Main menu

চলেন আমের কোলে উঠি

হিন্দি আর উর্দু বুলিতে পয়লা টকি সিনেমা কিন্তু একটাই, দুইটা না! আরো মজার ব্যাপার হইলো ‘আলম আরা’ নামের সেই সিনেমা কোন হিন্দু বা মোসলমান বানায় নাই, বানাইছে একজন জরথুস্ট্রিয়ান–আর্দেশির ইরানি, পারসি একটা ফোক গপ্পো লইয়া! ধনী-গরিবের পিরিত লইয়া মিউজিক্যেল টাইপ সিনেমা–মিউজিক পারসি/মোঘল ঘরানার–সুফিয়ানা টাইপের পপের মিশেল, এখনকার হিন্দি-উর্দু-বাংলার পপ ঘরানার সিনেমাগুলি যেমন হয়, তেমনই একখান সিনেমা ‘আলম আরা’! আরেকটা ব্যাপার হইলো, সিনেমাটা ফিমেল লিড!

তার আগে ভারতে যেইসব বোবা সিনেমা হইছে সেইগুলা প্রায় সব হিন্দু মিথোলজি লইয়া; পয়লা টকি ওই হিন্দি/উর্দু সিনেমা এই রিজিয়নের পরের সিনেমারে ডিটারমাইন কইরা দেয়। সিনেমা আর গান হিট, ক্রাউড সামলাইতে পুলিশ দরকার হইছিল! এই সিনেমার বুলি এমন মাত্রায় ডেমোক্রেটিক আছিল যে তা এমনকি হিন্দি-উর্দু, এই দুইটা বুলির ইন্টারসেকশন হিসাবে প্লে করতে পারছে; এই দুইটা বুলির ব্যাপারে খেয়াল করার ব্যাপার হইলো, দুইটার গ্রামার সেম, স্রেফ ভোকাবুলারি লইয়া কিছু কম্যুনাল ফারাক আছে।

ইরানি সাহেব জরথুস্ট্রিয়ান হওয়ায় মে বি হিন্দু-মোসলমানের কম্যুনাল চিপাটা এড়াইতে পারছিলেন!পরের হিন্দি সিনেমারে উনি বাঁচাইয়া দিছেন, থিম/সাবজেক্ট যেইটাই হৌক পরের হিন্দি সিনেমা বুলির ব্যাপারে ইরানি সাহেবের ওই বেসিক রুলটা ভায়োলেট করে নাই। নাইলে ‘আদমী’ নামে ১৯৩৯/১৯৬৮/১৯৯৩ সালের তিনটা হিন্দি সিনেমার নাম হইতো মে বি ‘মনুষ্য’! কিন্তু আরো বড়ো ব্যাপার আছে একটা; আদমী আর মনুষ্যের ফারাক আসলে ততো কম্যুনাল ফারাক না, যতো ক্লাসের ফারাক–হিন্দুত্বের কনটেক্সটে কাস্ট বা বর্ণের ফারাক কইলেই আরেকটু ঠিক হয়।

ভার্নাকুলার বুলিগুলি সংস্কৃত বুলিরে ডিনাই কইরাই পয়দা হইছিল, বা আগে থেকেই আছিল, সংস্কৃত হয়তো দখলের তাবত চেষ্টার পরেও ভোকাবুলারির ছোট্ট শরীকের বেশি হইতে পারে নাই; সংস্কৃতে যে আছিল না ভার্নাকুলার সেইটা গৌতম বুদ্ধের বুলি দিয়াই অনুমান করতে পারি আমরা! ফার্সি হাজির হওয়ায় সংস্কৃত বুলির লগে ফাইটে ভার্নাকুলারের জন্য রহমত নাজিল হইছিল হয়তো; নাইলে, পরিচয়ের কোরটাই রিপ্লেসড হইয়া ‘আদমী’ বা ‘ইনসান’ হইয়া পড়াটা কি সম্ভব! ‘আদমী’ নামে রাজ কাপুরের হিন্দি সিনেমা বা ভোকাবুলারিতে ‘ইনসান’ শব্দটা ডমিন্যেন্ট হইয়া ওঠা যতো বেশি ফার্সির জিত তার চাইতে বেশি ভার্নাকুলার/শূদ্রের/আমের জিত, ব্রাহ্মণ্যের লগে হাজার হাজার বছরের ফাইটে!বাট বাংলায় আম/শূদ্র মন জিততে পারে নাই; টকি সিনেমার আগেই বামুন বাংলা একদফা জিতছিল বিদ্যাসাগর-বঙ্কিম-রঠার ভিতর দিয়া; শূদ্র পক্ষে আলাল বা সধবার একাদশীর বাংলাটা হারছিল তখন; বঙ্কিম আলালের বাংলা বুলিরে খোশ আমদেদ জানাইলেও নিজের লেখায় কখনো আলালের রুচি নেন নাই–খোদ খোশ আমদেদটাও কইছেন বামুন বাংলায়–‘শুষ্ক তরুর মূলে জীবনবারি নিষিক্ত হইল।’!

টকি সিনেমা হবার কালে, ১৯৩০ দশকে ভার্নাকুলার/আম বাংলা জিততে পারতো হিন্দির মতো; একটা সুবিধাও আছিল–আগের নাটক/মঞ্চে ভার্নাকুলারের দাপট আছিল! বাট কোলকাতার যেই আলেমদের হাতে বাংলা টকি সিনেমা পয়দা হইলো তাগো আছিল বামুন মন; ভার্নাকুলারের/চাড়ালের i বিপরীতে ব্রাহ্মণ্যের আরেক দফা জিতে নজরুল ইসলাম আছিলেন বামুন সেনাপতি একজন; উনি অভিনয় করছেন অল্প (ধ্রুব, ১৯৩৪ সিনেমায় নজরুলের ডায়লগ–বামুন বাংলায়: …অসীম সাহসে আসিয়াছ বনমাঝে, হরি পদ্মপলাশলোচন কে তোরে শিখায়ে দিল? কে …ভাগ্যবান শিশু, শৈশবে…), তার বাইরে স্ক্রিপ্ট, গান লিখছেন, মিউজিক করছেন বেশ কয়েকটা টকিতে; সেগুলি আছিল মোর অর লেস বামুন বাংলায়।

