Main menu

কবিতার শশীকলাদ্যুতি, জল আগুনের সিঁড়িতে মাসুদ খান

 

কবিতা কী জিনিস? বাংলা-ভাষায় এইটা ডিফাইন করাটা একটা পাপ; এটলিস্ট কোন দোনামোনা না-থাকাটা একটা মারাত্মক রকমের ক্রাইম। রবীন্দ্রনাথ কি কারণে বিহারিলাল’রে কবি কইছিলেন এইটাও আমরা ভুইলাই গেছি; এইকারণে আপনারে কইতে হবে কবিতা কি জিনিস সেইটা আপনি জানেন না, এরপরে কেমনে যে কবিতা হইলো এইটাও আপনি জানেন না; কিন্তু কি না কি জানি হয়া গেলো, এইটা অবশ্য ফিল করতে পারেন এবং ফিল যে করতে পারেন, এইটা খালি কবিতা না, কবিতার আলোচনাও। এইরকম একটা ব্যাপারের সাথে মাসুদ খান-এর কবিতা ভালোভাবেই রিলেট করা যায়। মাসুদ খান-এর হোমাপাখি’রে যদি উনার কবিতা-ভাবনার জিস্ট হিসাবে নেন তাইলে দেখতে পারবেন, কবিতা হইলো সেই জিনিস যা আকাশে পয়দা হয়, আর মাটিতে পড়তে পড়তে আবার আকাশেই উইঠা যায়; এই যে পড়তে পারে, কিন্তু পড়ে না, এবং আবার উইঠা যায় আর ওড়তে থাকে, এইটা হইলো বাংলা-কবিতা।

বাংলা-কবিতা এবং কবিতার আলোচনা শুরু করার লাইগা, এই প্যার্টানটারে দেখা এবং পড়াটারে দরকারি কাজ বইলাই ভাবতে পারতেছি আমরা।

– ই.হা.।

________________________________________

 

গভীর রাতে বহুতল আবাসিক দালানের দশ তলার বেলকনিতে বসে সামুদ্রিক আলো অন্ধকারেরমিতালি পর্যবেক্ষণ করতে ভাল লাগে আমার। কখনো এই সুযোগে সমুদ্রের উপর গুচ্ছগুচ্ছ আলো অন্ধকারের সিনক্রনাইজড ড্যান্স দেখে ফেলতে পারি। কারা নাচে? কখনোমনে হয় বর্ণমালার সবগুলো অক্ষরের দ্বারা নির্মিত মানব মানবী আদলে সুন্দরউদ্ভাসিত লাল নীল উজ্জ্বল বায়োলুমিসেন্ট ক্রিয়েচারস – যারা আমাকেও দেখতেথাকে বিস্ময়ভরে – এমন মনে হয়। কখনো দালানের বাইরে গিয়ে সাগর পারের বাগিচারঅস্পষ্ট তমিস্রার মাঝে নিশ্চুপ ইউক্যলিপটাসের সাথে কথা বলি।

থোকা-থোকা বা এলোমেলো ছড়নো অচিরপ্রভা কোন চেনাজানা ছন্দে না সেজেও যেন প্রাণোচ্ছলরাখে পরিবেশ- আমার চারপাশের উত্তর দক্ষিণ পূবর্ পশ্চিম।

সেদিনের রাতে যেন চাঁদের রওশন বেশিই ছিল। আশ্বিনের চাঁদ ছিল কি-না নিশ্চিত নই।চাঁদ আর ইউক্যালিপটাসের সাথে আমার বিশেষ একটা প্রাতিস্বিক সম্পর্ক পুরানা।চাঁদের ভেতরই যেন আমি কেইপটাউনের এক ম্যাগনোলিয়ার চোখে মায়া ঝরতেদেখেছিলাম। তাকে বুঝাতে পারি নি হয়তো এইটুকু যে, আমি শরীর ও মনের পরিস্কারপৃথক সন্তরণ দেখেছি। ইনডিভিডুয়েল নর নারীর শরীর মনের সম্মিলিত বিভার চাইতেশুধু পরিশীল মনের দ্যূতি অধিক পরিব্যাপ্ত। শরীর ছাড়া মন বুঝবার উপায় নাথাকা সত্ত্বেও শরীরের ভেতরে মন অন্যতর অনবদ্য, আলাদা ভাস্বর। ফুলের শরীরস্পর্শ না করেও ঘ্রাণ টের পাওয়া যায়, গুণ বুঝে নেয়া যায়। থাক সেই ডিটেইল।তবু সে মেঘলা থেকেছে, আমাকে বলেছে। মেঘলা থাকবারও ফজিলত আছে, আমি বলেছি।ঝরা বনগোলাপের বিলাপ শুনে নার্গিস বনে বুলবুলির নিরবতা আসে, শিল্পের পাঠআসে, উন্মোচিত হয় মনোহর দুয়েন্দে।

সেদিনের রাতেই দেখলাম মধ্যরাতে ইউক্যালিপটাসে, রাত পোহাবার অপেক্ষায় এবং একই সাথেদিবসের ক্লান্তি মুছতে থাকছে একটি পাখি। বিদ্যুতের আলো আর জোছনা মিলেমিশেযে-মিশ্র ফোটন কণার সমারোহ, এর মাঝে এই পাখিকে দেখতে-দেখতে মনে হলো কবিমাসুদ খানের একলা মেঘলা পাখি দেখছি কি-না। কবির সেই “ভবঘুরেমনমরা একলা মেঘলা পাখি….” জগতের মাধবরোমাঞ্চ দেখেছে বেশ। আমি মায়া বোধকরলাম এই ভেবে যে, এই পাখিটা কী আগামীকালই চায় মাসুদ খানের পাখিটার মতো ,’কূটাভাসে ভরা এ-ভুবন ছেড়ে’ একা একা চুপচুপ, প্রকৃতিপ্রেমিক কবি রবার্টএ্যালান ব্ল্যাকওয়েল যেভাবে গেলেন, এইভাবে এই পাখিটাও ‘নিরুদ্দেশে, বহুদূরে, আকাশগঙ্গার ওই পারে’ চলে যাবে! হয়তোবা কিংবা হয়তো কাল নয়, কিছুকালপরে।। কোথাও তো থেমে যায় প্রাণ ও প্রাণের উৎসব। অন্তত ত্রিমাত্রিক দেখবারশক্তির দৌলতে আমরা যা ডিটেক্ট করতে পারি।

