Main menu

স্লটারহাউজ-ফাইভ: বুক রিভিউ? আই গ্যেস…

স্লটারহাউজ-ফাইভ, যদি তকমা দিতেই হয়, একটা যুদ্ধবিরোধী বই। কার্ট ভনেগাট নিজে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ড্রেসডেনে ছিলেন। ড্রেসডেন, যেই শহরে ইংল্যান্ড-আমেরিকা কর্তৃক তিনদিন ধরে ৩৯০০ টন বোমা ফেলা হয়। কার্ট ভনেগাট তখন একটা আন্ডারগ্রাউন্ড কসাইখানায় আশ্রয় নেন। বের হয়ে এসে দেখেন ১৭০০ একর জমি নাই হয়ে গেসে।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছু বছর পর ভাবলেন এই নিয়া তিনি একটা বই লিখবেন। কিন্তু কী লেখা যায়? কেমন শব্দ তার দেখা বীভৎসতার প্রতি সুবিচার করতে পারে? গেলেন এক পুরনো বন্ধুর কাছে, যে তার সাথে যুদ্ধে ছিল। যুদ্ধ নিয়া বই লিখবেন শুনে বন্ধুর বউ তার প্রতি পুরাপুরি শীতল আচরণ শুরু করলেন। কারণ তিনি জানেন এইসব লেখকেরা যুদ্ধের কথা কত রসায়ে রসায়ে লেখে, বীরত্ব আর দেশপ্রেমের মোড়কে। কিন্তু যুদ্ধ নিয়া বই লেখার কিছু নাই। যুদ্ধ হচ্ছে যেইখানে ছোট ছোট বাচ্চাদের পাঠানো হয় খুন হওয়ার জন্য। ভনেগাট সেই মহিলারে কথা দিয়াসছিলেন, তিনি যুদ্ধ নিয়া রোম্যান্টিক কোনো বই লিখবেন না। আর বইটার বিকল্প নাম রাখলেন, Children’s Crusade.
আরেক বন্ধুর সাথে আলাপ করায় তিনি বললেন, “যুদ্ধবিরোধী বই যারা লিখতে চায় তাদের আমি কী বলি জানো? তারচেয়ে বরং তোমরা তুষারস্রোতের বিরুদ্ধে একটা বই লেখো।” অর্থাৎ স্রোত কখনো থামবে না, যুদ্ধও না। কী লাভ?

তবু একটা বই লিখলেন ভনেগাট। বইয়ের প্রথম চ্যাপ্টারেই উপরের এইসব কথা লেখেন উনি। যেকোনো বইয়ের প্রথম লাইন গোটা বইয়ের পূর্বাভাস দিয়ে দেয়। এই বইয়ের প্রথম লাইন, “All of this happened, more or less. The war parts, anyway, are pretty much true.” প্রথম লাইনেই উনি ফিকশন আর রিয়ালিটির বর্ডারে এসে দাঁড়াইলেন। ফিকশন থেকে আমরা চাই একটা নিরাপদ দূরত্বে থেকে ক্যাথার্সিস গেইন করতে। কিন্তু এই বই উনি আমাদের নিখাদ ফিকশন হিসেবে এঞ্জয় করতে দিবেন না, আবার নিতান্ত তথ্যনির্ভকর ডকুমেন্টারিও না। এইটা তাইলে কী? সম্ভবত ভনেগাট নিজেও জানেনা।

উপন্যাস শুরু হয় দ্বিতীয় চ্যাপ্টারে: “Billy Pilgrim has come unstuck in time.” বিলি পিলগ্রিম সময়ের বাঁধন হতে খুলে গেসেন, এবং পুরা বইতে বিলি পিলগ্রিম এক সময়কাল হতে আরেক সময়কালে পড়ে যেতে থাকবেন। কখনো বারো বছর বয়সে বাবা-মায়ের সাথে প্রথমবার গ্র‍্যান্ড ক্যানিয়ন দেখতে যাওয়ার সময় হতে ড্রেসডেনে যুদ্ধবন্দী হিসেবে কসাইখানার পথে শুয়ারের মত জীবনে, কিংবা নিজের মৃত্যু হতে ট্রাল্ফামাডোরের চিড়িয়াখানায় বাস করার সময়।

