Main menu

অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশি সিনেমা (১)

বাংলাদেশে সিনেমা কিন্তু খুব কমই বানানো হইছে। ১৯৫৬-২০০৬, এই ৫০ বছরে ২৪৩২টা বাংলা সিনেমা রিলিজ হইছে সিনেমা হলগুলাতে। (বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, পাঁচ দশকের ইতিহাস, ২০১০)। বাজারের কথা যদি ধরেন, ২০১৮ সালে হলিউডের বিজনেস সাইজ ছিল ১১ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলার, বলিউডের ২.৩২ ট্রিলিয়ন (উইকিপিডিয়া), আর বাংলাদেশের কোন ডাটা নাই কিন্তু ২০১৮ সালে রিলিজ হইছিল ৬৩টা সিনেমা, হিসাব-টিসাব বাড়ায়া গড়ে ১ কোটি টাকা ধরলেও ৬৩ কোটি টাকার মার্কেট, ১ কোটি ইউএস ডলারও হয় না, বিলিয়ন-ট্রিলিয়নের হিসাব তো অনেক পরে।… তারপরে পুরষ্কার-টুরষ্কার পাওয়া বা সেনসেশনের কথাও যদি বলেন, এমন ৪/৫টা বাংলাদেশি সিনেমার নাম বলাটাও তো কঠিন, যেইগুলা দুনিয়ার সিনেমা ইতিহাসের কথা বলতে গেলে আসতে পারে। মানে, বিজনেস বলেন আর আর্ট-কালচার বলেন, যে কোন প্যারামিটারেই বাংলাদেশি সিনেমার কোন ‘গৌরবোজ্জ্বল’ অবস্থা নাই, কোনদিন তেমন একটা ছিলও না। কিন্তু এন্টারটেইনমেন্টের মিডিয়াম হিসাবে সিনেমা তো ইর্ম্পটেন্ট একটা জিনিস, এবং এই দেশের মানুশ খরচও কম করেন না এন্টারটেইমেন্টের পিছনে, তো এই কারণে  বাংলাদেশি সিনেমা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ হয়া উঠার সম্ভাবনার ভিতরে ছিল, এখনো আছে।

কিন্তু বাংলাদেশি সিনেমা নিয়া কথা বলার সবচে বড় মুশকিল হইলো, ইনফরমেশন নাই।  উইকিপিডিয়া বা অন্য এভেইলেবল সোর্সগুলাতেও সিনেমার নাম-টাম বাদে বাংলাদেশি সিনেমার তেমন কোন ইনফরমেশন-ই পাইবেন না: যেমন, কতো টাকা বাজেট ছিল, কতো টাকা ইনকাম হইছে, কয়টা হলে চলছে, কাহিনি কি ছিল বা ইমপ্যাক্ট কি রকম… এইরকম কিছু পাওয়া মুশকিলই। আর ইনফরমেশন যেহেতু ‘জ্ঞান’ না, এই কারণে কেউ একসাথে করার বা রাখার কথা ভাবেন নাই মনেহয়। :(

কিন্তু ‘জ্ঞানে’র আলাপ করতে গেলেও ইনফরমেশন কম-বেশি তো লাগে আসলে।… তো, এই কম ইনফরমেশনের বেসিসেই বাংলা সিনেমার হিস্ট্রি নিয়া কিছু কথা বলতে চাইতেছি।

 

শুরু কোনটা?

কোন টাইমলাইন থিকা আলাপ’টা শুরু করতে চাই – এই ডিসিশান’টা জরুরি। তো কনসাশলিই, আলাপ’টা ব্রিটিশ ইন্ডিয়া থিকা শুরু না কইরা পূর্ব পাকিস্তান পিরিয়ড থিকা শুরু করতে চাইতেছি। কারণ রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের শুরুটা ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান হওয়ার ভিতর দিয়াই, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বা ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলন দিয়া না। এর আগে বা পরেও আরো হিস্ট্রিক্যাল ঘটনা অবশ্যই আছে, কিন্তু এই ২০২০ সালে যখন বাংলাদেশ বইলা একটা রাষ্ট্র আছে, এর পলিটিক্যাল আইডেন্টিটি হিসাবে ১৯৪৭’রে একটা গোড়া হিসাবে মানতে পারাটা দরকার বইলা মনে হইছে আমার কাছে। এর বাইরে, কেউ যদি আরো আগে যাইতে চান, সেই হিস্ট্রি তো পাইবেনই অন্য বই আর লেখাপত্রে। তারপরও শুরু’র আগের জায়গাটা নিয়া কিছু কথা বইলা রাখতে চাইতেছি।

