Main menu

কাজী নজরুল ইসলামের কয়েকটা কবিতা

‘ছন্দ’ কাজী নজরুল ইসলামের কবিতারে কিশোর বানায়া ফেলছে। অথবা উনার কিশোর-মন (মানে ধইরাই নিতেছি মন বইলা একটাকিছু আছে বা থাকতে পারে শরীরের ভিতরে) ছন্দের শরীরে যে কমর্ফোটটা পাইছে সেইটা ছাড়তে আর রাজি হইতে পারে নাই, কোনসময়েই। এইটা কনটেম্পরারি থাকতে চাওয়ার একটা ফ্যাসাদই মেবি। কনটেম্পরারি হইতে চাওয়ার সুবিধাও আছে আবার, কবিতা তখন সেলিব্রেশনের একটা ব্যাপার – মোহামেডান জিতছে একটা কবিতা লিইখা ফেলি, সত্যেন্দ্রনাথ মরছে, কবিতাই লিখি; খিদা লাগছে কবিতা লিখি, চেত উঠছে কবিতাই লিখি… এইভাবে একটা টোটাটিলির ভিতর কবিতা নিয়া অ্যাক্ট করা যায়, করছেনও উনি।

তবে মাঝে-মধ্যে উনি উদাসও হইছেন, পলাইতে চাইছেন। উর্দু-হিন্দি ওয়ার্ড (এইগুলা তো ঠিক ‘বাংলা’ না!) দিয়াই বাংলা-কবিতা লিইখা ফেলছেন, আরবী-ছন্দ, বাউল-ভাটিয়ালি সুর ট্রাই করছেন, মটরশুটি-অড়হর-অথি-বাবলাফুল হাবিজাবি জিনিস দেইখা হারিকুরি মার্কা কাম করছেন। ভাষার এই ইনশার্সনগুলি সিগনিফেন্ট। এইগুলির সাইড এফেক্ট হিসাবে একটা ‘বেদনা’ টাইপ জিনিস থাইকা গেছে উনার অনেক কবিতাতে, যেইটা অনেকসময় রিভোল্ট হিসাবে না আসতে পারলে টিজ হিসাবেও আসছে। কিন্তু উনার যে বেদনা-রিভোল্ট-টিজিং সেইটা খালি মেন্টাল প্রব্লেমই না, সবগুলারই যে একটা সোশ্যাল বা পারসোনাল কজ আছে সেইটাই মেইন। এই ‘কজ’-এর জায়গা থিকাই আসলে বাংলা-কবিতাতে জীবনানন্দ দাশ ইর্মাজ করার একটা স্পেইস তৈরি হইছে।

তো, ইসলামি জাতীয়তাবাদ ছাড়াও, এই আইডেন্টিফিকেশনের নমুনা হিসাবে উনার কয়েকটা কবিতা পড়া যাইতে পারে।


ই. হা.

————————————

পথহারা ।। চৈতী হাওয়া ।। অ-কেজোর গান ।। শরাবন তহুরা ।। বাতায়ন-পাশে গবাক-তরুর সারি ।। তুমি মোরে ভুলিয়াছ ।। কুহেলিকা ।। কর্থ্যভাষা ।। আঁধারে ।। শেষ বাণী ।।

————————————

পথহারা

বেলা-শেষে উদাস পথিক ভাবে
সে যেন কোন্ অনেক দূরে যাবে –
উদাস পথিক ভাবে।

“ঘরে এসো” সন্ধ্যা সবায় ডাকে,
“নয় তোরে নয়” বলে একা তাকে;
পথের পথিক পথেই ব’সে থাকে,
জানে না সে কে তাহারে চাবে।
উদাস পথিক ভাবে।

বনের ছায়া গভীর ভালোবেসে
আঁধার মাখায় দিগবধূদের কেশে,
ডাকতে বুঝি শ্যামল মেঘের দেশে
শৈলমূলে শৈলবালা নাবে –
উদাস পথিক ভাবে।

বাতি আনে রাতি আনার প্রীতি,
বধূর বুকে গোপন সুখের ভীতি,
বিজন ঘরে এখন যে গায় গীতি,
একলা থাকার গানখানি সে গাবে –
উদাস পথিক ভাবে।

হঠাৎ তাহার পথের রেখা হারায়
গহন ধাঁধাঁর আঁধার বাঁধা কারায়,
পথ-চাওয়া তার কাঁদে তারায় তারায়
আর কি পুবের পথের দেখা পাবে –
উদাস পথিক ভাবে।

 

(বইয়ের নাম – দোলন-চাঁপা, অক্টোবর ১৯২৩ সালে ছাপানো হয়।)

 

চৈতী হাওয়া

.

