Main menu

অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশি সিনেমা (লাস্ট পার্ট)

।। এক ।। দুই ।। তিন ।। চাইর ।। পাঁচ ।।

 

৭. সিনেমার ফিউচার

সিনেমা জিনিসটাই এখন পাল্টাইয়া যাইতেছে, টেকনোলজির কারণে, প্লাটফর্মের কারণে, ডিভাইসের কারণে। সিনেমা যখন শুরু হয়, তখন তো সিনেমা হল ছাড়া অন্য কোথাও দেখার উপায় ছিলো না; বা সিনেমা জিনিসটা বানানোই হইতো সিনেমা হলের কথা মনে রাইখা। পরে দেখার যেই যন্ত্রগুলা আছে, যেমন, টেলিভিশন, সেইখানেও দেখানো শুরু হইলো। ধীরে ধীরে ভিসিআর, ভিসিপি, সিডি ডিভিডি প্লেয়ার আসলো; এর পরে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, এখন মোবাইলেও দেখা যায় তো সিনেমা।

তার মানে এইটা না যে, সিনেমা বাতিল হয়া যাইতেছে, বরং এই জিনিসটা আরো ছড়ায়া পড়তেছে, নতুন নতুন ফর্মে অ্যাপিয়ারড হইতেছে। আমি খুব কনশাসলিই ফার্স্ট চ্যাপ্টারে ভিজ্যুয়ালসের কথা কইছি; যে, ভিজ্যুয়ালস থিকা সিনেমা আসছে, যখন আমরা ক্যামেরা দিয়া দৃশ্য বানাইতে শিখছি তখনই এর ভিতরে সাউন্ড, মিউজিক, স্টোরি দিয়া সিনেমা বানানোর একটা কোশিশ শুরু হইছে। এখন ডিভাইসের কারণে নানান রকমের ভিজ্যুয়ালের ডিমান্ড বাড়তেছে। তো, অইগুলাও কম-বেশি সিনেমাই। সিনেমা খালি সিনেমাহলে দেখাইতে হবে – এইরকম জায়গা থিকা সইরা আসতে পারাটারে সিনেমার ডেথ হিসাবে দেখা’টা ঠিক না আর কি।

খেয়াল কইরা দেখবেন, আমাদের আর্ট-কালচার সবসময় সোসাইটির লিভিং প্যাটার্ন, টেকনোলজি’র উপ্রে বেইজ কইরা বদলাইছে। একটা সময়, গল্প-কবিতা-কাহিনি ব্যাপারটা ছিল ওরাল, কে কতো সুন্দর কইরা বলতে পারেন, দরদ দিয়া গাইতে পারেন। দ্যান যখন প্রিন্টিং প্রেস আসছে ব্যাপারটা লেখার জায়গাতে আসছে, কারণ এইটা আরো ওয়াইডার রেঞ্জে থাকতে পারে; আপনার নিজেরে ফিজিক্যালি উপস্থিত থাকতে বা বাঁইচা থাকতে হইতেছে না। এর ফলে যেইটা হইলো, লিখিত যে কোন কিছুই আর্ট হওয়ার সম্ভাবনার ভিতরে চইলা আসতে থাকলো, আর ওরাল যে কোন কিছুই ফর্মের কারণে নন-আর্ট বা পারফর্মেটিভ আর্টের মধ্যে রিডিউসড হইতে লাগলো। যে কোন ধরণের রিপ্রডাকশন ক্যাপাবিলিটির বাইরে আর্টের জায়গাটা সীমিত হয়া আসতে শুরু করলো। কিন্তু এই জিনিসটাও তো চেইঞ্জ হবে, হইতেছে। যেমন ধরেন, গত ২০/৩০ বছর ধইরা যেহেতু রিটেন ফরম্যাট ছাড়াও অডিও-ভিডিও ধইরা রাখা এবং দেখার অপশন বাড়ছে, ওরাল জিনিসগুলাও চেইঞ্জ হইতেছে; গান খালি শোনার জিনিস না, দেখার ঘটনাও হয়া উঠছে। এইরকম চেইঞ্জগুলা হইছে, হইতেছে। পাবলিক ভিউয়িংয়ের জায়গায় প্রাইভেট ভিউ’র স্পেইস ক্রিয়েট হইতেছে, সিনেমা ডিস্ট্রিবিউশনের জায়গায় প্লাটফর্মগুলা ক্রুশিয়াল হয়া উঠতেছে। থ্রি-ডি’র পরে ভিডিও গেইমসের মতন ইন্টার-এক্টিভ সিনেমাও হয়তো পাইতে থাকবো আমরা। মানে, প্রতি ৫০ বছরে না হইলেও ১০০ বছর পরেই ঘটনাগুলা একইরকম থাকার কথা না, যেহেতু টেনকোলজিক্যাল চেইঞ্জগুলা এখনো চলতেছে।…