এইখানে একটা কমেন্ট রাখি, ভাবনাটা আরো মেলতে চাই আরেকটা লেখায়; নজরুলের ফার্সি চেষ্টাটা বামুন বনাম ভার্নাকুলার বাংলা আছিল না মোটেই, ক্লাসের ইস্যুটা নজরুলে নাই, নজরুল কম্যুনাল মর্ম লইয়া কাম করছেন–মোসলমান বামুন বানাইছেন মাত্র! এই চিপায় এখনো আছেন মোসলমান বাঙালি–ইভেন মার্ক্সের বাছুর যেইসব মোসলমান বাঙালি তাঁরাও বাংলায় মোসলমানের ভাগ চাইতে থাকেন মাত্র, ক্লাসে যাবার দরকার দেখেন না–এঁনারা আমের পাশ কাটাইয়া যাওয়া মার্ক্সিস্ট!ii

হিন্দি টকি সিনেমা গোড়া থেকেই আমের নাগর হইতে চাইছে, আমের পয়সায় বলিউডের লোভের কারণে বলিউড আমের কাছেই বেচতে চাইছে তার আর্ট; আমের ভাব-ভঙ্গি, বুলি, মিউজিক, গপ্পো লইয়াই ব্যবসাটা করতে চাইছে, তার ভিতরে যতোটা পারে নিজের মুত ঢালছে–মানে নিজের ক্লাসের আর্ট ঢুকাইছে; বাস্তবে নিজের ক্লাসের আর্টের বস্তায় তো কলোনিয়াল মাল ছাড়া কিছু নাই! তাই বলিউড নিজের ব্রান্ডটা বানাইছে মোঘল আর আম আর্টের মিশেলে, কলোনিয়াল বস্তার বা হলিউড থেকে পরের আমদানী করা মাল ঢুকাইতে যাইয়া ব্রান্ড ইমেজে ছাড় দেয় নাই, ব্রান্ডে যখন ছাড় দিছে তখনই ধরা খাইছে। iii

আমের লগে ব্যবসা করার ডিসিশন নিছে বইলাই বলিউড কম্যুনাল চিপায় পড়ে নাই; আমরা দেখবো বিজেপির প্রোপাগান্ডা মুভিও আম হিন্দিতে, বিজেপি প্রাইম মিনিস্টারও ওয়াজ করতে খাড়াইয়া ‘সালাম’ দেন জনতারে। মোঘল/নবাবী মিউজিক-পোয়েট্রি-ডান্স রিমেক করছে মনের ভিতরে ইসলামে দুশমনী লইয়াই হয়তো; আবার নিছে আমের আর্ট–ফোক মিউজিক-ডান্স-গল্প; আবার, বলিউডের আওতায় তো অনেক আম–বাংলা থেকে তেলেগু-উড়িয়া!

আমরা এই ওয়াজে বাংলা আর হিন্দি লইয়াই থাকি; ১৯৫৪ সালে বলিউডে নাগিন সিনেমার রিলিজ হয়, এই সিনেমার গল্প মে বি বাংলাদেশের বেঁদে পিপলের উপর, লিখছেন ফরিদপুরের বিজন ভট্টাচার্য– ইনি মহাশ্বেতা দেবীর ভাতার, নবারুণের বাপ; মিউজিক করছেন হেমন্ত মুখার্জী। এইটার “মন দোলে, মেরা তন দোলে… ” আর ‘বিণ মিউজিক’ পরবর্তী সব সাপের সিনেমার রেফারেন্স পয়েন্ট হইছে, এখনো পিপল সাপের মিউজিক বলতে ওইটারেই বোঝে। গানটা গাইছিলেন লতা।

১৯৫৪ সালের আগেই কুমিল্লা/ত্রিপুরার রাজবংশের পোলা শচীন দেব বর্মণ বলিউডে সাকসেসফুল মিউজিক ডিরেক্টর হইছেন। বলিউডের গান/মিউজিক নাড়াচাড়া কইরা কিছু ব্যাপার মনে হইলো; যেমন, হেমন্তের নাগিনও একভাবে শচীন দেবেরই ক্রিয়েশন! ১৯৪০ দশকের বলিউডের মেইন/হিট গানগুলি তালাশ করলাম; মনে হইলো, ১৯৫০ দশকের হিট মিউজিকগুলি আগের দশক থেকে সিগনিফিকেন্টলি তফাতে। এই তফাতটা বানাইছেন শচীন দেব–বাংলার মিউজিক দিয়া, যেগুলিরে আমরা এখন ফোক কইতে আরাম পাই! হেমন্তের নাগিনে সেই ফোকেরই টাচ পাই–গল্পেও তো সেইটাই আছে!

তখনো ঢাকায় বাংলা সিনেমা হয় নাই, কোলকাতায় হইতাছে; তো, ওই মিউজিকেরা বা গল্পেরা কতটা জায়গা নিতে পারছে কোলকাতায়? এইসব লইয়া ওনারা যে বলিউডে গেলেন সেইটা কি ওনাদের পার্সোনাল লোভের ব্যাপার, নাকি কোলকাতার রিজেকশন? হেমন্ত কোলকাতা-বোম্বে দুই ইন্ডাস্ট্রিতেই কাম করছেন, বাট কোলকাতায় ফোক-টাচের মিউজিক দিতে পারেন নাই মে বি, বলিউডে যেইটা পারছেন; হেমন্তের মতো শচীন ফ্লোটিং আছিলেন না ততো, উনি কোলকাতায় ট্রাই করছেন কয়েক বছর, পরে পার্মানেন্টলি বলিউডে গেছেন; বহু বছর পরে ১৯৭৬ সালে আবার একটা বাংলা সিনেমায় মিউজিক দিছেন মনে হয়।

