Main menu

এডিটোরিয়াল: হুমায়ূন আহমেদ

১.
হুমায়ূন আহমেদের নভেল/নভেলাগুলারে ‘সমালোচকদের’ অপছন্দ করার একটা মেজর কারণ হইতেছে, উনার উপন্যাসগুলা’তে খেয়াল কইরা দেখবেন ‘বর্ণনা’র চাইতে ডায়লগ বেশি। আমাদের ‘সমালোচনায়’ উপন্যাসের স্ট্রেংথ হইতেছে বর্ণনায়; মানে ‘বর্ণনা-ই উপন্যাস’ না হইলেও, মেজর একটা জিনিস। তো, হুমায়ূন আহমেদে যে বর্ণনা নাই – তা না, বর্ণনা উনার স্ট্রেংথের জায়গা না; উনার স্ট্রেংথ হইতেছে, কনভারসেশন, ডায়লগ। কিন্তু এইটা তো নাটকের জিনিস! – এইটা মনেহয় ভাবতে পারি আমরা, যার ফলে ‘উপন্যাসের মানদন্ডে’ জিনিসটা বাজে হইতে পারে।…

মানে, খেয়াল কইরা দেখেন, একটা বা কিছু ‘মানদন্ড’ আছে এইখানে, বিচার করার; খালি উপন্যাস না, নাটক-সিনেমা-গান-কবিতা, অনেক জিনিস নিয়াই। সিনেমার মানদন্ড যেমন, একটা ভালো স্টোরি থাকতে হবে, একটা ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ থাকতে হবে, এইরকম; তো, এইগুলা বাজে জিনিস না, কিন্তু আর্টের এই ‘মানদন্ড’গুলাই যে আর্ট না – এইটা মনে রাখাটাও দরকার। মানে, আর্টের বিচার তো আপনি করবেন-ই; কিন্তু যেই বাটখারা দিয়া বিচার করতেছেন, শুধু সেইটা দিয়া মাপতে গেলে ঝামেলা হবে, সবসময়ই।…

/জুলাই ৩১, ২০২০

 

২.
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আর হুমায়ূন আহমেদ

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়’রে নিয়া হুমায়ূন আহমেদ একটা লেখা লিখছেন ‘যদ্যপি আমার গুরু’ নামে। লেখাটা ছাপা হইছে উনার ‘হিজিবিজি’ নামে একটা বইয়ে (অন্যপ্রকাশ, ২০১৩, পেইজ ৫৫ – ৫৯)।

মানিকের জন্মের একশ বছর হইছে, এইরকম কোন অকেশন ছিলো মনেহয়। তো, হুমায়ূন আহমেদ যেহেতু পপুলার রাইটার বইলাই ভাবতেন নিজেরে, এই জায়গাটা নিয়াই কনসার্নড হইছেন, পয়লা। কোন এক ক্রিটিক লিখছেন যে, মানিক বন্দ্যোপধ্যায় পরাবাস্তব, জাদুবাস্তব জিনিসপত্র লেখছেন; তো, হুমায়ূন আহমেদ কইতেছেন, মানিক শরৎচন্দ্রের লেখা অনেক পছন্দ করতেন, তারে নিয়া একটা লেখাও লেখছেন।

মানে, উনার ক্লেইমটা হইতেছে যে, পপুলার ভার্সেস সিরিয়াস এইরকম কোন প্রেজুডিস মানিকের ছিলো না। কিন্তু এই যে ছিলো না, এইটা বইলা হুমায়ূন এই ক্যাটাগরিটারে স্পেইসই দিছেন। যেমন, বলতেছিলেন, পরাবাস্তব, জাদুবাস্তব এইসব নিয়া সিরিয়াস অধ্যাপকরা (এই প্রফেশনটারে ধসায়া দিয়া গেছেন জীবনানন্দ দাশ) লেখবেন। পরে লেখার শেষে, এই লেখাটা লেখার লাইগা উনি যে কিছু বইপত্র পড়ছেন সেইটা মেনশন করছেন কয়েকজনরে কৃতজ্ঞতা জানায়া। 🙂

মানে, এনিমি চুজ করার ব্যাপারে সাবধান থাকা দরকার। উনারে পপুলার বইলা ক্রিটিক করা হইছে আর উনি সিরিয়াসদেরকে নিয়া একটু মশকরাই করছেন। কিন্তু এই ক্যাটাগরিটার কোন ক্রিটিক করেন নাই, উইথইন দ্য ক্যাটাগরিতেই রয়া গেছেন।

সো-কল্ড মার্কসিস্ট সাহিত্য-বিচারের জায়গা থিকাই মেবি এই সিরিয়াস ভার্সেস পপুলার জায়গা’টা তৈরি হইতে পারছে। যেইটা খুবই এলিটিস্ট একটা ভঙ্গিমা, স্নবারি’র জায়গা। তো, এইটার এগেনেস্টে অন্য কোন ক্যাটাগরি উনি সাজেস্ট করতে পারেন নাই, একসেপ্ট যে, পুপলার রাইটার’রাও রাইটার। (মানে, গরিব’রাও তো মানুষ, এইরকম!)