হারিয়ে গেছ অন্ধকারে পাইনি খুঁজে আর -,
আজ্‌কে তোমার আমার মাঝে সপ্ত পারাবার!
আজ্‌কে তোমার জন্মদিন-
স্মরণ-বেলায় নিদ্রাহীন
হাত্‌ড়ে ফিরি হারিয়ে-যাওয়ার অকূল অন্ধকার!
এই -সে হেথাই হারিয়ে গেছে কুড়িয়ে-পাওয়া হার!

 

৪.

বইছে আবার চৈতী হাওয়া গুম্‌রে ওঠে মন,
পেয়েছিলাম এম্‌নি হাওয়ায় তোমার পরশন।
তেম্‌নি আবার মহুয়া-মউ
মৌমাছিদের কৃষ্ণ-বউ
পান ক’রে ওই ঢুল্‌ছে নেশায়, দুল্‌ছে মহুল বন,
ফুল-সৌখিন্‌ দখিন হাওয়ায় কানন উচাটন!

 

৯.

উদাস দুপুর কখন গেছে এখন বিকেল যায়,
ঘুম জড়ানো ঘুমতী নদীর ঘুমুর পরা পায়!
শঙ্খ বাজে মন্দিরে,
সন্ধ্যা আসে বন ঘিরে,
ঝাউ-এর শাখায় ভেজা আঁধার কে পিঁজেছে হায়!
মাঠের বাঁশী বন্‌-উদাসী ভীম্‌পলাশী গায়

 

১৫.

কোথায় তুমি কোথায় আমি চৈতে দেখা সেই,
কেঁদে ফিরে যায় যে চৈত-তোমার দেখা নেই!
কন্ঠে কাঁদে একটি স্বর-
কোথায় তুমি বাঁধলে ঘর?
তেমনি ক’রে জাগছে কি রাত আমার আশাতেই?
কুড়িয়ে পাওয়া বেলায় খুঁজি হারিয়ে যাওয়া খেই!

 

( বইয়ের নাম – ছায়ানট, সেপ্টেম্বর ১৯২৫ সালে ছাপা হয়।)

 

-কেজোর গান

ঐ ঘাসের ফুলে মটরশুটির ক্ষেতে
আমার এ-মন-মৌমাছি ভাই উঠেছে আজ মেতে।।

এই রোদ-সোহাগী পউষ-প্রাতে
অথির প্রজাপতির সাথে
বেড়াই কুঁড়ির পাতে পাতে
পুষ্পল মৌ খেতে।
আমি আমন ধানের বিদায়-কাঁদন শুনি মাঠে রেতে।।

আজ কাশ-বনে কে শ্বাস ফেলে যায় মরা নদীর কূলে,
ও তার হলদে আঁচল চ’লতে জড়ায় অড়হরেরফুলে!
ঐ বাবলা ফুলের নাকছবি তার,
গা’য় শাড়ি নীল অপরাজিতার,
চ’লেছি সেই অজানিতার
উদাস পরশ পেতে।।

আমায় ডেকেছে সে চোখ-ইশারায় পথে যেতে যেতে।।

ঐ ঘাসের ফুলে মটরশুটির ক্ষেতে
আমার এ-মন-মৌমাছি ভাই উঠেছে তাই মেতে।।

 

(বইয়ের নাম – ছায়ানট, সেপ্টেম্বর ১৯২৫ সালে ছাপা হয়।)

 

শরাবন্ তহুরা

নার্গিস-বাগ্ মে   বাহার কি আগ্ মে ভরা দিল্ দাগ্ মে
কাহাঁ মেরি পিয়ারা, আও আও পিয়ারা।
দুরু দুরু ছাতিয়া   ক্যায়সে এ রাতিয়া কাটু বিনা সাথিয়া
ঘাবয়ারে জিয়ারা, তড়পত জিয়ারা।।

দরদে দিল জোর, রঙ্গিলা কওসর
শরাবন্ তহুরা লাও সাকী লাও ভর্,
পিয়ালা তু ধর্ দে মস্তানা কর্ দে সব্ দিল্ ভর্ দে
দরদ্ মে ইয়ারা-সঙ্গ্-দিল্ ইয়ারা।।

জিগর কা খুন নেহি, ডরো মত্ সাকিয়া,
আঙ্গুরী লোহুয়ো, – ক্যাঁও্ ভিঙা আঁখিয়া?
গিয়া পিয়া আতা নেহি মত্ করো সহেলি,
ছোড়ো হাত-পিয়ালা য়ো ভর্ দে তু পহেলি!