আমার মনে প্রশ্ন জাগে, এই পাখিটা হোমাপাখিকে চিনে কি-না? মাসুদ খান খুব সহজভাষায় এখানে বণর্মালাদের দ্বারা একটা ক্লাসিক ম্যাগনেটিক ফিল্ড নির্মাণকরেন, সেই ফিল্ডে গাঢ়তর অনুভূতি আর চিন্তার চকচকে সারি। সারিগুলোতে তথ্য ওমর্ম মিথের বিস্ময়কর হোমাপাখির পরিচয় বিধৃত আর মেটাফরিক ইশারাও সেইসাথে।পড়ি তাহলে কবিতাটি-

 

হোমাপাখি

পড়তে থাকা শুরু হলে একবার, জানি না কতটা পতনের পর সূচিত হয় উত্থান আবার–

ভাবছিতা-ই আর মনে পড়ছে সেই হোমাপাখিদের কথা যারা থাকে আকাশের অনেক উঁচুতে।আকাশেই ডিম পাড়ে। পড়তে থাকে সেই ডিম। কিন্তু এত উঁচু যে পড়তে থাকে দিনেরপর দিন। পড়তে পড়তেই ডিম ফুটে বাচ্চা হয়। তখন বাচ্চা পড়তে থাকে। পড়তেপড়তেই বাচ্চার চোখ ফোটে, ডানা হয়, পালক গজায়। একদিন দেখতে পায় সে পড়েযাচ্ছে। অমনি সাঁই করে উড়ে যায় মায়ের দিকে। উঠে যায় অনেক উঁচুতে। এতউঁচুতে যে পাখিরা আকাশের গায়ে ইতস্তত ভাসমান তিলচিহ্ন হয়ে ফুটে থাকে। 

 ওই পক্ষিকুলে জন্ম পুনর্জন্ম আমাদের, ওই পক্ষিকুলেই পালন-পোষণ-পতন-উত্থান-উড্ডয়ন...

ফার্সিভাষার সংস্কৃতিতে এবং ওসমানিয়া খেলাফতের তুর্ক ভাষার সংস্কৃতিতে, শিল্পসাহিত্যের প্রধান প্রসঙ্গ, মিস্টিক মেটাফর ওই হোমাপাখি। পাখিটা নর নারীদুইই একসাথে; একের মধ্যে দুই স্বভাব। প্রত্যেক স্বভাবের জন্যে এক ডানা একপা। ফরিদ উদ্দীন আত্তারের “মানাতেক আল তায়ের”-এ এই পাখিটা আছে অন্যরূপে। ছাত্র হয়ে এসেছে। তুরস্কের লোকজ বিশ্বাসে হোমাপাখি অনধিগম্য উচ্চতার প্রতীক। পারস্যের সূফি বিশ্বাসে বোঝায় সকল সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে ওঠা রাজা।ভাষার সীমাবদ্ধতার ভেতরে এই রাজা ডিনৌট করে সব কিছু ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ যাওয়া। সূফি ভাবধারার বাইরেও আছে হোমা। সিন্ধি সাহিত্যে আছে। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রতি লেখা শিখ গুরু গোবিন্দ সিংয়ের পত্রে হোমাপাখির উল্লেখ করেছেন শক্তি ও সুপ্রসন্নতার পাখি বোঝাতে।

মাসুদ খানের হোমাপাখির শেষ বাক্যটি একটা বিশেষ পংক্তি-মানিক্য যেনো; একটা বিশেষ ডিনোটেশন – একটা বিশেষাভিধান সিগনিফাই করলো।

কবিতা পড়তেছেন মাসুদ খান

কবিতা পড়তেছেন মাসুদ খান

শূন্যে ডিম, শূন্যে ফোটে, শূন্যে থাকতে-থাকতে ডানা এবং শূন্য থেকেই সে উধ্বর্লোকের দিকে, মোস্ট হাইয়ের দিকে যেতে থাকে। উচ্চতর পদার্থ বিজ্ঞানের বিশেষ নজরে শূন্য যদিও শূন্য না, তবু মানুষের স্বাভাবিক নজরে বস্তুর অস্তিত্ব আর অস্তিত্বহীনতার ফারাকটা তো আছে, একটা নাথিংনেসের দেশ-বলয় আছে। যে-দেশ-শূন্যেতার মাঝে মহাজগতমন্ডল গ্রন্থিত। শূন্যতার মাঝে কক্ষপথ, সে-পথে পৃথিবীর চক্রাবর্ত বিরামহীন প্রতি সেকেন্ডে তিরিশ কিলোমিটার গতিবেগে। এই শূন্যতার মাঝে আমাদের, পাখিদের, প্রাণ ও বস্তুনিচয়ের ‘পালন-পোষণ-পতন-উত্থান-উড্ডয়ন...’

ইউক্যালিপটাস গাছের পাখিটা কিছু বুঝে হয়তো তাকালো আমার দিকে। আমি সুলাইমান নবী না, সহজে পাখির সাথে ভাব বিনিময় হবে না যদিও, আমি নিশ্চিত এই পাখি ফিনিক্স পাখি না। কিছুটা তোতাপাখি আদলের, আবার ঠিক তোতা মনে হয় না। তোতা তো মানুষের কথা শিখতে পারে যদি সে পিঞ্জরে-পালা তোতা হয়। যদি এই তোতা কারো পিঞ্জরের পোষা তোতা হয়ে থাকে, আর পলাতক হয়ে তার এই একা দশা, তাইলে হয়তো কথা বলবে আমার সাথে হঠাৎ, দেখা যাক।

আমি তার দিকে চেয়ে-চেয়ে মনে-মনে ভাবি, পৃথিবীর আহ্নিক ও বার্ষিক গতির সাথে পাখিটা, আমি ও ইউক্যালিপটাস অন্য সবকিছুর সঙ্গে একসাথে চক্রাকারে ঘুরছি। এর মাঝেই আমাদের “জাগে ঢেউশ্রব্য ও অশ্রব্য কূট কোলাহলতরঙ্গ-আহ্লাদ/এক অঙ্গে মিটে যায় অপর অঙ্গের স্বপ্ন সাধ। (অন্ধ: মাসুদ খান)

ঘুরতে-ঘুরতে শূন্যে ভাসতে-ভাসতে মানুষের ভেতরে “বাইরে দীর্ঘ দাবানল, পুড়ে যাচ্ছে কত মধু ও মশলার বন।/দাহিত মধু-মশলার মিশ্র ঝাঁজালো গন্ধ/সেইসাথে বহু বহু যুগের ওপার থেকে ধেয়ে আসা/যত সমাধানহীন সমীকরণের ঝাঁজ/ঝাঁৎ করে এসে লাগছে একযোগে চোখে-মুখে।” (আবর্ত: মাসুদ খান)

