Main menu

হারুকি মুরাকামি’র গল্প: ইয়েসটারডে

হারুকি মুরাকামি বাংলাভাষায় পরিচিত হইতে শুরু করছেন। নরমালি এইরকমের ঘটনাটা ঘটে কোন লেখকের বুকার বা নোবেল পাওয়ার পরে; যখন সাহিত্য-সম্পাদকরা অনুবাদকদের তাগদা দিতে থাকেন আপডেটেড হওয়ার লাইগা বা লেখক-অনুবাদকরা আপডেটেড হওয়া তাগিদটা জোরেশোরে ফিল করতে থাকেন! মুরাকামি কোন পুরস্কার ছাড়া তার জনপ্রিয়তা দিয়াই এই চাপটা দিতে পারতেছেন মনেহয়।

মুরাকামির সবচে রিসেন্ট গল্প ইয়েসটারডে’র ইংরেজি অনুবাদ ছাপা হইছিলো দ্য নিউইয়র্কারে জুন ৯, ২০১৪ তে। বাংলায় অনুবাদ হইতে তাও দুইমাস সময় লাইগা গেলো! তারপরও যে হইলো, এর কৃতিত্ব পুরাটাই বাংলা অনুবাদকের।

___________________________________

হারুকি মুরাকামি’র গল্প:

ইয়েসটারডে

 

বিটলস এর গান “ইয়েসটারডে”র অনুরূপ, যদ্দুর জানি, কিটারু নামের লোকটিই জাপানের আলাদা বৈশিষ্টের কানসাই আঞ্চলিক ভাষায় নিজস্ব একটা সংস্করণ বানিয়ে বাথরুমে গোসল করার সময় গাইতো। তার গাওয়া গানটির কথা-

‘গতকাল
আগামীকালের দুইদিন আগের দিন
এই দিন দুই দিন আগের পরের দিন।’

আমার মনে পড়ে এভাবেই শুরু কিটারু সংস্করণ গানটি। বহুদিন হল, গানটি শুনি নাই এবং পুরো গানের কথাগুলোও নিশ্চিত মনে নেই। তবে মনে আছে, কিটারুর গান পুরোটাই অর্থহীন আর বিটলস এর গানের অর্থের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নাই। সেই চেনাজানা সুন্দর বিষাদময় মধুর স্বর সহযোগে প্রাণবন্ত কানসাই ভাষায় মিলিয়ে, কিন্তু যেটি আবার করুণ রসের বিপরীত- তবু এক ধরণের অদ্ভুত মিল দিয়ে গায় সে। মূলত তা আমার কাছে মনে হয়েছে গঠনমূলক কোনো কিছু প্রত্যাখ্যানেরই স্বরধ্বনি। সে-সময় আমি শুধু শুনছিলাম আর মাথা নাড়ছিলাম। আমি সেটা হেসে উড়িয়ে দিতে পারতাম, কিন্তু আমি টের পাই এতে এক ধরনের গুপ্ত মর্ম আছে।

কিটারুর সাথে আমার প্রথম দেখা ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে একটা কফিশপে। সেখানে আমরা পার্টটাইম কাজ করতাম, আমি কিচেনে আর কিটারু ওয়েটার। দোকানটিতে আমরা অবসরে অনেক কথা বলতাম। আমরা দু’জনের বয়স কুড়ি ছিল। জন্মদিনও ছিল মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে।

“নামের শেষার্ধ কিটারু কেমন-কেমন লাগে।” একদিন আমি বললাম।
হুমম, নিশ্চয়”। জবাব দিল কিটারু ভারী কানসাই উচ্চারণ-ভঙ্গিতে।
“এই নামে লটে বেইজবল টিমের এক খেলোয়াড় ছিল।”
“আমরা একে অন্যকে জানি না, এই নামটা খুব সাধারণ না, তা সত্বেও, কে জানে- এতে কোথাও কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে।”

আমি তখন ওয়াসেদা-তে দ্বিতীয় বর্ষে সাহিত্য বিভাগে। কিটারু এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ফেল করেছিল। সে আবার পরীক্ষা দেয়ার জন্যে ক্রাম স্কুলে প্রস্তুতি কোর্স নিচ্ছিল। সে দুইবার ফেল করেছিল। কিন্তু তার কাজ-কাম বা চলন-বলন দেখে আপনি বুঝতে পারবেন না। সে পড়ালেখায় যেন খুব মনোযোগ দিতো না। অবসরে সে খুব পড়তো কিন্তু সেসব পরীক্ষার পড়া না। পড়তো জিমি হেনড্রিক্সের জীবনী, শগি খেলার সমস্যাসমুহ (শগি- দাবার মতো এক ধরণের জাপানি খেলা), ‘হোয়ার ডিড দ্য ইউনিভার্স কাম ফ্রম’- এই রকম বই। আমাকে সে বলেছিল, তার মা বাবা যেখানে থাকে, টোকিওর অটা ওয়ার্ড, সেখান থেকে ক্রাম স্কুলে বদলি নিয়ে এসেছে।

“অটা ওয়ার্ড? ” আমি অবাক হয়ে জিগে্যস করি। “কিন্তু আমি নিশ্চিত ছিলাম তুমি কানসাই থেকে”।
“মোটেই না। ডনএনচোফু আমার আসল ঠিকানা”।
এই ব্যাপারটা আমাকে নাড়া দিল। আমি জিগ্যেস করি-
“তাইলে তুমি কেমনে এতো পরিস্কার কানসাইয়া বলো?”
“আমি শিখেছি, একেবারে নিজেকে তৈরী করেই শিখেছি।”
“এটা তোমার শেখা?”
“হুম, আমি খুব পরিশ্রম করেছি এটা শিখবার জন্যে। দেখো, ক্রিয়াপদ, বিশেষ্য, স্বরভঙ্গি ইত্যাদি সব শিখেছি। ঠিক যেভাবে ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ শিখতে হয়। এমনকি কানসাইয়ে ট্রেনিংয়েও গিয়েছি।”

তাহলে দেখা যাচ্ছে, এমন লোকও ছিল যিনি বিদেশি ভাষা শেখার মতো করে কানসাইয়ের আঞ্চলিক ভাষা শিখতো? এটা একটা সংবাদ ছিল আমার কাছে। এতে আমি বুঝলাম পুনরায়, সব মিলিয়ে টোকিও কতো বড় আর এর ভেতরে কতো কিছু ছিল যা আমি জানতাম না। আমার মনে পড়লো ‘সানশিরু’ উপন্যাসের কথা, যেখানে একটা টিপিক্যাল বালক বিশাল শহর ঘুরে বেড়ায় অস্বাভাবিকভাবে, সে-গল্প মনে পড়ে।

“ছেলেবেলায় আমি খুব পছন্দ করতাম হেনশিন টাইগার্স বেইজবল দলটিকে।” কিটারু কথা খোলাসা করতে শুরু করে। “টোকিওতে তারা যতবার খেলতো ততবারই দেখতে যেতাম। কিন্তু হেনশিন ব্লিচারে বসে টোকিওর ভাষায় কথা বললে কেউ পাত্তা দিতো না। সে-সমাজের একজন হতে পারতাম না, বুঝেছ? তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমাকে কানসাই শিখতে হবে এবং লেগে গেলাম শিখতে একেবারে কুকুরের মতো।”
“ওই ব্যাপারটাই তোমার প্রেরণা?” আমি বিশ্বাস করতে পারি নি।
“ঠিক, এতে বুঝে নাও হেনশেন টাইগার্স আমার কাছে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ”। কিটারু বললো। আরো বললো, “এখন স্কুলে, ঘরে, সব সময়, এমনকি ঘুমের মধ্যেও কানসাই ভাষায় কথা বলি। তোমার কি মনে হয় আমি তো ষোলআনার কাছাকাছি বলতে পারছি?”
“একদম বরাবর, আমি তো নিশ্চিত ছিলাম তুমি কানসাইয়ের বাসিন্দা আসলেই।” আমি বলি।
“কানসাই শিখতে যতোটা খেটেছি, অতোটা খাটুনি যদি আমি এন্ট্রান্স পরীক্ষা পাশের জন্যে করতাম, তাইলে দুইবারের ফেইল মারা কেউ হতাম না।” – কিটারু বললো।
তার কাছে একটা কারণ আছে বটে, কিন্তু কানসাইয়ের মানুষদের মতোই তার নিজের মতে-মতে চলা।
“তো, তোমার বাড়ি কই”- কিটারু প্রশ্ন করে।
“কানসাই, কুবে-র কাছে”। – আমি বললাম।
“কুবে-র কাছে? কোথায়?”
উত্তর দেই- “আশিয়া”।
” ওয়াও! সুন্দর জায়গা! তুমি প্রথমে বলো নাই কেন?”

আমি খুলে বললাম। মানুষেরা যখন জিগ্যেস করতো আমি কোথাকার, তখন আমি বলতাম আশাইয়া। তারা সব সময় মনে করতো আমি বড় লোকের ঘরের। আসলে আশাইয়াতে ধনী গরীব সব রকমের পরিবারই ছিল। আমাদের পরিবার বিশেষত স্বচ্ছল ছিল না। আমার বাবা একটা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীতে চাকরী করতেন আর মা ছিলেন লাইব্রেরীয়ান। আমাদের বাড়ি ছিল ছোট আর ক্রিম রঙের একটা করল্লা গাড়ি তাই পরে, কেউ জিগে্যস করলে আমি বলতাম, “কোবে-র কাছে”। ফলে তারা আগে ভাগেই আমার সম্বন্ধে ধারণা করতে পারতো না।

“আরে মিয়া, তুমি আর আমি দেখি একই রকমের।” – কিটারু বললো। “আমার ঠিকানা ডনএনচোফু— খুব অভিজাত এলাকা। আমাদের বাড়িটা শহরের অপরিচ্ছন্ন এলাকায়, আমাদের বাড়িটাও জীর্ণদশার। তোমার একবার বেড়াতে আসা উচিত। তুমি অবাক হবে- এই বুঝি ডনএনচোফু? মোটেই না! তবে এ ব্যাপারে মন খারাপ করা কোনো মানে হয় না, তাই না? এটা একটা ঠিকানা মাত্র। আমি উল্টো করি— আমার বেহাল বাড়ি-ঘরের দশা না-বুঝাবার জন্যে আমি জোর দিয়ে বলি, আমি ডন- এন- চোফু থেকে এসেছি। তোমারই মতন ব্যাপারটা আর কি। তোমার কেমন লাগে, হ্যাঁ?”