পারসোনাল মিথের জায়গাটাতে গিয়াও হুমায়ূন আহমেদ থতমত খাইছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোন ফ্রেন্ড ছিলো না, কাউরে উনি বই ‘উৎসর্গ’ করতে পারেন নাই… এইরকম পারসোনাল ফেইলিওরের কথাগুলি কইতে গিয়া আবার ভাবছেন, মিথ বানাইতেছেন না তো? তো, সেইটা এক ঘটনা। আরেকটা জিনিস হইলো, এক রকমের ইলিসিট প্লেজার কি পান নাই উনি? যেমন, আজকেই কইতেছিলাম, ধরেন কোন প্রোগ্রামে মেয়েদেরকে দিয়া  গেস্টদেরকে যে ফুল দেয়া হয়, এইটা তো মিনিংলেস কোন ঘটনা না! মানিক গরিব আছিলেন, এইটা একদিক দিয়া যেমন উনার পারসোনাল লাইফের মিথ হিসাবে কাজ করে, আবার মিথ হিসাবে না মানলে সোশ্যালি ‘অসহায় মুক্তিযোদ্ধা’ ক্যাটাগরিতেই ভাবতে পারার কথা, যখন ইনফরমেশন’টা আমাদের জানা আছে যে, শেষ লাইফে বস্তি’তে থাকতে হইতো উনারে। Continue reading

ক্রাইমের পানিশমেন্ট ও দস্তয়ভস্কি

ক্রাইম কি আর পানিশমেন্ট কেন? ব্যক্তির ক্রাইম করার অধিকার আছে কিনা। তাইলে পানিশমেন্টের এজাজতও কেন ক্রিমিনালের কোর্টে রাখা হয় না?

এইসব প্রশ্নগুলারে জবাব খুঁজলে একটা জায়গায় এনার্কিস্ট ছাড়া প্রায় সবাই একমত হবার কথা, সোশাল কন্টাক্ট থিওরী। যে, মানুশের বৃহত্তর কল্যাণে রাষ্ট্র বানাইছি আমরা। যেহেতু সবাই শাসক হওয়াতে লস ছাড়া লাভবিশেষ পাইতেছি না। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে মানুশরে নিয়ন্ত্রণ আর শোষণের কাজকাম নাই তা না, বাট শাসনের দরবার করলে তো শোষণ মিলবেই! তো, নিজেরারে সুখে রাখতে শাসিত হওয়াতে মত দিলাম আমরা, কিছু ব্যাপাররে ক্রাইম নাম দিয়া পানিশমেন্ট দেবার অধিকার দিলাম আমরা শাসন করার এক কিসিমের অথরিটিরে। রুশদেশের দস্তয়ভস্কি যাতে ঠ্যাং দিয়া নিজের নভেলের কাহিনী বানায়, ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট। যদিও কাহিনীটা সবটুকু না, তবুও কইলাম আরকি! কথার কথা, ক্যারেক্টারের পিছেই নিজের সব পর্যবেক্ষণ ঢালছেন উনি, বা কায়দা কইরা বলা যাইতে পারে পুরানা সমাজে ফিকশনাল এক্সপেরিমেন্ট কইরা নয়া রিয়ালিটির আমদানি..!

রাসকলিনভের নজরে যদি পুরা ক্রাইম দেখি তাইলে পানিশমেন্টে স্বস্তি পাওয়া যায়। কিন্তু পিটার্সবার্গের মহাজনের দিক দিয়া তাকাইলে জাস্টিস কতটুকু কায়েম হইলো? একজন হৃদয়বিদারক মহিলা, সোসাইটি’ই হয়তো তারে ওইরকম বানাইছে, নিজের লাভ নিজে ভালো বুঝতেন বইলা দস্তয়ভস্কির হিরো তারে লাঠি দিয়া মাইরা ফেললেন..! সাক্ষী হবার অপরাধে খুন করলেন ‘অমানবিক’ মহাজনের বোনরে..! অথচ অথরিটি তেনারে সাজা দিলেন কি, সাইবেরিয়ায় সশ্রম কারাদণ্ড! বহু প্রমাণ হাতে রাইখাও ক্রিমিনালের স্বীকারোক্তির অজুহাতে, চোখা নজরে দেখলে দেখবেন, দস্তয়ভস্কি ক্যাপিটাল পানিশমেন্টরে উতরাইয়া যাইতে চাইতেছেন..! মজার ব্যাপার হইলো, পাঠকের তাতে ঝামেলা হইতেছে না, মব সেখানে জাস্টিস হিসাবে জেলান্তর হইয়া সশ্রম কারাদণ্ডে সন্তুষ্টই আছেন। ক্রিশ্চিয়ানিটির দোহাই দিয়া দস্তয়ভস্কি এইখানে রাইটারের এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেন, মৃত্যুদণ্ড থেইকা পাঠকের দৃষ্টি সরায়া নিলেন।

