Main menu

বাংলা ভাষার আধুনিকায়ন: ভাষিক ঔপনিবেশিকতা অথবা উপনিবেশিত ভাষা

২০০৩-০৪ সালে আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। নৃবিজ্ঞান বিভাগে। তৃতীয় বর্ষে ১০০ নম্বরের বাধ্যতামূলক গবেষণা ছিলো। আমার গবেষণার বিষয় ছিলো ‘বাংলা ভাষার আধুনিকায়ন’। বিষয় আমার-ই ঠিক করা। বিভাগ থেকে অনুমোদন নিতে হয়। এবং গবেষণায় একজন সুপারভাইজর থাকেন। রেওয়াজ ছিলো পছন্দ মতো শিক্ষকের সাথে আলাপ কইরা বিভাগকে জানানো। আমি চিন্তা করলাম, বিভাগ আমারে শিক্ষক (সুপারভাইজর) দিতে বাধ্য; আমার দায় কেবল বিষয় জানানো। আমি দরখাস্তে বিষয় লিখে দিলাম। প্রস্তাবিত সুপারভাইজরের ঘর খালি। বিভাগীয় প্রধান (ফারজানা ইসলাম) আমারে ডাকলেন। বললেন, আমার সম্ভাব্য সুপারভাইজর মানস চৌধুরী; আমি যেন গিয়ে তাঁর সাথে আলাপ করি আমাকে তাঁর শিক্ষার্থী হিসাবে নেবে কিনা। তো আমি মানস চৌধুরীর রুমে গেলাম। বললাম, আমারে ম্যাডাম পাঠাইছে আপনার সম্ভাব্য শিক্ষার্থী হিসাবে, আপনি নেবেন কিনা জানতে। উনি বললেন নেবেন। ফলে আমি একজন সুপারভাইজর পাইয়া গেলাম।

আমার এই প্রাপ্তি ছিলো খুবই কাগুজে ঘটনা। আমি একদিন কি দুইদিন মানস চৌধুরীর কাছে গেছিলাম। ওনার আরো একজন শিক্ষার্থী ছিলো, আমার ক্লাসমেট সায়েমা চৌধুরী (হিমুও ছিলো সম্ভবতঃ)। ওর ডাক নাম অন্ত। অন্ত’রে আমি ত্যাজ্যবন্ধু করছিলাম তখন। হিমুর সাথেও কুসম্পর্ক আছিলো। এদিকে মানস চৌধুরী চাইছিলেন তাঁর শিক্ষার্থীদের মাঝে যেন সুসম্পর্ক থাকে। উনি তাঁর চাওয়ার কথা আমারে বলেন। আমার এইটা পছন্দ হয় নাই। আমি সেইটা বলি নাই ওনারে। আমি ওনার কাছে যাওয়া ছাইড়া দিলাম। বর্ষান্তে গবেষণাপত্র জমা দেবার এক/দুই দিন আগে মানস চৌধুরীর সাথে আমার ডেইরি ফার্ম গেটে দেখা হয়। উনি আমার গবেষণা’র বিষয়ে জিগান। আমি বলছিলাম যে, জমা দিয়া দিবো স্যার।

আমি জমা দিছিলাম সময় মতো। এর জন্য বিভাগের জুনিয়র ভাই রাহাতের কাছে কৃতজ্ঞ হইতে হয় আমার। বাংলা কম্পোজ করতে পারতাম না। জমা দেবার আগের রাতে আমি কাগজে লেইখা দেই, আর রাহাত কম্পোজ করে। রাহাতের কম্পোজ সঠিকের কাছাকাছি। সুজাতের কম্পিউটারে এই কর্ম কইরা দেয় রাহাত। আমার নামাজি বন্ধু অভি’র প্রিন্টারে ফজরের সময়ে প্রিন্ট নেই; আগেই বইলা রাখছিলাম। সাড়ে আট/নয়টার দিকে প্রিন্ট নিয়া যাই কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে। বাঁধাইয়ের পরে বিভাগে জমা দিয়া দেই।

ভাইভার সময় মানস চৌধুরী বোর্ডে ছিলেন (সুপারভাইজর উপস্থিত থাকেন)। সেইখানে আমার  সবিশেষ বেযোগাযোগ উনি বেমালুম চাইপা গেলেন। কী কী যেন ভুল বুঝাইলেন অন্য পরীক্ষকদের। সেই কারণেই সম্ভবতঃ আমি পাশ করতে পারছিলাম শেষ পর্যন্ত। এইটা নির্ঘাৎ ওনার একটা ট্রিক আছিলো, আমারে কৃতজ্ঞ করবার। সন্দেহ হওয়ায় আমার আর কৃতজ্ঞ হওয়া হয় নাই।

পরে অন্ত আর হিমুর সাথে আমি ‘খারাপ সম্পর্ক আর নাই’ দশায় পৌঁছাই। কিন্তু ততদিনে আমার গবেষণা শেষ। মানস চৌধুরীর সুপারভিসন না নেওয়ায় আমার গবেষণা যা হইতে পারতো তা হয় নাই। কিন্তু হয়তো যা হওয়া উচিত ছিলো তা-ই হইছে। অর্থাৎ এইটার মধ্যে একটা ‘আমার আমার’ বিষয় আছে; কিংবা খারাপির মধ্যে মানস চৌধুরীর দায় নাই কোন।