হীরালাল সেন। ছবি: উইকিপিডিয়া থিকা নেয়া।

হীরালাল সেন। ছবি: উইকিপিডিয়া থিকা নেয়া।

যেমন, ১৮৯৮ সালে হীরালাল সেন কিছু সাইলেন্ট ফুটেজ বানাইছিলেন (Dancing Scenes from the Flower of Persia, https://bit.ly/31rBihR), তো, উনি ঢাকার নবাবগঞ্জের লোক ছিলেন বইলা উনার বানানো সাইলেন্ট মুভিরে ‘বাংলা সিনেমা’ হিসাবে দাবি করার কিছু নজির আছে। কিন্তু অই ফুটেজ যেহেতু এভেইলেবল না এখন, অইখানে বাংলায় লেখা কোন ইন্টার-টাইটেল ছিল কিনা শিওর না আমি। তো, শুধুমাত্র বাংলাদেশের একজন লোক বানাইছেন বইলা তারে ‘বাংলা সিনেমা’ বলাটা হয়তো টাফ হবে; তার উপরে দেখেন, টাইটেল কিন্তু ইংলিশেই। ১৯১৩ সালে প্রথম যে ইন্ডিয়ান সিনেমা বানানো হয় “রাজা হরিশচন্দ্র” নামে সেইটার ইন্টার-টাইটেল ছিল ইংলিশ, মারাঠী আর হিন্দি’তে। তারপরে ১৯১৭ সালে বানানো “সত্যবাদী রাজা হরিশচন্দ্র’রে ফার্স্ট ইন্ডিয়ান সিনেমা বলা হয়, সেইখানে বাংলা ইন্টার-টাইটেল ইউজ করা হইছিল। (https://bit.ly/2DjG09s)। এরপরে ১৯১৯ সালে বিল্বমঙ্গল সিনেমার নাম আসে আর অনেকগুলারে সাইলেন্ট মুভি যেইগুলারে ‘বাংলা সাইলেন্ট ফিল্ম’ বইলা দাবি করা হইতেছে (https://bit.ly/2EToU2p) । ধারণা করি, হয় এদের ইন্টার-টাইটেলগুলা বাংলায় লেখা ছিল, বা এইগুলা কলকাতার স্টুডিও’তে বানানো হইছিল।

সুকুমারী সিনেমার একটা স্টিল

সুকুমারী সিনেমার একটা স্টিল

ঢাকায় বানানো ১৯২৮ সালের সুকুমারি (পাবলিকলি দেখানো হয় নাই) এবং  ১৯৩১-এ দ্য লাস্ট কিস (ফুল-লেংথ, সাইলেন্ট) এর কথা অনেকে বলেন, প্রথমদিকের বাংলা সিনেমা হিসাবে। (http://www.nawabbari.com/lastKiss.html)

দ্য কিস সিনেমার একমাত্র এভেইলেবল স্টিল

দ্য কিস সিনেমার একমাত্র এভেইলেবল স্টিল

একটা ঘটনা হইলো, ১৮৯০ সালের দিকেই কলকাতা ও ঢাকার থিয়েটারগুলাতে কিন্তু বায়োস্কোপ দেখানো হইতো। বায়োস্কোপ কোম্পানিও ছিল কয়েকটা, কলকাতাতে। কিন্তু অই কোম্পানিগুলা হিন্দি/উর্দু সিনেমাই বানাইতো। ১৯৩১ সালে বানানো “জামাই ষষ্ঠী” হইতেছে ফার্স্ট সবাক বাংলা সিনেমা, আর “দেনা পাওনা”রে বলা হয় প্রথম ফুল-লেংথ বাংলা সিনেমা। মানে, ১৯৩০’র দিকে কলকাতায় সিনেমার ব্যবসা বেশ জমজমাট হওয়ার কথা। বাংলাদেশের ন্যাশনাল পোয়েট কাজী নজরুল ইসলামও দুয়েকটা সিনেমা বানাইছিলেন তখন, অভিনয় করছিলেন।

কাজী নজরুল ইসলামের লেখা কাহিনি নিয়া বানানো সিনেমা সাপুড়ে।

কাজী নজরুল ইসলামের লেখা কাহিনি নিয়া বানানো সিনেমা সাপুড়ে।

কিন্তু ইন্টারেস্টিং ঘটনা হইলো, ১৯৩৫’র পরে আর কোন বাংলা সিনেমার নাম উইকিপিডিয়াতে নাই। অথচ অই সময়টাতে মুম্বাইয়ে ধুমায়া হিন্দি সিনেমা তো বানানো হইতেছিলই, ৩০/৪০টা কইরা কানাড়া, তেলেগু আর তামিল সিনেমা বানানো হইতেছিল। কলকাতায় বাংলা সিনেমা বানানো হইতেছিল না – তা না, কিন্তু কোন বাংলা সিনেমা ইন্ড্রাষ্ট্রি ওয়েস্ট বেঙ্গলেও যে শুরু হয় নাই, কিছু সন্দেহ থাকলেও, এই কথা মেবি বলাই যায়। ১৯৪৬-এ  “দুঃখে যাদের জীবন গড়া”র নামে একটা সিনেমার খোঁজ পাওয়া গেলেও ইন্ডিয়াতেও বাংলা  সিনেমার হিস্ট্রি শুরু হইছে ১৯৫৫ সালেই (https://bit.ly/3kigguE)।