পরার্থপরতা ও গ্রেটার গুডের যে য়ুরোসেন্ট্রিক সমসাময়িক ডমিন্যান্ট ফিলোসফি, দস্তয়ভস্কির ড্রামার হাত তারেও ডীল করলো ক্রিমিনাল সাইকোলজি দিয়া। জর্ডান পিটারসন যেমন ক’ন, তলস্টয় পড়বা সোশিয়লজিস্ট হিসাবে, আর দস্তয়ভস্কিতে সাইকোলজি ঠাসা। রাসকলিনভ ওই বুড়ি প’নব্রোকাররে হত্যা করে কিন্তু উপযোগবাদিতার দোহাই দিয়া, যে, ওই টেকাটুকা তো উনার লোভ ছাড়া কোন কাজে লাগতেছে না, সো, আমি যদি ওইগুলার মালিক হই ঠিকমতো পড়া শেষ কইরা দেশের সেবা করা যাবে, প্রেমিকার আর বেশ্যালয়ে যাবার দরকার র’বে না, বুড়ির বইনরেও মানবিক লাইফ লীড করানো যাবে..। “For one life, thousands of lives saved from decay and corruption.” তো, দস্তয়ভস্কি আমরারে দেখান, দশজনরে বাঁচায়া একজনরে মারাটাও ক্যামনে অনৈতিক। যেইটারে পরে আমরা ‘প্যারেটো এফিসিয়েন্স’ টার্মে চিনবো আমরা, খোদ ওয়েস্টার্ন ফিলোসফিতেই! অবশ্য ব্যাপারটারে সোসাইটি থেইকা এলাইনেশন হবার একটা কারণ হিসাবেও দেখা যাইতে পারে, যে, গ্রেটার গুডের ডিসিশন নিতে আপনেরে তো অথরিটি হতে হয়, না?, এবং সেই ‘সুপারম্যান’গিরিতে প্রোটাগনিস্টের কপালে সেই পুরানা, গ্রিকযুগের, প্রাইড’ই ভর করে। যেই প্রাইড সর্বনাশ করে ট্রাজিক হিরোর। কিন্তু দস্তয়ভস্কি এইখানে নয়া কিছুর সাজেশান দিতেছেন, প্রাইডে মরা লাগতেছে না নায়কের, যীশুর দরবারে ধর্না দিলেই হইতেছে..! মানে, ক্রিশ্চিয়ানিটির দাওয়াত দিতেছেন দস্তয়ভস্কি, যেন মানুশের ক্রুয়েলিটিরে কাউন্টার দেবার মতোন দুনিয়ায় জিনিস আছে ওই একটাই..। সোনিয়া হলেন রাসকলিনভের মেরী ম্যাগডিলেন, যে নয়া যীশুর পুরানা ট্রান্সফরমেশনের সাক্ষী হইতে চলতেছেন। যেই রূপান্তরের ভিত্তি হইলো, সবকিছুই ক্ষমার যোগ্য।” যেইটা ইসলামেরও গোড়ার কথা, যে, বহু সাহাবীর ‘পাহাড়ের,থেইকা বড়ো অপরাধ ও পাপ’ এর থেইকা নিষ্কৃতি মিলতেছিল।

বহুত সিনেমা হইছে এইটারে বেইজ কইরা। ছাড়া ছাড়া কাহিনীর এক ফিল্ম দেখলাম ১৯৩৫ সালের। যেইখানে ডিরেক্টর দস্তয়ভস্কির হইয়া ‘রিমান্ড’প্রথার ক্রিটিক করতেছেন। যে, ডান্ডা কি আসলেই জানে ক্রিমিনাল কে..! পরে, ক্রিমিনালের স্বীকারোক্তি মিললেও তা যে মাইরের চোটে, এবং তা দিয়া অথরিটির জালেমি দেখান তিনি। Continue reading

