব জায়গার বিভিন্ন ঘটনা সামগ্রিকভাবে বুঝার জন্যে এই টার্মটা ব্যবহার করা হয়। উত্তরাধুনিকতাই প্রথম ‘গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ’ এর সংকট চিহ্নিত করছিলো। তাদের মতে, প্রত্যেকটা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের ঝামেলা হইলো এরা একই মডেল দিয়া পুরা দুনিয়াকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। ফলে অতীতের পুনর্বিবেচনায় উত্তরাধুনিকতায় এক ধরণের ইয়ার্কিপ্রবণ স্ববিরোধীতা আবিষ্কার করা স্বাভাবিক, যার সাথে নিহিলিস্টিক প্রবণতারও মিল পাওয়া অমূলক না। বর্দিনির মতে, উত্তরাধুনিকতাও তার শেষ আমলে পৌছাইছে। স্বভাবে এ ছিল ক্ষণস্থায়ী, ফলে আমরা বুঝতে বুঝতেই সে বিদায় নিয়ে নিছে। এবং এখন যেমন আমরা প্রি-রোম্যান্টিসিজমের পাঠ নেই, একইভাবে উত্তরাধুনিকতারও পাঠ নেয়া হবে। আধুনিকতা থেকে আমাদের বর্তমানের নামহীন সময়ে আইসা পৌঁছানোর ঘটনাকে উপস্থাপন করাই উত্তরাধুনিকতার অবদান।

এই সময়ে রাষ্ট্রব্যবস্থার যে সংকট দেখা দিছে, বাউম্যানের মতে সেটা বাড়ন্ত বর্তমানের অন্যতম বৈশিষ্ট্যঃ রাষ্ট্রের বাইরের শক্তিকে মোকাবেলার জন্যে জাতিরাষ্ট্রগুলার কোন ফ্রিডম কি আছে? আমরা চোখের সামনে দেখতেছি একটা কিছু গায়েব হয়া যাইতেছে। আমাদের সময়ে সমস্যা মোকাবেলায় ব্যক্তির হোমোজিনিয়াস এক তরিকা ছিল – এই হোমোজিনিয়েটিই আর থাকতেছে না।এই সংকটের কারণে আদর্শও গায়েব, রাজনৈতিক দলগুলাও নাই। ফলে নিজেদের প্রয়োজনের তাগিদে কোনকিছুর সাথে একাত্ন বোধ করার যে সাধারণ আহ্বানটা ছিল, সেটাও নাই।

কম্যুনিটিতে এই সামগ্রিক সংকট স্বাভাবিকভাবেই লাগামহীন ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার জন্ম দিছেঃ লোকজন এখন একজন আরেকজনের ফেলো সিটিজেন না ভাইবা ভাবে বিপরীতপক্ষ। এই ‘সাব্জেক্টিভিজম’ আধুনিকতার ভিত্তি কাপায়া দিতেছে, এরে ভঙ্গুর করে তুলছে। এমন অবস্থায় কোথাও কোন নজির নাই যেটার রেফারেন্সে জুতের কিছু বলা যায়। সবকিছু একধরণের তারল্যের ভেতরে লুপ্ত হয়ে যাইতেছে। আইনের নিশ্চয়তা নাই, বিচারবিভাগ শত্রু। ফলে, যেই ব্যক্তির সামনে ভালো কিছুর নজির নাই, তার একমাত্র উপায় – নিজেরে যেকোনো মূল্যে দৃশ্যমান করে তোলা। এই দৃশ্যমান হওয়াই এখনকার একমাত্র মূল্যবোধ, সাথে আছে ভোগবাদ। হ্যাঁ, কিন্তু আকাঙ্ক্ষিত বস্তু ভোগ করে তৃপ্ত থাকা এই ভোগবাদের উদ্দেশ্য না, এই ভোগবাদের উদ্দেশ্য চাইতে থাকা ভোগকে মুহূর্তেই পুরানো বানায়া ফেলা। মানুষজন এক ভোগ থেকে আরেক ভোগে উদ্দেশ্যহীনভাবে বিচরাইতেছে, যেন সবাই বুলিমিয়ায় আক্রান্তঃ নতুন সেলফোনটা আগেরটার থেকে ভালো না, কিন্তু আগেরটা ফেইলা দিতে হবে কারণ আমাকে ভোগের ক্ষুধা যে করেই হোক মিটাইতে হবে।

আদর্শ আর রাজনৈতিক দলের পতনঃ এখন বলা হয়া থাকে রাজনৈতিক দলগুলার চরিত্র হয়ে গেছে ভোট কন্ট্রোলিং মব লিডার অথবা মাফিয়া বসদের ভাড়া করা  ট্যাক্সির মতো। কে কী অফার দিতেছে সেটা দেইখা লোকজন ক্যাজুয়ালি পার্টি বাছাই করে। রাজনীতিবিদদের দলবদল কোন স্ক্যান্ডাল গণ্য করে না কেউ। শুধু মানুষজন নাঃ এই সোসাইটি নিজেই একটা নিরাপত্তাহীনতার ভেতর দিয়ে বাস করতেছে।

এই দ্রবীভূতকরণ কী দিয়া রিপ্লেইস করা যায়? আমরা এখনো জানি না, কিন্তু এই অরাজকতা আরও সময় ধরে চলবে। বাউম্যানের মতে, এই অরাজকতার একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো যখন উপর থেকে, রাষ্ট্র থেকে, বিপ্লব থেকে আস্থা উইঠা যায়, তখন যা থাকে তা হইলো ক্ষোভ। এই ক্ষোভ জানে সে কী চায় না, কিন্তু সে জানে না সে কী চায়। একটা কথা এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা ভালো – ব্ল্যাক ব্লক প্রোটেস্ট নিয়ে পুলিশের একটা কমন অভিযোগ হইলো যে, অ্যানার্কিস্ট, ফ্যাসিস্ট কিংবা রেড ব্রিগেডের মতো এদেরকে কোন লেবেলে ফ্যালা যাইতেছে না। এই আন্দোলনগুলা হুট করে সামনে আসে, কিন্তু কেউ জানে না কখন আসবে, কোনদিক দিয়ে আসবে। এমন কী যারা করতেছে তারাও আগাম কোন দিশা পায় না।

এই দ্রবীভবনের সাথে বোঝাপড়ার কোন উপায় কী আছে? আছে, এবং সেটা হইলো আমাদের সচেতন হইতে হবে যে, আমরা একটা লিকুইড সোসাইটিতে বাস করতেছি – যারে বোঝার জন্যে এবং উৎরানোর জন্যে দরকার নতুন ধরণের ইন্সট্রুমেন্ট। কিন্তু ঝামেলা হইলো রাজনীতিবিদ আর বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ এখনো এইটার তাৎপর্য বুঝে উঠতে পারে নাই। এই মুহূর্তের জন্যে বাউম্যান এখনো, ‘নিষ্প্রাণ প্রান্তে কানতে থাকা একটা কণ্ঠস্বর’।

 

ফ্রিস্টাইল ক্যাথলিক এবং বকধার্মিক সেকুলারিস্ট (২০০০)

লোকজন যখন বিংশ শতাব্দীর গ্রেইট স্পিরিচুয়াল ট্রান্সফর্মেশনের কথা বলে, ঠিক পরের মুহূর্তেই তারা অবধারিতভাবে আদর্শের পতন নিয়ে আলাপ শুরু করে দেয়। এই স্পিরিচুয়াল ট্রান্সফর্মেশনকেই বলা যায় বিংশ শতাব্দীর সমাপ্তির নিদর্শন। এর ফলে ট্র্যাডিশনাল ডান আর বামের পার্থক্য একেবারে অস্পষ্ট হয়ে গেছে। তারপরেও প্রশ্ন থাকে, বার্লিন দেয়াল ভাঙা কী এই আদর্শিক পতনের কারণ না কী শুধুমাত্র ফলাফল।