গবেষণাপত্রের কোন কপি আমার কাছে নাই। ২০০৬-০৭ সালে সাঈদ স্যার (সাঈদ ফেরদৌস) এই বিষয়ে একটা বক্তৃতা দিতে নৃবিজ্ঞান বিভাগে ডাকেন আমারে। তখন সম্ভবতঃ বিভাগীয় লাইব্রেরি থেকে ফটোকপি নিয়া প্রবন্ধ আকারে এইটা লিখি। এবং যদ্দূর মনে পড়ে, সাঈদ ফেরদৌসের শিক্ষার্থীদের দেই। প্রবন্ধ আকারে মানে হইলো ‘গবেষণা পদ্ধতি’ জাতীয় ভণিতা বাদ দিয়া লিখি। বিভিন্ন সময় প্রকাশের কথাও ভাবি, কিন্তু করা হয় নাই।

এই কাজের জন্য আমার বিশেষ কোন পড়া ছিলো না। কার যেন পরামর্শে মাহবুব মোর্শেদের কাছে গেছিলাম একদিন। এর আগে-পরে, দৈনিক সমকালে দেখা হবার আগে ওনার সাথে আমার কথা হয় নাই আর। ওনারে আমি বিশেষ অপছন্দ করতাম। সেলিম আল দীনের ঠিক দুই কদম পিছে উনি কেমনে হাঁটতেন ভাইবা অতি আশ্চর্য হইতাম। এইটা যে খুব দেইখা ভাবতাম তা হয়তো না। ভাবার জন্য দেখার দরকার হইতো না কখনোই আমার। তো মাহবুব মোর্শেদের কাছে গেলে উনি কইলেন যে বঙ্কিম খারাপ, বিদ্যাসাগর ভালো। এইগুলার উত্থাপন কেমনে হইলো সেইটা মনে নাই আর। ওনার এই বক্তব্যও অপছন্দ হয় আমার। ফলে কাইটা পড়ি। বন্ধু রাজন একবার ‘পূর্ববঙ্গের ভাষা’র কথা কইছিলেন। ব্রাত্য রাইসু’র কথাও বলছিলেন সম্ভবতঃ। পরিচয় না থাকা, আমার ঢাকা না আসা—মোটের উপর আলসেমির কারণে এইগুলা আর কিছুই খোঁজা হয় নাই আমার। জানতামও না কিছু। জাহাঙ্গীরনগরে ‘সাহিত্য’ বিষয়ক লোকজনের সাথে আমি কখনো যোগাযোগ করতাম/রাখতাম না, ফলে বাইরেও কোন লিংক আছিলো না। তাস, জুয়া, ক্যারম, দাবা, টিভি দেখার পরে আর সময় পাইতাম না।

যাই হোক, এইখানে লেখাটা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিলাম। এই বিষয়ে আরো লেখার ইচ্ছা আছে। এখন ‘ভাষা’ বিষয়ে চলমান বিভিন্ন আলাপের সাথে পরিচয় ঘইটা গেছে আমার। সেইগুলারও প্রতিক্রিয়া লেখার ইচ্ছা আছে। মনে হইলো এইটাই প্রকাশ করি আগে।

– মনু
——————————

বাংলা ভাষার আধুনিকায়ন: ভাষিক ঔপনিবেশিকতা অথবা উপনিবেশিত ভাষা

উপনিবেশিতের ভাষার উপরে ঔপনিবেশিকতার প্রভাব সম্পর্কে আসাদ এবং ডিক্সন এর বিশ্লেষণ হলো-ঔপনিবেশিক প্রবল ভাষার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে উপনিবেশিতের ভাষার রূপান্তরণ; মোদ্দা কথায় ইউরোপীয়করণ। তারা লিয়েনহার্টকৃত ডিংকা সামাজে কাজের ভিত্তিতে দেখান, ডিংকা শব্দ ‘‘লো তোয়েঙ্গ’’ এর পূর্বতন অর্থ ‘‘সামনে যাওয়া’’ বা ‘‘এগিয়ে চলা’’ প্রতিস্থাপিত হয়েছে ইউরোপীয় ‘‘প্রগতি’’-র ধারণা দ্বারা। আসাদ এবং ডিক্সন আরবী ভাষার উদাহরণ দিয়ে দেখান ইউরোপ সাক্ষাতে আরবী ভাষার রূপান্তর, আরবী ভাষাকে ধ্রুপদী আরবী ভাষার চেয়ে যেকোন ইউরোপীয় ভাষার অধিকতর নিকটবর্তী করে তুলেছে (আহমেদ ও চৌধুরী, ২০০৩ পৃঃ ২৬৭)। আসাদ-ডিক্সন ভাষাকে সমাজবিচ্ছিন্ন করে ভাষা পরিসরে ঔপনিবেশিকতাকে দেখেননি। বরং ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক আধিপত্য ‘‘ডিংকা’’ সমাজকে কিভাবে ঢেলে সাজায়—তার পরিচয় উদ্ঘাটন করছেন তারা, ঔপনিবেশিক অভিঘাতে ডিংকা ভাষার পাল্টানো রূপ বিশ্লেষণ করে।