হাইস্কুল থে’কে গ্রেজুয়েট না-হওয়া পর্যন্ত, আমি শুধু কানসাই ভাষায় কথা বলতাম। কিন্তু টোকিও-তে এসে মাত্র এক মাসে অনর্গল টোকিও-র ভাষায় কথা বলা শিখে ফেলি। আমি একটু বিস্মিত হলাম এতো জলদি আয়ত্বে আনতে পারলাম ব’লে। হতে পারে আমার ব্যক্তিস্বভাব গিরগিটি টাইপের। অথবা ভাষা বুঝবার ক্ষমতা আমার সাধারণের চাইতে বেশি। যাইহোক, এখন কেউ বিশ্বাস করে না আমি কানসাইয়ের।
কানসাই বলা বাদ দেয়ার অন্য কারণ আমি চেয়েছিলাম সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ হতে।

যখন আমি কানসাই থেকে টোকিও গেলাম কলেজে পড়া শুরু করতে, আমি দ্রুত গতির বুলেট-ট্রেনের গতিতে মানসিকভাবে পর্যালোচনা করি আমার অতিক্রান্ত আঠারো বছর। আমি বুঝলাম যা-কিছু ঘটেছে আমার প্রতি সবই পরিস্কার বেইজ্জতি। আমি বাড়িয়ে বলছি না। আমি সে-সবের কোনো কিছু মনে আনতে চাইছিলাম না- ওসব খুব মর্মান্তিক। যতো আমি তখন পর্যন্ত ভাবি, ততোই নিজেকে ঘৃণা করছিলাম। তার মানে অবশ্য এ-ও না যে আমি পাই নি কিছু ভাল স্মৃতি। পেয়েছি। যথেষ্ট সুখের অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু সুখের স্মৃতিগুলোর চেয়ে লজ্জা কষ্টের স্মৃতি অনেক বেশি। যখন ভাবি, কিভাবে আমি জীবন যাপন করছিলাম, কিভাবে জীবন এগিয়ে যাচ্ছিল, সবই বাজে এবং খুব কষ্টদায়ক অর্থহীন। ওসব মধ্যবিত্তের আবর্জনা, সৃজনশীলতাহীন জীবন। আর আমি চেয়েছিলাম এসব জমা রাখবো দূরে কোথাও ড্রয়ারে, অথবা আগুনে জ্বালিয়ে দেখবো ধোয়া হয়ে এসবের শেষ হওয়া (যদিও কি ধরণের ধোয়া হয়- আমার আইডিয়া নাই)। যাইহোক, আমি চাইছিলাম ওসব থেকে মুক্ত হয়ে একেবারে নতুন মানুষ আকারে টোকিও-তে নতুন জীবন। কানসাই ভাষা ত্যাগ করা ছিল বাস্তবিক ও প্রতীকি পদ্ধতি এই অর্জনের ক্ষেত্রে। কারণ, চুড়ান্ত বিশ্লেষণে মানুষ কে কি ধরণের তা ভাষার দ্বারা ধরা যায়- আঠরো বছর বয়সে আমি এমনই ভাবতাম।

”বেইজ্জতি? কী আসলে খুব বেইজ্জতির?” কিটারু জানতে চাইলো।
“তুমি এটা মনে করছো”।
“তোমার স্বজন বা লোকাচার থেকে অমন পাও নি?”
“পেয়েছি”। আমি বলি। “তবু ওটা ছিল লজ্জাজনক। তাদের সাথে থাকা আমার মনে হতো বেইজ্জতি”।
“তুমি অদ্ভুত, বুঝলে?” কিটারু বললো। নিজের গোষ্ঠী-জ্ঞাতির সাথে থাকাতে বিব্রত হওয়ার কি আছে? আমার লোকদের সাথে আমার ভাল সময় কাটে”।

আমি আসলে ব্যাখ্যা করতে পারি না। ক্রিম কালার করল্লা গাড়ি থাকাতে খুব খারাপ কী? আমি বলতে পারি না। বাইরের চাকচিক্যের জন্যে আমার মা বাবা খরচ করতে আগ্রহী না। ব্যাপারটা এই-ই।

“আমি লেখাপড়ায় মনোযোগি না ব’লে আমার মা বাবা আমার ব্যাপারে মাথা ঘামান। আমি পছন্দ করি না তাদের মাথা ঘামানি। কিন্তু তুমি কি করবে? ওটা তাদের কাজ। তুমি ওসব অতিক্রম করে যাও, বুঝলে?” কিটারু বললো।
“তুমি খুব সরল, তাই না?” আমি বলি।
“মেয়েবন্ধু আছে?” কিটারু জানতে চায়।
“এখন নাই।”
“আগে কি একজন ছিল?”
“একটু আগে পর্যন্ত ছিল।”
“তোমরা সম্পর্ক ভেঙ্গেছ?”
“সেটা ঠিক”। আমি বললাম।
“তুমি ভাঙলে কেন?”
“এটা লম্বা ইতিহাস। এর ভেতরে যেতে চাই না।”
“মানে, সে তোমাকে চলে যেতে দিয়েছিল?”
আমি মাথা নেড়ে জানাই, “না, মোটেই না।”
“এই কারণে তুমি সম্পর্ক ছিন্ন করেছ?”
“তা কিছুটা বটে”।
“সে কি তোমাকে থার্ড বেইস- যেতে দিয়েছিল?”
“থার্ড বেইস অতিক্রম করেছি।”
“ঠিক কতদূর গিয়েছিলে?”
“এ ব্যাপারে বলতে চাই না।” আমি বললাম।
“এটাও কি তোমার আগে বলা বিব্রতকর বিষয়গুলার একটি?”
“হুম”। আমি জানাই।
“আরে ভাই, বেশ জটিলতায় ছিলে তুমি ওখানে।” কিটারু বললো।

বিটলস এর ‘ইয়েসটারডে’ গানটির কিটারুর নিজের সংস্করণ প্রথম শুনেছিলাম ডনএনচোফু-তে তার বাড়িতে। সে বাথরুমে গাইতেছিল। তার বাড়িটা সাধারণ বাড়ি, জীর্ণদশার না, আমার আশাইয়ার বাড়ির চেয়ে বড়, একটি পুরাতন বাড়ি। মানে, বিশেষ নজর কাড়বার কিছু না। আশেপাশে বেহালদশার বাড়ি আছে বটে। এরিমধ্যে চোখে পড়ে তার বাড়ির রাস্তায় নেভি ব্লু গলফ গাড়িটা সাম্প্রতিক মডেলের। কিটারু বাড়িতে এসেই কাপড়চোপড় খুলে বাথরুমে ঢুকে। আর স্নানের টাব থেকে যেনো সে উঠবেই না। তাই আমি প্রায়ই লাগোয়া রুমে একটা টুল টেনে নিয়ে বসি এবং বাথরুমের এক পরিমান খোলা দরজা দিয়ে তার সাথে কথা বলি। এতে তার মায়ের মাঝে মাঝে ক্লান্তিকর বকবকানি পড়ালেখায় অমনোযোগি ছেলের উদ্দেশে, তা শুনতে হয় না। (তার মায়ের কথাতে অভিযোগ আর তাকে আরো ভালো পড়ালেখা কিভাবে করতে হবে তা থাকে।)

“তোমার ওই গানের কোনো অর্থ নাই। তুমি দেখি “ইয়েসটারডে” গানটা নিয়ে মশকারি মারতেছ।”
“পন্ডিত হইও না। আমি মশকারি করতেছি না ওটার। যদি-বা করে থাকি, তোমার স্মরণ করা উচিত- জন অর্থহীনতা পছন্দ করতো আর শব্দ দিয়ে খেলতো, ঠিক আছে?”
“কিন্তু তিনি পল, যিনি গানটি লিখেছিলেন আর সুর করেছিলেন “ইয়েসটারডে”র জন্যে।”
“তুমি নিশ্চিত?”
“অবশ্যই”। আমি ঘোষণা দেই। “পল লিখেছিলেন আর নিজে স্টুডিওতে একটি গিটার সহযোগে রেকর্ড করেছিলেন। চৌতালের একটি ধারা পরে যোগ করা হয়েছিল। অন্য অংশের সাথে বিটলস সম্পৃক্ত ছিল না। তারা ভেবেছিল বিটলস এর গানের জন্যে এটা জুতসই না, নিম্নমানের।”
“তাই নাকি? ” আমার মাথায় ওসব বিশেষ সুবিধার তথ্য নাই।”
“এটা বিশেষ সুবিধার তথ্য না, সকলের জানা বিষয়।” আমি বললাম।
“কে এসব হিসাব করে? ওসব কেবল বিশেষ তথ্য।” তেজ নির্মিত মেঘপুঞ্জ হতে কিটারু শান্তভাবেই বললো। “আমি আমার বাড়ির স্নানঘরে গাইছি, কোনো রেকর্ড-বেকর্ড করছি না। কারো কপিরাইট লংঘন করছি না, কাউকে বিরক্ত করছি না। তোমার কোনো অধিকার নাই অভিযোগ করবার।”

সে কোরাসের মতো উচ্চস্বরে গাইতে শুরু করে। উচ্চ মাত্রার স্বরব্যঞ্জনে গানটি তার ফোটে ভাল। আমি শুনলাম সে কিছুটা পানি বাথটাবে ছিটিয়ে সুরের সাথে তাল মিলাতে থাকলো। সম্ভবত আমার উচিত ছিল ওর সাথে গেয়ে তাকে প্রেরণা দেয়া। কিন্তু আমি পারি নি নিজেকে সম্পৃক্ত করতে। ওখানে বসে, গ্লাসের দরজার ফাক দিয়ে ওর সাথে কথা বলা, যখন বাথটাবে সে এক ঘন্টা ভিজে থাকে, আসলে শুধু মজা করা না।
“কিন্তু তুমি কেমনে এতো লম্বা সময় বাথরুমে ভিজে থাকো”। আমি জিগ্যেস করি। “তোমার শরীর স্ফিত হয় না?”
“আমি যখন বাথরুমে লম্বা সময় ধরে ভিজে থাকি, সকল ভাল ধারণা আমার মাথায় আসতে থাকে”। কিটারু বললো।
“তুমি কি বলতে চাও ‘ ইয়েসটারডে’র সাথে মিলিয়ে তোমার গানের কথাগুলোও গুড আইডিয়া আনে?”
“হুম, অনেকগুলোর মধ্যে ওটাও একটা।” কিটারু বললো।
আমি প্রশ্ন করলাম- “বাথরুমে নানা আইডিয়া নিয়ে চিন্তা করতে সময় না-দিয়ে, তোমার কি উচিত না এন্ট্রান্স পরীক্ষার পাঠ পড়া?”
“জিইইইযi, তুমি কি আমার বাত্তি নিভাইতে চাও? আমার মা ঠিক এইভাবে বলেন। তুমি কি আরেকটু তরুণ না, মানে, কিছূ জ্ঞানের কথা বা অমন কিছু?”
“কিন্তু তুমি যে দুই বছর ধরে ফেল করে আসছো, এতে ক্লান্তি আসছে না?”
“অবশ্যই, আমি চাই যত তাড়তাড়ি সম্ভব কলেজে যেতে।?”
“তাইলে মনোযোগ দিয়ে পড়ো না কেন বাছাধন?”
“হুম- ভাল”। কিটারু বললো। আর বললো, “পারতাম যদি তা করেই ফেলতাম।”
“কলেজ একটা নেশা”। আমি বললাম। “আমি ঢুকে হতাশ, আর কলেজে যাওয়ার জন্যে তাড়াটাও নেশার চাইতে বেশি।”
“বুঝলাম, তোমার এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমার বলার কিছু নাই।” কিটারু বললো।
“তাইলে তুমি পড়ালেখা করছো না কেন?”
“প্রেরণার অভাব”। সে বলে।
প্রেরণা? তোমার মেয়ে বন্ধুর সাথে বেড়াতে যেতে পারো নি প্রেরণা পেতে?”