বায়েজিদ বোস্তামী

হযরত শায়েখ ফরিদুদ্দীন আত্তার ১২’শ ২১ সালে মোঙ্গলদের হাতে নিহত হন। নিশাপুরে হামলার পর মোঙ্গলরা আরও অনেকের সাথে উনারেও কয়েদ করে নিয়া যাইতেছিল। পথে এক লোক তাদের বললো, এই আল্লার ওলিরে এই কবিরে মুক্ত কইরা দাও, তোমাদের জন্য এক হাজার দিনারের বন্দোবস্ত করতেছি।

কিন্তু আত্তার তাতারদের বললেন, এই দাম আমার উপযুক্ত না। এই কথায় তারা ভাবলো, হয়তো উনার দাম আরও বেশি। তো পায়ে শিকল দিয়া আত্তাররে নিয়া তারা আগায়তে থাকলো। কিছু সময় পর এক গরিব লোক আইসা মিনতি জানাইলো, উনারে তোমরা ছাইড়া দাও। বিনিময়ে আমি তোমাদের ওই যে খড়ের পালাটা দেখতেছ, পুরাটাই দিয়া দিবো। তার এই কথায় আত্তার তাতারদের বললেন, আমার দাম আসলে এর চাইতেও কম। তোমরা বিবেচনা কর কী করবা।

তখন হাজার আশরাফি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ক্ষোভে এক তাতার আত্তারের গলায় তলোয়ার চালায় দেয়। আর আত্তার মারা যান, এমন অবস্থায় যে, নিজের জীবনের জন্য তুচ্ছ দামটাও উনি নির্ধারণ করতে পারেন নাই।

তো এই আত্তার যখন কিছু লেখেন বা বলেন, শুধু উনি বেটার লেখক বইলাই যে তা উমদা হয়া উঠে, ব্যাপারটা অমন না। উনার বড় সামান হইলো রুহানিয়্যাত।

ভাষা পরবর্তনশীল হইলেও মানুষের আত্মার পুরান চাওয়া প্রায় একই। তাই হাজার বছর পরও উনি তর্জমা হন। একটা ভাষা থিকা আরেকটা ভাষায় আত্তার কই কই কতদূর মানুষের মনে চইলা যান।
আমি উনার মশহুর কিতাব ‘তাজকিরাতুল আউলিয়া’র দুইটা অংশ – হযরত বায়েজিদ বোস্তামী আর রাবেয়া বসরীর জীবনীটুকু তরজমা করছি। রাবেয়া বসরীর ভূমিকায় তরজমার প্রাসঙ্গিকতা নিয়া দরকারি আলাপ করা হইছে। তাই এইখানে শুধু হযরত বায়েজিদ বিষয়ে সামান্য বলতেছি।

হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (১৩১-২৬১ হিজরী/৭৪৮-৮৭৪ ঈসায়ী) হইলেন সুফিদের সুফি। পুরা নাম আবু ইয়াজিদ তাইফুর ইবনে ঈসা ইবনে আদম সরুশান বোস্তামী। উপাধি সুলতানুল আরেফিন। হযরত বায়েজিদের জন্ম-মৃত্যু সাল নিয়া এখতেলাফ বা মতভেদ আছে। এছাড়া উনার জিন্দেগি নিয়া ধারাবাহিক কোনো বর্ণনা নাই। টুকরা টুকরা অংশ, যা সমসাময়িক এবং পরবর্তী সুফি ও কবিদের লেখায় আসছে, বেশিরভাগই উনার শাগরেদ আর ভক্তদের বয়ান। ফলে ইতিহাসের কোনো ভাঙা বা মসৃণ কাচ দিয়া এইগুলা বিবেচনার না। এইগুলা হইলো অনুভবের ব্যাপার।

হযরত বায়েজিদ বড় ঘরের সন্তান আছিলেন। উনার দাদা বিশাল কুমিস প্রদেশের গর্ভনর আর বড় দৌলতমন্দ ছিলেন। কিন্তু বায়েজিদের জন্ম হইছিল বোস্তামের সুফি মহল্লায়, তার বুজুর্গ বাপ তাইফুরের ঘরে। উনার মা-বা দুইজনেই ছিলেন খোদার দেওয়ানা। আলমে আরওয়াহ থিকা নিয়া আসা তাদের সন্তানও তাগো মতোন হইলো আর দুনিয়ার আবেগী হিস্ট্রিগুলার মধ্যে শীর্ষ হয়া থাকলো।