বাংলা ভাষা পরিসরে ঔপনিবেশিকতা নিয়ে ভেবেছেন কলিম খান (খান, ২০০২; পৃঃ ১১৮) তার ভাবনায় এসেছে বাংলা ভাষার একমাত্রিকতায় নীত হওয়া, বহু অর্থবোধকতা লোপ, তথা বাংলা ভাষার এক ধরনের খর্বীকরণকে চিহ্নিত করেছেন তিনি। এখানে ঔপনিবেশিকতাকে দেখেছেন তিনি সমাজ-প্রকৃতি পরিবর্তনে দায়ী হিসেবে, তাঁর মতে যে সমাজপ্রকৃতি ভাষার সরণ সাধক। ‘‘মানুষের জন্য প্রকৃতির ভাষা পরিকল্পনা’’-র একটি রূপরেখা দিয়েছেন তিনি—

মানব সমাজের জন্য প্রকৃতির ভাষা পরিকল্পনা* i

সমাজ যখন ভাষা তখন শব্দার্থের স্বভাব তখন ভাষার সংখ্যা শব্দ সংখ্যা
খন্ড স্বভাবের প্রতীকী একটি শব্দের একটিই অর্থ অনেক প্রচুর
অখন্ড স্বভাবের ক্রিয়া ভিত্তিক একটি শব্দের অনেক অর্থ সীমিত সীমিত

 

মনে হয় তার বিশ্লেষণে প্রথাগত মার্ক্সবাদী প্রকল্পের অনিবার্যতা আছে যাতে ঔপনিবেশিকতা শেষ পর্যন্ত একটি নিমিত্ত মাত্রে পর্যবসিত হয়। তার বিশ্লেষণে সমাজ যত বিশেষায়িত হবে, ব্যক্তি মানুষ একই কাজের পুনরাবৃত্তি করতে থাকবে, কোন একটি বিশেষ শব্দ তত একই অর্থের পুনরাবৃত্তিমূলক ব্যবহারে জীর্ণ হয়ে শেষতঃ একার্থক হয়ে পড়বে। তিনি ঔপনিবেশিকতাকে দেখেছেন ঐ বিশেষায়নকে ত্বরান্বিত করার প্রভাবক হিসেবে। এই দেখেদেখি ক্ষমতাকেন্দ্রিক ঔপনিবেশিকতাকে পাশ কাটায়। আমরা পরবর্তীতে দেখবো পুনরাবৃত্তিমূলক ঐ একটি অর্থ যে সব সময় প্রাচ্য ডিসকোর্সে থেকেছে এমন নয়; বরং শব্দটি কেবল বাংলা খোলস হিসেবে পাশ্চাত্য অর্খকে ধারণ করতে পারে। আসাদ-ডিক্সন এবং কলিম খান- এই দুই বিশ্লেষণের পরিসরে ঔপনিবেশিকতাকে বুঝতে বাংলা ভাষার প্রেক্ষিতে কতগুলো ক্ষেত্রে আমি ভিন্নমত পুষি।

আসাদ-ডিক্সন প্রস্তাবনাকে আমি পাঠ করি শব্দার্থবোধকতার ডিসকোর্স বদল অর্থে, যেখানে তারা দেখাচ্ছেন যে ইদানিং বিবিধ ‘ডিংকা’ শব্দ কিভাবে কেবল পশ্চিমা (এক্ষেত্রে ইংরেজি) ডিসকোর্সেই অর্থময় হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাংলা ভাষার প্রেক্ষিতে ডিসকোর্স বদল কেবল পশ্চিম অভিমুখেই হয়নি। একদিকে যেমন বিভিন্ন ইংরেজী শব্দ অধিগ্রহণের উদাহরণ আছে, আবার যেক্ষেত্রে সরণ হয়েছে পশ্চিম অভিমুখে–তার সনাক্তকরণ এবং প্রগাঢ় সমালোচনার উদাহরণও আছে। কন্ঠ শিল্পী মমতাজ গীত একটি গানের কথা এমন-

 

‘‘পাংচার হইলে চাকা

চলবে না আর গাড়ী

হায়াতের তেল পাইবা না

খুঁজলে জগৎ ভরি…।’’

আবার,

‘‘হেডলাইট করছো ইউজ

কখন যে হইবে ফিউজ

রাখছনি তাহার নিউজ…।’’

এখানে ব্যবহৃত পাঁচটি ইংরেজি শব্দ যে মারফতী আধ্যাত্মিকতা ধারণ করছে তা ইংরেজীর নয় বাংলা, তথা পূর্ব অভিমুখী। অন্যদিকে ‘সত্য’ শব্দের রবীন্দ্র অর্থবোধকতার ইংরেজিয়ানা সনাক্ত করেন বঙ্কিমচন্দ্র। বঙ্কিমচন্দ্র দেখান, রবীন্দ্রনাথের ‘সত্য’ ইংরেজী ‘truth’ এর বাংলা প্রতিশব্দ মাত্র, কিন্তু সত্য শব্দ বাংলায় প্রতিজ্ঞা, দায়িত্ব, কর্তব্য ইত্যাদি অর্থের ব্যবহার অবিরল। বঙ্কিম বাংলা ‘সত্য’ শব্দের সমান্তরাল আরেকটি ইংরেজি শব্দের কথা বলেন, ‘troth’।