প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময় থেকে কিটারু একটি মেয়েকে জানতো। একসাথে পড়তো তারা, বাল্যবন্ধু। দুজন একই গ্রেডে ছিল। মেয়েটি হাইস্কুল পাশ করে সোজা চলে যায় সোফিয়া ইউনি-তে। সে ফরাসি সাহিত্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার পাঠ নিতে থাকে আরএকটা টেনিস ক্লাবে যোগ দেয়। কিটারু আমাকে মেয়েটির একটি ছবি দেখায়। খুব সুন্দরী, দেহের গঠন সুন্দর, মনোভাবও মনোহর। তাদের দুজনের দেখা-সাক্ষাত হয় না আজকাল। তারা এ ব্যাপারে কথা বলেছিল যাতে কিটারু এন্ট্রান্স পাশ না-করা পর্যন্ত তারা ডেটিং করবে না। এর ফলে সে লেখাপড়ায় মনোযোগি হতে পারবে। কিটারুই এ পরামর্শ দিয়েছিল। মেয়েটি বলেছিল, “অকে, তা-ই হোক তুমি যা চাও”। তারা ফোনে কথা বলতো বেশি আর সপ্তাহে একবার দেখা করতো। তাদের দেখা হওয়াটা ঠিক নিয়মিত ডেটিং হতো না, যেনো একে অন্যের সাক্ষাতকার নিতে এই দেখা হওয়া। তারা চা খেতো, একটু ধরাধরি করতো সব সময় যেমন ধরে, মানে হাত ধরতো ছোট চুমু বিনিময় করেতো। তবে তারা খুব সীমা লঙ্ঘন করতো না।

কিটারু এমন কেউ না যাকে হ্যান্ডসাম বলতে পারেন আপনি। তবে দেখতে ভাল লাগে তাকে। সে পাতলা গড়নের, তার চুল পোশাক শাদামাটা কিন্তু শৈলীসিদ্ধ। যতক্ষণ সে কিছু খুলেমেলে না-বলে, আপনি ধরতে পারেন, সে সংবেদনশীল, ভাল শিক্ষা-দীক্ষা পাওয়া একটা শহুরে বালক। তার একমাত্র খুত- মুখটা বেশি পাতলা আর নাজুক। এতে কারো মনে হতে পারে ব্যক্তিত্বহীন দুর্বল। কিন্ত যখনই সে মুখ খোলে ওসব অনুমান যেন ধ্বসে পড়ে ঠিক সেভাবেই, যেভাবে প্রাণোচ্ছল প্রশিক্ষিত কুকুর লেবরাডর ধ্বসিয়ে দেয় শিশুদের বানানো বালিঘর। মানুষ তার কানসাই ভাষা শুনে হতাশ হয়। সে এমনভাবে বলে যেন তার স্বর ও শব্দেরা আঘাত করছে। তার কথার ধরণ আর মুখের ভাবভঙ্গি ভার-ভার লাগে, কথার সাথে মিলেও না। আমিও প্রথম তাকে বুঝে নিতে কিছুটা ধন্ধে পড়েছি।

পরের দিন কিটারু আমাকে জিগ্যেস করে-
“এ্যাই তানিমুরা, তুমি কি মেয়েবন্ধু ছাড়া একা?”
“আমি অস্বীকার করি না।” আমি বলি।
“তাইলে তুমি আমার বান্ধবীর সাথে বেড়াতে গেলে কেমন হয়?”
আমি বুঝতে পারি নি সে কি বলতে চায়, বলি-
“ওর সাথে যাওয়ার মানে কি?”
কিটারু বলে-
“ও দারুন একটা মেয়ে। সুন্দরী সাধবী স্মার্ট, সব দিক থেকেই ভাল। যাও ওর সাথে, আমি নিশ্চিত তুমি পস্তাবে না।”
আমি বললাম-
“না না, আমি যাবো না। তোমার বান্ধবীর সাথে আমি যাবো কেন? এটার তো কোনো মানে হয় না।”
“কারণ তুমি একটা ভাল মানুষ। আর কেউ হলে প্রস্তাব করতাম না। আমি আর এরিকা জীবনটাই কাটিয়ে দিলাম এক সাথে এখন পর্যন্ত। আমরা স্বাভাবিক যুগল জীবন বেছে নিয়েছিলাম, আমাদের চারপাশের সবাই মেনে নেয়। আমার বন্ধুরা, পিতামাতা, আমার শিক্ষকেরা অনুমোদন করেন। একটা হিসেবি যুগল আমরা সারাক্ষণ এক সাথে।” কিটারু বললো।
কিটারু তার এক হাত দিয়ে অন্য হাত জড়িয়ে ধরে ব্যাখ্যা করতে লাগে।
“আমরা দুজন যদি এক সাথে কলেজে ভর্তি হতাম, আমাদের জীবন আন্তরিক আর ঝাপসা হতো। এন্ট্রান্স পরীক্ষার জন্যে আমি অনেকটা সময় নষ্ট করলাম, এখন এই আছি আমরা, আমি জানি না এমন বাজে অবস্থায় কেন পড়লাম, এর জন্যে আমি কাউকে দোষ দেই না, সব আমারই দোষ।”

আমি চুপ হয়ে শুনি তার কথা।
“আমি আসলে এক রকম নিজেকে দুই ভাগ করেছি।” কিটারু বললো দুই হাত দিয়ে দুইদিকে ইশারা করে ।
জিগ্যেস করি- “অমন কেন?
সে তার হাতের তালুর দিকে একবার নজর দিয়ে বললো-
“আমি বলতে চাচ্ছি আমার মনোজগতের অংশ বিশেষ উদ্বিগ্ন, বুঝলে? আমি বলছি, আমি যাচ্ছি বিরক্তিকর ক্রাম স্কুলে, পড়ালেখা করছি বিরক্তিকর এন্ট্রান্স পরীক্ষার জন্যে, যখন এরিকা কলেজে বল খেলে। ওর মন যা চায় তা করতে পারছে, টেনিস খেলছে। সে নতুন বন্ধুদের পেয়েছে, হয়তো নতুন কারো সাথে ঘুরতে যাচ্ছে, যেহেতু আমি সব জানি, বুঝলে? যখন ওসব নিয়ে ভাবি, নিজেকে মনে হয় পরিত্যক্ত, আমি দিশাহারা হয়ে যাই, এখন বুঝলে তো কী বলছি?”
“আমার অনুমান অমনই।” আমি বললাম।
“কিন্তু আমার মনের আরেকটা অংশ, মনে করো ঠিক যেনো মুক্ত, পরিত্রাণ প্রাপ্ত। আমরা যদি আগের মতো একসাথে থাকতাম, কোনো সমস্যা নাই আমাদের যুগল জীবনে, সবকিছু স্বাভাবিক চলছে; মানে মনে করো- আমরা দুজনেই গ্রেজুয়েট, বিবাহিত, সবাই এতে খুশি, আমরা পেলাম ধরো দুইটা বাচ্চা, তাদের ভর্তি করলাম ডনএনচোফুর পুরাতন ভাল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, বেড়াতে গেলাম তামা নদী পারে রোববারে, অব-লা-দি অব-লা-দা ii আমি বলছি না অমন জীবন খারাপ কিছু। কিন্তু আমি অবাক হই, দেখো, জীবন যদি এমন সহজ আর আরামদায়ক হয়। বরং এটা ভাল, আমরা কিছুকাল আলাদা কাটাই, যদি আমরা একে অন্যকে ছাড়া চলতে না-পারি, তাহলে ফিরে এসে একসাথে চলবো।”

“তার মানে কি এই যে, তুমি বলতে চাও জীবনের বিষয়-আশয় সহজ স্বাভাবিক চলা বা আরামদায়ক হওয়া একটা সমস্যা?”
“হাঁ, আমি তা-ই বলছিলাম।”
“কিন্তু আমাকে কেন তোমার বান্ধবীর সাথে যেতে হবে?” আমি জিগ্যেস করি।
“আমি মনে করি, সে যদি অন্য কারো সাথে যায়, সেক্ষেত্রে তুমি যদি যাও ভাল হয়। কারণ আমি তোমাকে জানি। তুমি উত্তম, মানিয়ে নিতে সহজে পারবে।

তার ওসব কথা আমার মাথায় ঢুকে না। যদিও আমি স্বীকার করি এরিকার সথে সাক্ষাতের আইডিয়াটাতে আমার সায় ছিল। আমি এও বুঝতে চাইছিলাম কিটারুর মতো অদ্ভুত লোকটার সাথে একটি সুন্দরী মেয়ে ডেটিংয়ে যেতো কেন। নতুন মানুষের সামনে আমি সব সময় লাজুক স্বভাবের, কিন্তু আগ্রহের কমতি হয় না।

আমি জিগ্যেস করি, “কতদূর গিয়েছ ওর সাথে?”
“তুমি কি সেক্স বুঝাচ্ছ?” কিটারু জানতে চায়।
“হুম, তুমি পুরো কাম সারছো?”
কিটারু মাথা নাড়ে। “আমি পারি না, বুঝলে? আমি তাকে জানি তার শৈশব থেকে। ওই ব্যাপারটা তার সাথে মনে হয় বিব্রতকর, বুঝলে? ওটা করতে, মনে করো, আমরা শুরু করছি, তার কাপড় খুললাম, কামক্রীড়া করলাম, স্পর্শ করলাম ইত্যাদি। যদি সে অন্য নারী হতো আমার সমস্যা হতো না। কিন্ত ওর অন্তর্বাসে হাত দেয়া, এমনকি এমন চিন্তা করা ওর সাথে এইটা করার ব্যাপারটা- আমি জানি না- মনে হয় ভুল হচ্ছে কিছু, বুঝলে?”
“না, আমি কিচ্ছু বুঝি নাই।”
“আমি ব্যাপারটা ভালো ব্যাখ্যা করতে পারবো না। মানে, তুমি যখন হস্তমৈথুন করো তখন কোনো বাস্তব মেয়েকে কল্পনা করো, তাই না?” কিটারু বললো।
“আমি তাই মনে করি।” আমি বললাম।
“কিন্তু আমি এরিকাকে ওইভাবে কল্পনায় আনতে পারি না, ভুল করছি মনে হয়, বুঝলে? তাই আমি যখন এটা করি অন্য কোনো মেয়েকে ভাবি, যাকে আমি আসলে খুব বেশি পছন্দ করি না। তুমি কি মনে করো?”
আমি ব্যাপারটা নিয়ে ভেবেছি, কিন্তু কোনো কিনার লাগতে পারি নি। অন্যদের হস্তমৈথুনের অভ্যাস আমার ধারণার বাইরে। আমার নিজের কিছু বিষয় ছিল যা আমি বুঝতে পারি নাই।
“যাইহোক, চলো আমরা তিনজন একবার একসাথে মিলি। তারপরে তুমি এটা নিয়ে চিন্তা করো।” কিটারু বললো।

আমরা তিন- আমি কিটারু আর তার বান্ধবী এরিকা কুরিটানি এক রোববারের বিকেলে ডনএনচোফু স্টেশনের কাছে একটি কফিশপে মিলিত হলাম। এরিকাকে দেখলাম, সে কিটারুর মতোই লম্বা, সুন্দর রোদে পোড়া গাত্রবর্ণ, আর গাঢ় নীল রঙের মিনিস্কার্টের উপর শর্টস্লিভ শাদা ব্লাউজ পরিচ্ছন্ন ইস্ত্রি করা- বেশ সুসজ্জিত, যেনো মর্যাদাসম্পন্ন উপশহর এলাকার একজন টিপটপ কলেজগার্লের মডেল। মেয়েটি তার ছবির মতোই মন টানে। কিন্তু যে-ব্যাপারটা আমার নজর কাড়লো সেটা হলো, তার বাহ্যিক শোভার চাইতে এক ধরণের স্বাভাবিক শক্তির বিকিরণ হচ্ছিল যেনো তার থে’কে। সে কিটারুর ভাব-স্বভাবের বিপরীত। আর মেয়েটির তুলনায় কিটারু কিছুটা নিস্প্রভ।