এমনিতে, ১৯৪৭’র আগে এই অঞ্চলের সেন্টার ছিল কলকাতা শহর, আর সেইখানে থিয়েটারের স্টুডিওগুলাও ছিল; যেইটার অনেকগুলা পরে মুম্বাইয়ে শিফট হয়। অই স্টুডিওগুলাতে যারা কাজ করতেন তাদের অনেকে পূর্ব পাকিস্তানেও চইলা আসছিলেন; সুভাষ দত্ত তো ১৯৫২ সাল পর্যন্ত মুম্বাইয়ে কাজ করছেন, এবং সৈয়দ শামসুল হকও ছিলেন মনেহয় কিছুদিন। আর ঢাকা এবং পূর্ব পাকিস্তানে তো শ’খানেক সিনেমা হল ছিল, অইখানে চালানোর জন্য হিন্দি সিনেমাও কলকাতা আর মুম্বাই থিকা আমদানি করা হইতো। কলকাতা-বেইজড বাংলা সিনেমা হিসাবে ঋতিক ঘটকের “নাগরিক” ১৯৫২ সালে বাাননো হইলেও ১৯৫৫ সালের সতজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’-ই পয়লা সিনেমা, যেইটা ইন্টারন্যাশনালি অনেক রিকগনিশেন পায়। আর যেহেতু ইন্ডিয়ার একটা বাংলা-সিনেমা নিয়া আলাপ হইতেছিল তখন অনেক, পাকিস্তান রাষ্ট্রেও একটা পলিটিক্যাল প্রেশার তৈরি হওয়ার, বাংলা সিনেমা বানানোর; যেইটা এফডিসি’র আলাপে গিয়াও আমরা পাবো কিছুটা।…

মানে, হিস্ট্রি নিয়া আলাপ করতে গেলে, একটা কাট অফ পয়েন্ট আমাদের অবশ্যই ঠিক কইরা নিতে হবে; কিন্তু তার মানে আগের লিগাসিগুলারে অস্বীকার করা না, বরং যোগাযোগের একটা জায়গা যে ছিল সবসময় বা থাকেই, সেইটা মাথায় রাখতে পারলে ভালো।

(এইখানে জাকির হোসেন রাজু বাংলা সিনেমার শুরু’র ধারণা (https://bit.ly/2DskIGD) নিয়াও দুইটা কথা বইলা রাখাটা দরকার।  “few possible “beginnings”” হিসাবে উনি হীরালাল সেন ও ঢাকার নবাব পরিবারের কথা বলতে চাইছেন, “হিস্ট্রি” “সিনেমা” আর “ন্যাশন” এর ধারণাটাতে ক্রিটিক্যাল হওয়ার ভিতর দিয়া; কিন্তু ব্যাপারটা কনভিন্সিং মনে হয় নাই আমার কাছে, কয়েকটা কারণে।

 

জাকির হোসেন রাজুর লেখা বইয়ের কাভার।

জাকির হোসেন রাজুর লেখা বইয়ের কাভার।

 

এক হইলো, হিস্ট্রি’র যে কোন শুরু নাই – তা না, কিন্তু কোনটারে শুরু ধরতেছেন, কেন ধরতেছেন, সেইটারে একটা পলিটিক্যাল কোশ্চেন হিসাবে নিতে পারাটা বেটার । হীরালাল সেন বা ঢাকার নওয়াব পরিবার যখন ভিজ্যুয়ালস বানাইতেছিলেন তখন হিস্ট্রিক্যালি ‘বাংলাদেশ’ ধারণাটা শুরু হইতে পারে নাই; বরং এইগুলা ছিল অনেক বেশি ইন্ডিয়ান সিনেমার একটা ঘটনা। যেমন ধরেন, মর্ডানিজম বা পোস্ট-মর্ডানিজম একটা আইডিয়া হিসাবে এমার্জ করার আগেও এর নজির পাইবেন তো অনেকের চিন্তায়; তাই বইলা তারে মর্ডানিজম বা পোস্ট-মর্ডানিজমের শুরু বলাটা মুশকিলেরই। মানে, শুরু হিসাবে একটা টাইম’রে ধরতে হইলে, অই ধারণাগুলা একটা ডিফাইনিং জায়গাতে  কখন যাইতে পারতেছে, সেইটারে কন্সিডার করতে পারলে বেটার। ‘ন্যাশন স্টেট’ শুরু হওয়ার আগে যে দুনিয়াতে দেশ বা রাজ্য ছিলো না – তা তো না, কিন্তু ‘ন্যাশন’ হিসাবে কখন নিজেদেরকে ক্লেইম করতেছে, সেইটা ধরতে গেলে, ১৯৪৭’রেই নিতে হবে।

এই জায়গা থিকা, ধারণা হিসাবে যদি “সিনেমা”রেও কন্সিডার করেন, ভিজ্যুয়াল মেকিংয়ের বাইরেও একটা পাবলিক ভিউয়িংয়ে একটা ঘটনা জড়িত, একটা বিজনেস প্রজেক্টও; হীরালাল সেন এবং নওয়াব পরিবারের ভিজ্যুয়ালস সিনেমা ছিল না – এইটা আমার ক্লেইম না, কিন্তু অইটা পাবলিক ভিউয়িং আর বিজনেসের জায়গাতে অপারেট করতে পারে নাই; বা অ্যাজ অ্যা ফর্ম থিয়েটারের একটা এক্সটেন্ড হিসাবেই পারসিভড হওয়ার কথা, ইন্ডিপেন্ডেড একটা ইন্ড্রাষ্ট্রি হয়া উঠার কথা না।