লক্ষণীয়, রবীন্দ্রনাথ ইংরেজ প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থায় এবং পারিবারিক ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক আবহে শিক্ষাপ্রাপ্ত, আর মমতাজের গান ‘বাউল’ ঘরানার বলে পরিচিত, যা কিনা অইউরোপীয় (ভারতীয়) দার্শনিক বোঝাপড়ার পরিচয়বাহী। কাশীনাথ রায় এবং ফেরদৌস আজিম (রায় ও আজিম, ১৯৯৫) এর বিশ্লেষণী উদঘাটন হল ভারতীয় উপনিবেশে ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসক প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল নকল ইরেজ তৈরী, যারা রক্তে-বর্ণে ভারতীয় কিন্তু চিন্তায়, দর্শনে, রুচিতে ইউরোপীয়। ওদিকে গৌরী বিশ্বনাথনও (বিশ্বনাথন, ১৯৯০) দেখান ইংরেজ শাসকরা ঐ উদ্দেশ্যেই ভারতীয় শিক্ষা পরিকল্পনায় ইউরোপীয় বিজ্ঞান শিক্ষার থেকে মূলতঃ কেন্দ্রে এনেছিল ইউরোপীয় দর্শন নির্ভর সাহিত্যিক অধ্যয়ন। রবীন্দ্রনাথ এখানে ঐ ঔপনিবেশিক উদ্দেশ্য চরিতার্থতার উদাহরণ হয়ে যান। আমি এখানে বিশ্লেষণ করার চেষ্ট করবো, ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলাফল বাংলা ভাষার প্রেক্ষিতে কেমন হয়েছে—এই প্রশ্ন।

ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন:

ঔপনিবেশিক শাসক এবং ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত ইউরোপমনস্ক ভারতীয়রা যে মৌল দার্শনিক বিন্দুতে মিলিত হয় তা হল: ভারতের প্রধান সমস্যা—ভারতের বিবিধতা বা বহুমাত্রিকতা, বহু বাচনিকতা। ইংরেজ শাসনে রাজস্ব আদায় ক্ষেত্রে বড় সমস্যা ছিল ভারতের ভূমি ব্যবস্থাপনায় বিবিধতা, যেখান থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার উপায় হিসেবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে পুরো ভারত একক ভূমি ব্যবস্থার আওতায় আসে। ১৮৫৭ এর পরে পুরো ভারতবর্ষ বিটিশ সামাজ্যের একটি রাজ্যে পরিণত হয় যেখানে উপনিবেশ পূর্ব ভারতে (এমনকি মোঘল যুগেও) বহু রাজা, রাজ্য ছিল। ভূমির ব্যক্তি মালিকানার সূত্র ধরে পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থার একক আওতায় চলে আসে পুরো ভারতবর্ষ। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উদ্ভব/বিকাশ ঘটে, যেখানে ভারতে জাতিগত বহুত্বের তাত্ত্বিক অস্বীকৃতি জানানো হয়। ধর্মীয় ক্ষেত্রে একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম ধর্মের উদ্ভব ঘটে রামমোহন রায়, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমূখের প্রচেষ্টায়, যেখানে সনাতন ধর্মে ছিল বহু দেবদেবী, ঈশ্বর, ঈশ্বরী। ইসলাম ধর্ম ক্ষেত্রেও শিক্ষিত মুসলিমরা বিশুদ্ধ ইসলামের কথা বলেন; কারণ, ইসলাম ধর্ম তত্ত্বীয়ভাবে একেশ্বরবাদী হলেও ঔপনিবেশিকতা পূর্ব মধ্যযুগে, মুসলিম রচিত কাব্যে একাধারে দেব-দেবী, আল্লাহ-রাসুল বন্দনা গীতি তত্ত্বের উল্টো সাক্ষ্যই দেয়। তাই মুসলমান শত ভাগ কিতাবী হয়ে ওঠার ডাক শোনা যায় এসময়। এভাবে ঔপনিবেশিক ভারতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে একত্বে উপনীত হওয়া কাম্য হয়ে ওঠে। ভাষা সমাজ-সংস্কৃতি উত্তীর্ণ নয়। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও ঐ একত্বের তাগিদ দেখি। বাংলা ভাষার রৌপ, অর্থগত বহুত্বও একত্ব খোঁজে। বরিশাল, নদীয়া কিংবা ময়মনসিংহ, নোয়াখালীর বাংলা বাংলার বহুত্ব নয় বরং ‘আঞ্চলিকতা’ বলে চিহ্নিত হয়, এগুলো হয়ে পড়ে ‘উপভাষা’ তথা ‘ভাষাসদৃশ’। ‘আদর্শ’ বাংলা তৈরি হতে থাকে মুদ্রণ ব্যবস্থা, সংবাদপত্র কিংবা নব সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে।

বাংলা ব্যাকরণ:

বাংলা প্রথম ব্যাকরণ রচিত হয় ইউরোপীয়দের হাতে, বাংলায় উপন্যাস প্রথম রচনা করেন প্যারীচাঁদ মিত্র (সম্প্রতি [২০১১] দেখা গেলো, হ্যানা ক্যাথরিন ম্যুলেন্স প্রথম ঔপন্যাসিক।), মহাকাব্য প্রথম রচিত হয় বাংলায় এসময়। রীতি, আঙ্গিক কিংবা দার্শনিক—বহুবিধ পরিবর্তনের পথ ধরে ইউরোপীয় মানদণ্ডে ‘যথার্থ’ সাহিত্য হয়ে উঠে বাংলা। রবীন্দ্রনাথ নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পান ঐ ঔপনিবেশিক সময়কালেই। ঔপনিবেশিক শাসক বাংলা মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাও চালু করে। এসব ঘটনায় বাংলা ভাষার যে পরিবর্তন সাধিত হয় তাকে মোটা দাগে বাংলা ভাষার আধুনিকায়ন বলে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে ইতিহাসে। এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য ঔপনিবেশিকতার প্রভাবে বাংলা ভাষার পরিবর্তন বিশ্লেষণ–ঐ আধুনিকতাকে চেনা, নিদেনপক্ষে চিনতে চাওয়া।

ব্যাকরণ কি ভাষার সংবিধান?