এরিকা বললো আমাকে, “আমি আসলে খুশি আকি-কুনের একজন বন্ধু আছে দেখে।” কিটারুরর প্রথম নাম আকিওশি। এই দুনিয়ায় এই মেয়েটিই একমাত্র কিটারুকে আকি-কুন ডাকতো।

“বেশি বাড়িয়ে বলো না, আমি অনেক বন্ধু পেয়েছি। কিটারু বললো।

এরিকা বললো, “না তোমার নাই, তোমার মতো কেউ বন্ধু বানাতে পারে না। তুমি জন্মেছিলে টোকিও-তে, তবু সারাক্ষণ কানসাই বলো। হ্যানশিন টাইগার বা শগি চালের বিরক্তিকর ব্যাপারের পর আরেকটা বিরক্তির ব্যাপার- সারাক্ষণ তোমার কানসাইয়া বকবক। তোমার মতো অদ্ভুত মানুষের সাথে সাধারণ মানুষের ভালো চলা কোনোভাবেই সম্ভব না।”
“অকে, তুমি যদি ব্যাপারটা বুঝতে চাও, তাইলে দেখ, এই লোকটাও অদ্ভুত।” কিটারু আমার দিকে ইশারা করে বললো। তার মূল বাড়ি আশাইয়া কিন্তু কথা বলে টোকিও-র ভাষায়।
এরিকা বললো, ওটা খুব সাধারণ ব্যাপার, অন্ততপক্ষে উল্টা হওয়া থেকে তো বেশি সাধারণ।
“থামো, এখন- ওটা তো সাংস্কৃতিক বৈষম্য। সব সংস্কৃতির মান সমান। টোকিওর ভাষা কানসাইয়ের ভাষার চেয়ে উন্নত না।” কিটারু বললো।
এরিকা বললো, “ওসব সমান হতে পারে। কিন্তু মিইজি বিপ্লবের পর, যেভাবে টোকিওর মানুষ কথা বলে আসছে, এই ভাষাটাই জাপানের মান ভাষা। আমি বুঝাচ্ছি, কেউ কি “ফ্রানি এ্যান্ড জুওই” কানসাই ভাষায় অনুবাদ করেছে?”
“কেউ অনুবাদ করলে আমি সেটা কিনতাম নিশ্চিত।” কিটারু বললো।
আমি ভাবলাম, আমিও কিনতাম, কিন্তু চুপ থাকি।
এই আলোচনাকে আরো গভীরে না নিয়ে সুবিবেচনাবোধসম্পন্ন মানুষের মতো এরিকা কুরিটানি বিষয় পরিবর্তন করে।

আমার দিকে ফিরে এরিকা বললো, “আমার টেনিস ক্লাবেও আশাইয়ার একটা মেয়ে আছে। ওর নাম এইকো সাকুরাই। তুমি জানো তাকে?”
“হুম, জানি।” আমি বললাম।
এইকো সাকুরাই লম্বা পাতলা মেয়ে। তার মা বাবা একটা গলফ কোর্স চালাতেন। অহংকারী, চওড়া বুক, মজা-মজা ভাবের নাক, আর বিস্ময়কর ব্যাক্তিত্বের মতো কেউ না। টেনিসে সে সব সময় ভাল। আবার আমার সাথে তার দেখা হয় নাই হয়তো, তবে শীঘ্র দেখা হবে।

“সে ভাল একটা মানুষ। তার বান্ধবী নাই। সে দেখতে ভাল, আচরণও সুন্দর আর সে সব কিছু জানে। এই যেমন তুমি দেখতে পারতেছ সে খুব পরিচ্ছন্ন, তার কোনো মারাত্মক রোগ নাই। সে আশাবাদী এক তরুন আমি বলি।” কিটারু বললো এরিকাকে।
এরিকা বললো, “ঠিক আছে। আমাদের ক্লাবের কিছু আকর্ষণীয় নতুন সদস্য আছে। তাদের সাথে তার পরিচয় করিয়ে দিয়ে আমি খুশি হবো।”
“নাহ, আমি ওটা বুঝাই নি। তুমি কি তার সাথে ঘুরতে যেতে পারো? আমি কলেজে নাই, তবু, মানে, আমি তোমাকে নিয়ে যেভাবে যেতে চাই সেভাবে পারছি না । আমার বদলে তুমি ওর সাথে যেতে পারো। এতে আমি কষ্ট পাবো না।” কিটারু বললো।
এরিকা জিগ্যেস করে, “কী বলো তুমি, তোমার কি কষ্ট পাওয়া উচিত না।”
“আমি বলছি, মানে, দেখো, তোমরা দু’জনকে আমি জানি। আমার পরিচয় নাই এমন কারো সাথে যাওয়ার চাইতে তুমি যদি তার সাথে যাও আমার ভাল লাগবে।” কিটারু বললো।
এরিকা তাকালো কিটারুর দিকে, ভাবটা যেনো, যা দেখছে তা মোটেই বিশ্বাস করছে না। শেষে সে বললো, “তাইলে তুমি বলছো কী তানিমুরা-কুনের সাথে যাওয়া ঠিক আছে? তুমি কি সত্যি বলছো আমরা ডেটিংয়ে যাই?”
“হেই, এটা অমন ভয়ানক ব্যাপার না, তাই না? তুমি এরই মধ্যে কি কারো সাথে যাচ্ছো?”
এরিকা গম্ভীর স্বরে জানায়- “না, অন্য কেউ নাই।”
“তাইলে তার সাথে যাও না কেন? এতে এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিনিময় হতে পারে।”
“সাংস্কৃতিক বিনিময়”- এরিকা পুনরায় বলে আমার দিকে তাকালো।

আমার কোনো কথা তাদের কাজে লাগবে না মনে হচ্ছিল তাই আমি চুপ থাকি। কফির চামচটা হাতে নিয়ে এর নকশার কারুকাজে মনোযোগ দেই, ঠিক যেনো একজন যাদুঘর পর্যবেক্ষক মিশরের প্রত্নতাত্বিক কবরের নকশা গবেষণা করছে।

সাংস্কৃতিক বিনিময়“? মানে কী বুঝাতে চাও?” জিগ্যেস করে এরিকা কিটারুকে।
“মানে অন্যতর বুঝাবুঝি করা আমাদের জন্যে খুব একটা খারাপ হবে না….।”
“এই তোমার সংস্কৃতি বিনিময়ের ধারণা?”
“হুম, আমি যা বুঝাতে চাই…….”
“ঠিক আছে।” দৃঢ়ভাবে বললো এরিকা। যদি তখন আমার হাতের নাগালে একটা পেনসিল থাকতো, আমি ওটা ভেঙে দুই ভাগ করতাম।
“তুমি যদি মনে করো আমাদের সেটা করা উচিত, আকি-কুন, চলো তাহলে সাংস্কৃতিক বিনিময় করি।”

এরিকা এক চুমুক চা নিয়ে কাপটি পিরিচে রাখলো। আমার দিকে ফিরে মুচকি হাসলো। “যেহেতু আকি-কুন পরামর্শ দিলো আমরা ওটা করবার, তানিমুরা-কুন, চলো একদিন বের হয়ে যাই। মজা-মজা লাগছে। কখন তোমার সময় হবে।”
আমি কিছু বলতে পারি নি। সঠিক কথাটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বলতে না-পারা আমার অনেক সমস্যার একটি।
এরিকা তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি লাল নোটবুক বের করে। খুলে দেখে ওর অন্যান্য কার্যসূচী। তারপর জিগ্যেস করে- “শনিবার হলে কেমন হয়?”
আমি জানাই, “আমার কোনো কার্যসূচী নাই।
“তাইলে শনিবার। কখন যাবো আমরা?”
কিটারু বললো এরিকাকে- “তানিমুরা মুভি পছন্দ করে। তার স্বপ্ন কোনোদিন চিত্রনাট্য লিখবার।
“তাইলে চলো মুভি দেখি। কী ধরনের মুভি দেখা উচিত আমাদের? তুমি স্থির করবে তানিমুরা-কুন, হরর আমি পছন্দ করি না, বাকী যেকোনো কিছু হলেই হবে।”
কিটারু বললো আমাকে- “ও আসলে একটা ভিতু বিলাই। শৈশবে আমরা যখন ভূতুরে বাড়ি যেতাম কোরাকুয়েনে, তাকে ধরে থাকতে হতো আমার হাত এবং…..”

“ছবি দেখার পর একসাথে আমরা মজার খাবার খাবো।” এরিকা বললো কিটারুর দিক থেকে মনোযোগ সরিয়ে। সে তার নোটবুক থে’কে এক টুকরা কাগজ নিয়ে ওর ফোন নাম্বার লিখে আমাকে দিল। আর বললো- “যখন তুমি সময় ও স্থান ঠিক করবে, আমাকে ফোন দিতে পারবে?”
আমি তাকে ফিরতি ফোন করি নাই। (এটা সেলফোনের চিন্তার ক্ষীণ আলো আসারও আগের সময়কালে) আমি তাকে কফিশপটির নাম্বার দিয়েছিলাম, যেখানে কাজ করতাম আমি আর কিটারু। এক নজর হাতঘড়িতে সময় দেখলাম।
খোশমেজাজে বললাম, “আমাকে উঠতে হবে। এই রিপোর্ট আগামীকালের মধ্যে শেষ করতে হবে।”
“আরেকটু দেরী করা যায় না? আমরা মাত্র মিলিত হলাম এখানে। আরো কিছুক্ষণ কথা বলবার জনে্য আরেকটু থাকো না কেন? ঠিক এই কোণাতে একটা দারুন নুডলস খাবার দোকান আছে।”

আমি আমার কফির দাম টেবিলের উপর রেখে দাঁড়িয়ে যাই। “এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট”। আমি খুলে বলি। “এই কারণে আমি এটা পরে করবার জন্যে রাখতে পারি না।” আসলে ওটা অতো গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
আমি এরিকাকে বললাম, “আগামীকাল অথবা এর পরের দিন আমি তোমাকে ফোন দিব।
“আমি অপেক্ষায় থাকবো।” সে বললো ঠোঁটে একটা মনোহর হাসি ফুটিয়ে। একটি হাসি, আমার কাছে মনে হলো একটু বেশি ভালো লাগা, ব্যাপারটি সত্য হবে ব’লে।
কফিশপ ছেড়ে আমি যখন স্টেশনের দিকে হাটছিলাম, আমি নিজের কাজের প্রতি বিরক্ত হই, ধ্যত, কী করছিলাম আমি! গভীরভাবে ভাবছিলাম- বিষন্ন হচ্ছিলাম- কীভাবে বিষয়গুলো হাজির হলো দেখে। এরিমধ্যে সবকিছু স্থির হওয়ার পর আমার অমন বিষাদ আক্রান্ত হওয়া দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা।

ওই শনিবার আমি আর এরিকা সাক্ষাত করি শিইহবুইয়াহ-তে। সেখানে নিউইয়র্কে শুরু হওয়া উডি এ্যালানের একটি ফিল্ম দেখি। যেকোনো কারণেই হোক আমি টের পেয়েছিলাম উডি এ্যালানের ছবিগুলো ওর পছন্দের। আর খুব নিশ্চিত ছিলাম কিটারু কখনো তাকে এর একটা ছবি দেখতে নিয়ে যায় নি। ভাগ্য ভাল এটা একটা ভাল ছবি। তাই থিয়েটার থেকে বের হওয়ার পর আমরা দুজনেই খুব খুশি ছিলাম।