বিজ্ঞানের কথাই ধরেন। মানুষজন চাইতো বিজ্ঞান হবে একটা নিরপেক্ষ এলাকা যেটা লিবরাল আর সোশ্যালিস্ট দুই পক্ষই প্রোগ্রেসের খাতিরে মাইনা নিবেঃ পার্থক্যটা থাকবে শুধু  কার স্বার্থে এবং কীভাবে এই প্রোগেসের চালানটা হবে। একেবারে খাসা ১৮৪৮ সালের ‘কমিউনিস্ট ম্যেনিফেস্টো’র চিন্তা, যেইখানে পুঁজিবাদীদের এক প্রকারের গুণকীর্তন গায়া শেষমেশ বলা হইছিল, ‘আমাদেরও এখন এইটা চাই’। লিবরাল বলতে আমরা বুঝতাম যে প্রযুক্তিক উৎকর্ষে বিশ্বাস করে, আর প্রতিক্রিয়াশীলরা ঐতিহ্য আর কলুষতামুক্ত প্রকৃতিতে ফিরা যাওয়ার কথা বলে। অনেকটা  ‘রিভোল্যুশন ব্যাক টু দা পাস্ট’। এই প্রবণতা লাডাইটদের মতো, যারা মেশিনারি ভাঙার কথা বললেও তাদের সংখ্যা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু ছিল না। ফলে লিবরাল আর সোশ্যালিস্টদের পার্থক্যকে ঘুচায়া দেয়ার হিম্মতও তারা রাখতে পারে নাই।

তো, এই কিসিমের প্রভেদটার সমস্যা ধরে পড়া শুরু করে ১৯৬৮ সাল থেকে। সময়টা স্ট্যালিনবাদীদের স্টিলের অনুরাগ, ফ্লাওয়ার পাওয়ার, শ্রমিকবাদ (যেটা ধারণা করছিল অটোমেশনের মাধ্যমে এমপ্লয়মেন্ট কইমা যাবে) আর ডন হুয়ানের ড্রাগসের থ্রুতে মুক্তির নবিদের আবির্ভাবের সাথে মিলেমিশে আছে। ফার রাইট আর ফার লেফট দুইদিকের জন্যেই তৃতীয় বিশ্বের পপুলিজম সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়াইলে এই মিলমিশের প্রক্রিয়াটাও ভাইঙ্গা পড়তে থাকে। ফলে এখন আমরা হুট করে নিজেদেরকে দেখতেছি সিয়াটল মুভমেন্টের সামনে – যেইখানে নব্য লাডাইট, র‍্যাডিক্যাল পরিবেশবাদী, প্রাক্তন শ্রমিকবাদী, লুম্পেনশ্রমিক সবাই একত্র হয়া ক্লোনিং, বিগ ম্যাক, ট্র্যান্সজেনিক আর নিউক্লিয়ার টেকনলজির বিপক্ষে অবস্থান নিতেছে।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর দেখা যাইতেছে ধর্মীয় আর সেকুলার দুনিয়ার ভিতরে। হাজার বছরের ইতিহাসে আমরা জাইনা আসছি ধর্মের সাথে প্রোগ্রেসে অবিশ্বাস, ইহলৌকিকতা অস্বীকার, মতবাদের গোঁড়ামির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। অন্যদিকে সেকুলার বিশ্ব প্রকৃতির রূপান্তর, নৈতিক মানদণ্ডের নমনীয়তা, ‘অপর’ ধর্ম আর প্রাচীন চিন্তাবলীর দিকে খুবই আশাব্যঞ্জক দৃষ্টি নিয়ে তাকায়া থাকে সবসময়।

অবশ্যই, তেয়ার দে শারদানের মতো বিশ্বাসীরাও ছিল যারা ‘ইহজাগতিক বাস্তবতা’ নিয়ে মাথা ঘামাইতো আর ইতিহাসপাঠকে দেখতো পরিত্রাতা হিশাবে। অন্যদিকে, অগুনতি সর্বনাশা সেকুলার বণিকের চিন্তাও মাথায় আসে যারা ওরওয়েল আর হাক্সলির নেগেটিভ ইউটোপিয়ার কথা মনে করায়া দেয়। কিংবা মনে করায়া দেয় একটা ভবিষ্যতের কথা, যেই ভবিষ্যত হবে বীভৎস বৈজ্ঞানিক র‍্যাশনালিটি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এইটাই মোটামুটি সত্য ছিল যে, ধর্ম আমাদেরকে শেষ সময়ে ডাকবে আর সেকুলারিজম গাবে লোকোমোটিভের স্তোত্রগীত।

সাম্প্রতিককালে অত্যুৎসাহী তরুণ পোপভক্ত দলবলের যে হিউজ সমাবেশ আমরা দেখলাম সেটা ইঙ্গিত দিতেছে পোপ জন পল দুইয়ের আমলে একটা কিছু চেইঞ্জ হইছে। এই ছোকরার দল ক্যাথলিক বিশ্বাসে বিশ্বাসী, কিন্তু এদের সাক্ষাৎকার শুনে মনে হইলো বাতিকগ্রস্ত মৌলবাদি বলতে যা বুঝায়, এরা তা একেবারেই না। এই দল বিবাহপূর্ব সম্পর্ক, গর্ভনিরোধক, ক্লাবিং এমন কী ড্রাগস নিয়েও নতুন বোঝাপড়ায় যাইতে চায়। অন্যদিকে, সেকুলার দুনিয়ার দিকে তাকান – এরা ঘ্যানাইতেছে শব্দদূষণ আর নিউ এইজের স্পিরিট নিয়ে। এই স্পিরিট এক কাতারে দাড়া করায়া দিতেছে নব্য-বিপ্লবী, মনসিনিওর মিলিঙ্গর ফলোয়ার এবং ভোগবিলাসে ডুইবা থাকা লোকজনদের, যারা ওরিয়েন্টাল ম্যাসাজ নিতে জীবন উৎসর্গ করতেছে।

এটা তো মাত্র শুরুয়াদ। আমাদের মজুদে আরও অনেক কিছুই দেখার বাকি আছে।

 

ইউরোপের শেকড়ের খোঁজে (২০০৩) 

ইউরোপের খ্রিষ্টান শেকড়ের সাথে ইউরোপীয় সংবিধানের কোন প্রকারের সম্পর্ক টানা হবে কী না –এই ব্যাপারটার গ্রহণ যোগ্যতার বিতর্ক নিয়ে এই গ্রীষ্মে পত্রিকাগুলো বের সরব হয়ে উঠছে। পক্ষের লোকজন বলতেছে, রোমান সাম্রাজ্য পতনের পর ইউরোপের জন্ম খ্রিষ্টান সংস্কৃতির হাত ধরেই হইছে; তা না হইলেও ৩১৩ সালে সম্রাট কন্সটান্টিনের ফরমান থেকে তো অবশ্যই। বৌদ্ধ ধর্ম ছাড়া যেমন পূবের জগত কল্পনা করা যায় না, তেমনি ক্যাথলিক চার্চ, ধর্মপ্রাণ খ্রিষ্টান রাজা, স্কলাস্টিক ধর্মতত্ত্ব আর মহান সন্তদের কর্মযজ্ঞের উদাহরণগুলাকে স্বীকার না করলে কোন প্রকারের ইউরোপ বোঝা সম্ভব না।

বিপক্ষের লোকজন আধুনিক গণতন্ত্রের বুনিয়াদে এক প্রকারের সেকুলার নীতির উপরে তাদের যুক্তিগুলা সাজাইতেছেন। এরা বলতেছেন, ইউরোপের সেকুলারিজমের ধারণাটাই সাম্প্রতিক আবিষ্কার, বলা যায় ফ্রেঞ্চ বিপ্লবের উত্তরাধিকার এই সেকুলারিজম। এর সাথে খ্রিষ্টান সন্ন্যাসবাদ অথবা ফ্রান্সিনকান ঐতিহ্যের কোন লেনাদেনা নাই। তারা সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভবিষ্যতের দিকে তাকায়া ইউরোপকে একটা বহুজাতিক মহাদেশ হিশাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। যারা নতুন আসতেছে ইউরোপে, তাদের সম্মিলনীর প্রশ্নটা বাঁধাগ্রস্ত হবে যদি খ্রিষ্টান ধর্মের সাথে ইউরোপকে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত করা হয়। এছাড়াও অনান্য বিশ্বাস আর ঐতিহ্যের মানুষজনেরাও সংখ্যালঘু সংস্কৃতি আর কাল্টের কাতারে পর্যবসিত হবে। এর মধ্যে ‘এক প্রকারের বরদাস্ত করা হইলো আর কী’ মনোভাবটা খুবই পরিষ্কার।

এই কারণেই এটা শুধু ধর্মযুদ্ধ না; এটা এক প্রকারের রাজনৈতিক প্রকল্প, একটা নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। ইউরোপের  আদলটা কী তার জনসংখ্যার অতীতের শক্তির উপর ভিত্তি করে টানা হবে না কী এর ভবিষ্যতের মানুষের শক্তির উপর ভিত্তি করে টানা হবে – সেই সিদ্ধান্তও এর সাথে জড়িত।

