Main menu

মুস্তফা আনোয়ারের কবিতা

[pullquote][AWD_comments][/pullquote] বাংলা-কবিতাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জীবনানন্দ দাশ যে কাছাকাছি রকমের ঘটনা সেইটা মুস্তফা আনোয়ারের কবিতার প্রেজেন্সটারে মনে রাখলে মোর ক্লিয়ারলি ভিজিবল হইতে পারে। রবীন্দ্রনাথে মানুষ-ই প্রকৃতি, এই মানুষ অবশ্যই পুরুষ, নারীও আছেন লগে; আর জীবনানন্দেরও কনসার্ন এই মানুষের না-পারাটাতে, কারণ মানুষ-ই উনার সেন্টার; মুস্তফা আনোয়ারের কাছে এই সেন্টার’টা অস্পষ্ট অনেক। সেন্টার এবং পেরিফেরি’র জায়গাটাতেই অনেক বেশি কনসার্ন।

কবিতাগুলা নেয়া হইছে দুইহাজার দশ সালে ঐতিহ্য’র ছাপানো ‘মুস্তফা আনোয়ার রচনাসমগ্র’ বই থিকা। উনাদের স্টকে বইটা নাই। রিপ্রিন্টও করেন না আর। বইটা আমাদেরকে দিছিলেন হাসান জাফরুল। এমনিতে কবিতাগুলার স্বত্ব উনার মে নিশবাত আনোয়ার আর তাঁর আত্মীয়দের; উনার সাথে যোগাযোগ করতে পারি নাই আমরা, আশা করি যেহেতু আর্কাইভাল পারসপাসেই আমরা আপলোড করতেছি কবিতাগুলা, উনাদের আপত্তি থাকবে না, এই প্রচার নিয়া। যদি কখনো কোন আপত্তি পাই, আমরা পোস্টটা সরায়ে ফেলতে রাজি আছি।

————————————————–

 

বিদায়

আলকাৎরার রাতে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকব কবে, এমনি-দিনে,
বৃষ্টিতে, আ! সে ঘর-কাতর সিঁড়িপথ, অজগর লম্বা।
রাতের ময়লা গাছের ছায়া দিয়ে তৈরি করব গাদ্‌। কথা
দিচ্ছি, এক-দাগে ভুলে ভুলে যাবে চিরকাল, এক খাটে
শোওয়ার বোকামী, পাপ।
এতোদিন রসায়ন লেখাপড়া শিখলাম খামাখা, চল্লাম,
বিদায়। এখন কি করব আমি অভিশপ্ত পাপী আত্মা দিয়ে?
তুচ্ছ ছলাৎ ছলাৎ শব্দটাকে টিক-টিক করে কাটব, কাটা –
মাথার লকেট পরিয়ে দেব তোমার লিকলিকে সাপের ফণাতোলা
গলার মালায়। কাটামাথা নিয়ে তোমার জানলায় উঁকি
দেব রোজ চাঁদনি রাতে, চিনতে পারবে তো? হা-ভুলে
যাবে, ভুলে যাচ্ছো, ভুলে গেছ তুমি অনন্তকালের জন্য।
হা-হা, পৃথিবীর মাগীদের ভালোবাসাতে কী এতই মধুর
গাঢ়তা ছিল।

 

ভালো সে বাসে যদি

ভালো সে বাসে যদি –
বালতি কৈ বালির?
এ জোয়ান মন্দ লাশ
লুকোবো কী করে।

ভালোবাসা জানলো না সে
বলে কারে?
কানের ভিতর ঢেলা –
মাথায় ঘাম ওঠে।

ভালোবাসা সবাই চায় –
স্যাঁৎসেঁতে ঘর ও খড়।

 

মৃত্যু

(ফজল মওলার এপিটাফ)

কুছু চাঁদনির দিন, তুঁত পিবে
গরমা-গরম চোলাই
খাবে – নিশাদল গুঁড়া–
আপনি কেমন আছেন
ছোট-সাব?