আমরা গোধূলিবেলা ফোটানো সড়কে কিছুদূর ধীরে ধীরে হাঁটলাম। তারপর সাকুরাগাওকা’র ইতালীয় প্লেসে গিয়ে পিজা ও চিয়ান্তি খেলাম। এটা একটা মাঝারী মানের রেস্টুরেন্ট। বিদ্যুতের আলো কম, টেবিলে মোমবাতি। (অধিকাংশ ইতালীয় রেস্টুরেন্টে এই সময় ডোরাকাটা গিঙগেম টেবিলক্লথের উপর মোমবাতি রাখে।) iii আমরা সব বিষয়ে কথা বলি। কথার ধরন, আপনি মনে করতে পারেন, কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছাত্রী প্রথম ডেটিংয়ে যেভাবে কথা বলে। ফিল্মটাও আমাদের কলেজ জীবনের রুচি মোতাবেক। আমি যেটুকু আশা করেছিলাম তার চেয়ে বেশি মজা হয়েছে আমাদের কথাবার্তায়। সে কয়েকবার ঠা ঠা হাসিতে ফেটে পড়েছে। আমি যেটুক প্রশংসা করছি তা আওয়াজ করে বলতে চাই না। তবে মনে হচ্ছে আমার মধ্যে মেয়েদের হাসি বাইর করবার সামর্থ আছে।

“আকি-কুনের কাছ থে’কে শুনেছি, তোমার হাইস্কুল বান্ধবীর সাথে সম্পর্ক ভেঙেছো খুব বেশি দিন হয় নি, তাই কী?” এরিকা জানতে চায় আমার কাছে।
“হুম” আমি উত্তর দিলাম। “আমরা প্রায় তিন বছর চললাম, কিন্তু দুর্ভাগ্য, টিকলো না।”
“আকি-কুন বলেছিল না-টিকবার কারণ সেক্স। মানে মেয়েটি পারে নি…কেমনে বলা উচিত?…..মানে, সে তোমার মর্জিমত সবকিছু দিয়েছিল।”
“ওটা কিছুটা, পুরো ব্যাপার তা না। আমি মনে করি, যদি তাকে ভালোবাসতাম আমি ধৈর্য্যশীল হতে পারতাম, যদি নিশ্চিত হতাম যে ওকে ভালবাসছিলাম, মানে, আসলে তাকে ভালোবাসতে পারি নি।” আমি বললাম।
এরিকা মাথা নেড়ে সায় দেয়।
“এমনকি যদি আমরা একেবারে সবকিছু করতাম, খুব সম্ভব তবু এভাবেই সম্পর্ক শেষ হয়ে যেতো। এটা অনিবার্য এভাবে শেষ হওয়ার।” আমি বললাম।
“এটা কি কঠিন কিছু তোমার জন্যে”? সে জানতে চায়।
“কী কঠিন?”
“এই যে আরেকজনের সাথে নিজেকে বাইন্ধা হুট ক’রে নিজের কাছে সীমিত থাকা।”
“কখনো কখনো”। অকপটে বললাম আমি।
“হতে পারে কি তুমি যখন কম বয়সে, তখন অমন কঠিন একাকিত্ব যাপন জরুরী? মানে স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা প্রক্রিয়ার অংশ?”
“তুমি কি তাই মনে করো?”
“যেভাবে মৃত্যু এড়িয়ে টিকে থাকতে প্র্রচন্ড শীত একটা গাছকে শক্তিধর ক’রে তোলে। গাছের ভেতরের গ্রৌথ রিঙগুলোiv আরো শক্ত হয়।”

আমি চেষ্টা করলাম কল্পনা করতে আমার ভেতরের গ্রৌথ বলয়গুলো। কিন্তু শুধু আমার চোখের সামনে ভাসছিল খাওয়ার পর বাকী থাকা ফালি ফালি বৌমকুচেন কেকের ভেতরের বলয়। ওগুলো দেখতে গাছের ভেতরের বলয়গুলোর মতো।

“আমি একমত মানুষের জীবনে ওইরকম সময় দরকার। এমনকি তারা যদি জানে তা ভাল যে কোনো একদিন এই সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে।” আমি বললাম।
সে হেসে বললো, “চিন্তা করো না, আমি জানি তুমি শীঘ্রই কোনো একদিন সুন্দর কারো সাক্ষাত পাবে।”
“আমি তাই মনে করি।” আমি বললাম।
এরিকা কিছু ভাবছিল যখন আমি পিজা নিচ্ছিলাম।
“তানিমুরা-কুন, একটা ব্যাপারে আমি তোমার পরামর্শ নিতে চাই। ঠিক আছে?”
“নিশ্চয়”। আমি বললাম।
এটা ছিল আমার আরেকটা সমস্যা। কারো সাথে পরিচয় হওয়া মাত্র কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমার পরামর্শ চেয়ে বসে। আর আমি নিশ্চিত ছিলাম খুব এরিকা যে-পরামর্শ চাইছিল তা খুব-একটা জুইতের না।
“আমি ঠিক বুঝতে পারছি না” ব’লে সে শুরু করলো। বিড়ালের চোখ যেভাবে কিছু তালাশ করে, সেভাবে ওর চোখ আগেপিছে নড়লো।

“আমি নিশ্চিত এরিমধ্যে তুমি জেনে গেছ, সে যখন দ্বিতীয় বর্ষে, এন্ট্রান্স পরীক্ষার জন্যে বেশী পড়াশুনার সময়টা তখন, সে পড়ছে নামেমাত্র। পরীক্ষা প্রস্তুতি পর্বও সে বাদ দিয়েছে অনেক। সুতরাং আগামী বছরও সে ফেল করবে আমি নিশ্চিত। সে যদি কোনো নিম্নমানের স্কুলে যেতে চাইতো তাইলে কোথাও পেয়ে যেতো, কিন্তু ওয়াসেদাতে তার মন বান্ধা। তার মা বাপের কথা বা আমার কথা সে শোনে না। এটা তার যেন মোহাচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া…..। কিন্তু যদি সে ভালো পড়ালেখা করতো যাতে ওয়াসেদাতে পাশ করা যায়, তাইলে পারতো, অথচ সে করে না।”
“কেনো সে বেশি পড়ে না?”
এরিকা বললো, “তার গাঢ় বিশ্বাস যদি ভাগ্য প্রসন্ন হয় সে এন্ট্রান্স পাশ করবে”। আরো বললো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তার মতে, “ওই পড়ালেখা ক’রে সময় নষ্ট করা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সব সময় পাঠ্য বিষয়ে সে শীর্ষে ছিল। কিন্তু জুনিয়র হাইস্কুলে আসার পর তার মান নামতে থাকে। তার কিছুটা শিশুপ্রতিভা ছিল। তার ব্যাক্তিত্বের সাথে ঠিক মিলে না প্রতিদিনের নিরলস পড়ালেখা। সে বরং উল্টাপাল্টা চলে আর তার মর্জিমতে আবোলতাবোল কাজ করে। আমি তার অমন প্রবণতার বিপরীত। আমি অতো মাথাঅলা না, আমি সব সময় কাজে থাকি আর মনোযোগ দিয়ে কাজ শেষ করি।”

আমাকে পড়ালেখাতে খুব কষ্ট করতে হয় নি, প্রথমবারেই কলেজে ঢুকে যেতে পেরেছিলাম। হতে পারে আমার ভাগ্য ভালো ছিল।

“আকি-কুনের প্রতি আমার খুব সযত্নলালিত অনুরাগ আছে।” সে বলতে থাকে। “চমকপ্রদ বেশ কিছু গুণ আছে তার। এই কানসাই ভাষার ব্যাপারটা ধরো, কেন কেউ এমন যার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা টোকিওতে, সে কষ্ট ক’রে কানসাই শিখতে যায় আর সে-ভাষা সারাক্ষণ বলতে থাকে? আমি বুঝি না এটা, মোটেই না। প্রথম মনে করেছিলাম ঢং করছে, দেখলাম, না, সে ওই ভাষাতে সিরিয়াস।”
“আমার মনে হয় সে বিশেষ কেউ হতে চায়, এমন আলাদা কেউ, এখন পর্যন্ত সে যা তার চেয়ে আলাদা” আমি বললাম।
“এই কারণেই শুধু সে কানসাই বলতে থাকে?”
“আমি তোমার সাথে একমত ব্যাপারটা জটিল, এভাবে সম্পর্ক রক্ষা করা কঠিন।”
এরিকা এক টুকরা পিজা নিয়ে বড় ডাকটিকিটের সমান এক পিস কামড় দিয়ে মুখে নিল। কথা বলার আগে মনোযোগে চিবাইল। তারপর বললো-
“তানিমুরা-কুন, আমার কেউ নেই যার কাছে এই কথা জিগ্যেস করবো, তাই তোমার কাছ থেকে জানতে চাচ্ছি, তুমি বিরক্ত হও কী?
“অবশ্যই না”। কি আর বলতে পারি আমি?
সে বললো, “সাধারণত, একটা ছেলে আর একটা মেয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্যে পরস্পরকে জানতে বাইরে যায় যদি সেটা ভালো, আচ্ছা বলো তো, এতে মেয়ের শরীরের প্রতি আগ্রহ ছেলের আগ্রহ থাকে, তাই না?”
“সাধারণ নিয়মে আমি বলবো, থাকে।”
“তারা চুমু খেলে, ছেলেটা আরো আগে বাড়তে চায়।”
“স্বভাবত, ঠিক”।
“তুমিও ওইরকম অনুভব করো?”
“অবশ্যই”। আমি বললাম।
“কিন্তু আকি-কুন অমন না। আমরা একত্রে থাকলে নির্জনে সে আগে বাড়তে চায় না।”

একটু সময় নিলাম ওর কথার জবাবে সঠিক কথাটি পছন্দ করতে। অবশেষে বললাম, “ওটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। নিজের মর্জিমাফিক কিছু পাওয়ার ভিন্ন ভিন্ন পথ আছে মানুষের। কিটারু তোমাকে অনেক পছন্দ করে – এটা জানা বিষয়। তোমাদের সম্পর্ক বেশ গভীর আর সুখকর। বেশিরভাগ মানুষেরা যা করে সে তা করতে চায় না, মানে, সে চায় না হয়তো যে-ব্যাপারটা পরবর্তী স্তরে, সেটা সে আগেভাগে নিতে।”
“তুমি কি আসলেই ওভাবে ভাবো?”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “সত্যি কথা হলো, আমি আসলে এটা বুঝি না। আমি নিজের অভিজ্ঞতায় পাই নি এটা, আমি শুধু বলছি এমনতরো একট সম্ভাবনা হতে পারে।”
এরিকা বললো, “কখনো মনে হয় আমাকে নিয়ে তার যৌন বাসনা নাই।”
“আমি নিশ্চিত তার আছে। কিন্তু হতে পারে এটা তার পক্ষে স্বীকার করা একটু অস্বস্তিকর।”

“কিন্তু আমাদের বয়স কুড়ি প্রাপ্তবয়স্ক বরাবর, লজ্জিত না হওয়ার জন্যে যথেষ্ঠ এই বয়স।”
আমি বললাম, “কেউ অন্যদের তুলনায় একটু আগে পোক্তা হতে পারে।”
এরিকা এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবলো। যে-বিষয় সামনে আসে সে-বিষয় সরাসরি মোকাবেলা করে সব সময় এমন কেউ তাকে মনে হচ্ছিল।