এও কম বিস্ময়কর নয় যে,  এতো দ্রুত ঘুরতে থাকবার মধ্যে “দেখলাম– সহ্যাতীত দুঃখ শোক সয়ে যায় গ্রহের প্রাণীরা/অনাহারে কদাহারে কাহিলও অনেকে।/তবুও কেমন যেন রঙ্গরসে টইটম্বুর! এক চোখে অশ্রু,/অন্য চোখ অহৈতুকী আনন্দে ভরপুর।” (ভবঘুরে মনমরা একলা মেঘলা পাখির মতো: মাসুদ খান)

কবিতার বইয়ের কাভার

কবিতার বইয়ের কাভার

আমি দেখি রে পাখি, শূন্যের মাঝে মানুষ ঘর বানায়, শান্তির জন্যে অশান্ত হয়ে লড়াই করে, যুদ্ধ করে; সমস্যার সমাধান বের করতে-করতে নবতর সমস্যা আক্রান্ত হয়; কল্যাণ আর অকল্যাণ কেমনে আসে তা একেকজন একেকভাবে দেখায়। যেনো মানুষেরা কল্যাণের দোহাই দিয়ে অকল্যাণ পরম্পরার শিকল রচনা করে। কোনো সোশ্যাল কমিটমেন্ট ‘অকল্যাণ’ তাড়াতে বা আটকাতে পারে না। কবি জন কিটস এর সোশ্যাল কমিটমেন্ট ছিল না। কিন্তু তাঁর কবিতা আজো মানুষের মন টানে। কমিটমেন্ট থাকা সত্বেও লাখো মানুষকে “শজারুর কাঁটাকাঁটা উপলব্ধি নিয়ে/জান বাজি জেগে থাকতে হবে নিদ্রাহীন “। (জৈবনিক: মাসুদ খান) মিলিয়ন-মিলিয়ন মানুষ শুদ্ধ করছে ভেবে যে কাজ করে, পরবর্তীতে সে দেখে সে-কাজ ভুল করেছে।

তোমরাও ভুল করো পাখি- “এদিকে ভোরের আলো ভেবে জ্যোৎস্নায়/ওড়াওড়ি শুরু করে দিয়েছে পাখিরা/এত পাখি উড়ছে যে/পাখিতে-অক্ষরে কাটাকাটি হয়ে চলেছে শুধুই।” (জ্যোৎস্নারাত: মাসুদ খান) জ্যোৎস্নায় পাখিদের ওড়াওড়ি যদিও ভুল সিদ্ধান্ত, তবু চমকপ্রদ ব্যাপার এই যে, দৃশ্যটি মনোহর সৃস্টিশীল। মানুষের অজস্র ভুলও পরবর্তীতে অভূতপূর্ব কিছু প্রাপ্তির দুয়ারখোলে। ভুল আনতে পারে অনবদ্য শুদ্ধ প্রসঙ্গ। স্ট্রিট আর্টিস্ট মিঃ ব্রেইনওয়াশ উত্তেজিত হয়েই বলেছিলেন – “…এ্যাভরি মিসটেক ইজ এ্যা নিউ ক্রিয়েশন”।

আর ওই-যে শান্তির জন্যে অশান্ত হয়ে মানুষেরা খুনোখুনি করে, এই ব্যাপারটা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকে হাস্যকর প্রতিপন্ন করে না পাখি? ইশ! পাখিটা যদি বলেদিত- “করে করে”। মানুষের সভ্যতার অহংবোধের উদ্দেশ্যে সারা দুনিয়াকে দেখানো গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মধ্যম আঙুলটা যথাযথভাবে আরেকবার ব্যবহার করা যেতো। অধিকাংশ মানুষের স্বভাব কই? কেবল অন্যের ভাবে ব্যাতিব্যস্ত, মশগুল। কেবল অন্যঘরের চিন্তাতে সমর্পিত। মানুষ কেন প্রাকৃতিক-স্বাভাবিক না! ঝড় তুফান টর্নেডো আসতে থাকে। মঙ্গলকামী ঝড় তুফান! “বহু কিছু অনর্থক করে দিয়ে তবু আজ বইছে বাতাস/আরো বহু কিছু অনর্থক করে দিয়ে তবে বইবে বাতাস…”(ঝড়ো হাওয়া: মাসুদ খান) নির্দিষ্ট  বিষয়বস্তুকে সদর্থক করতেও আমরা দেখি অনর্থক কর্ম সম্পাদন হয়।

আচানক ঘটনা একটা ঘটলই। পাখিটা দুইটি শব্দ বললো দুইবার। বললো, “জংলি ফুল, জংলি ফুল”। আরে মানে কী! কী জংলি ফুল? কেন জংলি ফুল? কোথায় জংলি ফুল? পাখিটা আর কোনো কথা বলে না।

ফাওরান আমার মনে পড়লো “চাঁদ, প্রজাপতি ও জংলি ফুলের সম্প্রীতি” নামে একটা গদ্যের বই লিখতেছেন মাসুদখান। এও মনে পড়লো, কথাশিল্পী হারুকি মুরাকামি বলেছিলেন “এইপৃথিবীতে অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, কেন ঘটে, তা তুমি জানো না, কিন্তু ঘটনা ঘটে”। প্রতিটি মুহূর্তে মনে হয় জগতে অদ্ভুত ব্যাপার-স্যাপার ঘটতে থাকে। কখনো ভালো করে দেখলে পাওয়া যায়।