তো, বাংলাদেশের সিনেমা এর বাইরের কিছু না, এই ট্রেন্ড ও টেনডেন্সিগুলার ভিতর দিয়াই যাবে এই ফর্মটাও। এখনো (ফেব্রুয়ারি ২০২১) অনলাইন প্লাটফর্মের জন্য (সিরিজ ছাড়া) কোন বাংলাদেশি সিনেমা রিলিজ না হইলেও, শুরু হওয়ার কথা। (টিভি’তে তো হইছেই, এর আগে।) অই ফরম্যাটের অডিয়েন্স এবং সিনেমার টেকনিকগুলাও কিছুটা আলাদা হওয়ার কথা। কিন্তু একই সাথে ‘বাংলাদেশি’ বইলা একটা কিছুর ডিমান্ড আগে যেমন ছিল, এখনো থাকার কথাই। মানে, কালচারের কিছু জিনিস আছে, সেইটা ভাষা দিয়া, ডাবিং দিয়া, সাবটাইটেল দিয়া ফুলফিল করা যাবে না আসলে। ব্যাপারটা এইরকম না যে, নায়িকাদের কোমরে একটু চর্বি লাগবে বা নায়কদের ম্যাচো হইতে হবে, বা কাহিনি ‘সামাজিক’ হইতে হবে; কিন্তু এইখানে কিছু জিনিস আছে যেইটা হলিউডের ইংলিশ সিনেমা, হিন্দি-সিনেমা বা ইউরোপিয়ান আর্ট-ফিল্মগুলা রেপ্লিকেট করতে পারা যায় না। মানে, সিনেমা দেইখা ভালো-লাগা আর বাংলাদেশি সিনেমা বইলা একটা কিছুরে দেখা – দুইটা আলাদা ঘটনা, অডিয়েন্সের দিক থিকা।

কিন্তু এমন না যে ‘হাজার বছর’ ধইরা ‘বাঙালি’ কালচার বইলা কোন কিছু ছিল বা চলতেই থাকবে; বরং একটা হিস্ট্রিক্যাল টাইমফ্রেমে এই কালচারাল সিগনেচারগুলারে খেয়াল করা যাইতেছে, আর একটা সময়ে গিয়া হয়তো খেয়াল করাও যাবে না, অন্য কোন জিনিসের সাথে মিইশা যাবে; আবার জাইগা উঠবে। মানে, যে কোন কালচার একটা টেম্পরারি ঘটনাই, হিস্ট্রি’র জায়গা থিকা দেখতে গেলে। তবে আমার ধারণা, একটা কালচারের ভিতরেও অনেকগুলা লেয়ার থাকে। ধরেন, ১৯০৫ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’র প্রস্তাবের আগে এইখানে ‘পুব বাংলা’ বইলা একটা ‘রিজিওনাল’ কালচার ছিল যেইটারে কলোনিয়াল কলকাতার একটা বাই-প্রডাক্ট হিসাবে ভাবা হইতো; যে কলকাতা যেহেতু ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার রাজধানী, অইটা হইতেছে সেন্টার; বাদবাকিগুলা ‘রিজিওনাল’। যদিও এইটা বাজে চিন্তাই – এইভাবে দেখার তরিকাটা; কারণ অতীতেরও তো অতীত আছে; ব্রিটিশদের দখল করার আগে ঢাকা ছিল বরং সেন্টার, যেইটারে ‘সোনার বাংলা’ বলার রেওয়াজ আছে। আবার, তারও পাস্ট আছে।… তো, কলোনিয়াল টাইমের কারণে, বিফোর ১৯৪৭, এই কালচার’টারে আমরা ‘বাংলাদেশি’ ভাবতে পারি নাই। যেই কারণে, বাংলাদেশি সিনেমা বইলা যদি কিছু থাকে, সেইটার শুরু এরপর থিকা হইছে; এর আগে, ইন্ডিয়ান সাব-কালচারের একটা জিনিস হিসাবে পারসিভড হইতে থাকতো। এখনো ইউরোপিয়ান অডিয়েন্সের কাছে ঘটনা তো এইরকমই; যেইরকমভাবে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলারে কম-বেশি একইরকম লাগে আমাদের কাছে।…