পেছনে ফিরে দেখা যাক। ইউরোপ কি শুধুই খ্রিষ্টান সংস্কৃতির উপর দাঁড়ায়া বিকশিত হইছে? ভারতের গণিতশাস্ত্র, আরবের ওষুধ কিংবা মার্কও পোলোরও আগে আলেক্সান্ডার দ্যা গ্রেইটের সময়কালে পূবের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে ইউরোপ যেভাবে লাভবান হইছে সেটা আলাদা করে বলে লাগে না। প্রত্যেক সংস্কৃতিই অন্য সংস্কৃতির জিনিশপত্র আদানপ্রদান করে তার নিজস্ব চরিত্র দাঁড়া করায়। আবার শুধুমাত্র এটা বলাই যথেষ্ট না যে আমাদের ভারত কিংবা আরবদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকতে হবে, কারণ ইউরোপ আবার আরেকদিক থেকে দেখাইছে প্রকৃতি আসলে গাণিতিক স্বরলিপিতে লেখা। এগুলা বলতে বলতেই আমরা আবার গ্রেকো-রোমান সংস্কৃতির কথা ভুলে যাইতেছি।

গ্রেকো-রোমান সংস্কৃতি থেকে ইউরোপ আইন, দার্শনিক চিন্তা এমন কী লোকবিশ্বাসও আত্মস্থ করছে। খ্রিষ্টানধর্ম স্বাভাবিকভাবেই প্যাগান আচার আর মিথের অনেককিছুই নিছে নিজের মধ্যে, একটু খেয়াল করলেই বহু ঈশ্বরবাদের অনেক উপাদান লক্ষ্য করা যাবে এর ভিতরে। আর রেনেসাঁ যুগই  একমাত্র যুগ না যে কী না ভেনাস আর অ্যাপোলো দিয়ে ঠাসা  ক্ল্যাসিকাল জগতের ধ্বংসাবশেষ আর পাণ্ডুলিপি খোঁজে বের হইছে। মধ্যযুগের ধর্মতত্ত্ব অ্যারিস্টটলের চিন্তার উপর দাড়ায়া আছে, যেটা আরবদের মধ্যে দিয়ে পশ্চিমে আসছে। প্লেটোকে পাত্তা না দিলেও এই সময় নব্য-প্লেটোবাদকে এড়ায়া যাইতে পারে নাই। চার্চের ফাদাররা নব্য-প্লেটোবাদ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। খ্রিষ্টান চিন্তাবিদদের মধ্য শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ অগাস্টিনকে প্লেটোনিক চিন্তা ছাড়া কল্পনাই করা যায় না। সাম্রাজ্যের ধারণাটা, যেটা নিয়ে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলার মধ্যে হাজার বছরের বিবাদ চলছে, বিবাদ চলছে রাষ্ট্র আর চার্চের- সেটার উৎপত্তিও রোমান। খ্রিস্টান ইউরোপ রোমের ল্যাতিনকেই তার শাস্ত্রকাজের, ধর্মচিন্তার, আইন আর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কের ভাষা বানাইছে।

ইহুদিদের একেশ্বরবাদ ছাড়াও কোন খ্রিষ্টান ঐতিহ্য কল্পনা করা যায় না। ইউরোপের সংস্কৃতির ভিত যেই পাঠ্য, প্রথম ছাপখানা যেই পাঠ্য ছাপানোর কথা চিন্তা করছে, যেই পাঠ্যের অনুবাদ বলতে গেলে জার্মান ভাষার জন্ম দিছে, যেটা প্রটেস্ট্যান্ট দুনিয়ার নীতিপাঠ্য – সেটা হলো বাইবেল। খ্রিষ্টান দুনিয়া বড়ই হইছে সাম গায়া, নবীদের উদ্ধৃতি দিয়ে, জব আর আব্রাহামের ধ্যান করে। ইহুদি একেশ্বরবাদই খ্রিষ্টান একেশ্বরবাদ আর ইসলামিক একেশ্বরবাদের ভাব বিনিময়ের সেতু তৈরি করে দিছে।

এখানেই শেষ না। পিথাগোরাসের সময় থেকেই মিশরীয় সংস্কৃতি ছাড়া কোন গ্রিক সংস্কৃতি ভাবা যায় না। ইউরোপিয় সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলার মধ্যে একটা হইলো রেনেসাঁ, যেটা মিশরীয় আর ক্যালডিয়ানদের অভিজ্ঞান দাড়া ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। অবেলিস্কের রহস্যভেদ থেকে শুরু করে শ্যাম্পলিঁ পর্যন্ত যে ইউরোপের ছবি আমাদের মাথায় ভাসে, সাম্রাজ্যের ধারণা থেকে আধুনিক এবং খুবই পশ্চিমা নতুন যুগের যে চিন্তাকল্প- এগুলা তো নেফারতিতি, পিরামিডের রহস্য, ফারাওয়ের অভিশাপ, প্রাচীন মিশরের গুবরে পোকার খোদাই থেকেই আসছে।

তো, আমি মনে করি এই সংবিধানে গ্রেকো-রোমান সংস্কৃতি বা ইহুদি-খ্রিষ্টান সংস্কৃতির সাথে এই মহাদেশের সম্পর্ক টানাও প্রাসঙ্গিক বলা যায় তাই। রোম যেমন তার প্যান্থিয়ন সব বর্ণের খোদার জন্যে খুলে দিছিল, কিংবা কালো চামড়ার মানুষকেও তার সাম্রাজ্যের গদিতে বসাইছিল – আমাদের ভুলা উচিত না সেইন্ট অগাস্টিনের জন্ম আফ্রিকায় – এরকম শেকড়ের জন্যেই ইউরোপের উচিত বাকি সব সাংস্কৃতিক এবং জাতীসত্তার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত হিশাবে ঘোষণা করা। কেননা, উন্মুক্ত থাকাই এই মহাদেশের অন্যতম বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য।

 

ড্যামড ফিলোসফি (২০১১)

কিছুদিন আগে ‘লা রিপাব্লিকা’ স্টিফেন হকিং আর লেনার্ড ম্লডিনোর ‘দ্যা  গ্র্যান্ড ডিজাইন’ বইয়ের আগাম অনুবাদের সারাংশ প্রকাশ করছে। সারাংশে বইয়ের একটা প্যাসেজে থেকে উদ্ধৃত করা সাবটাইটেল আছে, যেটা বলতেছে, ‘দর্শন মৃত, পদার্থবিজ্ঞান একাই মহাবিশ্ব ব্যাখ্যা করতে সক্ষম’। দর্শনের মৃত্যু এর আগেও নানা জায়গায় বেশ কয়েকবার ঘোষণা করা হইছে, এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নাই। কিন্তু সারাংশটা পড়ার পর আমার কাছে মনে হইছিল হকিং বুলশিট বলতেছে। ‘লা রিপাব্লিকা’ যে ভুলভাল কিছু লিখে নাই,  সেটা অনুমান করছিলাম। তারপরেও নিশ্চিত হওয়ার জন্যে বইটা কিনলাম। এবং আমার ধারণা ভুল ছিল না।

বইয়ের কাভারে লেখা ম্লডিনো স্টার ট্রেকের একজন ফার্স্ট-রেইট পপুলারাইজার এবং বেশ কয়েকটা এপিসোডের স্ক্রিনরাইটারও। এটা বইটার জাঁকালো ইলাস্ট্রেশন দেখেই বুঝতে পারছি। মনে হইছে ইলাস্ট্রেশনগুলা বাচ্চাদের ইয়েস্টারইয়ার এন্সাইক্লোপেডিয়া উদ্দেশ্যে করা, যেটার সাথে বইয়ের ফিজিক্যাল-ম্যাথমেটিক্যাল-কসমোলজিক্যাল উপপাদ্যের কোন সম্পর্ক নাই। সম্ভবত সূচালো কানের লোকদের সাথে দর্শনের ভাগ্যকে গছায়া দেয়াটা খুব একটা সুবিধার বিচার ছিল না।

বইটা শুরু হইছে সুদৃঢ়ভাবে এটা দাবি কইরা যে, দর্শনের আর খুব বেশি কিছু বলার নাই এবং একমাত্র পদার্থবিজ্ঞানই বলতে পারে (১) যে দুনিয়াতে আমরা বাস করি সেটাকে কীভাবে বোঝা যায় (২) বাস্তবতার প্রকৃতি কী (৩) দুনিয়ার কি কোন স্রষ্টার দরকার আছে কী না (৪) কোন কিছু না থাকার থেকে কোন কিছু ক্যান আছে  (৫) আমাদের আমাদের অস্তিত্বের কারণ (৬) কেন সুনির্দিষ্ট এই ধরণের ল আছে কিন্তু অন্য ধরণের নাই। যেমন দেখা যাইতেছে, এগুলা সবগুলাই আদর্শ দার্শনিক প্রশ্ন এবং শেষ চারটা প্রশ্নের (যেগুলা সবচেয়ে দর্শনগত) উত্তর পদার্থবিজ্ঞান কীভাবে দিতে পারে, বইটার উপজীব্য সেটাই।

উল্লেখিত শেষ চারটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হইলে প্রথম দুইটা প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার। অন্যভাবে বললে, কোন কিছুকে বাস্তব বলতে আসলে কী বুঝায় এবং দুনিয়া যেমন- আমরা কী সেইভাবেই দুনিয়াকে জানতে পারি? ইতালির স্কুলের বাচ্চাকাচ্চাদের যখন দর্শন পড়ানো হয়, তখন তারা শুরুই করে এটা দিয়ে- বস্তুর সাথে ভাবকে মিলায়াই কি আমরা শিখি? আমাদের বাইরেও কি কিছু আছে? না কী আমরা বার্ক্লের বলা সেই সত্তা, অথবা পাটনামের ‘ব্রেইন ইন অ্যা ভ্যাট?’