তুঁত খাবে হামি
একটু – কুছু তামা দিন;
আমরা আনন্দ করিবে, আল্লা
ভালা করিবে, আপনার।

টাটকা তুঁত খাবে একমগ
নিশাদল পিতে পিতে
মারা যাব
একদিন হামি এইখানে;

এক-গিলাস পিলা ডিয়ার,
হামারা পিয়ারা
ছোট-সাবজি;
একমগ তুঁত পিয়ে
মারা যাবে –
ইল্লাল্লা ফজল মওলা।

 

বইয়ের কাভার

বইয়ের কাভার

বুড়োহাবড়া তুঁত

তুঁতের তলায় থাকি,
আমার নাম মুস্তফা –
আমার চেহারাটা বড় বিশ্রী
গোলগাল কেমন যেন চ্যাপ্টা আলুর মতো
চোখ দুটো ইঁদুরের মতে কুৎকুতে, ছোট্ট ছোট্ট, লাল;
চেহারাটা মে-মে,
শুধু একটা শুকনো ডালের মতো শিশ্ন ঝুলে আছে,
আমার চুলগুলো ইঁদুরের ল্যাজের মতে নোংরা –
আমি তুঁত গাছের তলায় থাকি,
আমার নাম আনোয়ার,
অন্তরঙ্গরা ডাকে আনু –
আর এই আনু নামটার ওপরেই আমার যত ঘেন্না;
আয়নার সামনে দাঁড়ালেই নিজেকে ঘেন্নাা হয়;
কি করি – উপায় নেই;
কিছুতেই নিজের চেহারা ভালোবাসতে পারি না,
একটুও প্রেম হয় না।
আমার পূর্বপুরুষেরা হয়তো মেথর ছিল, ডোম ছিল;
আমার রক্তের মধ্যে মেথর মেথর গন্ধ রয়ে গেছে।
আমার ভীষণ ইচ্ছে করে মেথর পট্টিতে মদের দোকান দিই –
তুঁতের পাতা পিষে পিষে কষ বার করে
মদের সাথে মিশিয়ে দিই;
তাতে করে তেতো ও ঝাঁঝ দুটোই পাবে আমার খদ্দেরবৃন্দ;
ওদেরকে ঠকিয়ে বেশ দু-পয়সা বানাতে পারবো,
একটা ক্যামোফ্লেজ করতে পারবো
এটাই আমার লোভের একটা গুপ্ত সুড়ঙ্গপথ।
সুড়ঙ্গের ওপারে তুঁত গাছের পাতায় পাতায় গুটিপোকা ধরেছে,
হ্যাঁ, আমি এখানেই একটা মদের দোকান খুলবো
আর ডাকবো দুই রফিককে,
আয়, খেয়ে যা – একটু মদ খেয়ে যা, চেটে যা।
এই তুঁত গাছের তলায় আমি একটা মদের দোকান দেবো,
এই গাছের পাতার মতো আমার অনেক টাকা হবে,
আমি অনেক টাকা পাবো, আমি বড়লোক হবো;
টাকা হলেই আমি বড়লোক হবো, অভিজাত হবো –
শুধু আমার গদ্য-পদ্যর ব্যবসা জমে উঠলেই হয়।
আশা করছি তুঁত আমাকে বড়লোক করবে, সভ্য করবে;
আমার গায়ে যে মেথরের গন্ধ লেগে আছে, তা ঢেকে দেবে,
মানুষকে ঠকাতে এই তুঁত পাতা আমাকে সাহায্য করবে,
আমি আশা করি – আশা করি আমার মদের দোকান চলবে
যদি ঠিক মতো তুঁতের পাতা রসের জোগান দেয়
ঠিক মতো গাঢ়ো কষ ও গাদ বের করে দেয়,
তবে আমাকে আর পায় কে?
হে আল্লা, আমার মেথর পট্টির মদের দোকান জমে উঠুক।
শুধু তুমি যদি একটু সহায় হও
শুধু তুমি তোমার চাঁদ ও সুরুযকে বলে দাও
তোমার বৃষ্টিকে বলে দাও, তোমার কুয়াশাকে বলে দাও,
তোমার শিশিরকে বলে দাও, ওরা যেন আমার তুঁত গাছের পাতাগুলো
কষে কষে মোটা করে দেয়, দিনে দিনে।
আমার চেহারার ক্যামোফ্লেজ তো চাই একটি –
হে তুঁত আমাকে বাঁচাও,
আমাকে একটু মাস্তানি করতে দাও।
আমার এই ঘৃণ্যতম আলু আলু চোহারাকে
থেঁৎলে থেঁৎলে পাতা কর।