বাংলাদেশের চট্টগ্রামে হযরত বায়েজিদ বোস্তামীর (রহ.) নামে যেই দরগাহ বা মাজার আছে, এইরকম পৃথিবীর আরও অনেক দেশেই আছে। ভক্ত-আশেকানরা নানা সময়ে হযরতের নামে এই খানকাগুলা করছেন। তবে উনার আসল মাজারটা ইরানের বোস্তামে। বায়েজিদের কবরের মর্মর পাথরে হযরত আলীর (রাযি.) কবিতা লেইখা দিছেন কেউ। এইটা খুবই মিলছে। উনাদের দুইজনের ব্যক্তিত্ব আর বলাগুলার উৎস তো একই।

তাজকিরাতুল আউলিয়ার বাংলা অনুবাদ যা হইছে এ পর্যন্ত, ভালো তো না-ই, বরং আত্তারের লেখারে মাইরা ফেলছেন অনুবাদকরা। মূল থিকা তরজমা না হওয়ায় ওইসব অনুবাদ ভাসা ভাসা পানার মতোই কিছু লাগে যেন। তাই যখন ইমরুল ভাই তাজকিরাতুল আউলিয়ার দারুণ একটা ফার্সি এডিশন, যা কিনা ১৯০৫ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি বিভাগের অধ্যাপক রেইনল্ড এ. নিকলসনের সম্পাদনায় লন্ডন থিকা বের হইছে, জোগাড় কইরা দিলেন, কাজটায় হাত দিলাম আমি।

তো উনারে শুকরিয়া জানায়া খতম করলাম। আর শুকরিয়া, বইটা প্রকাশে যারা মন দিয়া মেহনত করছেন – সাদ্দু ভাই আর যুবা ভাই, উনাদেরও।

হাসসান আতিক
মগবাজার, ঢাকা

 

……………………………………………………….

ফরিদ উদ্দীন আত্তারের
বায়েজিদ বোস্তামী
কিছু জিব্বা তো এমন, কান যার ভাষা জানে না
……………………………………………………….
খোদার খলিফা, আরেফদের সম্রাট, সৃষ্টির দলিল, রহস্য আর হাকিকতের চাবিওলায়া, সীমাহীন হিম্মতওয়ালা, প্রেম আর আবেগের দরিয়া, আলা-দরজার মুহাদ্দেস, মুজাহাদায় বিলীন – হযরত বায়েজিদ বোস্তামী; যার হাতে মারেফত আর তরিকতের রাস্তা নতুন কইরা বিস্তারিত হইছে।
হযরত জোনায়েদ বাগদাদী বলেন, ফেরেশতাদের মধ্যে যেমন জিব্রাইল, সুফিদের মধ্যে তেমন বায়েজিদ। তাওহিদের মাকামে সকল বুজুর্গদের শেষটা হইলো বায়েজিদের শুরু।

হযরত বায়েজিদ বলেন, মারেফতের বাগানে বছরের পর বছর থাকার পরেই কেউ একটা ফুল ফুটাইতে পারে। কিন্তু কোনোভাবে আমার তা মিলা গেছে বাচ্চা বয়সেই। শায়েখ আবু সাঈদ বলেন, আমি পুরা দুনিয়ারে বায়েজিদের সিফাতের নিচে রাইখাও উনার শুরু-শেষ পাই নাই।

বায়েজিদের দাদা ছিলেন আগুনপুজারী। আর বাপ ছিলেন পারস্যের বড় বুজুর্গ। উনার মা বলেন, বায়েজিদ যখন পেটে ছিল, আমি কোনো সন্দেহযুক্ত খাবার খাইতে পারতাম না। মানে ওই খাবার কীভাবে কার কাছ থেকে আসছে, কোন দেরহামে তা খরিদ করা হইছে, এইসব না জাইনা যা-ই খাইতাম, হজম করতে পারতাম না। অসহ্য এক ব্যথা আর অস্থিরতা কাজ করতো। আমি মুখে আঙুল দিয়া ওই খাবার বের কইরা ফেলতে বাধ্য হইতাম। আমার বায়েজিদ পেটে থাকতেই খোদার ওলি ছিল।

বায়েজিদ বলেন, মারেফত-তরিকতের রাস্তায় সবচেয়ে বড় সামানটা মানুষ পায় জন্মগতভাবেই। এরপর হাসিল করা লাগে আন্ধা চোখ আর জাগনা কান। যদি এই তিনটা জিনিস একসাথে না পাওয়া যায়, তাইলে হুট কইরা একদিন মইরা যাওয়াই বেটার। Continue reading

ইব্রাকর ঝিল্লী’র কবিতা

কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

প্রথম দিন চোখে মাছ হলো,
দ্বিতীয় দিন হৃদয়ে গাছ হলো,
তৃতীয় দিন হাতে পাখি;