এই বইয়ের দেয়া উত্তরগুলা সুনির্দিষ্টভাবে দার্শনিক। যদি তা না হইতো তাহলে পদার্থবিজ্ঞানও বলতে পারতো না পদার্থবিজ্ঞান উত্তরগুলা কেন জানে এবং কী জানে। প্রকৃতপক্ষে, লেখকদ্বয় এক প্রকারের ‘মডেল নির্ভর বাস্তবতা’ এর কথাই বলছেন যেটা বলে-  ‘ছবি-অথবা তত্ত্ব-হীন বাস্তবতার কোন ধারণা থাকতে পারে না’। এবং ‘ধারণাগত কাঠামো আলাদা হইলেও ভিন্ন ভিন তত্ত্ব দিয়ে একই ঘটনার একাধিক সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব’। বাস্তবতা নিয়ে আমরা যা বুঝি, জানি এবং বলি সেটা নির্ভর করে আমাদের মডেল আর বাইরে যা অবস্থান করে তার উপর। কিন্তু আমরা যা জানি সেটা সম্পূর্ণ আমাদের ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষজাত আর ব্রেইনের ফর্মের অবদান।

সজাগ পাঠক  ইতিমধ্যেই কান্টের ভূতের দেখা পাইছেন এই আলাপের মধ্যে। কিন্তু এই দুই লেখকের যে প্রস্তাবনা, দর্শনে তার নাম হলিজম। কেউ এটারে বলে অভ্যন্তরীণ বাস্তববাদ, আবার অনেকে বলে গঠনবাদ।

এতক্ষণে আমরা বুঝে গেছি, এই বই আসলে কোন পদার্থবৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নিয়ে না, বরং একটা দার্শনিক প্রতীতি নিয়ে যেটা উক্ত পদার্থবিদের গবেষণাকে সমর্থন আর ন্যায্যতা দেয়। সন্দেহ নাই, লায়েক পদার্থবিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়ার দার্শনিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন করার অনেক জায়গা খুঁজে পাবেন। এই ব্যাপারে আমরা সবাই অবগত, আর ম্লডিনো আর স্টার ট্রেকের বদৌলতে যেমন আমরা জানি, ‘প্রাচীনকালে লোকজন প্রকৃতির কোন ভয়ংকর ঘটনার দায় অলিম্পাসের হিংসক আর প্রতিশোধপরায়ণ দেবতাদের চাপায়া দিতো’। বাই হ্যাভেন অ্যান্ড বাই জোভ!

 

এন্টিসেমিটিজম কই খুঁইজা পাও? (২০০৩)

শুধুমাত্র সন্ত্রাসী হামলা না, সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটা মতামত জরিপসহ পরপর কিছু ঘটনার কারণে আবার এন্টিসেমিটিজমের প্রসঙ্গটা হেডলাইনে জায়গা করে নিছে। এবার অবশ্য অ্যারিয়েল শ্যারনের পলিসির বিরোধকারীদের খুব সহজে চিহ্নিত করা যাইতেছে না। কারণ এর মধ্যে অনেক ইহুদিও আছে যারা ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব পোষণ করে, বিপরীতে এর বিরুদ্ধবাদীদেরও একই ধরণের মনোভাব এদের প্রতি। কিন্তু জনমত আর ম্যাস মিডিয়া বিচিত্র রকমের বিদ্বেষকে একই কাতারে ফেলার চেষ্টা করতেছে। দেখা যাইতেছে,পশ্চিমা জনমত এখনো সেই আরামদায়ক দুইটা ক্যাটাগরিতে আটকানো- এক নাম্বার- এন্টিসেমিটিজম আরবদের ব্যাপার, দুই-ইউরোপে খুব কম সংখ্যক স্কিনহেডের মধ্যেই এন্টিসেমিটিজম দেখা যায়।

ইউরোপ কখনোই বিভিন্ন প্রকারের তথা ধর্মীয়, পপুলার আর ‘বৈজ্ঞানিক’ এন্টিসেমিটিজমের মধ্যে ফারাকটা বুইঝা উঠতে পারে নাই। ধর্মীয় এন্টিসেমিটিজম মূলত পপুলার এন্টিসেমিটিজমের জন্যে দায়ী ছিল। ইহুদীরা ঈশ্বর-বিদ্বেষীঃ  এই অজুহাতে একসময় ব্যাপক কচুকাটা চলছে তাদের উপর। আরেকটা অভিযোগ ছিল, নির্বাসিত ইহুদিরা নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর, সহজে সবার সাথে মিলতে চায় না। বইয়ের কাল্টের অনুসারী হওয়ার কারণে তাদের দেখে বাকিরা মনে করতো, এরা ভিন্ন তরিকায় কথা বলা ভয়ংকর ইন্টেলেকচুয়াল। ‘বৈজ্ঞানিক’ এন্টিসেমিটিজম বলতে আমি বুঝাইতেছি ঐতিহাসিক এবং নৃতাত্ত্বিক ভাবগুলাকে, যেটা ইহুদিজাতীর বিপরীতে আর্যজাতির শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার ন্যায্যতা প্রদান করতো। এর সাথে ছিল ‘ইহুদিরা ষড়যন্ত্র করতেছে খ্রিষ্টান দুনিয়া দখল করে নেয়ার’ – এই রকমের রাজনৈতিক বিশ্বাস।এরকম ধারণা সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে ফুইটা উঠছে ‘দ্যা প্রোটোকলস অফ দা এল্ডারস অফ জায়ন’ বইতে। বলতে দ্বিধা নাই, বইটা ইউরোপের সেকুলার বুদ্ধিবৃত্তিরই একটা প্রোডাক্ট।

আরব বিশ্বে ধর্মতাত্ত্বিক এন্টিসেমিটিজমের হদিস পাওয়া যায় না, কারণ কোরান শরিফ আব্রাহাম থেকে জিসাস পর্যন্ত সবাইকেই বিশ্বাসগত দিক থেকে অনুমোদন করে। ইসলামের প্রসারের যুগে খ্রিষ্টান আর ইহুদিদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিশাবে গুণলেও মুসলিমরাতাদের প্রতি বেশ সহনশীলই ছিল। সেই আমলে ইহুদি-খ্রিষ্টানরা ট্যাক্স দিয়ে তাদের ব্যবসাপাতি ধর্মকর্ম নির্বিঘ্নে চালায়া যাইতে পারতো। ইসলামিক এন্টিসেমিটিজম তাই ধর্মীয় ক্যাটাগরির না, এটা পুরাপুরিই জাতি রাজনৈতিক। ধর্মীয় প্রণোদনা থাকলেও সেটা জাস্ট একপ্রকারের সাপোর্ট দেয় জাস্ট। উনবিংশ শতাব্দীতে ইহুদিরা যদি ইসরায়েল রাষ্ট্রটা ইউটাতে প্রতিষ্ঠা করতো, তাহলে আরবরা এন্টিসেমিটিক হইতো না। আমাকে যাতে ভুল না বোঝা হয়ঃ ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় কারণে ইহুদিদের পূর্ণ অধিকার আছে প্যালেস্টাইনে তাদের বসতি স্থাপন করার। একশো বছর ধরে তারা সেখানে শান্তিপ্রিয় ভাবে বসতি স্থাপন করছে এবং তাদের অধিকার আছে সেখানে থাকার। কিন্তু আরব এন্টিসেমিটিজম আঞ্চলিক, কোনভাবেই ধর্মতাত্ত্বিক না।