সোজা সাপটা বললে ব্যাকরণ হলো ভাষার শাসনতন্ত্র। শাসক কে? যিনি বা যারা ব্যাকরণ রচনা করেন তারা অন্ততঃ শাসনাভিপ্রায়ী। বাংলা ব্যাকরণের প্রয়োজনীয়তা ছিল ইউরোপীয় বণিকদের। নেটিভদের সাথে যোগাযোগের জন্য বাংলা জানা প্রয়োজন আর তা শেখার জন্য চাই ব্যাকরণ। ব্যাকরণতো নেই, থাকবে কিভাবে, আগে তো কেউ বাংলা ভাষা শাসন করতে চায়নি। তারা ব্যাকরণ রচনা করে নেন। ওদিকে শিক্ষিত বাঙালি ‘আদর্শ’ বাংলা চান এবং চান সে ‘আদর্শ’ বাংলা শাসন করবে তাবৎ বাংলাকেই। তবে প্রথমে মীমাংসা করতে হবে বাংলার উৎপত্তি।

বস্কিমচন্দ্রের মতে বাংলা সংস্কৃত-এর দুহিতা। বাংলা ব্যাকরণ রচনায় সংস্কৃত ব্যাকরণের ছায়া  এসেছে। এর ফলে প্রচলিত অনেক আরবী, ফরাসী শব্দই বাদ পড়েছে বাংলা থেকে কিংবা সংস্কৃত বানান পদ্ধতিতে পুনর্লিখিত হয়েছে, এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলা ভাষায় হিন্দুয়ানী আবিষ্কৃত হয়েছে। পাকিস্তান আমলে কিংবা তার আগেই অনেক মুসলমান লেখক প্রচলিত সংস্কৃত শব্দ বাদ দিয়ে অপ্রচলিত আরবী, ফারসী শব্দ ব্যবহার করেছেন।

তবে উভয় পক্ষই সামিল একত্বের ডিসকোর্সে, ‘বহুত্ব’কে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সরবে। এভাবে আদর্শ বাংলার তাগিদ এবং সে লক্ষ্যে রচিত ব্যাকরণের মাধ্যমে যে সাহিত্যিক বাংলা তৈরি হয়েছে তা ব্যাপক বাংলাভাষী জনসাধারণের ভাষা থেকে দূরবর্তী হয়ে উঠেছে। বিভাজন তৈরী হয়েছে নতুন—‘কথ্য’ ও ‘লেখ্য’।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত: বাংলা কাব্যের আধুনিকায়ন

ঔপনিবেশিক পরিসরে প্রবল ভাষা ইংরেজির দিকে ঝুঁকে পড়েন নব্য শিক্ষিত মধুসূদন, লিখেন ইংরেজি কাব্য, কিন্তু কাব্যস্বীকৃতি পেতে ব্যর্থ হয়ে বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। লিখতে চান মহাকাব্য, কিন্তু বাংলাভাষাকে তার মনে হয় ম্যাড়মেড়ে, আর বিরক্তি উদ্রেককারী সাংগীতিক, যা মহাকাব্যের গাম্ভীর্য ধারণ করতে অপারগ। আবার, বাংলা প্রচলিত ‘ছন্দ’কে মহাকাব্যের উপযুক্ত দৈর্ঘ্যসহ ভাবতে পারেন না।

তিনি দেখতে পান কতিপয় ইংরেজি ধ্বনির উচ্চারণ বৈশিষ্ট্যের জন্য অধিকাংশ ইংরেজি শব্দের শেষে এক ধরনের ঝোঁক [থেমে যাওয়া অর্থে] রয়েছে যা ইংরেজির অতিরিক্ত সংগীত প্রবণতাকে রোধ করে। যেমন instinct, instant ইত্যাদি। একই বৈশিষ্ট্য তিনি পান সংস্কৃত ভাষার শব্দে এবং সংস্কৃত আশ্রিত যুক্তাক্ষরময় বাংলা শব্দে। আর ছন্দ শিখে নেন পেত্রার্ক এর কাছে—‘blank Verse’ যার বাংলা করা হয় ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’। তিনি লিখেন মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্য’, এ মহাকাব্য আঙ্গিক ও রীতিতে ইউরোপীয়। কিন্তু আসাদ-ডিক্সন প্রকল্প যেমন আরবী ভাষার ক্ষেত্রে বলেন যে, আধুনিক আরবী ধ্রুপদী আরবীর চেয়ে ঔপনিবেশিক প্রবল ভাষা ইংরেজির অনেক কাছাকাছি, তেমন এ মহাকাব্যের ভাষা প্রচলিত বাংলা থেকে দূরবর্তী হয়ে ঔপনিবেশিক ভাষা ইংরেজির মতো না হয়ে বরং অপর একটি ঔপনিবেশিক ভাষা ‘সংস্কৃত’ ভাষার কাছাকাছি হয়েছে। এখানে আসাদ ও ডিক্সন আরবী ভাষার ক্ষেত্রে যা বলেন তার থেকে ভিন্ন কিছু দেখতে পাই।