কিন্তু একি – হায় আর−একি করলে
হ্যাঙওভার ভাঙতে না ভাঙতেই
চোখ খুলতে না খুলতেই,
আমার সব তুঁতপাতা ঝরে গেছে;
আর আমি মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছি;
আমার ধুলো, আমার মাটি, আমার পাতা।
মেথর পাট্টিতে দোকান করার লোভ কেন হয়েছিল
বলতে পারো?
হে পাতাঝরা বুড়ো তুঁত গাছ
বলতে পারো?
বুড়োহাবড়া তুঁত গাছ বলতে পারো?
তোমার উত্তর শুধু ভেঙে পড়া শুকনো ডাল –
হা, বুড়োহাবড়া তুঁত।

 

আফিম

কোথায় যাচ্ছি? মৃত্যুর কাছে? না কবিতার কাছে –
প্রেমের কাছে যাওয়ার জন্যে মন হা-হা করে। তোমরা
কি কেউ প্রেমের একটা রঙিন গেট তৈরি করবে না। আসলে
প্রেমের বদলে মৃত্যুর গেট তৈরি;
মৃত্যুর বদলে পদ্যের দরজার হুড়কো খোলা;
মহাকাশ থেকে রোগ উড়ে আসছে, আমাদের মাথা কামড়ে
ধরেছে। আ, জঙ্গলের মশালের আলকাতরার তেল কতই না
ভালো ছিল। বল্লম দিয়ে হৃদয় খোঁড়া যেতো।

আমরা, বিশেষত আমি এক নোংরা লোক। পাতাল থেকে
উত্থিত হওয়ার দুঃখ হাস্যকর ভেবে কোথায় যেনো ঘুপটি মেরে
বসে থাকি। দুঃখ এই যে নিরুদ্দেশযাত্রা আর হলো না
এ-জীবনে।

পদ্যের সেই কালো আফিমের গাছটার অনেক ডালপালাশিকড়
বেড়ে উঠেছে। ঐ গাছের ছায়ায় শরীরের সব রক্ত বিষ হয়ে
যায়। চোখের ময়লায় বারুদ জমে। প্রত্যেক দিন পরীক্ষামূলক
ভাবে আণবিক বিস্ফোরণ ঘটে পাঁজরহীন বুকে।

আমরা নেগেটিভ আছি নেগেটিভ থাকবো।
আমাদের সঙ্গী রোগ জরা মৃত্যু
আমাদের দেশ গাছের ছায়া
আমাদের হৃদয় আফিমের নীল-ধোঁয়া
আমাদের ভালোবাসা পোকার মিলন
আমাদের স্মৃতিগুলো শয়তানের খুলির ভিতরে থাকে।

আমি তাই একটা অতিসবুজ সরীসৃপ ধরার জন্যে মানুষের
জঙ্গলে লুকিয়ে থাকি। জিভে কোবরার ফণা খাওয়ার
লোভ ছাড়তে পারি না। যেহেতু এক দিব্য-সন্ধে চাই।
আমার জিভ মাটির তলায় পচে গেছে; পদ্য আওড়ে এই
পচা জিভকে আরো নোংরা ক’রে লাভ কি। কিন্তু
আফিমের রস অভিশাপ ডেকে আনে, রক্ত খায়, আফিমখোরের
দুঃখ একমাত্র আফিমখোরেই জানে। অভিশপ্তনগরীর মানে
নগরীর পামরে লোকেরা জানে।

সত্যি বলছি আমি আর কবিতা বলবো না
আমি আর পদ্য-পদ্য খেলবো না
আমি আর ঐ নোংরা কালো গাছের তলায় যাবো না।
নিজেকে ধুয়ে নেব ঘৃণায়

মমতার হাতে ভ্রূণ কুড়িয়ে আনবো রাস্তা থেকে
চাঁদে কলঙ্ক বলেই তোমার মুখে কলঙ্কের জল-ছাপ মারবো,

কিন্তু চাঁদ কাছে টানে; আর রোগের সূত্র ঐখানেই
ঐখানেই মরুভূমির বাগান উঠে আসে
কাঁটা-অলা ক্যাকটাস হামাগুড়ি দেয়;
কখন আবার বৃষ্টি নামবে আবার দৌড়াবো কালো ফল চিবোতে।
স্বপ্নের মধ্যে শক্রসেনারা এসে কালো-চারা পুঁতে যায়;
হৃদয়ের জল দিতে হয় শিকড়ে, ছাল মোটা হয় দিনেদিনে
হৃৎপিন্ড চুপসে যায় দস্তার মোমবাতির মতো, চাবুকের মতো
হাত লাফায়, রাতের কুকুরের দীর্ঘ কান্নার মতো আমরা গান
গাই, শো-ব্যবসা করি।