আমি কথা চালাতে থাকি –
আমার মনে হয় কিটারু অকপটে কিছু চাইতেছে, তার নিজের মর্জি মতে, নিজের স্বচ্ছন্দ গতিতে। ব্যপারটা আসলে এই যে, তার মাথায় এখনো ব্যাপারটা ঢুকে নি। এই কারণে বিষয়টা আগে বাড়াচ্ছে না সে। তোমার যদি জানা না-থাকে কী তালাশ করছো, তাইলে এটা তালাশ করা সহজ না।”

এরিকা মাথা তুলে সোজা তাকালো আমার চোখের দিকে। মোমবাতির আলোশিখা ফুটছিল তার চোখে; একটি ছোট উজ্জ্বল আলোর বিন্দু। খুব সুন্দর লাগছিল ব’লে আমি চোখ সরাতে বাধ্য হই।
আমি দৃঢ়ভাবে বললাম, “অবশ্যই তুমি আমার চাইতে বেশি জানো তাকে।”
সে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো আবার।
সে বললো, “আসলে আমি আরেকজনকে দেখছি আকি-কুন ছাড়াও। আমার টেনিস ক্লাবে আছে ছেলেটা, আমার এক বছর আগে।
কথা বলতে আমার পালা আসে কিন্তু আমি চুপ থাকি।
সে বললো, “আমি সত্যিই ভালোবাসি আকি-কুনকে, অন্য কাউকে অমন ভালোবাসতে পারি না। যখনই আমি তার থেকে দূরে থাকি সব সময় আমার বুকের একই জাগায় ব্যথা পাই। এটা সত্য শুধু ওর জন্যে আমার হৃদয়ে বিশেষ স্থান আছে। কিন্তু একই সাথে আমার ভেতরে এই আকাঙ্খা তীব্র যে সব মানুষের নিকট যেতে চাই। বলতে পারো আগ্রহ, একটা তৃষ্ণা আরো জানার। আমি চেপে রাখতে পারি না, এটা স্বাভাবিক আবেগ, অনেক চেষ্টাতেও দমাতে পারি না।”

আমার চোখে ভাসলো একটা সুস্থ সুন্দর উদ্ভিদ টবটিতে উপচে উঠেছে যে-টবে লাগানো হয়েছিল।

এরিকা বললো, “আমি এই কথাই বুঝাই যখন বলি আমি দিশাহারা- সিদ্ধান্ত নিতে পারি না।”
আমি বললাম, “তাইলে তোমার বরাবর অনুভুতির কথা বলা উচিত কিটারুকে। তুমি যদি এটা গোপন রাখো যে, অন্য কাউকে চাও, আর কোনোভাবে সে এটা জেনে ফেলে, সে কষ্ট পাবে; সে কষ্ট পাক তুমি চাও না।”
“কিন্তু সে কি আমার কথা তার মনে স্থান দেবে? আমি তো আসলে অন্য কারো সাথে চলে যাচ্ছি?”
আমি বললাম, “সে তোমার অনুভূতি বুঝবে আমার মনে হয়।”
“তোমার তাই মনে হয়?”
“হুম” আমি বললাম।

আমি কল্পনা করলাম, কিটারু ওর বিহ্বলতা বুঝবে কারণ সেও একই রকম অনুভব করছে। সে অর্থে ওরা দুজনেই একই চিন্তা করছিল। তবু আমি পুরা নিশ্চিত ছিলাম না কিটারু শান্তিমতে গ্রহন করবে কি-না এরিকা যা করছিলো বা করতে যাচ্ছে। তাকে অতোটা শক্ত মনে হচ্ছিল না। তবে এরিকা যদি লুকায় বা মিছা বলে, সেটা হবে তার জন্যে বেশি কঠিন ব্যাপার।

এয়ার কনডিশনারের মৃদু বাতাসে মোমবাতির শিখার লকলক করা দেখছিল এরিকা। বললো, “আমি প্রায়ই একই রকম একটা স্বপ্ন দেখি। আকি-কুন আর আমি একটা জাহাজে। বড় জাহাজে দীর্ঘ পথ ভ্রমনে আমরা একত্রে একটা ছোট কেবিনে। তখন গভীর রাত। জাহাজের ছোট জানালা (পোর্টহৌল) দিয়ে আমরা পূর্ণচন্দ্র দেখতে পারি। কিন্তু ওই চাঁদ বিশুদ্ধ স্বচ্ছ বরফের তৈরী, নীচের আধাটা সমুদ্রে নিমজ্জিত। আকি-কুন বলেছে ‘ওটা দেখতে চাঁদ কিন্তু আসলে বরফের তৈরী শুধু আট ইঞ্চি পুরো। তাই যখন সকালে সূর্য ওঠে এটা পুরাটা গলে যায়। যখন তুমি সুযোগ পেয়েছো এটাকে ভালোভাবে দেখা উচিত।’ আমি এই স্বপ্ন অনেকবার দেখেছি। এটা একটা সুন্দর স্বপ্ন। প্রত্যেকবার একই চাঁদ, প্রত্যেকবারই আট ইঞ্চি ঘনত্ব। আমি আকি-কুনের উপর হেলান দিয়ে আছি, শুধু আমরা দুজন, বাইরে ধীরে ধীরে ঢেউ ভাঙার শব্দ। কিন্তু প্রত্যেকবারই আমি এই স্বপ্ন দেখে জেগে উঠবার পর অসহনীয় বিষাদাক্রান্ত হই।”

এরিকা কুরিটানি নিরব থাকলো কিছুক্ষণ। পরে আবার কথা বলা শুরু করে।
“আমি ভাবি, কতো না মজা হতো যদি চিরকাল ওই সমুদ্রযাত্রায় থাকতে পারতাম। প্রতিরাতে একজন আরেকজনের খুব ঘনিষ্ট হয়ে, স্নেহমাখা হয়ে বসে ছোট জানালা দিয়ে ওই বরফনির্মিত চাঁদের দিকে তাকাতাম। পরের সকালে চাঁদটা গলে যেতো এবং রাতে আবার দেখা যেতো। কিন্তু সেটা না হতে পারে। হতে পারে এক রাতে ওই চাঁদটা দেখা গেল না। ওটা ভাবতে আমার ভয় লাগে। আমি খুব ভয়ার্ত হই যেনো সত্যিসত্যি অনুভব করি আমার শরীর ডুবে যাচ্ছে।”

পরের দিন যখন কিটারুকে কফিশপে পেলাম, সে জানতে চাইলো কেমন ছিল ডেটিং।
“তুমি চুমু দিয়েছিলে তাকে?”
“অবশ্যই না।”। আমি বললাম।
সে বললো, “ব্যাপার না, তুমি চুমু দিয়ে থাকলে আমার মাথা খারাপ হবে না।”
“আমি অমন কিছু করি নাই”।
ওর হাত ধরো নাই?
” না আমি ওর হাত ধরি নাই।”
“তাইলে কি করেছো?”
“আমি বললাম, আমরা ছবি দেখতে গিয়েছিলাম, কিছুক্ষণ হাঁটি, রাতের খাবার খাই এবং কথা বলি।”
“ওই-ই কেবল?”
“সচরাচর তুমি প্রথম সাক্ষাতের দিন বেশি আগে বাড়বার চেষ্টা করো না।”
কিটারু বললো, “তাই নাকি? আমি কখনো নিয়মিত ডেটিংয়ে যাই না, তাই জানি না।”
আমি বললাম, “তবে ওর সাথে ভালো সময় কেটেছে। যদি ও আমার বান্ধবী হতো আমি কখনো তাকে চোখের আড়াল হতে দিতাম না।”
কিটারু এই কথাটা বিবেচনায় নিল। সে কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্ত ভাবলো এর চেয়ে ভালো কিছু। শেষে বললো, “তো কী খেয়েছিলে তোমরা।?”
আমি বললাম পিজা আর কেজান্তি মদ খেয়েছি আমরা। v
“পিজা আর শিয়ান্তি!” সে অবাক হলো। আর বললো, “আমি কখনো জানি নাই এরিকা পিজা পছন্দ করতো। আমরা শুধু নুডল আর সস্তা ডিনার খেতাম। আর মদ? আমি জানতামই না ও মদ গিলতে পারে।”
কিটারু কখনো নিজে মদ স্পর্শ করে নি।
“তাইলে সম্ভবত ওর নির্দিষ্ট কিছু বিষয় তুমি জান না।” আমি বললাম।

ডেটিংয়ের ব্যাপারে তার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলাম আমি। উডি এ্যালেন ছবির কথা খুলেমেলে বলেছি তার জোরাজুরিতে, খাবারের বিল কতো এসেছে, আমরা একে অন্যকে চটাইছি কি-না, সে শাদা পোশাক পরেছিল, চুল পিন মারা, তাও বলেছি, কি ধরনের অন্তর্বাস পড়েছে (আমি কেমনে বলি?), কি বিষয়ে আমরা কথা বলেছি জানতে চেয়েছে, অন্য ছেলের সাথে যাওয়ার ব্যাপারে আমি কিছুই বলি নাই। আমি উল্লেখ করি নি ওর তুষার নির্মিত স্বপ্নের কথা।

“তোমরা কি দ্বিতীয় সাক্ষাতের তারিখ নির্ধারণ করেছিলে?” কিটারু জানতে চায়।
আমি জানাই, “না আমরা ঠিক করি নি।”
“কেন? তুমি কি তাকে পছন্দ করো না?”
আমি জানাই, “এরিকা দারুন একটা মেয়ে। কিন্তু আমরা ওভাবে চালিয়ে যেতে পারি না। আমি বলছি, সে তোমার বান্ধবী, ঠিক আছে? তুমি বলছো তাকে আমি চুমু দেয়া অকে, কিন্তু ওটা আমার দ্বারা কোনোভাবেই সম্ভব না।”

কোনো সিদ্ধান্ত নেবার আগে মানুষ যেমন মনোযোগী হয়, তেমন মনোযোগী হয়ে কিটারু অবশেষে বললো, “তুমি জানো কি কিছু? জুনিয়র হাইস্কুল শেষের পর থেকে আমি একজন ডাক্তারকে দেখিয়ে আসছি। আমার মা বাবা ও শিক্ষকেরাও বলেছেন ডাক্তার দেখাতে। কারণ, স্কুলে আমি বিভিন্ন সময়ে অস্বাভাবিক কিছু করে বসতাম। কিন্তু যদ্দুর আমি দেখি, ডাক্তার দেখানোতে কোনো লাভ হয় নি। এটা তত্ত্ব হিসাবে ভাল কিন্তু ডাক্তাররা কেয়ার করে না। তারা তোমার দিকে এমনভাবে তাকাবে যেন কি হয়েছে তারা জানে। তখন তোমাকে দিয়ে মাঝে মাঝে কথা কওয়াবে আর শুনতে থাকে। আরে মিয়া, অমন আমিও পারি।”
“তুমি কি এখনো ডাক্তার দেখাচ্ছ?”
“হুম, মাসে দুইবার। মানে, টাকা ফেলে দেয়া জলে। এ ব্যাপারে এরিকা তোমাকে বলে নি?”
আমি মাথা নাড়লাম।
কিটারু বললো-
“সত্য বলি তোমাকে। আমি জানি না আমার চিন্তার ধরনের মধ্যে কি এমন খুব অস্বাভাবিকতা। আমার মনে হয় আমি সাধারণভাবেই কাজগুলো করছি স্বাভাবিক চিন্তা করেই। কিন্তু মানুষেরা বলে আমার প্রায় সব কাজ অদ্ভুত।”
আমি বললাম, “ভালো, কিছু ব্যাপার আছে তোমার মধ্যে নিশ্চিয়ই স্বাভাবিক না।”
“যেমন কি রকম?”
“যেমন তোমার কানসাই ভাষা?”
কিটারু স্বীকার করে, “তোমার কথা ঠিক হবে। এটা একটু অস্বাভাবিক।”
“সাধারণ মানুষ বিষয়গুলোকে অতো দূর দেখে না।”।
“হুম, তুমি হয়তো ঠিক বলছো।”
“কিন্তু যদ্দুর আমি বলতে পারি, যদিও তুমি যা করছো তা স্বাভাবিক না, কিন্তু তা তো কাউকে বিব্রত করছে না।” আমি বললাম।
“ঠিক না এখন।”
“তাইলে এতে সমস্যা কী”। আমি বললাম। তখন আমার একটু খারাপ লাগছিল যা বা কাউকে বলতে পারি নি। আমি টের পেলাম আমার আওয়াজ অসুন্দর হচ্ছে। বললাম, “তুমি যদি কাউকে বিরক্ত না-করো, তাইলে সমস্যা কী? কানসাই বলতে চাও বলো, সচেষ্ট থাকো। এন্ট্রান্স পরীক্ষার জন্যে পড়তে না-চাও না-পড়ো। তোমার কি মনে হচ্ছে এরিকার প্যাণ্টিতে তোমার হাত আটকে আছে? কে বলছে অমন করতেই হবে? এটা তোমার জীবন। তুমি তা-ই করো যা করতে চাও, অন্যে কি বলে-না-বলে ওসব পাত্তা দিও না।”