মানে, আমি বলতে চাইতেছি, আমরা যে বাংলাদেশি সিনেমা দেখতে চাই এইটা ন্যাশনালিস্টিক কোন ভয়ারিজম না, বরং ‘বাংলাদেশি’ যখন একটা আইডেন্টিটি হিসাবে রিলিভেন্ট থাকতেছে তখন এর একটা ম্যানিফেস্টশন বা ছাপ কালচারাল জিনিসগুলার মধ্যে থাকে। একটা কালচারের উপর বেইজ কইরাই একটা আইডেন্টিটি তৈরি হয় না খালি, একটা আইডেন্টিটি’র জায়গা থিকাও কালচার তৈরি করার একটা তাগিদ থাকে। বাংলাদেশি-গল্প, বাংলাদেশি-কবিতা বা বাংলাদেশি-মদের মতো বাংলাদেশি-সিনেমারও এই জায়গাটা আছে। ইন্ডিয়ান বাংলা দিয়া এই জিনিসটারে ধরা যাবে না বা রিপ্লেস করা যাবে না, যায়ও নাই।

তো, হলে-দেখানোর সিনেমা, টিভিতে-দেখানোর সিনেমা বা ইন্টারনেটের স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে দেখানো ওয়েব-সিরিজই হোক, সব জায়গাতেই ‘বাংলাদেশি’ বইলা একটা জিনিসরে যে প্রজেক্ট করার ট্রাই করা হয়, সেইটা খুব কমই ‘বাংলাদেশি’ হইতে পারে। এই কারণে না যে, যারা সিনেমা বানান উনারা সিনেমা বানাইতে জানেন না, বরং আমাদের এইখানে ‘বাংলাদেশি কালচার’ বইলা যেই ধারণা চালু আছে, সেইটা সবসময়ই ‘নকল’ একটা ব্যাপার বইলা আমরা পারসিভ করি; যে, আমাদের ‘অরিজিনাল’ বইলা তো কিছু নাই! “জাতি হিসাবে আমরা তো সংকর জাতি”… এই-সেই। এই ন্যারেটিভ’টার ঘটনা।