যাই হোক, এর থেকেও সিরিয়াস আলাপ হইতেছে ইউরোপের দায়ঃ পপুলার এন্টিসেমিটিজম ধর্মীয় এন্টিসেমিটিজমের আস্কারা পায়া গণহত্যা চালাইছে। যদিও সেটা ছিল লোকালাইজড এবং মোটামুটি পরিকল্পনাহীন। আসল ‘বৈজ্ঞানিক’ এন্টিসেমিটিজম প্রকল্প চালু হয় আঠারোশো শতাব্দীর শেষে এবং উনিশ শতাব্দীতে। এবং সেটা জার্মানিতে না, শুরু হইছিল ফ্রান্স এবং ইতালির কিছু অংশে। সভ্যতার জাতিগত শেকড় নামে ফ্রান্সে সর্বপ্রথম বর্ণবাদী তত্ত্বের বিকাশ হয় এবং ফ্রান্স আর ইতালির ভিতরেই ইহুদি-ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বমতে, ফরাসি বিপ্লব ছিল ইহুদিদের কাজ এবং এটা হচ্ছে খ্রিষ্টান সভ্যতাকে কব্জায় আনার প্রথম ধাপ। ইতিহাস দেখাইছে, ‘দ্যা প্রোটোকলস অফ দ্যা এল্ডারস অফ জায়ন’ জেজ্যুয়েট লেজিটিমিস্ট, ফ্রেঞ্চ আর রাশিয়ান সিক্রেট সার্ভিসেরই কাজ, পরবর্তীতে যেটা জারবাদী প্রতিক্রিয়াশীল আর নাৎসিরা দ্বিধাহীনভাবে গ্রহণ করছে। ইন্টারনেটে ম্যাক্সিমাম এন্টিসেমিটিক আরব ওয়েবসাইটও ইউরোপীয় ‘বৈজ্ঞানিক’ এন্টিসেমিটিজমের আদর্শে বানানো।

ইটালিতে রাইট উইং লিডার জানফ্রাঙ্কো ফিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেছে তার পার্টির অতীতের এন্টিসেমিটিক কলঙ্ক মুইছা ফেলার জন্যে। এর জন্যে তাকে মনে রাখা উচিত। কিন্তু যে কোন স্পেশালটি বুকশপে যান, দেখবেন হলি গ্রেইলের উপর অকাল্ট বুকের সাথে সাথে মুসোলিনির বক্তৃতা আর ‘দ্যা প্রোটোকলস অফ দ্যা এল্ডারস অফ জায়ন’ খুইজা পাবেন আপনি। এইরকম ব্লেন্ড জুলিউস এভোলার মতো দেশী রাইট উইং আইডিওলগের জন্যে খুবই দরকার। খুঁজলে আপনি ওইখানে এভোলার বই-ও পাবেন।

মূলধারার রাজনীতি অস্বীকার করা অনেক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আছে যারা নিজেদেরকে ‘কম্যুনিস্ট’ বলে দাবি করে।  ইটালিয়ান বামদের অনেক মেম্বারকেই মাইরা ফেলা হইছে, ফলে তাদের পূর্ণ অধিকার আছে এই ‘কম্যুনিস্ট’দের থেকে নিজেদের আলাদা দাবি করার। তারা ইতিমিধ্যে সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের পক্ষে আইসা দাড়াইছে। একমাত্র বেরলুস্কনিকেই এইসব ব্যাপারে মাথা ঘামাইতে দেখা যাইতেছে না। রাজনৈতিকভাবে সে যতই কামেল আদমি হোক না কেন, তার উপর কোন প্রকার আস্থা রাখা কঠিন। ইটালিয়ান রাইট উইং কি এইসব নিয়া কিছু করতেছে? এরা কি মাইনা নিতে রাজি যে এভোলা যখন ভিজা বিড়াল হয়া উঠে নাই, যার লেখা আরাম কইরা পড়া গেলেও বৈজ্ঞানিকভাবে চরম ভুল, সে ছিল একজন পাড় এন্টিসেমাইট? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও সে তার কার্যক্রম চালায়া গেছে। ইটালিয়ান রাইট উইঙের আস্কারায় ‘দ্যা ডিফেন্স অফ দ্যা রেস’ মতো ম্যাগাজিনে ‘বৈজ্ঞানিক’ এন্টিসেমিটিজমের যে রেটরিক  এখনো চলতেছে, স্কুল আর অ্যাডাল্ট এজুকেশনে গিয়ে কে দায় নিবে এর অযৌক্তিকতা জানানোর জন্যে?

নিজেদের আরব সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই। একইসাথে, যেভাবেই হোক না কেন, শিক্ষাব্যবস্থাকে ব্যবহার করতে হবে ঘরের শত্রুদের সাথে লড়ার জন্যে – যারা ক্রমাগত আরব এন্টিসেমিটিজম ফেনায়া যাইতেছে।

 

ডিজিটাল মিডিয়ার বিলোপ প্রবণতা নিয়ে (২০০৯)

গত রবিবারে ভেনিসে এক কনফারেন্সে ডিজিটাল মিডিয়ার ক্ষণস্থায়ীত্ব নিয়ে একটা আলাপ তোলা হইছিল। মিশরের খাড়া পাথরের ফলক, মাটির চাকতি, প্যাপিরাস, পশুর চামড়া এবং অতি অবশ্যই ছাপানো বই – এগুলা ইতিহাসে তথ্যের মাধ্যম হিশাবে কাজ করে আসছে।  এদের মধ্যে একমাত্র বইকেই পাঁচশো বছর টেকানো গেছে, অবশ্য যখন র‍্যাগ পেপার দিয়ে বানানো হইছে শুধু তখনই। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝখান থেকে কাঠের মণ্ড থেকে বই ছাপানো শুরু হইলে তার স্থায়িত্ব গিয়া দাড়ায় সত্তর বছরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর ছাপা হওয়া কোন বইয়ের পাতা উল্টায়া দেখার চেষ্টা করেন। দেখবেন পৃষ্ঠাগুলা সব খুইলা পড়তেছে। তাই বেশ কিছুকাল ধরেই কনফারেন্স আর গবেষকরা আমাদের লাইব্রেরিগুলাতে থাকা বইয়ের সমাহার টিকায়া রাখার চেষ্টা চালায়া যাইতেছেন। মোটামুটি অসম্ভব মনে হইলেও, সবচেয়ে জনপ্রিয় উপায় হইলো যত বই আছে সবগুলাকে স্ক্যান কইরা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে ঢুকায়া দেয়া।

কিন্তু এটার আরেকটা ঝামেলা আছে। যে মাধ্যমগুলা ট্রান্সফার আর সংরক্ষণের জন্যে ব্যবহার করা হবে বলে ধরা হইতেছে, দেখা যাইতেছে সেগুলার আয়ুকাল আসলে বইয়ের থেকেও কম- হোক সেটা ফিল্ম রিল, ডিস্ক, অথবা কম্পিউটারের সাথে ব্যবহার করা ইউএসবি মেমোরি স্টিক। এগুলা ব্যবহার করার সম্যক অভিজ্ঞতা আমাদের আছে-আগেকার দিনে অডিও ক্যাসেটগুলা কিছুদিন ব্যবহার করার পরই ক্যালায়া দিতো। তারপর আমরা ফুটার ভেতর দিয়ে পেন্সিল ঢুকায়া রিওয়াইন্ড করে সেগুলা চালানোর চেষ্টা করতাম। সবসময় এই পদ্ধতি যে কাজে দিতো, তাও না। অন্যদিকে, ভিডিও ক্যাসেটের কালার আর ডেফিনেশনে কিছুদিন পরেই ঝামেলা শুরু হয়া যাইতো, আর আগে পিছে টাইনা চালাইলে নষ্ট হওয়া ছিল ওয়ান্টুর ব্যাপার। স্ক্র্যাচ পড়ার আগ পর্যন্ত ভাইনল কীভাবে সবচেয়ে ভালো চালানো যায়, এই বিষয় নিয়েও অনেক ভাবছি আমরা। তবে সিডি জিনিশটা কতোদিন টিকবে এটার ভাবার খুব একটা সময় আমরা পাই নাই। সিডি আইসা বইয়ের অস্তিত্বকে মোটামুটি হটায়া দিতে নিছিল, কিন্তু অনলাইনে সিডির সেইম ম্যাটেরিয়াল আরও শস্তায় পাওয়া শুরু হইলে সিডি নিজেই গায়েব হয়ে গেলো। আমরা এটাও না ডিভিডিতে কতদিন একটা মুভি  টিকে থাকবে, কিন্তু খুব বেশি ইউজ করলে মাঝে মাঝেই এটা স্কিপ করা শুরু করে। এমনি করে আমরা ভাবারই টাইম পাই নাই ফ্লপিডিস্কের জমানা থাকবে কয়দিন। কারণ ভাইবা বের করার আগেই ডিস্কেট দিয়ে ফ্লপি ডিস্ক, রিরাইটেবল ডিস্ক দিয়ে ডিস্কেট আর ইউএসবি মেমোরি স্টিক দিয়ে রিরাইটেবল ডিস্ক তার জায়গা দখল কইরা নিছে পালাক্রমে। যেই কম্পিউটারগুলা এগুলা রিড করতে পারতো,  এই মাধ্যমগুলা গায়েব হওয়ার সাথে সাথে সেগুলাও গায়েব হয়ে গেছে। আমি মোটামুটি নিশ্চিত এখন কারো ফ্লপি ডিস্ক স্লটওয়ালা কম্পিউটার নাই। পুরানো ফাইলগুলা যদি আগের ডিভাইসগুলা থেকে নতুন ডিভাইসে দুই তিন বছর পরপর ট্রান্সফার না করা হয়ে থাকে (এই প্রক্রিয়া অনন্তকাল চালাইতে হবে সম্ভবত), তাহলে সেগুলা নিঃসন্দেহে হারায়া গেছে। এই ঝামেলা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায়- আমাদের স্টোররুমে নানা যুগের এক ডজন বা তারও বেশি কম্পিউটার রাইখা দেয়া-এবং এর প্রত্যেকটাই থাকবে কোন না কোন বাতিল ফাইল-স্টোরেজ মেথডের সাথে সম্পর্কিত।