আমরা কি ভূগোলের এদিকের লোক একজোড়া
ঘুম পাবো না কোনোদিন। কোনোদিন কি পাবো না যাযাবর
পাখির ঐক্য; অদৃশ্য কম্পাস। পাবো না জানতে কি ক’রে
ডাকাতি করতে হয় মেঘ থেকে শিল্পের বিদ্যুৎ। পেটে
পাথর পড়লে তাই সারা-রাত ল্যাজ সোজা করি।
আমরা সব-কিছু কানা-চোখে দেখি, কানের পর্দা নেই;
আঙুলে গুনে মাপি ভালোবাসার কথা, আমাদের মাথায় রক্ত
পড়ে পদ্যের ভোঁতা চাকুতে। কবে আর ভূমিকম্প
শুনবো; সময়ের সুসময় চলে যায়।
কবে হৃদয় এক শিশি আকর হবে
গুঁড়ো অশ্রু হবো আমি
তোমার ঠোঁটের সূর্যাস্ত হবো
কবে আমার হাড়গোড় পুড়িয়ে উপহার দেবো।

হে ভালো লোকেরা, কবে তোমাদের বিষ্ঠাকে হজম ক’রে
এই সুন্দর পৃথিবীর সার হ’তে পারবো। বড়ো-বড়ো লোকদের
পাথরের ভাস্কর্যের গলা কেটে ফেলতে পারবো। আমরা
তোমাদের আগাছায় পাইথনের মতো সিঁদ কাটবো,
গিলে ফেলবো সভ্যতার সংকট। তোমাদের মনোহরি দোকান
লুঠ করবো।

এখন শুধু ছটফট করছি, আমাদের ঘা-এর চার পাশে ধ্রুপদী
কালো-ডানা আমাদের ঘিরে থাকে। তাই আজ পদ্যের
জ্যোৎস্নার কান্নার মাঠ হা-হা করে। কাক উড়ে এসে
বসে কালো আফিমের ডালে, ভোঁতা গলায় চেঁচায়, কী বলে,
কেউ জানে না।

রক্ত জানে না
মাংস জানে না
নিশ্বাস জানে না
ঠান্ডা অস্তিত্ব জানে না
ব্যাধি জানে না, জরা জানে না, মৃত্যু জানে না।

আমরা শেষ পর্যন্ত বৃষ্টির জ্যোৎস্নার জন্যে
ভূমিকম্প ও জলোচ্ছ্বাসের জন্যে
রোগের জন্যে, নরকের জন্যে, একটা কালো আফিমের
গাছের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকবো কবর পর্যন্ত।

এখন আত্মহত্যার কলাকৌশল জেনে ফেলেছি
স্ত্রীর কাজলে বিষ মাখিয়ে দিতে শিখেছি
এখন আমরা গ্যাস-চেম্বারে বসবাস করতে শিখে ফেলেছি
আমরা এখন ম্যাজিক দেখিয়ে শূন্য থেকে শকুন ও প্যাঁচা ধরি।
আমি আফিমখোর, তাই ডাইনীর করোটির সুড়ঙ্গ পথে
যাওয়া-আসা করি। কুয়াশার কাপড় পরে একা যাই
যেমন ক’রে গাছের ফসিল যায় অন্ধকারে আগুন হ’তে।
বধ্যভূমিতে করোটি প’ড়ে থাকে; বিগোনভিলার ডাল পেঁচিয়ে
থাকে দড়িতে; কেউ মমতার মোম মাখিয়ে দেয় না;
মানুষ নয়, বিছেরা আমাদের ঘুরে-ঘুরে নাচ দেখায়
আমি তাই আমার খারাপ জিভের তলায় পুষে রেখেছি
দুঃখজনক একটা শেষ নিশ্বাস, শেষ বিস্ফোরণ, বহুদিনের
পুরোনো মায়াভরা একটা কালো আফিমের গাছ; ছাল
শিকড়, রস, ঢেলা; এ-কী নরক আমি।

তোমরা না বলেছিলে এ-শহরকে গাছহীন ক’রে একটা মস্ত
স্কাইস্ক্র্যাপার, পাথর বানাবে। কথা ছিলো এ-দিকে শুধু গলা-
পচা-লাশ প’ড়ে থাকবে; কিন্তু সবাই আনলো হাজার-হাজার
অবাস্তব কুঠার

মানুষকে মারার জন্যে যতো অস্ত্র তৈরি হয়েছে
তার চেয়েও বেশি অস্ত্র মজুদ আছে মানুষের বুকে, মৃত্যুর
বিরুদ্ধে। কিন্তু সবার হাতেই রয়েছে একখানা অদৃশ্য কুঠার;
কারো হাতে লোহার কুঠার ছিলো না।