মাসুদ খানের “চাঁদ……জংলি ফুল” শীর্ষক প্রকাশিতব্য বইয়ের গদ্য বহু কারণে অনবদ্য মনে হয়। বইটির কিছু রচনা বিভিন্ন মিডিয়াতে নানা উপশিরোনামে ধারাবাহিক আসতে থাকছে। কবি লিখছেন গদ্য, ক্লাসিক ধারার কবি কর্তৃক রচিত গদ্যের শান-ই আলাদা। কবিরগ দ্য, মানে গদ্যকবিতা না, নিবন্ধ বা আখ্যানগদ্য বিশেষ রসস্নাত হয়, আলাদা কিছিমের উজ্জ্বলতা ধরে। যোগরস বা বিয়োগরস বা যে কোনো রসসমৃদ্ধ হয়। ক্লাসিক কবি যিনি, তিনি সব দিক থেকেই রসিক – শিল্পরসিক হতে পারেন মোটা দাগে। বিশেষত, ক্লাসিক ধারার কবিদের গদ্য-লেখা দুনিয়ার সাহিত্যের ইতিহাসে যেটুকু আছে, তার মান-কিমাত বেশ উচা, জ্বলজ্বল ধরা হয়। ব্যাতিক্রম এই যে, কেউ কবিতা রচনা করেন না, কথাসাহিত্য সৃজন করেন, সে-কথাসাহিত্যে  অনুচ্ছেদের পর অনুচ্ছেদে পাওয়া যায় পোয়েটিক ইমেজ, ছন্দোময় বাক্য-মাণিক্য। চট করে নাম আসে বাংলার হাসান আজিজুল হক। ইংরেজি থেকে, কবি কিন্তু তাদের গদ্য অসাধারণ, যেমন – অডেন, এলিয়ট, লিউইস প্রমুখ। আর এই যুগে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষারসাহিত্যের পাঠক বিপুল আগ্রহ নিয়ে হারুকি মুরাকামির কথাশিল্পের ইংরেজি অনুবাদ পড়ছেন। এর অন্যতম প্রধান কারণ, আমরা দেখি তার গল্প উপন্যাসের মাঝেমধ্যে অনুচ্ছেদ ভরা থাকে চমৎকার পোয়েটিক ইমেজে।

আমরা তো দেখতেই থাকছি, ক্লাসিক সবদিক থেকেই তীব্রতর, চৌকষ, গোথিক। ক্লাসিকধারার কবিদের গদ্য বা আখ্যানগদ্য তাদের কবিতার অন্তরদেশ ভ্রমণ করতে অনেকটাই সহায়ক হতে পারে। কবির চিন্তা পাঠের সারিগুলো অনেকটা সামনে আনে, কবির মনোজগতকে মেলে ধরে প্রায়।

ক্লাসিক থাকতে পারে রাখালের বংশীসুরে, পাখির দুর্বোধ্য গানে, গাঙের ঢেউয়ে, নদীর কলতানে, ধান কাউনের শিশিরে, প্রবীণ কৃষকের ক্লান্তিতে; ক্লাসিক ফুটতে পারে নালার উগলের নাচে, টিলায় পর্বতে হিমালয়ে, মেঘলোকে, বৃষ্টিতে, উপরে নীচে বায়ে ডানে, প্রিয়জনের ঘ্রাণে, সবখানে ফুটতে পারে ক্লাসিক। খাটি ঘন দুধ ক্লাসিক, দুধের সর মাখন ঘি, দুধভরা ওলানের রোশনীও ক্লাসিক।

মাসুদ খানে আখ্যান গদ্যটিতে সৃষ্ট একটি প্রভাবশালী চরিত্র হকসেদ খোজা। পন্ডিতলোক। শক্ত-পোক্ত তেজদীপ্ত কথার তুফান বইয়ে দিতে যেনো একেবারে বুনিয়াদি ওস্তাদ।

মাসুদ খানের ভাষায়-

“এই যে হকসেদ খোজা (খাজা নয়, খোজা, হকসেদ খোজা), অদ্ভুত এক রহস্যমানব।ভাঙাচোরা পোড়া-পোড়া মেছতাপড়া চেহারা, কাইস্টা পাটের দড়ির মতো দীর্ঘপাকানো শরীর, তার ওপর সে খোঁড়া, আবার খোজাও, পেশায় ছিচকে চোর, খুচরালুচ্চামি-লাম্পট্যে ওস্তাদ, কিন্তু মহাজ্ঞানী, মহাপণ্ডিত। ‘খোজা’ ছাড়াও আরও অভিধা আছে তার। কেউ কেউ তাকে বলে ল্যাংড়া হকসেদ আবার কেউ বলে হকসেদপণ্ডিত। দুনিয়ার সব বাঘা-বাঘা পণ্ডিতদের সঙ্গে যোগাযোগ তার। নোম চমস্কির কাছ থেকে চিঠি আসে তার কাছে। এই কিছুদিন আগে জাক দেরিদা চিঠি দিয়েছে ফরাসিভাষায়। অনেক জ্ঞান হকসেদ পণ্ডিতের, ভাষাও জানে অনেকগুলি। ইতিহাস, পুরাণ, ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি, রামায়ণ, মহাভারত, বেদ-উপনিষদ…, জেনবাদ থেকে সঞ্জননীব্যাকরণ, শ্রেণিসংগ্রাম থেকে ক্ষমতাকাঠামো, ভার্ব-বেইজ্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে কসমোলজি, ভাষার ডিপ-স্ট্রাকচার ডিবেট থেকে মহা-মন্দার ডেরিভেটিভ থিয়োরি, কালাজাদু থেকে কমোডিটি ফেটিসিজম, স্ট্রিং থিয়োরি থেকে সেক্স অ্যান্ড ক্রাইম ইন্ডাস্ট্রি, আসমান-জমিন, আন্ডারগ্রাউন্ড-ওভারগ্রাউন্ড…কমবেশি সবকিছুরই হালনাগাদ খবরাখবর আছে তার কাছে।”

হকসেদ লোকটার মাঝে অনেক কিছু আছে আবার অনেক কিছু নাই। রহস্যমানব পুরোদস্তুর। কোথা থেকে এলো সে কেউ জানে না। ভার্সিটির গবেষকেরা বের করেছেন সে মঙ্গোলয়েড ও ভেড্ডিড নৃগোষ্ঠি আর সেইসঙ্গে পুরাণ প্রসিদ্ধবায়স পক্ষি গোষ্ঠির সঙ্কর। সময়, ইতিহাস ও ভূগোলের বাইরে থেকে উঠে আসা এই এক প্রহেলিকা-মানব।

কবিতার বইয়ের কাভার

কবিতার বইয়ের কাভার

জীবন তার কন্টকাকীর্ণ, অবশ্যই কুসুমাস্তীর্ণ না কিন্তু রসালো বাকচাতুর্য্য আছে।সাহিত্যের লোকদের নানাবিধ ফালতু প্রয়াসের প্রসঙ্গ তুলে বিধ্বংসী বাক্যবাণ মারে। একেবারে পোক্তা যুক্তি। সব মিলিয়ে দুর্দান্ত তার ব্যক্তিক দুয়েন্দে।