কিটারুর মুখ একটু খোলা, অবাক হয়ে তাকালো আমার দিকে। “তুমি কিছু জানো তানিমুরা? তুমি একটা ভাল মানুষ। যদিও কখনো একটু বেশি স্বাভাবিক, তুমি জানো?”
“তুমি কি করতে যাচ্ছো?” আমি প্রশ্ন করে তারপর বললাম, “তুমি তোমার ব্যাক্তিগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করতে পারো না।”
“বরাবর, আমি তা-ই বলতে চাইছিলাম, তুমি তোমার ব্যাক্তিগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করতে পারো না।”
“কিন্তু এরিকা দারুন একটা মেয়ে। সে তোমার ব্যাপারে আগ্রহী। তুমি যা কিছু করো তাতে সে তোমার থেকে সরে যায় না। তুমি কখনো আবার কেউ পাবে না ওর মতো গুণসম্পন্ন।” আমি বললাম।
কিটারু বললো, “আমি জানি, তোমাকে বলতে হবে না। শুধু জানাজানিতেই কাজ হবে না।”

প্রায় হপ্তা দুই পরে, কিটারু কফিশপের কাম ছেড়ে দেয়। আমি বলি ছেড়ে গেছে। আসলে সে আচমকা হাওয়া হয়ে যায়। নাগালেই থাকলো না, কিছু জানাইলো না তার কাজ ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে। সময়টা ছিল তখন আমাদের ব্যস্ত মৌসুমের। তাই মালিক বেশ জোশে ছিল। কিটারুর এক সপ্তাহের বেতন বাকী ছিল। সে নিতে আসে নি। সে উধাও। এতে আমি কষ্ট পেয়েছি। আমি মনে করেছিলাম আমরা ঘনিষ্ট বন্ধু হয়েছি। এভাবে আমাদের সম্পর্ক কেটে যাবে না ভেবেছিলাম। টোকিওতে আমার অন্য কোনো বন্ধু ছিল না।

লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার দুইদিন আগে, কিটারু অস্বাভাবিক শান্ত ছিল। আমি কথা বললে খুব একটা সাড়া দিত না। এরপরে গেল গায়েব হয়ে। আমি এরিকা কুরিটানিকে ফোন করতে পারতাম তার খবর নিতে। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক আমি নিজেকে মানাতে পারি নি। তাদের দুজনের মধ্যে যে টানাপোড়েন চলছিল আমি ধরে নিলাম সেটা তাদের ব্যাপার। আর এটা খুব ভালো না আমার পক্ষে যে, আমি যতটুকু ছিলাম তার বেশি জড়িয়ে যাওয়া। আমি কোনো-না-কোনোভাবে আমার ছোট জগতটাতেই নিজেকে টিকিয়ে রাখছিলাম।

এতোসবের পর, আমি কোনো কারণে আমার পুরান বান্ধবীকে নিয়ে ভাবছিলাম। হতে পারে কিটারু আর এরিকাকে একত্রে দেখে আমি কিছু অনুভব করেছিলাম। আমি আমার অতীত আচরণের ব্যাপারে মাফ চেয়ে লম্বা চিঠি লেখি ওর কাছে। আমি ওর প্রতি একেবারে উদার হয়ে যেতে পারতাম কিন্তু কখনো একটা উত্তর পাই নাই।

দেখামাত্র আমি এরিকা কুরিটানিকে চিনে ফেলি। দুইবারই তার সাথে দেখা হয়েছিল। সেই থেকে পার হলো ষোল বছর। কোনো ভুল নাই। তাকে আগের মতোই সুন্দর দেখাচ্ছিল, সেই আগের মতোই সজীব প্রাণোচ্ছল অভিব্যক্তি। কালো লেসের পোশাক, এর সাথে মিলিয়ে কালো হাইহিল, আর দুই সুতার মুক্তামালা পরেছে তার সুন্দর গলায়। সে আমাকেও চিনে ফেলে দেখামাত্র। আমরা এসেছিলাম হোটেল আকাসাকা-তে একটা ওয়াইন টেস্টিং পার্টিতে। ওটা ছিল একটা ব্ল্যাক-টাই আয়োজন। আমি পরেছিলাম কালো স্যুট ও টাই অনুষ্ঠান উপলক্ষে। যে-বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান অনুষ্ঠানটির স্পনসর সে-প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ছিল এরিকা। আর সে ওর দারুন জব-টা বেশ ভালো আঞ্জাম দিচ্ছিল। আমি সেখানে ছিলাম তাই জব-টা বুঝবার জন্যে একটু বেশি সময় নিতাম।

এরিকা বললো, “তানিমুরা-কুন, সেই-যে রাতে আমরা ঘুরতে বেরিয়েছিলাম, এরপর আর তোমার দেখা মিললো না, কেমনে এমন হলো? আমি আশা করেছিলাম আমাদের মধ্যে আরো কথা হবে।”
আমি বললাম, “আমার কাছে তুমি ছিলে একটু বেশি সুন্দর।”
সে হাসলো, “এমন কথা শুনতে ভালো লাগে। যদিও তুমি স্রেফ মিঠা লাগাইতেছ।”

আসলে আমি যা বলছিলাম তা মিছা না মচকা মারাও না। সে ছিল আমার চোখে ফাটাফাটি সুন্দর, এমন সৌন্দর্য্য আমি গলে যাওয়ার জন্যে যথেষ্ট। সেই তখন ষোল বছর আগে আর এখনও।

সে বললো, “আমি সেই কফিশপে, যেখানে তুমি কাজ করতে, ফোন করেছিলাম, তারা জানায়, তুমি ওখানে আর কাজ করো না।”

কিটারু যাওয়ার পর, চাকরিটা ওখানে পুরা বিরক্তিকর হয়েছিল আমার কাছে। দুই সপ্তা পর আমিও ছেড়ে দেই।

এরিকা আর আমি সংক্ষেপে গত হওয়া ষোল বছরের জীবন নিয়ে কথা বলি। কলেজের পর একটা ছোট প্রকাশনার সাথে আমার চুক্তি হলো। তিন বছর পর সেই চুক্তি বাতিল করে সেই থেকে লেখক হয়ে গেলাম। সাতাশ বছর বয়সে আমি বিয়ে করি কিন্তু এখনো সন্তান পাই নি। এরিকা তখনো একা। সে মশকারি করলো, “ওরা আমাকে কোণঠাসা করে রেখেছিল তাই বিয়ে করবার সময় পাই নাই।” সে-ই প্রথম উঠিয়েছিল কিটারু প্রসঙ্গ।

সে বললো,”আকি-কুন এখন ডেনভার-এ সুশি vi  বাবুর্চি হিসাবে কাজ করছে।
“ডেনভার”?
“ডেনভার, কলোরাডো, কয়েক মাস আগে পাঠানো তার পোস্টকার্ড মোতাবেক।”
“ডেনভার-এ কেন?”
এরিকা বললো, “আমি জানি না। এর আগের পোস্টকার্ড এসেছিল সিয়াটল থেকে। সেখানেও সে সুশি বাবুর্চি ছিল। ওটা প্রায় এক বছর আগে। সে পোস্টকার্ড পাঠায় মাঝে-মাঝে। সব সময় আউলফাউল কার্ড পাঠায় কয়েক লাইন লিখে ড্যাশ-ড্যাশ দিয়ে কথা শেষ। কখনো সে তার ঠিকানা লেখে না”
“একজন সুশি বাবুর্চি?” আমি গভীর চিন্তায় পড়লাম। “তাইলে সে কলেজে লেখাপড়া করে নি?”

এরিকা মাথা নাড়লো। আর বললো, “সেই গরমকালের শেষে আমি মনে করছিলাম, সে ওসাকা’র রান্না বিষয়ক স্কুলে যাওয়ার কারণ হিসাবে আচমকা জানিয়েছিল যে, এন্ট্রান্স পরীক্ষার জন্যে পড়ালেখার পাশাপাশি তার ওটা দরকার। বলেছিল সে আসলে চাইছিল, কানসাইয়া রান্না শিখতে আর কোশিন স্টেডিয়ামে এবং হেনশিন টাইগার স্টেডিয়ামে যেতে। অবশ্যই আমি জিগ্যেস করেছিলাম তাকে, ‘তুমি কেমনে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নিলে আমাকে একটু না-জানিয়ে? আমার কী হবে?’।”

“জবাবে কি বলেছিল সে।” আমি জানতে চাই।

এরিকা কোনো জবাব দিল না। সে ওর নিজের ঠোট চেপে ধরলো যেনো যদি কথা বলে তাইলে কান্নায় ভেঙে পড়বে। আমি তাড়াতাড়ি অন্য বিষয়ে যাই।

“যখন আমরা শিবুইয়া-তে সেই ইতালীয় রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম, আমার মনে পড়ে আমরা সস্তা শিয়ান্তি খেয়েছিলাম। এখন দেখো আমরা প্রিমিয়াম নাপা মদ টেস্ট করছি। এটা ভাগ্যের এক ধরনের অদ্ভুত চক্কর।”