আমার আফিমের গাছ; কালো আফিমের গাছ;
দিন-দিন আরো বড় হচ্ছে, নতুন পাতা আসছে, ফল পাকাচ্ছে;
তবে কি তাই হবে? এই বিষবৃক্ষ কি অমর হ’য়ে যাবে;
ছাল স্ফীত হ’তে-হ’তে আমাদের চামড়া খাবে;
তবে কি তাই হবে।

শুধু কালো আফিমের গাছ থাকবে
আর একা আমি শুয়ে থাকবো ঐ গাছের তলায়।

 

মে-মানুষ ও পুরুষমানুষের যুদ্ধ

আমি এক ধর্ষিতা।
আমাকে ধর্ষণ করে গেছে ফুলের পাপড়ি,
গাছের পাতা, শিকড়ের কাঁটা।
যুদ্ধ হলেই নাকি মে-দের ধর্ষণ করার রেওয়াজ প্রাগৈতিহাসিক
যুগে-যুগে হয়ে এসেছে।

যুদ্ধ হলেই মে-দের ধর্ষণ করা হয়, এটাই নিয়ম।
তখন আমাদের বীরপুরুষদের
শিশ্ন কুঁচকে যায়
বাহুতে হাড় বেরিয়ে আসে
চোখে সূর্যাস্তের ধুলোভরা আগুন জ্বলে ওঠে।

হি-হি-হি হাসি পায়;
অথচ যুদ্ধ জয়ের পরেই এসে
তুমি আমাকে ধর্ষণ করবে;
প্রতিরাত, প্রতিরাত, প্রতিরাত;
যেমন যুদ্ধের আগে করতে।

ধর্ষণ-ই মে-মানুষদের নিয়তি।
আমার জন্যে, আমাদের জন্যে,
তোমার যুদ্ধ করার দরকার নেই।
তুমি এবার নিজের জন্যে যুদ্ধ করো।

আমাকে পুর-পরিখার বাইরে পড়ে থাকতে দাও।
তুমি আমাকে ধর্ষণ করে, তুমি তোমার কঠিন পথে চলে যাও।
আমি এখানেই পড়ে থাকবো;
অন্য আর একজন এসে ফিরে না যায়।
তুমি যেনো আবার ভুল করে আমার মাথার কাছে
বসে যেও না।
হে প্রেমিক, তুমি আমার জন্যে ভাবনা করো না।
আমি তো তোমার ছ’ফুট মাটি;
আমি সব কিছু খেয়ে ফেলতে পারি;
আমি মাটি; মাটি।
তুমি কী, তুমি কী;
তুমি কি জানো হে প্রেমিক, তুমি কী।
আমি জানলেও কোনোদিন বলবো না, বিদায়।

আমি ধর্ষণের কোনো প্রতিবাদ করিনি
কারণ চেঁচিয়ে উঠলেই টুটুল জেগে যাবে
শম্পা ভয়ে কঁকিয়ে উঠবে।
আমি কোনো প্রতিবাদ করি না,
ধর্ষণের প্রতিবাদ হয় না।

তবে, তবে কি সত্যি-সত্যি চলে যাচ্ছো হে বীরপুরুষ;
হে যোদ্ধা; হে আমার প্রেমিক যাও,
যাও, আবার যুদ্ধ করতে যাও।
আমি আমার বুককে তোমার মুক্ত আত্মার
কবর বানিয়ে রাখবো।

যাও, যুদ্ধ ও মে-লোক ধর্ষণের জন্যে এগিয়ে যাও।
আমি জানি তোমার সমস্ত আশীর্বাদ মিথ্যে ভন্ডামি।
আর আমি তোমাকে কীই-বা অভিশাপ দেবো।
আমার সমস্ত অভিশাপ যে ঝরা পাতার মতো আমারি মাটিতে
পড়ে যায়। আমার সমস্ত অভিশাপ – যে মৃত্যুর মতো সত্যি।
আমি তোমাকে কি অভিশাপ দেবো।

হে আমার যোদ্ধা প্রেমিক যুদ্ধে যাও।
আমাকে ভুলে যাও।

তবে যাওয়ার আগে শুনে যাও;
আমি তোমার পাঁজরের কাছেই আছি।
তোমার পাশেই আছি। থাকবো।
আর তুমি আমার ভেতরেই থাকবে।
আমি তোমার দুঃখ, সংগ্রাম ও জয়ের পাশেই আছি।
থাকবো। যেহেতু আমাদের যুদ্ধ চলছেই। আর আমিই
তোমার কাঁচা-কবর। আমার হাতে বটি ও দা।