মত্ মাচা গও্গা,   বসন্ত্ মে বাহবা   ম্যায়্ সে ক্যা তৌবা?
আহা গোলনিয়ারা সখি গোলনিয়ারা-
শরাব কা নূর সে   রৌশন কর্ দে দুনিয়া আঁধিয়ারা
দুনিয়া রা দুনিয়া রা।।

 

(বইয়ের নাম – পুবের হাওয়া, ১৯২৫ সালে ছাপা হয়।)

 

বাতায়ন-পাশে গুবাক-তরুর সারি

বিদায়, হে মোর বাতায়ন-পাশে নিশীথ জাগার সাথী!
ওগো বন্ধুরা, পান্ডুর হয়ে এল বিদায়ের রাতি!
আজ হ’তে হ’ল বন্ধ আমার জানালার ঝিলিমিলি,
আজ হ’তে হ’ল বন্ধ মোদের আলাপন নিরিবিলি।…

অস্ত-আকাশ-অলিন্দে তার শীর্ণ কপোল রাখি’
কাঁদিতেছে চাঁদ, “মুসাফির জাগো, নিশি আর নাই বাকী”!
নিশীথিনী যায় দূর বন-ছায়, তন্দ্রায় ঢুলুঢুল্,
ফিরে ফিরে চায়, দু’হাতে জড়ায় আঁধারের এলোচুল।-

চমকিয়া জাগি, ললাটে আমার কাহার নিশাস লাগে?
কে করে বীজন তপ্ত ললাটে, কে মোর শিয়রে জাগে?
জেগে দেখি, মোর বাতায়ন-পাশে জাগিছ স্বপনচারী
নিশীথ রাতের বন্ধু আমার গুবাক-তরুর সারি!

তোমাদের আর আমার আঁখির পল্লব-কম্পনে
সারারাত মোরা কয়েছি যে কথা, বন্ধু, পড়িছে মনে!-
জাগিয়া একাকী জ্বালা করে আঁখি আসিত যখন জল,
তোমাদের পাতা মনে হ’ত যেন সুশীতল করতল
আমার প্রিয়ার!- তোমার শাখার পল্লবমর্মর
মনে হ’ত যেন তারি কন্ঠের আবেদন সকাতর।
তোমার পাতায় দেখেছি তাহারি আঁখির কাজল-লেখা,
তোমার দেহেরই মতন দীঘল তাহার দেহের রেখা।
তব ঝির্ ঝির্ মির্ মির্ যেন তারি কুন্ঠিত বাণী,
তোমার শাখায় ঝুলানো তারির শাড়ীর আঁচলখানি!
– তোমার পাখার হাওয়া
তারি অঙ্গুলি-পরশের মত নিবিড় আদর-ছাওয়া!

ভাবিতে ভাবিতে ঢুলিয়া পড়েছি ঘুমের শ্রান্ত কোলে,
ঘুমায়ে স্বপন দেখেছি,-তোমারি সুনীল ঝালর দোলে
তেমনি আমার শিথানের পাশে। দেখেছি স্বপনে, তুমি
গোপনে আসিয়া গিয়াছ আমার তপ্ত ললাট চুমি’।
হয়ত স্বপনে বাড়ায়েছি হাত লইতে পরশখানি,
বাতায়নে ঠেকি’ ফিরিয়া এসেছে, লইয়াছি লাজে টানি’।
বন্ধু, এখন রুদ্ধ করিতে হইবে সে বাতায়ন!
ডাকে পথ, হাঁকে যাত্রিরা,‘কর বিদায়ের আয়োজন!’