বাংলাদেশি সিনেমা যে ‘হয় না’, এইটা সিনেমার সমস্যার চাইতে অনেকবেশি ‘বাংলাদেশ’ বইলা একটাকিছুরে আইডেন্টিফাই করার সমস্যা। আর যে কোন ক্রিয়েটিভ জিনিস সংজ্ঞা দিয়া আপনি বইলা দিতে পারবেন না, বরং উদাহারণ দিয়া তৈরি করতে পারতে হবে। যেইরকম, রূপবানরে বাংলাদেশি সিনেমা বলছি আমি, ছুটির ঘণ্টা এবং বেদের মেয়ে জোসনা’রে; এইরকম আরো কিছু সিনেমা আছে যেইগুলারে ‘বাংলাদেশি সিনেমা’ বলা যাবে। আর ফিউচারের বাংলাদেশি সিনেমা অইগুলার রেপ্লিকেট কিছু হবে না, কিন্তু যখন হবে, আপনি দেখবেন কানেক্ট করতে পারতেছেন। এর জন্য সবচে আগে, অডিয়েন্সের কথা ভাবতে পারতে হবে। যদি বাংলাদেশের মানুশরে সিনেমার দর্শক হিসাবে ভাবতে পারেন, তাইলেই বাংলাদেশি সিনেমা বানানোর কাজটা শুরু হইতে পারবে। এইটা হইতেছে, ফার্স্ট পয়েন্ট। আমার ধারণা, সমস্যাটা এই শুরু’র জায়গাটাতেই। শুরু’টাই হইতে পারতেছে না এখনো, ফিউচার তো তার পরের কথাই। 🙁

তো, আমি যেহেতু এই জিনিসগুলারে ফিল করতেছি; আমার ধারণা, সিনেমার লগে রিলেটেড আরো অনেকেই এই ব্যাপারগুলা ফিল করতে পারতেছেন, বা পারবেন; নিজেদের জায়গাগুলা থিকা কাজ করতে পারবেন, এবং আগে যেইরকম কিছু বাংলাদেশি সিনেমা আমরা পাইছি, সেই জায়গাতে একটা ট্রেন্ড শুরু হইতে পারবে, যেইটা দেইখা আমরা বলতে পারবো, আরে, এইটা তো দেখি বাংলাদেশি সিনেমা!

 

৮. ও, বাংলা-সিনেমার গান

এইটা আরেকটা ইম্পর্টেন্ট জিনিস। এইটা নিয়া বরং আলাদা একটা বই লেখা যাইতে পারে, মানে, যারা খেয়াল করতেছেন বাংলা-সিনেমার জায়গাগুলারে, উনারা এইটা করতে পারেন, দরকারি একটা জিনিস হবে সেইটা। অথচ কোন সিনেমার বইয়েই সিনেমার-গান নিয়া কোন আলাপই আমি পাই নাই। (সিনেমার গান নিয়া দুয়েকটা বই অবশ্য আছে)। হোয়াই? এই জিনিসটা কি সিনেমাতে নাই?

মানে, এমন কোন বাংলা-সিনেমা তো রেয়ার যেইখানে কোন গান নাই। একইভাবে বাংলা-সিনেমা নিয়া এমন কোন বইও রেয়ার, যেইখানে সিনেমার গান নিয়া কোন আলাপ আছে।

এমনকি বাংলাদেশে এইরকম ধারণাও আছে যে, ‘ভালো সিনেমা’তে গান থাকতে পারে না। কারণ বিদেশের আর্টফিল্মগুলাতে তো নাই! রূপবান এবং বেদের মেয়ে জোসনা নিয়া এইরকমের ‘ক্রিটিক’ এবং হাসি-ঠাট্টাও চালু ছিল যে, অইটা কি সিনেমা নাকি? ৩৬টা গান দিয়া ভইরা রাখছে!

কিন্তু বাংলা-সিনেমাতে গান সবসময়ই ছিল এবং এইটা খুবই ক্রুশিয়াল একটা ব্যাপার। যারা ‘বাণিজ্যিক সিনেমা’ বানাইছেন, তাদের মধ্যে এইরকম একটা ট্রেন্ডও চালু আছে যে, গান হিট হইলে, সিনেমাও হিট হবে! আগে (৮০’-এ) রেডিও’তে সিনেমা রিলিজ দেয়ার আগে ডায়ালগের লগে গান-ই বাজানো হইতো। [সিনেমার পাবলিসিটির জায়গা নিয়াও লিখবো একটু।] এই কারণে, অনেক সময় অই সময়ের হিট গানগুলারেও সিনেমাতে নিয়া আসা হইতো। যেমন ‘ফোক-সিনেমাগুলাতে’ (খুবই বাজে একটা টার্ম) ‘গ্রাম-বাংলার’ পরিচিত অনেক গান পাইবেন; যেহেতু ‘গ্রামের মানুশের’ লাইগা বানানো সিনেমা, তাদের পছন্দের গানগুলা রাখতেছি। গানের কারণে তো এটলিস্ট দর্শক দেখতে আসবো! এইরকম।