শচীন ততো ফ্লোটিং আছিলেন না মানে তাঁর যেই মিউজিক্যাল সিগনেচার/দস্তখত iv সেইটা ছাড়তে ততো রাজি আছিলেন না মনে হয়–বলিউডের একদম শুরুতে একটু ছাড় দিছেন রিজেকশনের পরে, বাট তারপর থেকে সিগনেচার দিতে ছাড় দেন নাই। নজরুলের কামে মনে হয়, উনিও হেমন্তের মতোই ‘ফ্লোটিং বিটুইন ক্যাটেগরিজ’ টাইপ আছিলেন; ‘আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন, দিল ও হি মেরা ফাস গ্যয়ি…’ টাইপ আইটেম গান বাদেও উনি ‘সাপেরা’ নামে একটা হিন্দি সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখছেন, যেইটা হয়তো ১৯৫৪ সালের নাগিনের আম্মা! সাপেরা আসলে বাংলা সিনেমাই, হিন্দিতে ডাবিং করা হইছিল। কিন্তু নজরুলদের এইসব চেষ্টায় তেমন ফল হয় নাই, নিজেরাও থাকেন নাই ঐখানে; মোটের উপর কোলকাতায় আমজনতার এইসব মালামাল বিশেষ পাত্তা পায় নাই; সেইটা ক্লিয়ার হয় সত্যজিৎ বা উত্তমরা কোলকাতার সবচে সেলিব্রেটেড সিনেমার লোক হওয়ায়। এমনকি বাংলা সাপেড়া সিনেমাও বামুন বাংলাতেই মে বি; সিনেমার ক্লিপ পাই নাই, কিন্তু গান পাইলাম, নজরুলেরই লেখা। ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই…’

–গানটা গাইছেন কানন বালা, জটিল রাগের গান; ভাবে মনে হইতে থাকে শহুরে মিডল ক্লাসের কেউ পাগাড়ে যাইয়া মইজা গেছে, গান গাইতাছে সে, সাপুড়ের ভাবের মনে হয় না! ‘আকাশ’ শব্দটাও তো আমের শব্দ না, ডেমোক্রেটিক হিসাবে আসমান-ই বেশি আম, এখনো, জীবনানন্দের আকাশ বা নীল আকাশের নিচে’র পরেও! তবু এই সিনেমা বা গানে যতটা আমভাব আছে তাতে আরেকটু বাতাস দিলে নজরুল মে বি আমের দিকেই যাইতেন, হুমায়ুনের ঘেঁটুপুত্র কমলা’র আদি ভার্সনটা হয়তো নজরুলই বানাইতেন–লেটোর দলে নিজের এক্সপেরিয়েন্সের ভিতরেই তো আছিল নজরুলের!

তো, এখন তক আমার থিয়োরি হইলো, কোলকাতা বিজন বা শচীনদের নেয় নাই, খেদাইয়া দিছে; কেননা, কোলকাতার আবহাওয়া ডেমোক্রেটিক আছিল না একেবারেই, বোম্বের তুলনায়। বোম্বের সিনেমা যেমন কলোনিয়াল মিডল ক্লাসের বাইরের হিউজ অডিয়েন্সকে পাত্তা দিছে, তাগো দেখাইতে চাইছে, বেচতে চাইছে, কোলকাতার সিনেমা সেইটা চায় নাই; রাজ কাপুর বা দিলীপকুমার সব ক্লাসের হিরো হইতে পারছিলেন, অমিতাভ হইছেন শাহেনশাহ্, বাদশাহ শাহরুখ আর কোলকাতায় উত্তম মিডল ক্লাসের ‘মহানায়ক’ বটেন। deshpremeeএই মহানায়ক অমিতাভের লগে হিন্দি সিনেমা করতে যাইয়া পুচকে বাঙালি হইয়া আছিলেন! v ১৯৫৫ সালের হিন্দি দেবদাসে সুচিত্রার যেই হিউজ বলিউড জয় সেইটা আর কন্টিনিউ করতে পারে নাই মে বি ঐ পুচকে বাঙালি নাগরের গোস্বায়!

কনজার্ভেটিভ/ফিউডাল কোলকাতা সিনেমারে পপ আর্ট হইতে দিতে চায় নাই, বাট শচীন-বিজনের আর্ট ভাবনা আছিল পপ-নাগর! হেমন্তেরও আম বা পপ আর্জ/কামগুলি বলিউডেই করতে হইলো মে বি তাই!

কোলকাতা যে পপ হইতে রাজি হইতে পারলো না তার মেইন কারণ মে বি বাংলা বুলি লইয়া খুবই কনজার্ভেটিভ পজিশন; কমন/আম বাংলায় মুভি করার বদলে কোলকাতা মুভি বানাইছে সেন্সর্ড এবং প্রমীত/বামুন বাংলায়। মডার্ন বাংলা বানাবার নামে বিদ্যাসাগর-রঠা যেই বাংলাটা বানাইছিলেন সেইটা ডেমোক্রেটিক আছিল না, তার উপর, ওইটা হিন্দু ধর্মের ছাকনিতে ফিল্টার্ড খুবই! বলিউড হিন্দির ব্যাপারে অমন কনজার্ভেটিভ আছিল না, হিন্দি সিনেমা বানাবার নামে তাঁরা আদমীরে মনুষ্য বানায় নাই–কেননা, আদমী-ই কমন বা আমের হিন্দি; রিলিজিয়ন চর্চা না কইরা বরং ব্যবসা করতে চাইছে সব ক্লাসের লগে, যা কিছু পয়সাফ্রেন্ডলি হওয়া পসিবল তারেই ঢুকাইছে বলিউডে; সেই কারণে হিউজ শিয়া মোসলমান পাই বলিউডে, কিছু সূন্নী, দরবারী/মোঘল মিউজিক-ডান্স, ফোক, বাংলার মতো পেরিফেরির পয়সাফ্রেন্ডলি এলিমেন্টস নিছে গরুর ঘাস খাবার মতো কইরা (গোগ্রাসে)!