ট্রাল্ফামাডোর হচ্ছে পৃথিবী হতে ৪৪৬,১২০,০০০,০০০,০০০,০০০ মাইল দূরের একটা গ্রহ। সেই গ্রহের অধিবাসীরা বিলি পিলগ্রিমকে তুলে নিয়ে যায় নিজেদের গ্রহে। “আমাকেই কেন?”, জিজ্ঞেস করলো বিলি পিলগ্রিম; “কেন কোনোকিছুই?”, উত্তর দিলো ট্রাল্ফামাডোরিয়ান। “কেন”র মত ফালতু প্রশ্ন নিয়া তারা ভাবে না। ট্রাল্ফামোডোদিয়ানরা চতুর্মাত্রিক প্রাণী, তারা সকল মুহূর্ত একসাথে ঘটতে দেখে। তারা একইসাথে দেখতে পায় আকাশের প্রতিটা নক্ষত্র কোথায় ছিল, কোথায় আছে এবং কোথায় যাচ্ছে। তাই রাত্রির আকাশ তাদের কাছে অনেকগুলা নক্ষত্রের বিশাল ন্যুডলসের মত দেখায়। আর তারা যেহেতু সকল সময় একইসাথে দেখতে পায়, তাই যাকিছু ঘটবে তার সবটাই তারা আগে থেকে জানে, এমনকি মহাবিশ্বের ধ্বংসও। কিন্তু তারা এইসব ঠেকাইতে কিছুই করে না। কারণ যা কিছু হওয়ার তা এমনিই ঘটে-ঘটসে-ঘটবে, চিরকাল, বারবার। তাইলে কি কারো স্বাধীন ইচ্ছা নাই? ট্রাল্ফামোডোরিয়ানরা জানায়, তারা মহাবিশ্বের ১১০টা গ্রহের প্রাণীদের সাথে যোগাযোগ করসে, একমাত্র পৃথিবীর একটা প্রজাতির মধ্যেই “স্বাধীন ইচ্ছা” নামক হাস্যকর জিনিসের ধারণা আছে। তাদেরও নিজস্ব সাহিত্য আছে।

ট্রাল্ফামাডোরিয়ান সাহিত্য হইলো এরকম: ছোট ছোট অনেকগুলা আর্জেন্ট ম্যাসেজ, যা একসাথে পড়া হইলে (যেহেতু ট্রালফামোডোরিয়ানরা সবকিছু একসাথে ঘটতে দেখতে পায়) জীবন সম্পর্কে একটা গভীর, সুন্দর গল্প বলে। ছোট ছোট এবং অত্যন্ত আর্জেন্ট প্যারাগ্রাফে বিভক্ত ভনেগাটের এই বইটাও একটা ট্রালফামোডোরিয়ান সাহিত্য, খালি আমাদের চোখ যদি ট্রাল্ফামাডোরিয়ান হইতো…

বইটাতে একটা জিনিস আমার চোখে পড়সে। তা হইলো নিৎশের প্রতি এ্যাল্যুশন। বইয়ের একদম সেন্ট্রাল ধারণা, যে মহাবিশ্বের প্রতিটা মুহূর্ত সম্পূর্ণ একইভাবে বারবার ঘটে, এইটা সোজাসুজি নিৎশের এটার্নাল রেকারেন্সের (বিস্তারিত কমেন্টে) ধারণার অনুরূপ। আবার বিলি পিলগ্রিমরে পুরা বইতে কেবল একবার কাঁদতে দেখা যায়, দুইটা ঘোড়ার চোখেমুখে রক্ত দেখে। বলে রাখা ভালো, তার আগে পিলগ্রিম গোটা একটা শহরের ধ্বংস দেখসেন, নিজের অসংখ্য বন্ধুর লাশ কবর দিসেন। সম্পূর্ণ নির্বিকার। কিন্তু তিনি কাঁদলেন একটা ঘোড়ার মুখে রক্ত দেখে। নিৎশের সেই বিখ্যাত তিউরিন হর্সের (কমেন্টে) কথা মনে পড়ে না?

কিন্তু, যা বলসি, স্লটারহাউজ-ফাইভ একটা যুদ্ধের বই। কিন্তু তা ওইরকম মনে হবে না। মানে, যুদ্ধ আছে, তার ভয়াবহতার বর্ণনাও আছে। কিন্তু সেই বর্ণনায় ন্যারেটরের কোনো আবেগঘন সংযুক্তি নাই। যুদ্ধ এইখানে আর সব ঘটনার মতনই একটা ঘটনা। বিলি পিলগ্রিমের অনেকগুলা টাইমলাইন ভ্রমণের মধ্যে স্রেফ আরেকটা টাইমলাইন। একজনের পর একজন মানুষ মরে, আর ভনেগাট প্রচণ্ড পাষাণ নির্লিপ্ততায় শুধু বলেন, “So it goes.”