ঔপনিবেশিক শাসনামলে বাংলা ভাষা পরিক্ষেত্রে বেশ কিছু নতুন ঘটনা ঘটে। ভারতে এ সময়ে মুদ্রণযন্ত্র আমদানী হয়, ছাপা হতে থাকে সংবাদপত্র থেকে বিভিন্ন সাহিত্যিক পুস্তকাদি, বলা হয়ে থাকে এ সময়ে বাংলা গদ্যের আবির্ভাব (যদিও এর আগে থেকেই চিঠিপত্র সরকারি প্রজ্ঞাপন ইত্যাদিতে গদ্য বেশ থাকার কথা), বিরাম চিহ্নের ব্যবহার শুরু করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (ইংরেজীর অনুকরণে)।

দার্শনিক সরণ, ভাষিক সরণঃ

মধুসূদন অমিত্রাক্ষর ছন্দ শেখার সাথে সাথে ইউরোপীয় রীতির নাটক প্রহসন, সনেট শিখে নেন। অমিত্রাক্ষর ছন্দ এবং সনেট উভয় ক্ষেত্রেই ছত্রে ছত্রে অন্ত্যমিল এর বাধ্যবাধকতা নেই। অন্ত্যমিলকে ভাবা যেতে পারে বারবার একই স্থানে ফিরে ফিরে আসা যা পুঁজিবাদী গতিশীলতার সাথে খাপ খায় না। গদ্যের প্রধান ব্যবধান পদ্য থেকে মনে করি–গতি। ইউরোপেও গদ্য তৈরি হয় সম্ভবতঃ পুঁজিবাদের উন্মেষ কালেই। নতুন আর্থসামাজিক-দার্শনিক ভাবনা ধারণ করতে পারে না পদ্য, অতএব গদ্য অবশ্যম্ভাবী। এমন বাস্তবতায় গদ্য কবিতা তৈরি হয়। বিষয়টি মার্ক্সের ‘মুক্তশ্রম’ ধারণা দিয়ে বোঝা বা বিশ্লেষণ করা যেতে পারে, যেখানে অনুসিদ্ধান্ত হলো শ্রমের গতিশীলতার সাহিত্যিক উৎসারণ গদ্য। ঐ গতি পদ্য পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এসেছে গদ্য কবিতা, বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থায় আর্থ-সামজিক-দার্শনিক রূপান্তরণের সমান্তরালে এইসব ঘটনা ঘটেছে। এখানে বিকাশের একটি ঐতিহাসিক শর্তকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে, তবে বাংলার ক্ষেত্রে এটা সম্ভবতঃ সার্বজনীন নয়। ইউরোপমনস্ক ‘শিক্ষিত’ বাঙালিরা ইউরোপের ‘আধুনিকতার’ অনুকৃতি হিসেবে বাংলায় অনেক কিছু করেছে, যেগুলো সমাজ-ঐতিহাসিক শর্ত নির্ভর প্রথাগত মার্ক্সবাদী প্রকল্প ব্যাখ্যা করতে পারে না। এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে গ্রামসির হেজেমনির ধারণা কিংবা তালাল আসাদের ‘পশ্চিমা সভ্যতার আবশ্যিক গ্রাহক’, বিষয়ক বিশ্লেষণ। ঐ পশ্চিমা সভাতার একটি অনুষঙ্গ ‘একক পরিবার’। আমার মনে হয় ‘একক পরিবার’ মতাদর্শ ও ‘ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ’ বাংলা ভাষায় যুক্তাক্ষর নিয়ে বিতর্কে প্রভাব রাখছে। বাংলা ভাষায় যুক্তাক্ষর ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্ক আছে। প্রচেষ্টা আছে যুক্তাক্ষর ভেঙে দেয়ার। যুক্তাক্ষরময় শব্দে গাদাগাদি করে একাধিক বর্ণ পরস্পরের সাথে লেপ্টে থাকে যেখানে বর্ণের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই। এর সাথে মিলিয়ে দেখা যেতে পারে ‘যৌথ পরিবার’ কে যেখানে ব্যক্তিকতার পরিসর সীমিত। বিপরীতে রয়েছে যুক্তাক্ষরবিহীন শব্দ যার সাথে মিলে যায় ‘একক পরিবার’, যেখানে স্বীকৃতি রয়েছে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের। আমি মনে করি যুক্তাক্ষর ভাঙার প্রয়াসকে বলা যেতে পারে ‘বর্ণ স্বাতন্ত্র্যবাদ’। আবার ইংরেজীতেও যুক্তাক্ষর নেই, সম্পর্ক/ যোগাযোগ খোঁজা যেতে পারে এর সাথেও।