ঢাকার বাংলা সিনেমা কোলকাতারেই ফলো করছিলো–সেই ‘মুখ ও মুখোশ’ থেকেই, কেবল মিডল ক্লাসের গপ্পো লইয়াই, এবং অবশ্যই বামুন বাংলায় (সিনেমার অশিক্ষিত শমসের ডাকাত বামুন বাংলায় কথা কয়)। বাট হিন্দি আর উর্দু সিনেমা দেখতে দেখতে কোলকাতা থেকে সইরা যাইতেছিল ঢাকার সিনেমা।

দেখতে দেখতে মানে হইলো আমের দিকে যাওয়ার ছবক পাইতেছিল; আসলে উপায়ও আছিল না কোন, সাকসেসফুল বাংলা সিনেমা বানানো যাইতেছিল না; কেননা, একে তো কোলকাতার খারাপ নকল, তার উপর পয়সা উসুল হইতে যেই সাইজের মিডল ক্লাস দরকার সেইটা নাই পূব পাকিস্তানে–আর আমের লগে ব্যবসা না করার ডিসিশন তো নেওয়াই আছে আম বাংলার দিকে পিঠ দিয়া থাকায়।

সো, ছবক লইতে রাজি হইলেন ঢাকার ডিরেক্টররা; আমের দিকে গেলেন, ইবনে মিজান বানাইলেন রূপবান, পরে জহির রায়হান বানাইলেন বেহুলা! আম বাংলার কাহিনি এগুলি, সিনেমার মিউজিক আর গানেরাও আম বাংলায়; মুভিগুলি সুপারহিট, আমের পয়সায় পাওয়া গেল আরো ছবি বানাবার রসদ। তবু খেয়াল করলেই বুঝবেন, এঁনারা আসলে জনতার লগে ধানাই-পানাই করছেন! এইসব ডাইরেক্টর আসলে বামুন বাংলার লোকই থাইকা গেছেন; সিনেমার গরিব/মুর্খ পাটের মুখে আম বাংলা বুলি দিছেন, বাট নিজেদের ক্লাসের, শিক্ষিতের মুখের বুলি সেই বামুন বাংলাই! জহির রায়হান অবশ্য কোলকাতার সহি মুরিদ হইয়াই থাকলেন মোটামুটি; ১৯৬১ সালে ‘কখনো আসেনি’তে ডাব্বা মারার পর উর্দু সিনেমা বানাইলেন জহির সাব, তারপর ১৯৬৬ সালে বেহুলা; বেহুলায় আম বাংলার কাহিনি লইলেন ঠিকই বাট ওনার বেহুলা কথা কয় সেই বামুন বাংলাতেই; ‘কখনো আসেনি’ হতে ‘জীবন থেকে নেয়া’–ওনার ছবিগুলি বামুন বাংলাতেই কোলকাতার ভাব-ভঙ্গি-বুলি লইছেন, কোলকাতার কাছে যেইটা চাড়ালের আর্ট সেইটা লন নাই; পূবের বাংলার জনতারে কোলকাতার আর্ট খাওয়াইতে, বুলি শিখাইতে আয়ু খরচ করছেন নিজের! vi

এমন ধানাই-পানাই বা বেঈমানী বা ঘুঘলামী পূব পাকিস্তানের মিডল ক্লাস বাঙালিরা আগেও তো করছিল! ১৯৫২ সালে বাংলার জিতটা তো পুরাই দখল করছিল বামুন বাংলা; অথচ, আমের বাংলারে যদি ভুল/অশুদ্ধ বাংলা ধরেন তাইলে সহি বাঙালি তো এখনকার চাকমাদের চাইতে বেশি হবে না শুমারিতে! ১৯৫২’র দাবিটাই তাইলে করা যায় না, বাংলারে স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ বানানো তো দূরের কথা! মানে হইলো, আম বাংলা দিয়াই আপনে মেজরিটি হইছেন, আর জেতার পরে বেঈমানী করছেন, আমের বাংলারে ভেজাল বাংলা কইয়া বেয়াদবি করছেন।

বাট ইবনে মিজানরা ঘুঘলামী/ধান্দালি করলেও একটা জিনিস সামনে আনছেন; নোয়াখালী বা বগুড়া বা পূর্ণিয়া বা মুর্শিদাবাদের বাঙালিদের বা শিক্ষিতের যে কমন একটা বাংলা থাকা পসিবল, সেইটা দেখাইছেন; আনুমানিক একটা কমন/আম বাংলা দিছেন গরিব/মুর্খ পাটগুলির মুখে, যেইটারে কোন একটা অঞ্চলের বাংলা (ধরেন, নোয়াখাইল্লা) বলা যায় না, কেবল মুর্খের বাংলা কইতে পারবেন না; কেননা, ঐ বাংলাটা দিয়াই তো সিনেমার মুর্খেরা কম্যুনিকেট করতাছেন শিক্ষিতের লগেও! এইটাও কম বড়ো কাম কইবো না আমি; এইটা তাবত বাঙালিরে আম হিসাবে ভাবতে রাজি হওয়া অনেকটাই, সিনেমার আমের আর্ট হবার দিকে যাইতে থাকা! মিউজিক আর পোয়েট্রি/লিরিকস-এ তো পুরাই আম হওয়া! সো, এইটারে–ইবনে মিজানদের কামগুলিরে কইবো আমের দিকে যাইতে থাকার একটা ধাপ!