তার মানে দাড়াইতেছেঃ সব মেক্যানিক্যাল, ইলেক্ট্রিক্যাল এবং ইলেক্ট্রনিক মাধ্যম না হয় খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়,  অথবা আমরা কোন ধারণাই করতে পারি না যে সেই মাধ্যমটার জমানা কয়দিন থাকবে।

আবার ধরেন, পাওয়ার সার্জ, বিদ্যুৎ চমকানি কিংবা অন্য কোন তুচ্ছ ঘটনাই একটা মেমোরি কার্ডকে ডিম্যাগ্নেটাইজ করার জন্যে যথেষ্ট। একটা বড়সড় ব্ল্যাক আউটের ভেতরে পড়লেই কোন প্রকারের ইলেকট্রিক মেমোরি ব্যবহার করার জো থাকে না। ইলেক্টনিক মেমোরিতে  যতই ‘ডন কিহোতে’  থাকুক,  আমি  কিন্তু মোমবাতির আলোতে, হ্যামকে, নৌকায়, গোসলে, দোলনায় তা পড়তে পারবো না। অথচ সবচেয়ে প্রতিকূল অবস্থাতেও বই পড়া সম্ভব। পাঁচতলা থেকে আমার কম্পিউটার বা ই-বুক ছুড়লে সেটা গুড়াগুড়া হয়া যাবে। কিন্তু একটা বই ঢিল দিলে সেটারে অন্তত উদ্ধার করা সম্ভব।

আধুনিক মাধ্যমগুলা তথ্যের সংরক্ষণের থেকে সম্প্রচারে বেশি জোর দিয়ে আসতেছে। তারপরেও, বই শুধু তথ্য সম্প্রচারের কাজ করে না, এর সংরক্ষণও করে। প্রোটেস্ট্যান্ট রিফর্মেশনে ছাপা বাইবেলের ভূমিকা কল্পনা করে দ্যাখেন। এমনও হইতে পারে আর কয়েক শতাব্দীর মধ্যে সব ইলেকট্রনিক মিডিয়া ডিম্যাগ্নেটাইজড হয়ে যাবে, তখন একটা ভালো ইনকুন্যাবুলুম হবে অতীত জানার একমাত্র মাধ্যম। আর আধুনিক বইয়ের মধ্যে যেগুলা টিকবে, সেগুলা হইতে হবে শ্রেষ্ঠ মানসম্পন্ন অ্যাসিডহীন কাগজের।

আমি ঐতিহ্যবাদী না। একটা দুইশো পঞ্চাশ গিগাবাইটের হার্ডডিস্কে আমি বিশ্বসাহিত্য আর দর্শনের মাস্টারপিসগুলা রেকর্ড কইরা রাখছি। সবচেয়ে উচা শেলফের ইয়া মোটা মোটা বই নামানোর প্যারা নেয়ার থেকে এই হার্ডডিস্ক ইউজ করা অনেক সহজ। আর চাইলেই দান্তে কিংবা ‘সুমা থিওলজ্যের’ কোন উদ্ধৃতি চোখের পলকে খুঁজে বের করা কোন ঘটনাই না। কিন্তু তারপরেও আমার ভাল্লাগে যে ওই বইগুলা শেলফে আছে, ইলেক্ট্রনিক ইন্সট্রুমেন্ট যখন কাজ করবে না তখনকার ব্যাকাপ হিশাবে।

 

না পড়া বই নিয়ে (২০০৭)

যতদূর মনে পড়ে, জর্জো ম্যাঙ্গানেল্লির তার একটা আর্টিকেলে ব্যাখ্যা করছিলো যে- কীভাবে একজন ঝানু পাঠক নতুন কোন বই খোলার আগেই আঁচ করতে পারে বইটা পড়ার ফায়দা আছে কী না।  তার এই দাবী  কোন পেশাদার, উৎসাহী বা সমঝদার পাঠকের সামর্থ্যের দিকে ছিলো না; যারা কী না প্রথম লাইন পড়ে, দুই এক পাতা উল্টায়া-পাল্টায়া দেইখা বা সূচিপত্র, রেফারেন্স ঘাইটাই বুইঝা ফ্যালে এটা পড়ার যোগ্য কী না। এগুলায় চোখ বুলায়া যারা বলতে পারে, তারা অভিজ্ঞ লোক। কিন্তু, ম্যাঙ্গানোল্লি ইঙ্গিত ছিল স্পষ্টতই একটা প্যারাডক্সিকাল চেরাগীপনার দিকে।

সাইকোঅ্যানালিস্ট এবং সাহিত্যের অধ্যাপক পিয়েরে বায়ার্দের একটা বই আছে ‘হাউ টু টক অ্যাবাউট বুক্স ইউ হ্যাভেন্ট রেড’ নামের। আপনার কোন বই পড়ার দরকার নাই সেটা বইটার বিষয়বস্তু না, বরং খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বই না পড়েও আপনি কীভাবে যে কারো সাথে (এমন কী আপনার ছাত্রদের সাথেও) সেটা নিয়ে খুশিমনে আলাপ চালায়া যাইতে পারবেন – এটা নিয়েই সে একটা বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা তুলছে। ধরেন, একটা ভালো লাইব্রেরিতে কয়েক মিলিওন বই থাকে; আপনি যদি প্রতিদিন একটা করেও পড়েন তাহলে এক বছরে ৩৬৫ টা বই পড়তে পারবেন, দশ বছরে সেটা গিয়ে দাঁড়াবে ৩৬০০, এবং দশ এবং আশি বছরের মধ্যে আপনি সর্বোচ্চ পড়তে পারবেন ২৫,২০০ টা বই। খুবই নগণ্যসংখ্যক। অন্যদিকে, মোটামুটি ভালো সেকেন্ডারি এজুকেশন আছে এমন যেকোনো ইটালিয়ান খুব ভালোভাবে জানে, একটা অক্ষরও না পড়ে তারা ম্যাটিও ব্যান্ডেলো, ফ্রাঞ্চিসকো গুইচার্দিনি, ম্যাটিও বইয়ার্দো অথবা ভিত্তরিও আলফিয়েরি ট্র্যাজেডি কিংবা নিয়েভোর ‘কনফেশন অফ অ্যান ইটালিয়ান’ বিষয়ক যেকোন আলাপে জুইড়া বসতে পারবে – শুধুমাত্র নাম আর তাদের হাল্কার উপরে ঝাপসা ক্রিটিক্যাল কনটেক্সট জানার থ্রুতে।