তো, এই জিনিসটাও ঝামেলার। কারণ পাবলিক গান দেখতে আসতো না, এখনো গান দেখতে বসে না, সিনেমাটাই দেখতে চায়। বাংলা-সিনেমার শুরু থিকা এখন পর্যন্ত যেই জায়গাটা মিসিং সেইটা হইতেছে, আমাদের এইখানে গল্প-কাহিনির আগের যেই ফর্মগুলা ছিল (মৈমনসিংহ গীতিকার কথা মনে করতে পারেন) সেইগুলা ছিল লিরিক্যাল। (এখনো ছন্দ-মিলের এবং পয়ারের কবিতাগুলারেই ‘বাংলা-কবিতা’ মনে করা হয়।) এই কারণে ব্যাপারগুলারে ‘ফোক’ ও ‘গ্রাম্য’ মনেহয়। যতো বেশি গদ্য, ছাঁচা-চোলা তত বেশি যেন ‘আধুনিক’ – এইরকম একটা ভুল ধারণার জায়গা থিকা সিনেমার গানরে পারসিভ করার ‘নিয়ম’ চালু ছিল, এবং আছে। বাংলা-সিনেমায় গান রাখা হইছে বা রাখা হয়, কারণ ‘পাবলিক দেখতে চায়’ ‘দুই-চাইরটা গান না থাকলে সিনেমা চলে না’ – এইরকমকিছু জায়গা থিকা। যার ফলে বাংলা-সিনেমার গান সবসময়ই সিনেমার একটা বাইরের জিনিস, একটা আলগা-ভাবের জায়গা, একটা ইরিলিভেন্ট এলিমেন্ট হিসাবে দেখা হইছে।

………………

রূপবান (১৯৬৫) আর বেহুলা (১৯৬৬)

এই দুইটাতে সিনেমাতে গানের ইউজের জায়গাটা দিয়া এইটা বেশ ভালোভাবে টের পাওয়া যাইতে পারে। রূপবানে দেখবেন অই সময়ের এবং এখনকারও অনেক পপুলার ‘ফোক সং’ আছে, যেমন, ‘সাগর কূলের নাইয়া…’ কিন্তু অইটারে কেউ ‘রূপবানের’ গান বইলা চিনে না, বরং ‘শোনো, তাজেল গো…’ বা ‘শোনো দাইমা গো…’ বা ‘মেরো না মেরো না জল্লাদ…’ – এইগুলা হইতেছে রূপবানের গান! যা কাহিনি’টারে মনে করায়, সিনেমার লগে ইন্ট্রিগ্রেটেড একটা ঘটনা হিসাবে এটাচড।

অন্যদিকে, জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ সিনেমাও ‘ফোক-সিনেমা’; অনেক গানও আছে, গানগুলা শুনলে ভালোও লাগবে, কিন্তু কোন গান-ই সিনেমার কাহিনির লগে অইভাবে মিইলা নাই, যেই কারণে ‘বেহুলা সিনেমার গান’ – এইরকম কোন কিছু তৈরি হয় নাই।

রূপবানের গানের এই প্যাটার্ন’টা বেদের মেয়ে জোসনা’তেও দেখছি; আরো অন্য সিনেমাতেও হয়তো আছে। কিন্তু এইটা বেশ ‘গ্রাম্য’ একটা ব্যাপার! 🙁 আর সিনেমা তো ‘আধুনিক’ একটা জিনিস! যার ফলে এই প্যাটার্ন’টা খুববেশি আসে নাই বা রাখা যায় নাই বাংলা-সিনেমাতে। এমনকি ‘সামাজিক সিনেমাগুলাতেও’ অই গানগুলাই সিনেমার গান হয়া উঠছে যেইখানে গান সিনেমার ‘বাইরের জিনিস’ হয়া থাকে নাই।

…………….