অনুবাদ: বনসাঁই বাংলা শব্দ

বর্তমান বাংলা বর্ণমালায় কয়েকটি বর্ণ বাদ দেয়া হয়েছে। যেমন ‘৯’ এর মতো দেখতে ‘লী’ উচ্চারণ হয় যে বর্ণটির যা কম্পিউটারের হরফে নেই, অন্তঃস্থ ‘ব’ ইত্যাদি। এগুলো নাকি এখন অপ্রয়োজনীয়। যুক্তাক্ষর ভেঙে দেয়া, তিনটি শ এর পরিবর্তে একটি শ কিংবা একটি ন এর প্রস্তাব-এর মতো বাংলার কিছু বিষয়কে অপ্রয়োজনীয় বলে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে বাংলা শব্দের অর্থবোধকতায় ধাতুমূল বা শব্দমূল এর প্রয়োজনীয়তা হ্রাস থেকে, আর এই প্রয়োজনীয়তা হ্রাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ আমি মনে করি—অনুবাদ। বর্তমানে দাবী আছে উচ্চশিক্ষার পাঠ্যপুস্তক বাংলায় প্রণয়নের। আর যেহেতু পাঠ্যসূচী ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থারই প্রতিফলন, তাই ঐ সব পাঠ্যপুস্তক মূলতঃ ইংরেজি গ্রন্থেরই অনুবাদ।

এছাড়াও অনেক সাহিত্যিক অনুবাদও হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে একটি বিষয় প্রায়ই দেখা যায়, আর তা হল বাংলায় অনুবাদের পরে কোন নির্দিষ্ট বাংলা শব্দের পরে বন্ধনীর মধ্যে ইংরেজি শব্দ দেয়া। এখন পাঠাগ্রহ বা পাঠাদর্শ যদি হয় ইংরেজি তবে ঐ সব বাংলা শব্দকে পাঠক চিনতে থাকে ঐ বন্ধনীনির্দিষ্ট  ইংরেজি শব্দের অনুবাদ হিসেবে। এভাবে ঐ বাংলা শব্দ ইংরেজি শব্দের অনেকগুলো অর্থের একটি অর্থকে ধারণ করে, আর তা-ই হয়ে ওঠে ঐ বাংলা শব্দের একমাত্র অর্থ। এর ফলে ঐ বাংলা শব্দের অর্থময়তার ডিসকোর্স হয়ে ওঠে ইংরেজি অথবা ঐ একটি অর্থকেই উপজীব্য করেই বাঁচে, কাজ করে। ঐ বাংলা শব্দের বহুবিধতার সম্ভাবনা রহিত হয়, অর্থ স্থির, অনড়, নিরেট হয়ে ওঠে, যা ধাতুমূল বা শব্দমূলের প্রয়োজনীয়তা ছেঁটে ফেলে। বেশ কিছু উদাহরণের মাধ্যমে, বিষয়টি বোঝা যেতে পারে। ধরা যাক ‘বৃদ্ধ’ শব্দটি। শামসুর রাহমানের কোন একটি সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম মনে পড়ে, সেখানে শামসুর রাহমান বলেন যে তিনি ‘বৃদ্ধ’ হতে চান না, চিরতরুণ থাকতে চান। কিংবা দেহ ‘বৃদ্ধ’ হয়েছে কিন্তু মন ‘বৃদ্ধ’ হয়নি। এখানে বৃদ্ধ ও তরুণ শব্দদ্বয় ইংরেজী ‘old’ এবং ‘young’ এর বাংলা প্রতিশব্দ। কিন্তু ‘বৃদ্ধ’ শব্দটি বিশ্লেষণ করলে কি দাঁড়ায়?

‘বৃদ্ধ’—বৃদ্ধি পাওয়া সমাপ্ত হয়েছে যার; বৃদ্ধি পাওয়া বলতে আমরা বুঝতে পারি-

শারীরিক বৃদ্ধি, আবার মানসিক বৃদ্ধি। অথবা সম্পত্তিগত বৃদ্ধিও বোঝা যেতে পারে, -এই অর্থে ‘বৃদ্ধি’ মানে দখলের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া ব্যক্তি হিসেবে ফুলে ফেঁপে উঠতে চাওয়া।

মোটের উপর ‘বৃদ্ধি পাওয়া’ বলতে আমরা যাই বুঝি না কেন ‘বৃদ্ধ’ বলতে এক কথায় বুঝতে হবে আর না চাওয়া। তাহলে তিনি ‘বৃদ্ধ’ হতে চান না এর অর্থ করা সম্ভব তিনি আরও চান।  একেই সম্ভবত সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব বলা হয়। তবে কি শামসুর রাহমান সাম্রাজ্যবাদী এবং তিনি তাই থাকতে চন? নিশ্চয়ই তিনি তা বোঝাতে চান না। এই বিভ্রাট তৈরি হয়েছে ইংরেজি ডিসকোর্সে ‘বৃদ্ধ’ শব্দের অর্থবোধকতার জন্য। আর এই অর্থবোধকতার জন্য ‘বৃদ্ধ’ শব্দের ধাতুমূল বা শব্দমূলের প্রয়োজন নেই।

আবার,

‘Can’ মানে ‘পারা’, ‘May’ মানেও ‘পারা’।

বাংলায় একটিই ‘পারা’ কিন্তু ইংরেজিতে ‘May’-এর মধ্যে এক ধরনের নৈতিক প্রশ্ন জড়িত সম্ভবত যেমন ‘I may not do this to her.’; আর ‘I can do this.’  শক্তি, সামর্থ্য, ক্ষমতার প্রশ্ন। তাহলে ইংরেজিতে ‘Can’ এবং ‘May’—দু’টি বিদ্যমান থাকা বোঝায় যা নৈতিক নয় এমন কিছুও ইংরেজি ভাষায় করা সম্ভব। কিন্তু বাংলায় একটি ‘পারা’ দিয়ে নৈতিক নয় এমন কিছু ‘পারা’র সম্ভাবনা খারিজ করে।