আসলে, গোটা বইটা সম্ভবত বিলি পিলগ্রিমের ট্রমা, কিংবা, ফর দ্যাট ম্যাটার, কার্ট ভনেগাটেরই ট্রমা। ট্রালফামোডোরিয়ান এলিয়েন, একেক টাইমলাইনে ভ্রমণ, এর সবটাই বিলির যুদ্ধপরবর্তী ট্রমার রেস্পন্স। পৃথিবীর, পরিপার্শ্বের, মানুষের সেন্স মেক করার জন্য সে নিজের মধ্যে একটা ওয়ার্ল্ড ক্রিয়েট করে নেয়। বোঝা যায়, কিলগোর ট্রাউট নামে এক সাইন্স ফিকশন রাইটারের বই হতেই তিনি এই ওয়ার্ল্ড ক্রিয়েটের রসদ পান। যুদ্ধের পর তার ট্রমাটিক মেমরি এতই মূর্ত হয়ে ওঠে যে তিনি বর্তমান থেকে ডিস্কানেক্টেড হয়ে পড়েন। মনে হয় যেন টাইম ট্র‍্যাভেল। আবার ড্রেসডেন! আবার কসাইখানা! যাকিছু বাস্তবে ঘটে, তারই একটা মেটাফোরিক প্যারালেল ইমেজ তার মাথায় ঘটে। যেমন, যুদ্ধবন্দী হিসেবে ড্রেসডেনে তারে একটা বগীতে বন্দি করে নিয়ে রাখা হয় কসাইখানায়। তারই প্যারালেলে ট্রালফামোডোরিয়ানরা তারে ইউএফওতে বন্দি করে নিয়ে রাখে একটা চিড়িয়াখানায়। কসাইখানা, যেইখানে প্রাণীদের আনা হয় খুন করতে, এবং চিড়িয়াখানা, যেইখানে প্রাণীদের রাখা হয় বাঁচায়ে রাখতে। অর্থাৎ বাস্তবতা, যা তারে জবাই করে, আর তার নিজস্ব ফ্যান্টাসি, যা আঁকড়ায়ে সে বেঁচে আছে।

এবং যুদ্ধ হইতে ফেরার পর পিলগ্রিম পুরাপুরি চুপ হয়ে যান। একদম চুপ! যুদ্ধের বিরুদ্ধে কিছু বলেন না, পক্ষে কিছু বলেন না। উনি যে ড্রেসডেনে ছিলেন তাই কাউরে বলেন না। ভনেগাটেরও অনেকদিন এমন অবস্থা ছিল। সে বই লেখার সময় কী বলবে কিছুই বুঝতে পারে না। সেই মহিলা ঠিকই বলসিলো: যুদ্ধের ব্যাপারে বলার কিছুই নাই।

ভনেগাটের বইটা শেষ হয় এইভাবে: ড্রেসডেনে একনাগাড়ে তিনদিন বম্বিং শেষ হইলে পর আন্ডারগ্রাউন্ড কসাইখানা থেকে বের হয়ে ধ্বংসের উপর দিয়ে হাঁটতে থাকে বিলি পিলগ্রিম। একটা গাছের ডাল হতে তখন তুমুল নীরবতার বিপরীতে একটা পাখি তার দিকে ডাকে: “পুটুইট!”
একটা বীভৎস যুদ্ধের পর আর মহৎ কিছুই বলার থাকে না। ওইযে ভনেগাটের বন্ধু বলসিলেন, বলে কোনো লাভও নাই। প্রায় তিরিশ হাজার মানুষের মৃত্যুর পর, ১৭০০ একর ধরে যাকিছু দাহ্য তার সবকিছু পুড়ে যাইতে দেখার পর, নিজের বন্ধুর লাশের চর্বি হইতে বানানো মোমের আলোয় রাত পার করার পর তা নিয়া যাই বলা হবে তা নিরর্থক। তবু কিছু বলতে হয়, নীরবতা ভাঙার জন্য হইলেও। ভনেগাটের এই বই মূলত একটা গোটা নগরীর ধ্বংসাবশেষের উপর বসে একটা পাখির নিরর্থক “পুটুইট” ডাক।

………

সংযুক্তিঃ স্লটারহাউজ-ফাইভের মত এতগুলা লেয়ারওয়ালা বই রিসেন্টলি পড়ি নাই। তো এইটায় অনেকগুলা এ্যাস্পেক্টই আছে। আমি যেই এ্যাস্পেক্টে এইখানে দেখতে চাইতেসি, সেইটা হইলো এইঃ যখন আপনার চারিপাশের অবস্থা এতটাই বিচ্ছিরি, এতটাই হোপলেস যে তা নিয়া কিছু বলাই অর্থহীন মনে হয়, তখনও আপনার কিছু বলতে হবে। যখন আপনার চারপাশের সবাই আপনারে চুপ করাইতে চাবে, বলবে কী লাভ এইসব দুর্নীতি, অনাচার, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বলে? এগুলা তো কখনোই থামবে না। আর হয়তো তারা ঠিকই বলবে। কিন্তু আপনি যেন তখনও কথা বলেন। সফল হবে কিনা, কার্যকর হবে কিনা এইসব না ভেবেই যেন আমরা প্রতিবাদ করতে পারি, এইটাই আমি নিতে চাই স্লটারহাউজ-ফাইভ বইটা হতে।

The following two tabs change content below.

মাহীন হক

হাই স্কুলের ছাত্র। মিরপুরে বসবাস। লেখালেখি নিয়া আগ্রহী। টুকটাক অনুবাদ করেন।
[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য