আর এই ক্রিটিক্যাল কনটেক্সটই বায়ার্দের ক্রুশল পয়েন্ট। কোন সংকোচ ছাড়াই সে ঘোষণা দিছে, জেমস জয়েছের ‘ইউলিসিস’ না পড়ার পড়েও সে এটা নিয়ে আলাপ করতে পারে কারণ এটা ‘ওডিসি’রই পুনর্বয়ান ( বায়ার্দ এটাও স্বীকার করছে যে পুরা ‘ওডিসি’ও তার পড়া হয়ে ওঠে নাই)। সে এটাও জানে পুরা ঘটনাটা ডাবলিনের একটা দিনে ইন্টারন্যাল মনোলগের উপর ভিত্তি করে সাজানো। ‘ফলে’, সে বলতেছে, ‘কোন দুশ্চিন্তা ছাড়াই আমি এই বইয়ের কথা নানা জায়গায় উল্লেখ করতে পারি’। একটা বইয়ের সাথে আরেকটা বইয়ের সম্পর্ক জানা থাকলে না পড়া বইটা সম্পর্কেও আপনি অনেক জাইনা থাকতে পারেন, ইভেন চান্স আছে- বইটা পড়েও হয়তো ততোটা জানতে পারবেন না যতোটা না পড়ে জানতেন।

বায়ার্দ দেখাইছে-  নির্দিষ্ট  কিছু বই পড়ার সময় আপনি কীভাবে উপলব্ধি করেন বইগুলার বিষয়বস্তু আপনার পরিচিত। হয়তো বইগুলা অন্য কেউ পড়ে সেটা নিয়ে কথা বলছে, সেগুলার উদ্ধৃতি দিছে, অথবা সেইম চিন্তাগুলার ভিতর দিয়ে আশেপাশের কেউ হয়তো গেছে। বায়ার্দ তার না পড়া বেশ কিছু লিটেরেরি টেক্সট নিয়ে খুবই চমকপ্রদ কিছু পর্যবেক্ষণ করছে। এর মধ্যে রবার্ট মুসিল, গ্রাহাম গ্রিন, আনাতোল ফঁস, পল ভ্যালরি আর ডেভিড লজের বইও আছে। বায়ার্দ বইটায় ‘দ্যা নেইম অফ দ্যা রোজ’ নিয়ে এক চ্যাপ্টার লিখে আমাকে ধন্য করছে।‘দ্যা নেইম অফ দ্যা রোজ’-এর উইলিয়াম দ্যা ব্যাস্কারভিল যখন প্রথমবারের মতো অ্যারিস্টটলের ‘পোয়েটিক্স’-এর হারায়া যাওয়া দ্বিতীয় খণ্ড হাতে পায়, তখনই সে শনাক্ত করতে পারছিলো এইটা কোন বই। এরিস্টটল তার অন্যান্য বইয়ে কী লিখছে, সেটার উপর ভিত্তি করে ব্যাস্কারভিল সহজেই এই কনক্লুশনে আসছিলো। যাই হোক, নিজের ঢোল পিটানোর জন্যে এই প্যাসেজটা লিখতেছি না, এটা আর্টিকেলের শেষেই আপনারা বুঝতে পারবেন।

বায়ার্দের বইটার আরেকটা কৌতূহলোদ্দীপক প্রস্তাবনা হইতেছে, যে বইগুলা পড়া হয় আমাদের, তার ভিতরের বিশাল একটা অংশই আমরা ভুইলা যাই।  প্রকৃতপ্রস্তাবে, আমাদের মনে বইগুলা কেমনে ধরা দিছে সেটার উপর ভিত্তি করেইআপনমনে ভার্চুয়াল ছবি বানাইতে থাকি বইগুলা নিয়ে, যার সাথে বইয়ের কথার  মিল নাও থাকতে পারে। ফলে, কেউ যদি একটা বই না পড়ে সেটা থেকে একটা মনগড়া প্যাসেজ অথবা সিচুয়েশন বর্ণনা করে, আমরা সহজেই বিশ্বাস করে ফেলি যে আসলেই সেটা বইয়ে আছে।

বই পড়ার ব্যাপারটাকে বায়ার্দ অন্য মানুষের আইডিয়া পড়া হিশাবে দেখতে নারাজ। এই জায়গায় আইসাই সে সাহিত্যের প্রফেসরের মতো চিন্তা না করে চিন্তা করে সাইকোঅ্যানালিস্টের মতো। তার মতেঃ যে কোন ধরণের পড়া, না পড়া, অসম্পূর্ণ পড়ার একটা ক্রিয়েটিভ অ্যাসপেক্ট আছে।  এই জিনিশটা পাঠকরা যে যার যার মতো করে বানায়া নেয়। এবং বায়ার্দ এমন একটা স্কুলের সম্ভাবনার দিকে আগ্রহী, যেখানে ছাত্ররা ‘আবিষ্কার’ করবে কোন ধরণের বই তাদের পড়া লাগবে না। কারণ না পড়া বই নিয়ে কথা বলা এক ধরণের আত্নসচেতনতা।

বায়ার্দ এটাও দেখাইছে যে, কীভাবে একজন একটা বই না পড়েও সেই বইটা নিয়ে আরেকজনের সাথে আলাপ করতেছে যে কী না আসলেই বইটা পড়ছে। অথচ যে বইটা পড়ছে, সে আরেকজনের ভুলভাল ধরতে পারতেছে না। এই বইটার শেষে লেখক স্বীকার করছে যে, ‘দ্যা নেইম অফ দ্যা রোজ’, গ্রাহাম গ্রিনের ‘দ্যা থার্ড ম্যান’ আর ডেভিড লজের ‘চেইঞ্জিং প্লেইসেস’-এর  সামারিতে সে ইচ্ছাকৃত তিনটা ভুল তথ্য ঢুকাইছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হইলো, আমি যখন বইটা পড়ছি তখন গ্রাহাম গ্রিনের ভুলটা সাথে সাথেই ধরতে পারছি, ডেভিড লজেরটা নিয়ে সন্দেহে ছিলাম আর আমার বই নিয়ে ভুল তথ্যটা চোখেই পড়ে নাই। এটা সম্ভবত প্রমাণ করে আমি বায়ার্দের বইটা ঠিকমতো পড়ি নাই, অথবা, এবং একই সাথে সে এবং আমার পাঠকরা  সন্দেহ করতে পারে আমি বইটায় জাস্ট চোখ বুলায়া গেছি। কিন্তু সবচেয়ে ইন্ট্রেস্টিং ব্যাপার হইলো, তিনটা ইচ্ছাকৃত ভুল ঢুকানোর কথা স্বীকার করে সে নিজেই মাইনা নিলো যে এক ধরণের পড়ার থেকে আরেক ধরণের পড়া সঠিকতর। ফলে যে বইগুলার উল্লেখ বায়ার্দ তার বইয়ে করছে, তার সবগুলারই একটা ঝানু পাঠ তার নিতে হইছে- শুধুমাত্র সেগুলা পড়তে হবে না এই তত্ত্ব প্রমাণের জন্যে। এই কন্ট্রাডিকশনটা এতটা স্পষ্ট যে, একজন অবাক হয়ে ভাবতেই পারে বায়ার্দ কী আসলে নিজের বইটা পড়ে দেখছে।

 

আল্লা সাক্ষী আমি বেকুব (২০১০)

সেদিন এক সকালে আমি আমার রাজার সাথে লাঞ্চে করতেছিলাম। ভুল বুইঝেন নাঃ রিপাব্লিকানদের প্রতি আমার শক্ত সমর্থন থাকার পরেও দুই বছর আগে আমাকে রেদোন্দা রাজ্যের ডিউক হিশাবে অভিষিক্ত করা হয়। আমার টাইটেল ছিলঃ দুক্যে দে লা আয়লা দেল দিয়া দে আন্তেস। আমার সাথে এই খেতাবে আরও যারা সম্মানিত হইছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন পেদ্রো আলমদোভার, এ এস বায়েত, ফ্রাঙ্কিস ফোর্ড কপোলা, আর্তুরো পেরেস রেভের্তে, জন অ্যাশবেরি, ওরহান পামুক, ক্লাউদিও মাগরিস, রে ব্র্যাডবেরি এবং আরও কয়েকজন। এদের মধ্যে মিলটা হইলো- উল্লেখিত সবাইকেই রাজায় পছন্দ করছে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজে অবস্থিত রেদোন্দা দ্বীপের আয়তন ত্রিশ বর্গকিলোমিটার, বলা যায় একটা রুমালের সমান। একেবারেই বসতীহীন দ্বীপ, দেইখা মনে হয় না কখনো কোন রাজা এই দ্বীপে পা ফেলছে। ১৮৬৫ সালে ম্যাথিও ডাউডি শায়ল নামের এক ব্যাংকার এই দ্বীপ অধিগ্রহণ করে রাণীর কাজে আর্জি জানায় জায়গাটায় স্বাধীন রাজত্ব কায়েমের। রাণী খুশি হয়েই তা মাইনা নেয়, কারণ তার কাছে মনে হইছিলো এই পুচকা জায়গা ব্রিটিশ উপনিবেশিক সাম্রাজ্যের জন্য কোন প্রকারের হুমকি ডাইকা আনবে না। সময়ের সাথে সাথে এই দ্বীপের মালিকানা অনেকবার হাতবদল হইছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ একই জায়গা নানাজনের কাছে বিক্রি করছে, ফলে আইনগত ফ্যাসাদও ছিলো দ্বীপটা নিয়ে। আপনি যদি রেদোন্দো দ্বীপের মালিকানার বংশ নিয়ে জানতে আগ্রহী হন, তাহলে উইকিপিডিয়াতে এর আর্টিকলটা চেক করতে পারেন। ১৯৯৭ সালে দ্বীপের শেষ রাজা স্প্যানিশ লেখক হাভিয়ার মারিয়াসকে দ্বীপটার অধিপতি ঘোষণা করে নিজের এই রাজত্ব হস্তান্তর করে দেয়। এরপর থেকেই লেখক-রাজা হাভিয়ার মারিয়াস অতি উৎসাহে দ্বীপের ডানে, বামে মাঝখানে নানা জায়গায় ডিউক অভিষিক্ত করা শুরু করে।