তো, আখ্যানের আদলে ওটা দেখা যাচ্ছে বিশেষ গদ্য রচনা মাসুদ খানের। গল্পেরস্বাদ, ওজনসম্পন্ন চিন্তা, তাজা-রসালো সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ ঝকঝকে, জ্বলজ্বলে, ক্লাসিক। কিন্তু না-প্রবন্ধ, না-গল্প, না-আত্মকথা; তবু অসাধারণ নতুন গদ্য, আখ্যানগদ্য বলা যায়। কোথাও-কোথাও মনে হয় যেনো স্বরবর্ণ আরব্যঞ্জনবর্ণ আর আকার ওকার হ্রস্ব উকার দীর্ঘ উকার ইত্যাদি জলপ্রপাতের মতো নামছে, আর ফটাফট ওসব অর্থপূর্ণ সমৃদ্ধ চিন্তার শব্দ বাক্য হয়ে যাচ্ছে একের পর এক।

ইউক্যালিপটাস গাছের পাখিটা তার কাছের ডালটিতে ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে গেল। উত্তরমুখী হয়ে প্রথমে আবার দক্ষিনমুখী হয়। আমার মনে পড়লো মাসুদ খানের কবিতা “মায়া”-র শেষ চার পংক্তি-

“আমি নিশি পাগলার বেশে কী এক অদ্ভুত চোরাটানে অনন্তকাল ধরে চলেছি

অরণ্য পাহাড়  নদী সম- ও মালভূমির অন্তহীন অলিগলি চোরাপথ থেকে

কারা যেন খালি মায়া ছুঁড়ে মারে এমনকি আমি যখন বকফুল আর

ভেরেন্ডা গাছের নিচ দিয়ে যাই তখনো কে যেনো কেবলই মায়া মাখিয়ে দেয়”

আহারে মায়া! মায়া বুঝতে পারে সবাই। বনের হিংস্র প্রাণীটাও বুঝে, বিষাক্ত সাপটা ও মায়া করতে জানে। মায়া পরিচ্ছন্ন অর্থ ফোটায় পুস্পিত ফুলটির মতো। তবু মায়া আনগ্রেসপেবল। মায়ার কারণে নিশ্চিহ্ন হয় প্রাণ। মায়া নৃশংসতাও আনে, সুখরস দুখরসও আনে। মায়ার কারণে “এমনকী কালো কোকিলও রূপান্তরিত হয় ধীর ধবলবিহঙ্গে” (মধুকণ্ঠী কালো বিহঙ্গ আমার: মাসুদ খান) মায়ার কারণে দেখা যায়,  “মগজ ও কলিজা খাচ্ছে, হাড় মাংস ভাজা-ভাজা করে খাচ্ছে, এমনকি রক্তকে শরাব বানিয়েও খাচ্ছে। রঙ্গতামাশাও হচ্ছে বেশ।” (মন্দা: মাসুদ খান)

মায়ার প্রভাবে রকমারি তালে বেতালে নাচতে নাচতে দিশাহারা হয়ে থাকা ওই মানুষদেরেএ্যালেক্স হ্যালি-র “রুটস” এর আলোকে দেখলে পাওয়া যায় আগের প্রজন্মে সিঁধেল চোরের বংশধারা থেকে প্রস্ফুটিত এক ‘স্নিগ্ধ চোর’ সামনে খাড়া। “তবুওই স্নিগ্ধ চোর, তার বৃত্তি, প্রাচীন প্রবৃত্তি/ওহো তার প্রবৃত্তির সৌগন্ধে, গন্ধব্যঞ্জনায় মুগ্ধ হয়ে আছে সমস্ত অতীত/এবং অধুনা– /সকল ছাপিয়ে উঠে শেষে শীর্ষে জেগে থাকে তস্করের নিপুণ তাস্কর্য।” (প্রজা, প্রজাপতি, চোর ও যম: মাসুদ খান)

মায়ায় মায়ায় “ফলনেউৎসবে প্রীতিপ্রফুল্লম্ ফসল কাটার দিনে/আজ শস্যজ্যোতির ঝিলিক লেগে উদ্ভাসিত সর্বাঙ্গ, গোত্রের।” (বীজ ও বপনকেলি সংবাদ: মাসুদ খান)। আর প্রতীকের, উপমার, ইশারার অঙ্গে যখন অর্থ উদ্ভাসিত হয়, তাতেও মায়ার পোক্তা-পোক্তা নবরূপ ধরে। নদী আর ডাঙ্গা বাংলাদেশের মানুষের জীবনের সাথেমিশে আছে। যেন প্রতিদিন নতুন গল্পের পাঠ দেয়। উন্মোচন করে পরিপ্রেক্ষিত। নতুন সিগনিফায়ার-দের ভীড় জমে। নতুন সিগনিফায়েডস-দের নৃত। শুরু হয় যেনো। নদীআর ডাঙার “কাহিনী”-তে মাসুদ খান অমল মোলায়েম কিন্তু শক্ত-পোক্তা রিজনিংদিয়েই শুরু করেন-

“ঢেউয়ের স্বভাব ঢেউয়ের মতো

অধিক কথা বলা

ঢেউ পাগলি নদীটা তাই

আজন্ম চঞ্চলা। “

চিরকালের এক সত্য নবতর বাকসৌন্দর্য্য ঝলমলিয়ে স্ফুট এখানে। ওদিকে, মায়াকে ঘিরে, মানে মায়াময়তার ভেতরে, মায়ার কারণেই সহস্র কিছিমের বে-বুঝ অবস্থার দৃশ্যফোটে। কেউ কাউকে যুক্তি দিয়ে কিছুই বুঝাতে পারে না। বে-বুঝ থাকাতেই যেনবুদ্ধির প্রকাশ ঘটে, যেন স্বাভাবিকের বাইরের বিস্ময়কর আরেক স্বাভাবিকতা। অবাক কান্ড ঘটিয়ে কবি ঠাশ-ঠাশ ফোটান দৃশ্য ভেতরের মর্ম বার করবার জন্যে। বড় মনোহর অথচ ভয়-রোমাঞ্চভরা দৃশ্য মাসুদ খানের “জলোচ্ছাস” কবিতাটিতে-

“হাজার হাজার জংলি ঘোড়ার দঙ্গল উঠে আসছে অন্ধকার দরিয়ার মধ্য থেকে আর একটানা বিজলি ও বজ্রচমক। চমকের মুহুর্মুহু ইলিশরঙা ঘ্রাণের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে ঘোড়াদের হ্রেষাধ্বনি, উপর্যুপরি রাত্রিরং চিৎকার। দাউদাউ শিখা শোনাযাচ্ছে কেশরের। কেশরপোড়া গন্ধের ঢেউয়ের আস্বাদ এসে আছড়ে পড়ছে স্তরে স্তরে- বালুতে লবণে ফসফরাসে। যেন একদল উগ্র পাগল আরেকদল বদ্ধ মাতালের সঙ্গেমারদাঙ্গা মেতেছে সংলাপে। কেউ কারো বাক্য বুঝছে না, জাহেরি-বাতেনিধর্ম-মর্ম কিচ্ছু বুঝছে না, বাক্যের বিন্যাস-ব্যঞ্জনা বুঝছে না, খালি একনাগাড়ে ঝাপটা মারছে বাগ্-বাহুল্যের। ফলে সংলাপে না হচ্ছে সমঝোতা, না কথাকাটাকাটি। খুব চেষ্টা হচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই কথাকে কাটছে না কোনো কথা, বাক্যে এসে মিশছে না কোনো বাক্য, পাশ কেটে চলে যাচ্ছে কেবলই অবিরাম হুলুস্থুল ধুন্ধুমার মহাগজব একটানা…”