১৯৬৫ সালের পরে হিন্দি আর ঢুকতে না পারলেও উর্দু সিনেমা এবং পাকিস্তানী হবার দেমাগে কোলকাতা থেকে সরার আগ্রহ বাড়ছিল মে বি, কোলকাতার লগে ঢাকার ফাইটের একটা আইডিয়াও আছিল। আইউবের রিঅ্যাকশনে পূব পাকিস্তানে রঠাগানের রমরমা বাজারের ভিতরেও তাই বাংলাদেশের ইন্ডিপেন্ডেন্সের আগে-পরে কমন বাংলায়, সব ক্লাসের ভিতর পপুলার হবার বাসনা লইয়া ঢাকায় বাংলা সিনেমা হইছে; সুজন-সখী বা রূপবান বা লাইলী-মজনু এইসব সেই ডেমোক্রেটিক/পপ হবার বাসনার মুভি, একটা অনুমিত কমন বাংলায় এগুলির ডায়লগ-গানের অনেকটাই।

“ও আমার রসিয়া বন্ধুরে, তুমি কেন কোমরের বিছা হইলা না…”, “আমার কাঙ্খের কলসী, গিয়াছে ভাসি…”, “সব সখীরে পার করিতে…”, –এইসব গান আমরা পাইছি কোলকাতা থেকে সরতে পারায়। মাগার ১৯৭১ সালের পরে উর্দু সিনেমাও বন্ধ হয়, হিন্দিও আর ঢুকতে দেওয়া হয় নাই প্রোটেকশনের নামে। এই সুযোগেই কোলকাতা আবার টেক-ওভার করে। আইউব যখন রঠাগান গাইতে মানা করে তাঁর রিঅ্যাকশন হিসাবে পূব পাকিস্তানে যেই রঠাজিকির শুরু করে আওয়ামী কালচার-লেবারেরা সেইটাই ঢালিউডরে দখল করে আবার, বলিউড বা লাহোরের মোর ডেমোক্রেটিক/পপ আর্ট ঢুকতে না পারা ফাকা মাঠে!

পপুলার বাংলা ঢং, গল্প, মিউজিক, বুলির ডিরেক্টররা ক্রমেই কোণঠাসা হইয়া পড়েন, কুড়ি বছরের ভিতর–তাগো আর্টকে ছোটলোকের বিনোদন হিসাবে ট্রিট করা হইতে থাকে; আমাদের মনে পড়বে, দেশের সবচে বেশি কামাই করা সিনেমা বেদের মেয়ে জোসনারে অনার দেই নাই আমরা, অঞ্জুর বডি লইয়া হাসাহাসি করছি, অঞ্জুর কান্দনে আমাদের হাসি পাইছে, ডাইরেক্টর তোজাম্মেল হক বকুলরে স্রেফ একটা আনকালচার্ড নামের বেশি ভাবতে নারাজ, বকুলের নসিবে উইকিপিডিয়ার একটা পেজও দিতে পারি নাই আমরা!

কোনটারে কইলাম কোনঠাসা? নাগপূর্ণিমা সিনেমা এই ব্যাপারে ভালো একটা নজির। সোহেল রানা-ববিতার এই সিনেমা বাইদা/সাপুড়ে মানুষদের লইয়া; বাইদা বা অন্যান্য গরিব/অশিক্ষিত মানুষ লইয়া বানানো সিনেমাগুলিতে অন্তত আম বাংলা পাওয়া যাইতো, সেই সব সিনেমায় যদিও শিক্ষিত পাটগুলি বামুন বাংলাতেই ডায়লগ দিতো; নাগপূর্ণিমা সিনেমায় বামুন বাংলা অশিক্ষিতদেরো পুরা দখল কইরা ফালায়! এই সিনেমার সাপুড়ে বাইদারাও বামুন বাংলায়! যেমন, সাপুড়ে সর্দার মিটিং শেষে কয়, ‘সভা ভঙ্গ করা হইলো।’! ঢালিউডে অশিক্ষিতের কমন বাংলা হিসাবে যেইটা এতোদিন এলাকা-ক্লাস ছাড়ানো আম বাংলা হিসাবে আছিল, নাগপূর্ণিমা সেইটারে পুরাপুরি ডিনাই করলো। আস্তে আস্তে ১৯৮০/৯০ দশকে ঢালিউড পুরাই বামুন বাংলা দখল কইরা লয়।

অমন দশার মাঝেই রূপবানের মতো অনেক সিনেমাই বানাইছেন ইবনে মিজান, আজিজুর রহমান, আমজাদ হোসেন, বকুলরা। আমজাদ হোসেন লইয়া আরো দুই কথা কইতে হয়; উনি ফোক বা মিথে থাকেন নাই, উনি কন্টেম্পরারি গেরাম লইয়া মুভি বানাইছেন, গোলাপীরে লইয়া গ্রাম টু আরবান ফোক-ফ্যান্টাসি বানাইছেন।

বামুন আর আম, দুই বাংলাতেই সিনেমা হইতেছিল ঢাকায়; কিন্তু আমের আর্ট, সিনেমা-মিউজিক আমরা মিডল ক্লাস বড়জোর লোক-ফোক-গরিব হিসাবেই নিছি, কনজ্যুম করছি আর বামুন বাংলা আর্টকে নিজেদের আর্ট হিসাবে নিয়া বুলবুলের মাঝে উত্তম-সৌমিত্রের তালাশ করছি, ববিতা আমজাদের গোলাপী হইলেও তাঁর মাঝে পাইতে চাইছি সুচিত্রা-তনুজার ঢঙ; ওনারাও তাবত মন দিয়া বামুন বাংলার সহি উচ্চারণে বিজি হইলেন, মোহাজের রাজ্জাকরে পাইয়া আমরা ভাবলাম দুধই তো, এর মাঝেই পাইবো কোলকাতার দুধের স্বাদ! লগে আমরা টিভির ভিতর ঢুইকা পড়লাম আমের আর্ট এড়াইতে; পিওর বামুন বাংলা পাইলাম যেন আফজাল-সুবর্ণা-শম্পা রেজার মাঝে। vii

তবে, মাসুদ পারভেজের একটা সিনেমা পাইলাম–এইটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মাসুদ পারভেজ বহু কারণেই ইন্টারেস্টিং; ‘ড্যাশিং হিরো’ হিসাবে পরিচিত সোহেল রানাই ডাইরেক্টর হিসাবে নিজের নাম লিখতেন মাসুদ পারভেজ! দুই নামই ইউজ করছেন গুণাহগার সিনেমায়–ডাইরেক্টর আর নায়ক–দুই নামে দুইটাই উনি!

