Main menu

এরশাদের প্রোপাগান্ডা মেশিনের এসথেটিক সেন্টার হইয়া ওঠা

পেশা আর জাতের খুব খাতির আছিল আগে; মেথর লোকটা পেশায় মেথর না যেন, জাতে মেথর। ইংরাজের কলোনিয়াল মডার্নিটির একটা ফায়দা আছিল– পেশা আর জাতের এই খাতির নয়া সুরতে হাজির হওয়া। নয়া সুরতের একটা নজির হইলো–জেনারেলদের রাজনীতি করাটা অপছন্দ করা; জেনারেলরা হইলেন একটা জাত যেন, রাজনীতি এই জাতের আওতার বাইরে থাকার কথা!

বিজনেসম্যান আনিসুল হক মরলেন রাজনীতি করতে করতে, তারে রাজনীতির লোক হিসাবেই দেখতেছে সিভিল সোসাইটি। পেশা আর জাতের ঐ খাতির এইখানে মনেই আসতেছে না। জাতপাতের বাইরে দেখাদেখির ঘটনা একটা। ভালো। আমরা হয়তো এতোদিনে জাতের হিসাবের বাইরে থাইকা বিচার করতে পারতেছি, সেইটা বিজনেসপার্সন বা জেনারেল যাই হৌক! ভালো।

রাজনীতি করতে করতে আনিসুল হকের মরণে এই একটাই ফায়দা পাইতেছি আমি!

গার্মেন্টস বা বিজিএমইএ লইয়া আলাপে না যাই; এই আলাপটা আছে কিছু। একটা কথাই কই এই ব্যাপারে, মজা পাই ভাইবা– হাতির ঝিল দখল কইরা এখনো খাড়াইয়া থাকা বিজিএমইএ দালানটা দেইখা যাগো গা জ্বলে, সেই লোকগুলাই আনিসুল হকের মরণে সবচে বেশি কাতর দেখতেছি!

যাই হৌক, আগাই। আনিসুল হক জেনারেল এরশাদের কারখানার মাল। বিটিভির। খেয়াল কইরেন, হকের মরণে কাতর এইসব লোক এরশাদ বা বিটিভি নামের সরকারি প্রোপাগান্ডা মেশিনটারে কিন্তু পছন্দ করে না! তবু এই ইস্যুটা তারা টানতে নারাজ জনাব হকের ব্যাপারে! আবারো কই, জনাব হক বা এরশাদ, দুইজনকেই তাগো পেশা বা জাতের হিসাবের বাইরে থাইকা বিচার করতে চাইতেছি আমরা।

জনতার ম্যান্ডেটে গদিতে বসেন নাই এরশাদ, বইবার পরেও ম্যান্ডেট পান নাই। কিন্তু শাসন করতে হইলে জনতার মাঝে এজেন্ট লাগে। কেমনে ওভারকাম করলেন এরশাদ? এইটার জবাব হিসাবে আনিসুল হকদের ভাবেন।

কলিকাতা থিকা ঢাকায় আইসা রাজ্জাকের আশা পুরা হইছে

১৯৮০-৯০ দশের মিডল ক্লাস মাইয়ারা আনিসুল হকে ভিজতেছেন, আনিসুল হক নায়ক; এই মাইয়াদের মন থিকা আনিসুল হক খেদাইয়া দিতেছেন রাজ্জাক বা ওয়াসিম বা আলমগীর বা ফারুক বা ইলিয়াস কাঞ্চনদের। বুলবুল বা জাফর ইকবাল কোনমতে মনের কোণায় থাকতে পারতেছেন! সুবর্ণা বা শম্পা রেজারা খেদাইতেছেন ববিতা-কবরী-শবনমদের। পোলারা ভেজে সুবর্ণা-শম্পায়! এরশাদের প্রোপাগান্ডা চালাইয়া বিটিভি যেই পাপ করতেছে সেইটা ধুইয়া ফেলতেছেন যেন আনিসুল-আফজাল-সুবর্ণা-আলী যাকের!