– আজি বিদায়ের আগে
আমারে জানাতে তোমারে জানিতে কত কী যে সাধ জাগে!
মর্মের বাণী শুনি তব, শুধু মুখের ভাষায় কেন
জানিতে চায় ও বুকের ভাষারে লোভাতুর মন হেন?
জানি-মুখে মুখে হবে না মোদের কোনোদিন জানাজানি,
বুকে বুকে শুধু বাজাইবে বীণা বেদনার বীণাপাণি!

হয় ত তোমারে দেখিয়াছি, তুমি যাহা নও তাই ক’রে,
ক্ষতি কী তোমার, যদি গো আমার তাতেই হৃদয় ভরে?
সুন্দর যদি করে গো তোমারে আমার আঁখির জল,
হারা-মোমতাজে ল’য়ে কারো প্রেম রচে যদি তাজ-ম’ল,
-বল তাহে কার ক্ষতি?
তোমারে লইয়া সাজাব না ঘর, সৃজিব অমরাবতী!…

হয় ত তোমার শাখায় কখনো বসে নি আসিয়া শাখী,
তোমার কুঞ্জে পত্রপুঞ্জে কোকিল ওঠেনি ডাকি’।
শূন্যের পানে তুলিয়া ধরিয়া পল্লব-আবেদন
জেগেছ নিশীথে জাগেনিক’ সাথে খুলি’ কেহ বাতায়ন।
-সব আগে আমি আসি’
তোমারে চাহিয়া জেগেছি নিশীথ, গিয়াছি গো ভালোবাসি!
তোমার পাতায় লিখিলাম আমি প্রথম প্রণয়-লেখা
এইটুকু হোক সান্ত্বনা মোর, হোক বা না হোক দেখা।…

তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু, আর আমি জাগিব না।
কোলাহল করি’ সারা দিনমান কারো ধ্যান ভাঙিব না।
নিশ্চল নিশ্চুপ
আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধুর ধূপ। –

শুধাইতে নাই, তবুও শুধাই আজিকে যাবার আগে-
ঐ পল্লব-জাফরি খুলিয়া তুমিও কি অনুরাগে
দেখেছ আমারে-দেখিয়াছি যবে আমি বাতায়ন খুলি’?
হাওয়ায় না মোর অনুরাগে তব পাতা উঠিয়াছে দুলি’?
তোমার পাতার হরিৎ আঁচলে চাঁদনী ঘুমাবে যবে,
মূর্ছিতা হবে সুখের আবেশে,- সে আলোর উৎসবে,
মনে কি পড়িবে এই ক্ষণিকের অতিথির কথা আর?
তোমার নিরাশ শূণ্য এ ঘরে করিবে কি হাহাকার?
চাঁদের আলোক বিস্বাদ কি গো লাগিবে সেদিন চোখে?
খড়খড়ি খুলি চেয়ে রবে দূর অস্ত অলখ-লোকে?
– অথবা এমনি করি’
দাঁড়ায়ে রহিবে আপন ধেয়ানে সারা দিনমান ভরি’?
মলিন মাটির বন্ধনে বাঁধা হায় অসহায় তরু,
পদতলে ধূলি,উর্ধ্বে তোমার শূন্য গগন-মরু।
দিবসে পুড়িছ রৌদ্রের দাহে, নিশীথে ভিজিছ হিমে,
কাঁদিবারও নাই শকতি, মৃত্যু-আফিমে পড়িছ ঝিমে!
তোমার দুঃখ তোমারেই যদি, বন্ধু, ব্যথা না হানে,
কী হবে রিক্ত চিত্ত ভরিয়া আমার ব্যথার দানে!…

*      *       *

ভুল ক’রে কভু আসিলে স্মরণে অমনি তা যেয়ো ভুলি।
যদি ভুল ক’রে কখনো এ মোর বাতায়ন যায় খুলি’,
বন্ধ করিয়া দিও পুনঃ তায়! তোমার জাফরি-ফাঁকে
খুঁজো না তাহারে গগন-আঁধারে-মাটিতে পেলে না যাকে!