তবে মুশকিল হইলো, কেন হীরালাল সেনের নাম নেয়া হয় না (এইটা সত্যি কথা না যদিও, বাংলাদেশের সিনেমা যত বই পাইবেন সবগুলাতে উনার নাম পাইবেন) এই কথা বলতে গিয়া উনি যে মুসলমান ছিলেন না – এইটারে একটা কারণ হিসাবে দেখছেন জাকির হোসেন রাজু i; এইটা থিকা সন্দেহ হয় উনার সাচ্চা সেক্যুলার হিস্ট্রি লেখার একটা ড্রিম মেবি হিস্ট্রিক্যাল ফ্যাক্টের জায়গাগুলাতে উনারে আন্ধা কইরা রাখছিল। কারণ, হীরালাল সেনের ভিজ্যুয়ালস আর আবদুল জব্বার খানের কাহিনি-চিত্র’রে সিনেমা হিসাবে কন্সিডার করার প্যারামিটারগুলা কমপ্লিটলি আলাদা। )

 

পার্ট ১: ফ্রম অ্যামেচার টু ইন্ড্রাষ্ট্রি (১৯৪৭ – ১৯৬৫)

 

বিফোর “মুখ ও মুখোশ” 

ব্রিটিশ আমলের কথা বাদ দিলে, পয়লা বাংলা সিনেমা হিসাবে মুখ ও মুখোশের কথা সবসময় আসে। নো ডাউট, এইটা প্রথম ফিচার ফিল্ম বা কাহিনি-চিত্র, কিন্তু যদি ডকুমেন্টারি’রে যদি সিনেমা হিসাবে মানেন, এর আগে আরো দুইটা ডকুমেন্টারি বানানো হইছিল – একটা সরকারি, কায়েদে আজম জিন্নাহ’র ঢাকা ভিজিট নিয়া – “ইন আওয়ার মিডস্ট” (১৯৪৮) নামে, পরে আরেকটা ডকু-ফিকশন বানানো হয় ‘সালামত’ (১৯৫৩-৫৪) নামে। দুইটা জিনিসই বানাইছিলেন, নাজির আহমেদ। এই নাজির আহমেদই পরে ঢাকায় এফডিসি (ফিল্ম ডেভলাপমেন্ট কর্পোরেশন) বানানোর একজন পাইনিওয়ার ছিলেন।

 

নাজীর আহমেদ। ছবি: গুগুল সার্চ থিকা নেয়া।

নাজীর আহমেদ। ছবি: গুগুল সার্চ থিকা নেয়া।

নাজির আহমেদের একটা লেখাই পাওয়া যায়, যেইটা কেজি মুস্তাফা সম্পাদিত “সচিত্র বাংলাদেশ” পত্রিকায় ১৯৮৫ সালের ১৬ই জানুয়ারি ছাপা হইছিল। পরে অনুপম হায়াৎ উনার একটা বইয়ে (চিত্র পরিচালক ও তারকাদের আত্মকথা, ২০১৬) লেখাটা রাখছেন। আরো কয়েকটা বইয়ে পাইছি এই লেখাটা। তো, অইখানে নাজির আহমেদ ফার্স্ট ডকুমেন্টারি’টা কেমনে বানানো হইছিল, এই নিয়া বলছেন:

“১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল জিন্নাহ সাহেব আসবেন ঢাকায়। এখানে তার অবস্থানকালে কার্যক্রমের ওপর একটি তথ্য চিত্র তৈরি করতে হবে। কিন্তু তখন সরকারের ছবি তৈরি করার মতো সাজসরঞ্জাম নেই, কুশলী নেই, স্টুডিও নেই। মোহাম্মদ মুশতাক তখন জনসংযোগ পরিচালক। তিনি জানতে পারেন যে, আমি কলকাতায় বিভিন্ন ছবিতে কাজ করেছি। ক্যামেরা, ছবি তোলা, স্টুডিও সম্পর্কে আমার জ্ঞান রয়েছে। তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন জিন্নাহ সাহেবের সফরের ওপর ছবি তোলার ব্যাপারে। এ নিয়ে মুশতাক ও আমি বেশ কদিন ধরে আলাপ-আলোচনা করি। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয় কোলকাতার অরোরা ফিল্ম স্টুডিওর সাহায্য নেয়ার। এই সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমি কোলকাতা গিয়ে অরোরা ফিল্ম ষ্টুডিও থেকে একজন অভিজ্ঞ ক্যামেরাম্যান নিয়ে আসি যন্ত্রপাতিসহ। কায়েদে আজম এখানে ১১ দিন ছিলেন। রেডিওর একজন কর্মকর্তা হিসেবে আমি ছিলাম তার সঙ্গে। আর সঙ্গে ছিলেন ওই ক্যামেরাম্যানও। ছবি তোলার পর আমি তা কোলকাতায় নিয়ে যাই প্রসেস করার জন্য। ছবি সম্পাদনা ও ধারা বর্ণনা ছিল আমারই। বাংলা, ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় ধারা বর্ণনা দেয়া হয়। ‘ইন আওয়ার মিডস্ট’ অনেকে এটাকে ‘পূর্ব পাকিস্তানে ১১ দিন’ নামে অভিহিত করলেও তা ভুল। বলতে পারেন, ‘ইন আওয়ার মিডস্ট’ই হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তা তথা বাংলাদেশের প্রথম চিত্র। কায়েদে আজমের সফরের এক মাসের মধ্যেই ছবিটা রিলিজ দেয়া হয় (১৯৪৮)।”

QUAID-I-AZAM Mohammad Ali Jinnah during his last visit to Dhaka, then East Pakistan. It was during this trip at a mammoth public gathering on March 21, 1948 | Photo: PID.