তারপরেও, এইরকম ভুল পারসেপশনের পরেও গান আছে বাংলা-সিনেমাতে, বাদ দেয়া যায় নাই। হিস্ট্রিক্যালি দুইটাভাবে বাংলা-সিনেমার গান’রে দেখা যাইতে পারে। একটা হইতেছে এর ইউজের প্যাটার্নের ভিতর দিয়া; আর সেকেন্ড হইতেছে, হিস্ট্রিক্যাল টাইম পিরিয়ডে এর ট্রেন্ডের ভিতর দিয়া।

ইউজের জায়গাতে, ৩টা প্যাটার্ন আমি খেয়াল করছি – ইমোশনাল এক্সপ্রেশন বা ইনটেন্স আবেগের জায়গাটারে কাভার করা; গানের একটা সিন নিয়া আসা এবং ‘বিনোদন’ হিসাবে গানরে রাখা (আইটেম সং-ও এইখানে)। তিনটা প্যাটার্নই মোটামুটি ‘বাহুল্য’; কাহিনি বলতে গেলে এতোটা লাগে না। এই জায়গাগুলাও টাইম টু টাইম চেইঞ্জ হইছে, ধরণ পাল্টাইছে।

ইমোশনাল এক্সপ্রেশন বা ইনটেন্স আবেগের গানগুলা যে এখনো চালু আছে এর সবচে বড় ইন্সপারেশন হইতেছে, হিন্দি-সিনেমা। নায়িকা সিনে ফার্স্ট আসছে, একটা গানের ভিতর দিয়া (বেহুলা সিনেমা’তে আছে); নায়ক সিনে আসলো, একটা গান গাইতে গাইতে; প্রেম হইছে, ও এখন তো বিরহের একটা গান দিতে হবে; ব্রেকাপ হইছে, এখন তো গান দেয়া লাগবে একটা, এইরকম। তো, যেহেতু হিন্দি-সিনেমা’তে আছে, আমরাও রাখতে পারি তো! আর এই কারণে বাংলা-সিনেমার অনেক গানও হইতেছে হিন্দি-সিনেমার গানের নকল। (আর.ডি.বর্মণ এইখানে সুন্দর একটা চালাকি করছিলেন, অনেক পপুলার ইংলিশ-গানের টিউনরে হিন্দি-সিনেমার গানে রিপ্লেস করছিলেন; বাংলাদেশের নকলগুলা অইরকম সুন্দর কিছু হয় নাই। মেবি ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ একটা একসেপশন।) তো, এই যে ইমোশনাল মোমেন্টে একটা গান দিতে হবে – এই প্যাটার্ন’টা এখনো চালু আছে। বা এইটুক জিনিস মাইনা নেয়ার বা টরলারেট করার একটা ব্যাপার আছে মনেহয়।

সেকেন্ড হইতেছে, গান’টারেই একটা সাবজেক্ট কইরা তোলা। যে, একটা গানের অনুষ্ঠান হইতেছে। ওরা ১১ জন সিনেমা’তে আছে, আরো অনেক সিনেমাতেই – জন্মদিনের পার্টি, ঘরোয়া অনুষ্ঠান, বিয়া’র দিন; এইরকম গানের অকেশন বানায়া নিয়া তারপরে গান শুরু কইরা দেয়া। মানে, গান তো আছেই আমাদের লাইফে। কেমনে নিয়া আসা হবে – সেই জায়গাটাতে স্ট্রাগলটা বরং। বা নায়ক বা নায়িকা হইতেছে সিংগার; তো, এইরকম ‘কাহিনির প্রয়োজনে’ গান তো আসতেই পারে! এই মিউজিক্যাল সিনেমাগুলাও কিন্তু হিট হইছে অনেক সময়, যেমন, নয়নের আলো (১৯৮৪)! সেভেনটিইজ-এইটিইজে এইগুলা ছিল, এখন এই জিনিসটা ট্রেন্ড হিসাবে কমে আসছে মনেহয়।…