কিন্তু এই ঘটনার আসল ফজিলত হইলো, জনতার থিকা দূরের রুচির একদল লোক গজাইলো যারা সমাজে এরশাদের এজেন্ট হিসাবে একটিভ!

খেয়াল করেন, ঢালিউডের নায়ক-নায়িকারা গড়ে আমজনতার সব ক্লাসের নায়ক-নায়িকা হইতে কসরত করতেছেন (বুলবুল যদিও এই দলে ততো পড়েন না)। এডুকেটেড মিডল ক্লাস তখন বিটিভিকে সেন্টার বানাইয়া এফডিসি থিকা রামপুরার দিকে মুখ ঘুরাইয়া লইতেছে, এসথেটিক কেবলা হইয়া উঠতেছে বিটিভি! এইটা সবচে ভালো বুঝবেন ভাষায়, কোথায় কোন বাংলা খাড়া হইতেছে, দেখেন।

———————————————–

বাচ্চাদের জন্য বাংলা ছড়া-গান, নামতা ইত্যাদি নিয়া কিছু ডিজিটাল কনটেন্ট দেখতেছি মরমী-অপারের লগে; বর্ণমালা শিখাবার সিস্টেম–কালচারাল প্রোডাক্ট।

এইখানে গানে গলা দিছেন কয়েকজন, তার ভিতর শম্পা রেজা আর সুবীর নন্দীও আছেন; আমাদের কি ভালো লাগা উচিত?

প্রায় কোন ঘটনাই না–তেমনভাবেও ভাবতে পারি আমরা; বাট ঘটনা বলে মাইনা নিয়া কালচারাল পলিটিক্স কিছু বুঝতে চাওয়া যাইতে পারে বটে।

যারে বাঙালি কালচার বলে আইডেন্টিফাই করা হয় তার খুব কোরের জায়গাতেই পড়বেন এই দুইজন; একটা টাইমে হিউজ স্টারডমও এনজয় করতেন এনারা। সেই দিন আর নাই, দেশে স্টার কই আর!

বাঙালি কালচার হ্যাজ ফেইল্ড। বিটিভিতে হুমায়ুন আহমেদের নাটক শম্পা রেজাদের বিদগ্ধতা, জীবনের গভীর কোন ট্রুথের ইনভেনশন, সিরিয়াসনেস-এ বড় আঘাত করতে পারছিল; তার আগেই পপ মিউজিক শুরু হইছিলো, বাট বাংলা গানে পপ মিউজিকের দাপট তৈরি হয় ১৯৯০ দশকে। জেমস, মাইলস্, বাচ্চুর যুগ সেইটা; বাট পরে আরো বেশ কিছু ঘটনায় পপ মিউজিকও কড়া বাঙালি কালচার মনে হইতে থাকে মে বি। হুমায়ুন যেইখানে থামছিলেন সেইখান থেকে শুরু করেন ফারুকী জেনারেশন; কেউ কেউ সেলিম আল দীন আর সা. লাভলুর টিভি নাটকে সিরিয়াসনেস না পাইতে পারেন কতক, বাট সেইটা এক প্যারালাল জগত বানাইয়া তোলা, ইন্টারভেনশানের চেষ্টা নাই; বাট অবভিয়াসলি এন্টারটেইনমেন্ট আওয়ার দখল, অডিয়েন্সের টেস্ট গইড়া তুলতে থাকা, সিরিয়াসনেসরে জোকারের চেহারা বানাইয়া ফেলা! ওদিকে ফারুকীরা ঢাকার মিডল ক্লাস দেখায়, বাংলার উচ্চারণ থেকে বাক্য-ক্রিয়ারে আটার রুটির মতে বেলতে থাকে; এদের কাম আগেই সোজা বানাইয়া রাখছিলো মীনা কার্টুন, এলাকা-শ্রেণী ছাড়ানো এক বাংলা শুনাইয়া এবং বইলা। নতুন যেই কান তৈরি হইলো তাতে শম্পা রেজাদের প্রমিত/শুদ্ধ উচ্চারণ ফানি লাগা শুরু হইলো!