গুনাহগার সিনেমায় বামুন বাংলারে পুরা ডিনাই করলেন মাসুদ পারভেজ! গরিব-ধনী-শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রায় সবগুলি পাটই এই সিনেমায় আম বাংলায় কথা কয়! গুনাহগারের ডায়লগ:

সো.রানা: ওই ছেড়ি, তুই কেডা…?

ববিতা: আস্তে কন, আস্তে কন… মর্দের জাত কি নরম হইয়া কথা কইতে পারে না!

–গুনাহগার

ববিতা, সোহেল রানা আর খলিলের অভিনয় স্পন্টেনিয়াস খুবই, তাগো পাটগুলি গরিবের না, খুব শিক্ষিত না বটে; বাট বামুন বাংলায় ডায়লগ দেবার মতো পজিশনে আছে মোটামুটি সবাই–ঢালিউডি পাটের হিসাবে; কাহিনি কিছুটা আন্ডারওয়ার্ল্ডের কওয়া যায়–ক্রাইম থ্রিলার। এমনও আছে যে, খলিল বামুন বাংলায় ডায়লগ শুরু কইরা আম বাংলায় চইলা যায়! সোহেল রানাও বামুন বাংলা কইতে পারে; একটা সিনে গাড়ি থেকে একজনরে বাইর কইরা বামুন বাংলায় কথা কয়; দুইচারটা কিল-থাপ্পড় দিয়া আম বাংলায় শাসায়! দেখা যাইতাছে, গাড়ির সমীহ কাটাইয়া উঠতে পারলেই আপনে আম বাংলায় কইবেন!

আরেকটা মজার সিনে দেখা যায়, ক্যানভাসার টেলিসামাদ ওষুধ বেচে, খদ্দেরকে কনভিন্স করতে বামুন বাংলায় লেকচার দেয়! এই যে খারাপ কামে বামুন বাংলার ব্যবহার, এইটা আরো করছেন আমজাদ হোসেন। আমজাদের সিনেমায় হামেশাই দেখবেন, ভিলেন বামুন বাংলায় কয়, নায়ক-নায়িকা আম বাংলায়। ঢালিউড পুরা উল্টাইয়া যায় পরে; মান্নার মুভিতে মনে পড়ে, নায়ক মান্না বামুন বাংলাই হামেশা ব্যবহার করছেন, আর ভিলেনরা হামেশাই আম বাংলা! আমজাদে যেই রাজীব বামুন বাংলায় শয়তানী করে সেই রাজীব কাজী হায়াতে আম বাংলায় শয়তানী করে!

যাহোক, গুনাহগার সিনেমার আসল গুরুত্ব বোঝা যাবে ১৯৯০ দশকে প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের নাটকের নতুন একটা ধারার শুরু হওয়াটা খেয়াল করলে। তখন একটা আম বাংলায় নাটক শুরু হয় ফারুকী/আনিসুল হকের হাতে। এই আম বাংলাটায় শিক্ষিত মিডল ক্লাসের বাইরে কম চেনা ইংরাজি শব্দ একটু বেশি; সেই কারণে অনেকে ভাবলেন, এইটা আরবান ঢাকার মুখের বুলির নাটক। মুখের বুলি আলবত; মাগার খেয়াল করলে দেখা যাবে, মুখের বুলির বাইরেও এই বুলিটা ক্লাস উতরাইয়া উঠতে পারা একটা বাংলা; সব ক্লাসের, সব এলাকার মানুষের মাঝেই পপুলারিটি পাইছিল, এবং সেইটার আসল কারণ আম ব্যবহারের বুলি হওয়ায় অভিনয়ের স্পন্টেইনিটি–উচ্চারণে বাড়তি মন দিতে যাইয়া অভিনয়ে মনের কমতি পড়তাছে না, আবার একই কারণে বুঝতে পারতাছে সবাই–কম্যুনিকেটিভ।

মাসুদ পারভেজের গুনাহগার এই নয়া ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার আম্মার মতোই, এই আম বাংলাটাতেই উনি গুণাহগার বানাইছেন! তালাশ করলে আমরা আরো নজির পাবো হয়তো। গুনাহগারের মতো সিনেমা খুব না পাইলেও ঐ সময়ের বলিউডের একটা পাওয়ারফুল ট্রেন্ড আছিল, কোলকাতার ফিল্মোগ্রাফিরে পাত্তা না দেওয়া; বদলে বলিউড মন টানছিল তাগো। কোলকাতাবাদীরা এই ঘটনারে হিন্দির দাপট হিসাবে ভাবাইতে চায়, তাতে করে কোলকাতাবাদ আসানে গোপন করা যায়।