থার্ড হইতেছে, বিনোদন! 🙂 এইটা শুরু হইছিল মেবি ‘বাঈজী বাড়ি’ দিয়া, তারপরে ভিলেনের হাতে বন্দি নায়িকা হয়া, মাঝখানে কিছুদিন ক্যাবারে ড্যান্স থিকা এখন ‘আইটেম সং’য়ে আইসা ঠেকছে। এই জায়গা’টা, ট্রানজেশন’টা ইন্টারেস্টিং। বাঈজী টু আইটেম গার্ল। এই ‘বিনোদন’ জিনিসটা শুরু থিকা এখন পর্যন্ত ‘নেগেটিভ’ একটা জিনিস; নিউজপেপারে রেইপের নিউজের মতন। বলতেছেন, কারণ সমাজে তো এইরকমের ঘটনা আছে, ঘটতেছে! খারাপ জমিদার’রা কি বাঈজী ভাড়া কইরা নিয়া আসতো না! বাঈজী’রা কি ছিলো না সমাজে! এইরকম একটা মোরাল গ্রাউন্ড থিকা আসে, কিন্তু যিনি বানাইতেছে, দেখতেছেন এবং রিলেটেড পার্টি যারা আছেন, সবাই জানেন যে, এইটা হইতেছে ‘বিনোদন’, সিনেমাতে; রেইপের নিউজে ইরোটিক বর্ণনার মতন। এনজিওদের ফিল-গুড টাইপের ‘প্রতিবাদ’ এর মতন। (‘অশ্লীল সিনেমার’ প্রায় সবগুলাই হইতেছে আবার ‘নারী অধিকার আদায়ের’ বা রিভেঞ্জের কাহিনি।) মানে, শুরু’র দিকে বাঈজী’র গান যে রাখা হইতো, অইটা ছিল একটা ‘সমাজ-বাস্তবতা’; যারে দেখাইতে হবে, গোপন রাখা যাবে না – এইরকম একটা দাবির জায়গা। এই ‘সমাজ-বাস্তবতা’ পরে হয়া উঠে ফ্যান্টাসি; যে ভিলেন হিসাবে আপনি যেহেতু নায়িকারে ‘পাইতে’ পারে না, তারে হিউমিলিয়েট করতেছে; নায়িকাও করতেছে কারণ তার নিজেরে বাঁচাইতে হবে, নায়করে বাঁচাইতে হবে, এইরকম। কিন্তু অইটা আর ‘সমাজ-বাস্তবতা’ না, ফ্যান্টাসির ঘটনা ভিলেনের, দর্শক হিসাবে আপনি দেখতেছেন। দ্যান দেখা গেলো যে, নায়িকারে দিয়া এই কাজ করাইলেও মান-ইজ্জত থাকে না, এতোটা ওপেনও হওয়া যায় না, তখন আইটেম সং চইলা আসলো। কিন্তু নায়িকারে টক্কর দেয়া লাগে মাঝে-মধ্যে আইটেম গার্লদের লগে ফ্যান্টাসির জায়গাটাতে। মানে, সমাজ-বাস্তবতা > ফ্যান্টাসির এক্সপেক্টশন > পিওর ফ্যান্টাসি – এইরকম একটা রাস্তা আছে, এইখানে। (মানে, সমাজে সমাজ-বাস্তব যেইভাবে তৈরি হয়, তার অপজিট একটা ঘটনাই।…) আর ভিলেনের এই ‘বিনোদন’টাও এখন ‘দর্শকদের’ বিনোদন হিসাবেও এস্টাবলিশড হইতে পারছে। তো, এই ট্রান্সফর্মেশনটা মিন করে না যে, সিনেমার গানে নারীদের রিপ্রেজেন্টশন আরো বাজে হইছে, বরং দেখতে দেখতে ‘মাইনা নেয়ার’ একটা জায়গাতে চইলা আসছে যে, সিনেমা’তে এইসব লাগে! 🙁 তো, এইটা একটা স্যাড ঘটনাই যে, এইভাবে সিনেমার গান’রে ভিলিফাই করার, বাতিল করার আরেকটা রাস্তা তৈরি হইছে।…