১৯৯০ দশকে আরো আসছে ডিশ টিভি, তার আগে থেকেই ভিসিআরের বলিউড আসছে; চ্যানেল ভি নিয়া আসছে ইংরাজি পপ–মাইকেল জ্যাকসন থেকে ম্যাডোনা, জে লো, ভেঙ্গা বয়েজ, শাকিরা, লেডি গাগা থেকে জাস্টিন বিবার আর সেলেনা গোমেজ–পপ ফ্লাড ভাসাইয়া নিয়া গেছে গা বাঙালি কালচার। হালে ইন্টারনেট, টরেন্ট, সোশ্যাল মিডিয়া ওই ফ্লাডে দিল নতুন মাত্রা–আগের অডিয়েন্স এখন কালচার প্রোডিউসারও, পাবলিকেশনে আসছে পুরাই নতুন ডাইমেনশন।

সো, বাঙালি কালচার তো রিফিউজি হইয়া গেল! শম্পা রেজা/কোর বাঙালি কালচার এখন তাই প্রমিত উচ্চারণ শিখাবার তালে আছে বাচ্চাদের; কান আর মুখ বানাবার কাজে ইনভেস্ট করতাছে নিজেদের। এখনকার যুদ্ধে হার মাইনা নিছে, নতুন সৈনিক বানাবার কাজে মন দিছে–একদম ছোট থেকে বড় কইরা তোলা, একদিন যেন এই সৈনিকেরা ফিরাইয়া আনতে পারে সেই পুরানা কান-মন-মুখ। আহা!

বাট স্যাডলি, বাচ্চারা রাইমের মিউজিক-ভিজ্যুয়াল কনজ্যুম করতে করতে শম্পা রেজাদের এনজয় করতে পারে না আর, সেই সিসিমপুর কিসের খারাপ নকল সেইটা বুইঝা ফেলে, পোকোইয়ো আর মাশা আর ডোনাল্ড ডাকের টেস্টের লগে কমপিট করার কিছু তো পয়দা করতে পারে না উচ্চারণে মন গাইড়া রাখা বাঙালি মন!

অগাস্ট ২১, ২০১৫।

———————————————-

রাজ্জাক কোলকাতা থিকা আইছিলেন ঢাকায়; বাংলাদেশ হবার পরে কিন্তু রংবাজে উনি ঢাকাইয়া হইয়া উঠলেন, রিক্সা চালাইয়া চালাইয়া গান গাইলেন বাংলাদেশের কমন বাংলায়, কমলাপুরের কুলি হইলেন। ফারুক সুজন-লাঠিয়াল হইলেন, সোহেল রানারা গুণাহগারে কমন বাংলারে আরো উঁচাইয়া ধরলেন। আম বাংলায় কত কত গান হইলো ততদিনে।

ঢালিউডে পোক্ত হইতে থাকা বাংলাদেশী আম বাংলা ডিনাই কইরা আনিসুল হকরা বিটিভির ভিতর দিয়া কোলকাতাই বাংলাটা ছড়াইতে থাকলেন। ঢালিউডের আম বাংলার বদলে দেশের এডুকেটেড মিডল ক্লাস কোলকাতাই বাংলায় খোয়াব দেখা শুরু করলো। সৈয়দ সামসুল হক কিসিমের দেশের সেরা লেখকরা ঢালিউডে আছিলেন, তারা আস্তে আস্তে সরাইয়া লইলেন নিজেদের, নিজেদের বেচতে থাকলেন এরশাদের কাছে। ১৯৭১ সালের পরে ঢালিউডের ভিতর দিয়া বাংলাদেশী আম বাংলা হইতেছিল, এই পয়লা কলোনিয়াল মিডল ক্লাসের লগে আমজনতার ব্রিজ পয়দা হইতেছিল ভাষার ভিতর দিয়া; এরশাদের বিটিভির ভিতর দিয়া, আনিসুল হকদের ভিতর দিয়া সেই ব্রিজের সম্ভাবনা মরতে থাকলো! গণতন্ত্র যখন দরকার নাই, জনতার ম্যান্ডেটের যখন তোয়াক্কা করা লাগে না, তখন ঐ ব্রিজের কি দরকার! ভালগার ছোটলোকই তো ভাবা যাইতেছে আমজনতার বুলি আর ভঙ্গিমাগুলারে, ঘেন্না করতে পারার আরামে মাতাইলো বিটিভি, কলোনিয়াল কোলকাতাই মালে সয়লাব করতে থাকলো জনাব হকেরা। ছোটলোকের ভোটও তো ভালগার! বরং এমন একটা মিডল ক্লাসই এরশাদের মতো শাসকের গদি টিকাইয়া রাখার টেকসই এজেন্ট হইতে পারে! হিম্মত থাকলে আজকের বাংলাদেশ লইয়াও ভাবতে পারেন।