আরেক বহুবিধ অর্থে অনির্বচনীয় মায়া জাগানো – হৃদয় দোলানো ম্যাজিক-সুন্দর কবিতা মাসুদ খানের “কুড়িগ্রাম”।

গাছের পাখিটা ঘুমায় না কেন ভাবলাম আমি। সে একেবারে বাংলায়, আমারই ভাষাতে কথা বলাতে আমি বেশ থ্রিল্ড হয়েছি, কিন্তু গ্রিল্ড হয়ে তার সাথে রূঢ়ভাবে জেরা করবার পর্যায়ে আমার মন যায় নি।

তখনি পাখিটা বলে উঠে-

“কবিতা কবিতা”।

“কী? কবিতা পড়বো?” আমি জিগাই।

কোনো জবাব নাই। চট করে আমার ত্যাড়া হওয়ার সাধ জাগে। বলি, “তুমি তোমার মর্জি হইলে কিছু কও, আমি জিগাইলে জবাব দেও না, সুতরাং তোমার কথায়-কথায় আমি চলতে পারবো না। তোমার হুকুম পালন করার জন্যে আমি আসি নি। আমি এখন কবিতা পড়বো না, তোমার চাইতে আরো বেতাল ত্যাড়া আমি। এখন আমি আমার মর্জিমতে কবিতা প্রসঙ্গে মাসুদ খান কী ভেবেছেন, তা নিয়ে ভাববো”।

কবিতার বইয়ের কাভার।

কবিতার বইয়ের কাভার।

পাখিটা নিশ্চুপ থাকে নক্ষত্রের মতো, অন্তত পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে যেমন নিশ্চুপ দেখা যায় নক্ষত্রদেরে।

আমি মাসুদ খানের কবিতা ভাবনার উপর চোখ বুলাই-

“……..একটি কবিতা হচ্ছে কবির একটি বিশেষ অনুভূতি বা উপলব্ধির সবচাইতে সৎ ও অকৃত্রিম প্রকাশ, তাই যে-ভাষায় সেই অনুভূতি প্রতিফলিত হতে পারবে সবচেয়ে অকৃত্রিমভাবে, অর্থাৎ যে-কবিতা দাবি করবে যে-ভাষা, সেই ভাষাতেই লেখা হবে ওই কবিতা। ভাষার ব্যাপারে কবিতার তাই কোনো প্রেজুডিসও নাই, শুচিবায়ুও নাই। বলে-কয়ে-দেওয়া কোনো সুনির্দিষ্ট ভাষা নাই কবিতার। কোনো ফতোয়াও খাটে নাকবিতার বেলায়। আর তা ছাড়া, এমনিতেই, কবিতার স্বভাবগত কারণেই, এর ভাষা সরাসরি কখনোই মিলবে না কোনো ভাষার সঙ্গে- না নিত্যব্যবহারের ভাষা, না চলতি, না কথ্য, না প্রমিত-কোনো চেনা ভাষাভঙ্গির সঙ্গেই না, আবার হয়তো সবরকম ভাষার সঙ্গেই। কারণ কবিতায় ভাষার প্রথাগত লজিক, শৃঙ্খলা, ব্যকরণ সবই ভেঙে পড়ে; অনুভূতির তীব্র চাপে ভাষা যায় বেঁকেচুরে, ফেটে-ফেটে। অর্থাৎ ভাষাকে ফাটিয়ে, বিশৃঙ্খল করে দিয়ে, নেমে আসে কবিতা। ভাষার ভিতরে ঘটিয়ে দেওয়াএক তুমুল রতিক্রিয়ার মাধ্যমে বেরিয়ে আসে কবিতা। ভাষার এক শুদ্ধ সৎ আন্তরিকতার ফসল কবিতা। উপমা-উৎপ্রেক্ষায়, রূপকে, প্রতীকে, প্রতিমায় আর ভাষাও যুক্তির শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় এক নতুন শৃঙ্খলা, এক অভিনব গোধূলিভাষ্য। সে যেন খোদ অনুভূতিরই এক অবিকৃত সৎ প্রতিচ্ছবি, উপলব্ধিরই এক অকপট আলপনা- কবিতা। কবিতার ভাষা তাই ফাটা-ফাটা, বাঁকাচোরা, বিশৃঙ্খল ও প্রহেলিকাপূর্ণ।” (কবিতা, মানবজাতির মাতৃভাষা: মাসুদ খান)

বিশৃঙ্খল কেন?

আমরা বলতে পারি, হতেই পারে বিশৃঙ্খল, কেননা শুধু “ধ্বনিতে ধ্বনিতে ছন্দোস্পন্দ  জাগানো এক ধ্বনিতরঙ্গ” নয় কবিতা। মাসুদ খান দেখান- শব্দের ধ্বনিগুণ অর্থগুণ চিত্রগুণ একসাথে নিয়ে কবিতা উন্মোচিত হয়। এও অর্থপূর্ণ কথা যে, বিশৃঙ্খল মানে ছন্দহীন বা শ্রীহীন না, ছন্দহীনতার মাঝেও ছন্দ হাজির থাকে, ইনফেকশাস হয়। হতে পারে ভাষা ফাটিয়ে, ব্যাকরণ ভেঙ্গে নতুন অলংকার প’রে নতুন বিস্ময় নিয়ে আবির্ভূত হওয়ার কারণে কবিতার মাঝে ইনফেকশাসনেস আসে। আবুল হাসানের  কবিতা থেকে একটা দৃষ্টান্ত –

‘দ্রাক্ষার বদলে আমি দুঃখ দেবো:/ মৃত্যুর বদলে মধু চাও তবে,/ পা ডুবিয়ে বসো এই যুগল তৃষ্ণার চোখে…’ (রচনাসমগ্র, পৃষ্ঠা ১২৮)।