সে বললো নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে, “আমার মনে পড়ে”।
আমি বললাম, “আমরা উডি এ্যলানের একটা মুভি দেখেছিলাম। ওটা কি আবার দেখা ছিল?”
“ওটা একটা দারুন মুভি।”
আমি সায় দেই। ওটা অবশ্যই উডি এ্যালানের মাস্টারপিস-গুলোর একটি।
আমি জিগ্যেস করি, “টেনিস ক্লাবের ওই যে লোকটার কথা বলেছিলে, তার সাথে সব ধরনের সম্পর্ক হয়েছিল তোমার?”
সে মাথা নেড়ে জানায়, “না।, আমি যেভাবে ভেবেছিলাম, আমরা ঠিক সেভাবে ঘনিষ্ট হই নি। ছয় মাস চলি আমরা, তারপর ভেঙে যায়।”
“একটা প্রশ্ন করতে পারি? যদিও খুব ব্যক্তিগত।”
“অবশ্যই পারো।”
“আমি চাই না তুমি বিরক্ত হও।”
“আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করবো।”
“তুমি ওই লোকটার সাথে শুয়েছিলে, তাই না?”
এরিকা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালো। ওর গাল লাল হতে থাকে।
“এই বিষয়টা এখন আনলে কেন তুমি?”
আমি বললাম, “ভাল প্রশ্ন। এটা আসলে অনেক দিন ধরে আমার মাথায় ছিল। কিন্তু এটা প্রশ্ন করবার বিষয় না। আমি দুঃখিত।”
এরিকা আস্তে করে মাথা নাড়লো। “না ঠিক আছে। আমি বিরক্ত হই নি। আমি শুধু এটা আশা করছিলাম না। এসব অনেক আগের ব্যাপার।”

আমি ঘরের চারদিকে তাকালাম। প্রথাগত পোশাকে মানুষেরা এখানে-সেখানে ছড়িয়ে আছে। দামী মদের বোতলের ছিপি একের পর এক খোলা হচ্ছিল। “লাইক সামওয়ান ইন লাভ” গানটির সুর তুলছিলেন একজন নারী পিয়ানো বাদক।

“উত্তরটা হলো হ্যাঁ”। এরিকা বললো। “কয়েকবার আমার সাথে তার সেক্স হয়।”
“আরো বেশি জানবার ইচ্ছার কারণে এ প্রশ্ন।” আমি বললাম।
সে খুশির আভাস দিয়ে বললো, “আরো জানার ইচ্ছা ওটা ভালো”।
“ওভাবেই আমরা আমাদের গ্রোথ রিংয়ের মান বাড়াই।”
“তুমি যদি অমন বলো..” সে কথা পুরা করতে পারে নি।
“আর আমার অনুমান শিবুইয়াতে আমাদের সাক্ষাতের পরেই তুমি ঘুমিয়েছিলে তার সাথে প্রথমবার।”
এরিকা ওর দিনলিপির এক পৃষ্ঠা উল্টিয়ে বললো, “আমার তাই মনে হয়, এক সপ্তাহ পরে তোমার সাথে সাক্ষাতের, ওই সময়ের সব মনে আছে বেশ আমার, ওই-ই ছিল প্রথম আমার জীবনে।”
“আর কিটারু খুব জলদি ধরতে পারতো অনুভুতি।” আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম।

সে নীচের দিকে তাকিয়ে তার গলার হারের মুক্তাদানার উপর একে একে হাত বুলাচ্ছিল, যেন নিশ্চিত করছিল সব স্মৃতি আছে তার হৃদয় মাঝে অবিকল এখনও। হয়তো কিছু স্মরণ করে ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। বললো, ”হুম, তোমার ভাবনা ঠিক, আকি-কুনের সহজজ্ঞান খুব শক্তিশালী ছিল”।
“কিন্তু অন্যের বেলায় তার স্বজ্ঞা কাজ করতো না।” – আমি বললাম।

সে মাথা নাড়লো। বললো, “দুর্ভাগ্য, আমি অতোটা তীক্ষ্ণধীসম্পন্ন না। আমার লম্বা সময় নেয়ার দরকার ছিল। আমি সবসময় ঘুরপথে ঘুরে যেতে পছন্দ করি”।
আমি তারে বলতে চাইছিলাম, –ওইটাই আমরা সবাই করি: অবিরাম জটিল পথ ধরি-, কিন্তু নিরব থাকি। খুশি-খুশি সময়টাতে বোকার মতো ফস কইরা গুপ্ত কোনো কথা বলে ফেলা আমার আরেকটা সমস্যা।

আমি জিগাইলাম- “কিটারু বিয়ে করছে নাকি?”
এরিকা বললো, “আমি যদ্দুর জানি সে এখনো একা। মানে, সে আমাকে বলে নি বিয়ে করেছে বলে। হতে পারে আমরা দুজনই বিয়া না-করবার পক্ষে।”
“অথবা তোমরা একটু ঘুরে বিয়ের পথে নামতে চাও হয়তো।”
“হয়তোবা”
আমি জানতে চাই, “তুমি কি এখনো বরফের তৈরী চাঁদের স্বপ্ন দেখো?”

তার মাথায় খুশি ঝকমকালো আর সে আমার দিকে তাকালো। খুব শান্ত ধীর গতিতে ওর চোখেমুখে একটা হাসি ছড়িয়ে পড়লো। একদম খোলামেলা স্বাভাবিক হাসি।
সে জানতে চায়, “আমার স্বপ্নটি তোমার মনে আছে?”
“কোনো কারণে আছে আর কি।”
“এটা অন্য কারো স্বপ্ন হওয়া সত্বেও?”
আমি বললাম, “স্বপ্নেরা হলো এমন কিছু যা তুমি নিতে ও দিতে পারো”।
সে বললো, “ওটা বেশ ঝিলমিল আইডিয়া”।

কেউ আমার পেছন থেকে ওর নাম ধরে ডাকলো। সে তার কাজে ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছিল।
এরিকা বললো বিদায় নেবার সময়, ” ওই স্বপ্নটা আর আমার না এখন। কিন্ত আমার মনে আছে একেবারে সব। যা আমি দেখেছিলাম, যেভাবে অনুভব করেছিলাম, ওসব আমি ভুলতে পারি না, হয়তো কখনো ভুলবো না।”

যখন আমি গাড়ি চালাইতেছি আর বিটলসের “ইয়েসটারডে” গানটি রেডিওতে আসে, আমি শুনতে লাগি বাথরুমে গুনগুন করা কিটারুর গানটি। আর পস্তাই- কেন লিখে রাখলাম না পুরো গানটা। সামান্য সময়ের জন্যে স্মরণে ছিল গানটি বড় অদ্ভুত, আস্তে আস্তে বিস্মৃত হওয়া শুরু, শেষতক প্রায় ভুলেই গেলাম। এখন যেটুক মনে পড়ে তা টুকরো টুকরো, আর আমি নিশ্চিত না এসব ভাঙ্গা-টুকরো গানের কথা যা আমার মনে পড়ছে তা আসলে কিটারু গেয়েছিলো কি না। সময় বয়ে যাওয়ার সাথে সাথে স্মৃতি অবধারিতরূপে নিজেকে পুনর্গঠন করে।

যখন আমার বয়স বিশ বা একটু কম বেশী ছিল, আমি কয়েকবার চেষ্টা করেছি দিনলিপি লিখে রাখতে, কিন্তু পারি নি। অনেক কিছু তখন ঘটছিল আমার চারপাশে। আমি ওসবের সাথে তাল মিলাতে পারতাম না, ওসব লিখে রাখতে পারতাম দিনলিপিতে নিজেকে নিঃসঙ্গ না-রেখে। এবং ওসব এমন কিছু নয় যে আমাকে চিন্তা করতে বাধ্য করতে পারে, মানে- বাহ, পাইছি বিষয় একটা, লিখে রাখতে হয়। ওসব আমি লিখতে পারতাম চোখ খুলবার জন্যে, প্রবল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মুক্ত নিঃশ্বাস নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার জন্যে।

কিন্তু আশ্চর্য কিটারুকে আমার বেশ ভালো মনে পড়ে। আমরা মাত্র কয়েক মাসের বন্ধু ছিলাম। তবু সব সময় আমি ”ইয়েস্টারডে” শুনি আর তার সাথে কথা ও সেই সময়ের দৃশ্য আমার পরিস্কার মনে আছে। তার ডেনএনচোফু’র বাড়িতে যখন বাথরুমে সে ভেজা আমরা দু’জন তখন কথা বলতাম। আমরা কথা বলতাম হানশিন টাইগারদের বেটিং অর্ডার নিয়ে, বলতাম নির্দিষ্ট ধরণের সেক্স কেমন বিরক্তিকর হতে পারে, এন্ট্রান্স পরীক্ষার জন্যে পড়ালেখা কতো অসহ্য, সেটাও আমাদের কথাবার্তায় থাকতো, অনুভূতি বুঝবার ক্ষেত্রে কানসাই ভাষাটা কতো সমৃদ্ধ সে-বিষয়েও আমরা কথা বলতাম। আর আমার মনে পড়ে এরিকা কুরিটানির সাথে আমার আজব কিছিমের ডেটিং। ইতালীয় রেস্টুরেন্টে মোমবাতির আলোয় এরিকার স্বীকারোক্তিও মনে পড়ে। যেনো মনে হয় এই বিষয়গুলো গতকাল সম্পন্ন হয়েছে। স্মৃতিকে পুনরায় সজীব করবার সে-শক্তি সংগীতের আছে, কখনো খুব স্পর্শ করে সেসব স্মৃতি।

কিন্তু যখন বিশ বছর বয়সের আমার নিজের দিকে ফিরে তাকাই, দেখি, বেশিরভাগ দিনগুলি একা – নি:সঙ্গ। দেহ মন চাঙ্গা করার জন্যে আমার কোনো মেয়েবন্ধু ছিল না। কোনো বন্ধু ছিল না যাদের কাছে নিজেকে মেলে ধরতে পারতাম। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না যে প্রতিদিন আমার কি করা উচিত। ভবিষ্যতের জন্যে কোনো দৃষ্টিপথ ছিল না। বেশিরভাগ সময় আমি নিজের মনের গহীনে লুকিয়ে থাকতাম। কখনো পুরো সপ্তাহ কারো সাথে কথা বলতাম না। ওইরকম জীবন গেল এক বছর। বেশ লম্বা একটা বছর। এই দিনগুলো শীতকালের ছিল কি-না যা আমার ভেতরে মূল্যবান গ্রোথ রিং রেখে গেছে – আমি আসলে বলতে পারবো না। সে-সময় আমি টের পেয়েছি যেনবা প্রতি রাতে আমিও জাহাজের গোল ছোট জানালা দিয়ে বরফ নির্মিত চাঁদের দিকে তাকাচ্ছিলাম – একটা স্বচ্ছ আট ইঞ্চি ঘন হিমায়িত চাঁদ। কিন্তু আমি একাই দেখছিলাম ওই চাঁদ, আর এর হিম-হিম সৌন্দর্য্য কারো সাথে ভাগ করে নিতে পারছিলাম না।

‘গতকাল
আগামীকালের দুইদিন আগের দিন
এই দিন দুই দিন আগের পরের দিন।’

 

————————————————

জাপানি-ভাষা থিকা ইংরেজি করছেন ফিলিপ গাব্রিয়েল। টীকাগুলি বাংলা-অনুবাদকের।

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
সারওয়ার চৌধুরী

সারওয়ার চৌধুরী

জন্ম উনিশ শ ছেষট্টি সালের চব্বিশ ডিসেম্বর। সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে লেখেন বাংলা ও ইংরেজিতে। প্রধানতঃ কবিতা গল্প প্রবন্ধ। বর্তমানে ষোল বছর ধ’রে প্রবাসী। তিনটি গদ্যের বই বের হয়েছে - ‘এক মুঠো ল্যাবিরিন্থমাখা মায়াবী জীবন তৃষ্ণা’ (২০০৬), ‘অচিন মানুষটির নানা রঙের গল্প’ (২০০৭), ‘বচনে বন্ধনে ঘ্রাণে প্রশ্নোত্তর ফোটে’ (২০১২)। প্রকাশিতব্য গল্পের বই ‘শিশির ও ধুলকণা মায়া’ (২০১৪)।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য