অতঃপর তিনি জন্ম নিলেন,
তাদের কথা শুনতে যারা
হ্রদের ধারে বসে নতুবা
একা একা কথা বলতেন।

০৬/০৯/’১৯

 

বাইস্কোপ

শুক্কুরবার সকালবেলা চিনতেও পারেন আমারে; ওইসময় আমি খোলাসা হই।

তার আগেরদিন রাত্রেও বিলের ধারে মজা পানিত খইসা পড়া ডুমুর ফলের ভিতর ডুকরায় ডুকরায় কান্দি। কিন্তু শুক্কুরবার শেষ রাত্রে, ভোর হইতে চাইলে ভোরের হ্যান্ডেল ধইরা ঝুইলা পড়ি আমি। আকাশ যখন ফরসা হইছে সবে, তখন বোটানিকাল গার্ডেনের সামনে বাম-পা আগে দিয়া দৌড়ের উপরে নামি।

কিন্তু বোটানিকাল তখনও খুলে নাই; যখন আমি খোলাসা হই তখনও বোটানিকাল ওপেন হয়নাই।

০৯/১১/’১৯

 

পল্লবগ্রাহিতা

একেলা হেঁটে হেঁটে মন পড়িবো কেমনে চোখ!
যদি দুয়ারই না থাকে তবে ,
ঘুমেরই ভেতরে দোর খুলিবো কেমনে?

সকলের মধ্যিখানে কেমনে বুঝাইয়া তুলিবো যে মরিয়া গিয়াছি রাতে, মরে গেলে!
যদি ঘুম না আসে তবে বুঝিবো কেমনে-
মরিয়া গেলে ঘুমের ভেতরে?

যদি মরে গেলে বুঝিতে না পারি,
যদি জেগে জেগে বুঝিতে না পারি,
মরে গেলে কী হবে ভেবে!

ঘুমের ভেতরে মরে গেলে বুঝিবো কেমনে!
রোদের ভেতরে ভেসে ভেসে রাতের কথা আমি বুঝিবো কেমনে!
পাখি, উড়িবো কেমনে?
ছাই, পুড়িবো কেমনে যদি, ঘুমের ভেতরে
মরে যাই বুঝিবো কেমনে?

১৯/০৫/’১৯

Continue reading

ফারনান্দো পেসোয়া’র কবিতা

ফারনান্দো পেসোয়ারে বলা হয় ‘দ্যা ম্যান হু নেভার ওয়াজ’। কারণ তিনি একটা গতানুগতিক লাইফ বলতে যা বোঝানো হয় অইটারে তার লিটারেরি প্রজেক্টের জন্য স্যাক্রিফাইস করছিলেন। তিনি প্রায় ৭৫টা অল্টার ইগো নিয়া লেইখা গেছেন আর নামগুলারে তিনি ‘ছদ্মনাম’ বইলা ডাকতে চান নাই। কারণ ‘ছদ্মনাম’ ডাকলে অই ‘ব্যক্তি’গোর স্বাধীন ইন্টেলেকচুয়াল সত্তারে অস্বীকার করা হয়। তিনি এগুলারে ডাকতেন ‘হেটেরোনিম’। আবার তার ‘পেসোয়া’ নামের অর্থও আসলে পারসন। তো এমনে তিনি তার হেটেরোনিম আর স্বনামরে পুরা একাকার কইরা ফেলান। এমনকি জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও। ছোটবেলা থেকাই তিনি চুপচাপ একলা টাইপের ছিলেন। কোন সোশ্যাল গ্রুপে ছিলেন না। কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়ালেখা করেন নাই। তিনি টানা তিরিশ বছর লিসবনে ভাড়া করা রুমে থাইকা থাইকা লেখালেখি করেন। অট্টুকই উপার্জন করেন যা তার লিখতে লাগে। আর তার লেখায় পুরা দুনিয়াটা ঘুইরা বেড়ান। ‘আ লিটল লার্জার দ্যান দ্যা এনটায়ার ইউনিভার্স’ বইটা তার নিজের নাম ও তার তিন প্রাইমারি অল্টার ইগো আলবার্তো কায়্যিরো, আলভারো দ্যা ক্যাম্পস, রিকার্দো হেইস এর নামে লেখা মেজর কবিতাগুলার সংকলন। পেসোয়া একাধারে কবি, অনুবাদক, সমালোচক, প্রকাশক, দার্শনিক ছিলেন। অনুবাদের ক্ষেত্রে কবিতার মূল বক্তব্য আর ভার্বাল রিদম ধইরা রাখারে তিনি গুরুত্ব দিছেন। চব্বিশ-পঁচিশের দিকে তিনি কিছু স্পিরিচুয়াল প্র‍্যাক্টিস করতে গিয়া নানারকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন এবং মানুষরে তিনি এগুলা সম্পর্কে লেইখা জানান ওইসময়। তিনি এমনও বলছেন যে তার চেহারা চারটা আলাদা আলাদা চেহারায় পরিণত হইতেছে আর আয়নায় তিনি তা দেখতে পাইতেছেন। থিওসোফিস্ট বইপত্র অনুবাদ করতে গিয়া তার স্পিরিচুয়ালিটির চর্চা ব্যাপক হয়। যদিও তিনি নিজেরে পরবর্তীতে নিওপ্যাগান আখ্যায়িত করেন।