কবি যখন বলেন তৃষ্ণার চোখে পা ডুবিয়ে বসবার কথা, তখন এই শব্দদের চিত্রগুণ এক অভিনব অর্থ নিয়ে হাজির হয়, চেনাজানা অর্থ আর নাই এখানে; ব্যাকরণসম্মত পরিচিত ভাব নাই, আছে নবতর অনিন্দ্য বেদনা-সুন্দর। মাসুদ খানের বিস্তর শব্দদের দ্বারা বিনির্মিত চিত্রগুণ প্রকাশ পায় নানাভাবে, পরাবাস্তব, যাদু বাস্তবের সুন্দর বুনতে-বুনতে। একটা ছোট দৃষ্টান্ত দেখি – “ফ্লাড-লাইটের শীর্ষে শীর্ষে /বিশাল তরঙ্গ তুলে ছুটে যাবে আমার গালিচা” (হন্যমান: মাসুদ খান)।

পাখিটা গাছে চুপচাপ বসে আছে। আমি ভাবতে থাকি মাসুদ খানের আরেকটি গদ্যের চিন্তা  বিশ্লেষণ নিয়ে। মাসুদ খান মানুষের জীবন জগতের চলা-বলা-কলার কোন দিক-পথনির্দেশনাকে বা মতপথচিন্তাকে বাহবা দিতে চান? কেন চান? তাঁর চিন্তা পথের রিজনিংয়ে কিসের প্রতি মায়া আছে? “ভিন্নতর রেনেসাঁর খোঁজে: একটি ভাবনা সূত্র” শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি সে-ইশারা আলামত স্পষ্ট করেছেন। আধুনিক সভ্যতার ভেদবুদ্ধির পক্ষে তিনি নাই। বাংলার ভাবপরম্পরার সাম্য মৈত্রীর পক্ষে তিনি। কোনোভাবেই হায়ারার্কি না, দলন পীড়ন দাবড়ানি না। তিনি সেইনজর-দর্শন-চিন্তাকে বাহবা দেন, যে-নজরে “সবকিছুকে বৈচিত্র আকারে দ্যাখে। বিশ্বজগৎকে এক অনিঃশেষ বৈচিত্রের সমাহার হিসাবে দ্যাখে। সে সাধন করতেচায় বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য, নানা মতপথচিন্তার মধ্যে সমন্বয়। এই ভাবভেদ বুদ্ধির শর্তবিনাশী পরমাপ্রকৃতিবাদী ধারার ভাব।”

কবিতার বইয়ের কাভার

কবিতার বইয়ের কাভার

বাংলার ভাব-চিন্তা-দর্শনকে রচনাটিতে মাসুদ খান তুলনামুলক ছোট পরিসরে যথেষ্ট পরিস্কার করেছেন। সেখানে মহাত্মা রুমি কর্তৃক সমগ্রকে বুঝবার যৌক্তিক ঝিলিকও আছে অপ্রত্যক্ষভাবে। বিভেদের চিন্তাকে পরাজিত করে সমগ্রের সাথে সদ্ভাব রাখার বিশ্ববিশ্রুত মজবুত পাঠ আমরা পাই রুমির ডিসকোর্সে। ৭২ ধর্মীয় বিভক্তির সাথে এক হতে পারবেন কেমনে – এমন প্রশ্নের জবাবে রুমি জানিয়েছিলেন তিনি প্রশ্নকারি আলেমের সাথেও একমত। রুমি ডাকেন তাঁর কবিতার মাধ্যমে- “কাম, কাম, হুএভার ইউ আর / ওয়ান্ডারার, ওয়ার্শিপার, লাভার অব লীভিং /  ইট ডাজ নট মেটার / আ আর্স ইজ নট এ্যা ক্যারাভাঁ অব ডিসপেয়ার।”

একটা বিশ্বাসের জায়গা বাদে, ভাষা-চিন্তা-দর্শন নিয়ে মানবজাতির মনোজগতে সত্যবিষয়ক স্থায়ী নির্ভুল আস্তানা একটা কিছু ধরা যায় কিনা তা লুদউইগ উইটজেনস্টাইনের চিন্তা আর মার্টিন হাইদেগারের চিন্তাকে সামনে এনে দেখা যেতে পারে। উইটজেনস্টাইন জানিয়েছেন, এভাবে বলা ভুল যে, “আমি জানি আমি চিন্তা করতেছি”; বলা উচিত “আমি জানি তুমি যা চিন্তা করতেছ”। কারণ ভাষা দ্বারা চিন্তাটা হচ্ছে, অন্য দ্বারা নির্ধারিত গ্রামার শাসিত, অন্য দ্বারা রূপায়িত ভাষা দ্বারা চিন্তা করা। চিন্তার প্রকৌশল নিরংকুশ কোনো সত্য ধরতে পারে কিনা? উইটজেনস্টাইন দেখান – “ফিলোসফি ইজ নট এ্যা থিওরি”। তাঁর মতে ফিলোসফি হলো এ্যাকটিভিটি। মার্টিন হাইদেগার পশ্চিমের দর্শনের ইতিহাসকে চাবুক মেরেছেন। মাসুদ খান খুব সুন্দর পশ্চিমের দর্শন দ্বারা দাবড়ানির মতলবের সমালোচনা করেছেন। হাইদেগার সাফ জানিয়েছেন দর্শন দিয়ে সত্য ধরা সম্ভবনা।  যে-সত্য আনকোয়েশ্চনেবল, সে-সত্য ধরবার লক্ষ্যে ছুটতে থাকা সামগ্রিকভাবে ‘ওয়ে অব থিংকিং’ যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয় রিজনিংয়ের একটা শক্ত ভিত্তি দ্বারা, তাহলে কনস্টান্টলি চেঞ্জিং বাস্তবতাতে ‘অনড় চিন্তা-সত্য’ ধরবার সুযোগ থাকে না।

মার্টিন হাইডেগার আড়াই হাজার বছরের বহুবিধ দর্শনের দোকানদারিতে চালুনি মারতে-মারতে বের করেছেন, দর্শনবিদ্যা যা-কিছুকে সত্য বলে তা সত্য নয়, তা অনড় থাকে না, একটা আপেক্ষিক অবস্থাতে কেবল দৃশ্যমান। মানে, দর্শনবিদ্যা দ্বারা সত্য ধরা সম্ভব নয়, যে-সত্য আনকোয়েশ্চনেবল।

অতঃপর তাহলে কি আমাদের জানা জ্ঞান “এ্যাবসলিউট রিয়েল” বুঝবার কোন উপায় দিতে পারে না? সক্রেটিস অকপটে বলে দেন, “আই নো ওয়ান থিং দ্যাট আই নো নাথিং”। আমরা এও দেখি, নিজের অজ্ঞতা দেখতে-বুঝতে পারবার জন্যে জ্ঞানচর্চা করা লাগে।