খেয়াল করলে দেখবেন, ১৯৮০-৯০ দশে ঢাকায় বিদেশী কোলকাতাই কবিতাও নয়া যৌবন পাইতে থাকে। আমজনতা বোঝে না এমন সব জটিল সংস্কৃত শব্দে লিটলম্যাগ হইতে থাকে। ১৯৬০-৮০, এই কুড়ি বছরের কবিরা আমজনতার বোঝার মতো বহু কবিতা লিখছেন, ১৯৮০’র পরে সেইসব কবিতারে পাতলা কবিতা হিসাবে দেখতেছে ঢাকার কোলকাতাই কবিরা; ঘন কবিতা লিখলেন তারা, তাগো কবিতা কতটা ঘন সেইটা বুঝতে গেলে শুরুতেই নজর পড়ে তাগো ভাষায়, কলোনিয়াল কলিকাতার কারখানায় বানোয়াট, আমজনতার শব্দ আর ভাব খেদানো শব্দ আর ভাবে কবিতা লিখলেন তারা, জনতার না বোঝাই হইয়া গেল তাগো ঘনতা!

মজার ব্যাপার হইলো, এরশাদের কবিতাই সবচে বেশি বুঝলো জনতা! আনিসুল হকরা এরশাদের হইয়া দখল করলো মিডল ক্লাস মন, এরশাদ নিজে তার কবিতা আর রিলিজিয়াস লেবাস দিয়া সিডিউস করতে চাইলেন জনতারে। আর কলেজ-ভার্সিটিতে গুন্ডা বানানো তো আছেই।

আমজনতার কাছে আর্ট-কারচার বেচতে না চাইবার মতো এতো ঘেন্না দুনিয়ায় কলিকাতা ছাড়া আর আছে বইলা মনে হয় না! এমনকি পাকিস্তানের জিয়াউল হক-পারভেজ মোশাররফও এইটা পারে নাই, হয়তো পাকিস্তানের উর্দু আর শিয়ারা আর্ট-কালচারকে জনতার কাছাকাছি রাখতে পারছে!

তবু জনতা রাস্তা বানাইয়া লয়; আনিসুল হকরা মরে, শম্পা রেজারা বাচ্চাদের ছড়া গাইয়া কোলকাতাই উচ্চারণ শেখায়, আলী যাকেররা এশিয়া এনার্জির পয়সায় নাচে। কেননা, প্রাইভেট টিভি আইসা পয়সার জন্যই জনতার পকেট হাতায়, মোশারফ করিম হইয়া জনতারে এন্টারটেইন করে; অনন্ত জলিল কলিকাতা-মুম্বাই ছাড়াইয়া টম ক্রুজ হইয়া উঠতে চায়। ইউটিউবে হিরো আলোমরা আইসা কলিকাতারে খাটের তলায় রাইখা বলিউডকেও হারাইয়া দেয়।

 

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
রক মনু

রক মনু

কবি। লেখক। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য