 

ঘোড়ারোগ

সকলেই ঘোড়া নয়, কেউ কেউ ঘোড়া
উহাদের চেনা যায়
ঘোড়ারোগ হলে, অতঃপর
নিস্ফলা গাছ পাথরে মাথা খোঁটে তাহারা।

কবিতা, নাটক, জার্নাল প্রভৃতি
বাতিকের বাতি
ঘুম হয় না রাতে, অথচ সকালে উঠেই
মূর্খ ছাগলের ভেংচি চোখে আনে কালি
ঘোড়ারোগ বেড়ে যায় দ্বিগুণ বিগুণ –
প্রাকৃত ইতরপাঠক ভাবে,
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহাদের।

 

জীবন পগারপার

শেষ কথা নেই কোনোরে
কোনোদিনও হাতে-হাতে নেই মিলরে
তুই পাততাড়ি দিলিরে
দুপা তুলে পথ কুকুর রে

ধায় রেলগাড়ি ঝমাঝম রে
মখমল দিন যায় হুড়মুড় করে
রেখে দে পুঁটুলি বেঁধে চরিত্র রে
দিল পাড়ি প্রাণগাড়ি রে
কী সুন্দর স্যাঁতস্যাঁতে হিস-হিস পুরাতন ঢাকারে

এইবার তুই যারে চলে একেবারে পগারপার।

শুধু একটা চুমুক রে
জীবন এ-কী হুলুস্থূল রে।

 

চাঁদের ভিতরে চাঁদ

গলি তস্য গলি পেরিয়ে
পাৎলা মলমূত্র পেরিয়ে
মুক্তবাজার শহর যেতে হয়

ওই হোথায়, আমাদের আস্তানায়
পাঁজরের পাথরে পাথর ঠুকে
বাঁশবনের মাথায় জ্যোৎস্নার কুপি, ওঠে সারারাত।

রাত নামে পাটে
মদ খেয়ে নে।

পেলি এক মরা দেহ –
তা, মন্দ কি গুবরে কপাল সিংহের ছা।

হো, হিম্মৎঅলা –
আজ একটা মহৎ কবিতা লেখা হবে,
মুড়ির ঠোঙার জন্য।

রঙিন রঙিন ঠোঙা ভাসে
দূরে মেঘে মেঘে।

প্রার্থনা করো মাটির জন্য।
প্রার্থনা করো দেহের জন্য।
প্রার্থনা করো মৃত্যুর জন্য।
প্রার্থনা করো নিঃসঙ্গতার জন্য।

নাজমা আনোয়ারের সাথে।

মুস্তফা আনোয়ার উনার ওয়াইফ নাজমা আনোয়ারের সাথে।

The following two tabs change content below.

মুস্তফা আনোয়ার

জন্ম অক্টোবর ১০, ১৯৪০, পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলায়। কলকাতার হেয়ার স্কুলে পড়াশোনা করছেন ক্লাশ টেন পর্যন্ত। ১৯৫৩/৫৪ তে মাইগ্রেট করেন বাংলাদেশে, যশোরে। পড়াশোনা করছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ এবং জগন্নাথ কলেজে, বাংলায়। ১৯৬৮’তে রেডিও পাকিস্তানে জয়েন করেন। ১৯৭১-এ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সদস্য ছিলেন। প্রথম বিয়া করেন ১৯৭০-এর দিকে; একবছর পরে বিয়া করেন অভিনেত্রী নাজমা আনোয়ারকে, চার সন্তানসহ। মারা গেছেন এপ্রিল ৬, ২০০৬-এ। ছাপা হওয়া বই: ক্ষুর (গল্প, ১৯৭৯), পরবাসে বসবাস (কাব্য নাটক, ১৯৮০), কোনো ডাকঘর নেই (কাব্য নাটক, ১৯৮১), তুঁত (কবিতা, ১৯৮৩), ভিন্নচোখে (প্রবন্ধ ও অনুবাদ, ১৯৮৫), রসাতল ও মরিয়ম (কবিতা, ১৯৯৭), মুস্তফা আনোয়ার রচনা সমগ্র (২০১০)।

Latest posts by মুস্তফা আনোয়ার (see all)

  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য