 

(বইয়ের নাম – চক্রবাক, অগাস্ট ১৯২৯ সালে ছাপা হয়। )

 

PAKISTAN - CIRCA 1969: stamp printed in the Pakistan  show Chancellor Konrad Adenauer, circa 1969

PAKISTAN – CIRCA 1969: stamp printed in the Pakistan show Chancellor Konrad Adenauer, circa 1969

 

তুমি মোরে ভুলিয়াছ

তুমি মোরে ভুলিয়াছ তাই সত্য হোক! –
সেদিন যে জ্বলেছিল দীপালি-আলোক
তোমার দেউল জুড়ি’ – ভুল তাহা ভুল!
সেদিন ফুটিয়াছিল ভুল ক’রে ফুল
তোমার অঙ্গনে প্রিয়! সেদিন সন্ধ্যায়
ভু’লে পরেছিলে ফুল নোটন-খোঁপায়!
ভুল ক’রে তুলি’ ফুল গাঁথি বর-মালা
বেলাশেষে বারে বারে হয়েছ উতলা
হয়ত বা আর কারো লাগি’!… আমি ভু’লে
নিরুদ্দেশ তরী মোর তব উপকূলে
না চাহিতে বেঁধেছিনু, গেয়েছিনু গান,
নীলাভ তোমার আঁখি হয়েছিল ম্লান
হয়ত বা অকারণে! হয়ত তোমার
পড়ে মনে, কবে যেন কোন্ লোকে কার
বধূ ছিলে; তারি কথা শুধু মনে পড়ে।
-ফিরে যাও অতীতের লোকলোকান্তরে
এমনি সন্ধ্যায় বসি’ একাকিনী গেহে!
দু’খানি আঁখির দীপ সুগভীর স্নেহে
জ্বালাইয়া থাক জাগি’ তার পথ চাহি’!
সে যেন আসিছে দূর তারালোক বাহি’
পারাইয়া অসীমের অনন্ত জিজ্ঞাসা,
সে দেখেছে তব দীপ, ধরণীর বাসা!

হয়ত সে গান মম তোমার ব্যথায়
বেজেছিল। হয়ত বা লেগেছিল পায়
আমার তরীর ঢেউ। দিয়েছিল ধু’য়ে
চরণ-অলক্ত তব। হয়ত বা ছুঁয়ে
গিয়েছিল কপোলের আকুল কুন্তল
আমার বুকের শ্বাস। ও-মুখ-কমল
উঠেছিল রাঙা হয়ে’। পদ্মের কেশর
ছুঁইলে দখিনা বায়, কাঁপে থরথর
যেমন কমল-দল ভঙ্গুর মৃণালে
সলাজ সঙ্কোচে সুখে পল্লব-আড়ালে,
তেমনি ছোঁওয়ায় মোর শিহরি’ শিহরি’
উঠেছিল বারে বারে সারা দেহ ভরি’!
চেয়েছিল আঁখি তুলি’, ডেকেছিল যেন
প্রিয় নাম ধ’রে মোর – তুমি জান, কেন!
তরী মম ভেসেছিল যে নয়ন-জলে
কূল ছাড়ি’ নেমে এলে সেই সে অতলে।
বলিলে, – “অজানা বন্ধু, তুমি কি গো সেই,
জ্বালা দীপ গাঁথি মালা যার আশাতেই
কূলে বসে একাকিনী যুগ যুগ ধরি’?
নেমে এস বন্ধু মোর ঘাটে বাঁধ তরী!”

. . . . . . . . . . . . . . . .

কাহারে খুঁজিতেছিলে আমার এ চোখে
অবসান-গোধূলির মলিন আলোকে?
জিজ্ঞাসার, সন্দেহের শত আলো-ছায়া
ও-মুখে সৃজিতেছিল কী যেন কি মায়া!
কেবলি রহস্য হায়, রহস্য কেবল,
পার নাই সীমা নাই অগাধ অতল!
এ যেন স্বপনে-দেখা কবেকার মুখ,
এ যেন কেবলি সুখ কেবলি এ দুখ!
ইহারে দেখিতে হয়, ছোঁওয়া নাহি যায়,
এ যেন মন্দার-পুষ্প দেব-অলকায়!
ইহারি স্ফুলিঙ্গ যেন হেরি রূপে রূপে,
নিশীথে এ দেখা দেয় যেন চুপে চুপে
যখন সবারে ভুলি। ধরার বন্ধন
যখন ছিঁড়িতে চাহি, স্বর্গের স্বপন
কেবলি ভুলাতে চায়, এই যে আসিয়া
রূপে রসে গন্ধে গানে কাঁদিয়া হাসিয়া
আঁকড়ি’ ধরিতে চাহে, – মাটির মমতা!
পরান-পোড়ানী শুধু জানে না ক’ কথা!
বুকে এর ভাষা নাই, চোখে নাই জল,
নির্বাক ইঙ্গিত শুধু শান্ত অচপল!