বাংলা ভাবচর্চার সারকথা রচনাটিতে মাসুদ খান আলাদা-আলাদাভাবে খুব সুন্দর মেলে ধরেছেন। লিখেছেন, “জ্ঞানচর্চা-প্রশ্নে বাংলার ভাব-এর মর্মকথা হচ্ছে – জ্ঞানক্ষমতা নয়, দেবে দায়িত্ব। জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানসঞ্চালনের মাধ্যম ও প্রক্রিয়া এমন হবে যে, তা জ্ঞানীর মধ্যে কোনো নাক উঁচু বা খান্দানিভাব কিংবা হামবড়া- বা অহংকার-ভাবের উদ্বোধন ঘটাবে না, বরং তাকে ছায়াবান, ফলভার বৃক্ষের মতো আনত ও দায়িত্বপরায়ণ করে তুলবে।”

পাখিটা আবার বললো, “কবিতা কবিতা।”

এবার আমি তাকে সমর্থন করে বলি, “অবশ্যই কবিতা, কবিতা কোনো দর্শনকে ধারণ করেও সে-দর্শনকে ম্লান করে দিয়ে আগে বাড়তে থাকে অনির্বচনীয়ের উদ্দেশে।

পাখিটা চুপচাপ। আমি ভাবতে থাকি – আমার মনে হয় – প্রসঙ্গের ভেতরে বাইরে কবিতা না-থাকলে, কবিতার প্রভাব না-থাকলে প্রসঙ্গের শোভা ফোটে না, প্রাণবন্ত হয় না; বিশেষত, বিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বুঝবার যথাযথ পাঠ ও প্রতিবেশ মনোহর করে দিতে পারে কবিতা। কবিতা না-আসে যদি “সবগুলি মাত্রা থেকে ছিটকে ছিটকে পড়ে যাবে চন্দ্রবিন্দু/আর আমি অন্ধকার ঘাসে ঘাসে দ্রুত/দিগবিদিক চন্দ্রবিন্দু কুড়াতে থাকব।” (হন্যমান: মাসুদ খান) আমরা দেখি, ভিক্টর হুগোর ভাবনা – স্বর্গদশের মাইক্রোগ্রাফি হল জ্যোতির্বিজ্ঞান — এর একদিক এ্যালজেবরার, অপরদিক – মানে দীপ্তিমান দিকটা – কবিতার। স্যার পিটার বিমেডাওয়ারের কথাতে – দেয়ার ইজ পয়েট্রি ইন সায়েন্স – বিশেষ ভাবনা উস্কেদ্যায়। কখনো কবি বিজ্ঞানের উপাদানকে অসাধারণভাবে প্রকাশ করেন, যেমন উইলিয়াম ব্লেইক লিখেন – এ্যনার্জি ইজ এটারনাল ডিলাইট। আর জর্মন ভাষাবিজ্ঞানবিৎ ফ্রেদরিখ ফন শ্লেগেল সেই কবে জানিয়েছিলেন জগৎবাসীকে -ফিজিক্সের অন্তরের অভ্যন্তরে যেতে হলে কবিতার রহস্যের ভেতর দিয়ে যাত্রা শুরু করতে হবে আপনাকে। পাখিটার দিকে চেয়ে মনে মনে বলি – তুমিও পদার্থবিদ্যা পাখি, তুমিও জীবন্ত এক সরাসরি কবিতা। এই কারণে হয়তো মাসুদ খান ঘোষণা দেন- “আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানি”। আর তিনিও জানেন এবং জানান বা তাঁর দ্বারা জানানো হয়- “আকারে বিকারে আর অলংকারে ভরা এই অনিত্য সংসার”।

মাসুদ খান-এর কবিতার ইংরেজি অনুবাদের বইয়ের কাভার

মাসুদ খান-এর কবিতার ইংরেজি অনুবাদের বইয়ের কাভার

মাথার উপর দিয়ে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসছে এবং যাচ্ছে অন্ধকার চিরে চিরে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ। একটি এয়ারক্রাফ্টের হেডলাইট বেশ বড় দেখে কিছুক্ষণ ওটার ওপর নজর রাখি। আবার দৃষ্টি ইউক্যালিপটাস গাছে ফিরিয়ে নিয়ে দেখি পাখিটা নাই। ঘুরে ঘুরে দেখলাম চারিদিক। পাখিটা আর নাই এবং নাই।

রাত বেলা দেড়টা পার হওয়ার পর, আমার বাম দিকে আকাশ আর সমুদ্রের একাকার রাত্রী রঙের উপর নজর রাখতেই দেখি আরেক আজব ঘটনা, তিরিশ তলা দালান সমান লম্বা একটা ঘোরানো সিঁড়ি জল আর আগুনে নির্মিত। পরিস্কার জল ও আগুন উপাদান; শূন্যে ভর দিয়ে জল ও অগ্নির মিলমিশে সিঁড়ি। আর এই “ঘোরানো সিঁড়ির ঘুরস্বভাব মাড়িয়ে” এক বায়োলুমিসেন্ট মানুষ, স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় দশগুণ বড় সাইজের, অবিকল মাসুদ খান, উঠে যাচ্ছেন উপরের দিকে। আমি চিৎকার করলাম – ডাক দিলাম – মাসুদ ভাই মাসুদ ভাই, একটু শোনেন, আপনার কবিতার সমালোচনা করতে চাই। জবাব দিলেন না, মুচকি হাসলেন, আর উপরের দিকে উঠতেই থাকলেন…।

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
সারওয়ার চৌধুরী

সারওয়ার চৌধুরী

জন্ম উনিশ শ ছেষট্টি সালের চব্বিশ ডিসেম্বর। সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে লেখেন বাংলা ও ইংরেজিতে। প্রধানতঃ কবিতা গল্প প্রবন্ধ। বর্তমানে ষোল বছর ধ’রে প্রবাসী। তিনটি গদ্যের বই বের হয়েছে - ‘এক মুঠো ল্যাবিরিন্থমাখা মায়াবী জীবন তৃষ্ণা’ (২০০৬), ‘অচিন মানুষটির নানা রঙের গল্প’ (২০০৭), ‘বচনে বন্ধনে ঘ্রাণে প্রশ্নোত্তর ফোটে’ (২০১২)। প্রকাশিতব্য গল্পের বই ‘শিশির ও ধুলকণা মায়া’ (২০১৪)।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য