পেসোয়া তার একটা ইন্টারভিউতে কইছেন,”আমি ম্যাটারিয়ালিস্ট বা ডেইয়িস্ট বা অন্য কিছুই না। আমি এমন একজন মানুষ যে একদিন জানালা খুলছিলো আর এই গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটা আবিষ্কার করছিলো যে ‘নেচার আছে’। আমি দেখছিলাম গাছ, নদী আর পাথরগুলা সত্যিই আছে৷ আমার আগে কেউ এইটা ভাবে নাই।

আমি দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা কবি ছাড়া অন্য কিছু হওয়ার ভান করিনা। আমি এমন একটা আবিষ্কার করছি যার পাশে অন্য সব আবিষ্কার বাচ্চাদের খেলা। আমি মহাবিশ্বরে নোটিস করছি। গ্রীকরা তাদের সব ভিজুয়াল তীক্ষ্ণতা নিয়াও এতখানি করেনাই।”

সঠিক বেঠিকের হিসাব বাদ দিয়া ফারনান্দো পেসোয়ার ব্যাপারে আমার যে জিনিসটা খুব ইন্টারেস্টিং লাগে তা হইলো- মোটামুটিভাবে একটা ‘আইডেন্টিটি’তে থাকার যে কম্ফোর্টটা পায় মানুষ সোশ্যালি বা পারসোনালি, লেখার জন্য অইটারেই বিসর্জন দিছিলেন তিনি। পেসোয়া তার লাইফের কোশ্চেনগুলারে ভিন্ন ভিন্ন ক্যারেক্টার দিয়া ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গিমায় ডীল করছেন। বলা যায় তার লিটারেরি আইডিয়াগুলার সাথে তার ব্যক্তিজীবন যেমনে মিইশ্যা রইছে অইটা ভালোই রেয়ার। তার লেখায় এই ব্যাপারটা আছে যে কোনকিছুরেই কিছু ভাবা যাবে না, যা তাই। যা যেমন তারে তেমনভাবেই দেখতে হবে, অর্থ আরোপ করা যাবেনা। কোনকিছুরে কজালিটির মধ্যে, ফরমুলার মধ্যে ঢুকানো হইলো তারে রিডিউস করা। তার লাইফেও তিনি নিজের পুরা ব্যক্তিত্বরেই এমন খণ্ডবিখণ্ড কইরা রিয়েলিটিতে ক্রিয়েট কইরা রাইখা গেছেন যে, মনে হয় এইটা বেশ অশান্তিদায়ক হয়ার কথা বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে৷

তার লেখকসত্তার যাপনটা ভালোই প্যাশনেট আর সাহসী কারণ তিনি সব ধরণের এনার্জি নিয়া লিখছেন। এক চিঠিতে তিনি বলতেছেন,”আমি এই তিনজনের নামে কেমনে লেখি? কায়্যিরোর নামে আমি লেখি যখন অপ্রত্যাশিতভাবে পুরাদস্তুর ইন্সপিরেশন আসে, আমি জানিওনা বা সন্দেহও করিনা যে আমি লিখবো। একটা এবস্ট্রাকট মেডিটেশনের পর রিকার্দো হেইস কবিতার মধ্যে কনক্রিট শেইপ দেয় অই ধ্যানটারে। ক্যাম্পস- যখন আমি লেখার প্রচণ্ড ইম্পালস অনুভব করি কিন্তু জানিনা কি লিখতে হবে।”