. . . . . . . . . . . . . . . .

…কত কি যে কহিলাম অর্থহীন কথা,
শত যুগ-যুগান্তের অন্তহীন ব্যথা।
শুনিলে সে সব জাগি’ বসিয়া শিয়রে,
বলিলে, “বন্ধু গো, হের দীপ পু’ড় মরে
তিলে তিলে আমাদের সাথে! আর নিশি
নাই বুঝি, দিবা এলে দূরে যাব মিশি’!
আমি শুধু নিশীথের। যখন ধরণী
নীলিমা-মঞ্জুষা খুলি’ হেরে মুক্তামণি
বিচিত্রা নক্ষত্রমালা – চন্দ্রদীপ জ্বালি’,
একাকী পাপিয়া কাঁদে ‘চোখ গেল’ খালি,
আমি সেই নিশীথের। – আমি কই কথা,
যবে শুধু ফোটে ফুল, বিশ্ব তন্দ্রাহতা
হয় ত দিবসে এলে নারিব চিনিতে,
তোমারে করিব হেলা, তব ব্যথা-গীতে
কেবলি পাইবে হাসি সবার সুমুখে,
কাঁদিলে হাসিব আমি সরল কৌতুকে,
মুছাব না আঁখি-জল। বলিব সবায়,
“তুমি শাঙনের মেঘ – যথায় তথায়
কেবলি কাঁদিয়া ফের, কাঁদাই স্বভাব!
আমি ত কেতকী নহি, আমার কি লাভ
এই শাঙনের জলে? কদম্ব যূথীর
সখারে চাহি না আমি। শ্বেত-করবীর
সখি আমি। হেমন্তের সান্ধ্য-কুহেলিতে
দাঁড়াই দিগন্তে আসি’, নিরশ্রু-সঙ্গীতে
ভ’রে ওঠে দশ দিক! আমি উদাসিনী।
মুসাফির! তোমারে ত আমি নাহি চিনি!”

. . . . . . . . . . . . . . . .

হয়ত ভুলেছ তুমি, আমি ভুলি নাই!
যত ভাবি ভুল তাহা – তত সে জড়াই
সে ভুলে সাপিনী সম বুকে ও গলায়!
বাসি লাগে ফুলমেলা। – ভুলের খেলায়
এবার খোয়াব সব, করিয়াছি পণ।
হোক ভুল, হোক মিথ্যা, হোক এ স্বপন,
-এইবার আপনারে শূন্য রিক্ত করি’
দিয়া যাব মরণের আগে! পাত্র ভরি’
ক’রে যাব সুন্দরের করে বিষপান!
তোমারে অমর করি’ করিব প্রয়াণ
মরণের তীর্থ-যাত্রী!

ওগো বন্ধু, প্রিয়,
এমনি করিয়া ভুল দিয়া ভুলাইও
বারে বারে জন্মে জন্মে গ্রহে গ্রহান্তরে!
ও-আঁখি-আলোক যেন ভুল ক’রে পড়ে
আমার আঁখির ‘পরে। গোধূলি-লগনে
ভুল ক’রে হই বর, তুমি হও ক’নে
ক্ষণিকের লীলা লাগি’! ক্ষণিক চমকি’
অশ্রুর শ্রাবণ-মেঘে হারাইও সখি!…

তুমি মোরে ভুলিয়াছ, তাই সত্য হোক!
নিশি-শেষে নিভে গেছে দীপালি-আলোক!
সুন্দর কঠিন তুমি পরশ-পাথর,
তোমার পরশ লভি’ হইনু সুন্দর-
-তুমি তাহা জানিলে না!
…সত্য হোক প্রিয়া
দীপালি জ্বলিয়াছিল – গিয়াছে নিভিয়া।

 

 (বাছাই করা অংশ নেয়া হইছে কবিতাটার; বইয়ের নাম – চক্রবাক, অগাস্ট ১৯২৯ সালে ছাপা হয়।)

 