কিন্তু দুই ধারার সিনেমা তুলনা করলে আমরা দেখবো, কোলকাতাবাদ কেবল সেই কলোনিয়াল ক্যাপিটালে পয়দা হওয়া, প্রজাদুশমন জমিদারির টাকায় জিন্দা থাকা মিডল ক্লাসের রুচিরে তোয়াক্কা করে, বুলি থেকে মশকরা–সবই কোলকাতার তাগো, জনতায় আদব নাই–বড়জোর মাস্টারি কইরা মন দখল করতে চায়। ওদিকে, বলিউডে মন দেওয়া ডাইরেক্টররা আসলে বলিউডের কাছে স্রেফ একটা এটিচ্যুডের ছবক লইলো! জনতার লগে আর্ট-কালচারের রিলেশন বুঝতেই বলিউডের হেল্প নিলো। সেই হেল্প লইয়াই তারা বাংলাদেশের জনতার রুচি-গল্প-আর্ট-দুঃখ-ইশক-বুলি-রিলিজয়নকে পাত্তা দিতে শিখলো। ‘দো-জাহানের মালিক তুমি, হে পরওয়ারদেগার…’ –এই গানের পয়দা হইতে পারে না কোলকাতার আর্ট ভাবনায়, কোলকাতা যেমন একসাথে কইবে জ্বীন-ভুত, তাতে জ্বীনের বাদশা সিনেমা পয়দা হইতে পারে না, কোলকাতার আর্ট মাজারে যাইতে দেবে না আপনারে! কোলকাতার আর্ট আপনারে ইভেন লিখতে দেবে না, ‘আমার সারা দেহ খেও গো মাটি, চোখ দুটো মাটি খেও না…’, কেননা, ওতে আছে কবরের রেফারেন্স; বদলে আপনারে দিয়া কেবল লেখাবে, ‘চিন্তার চেয়ে চিতার আগুন ভালো…’! বলিউডে মন দিয়া আপনে গাইতে পারবেন, ‘নজরে নজরে রাখিয়া আমারে, নয়নের বান মারিলা, অন্তরে পিরিতের আগুন ধরাইলা…’, কোলকাতা আপনেরে গাইতে কইবে, ‘দৃষ্টিতে দৃষ্টিতে রেখে আমাকে, অক্ষিবন্ধনে শৃঙ্খলিলা, হৃদয়ে প্রেমের অগ্নি প্রজ্জ্বলিলা…!’ viii কোলকাতার মন লইয়া গাইতে পারবেন না, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম মধুমালার মুখ, স্বপ্ন যদি মিথ্যা হইবো, হাতের আংটি কেন বদল হইবো গো…’! আপনে উরশ বুঝবেন না, জিকিরে ফানা হওয়ারে ভাবতে থাকবেন প্রি-মডার্ন ব্লাইন্ডনেস, তারপর আপনে লালসালু লেইখা ওয়াহাবি মুভমেন্ট আগাইয়া দেবেন আরেকটু!

বলিউড সেইসব ডাইরেক্টরদের বাঁচাইয়া দিছিল, বলিউডের ভাব তাগো গণদুশমন হামবড়া হইতে দেয় নাই, কোলকাতার মতো ফিউডাল সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স থেকে দূরে রাখতে পারছিল তাগো! বলিউডের কাছে তাঁরা জনতার এন্টারটেইনার হইতে শিখছে, শিখছে জনতার দুয়ারে আর্টের ফেরিঅলা হইতে।

তবে আরো দুইটা ঘটনা কইতে হয় এই ব্যাপারে; ১৯৮০ দশকে হুমায়ুন আহমেদ বামুন বাংলা থেকে বেশ কিছুটা বাইরে নাটক বানাইছেন, বাংলাদেশের আম বাংলার কাছাকাছি আছিলেন উনি অনেকটাই। আরো আছিল মীনা কার্টুন; ইউনিসেফের মীনা কার্টুন তার ইনটেনশনের কারণেই আম বাংলায় বানানো। শিক্ষিত মিডল ক্লাস পাটগুলি মীনায় বামুন বাংলায় কথা কয় প্রায়ই; বাট সেইটা তরজমা করে মীনা। মীনার কামিয়াবি এই বুলিটার পাওয়ারে নজর দিতে বাধ্য করে।

সো, মাসুদ পারভেজ-হুমায়ুন আহমেদ-মীনা, আম বাংলার এমন একটা পাটাতন বানাইয়া তোলে যাতে ঐ নাটকগুলির পয়দা হওয়া সোজা কইরা দিছিল! সেই ধারায় এখন আমরা নাটক আর সিনেমা দুইটাই পাইতেছি ঐ আম বাংলায়। দেশে তো ক্রিটিক নাই ভালো, ব্যাপারগুলি পাবলিক ডিসকোর্সে পুরা ফরসা হয় নাই। সেই কারণেই মে বি ডাইরেক্টররা আম বুলির ব্যাপারে পুরা কনসাস হইতে পারেন নাই! মাগার বিজনেস আর্জ অটোমেটিক্যালি তাগো আম বুলির দিকেই নিয়া যাইতাছে।

এখন আবার একদল সিনেমাঅলা হইছেন যাঁরা কোলকাতারে পাত্তা না দিতে পারেন; এ কে সোহেল, অনন্ত জলিল, ফারুকী, রেদোয়ান রনি, ইফতেখার চৌধুরী, আশিকুর রহমান (মে বি মনপুরা’র সেলিমও কতকটা)–এনারা কেউ বলিউডে, কেউ তামিলে, কেউ কোরিয়ায়, কেউ হলিউডে, কেউ ইরানে মন দিছেন; কেউ পুরাটা এড়াইতে পারছেন কোলকাতারে, কেউ অল্পই! এখন বাকি কেবল নিজের কাছে নিজের খমতার খবরটা সাফ হওয়া–আরেকটু হাঁটলেই এঁনারা নিচ থেকে উপর, সবগুলি ক্লাসের জন্যই সিনেমা বানাইতে পারবেন, তখন সব ক্লাসের কাছে স্টার বাইর হবে এদের সিনেমা থেকেই, সেইসব স্টার কোলকাতারো স্টার হবেন; বাংলাদেশ আর ওয়েস্ট বেঙ্গলের আমজনতা অতো দূরে নাই–দুই আম-ই মীনার কনজ্যুমার হইছে মীনার বুলির ভিতর দিয়া। আমরা তো আগেও দেখছি, তোজাম্মেল হক বকুলরে রিমেক করছে কোলকাতা! ‘যৌথ প্রযোজনা’ নামের টালবাহানার ভিতর দিয়া এইবার কোলকাতা কাবিয়াব হইতে পারবে না দেশি দালাল লইয়া। এই ডিরেক্টরদের কেবল মালুম হইতে হবে যে তাঁরা ইবনে মিজান, মাসুদ পারভেজ, আমজাদ হোসেন, বকুলদের কন্টিনিউশন, তাতেই তাঁরা হাঁটবেন যাঁর যতটা যেইদিকে হাঁটা দরকার!