এইটাই হলো আমার ডিউক হওয়ার ঘটনা। যদিও এর মধ্যে একটা প্যাটাফিজিক্যাল মূঢ়তার গন্ধ আছে। তারপরেও… প্রতিদিন নিশ্চই কেউ ডিউক হওয়ার সুযোগ পায় না। যাই হোক, এতকিছু বলার উদ্দেশ্য অন্য। সেদিন সকালে মারিয়াস আমাকে তার একটা  ইন্ট্রেস্টিং পর্যবেক্ষণ জানাইছিলো। আমরা আলোচনা করতেছিলাম যে, আজকালকার মানুষজন টিভিতে যাওয়ার জন্যে কী না করতে পারে। এমন কী টিভিতে কারো সাক্ষাৎকার নেয়া হইলে তার পিছনের ভিড়ে বইসা হাত নাড়ানোর জন্যে হইলেও সে টেলিভিশনে যাইতে রাজি। কিছুদিন আগে ইটালিতে খুন হওয়া বোনের এক ভাইয়ের কাহিনী  কানে আসলো। এক পত্রিকার ক্রাইম কলামে ভাইটার নাম মেনশন করা হইছিলো। এই ঘটনার পরে সে এক টেলিভিশন সেলেব্রিটির কাছে গিয়া আর্জি জানায় তাকে যাতে টিভির পর্দায় ডাকা হয়, কারণ সে তার বোনের খুনের হৃদয়বিদারক ঘটনা সবাইকে বলতে চায়। আমরা এমন অনেককেই চিনি যারা লাইমলাইট পাওয়ার জন্যে যে কোন কিছু করতে রাজি- পরকীয়া করা হাজব্যান্ড থেকে শুরু কইরা প্রতারক, ইমপোটেন্ট কোন পরিচয়েই তার সমস্যা নাই, কিন্তু লাইমলাইটা তার পাইতেই হবে। ক্রাইম সাইকোলজিস্টদেরও এটা অজানা না যে সিরিয়াল কিলাররা খুন করার বেসিক কারণই  হচ্ছে কেউ যাতে তাকে খুইজা বের করতে পারে, কারণ খুইজা বের করতে পারলেই সে বিখ্যাত।

আমরা ভাবতেছিলাম, এই মূঢ়তার কারণ কী? মারিয়াসের ধারণা, এর সাথে মানুষের ঈশ্বরে না বিশ্বাস করার একটা সংযোগ আছে। একটা সময় ছিল যখন মানুষ ভাবতো এট লিস্ট একজন অন্তত আছে যে আমাকে দেখতেছে। সেই একজন জানে সে কী চিন্তা করতেছে, কী কাজ করতেছে। সেই একজন তার প্রতি দয়াশীল, এমন কী সময়ে সময়ে তার ভুলত্রুটি নিয়ে নিন্দাও করে। সেই মানুষটা মেবি সমাজচ্যুত, অকর্মা। চারপাশের মানুষ চোখে হয়তো সে লুজার ছাড়া কিছুই না, মরার পরে তাকে মনে রাখার কেউই নাই – কিন্তু তারা অন্তত এই বিশ্বাসটা লালন করে গেছে যে, কেউ একজন তার সম্পর্কে সব জানে।

অসুস্থ দাদী, যার নাতিপুতিরা তাকে ছাইড়া চলে গেছে, হয়তো বলতো, ‘আল্লা মালুম আমি কত ভুগছি’।

বিনা কারণে সাজাপ্রাপ্ত মানুষ সান্ত্বনার জন্যে বলতো, ‘আল্লা জানে আমি নির্দোষ’।

অকৃতজ্ঞ পোলাপানরে তার মা বলতো, ‘আল্লা সাক্ষী আমি তোমাদের জন্যে কতকিছু করছি’।

ছ্যাকা খায়া প্রেমিক চিল্লাইতো, ‘আল্লা জানে আমি তোমাকে কত ভালোবাসি’।

চারদিকে থেকে মারা খাওয়া হতভাগা মানুষটা, যাকে কেউ পাত্তা দেয় না,  তার অন্তত বলার ছিল, ‘একমাত্র আল্লা জানে আমার কীসের ভিতর দিয়ে যাইতে হইছে’।

যেহেতু এই সর্বদর্শী সাক্ষীকে তাদের কাছ থেকে ছিনায়া নেয়া হইছে, তার অনুপস্থিতিতে মানুষের আর আছে কী? এখন তাদের চারপাশে শুধু সমাজের চোখ, ‘অন্যের’ চোখ – যাদের সামনে নিজেরে প্রকাশ করতেই হবে। প্রকাশ না করলেই তুমি ব্ল্যাকহোলের নামহীনতায় হারায়া যাবা, হারায়া যাবা বিস্মৃতির ঘূর্ণিতে। এই ভয়ে কেউ গ্রামের সেই ন্যাংটা পাগলহইতেও আপত্তি করতেছে না।

টেলিভিশনে ডাক পাওয়াটা আসলে সেই ‘সর্বদর্শী সৃষ্টিকর্তা’ ধারণার একটা প্রতিস্থাপন মাত্র। টিভিতে যাওয়াটা এক প্রকারের ট্র্যানছেনডেন্স, যার মাধ্যমে সবাইকে সে নিজের ব্যাপারে জানাইতে পারে। লোকজন টিভিপর্দা নামের পরকালে নিজেরে দ্যাখে এবং সবার সামনে নিজেরে প্রকাশ করে। কিন্তু এর বিপরীতে, সেই টিভিপর্দার পরকালে যারা আছে,তাদের চলাচল মূলত টিভিপর্দার বাইরের দর্শকদের ইহকালেই। আবার, বাইরের দর্শক আর টিভিতে যারে দেখায় সেইসব মিলায়াই এই ইহকাল। চিন্তা করে দ্যাখেন, এই ইহকাল-পরকালের যাতায়াত ক্ষণস্থায়ী এবং ত্বরিত হইলেও এর মাধ্যমে অমর হওয়ার একটা সুযোগ সৃষ্টি হইতেছে। একইসাথে নিজেদের পৃথিবী আর কল্পিত ঊর্ধ্বলোক, দুই জায়গাতেই আমাদের কীর্তন গাওয়া হইতেছে এই পুরা ঘটনায়।

ঝামেলাটা হইলো, এই ‘স্বীকৃতি’টা দ্ব্যার্থবোধক। আমরা সবাই চাই আমাদের শ্রম, মেধা, ত্যাগ কিংবা যেকোন ভালোত্বই যাতে ‘স্বীকৃত’ হয়। কিন্তু টেলিভিশনে হাজিরা দেয়ার পরে মানুষজন আমাদের যখন দ্যাখে তখন বলে, ‘তোমারে চিনছি, গতরাত্রে তোমারে টেলিভিশনে দেখলাম’। এই ‘মুখচেনার স্বীকৃতি’ আর স্বীকৃতি পাওয়া কিন্তু সম্পূর্ণই আলাদা দুইটা জিনিশ।

 

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
শফিউল জয়

শফিউল জয়

জন্মঃ ১৯৯৩ এপ্রিল। অনুবাদক। থাকেন জার্মানিতে। পড়াশোনা করতেছেন ভারতবর্ষের উপনিবেশিকতা নিয়ে।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য