QUAID-I-AZAM Mohammad Ali Jinnah during his last visit to Dhaka, then East Pakistan. It was during this trip at a mammoth public gathering on March 21, 1948 | Photo: PID.

ডকুমেন্টারি’টা কতোক্ষণের, কিভাবে রিলিজ দেয়া হইছিল সিনেমা হলে – এইগুলা নিয়া কিছু জানা নাই। কিন্তু আমার অনুমান, টাকা দিয়া এই ডকুমেন্টারি সিনেমা হলে কেউ দেখতে যাওয়ার কথা না। হিন্দি, উর্দু আর ইংলিশ সিনেমা শুরু হওয়ার আগে সরকারিভাবে এই ডকুমেন্টারি দেখানোর কথা। মানে, ফার্স্ট ঘটনা’টা ছিল একটা পলিটিক্যাল ডকুমেন্টশনই। এই জায়গাতে মনে হইলো, বাংলাদেশের বা তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে পয়লা অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রডাকশন কোন না কোন কোম্পানির ‘বিজ্ঞাপণ চিত্র’ বা অ্যাড-ই হওয়ার কথা। কারণ ১৯৫৩ সালে ৯২ টা সিনেমা হল ছিল, এই কথা জানা যায়, কয়েকটা লেখাতে। এইসব সিনেমা হলে হিন্দি, উর্দু আর ইংলিশ ছবি দেখানো হইলেও সিনেমা শুরুর আগে বা বিরতি’তে অ্যাড দেখানোর চল থাকার কথা। কিন্তু ‘বিজ্ঞাপণচিত্র’ আর্ট না বইলা আলাদা কইরা ফেলার কারণে সিনেমার হিস্ট্রি’টারে হঠাৎ কইরা গজায়া উঠা একটা জিনিস মনে হইতে পারে। এই ‘বিজ্ঞাপণচিত্র’ বা অ্যাড বানানো, সিনেমা বানানোর লগে খুব বেশি ইরিলিভেন্ট ঘটনা হওয়ার কথা না। কিন্তু আনফরচুনেটলি, এই নিয়া তেমন কোন আলাপ কোথাও নাই। কিন্তু একটা ‘আলাপ’ যে এইখানে থাকতে পারে, এই সম্ভাবনার কথাটা এইখানে বইলা রাখলাম।

 

………………………………………

সুলতানা জামান ১৯৫৮ সালে শুটিং হওয়া ডিরেক্টর মহিউদ্দিনের “মাটির পাহাড়” সিনেমাতে কাজ করছিলেন। উনার জামাই জামান ছিলেন “মুখ ও মুখোশ” সিনেমা সিনেমাটোগ্রাফার, আরো অনেক সিনেমারই। তো, মাটির পাহাড়ে উনারে যে সিলেক্ট করা হইলো, সেইটার কাহিনি নিয়া উনি বলতেছিলেন:

“…তখন জামান সাহেব বিজ্ঞাপণচিত্র নির্মাণ করতেন। তেল, ছাতা, বিভিন্ন পণ্যের ওপর এসব ছবি তৈরি করছিলেন। জামান সাহেব বললেন – এটা তো আমাদের প্রডাকশন। তুমি এটার কাজ করো।…

এই আলাউদ্দিন ছাতার শ্যুটিং হচ্ছিল আবার ‘মাটির পাহাড়’ অফিসের পাশে। শ্যুটিং করলাম। ওটা যে আমার স্ক্রীন টেস্ট হয়ে যাচ্ছে তা আমি বুঝিনি। মহিউদ্দিন সাহেবই ওখানে ডিরেকশন দিচ্ছে।… এরপর জামান সাহেব মুন্নু টেক্সটাইল-এর একটি শাড়ির বিজ্ঞাপন করছিলেন। ওটাতে কাজ করছিলেন লোহানী সাহেব (ফতেহ লোহানী), কাজী খালেক ভাই ও খলিল সাহেব। জামান সাহেব আমাকে বললেন – তুমি ফিমেল জয়েন্ট দিয়ে দাও। আমি রাজি হয়ে গেলাম। তখন বিজি প্রেসে ছিল প্রজেকশন হল। মুন্নু টেক্সটাইল-এর শাড়ির বিজ্ঞাপন ভয়েসের মাধ্যমে যে আমার ভয়েস টেস্ট নেয়া হলো সেটা বুঝলাম অনেক পরে।…” (চিত্র পরিচালক ও তারকাদের আত্মকথা, ২০১৬)

মানে, তখনো ডিরেক্টর, সিনেমাটোগ্রাফার’রা ‘বিজ্ঞাপণচিত্র’ বানাইতেন, হয়তো মার্কেট বড় ছিল না বইলা হয়তো এতো অ্যাড বানাইতে হইতো না, কিন্তু উনারাই ইনভলভব ছিলেন। আর কিছুদিন আগে নায়ক-নায়িকা হওয়ার লাইগা কয়েকটা অ্যাড করা লাগতো তো!…

মানে, এই ইনফরমেশনগুলা মার্ক কইরা রাখা দরকার।

………………………………………

 