কুহেলিকা

তোমরা আমায় দেখতে কি পাও আমার গানের নদী-পারে?
নিত্য কথার কুহেলিকায় আড়াল করি আপনারে।
সবাই যখন মত্ত হেথায় পান ক’রে মোর সুরের সুরা,
সব-চেয়ে মোর আপন যে জন সে-ই কাঁদে গো তৃষ্ণাতুরা।

আমার বাদল-মেঘের জলে ভরল নদী সপ্ত পাথার,
ফটিক-জলের কণ্ঠে কাঁদে তৃপ্তি-হারা সেই হাহাকার!
হায় রে চাঁদের জ্যোৎস্না-ধারায় তন্দ্রাহারা বিশ্ব-নিখল,
কলঙ্ক তার নেয় না গো কেউ, রইল জু’ড়ে চাঁদেরি দিল্!

 

(বইয়ের নাম – চক্রবাক, অগাস্ট ১৯২৯ সালে ছাপা হয়।)

 

কর্থ্যভাষা

কর্থ্যভাষা কইতে নারি শুর্দ্ধ কথা ভিন্ন।
নেড়ায় আমি নিম্ন বলি (কারণ) ছেঁড়ায় বলি ছিন্ন।

গোঁসাইকে কই গোস্বামী, তাই মশাইকে মোর্স্বামী।
বানকে বলি বন্যা, আর কানকে কন্যা কই আমি।।
চাষায় আমি চশশ বলি, আশায় বলি অশ্ব।
কোটকে বলি কোষ্ঠ, আর নাসায় বলি নস্য।।
শশারে কই শিষ্য আমি, ভাষারে কই ভীস্ম।
পিসিরে কই পিষ্টক আর মাসিরে মাহিষ্য।।
পুকুররে কই প্রুষ্করিণী, কুকুররে কই ক্রুক্কু।
বদনাকে ক্ই বদ্ না, আর গাড়ুকে গুড়ুক্কু।।
চাঁড়ালকে কই চন্ডাল, তাই আড়ালকে অন্ডাল।
শালাকে কই শালাকা, আর কালায় বলি কঙ্কাল।।
শ্বশুরকে কই শ্মশ্রু, আর দাদাকে কই দদ্রু।
বামারে কই বম্বু, আর কাদারে কই কদ্রু।।
আরো অনেক বাত্রা জানি, বুঝলে ভায়া মিন্টু।
ভেবেছ সব শিখে নেবে, বলছি নে আর কিন্তু।।

 

(বইয়ের নাম – ঝড়, জানুয়ারি ১৯৬১ সালে ছাপা হয়।)

 

আঁধারে

অমানিশায় আসে আঁধার তেপান্তরের মাঠে;
স্তব্ধ ভয়ে পথিক ভাবে, – কেমনে রাত কাটে!
ঐ যে ডাকে হুতোম-পেঁচা, বাতাস করে শাঁ শাঁ!
মেঘে ঢাকা অচিন্ মুলুক; কোথায় রে কার বাসা?
গা ছুঁয়ে যায় কালিয়ে শীতে শূন্য পথের জু জু –
আধাঁর ঘোরে জীবন-খেলার নূতন পালা রুজু।

 

(বঙ্গবাণী পত্রিকায় ছাপা হওয়া; চৈত্র, ১৩৩০।)

 

শেষ বাণী

ভাল আমি ছিলাম এবং ভালই আমি আছি;
হৃদয়-পদ্মে মধু পেল মনের মৌমাছি।

 

(পাবলিকেশন্সের কোন তথ্য পাওয়া যায় নাই।)

 

——————————

 

[কবিতাগুলি নজরুল ইন্সটিটিউট থিকা পাবলিশ করা ‘নজরুলের কবিতা সমগ্র’ বই (পঞ্চম মুদ্রণ, জানুয়ারি, ২০১৫) থিকা নেয়া হইছে।]

 

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
কাজী নজরুল ইসলাম

কাজী নজরুল ইসলাম

কাজী নজরুল ইসলাম (মে ২৫, ১৮৯৯–আগস্ট ২৯, ১৯৭৬): পোয়েট, লিরিস্টিট, মিউজিশিয়ান। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ন্যাশনাল পোয়েট।
কাজী নজরুল ইসলাম

লেটেস্ট ।। কাজী নজরুল ইসলাম (সবগুলি)

  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য