প্লুরালিস্ট ছিলেন পেসোয়া। কোন মতাদর্শেই সাবস্ক্রাইব করার ব্যাপারটা উনি উনার লেখায় যেমনে এড়াইতে বলছেন ওই ভাসানটা উনি নিজেরেও ভাসায় রাখছেন বইলা মনে হয়। খালি উনার কবিতাগুলা পড়তে পড়তে মনে হয়, ‘নেচার’রে ‘নেচার’-এর মত দেখতে উনার যে জোর প্রদানটা, এমন স্ট্যাটিক না তো কিছু, ডায়নামিকই। ‘নেচার’, ‘স্বাভাবিক’ বইলা আমরা যা কিছুরে ডাকি তারমধ্যেও জিনিসপত্র যুক্ত হওয়ার বা অন্য আরেকটা রূপ পাওয়ার ব্যাপার আছে। অই ব্যাপারটারে তো ‘আনন্যাচারাল’ বলা যায় না। তো উনার কবিতাগুলা কনসিকুয়েন্সগুলারে বা ‘থাকা’গুলারে তাকায় তাকায় দেখা নিয়া একটা পোয়েসি ক্রিয়েট করে। যেমন একটা কবিতায় উনি বলতেছেন, “সবাই বলে দুনিয়া এমন না হইয়া ওমন হইলে ভালো হইতো। আমি বলি যে তাইলে তো দুনিয়াটা ওই ওমনই (বা আরেকটা ‘এমন’) হইতো।” কিন্তু পারটিসিপেট না করার ব্যাপারটা আসলে অই কনসিকুয়েন্স দেখাটারেও রিডিউস করার কথা। একটা ক্রিয়েট করা ‘পিস’ই দিতে পারে, বাট আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইমোশন বা এক্সপেরিয়েন্স সবকিছুরে ‘ভুল’ভাবে বা ‘রিডিউসিং’ভাবে ব্যাখ্যা করার বা চিন্তা করার মাঝ দিয়া আসে মনে হয়; যা পেসোয়া বার বার মানা কইরা গেছেন তার কবিতায়। তবে একটা পোয়েটিক দেখা, দেইখা যাওয়া, থাইমা গিয়া আসলেও কিছুরে দেখা বা একটা নির্মোহতার ভাব তার কবিতাগুলা ইনজেক্ট করতে পারে।

এই কবিতাগুলার মধ্যে প্রথম সাতটা উনার ‘আ লিটল লার্জার দ্যান দ্যা এনটায়ার ইউনিভার্স’ সংকলনের প্রথম বই ‘দ্যা কীপার অফ শীপ’ এর কিছু মেজর মনে হওয়া কবিতা। আর শেষ কবিতাটা ‘দ্যা শীপার্ড ইন লাভ’-এর।

 

মাসিয়াত জাহিন
………………………………………………………….

The Keeper of Sheep

১.

যদি আমি পুরা দুনিয়াটার মধ্যে দাঁত ডুবাইতে পারতাম
আর আসলেই স্বাদ গ্রহণ করতে পারতাম
আমি এক মুহূর্তের জন্য বেশি সুখী হইতাম।

কিন্তু আমি সবসময় সুখী হইতে চাইনা।
মাঝেমাঝে অসুখী হওয়া খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।
সব দিন তো আর ঝলমল করে না
আর বৃষ্টি যখন দুর্লভ,
আমরা তার জন্য প্রার্থনা করি।

তাই আনন্দের সাথে বেদনা
এত স্বাভাবিক আমার কাছে
যেমন পাহাড় আর সমতল।
পাথর আর ঘাস।

দরকার হইলো শুধু শান্ত আর সহজ হওয়া
সুখ আর অসুখের মধ্যে।
এমনে অনুভব করা যেন অনুভব করা হইলো দেখা।
এমনে চিন্তা করা যেন চিন্তা করা হইলো হাঁটা।
আর যখন মৃত্যু আসে তখন মনে রাখা যে :
প্রতিটা দিন এমনেই হারায় যায়।
আর সূর্যাস্ত খুব সুন্দর।
আর সুন্দর যেই রাতটা বাকি থাইকা যায়।

এইটা এমনি আর আমি এইটা এমনেই চাই।

 

২.

সাজসজ্জাওলা বাগানের বেচারি ফুলগুলি!
ওদের দেখলে মনে হয় ওরা পুলিশরে ডরায়।
কিন্তু তাও এরা এত সত্য যে,
প্রথম মানবের প্রথম দৃষ্টিতে ধরা পড়ার সময়
যেমন ছিলঃ আদি, বন্য
এখনো অইভাবে অই রঙেই তারা ফোটে।

অই মানুষটা এত আচ্ছন্ন ছিল ওদের দেইখা!
আর অনেক সাবধানে ছুঁইছিলো
ধীরে-

যাতে আংগুল দিয়াও ফুলগুলা দেখতে পারে।

Continue reading

  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য