তো, “ইন আওয়ার মিডস্ট” বানানোর পরে বিবিসি’তে চাকরি নিয়া নাজির আহমেদ লন্ডনে চইলা গেছিলেন, অইখান থিকা উনারে নিয়া আসেন তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীন সাহেব। আরেকটা ডকুমেন্টারি বানাইছিলেন তখন নাজির আহমেদ ‘সালামত’ নামে।  ডকুমেন্টারি হিসাবে এইটা ইন্টারেস্টিং হওয়ার কথা। কাহিনিটার ব্যাপারে উনি বলতেছিলেন, “সালামত ছিলেন আমাদের বাড়ির ওস্তাগার (মানে, রাজমিস্ত্রী, দালান-কোঠা বানানোর কাজ করতেন যারা)।…  সালামতের দৃষ্টিতে নতুন নির্মীয়মাণ ঢাকা শহর ছিল এ ছবির বিষয়।… ছবির সার্বক্ষণিক কাজে আমাকে সহায়তা দেন আবদুল আহাদ, তিনি ছবির সুরকারও।… চিত্রগ্রহণের কাজে মীর্জাকে সহায়তা করেন হাবীব বারকী। ‘সালামতে’র আমরা দু’টো ভার্সন করি, একটি ছোট (এক হাজার ফুট)। ‘সালামত’ মুক্তি পায় ১৯৫৩-৫৪ সালে।” ছবির কাহিনি যতই ইন্টারেস্টিং হোক, আমার সন্দেহ, সিনেমা হলে এইটা আলাদা সিনেমা হিসাবে দেখানোর কথা না; হয়তো “বিশিষ্ট জনদেরকে” আলাদা কইরা দেখানো হইছিল বা  হিন্দি, উর্দু বা ইংলিশ সিনেমার সাথে দেখাইতো… মানে, কেউ যেহেতু কিছু বলেন নাই, আমার সন্দেহ হিসাবেই রাখতে চাইতেছি, কোন ফ্যাক্ট হিসাবে না। তো, এই ‘সালামত’ সিনেমা বানানোর পরে গর্ভমেন্টের কাছ থিকা ফিল্ম ষ্টুডিও বানানোর লাইগা ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা অনুদান পাইছিলেন নাজির আহমেদ। উনারে হেল্প করছিলেন নুরুল আমীন সাহেব। কিন্তু ১৯৫৪ সালের ৩রা এপ্রিল যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসলে নুরুল আমীনের জায়গায় মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে আসেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক।

 

এফডিসি

আমার ধারণা, শিল্প-সাহিত্য-সিনেমা এইসব নিয়া আলাপের সময় নেসেসারিলি পলিটিক্যাল হিস্ট্রি’টারে মোস্টলি ইগোনরই করা হয়; কিন্তু রাজনীতির রিলিভেন্স বাদ দিলে জিনিসগুলারে ক্লিয়ারলি দেখতে পারার কথা না এতোটা। যেমন ধরেন, এফডিসি যে বানানো হইলো ঢাকাতে, এইটা যুক্তফ্রন্ট সরকারের একটা ঘটনা। (যুক্তফ্রন্ট সরকার পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর থিকা ১৯৫৮ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল। এই সময়টা খুব ইর্ম্পটেন্ট একটা টাইম।) নাজির আহমেদ এইভাবে বলছেন, হিস্ট্রি’টা: “ওই সময় পূর্ব পাকিস্তানে চলছে যুক্তফ্রন্ট সরকার। শেখ মুজিবুর রহমান তখন বাণিজ্যমন্ত্রী আর আসগর আলী শাহ শিল্প সচিব এবং আবুল খায়ের শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব। আমি উপ-সচিবের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের ১ কোটি টাকার কথা জানালাম। বললাম, কর্পোরেশন করলে এ টাকা পাওয়া যেতে পারে। মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সব শুনে আমাকে তার বাসায় ডাকেন। তখন প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন শেষ হতে মাত্র দুদিন বাকি। শেখ সাহেব আমাদেরকে  কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সত্ত্বর কাগজপত্র তৈরি করতে বললেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে অধিবেশনের শেষ দিন (১৯৫৭ সালের ৩ রা এপ্রিল* অন্য আরেকটা লেখায় পাইছি তারিখ’টা) শেখ মুজিবুর রহমান ইপি এফডিসি ও ইপিসিক প্রতিষ্ঠার জন্যে এক হাতে দু’টো বিল পরিষদে অনুমোদনের জন্যে পেশ করেন। সঙ্গে সঙ্গে বিনা বাধায় বিলটি পাশ হয়ে যায়।”