এঁনাদের হাঁটা দরকার, কেননা, ঢালিউডে আম বাংলা এখনো খুবই দুর্বল। ২০০৭ সালের খায়রুন সুন্দরীর মতো কিছু মুভির ভিতর দিয়া আম বাংলা ধারাটা চালু আছে বটে; তবু আমাদের কইতে হয়, ঢালিউডে বামুন বাংলারই রাজত্ব। ১৯৮০-৯০ টাইমে আরেকটা ঘটনায় বামুন বাংলার জিত পোক্ত হইছিলো, মিডল ক্লাসও আরেকবার বেঈমানী করলো আমের লগে। দেশি আইউব এরশাদের লগে ফাইট করতে আমকে ডাকলাম, তাঁরা আইলোও, জিতলাম আমরা আমের ওজনে; জেতার পরে কী করলাম আমরা? বামুন বাংলা কবিতা পইড়া এরশাদের লগে আমরা ফাইট করছিলাম, এরশাদকে বেহায়া, সমকামী, চরিত্রহীন হিসাবে আঁকছিলাম আমরা। আমাদের সেই ভ্যালু জাজমেন্ট আর ‘শুদ্ধ বাংলা আবৃত্তি’ লইয়া থাপ্পড় মারলাম আমের গালে, আমের আর্টে ‘অশ্লীলতা’ বাইর করলাম, খেদাইয়া দিলাম আমাদের নয়া জিতের পাওয়ার দিয়া; তারপর নয়া বামুন সালমান শাহ্’কে হাজির কইরা আমকে কইলাম, ‘এইটাও পুরা সুস্থধারা না, বাট এতটুকু রাজি আমরা, খা এইবার!’ আমরা খেয়াল করলে বুঝবো, কেয়ামত থেকে কেয়ামত বলিউডের রিমেক হইলেও সেইটা আসলে করতাছে কোলকাতাবাীরাই! তবু আসল সুস্থধারা তানভীর মোকাম্মেল আর মোরশেদুল ইসলামে–রুচিবান একদল মুভিগোয়ার, মানে খসরুরা হিউমিলিয়েট করা শুরু করলো আমের সিনেমারে! তারেক মাসুদরেও পাই আমরা, যিনি আমের কাছে যাইতে চাইছেন মাস্টারি করতে স্রেফ, আমের এন্টারটেইনার হন নাই! এমন মাস্টারি আর সরকারি ডোনেশনের সিনেমারেই যখন একটা দেশের আলেম আর আর্ট ক্রিটিকরা সবচে বেশি পাত্তা দেবেন, তখন ঐ পাত্তা আসলে সেই দেশের সিনেমার জানাজা!

জানাজা অবশ্য বাংলাদেশের পুরা ভিজ্যুয়াল মিডিয়ারই! ১৯৯০ দশকে টিভিতে ডিশলাইন দেবার পরে ইংরাজি-হিন্দি গান, হলিউডি সিনেমা, তার আগেই ভিসিআরে বলিউডের দাপটে এই জানাজা কনফার্ম হয়; দেশের কালচারে যেমনটা খাড়াইয়া থাকলে, নিজেদের ব্রান্ড পয়দা করতে পারলে আমরা হয়তো টিকতে পারতাম! এগুলি ছাড়াও ইংরাজি মিডিয়াম মিডল ক্লাসের মঞ্জিল হইয়া ওঠায় দেশের মানুষের রুচি-চাহিদা-মনের ধারে কাছেও থাকতে পারে নাই কোলকাতার নাগর ঢাকার ভিজ্যুয়াল মিডিয়া! ইভেন কোলকাতাও তো এখন বলিউড আর ইংরাজির দাপটে দিশা হারাইছে, তাঁরাও না মরার ট্রাই করতাছে–ঢাকার রেসপেক্ট ix কেমনে ধইরা রাখবে সেই চিন্তায় ইনসমনিয়ায় ভুগতাছে! হিন্দি-ইংরাজির ভাপে কোলকাতার আমও দখলে নাই আর কোলকাতার, সে-ও কম্প্যাটিবল হবার ট্রাই করতাছে নয়া রুচির :)!

সো, কেমন আছে এখন ঢালিউড–বাংলাদেশের সিনেমা? রঠানাগর কোলকাতার দালালেরা ধরা খাইয়া আছে পিপলের সেন্টিমেন্ট বা বুলিরে ডিনাই কইরা। কিন্তু এখনো তো দেশের কালচার ইন্ডাস্ট্রির পাওয়ার তাগো হাতেই! আমরা তাই একটা গজবের টাইম পার করতেছি! দুয়েকজন ক্রিকেটার ছাড়া দেশে কোন স্টার পয়দা হইতে পারতাছে না! রাজ্জাক-ববিতা-কবরী-সোহেল রানারা একটা টাইমে দেশের সব ক্লাসেই স্টার হইতে পারছিলেন কতক, এখন কেউ নাই আর ঢালিউডে; এমন একটা দশা যে, টিভিই এখন সিনেমার চাইতে বড়ো স্টার বানাইতাছে যেন–অন্তত টিভিরা তাই ভাবে বলে টের পাই; ঢালিউড এখন মিডল ক্লাসের মশকরার বিষয় হইতেও যেন যোগ্য নাই আর! ঢালিউডের হিউজ অডিয়েন্সকে টিভির লোকেরা অ্যাবিউজ করতে পারতাছে তাই! এড়ানো তো যায় না–এই অডিয়েন্স তো টিকিট কাইটা সিনেমা দেখে, তাগো টাকা তো আর কম টাকা না কোনভাবে!

এপ্রিল-মে ২০১৬।

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
রক মনু

রক মনু

কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.