অনুবাদের ফলে বাংলায় নতুন ‘পারা’—‘আমি খুন করতে পারি।’ তৈরি হয়েছে, যেখানে বাংলা ‘পারা’ধৃত দর্শনকেই উল্টে দেয়া হয়েছে।

‘ক্ষমতা’ শব্দ নিয়েও ভাবা যেতে পারে। ‘ক্ষমা’ এবং ‘ক্ষমতা’–একই ধাতুমূল উৎসারিত যার মানে দাঁড়ায় ক্ষমতাবান-ই ক্ষমাশীল। কিন্তু ইংরেজিতে ‘Forgiving’ এবং ‘Power’-এর মধ্যে কোন সম্পর্ক নেই । কিন্তু আমরা বাংলা ভাষীরাই এখন ‘ক্ষমা’ ও ‘ক্ষমতা’র সম্পর্ক দেখি না। অনুবাদ কেন্দ্রিকতায় ধাতুমূলের প্রয়োজনীয়তা লোপ ‘ক্ষমা’ ও ‘ক্ষমতা’র দূরত্বকে আরও বাড়িয়েছে।

মওলানা আকরাম খাঁ তার ‘মোসলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস’ বইয়ে মধ্যযুগের একটি বৈষ্ণব কবিতা উল্লেখ করেন। সেখানে চৈতন্যদেব ‘ভূষণ্ডী’ সংহার করতে চান। তিনি তার শিষ্যকে জিজ্ঞেস করছেন ‘ভূষণ্ডী’ সংহারের উপায়। শিষ্য বলছে মুসলমানরাও নিষিদ্ধ, অপবিত্র বিষয় বা বস্তু থেকে পরিত্রাণের জন্য ‘হারাম’ ‘হারাম’ বলে উঠে। অবিশ্বাসী মুসলমান যদি ‘রাম’ [হা রাম, হা রাম] নাম নিয়ে পরিত্রাণ পায় তবে ‘রাম’ ভক্তের তো কথাই নেই। (খাঁ, ২০০২ পৃঃ ১১৪)

‘হারাম’ শব্দের এমন ভাষিক ব্যবহার কি আজ সম্ভব? যে জন্য এই ব্যবহার নেই, সেখানেই ঔপনিবেশিকতা।

প্রতিরোধের বিরল উদাহরণঃ

ঔপনিরবেশিকতায় রূপান্তরিত বাংলার এক ধরণের বিনির্মাণ করেন কফিল আহমেদ। বাংলা ভাষার এখন ‘রাধা’ আবশ্যিকভাবেই ‘নারী’। যদিও ধাতুমূল বলে ‘রাধা’ হলো ‘আরাধনা করে যে’ (বঙ্কিমচন্দ্র, ১৩৯৩ বাং, ৯১৬পৃঃ); এই অর্থে ‘রাধা’র লিঙ্গ পরিচয় পাই না। লিঙ্গ উত্তীর্ণ ‘রাধা’ কফিল আহমেদ ব্যবহার করেছেন। কফিল আহমেদ আরও যেটা করেছেন তা হলো বাংলা গানে ‘ওগো’ ‘গো’ ‘রে’ (বিশেষত আধুনিক গানে) ধরনের নিরর্থক শূন্যস্থান ভরাটকারী আরোপিত মাত্রা সংযোজনকে পাল্টে দিয়েছেন। কফিল আহমেদ একটি গানের কথা হল।

‘‘রাজার ফুল বাগানে যাই

একটু হাঁটিয়া বেড়াই রাই

আমার প্রাণে শান্তি নাই…।’’

এখানে ‘রাই’ একটি শব্দ, ‘গো’ ‘রে’ ‘ওগো’ ধরনের ‘পুটিং’ ধ্বনিমাত্র নয়। ‘রাই’ মানে রাধা যার লিঙ্গ পরিচয় গানে নেই।

আমাদের ‘রাধা’ পাঠ, ‘নারী’ পাঠ আবশ্যিকভাবেই। ‘কৃষ্ণ’—নরমানুষ, ঈশ্বর নন কোনভাবেই। ‘রাধা’ ‘নারী’ হতে বাধা নেই, কৃষ্ণের ‘নর’ হতেও বাধা নেই; কিন্তু ঔপনিবেশিক একার্থবোধকতায় রাধা-কৃষ্ণ নারী-নর ছাড়া কিছু নন। আবার চারদিকে শুনতে পাই, কফিল শ্রবণ উদ্ভট শ্রবণ। উদ্ভট, কারণ কফিলের গান একার্থবোধী শ্রবণেন্দ্রিয়কে উদ্দীপ্ত করে না। কফিলের গানের অজনপ্রিয়তায় উদ্ভাসিত দেখি ঔপনিবেশিক আধিপত্য।

 


আগের/পরের পর্ব<< বাংলাভাষা পরিচয়বাঙ্গালা ভাষা – গ্রাডুএট্ (হরপ্রসাদ শাস্ত্রী)। >>
শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
রক মনু

রক মনু

কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য