বিল পাশ হওয়ার পরে ১৯৫৭ সালে এফডিসি শুরু হইলেও সেন্ট্রাল গর্ভমেন্ট থিকা টাকা-পয়সা পাইতে পাইতে সময় লাইগা যায়। এই কারণে সরকারি টাকায় বানানো সিনেমার শুরু হইতে এবং শেষ করতে টাইম লাগে কিছু। এফডিসি থিকা ৪টা সিনেমা বাাননোর অনুমতি দেয়া হয় –  জাগো হুয়া সভেরা, আসিয়া, মাটির পাহাড় আর আকাশ আর মাটি। এইখানে বাংলা সিনেমা বানাইতে দেয়ার আরেকটা পলিটিক্যাল কারণ মেবি পথের পাঁচালীর (১৯৫৫) ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ-টাইজ পাওয়া; যেহেতু ইন্ডিয়ার বাংলা সিনেমার এতো সুনাম হইতেছে, পাকিস্তানেরও তো বাংলা সিনেমা বানাইতে হবে বা এইরকম প্রাইজ-টাইজ পাইতে হবে! আলমগীর কবিরের একটা কথা’তে এই অনুমান’টা আরো ভ্যালিড মনেহয় – “…সত্যজিৎ রায়ের শিল্পসৃষ্টিকে সামনে রেখে পথচলা শুরু করেছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্র। ‘পথের পাঁচালী’র মত ছবি করে দেয়ার অঙ্গীকারে অভিনেতা ii ফতেহ্ লোহানীকে পরিচালনার দায়িত্ব দিলেন নাজির আহমেদ।… ফতেহ্ লোহানীকে বললেন, ‘বাংলার পল্লীজীবনকে কেন্দ্র করে ছবি কর। বাজার ভুলে যাও। এমন শিল্প সৃষ্টি কর যাতে করে ওপার বাংলার সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টির মত এপার বাংলায়ও বিশ্বচলচ্চিত্রে আলোড়ন তুলে।’” (আলমগীর কবির, আজ ও কালের প্রেক্ষণে, ১৯৭১/১৯৭২; আলমগীর কবির রচনা সংগ্রহ, ২০১৮ )  জাগো হুয়া সভেরাও যে প্রাইজ পাইছিল, এইটা সিনেমা হিসাবে ভালো-খারাপের বাইরেও পলিটিক্যাল জিনিসগুলা না থাকার কথা না।

কিন্তু এফডিসি দিয়া বাংলা সিনেমার শুরু হয় নাই।

 

মুখ ও মুখোশ

মুখ ও মুখোশ (১৯৫৬) হইতেছে আসলে পয়লা সিনেমা যেইটা সিনেমা হলে চালানোর জন্য, পাবলিক’রে দেখানোর জন্য বানানো হইছিল। আবদুল জব্বার খান পরে আরো পাঁচটা সিনেমা বানাইলেও, এর মধ্যে কাঁচ কাটা হীরা (১৯৭০) মনেহয় কিছুটা হিট হইছিল।

তবে অই সময়ের কিছু জিনিস মাথায় রাখলে ভালো। যেমন, বাংলাদেশে কিন্তু সিনেমা হল ১৯২২/২৩’র দিকেই ছিল, ১৯৪০’র দশক থিকা সিনেমা হল ব্যবসা শুরু হওয়ার কথা, সিনেমার ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবসাও। ‘বোম্বে স্ক্রীন ইয়ার বুক (১৯৫৬)’তে ঢাকার ২৪টা সিনেমা ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির নাম পাওয়া যায়। (পুরা লিস্ট’টা পাইবেন অনুপম হায়াৎ’র “বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিকথা” বইয়ের  ৫৪-৫৫ নাম্বার পেইজে, ২০১৭।) ১৯৪৮ টু ১৯৫৫ সালে, বছরে গড়ে ১৫০/২০০ ছবির প্রিন্ট আমদানি করা হইতো।  মানে, সিনেমা হল আছে, বাংলাদেশের লোকজন সিনেমাও দেখতেছে, কিন্তু বাংলা সিনেমা বানানো হয় না। এইরকম একটা সিচুয়েশন।

তো, “মুখ ও মুখোশ” বানানোর ব্যাকগ্রাউন্ড হিসাবে একটা ঘটনার কথা বলছেন আবদুল জব্বার খান: “… ১৯৫৩ সালের জানুয়ারি। পরিসংখ্যান বিভাগের ডাইরেক্টর ড. আবদুস সাদেক একটা মিটিং ডাকলেন। দাওয়াতটা ছিল চা-চক্রের। এত আমন্ত্রিত হয়েছিলেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও সম্পাদক, সিনেমা হলের মালিক, পরিবেশক প্রমুখ।… তখনকার সেক্রেটারিয়েট, ছনের ঘর। এর ভেতর ৪০/৫০ জন লোক। সাদেক সাহেব খুব আবেগপ্রবণ ভাষায় বললেন, ‘আমাদের দেশে ৯০ টি সিনেমা হল আছে। এগুলোতে লাহোর, কোলকাতা, বোম্বের ছবি চলে। চলচ্চিত্র শিল্পকে গড়ে তুলতে হলে, হলগুলোকে বাঁচাতে হলে আমাদের পূর্ব পাকিস্তানে ছবি তৈরি করতে হবে।’” তখন গুলিস্তান সিনেমা হলের মালিক এস এম দোসানী বলেন, যে এই দেশে সিনেমা বানানো যাবে না, এই-সেই। তখন আবদুল জব্বার খান জোশের চোটে বইলা বসেন যে, কেউ সিনেমা না বানাইলে উনি-ই বানাইবেন। সিনেমা বানানো লাইগা কয়েকজন মিইলা ১৯৫৩ সালেই ‘ইকবাল ফিল্মস’ নামে একটা কোম্পানি তৈরি করেন। কিন্তু ক্যামেরা, আর্টিস্ট যোগাড় কইরা শ্যুটিং শেষ করতে করতে ১৯৫৫ সাল লাইগা যায়।

একটা কথা এইখানে মেনশন করা যাইতে পারে, আবদুল জব্বার খান বলছেন যে, নাজির আহমেদ উনারে হেল্প করেন নাই: “১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকার নাজির আহম্মদকে ডেপুটি ডিরেক্টর করে একটা চলচ্চিত্র বিভাগ করেছে। বিজি প্রেসে (তেজগাঁ’তে) তারা একটা এডিটিং টেবিল বসিয়েছে। নাজির সাহেবের কাছে গেলাম এডিটিংয়ের কোনো সুবিধা পাই কিনা, উনি রাজি হলেন না।” মানে, এফডিসি বানানো হইছিল ঢাকাতে সিনেমা বানানোর লাইগাই, কিন্তু সিনেমা’টা বা সিনেমাগুলা ‘পুরষ্কার’ পাওয়ার মতো হইতে হবে – এই এক্সপেক্টশন মাথায় রাইখা। তো, পরে লাহোরে গিয়া সিনেমার এডিটিং করেন আবদুল জব্বার খান। অইখানে অনেক ঝামেলায় পড়তে হয় উনার।

 

মুখ ও মুখোশ সিনেমার পোস্টার।

মুখ ও মুখোশ সিনেমার পোস্টার।

ছবি বানানোর পরে হল পাইতেও ঝামেলা হইছিল। বাংলা সিনেমা শুরু থিকাই যে সিনেমা হল মালিক আর ডিস্ট্রিবিউটদের কব্জায় ছিল, সেইটাও খেয়াল করা যাইতে পারে উনার বর্ণনায়: “ছবি করেছি কিন্তু হল পাই না। কারণ, তারা শুনেছে, এটা কোনো ছবিই হয় নি। দর্শকরা চেয়ার টেবিল ভেঙে ফেলবে। বাঙালি মুসলমান সিদ্দিকী সাহেবের ‘মানসী’ হলের কাছে গেলাম। উনি রাজি হলেন না। বিপদে পড়লাম। হল ভাড়া করতে চেয়েও পাই না। এ সময় পাকিস্তান ফিল্ম ট্রাস্টের মোশারফ হোসেন চৌধুরী ও আউয়াল সাহেব, ফনীবাবু এরা পরিবেশকের কাজ করতেন। আলাপ করে তাদেরকে দিয়ে দিলাম। তারা চেষ্টা করে নারায়ণগঞ্জে এবং বাইরে দু’একটা হল ঠিক করলেন। কিন্তু ঢাকাতে হয় না। এরপরে ‘মুকুল’ (এখন ‘আজাদ’) আর ‘রূপমহলের’ মালিক কমল বাবুর কাছে গেলে উনি রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, জব্বার সাহেব টাকা খরচ করল আর আমার কয়েকটা চেয়ার যদি ভাঙে তো ভাঙুক। আমিই হল দেব।

১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট তারিখ ঠিক হলো। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের (তখন গর্ভনর) কাছে গেলাম। উনি বললেন, স্টুডিও নেই কিন্তু ছবি বানালেন কি করে? বাপের বেটার মতো কাজ করেছেন।

উনি ছবি উদ্বোধন করলেন। সকাল বেলা ‘মুকুল’-এ বেশ জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান হলো। মুক্তি পেল ৩টা শো থেকে ঢাকার ‘রূপমহল’, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে। দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করছি – লজ্জা পেতে হয় নাকি। হাউজ ফুল হয়ে ছবি চলল। প্রতি মুহূর্তে হাততালি, হাততালি, হাততালি একদম বিরতি পর্যন্ত।… চার সপ্তাহ হাউজ ফুল হয়ে ছবি চলল। আরো চলতো, কিন্তু আমাদের বুকিং ছিল চার সপ্তাহের। তারপর ছবিটাকে আরো সম্পাদনা করবো ভেবে বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু সেটা আর হয়নি।”

‘মুখ ও মুখোশ’ সিনেমা দেখা নিয়া সুভাষ দত্ত একটা ঘটনার কথা বলছেন, যেইটা দিয়া পাবলিক রি-অ্যাকশনের জায়গাটা ক্লিয়ারলি দেখা যাইতে পারে। উনি লিখছেন, “…ডাবিং সিস্টেমে কোথাও গন্ডগোল হয়ে গিয়েছিল, কথা আগে-পিছে হয়ে গিয়েছিল, ঠিক ‘সিন’ হয় নি। মানে লিপ মেলে নি। তো ছবি দেখতে গিয়ে এক ঢাকাইয়া মন্তব্য করে বসল, “ছ্যারা হালায় কতা কয় ছেরির হালায় মুখ লড়ে। আর ছেরি হালায় কতা কয়, ছ্যারার মুখ লড়ে।’ তখন পাশের জন বলে উঠল, ‘অই, অত ছমালোচনা করিস না। আরে, ঢাকার ছবি দেখতে আইছস। বইসা চুপচাপ দেখ। এইটা আমাগো গর্ব। বুছছস। বিটলামি করিস না।”

মুখ ও মুখোশ’রে এই জায়গা থিকাই দেখা যায়।

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
ইমরুল হাসান
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.