আরো প্যাটার্ন এইখানে থাকতে পারে, আমি মোটাদাগে তিনটার কথা বললাম।

আর গানের রকম বা জনরা হিসাবেও তিন ধরনের ট্রেন্ড ছিল বা আছে মনেহয় – ফোক সং ও পুরান পপুলার গান, মিডল-ক্লাসের সংগীত এবং পপ সং, ব্যান্ডের গান (খুব অল্প হইলেও)। ফোক সং এবং পুরান পপুলার গানগুলা যে খালি ‘ফোক সিনেমা’তেই ইউজ হইছে – তা না, অনেক সিনেমাতে তৈরিও হইছে। তবে ‘ফোক-ঘরনার’ গানগুলাই বাংলা-সিনেমা থিকা পপুলার হইছে। “ওরে নীল দরিয়া…” “হায়রে মানুশ রঙিন ফানুশ…” বাংলা-সিনেমার গান কিন্তু যেহেতু ল্যাঙ্গুয়েজের জায়গা থিকা ‘প্রমিত’ বা কালচারাল মিডল-ক্লাসের ‘শুদ্ধ উচ্চারণ’রে ফলো করে না, এইগুলারে ‘ফোক’ কয় অনেকে। অথচ এইটাই সবচে স্ট্রংগেস্ট ধারা বা জনরা, বাংলা-সিনেমার গানে।

 

সেকেন্ড হইতেছে, মিডল-ক্লাসের সংগীত; মেইনলি, ‘শহুরে’ ব্যাপার, যেমন ধরেন, “পিচ-ঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি…” “ফুলের কানে ভ্রমর এসে চুপি চুপি বলে যায়…” “আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো গন্ধ বিলাতে চাই…” এইরকম হাজার হাজার না হইলেও শ’য়ে শ’য়ে গান আছে, যেইগুলা মানুশের মনে আছে বাংলা-সিনেমার গান হিসাবে। কালচারাল মিডল-ক্লাস, যারা বাংলা-সিনেমারে হেইট করেন, তারাও এই গানগুলারে দেখবেন নিতে রাজি আছেন। কোরিওগ্রাফি হয় নাই ঠিকমতো, কিন্তু গানগুলা চলে, সিনেমার গান না হইলেও চলতো 🙂 এইরকম!

 

তবে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হইতেছে, রবীন্দ্র-সংগীত এবং নজরুল গীতি মোটামুটি এভয়েড-ই করা হইছে বাংলা-সিনেমাতে। (একদম নাই যে, তা না; কিন্তু বাংলাদেশি সিনেমার গানের কোন সিগনেচার হয়া উঠতে পারে নাই।) যেইটা খুবই ভালো একটা জিনিস।

থার্ড জিনিস হইলো, সিনেমার বাইরেও এইটিইসে যখন পপ সং এবং ব্যান্ড-মিউজিক শুরু হইলো বাংলাদেশে; তখন অই গানগুলারেও স্পেইস দেয়া হইছে, সিনেমাতে। ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা…’ দিয়া মেবি শুরু ‘ঘুড্ডি’তে। কুমার বিশ্বজিৎ তো অনেকদিন রেগুলারই ছিলেন। ফিডব্যাকের গানও ইউজ হইছে সিনেমাতে। জেমসও অনেকগুলা গান গাইছেন। [আসবার কালে আসলাম একা, ‘মনের সাথে যুদ্ধ’ (মান্না, পূর্ণিমা, ২০০৭); তোর প্রেমে; ‘সত্তা (শাকিব খান, পাওলি দাম ২০১৭), এই দুইটার কথা মনে হইলো।]

তবে এর বাইরেও মিউজিক-ডিরেক্টরদের নিজের মতো কইরা এই পপ-জিনিসগুলারে বাংলা-সিনেমা’তে আলাদাভাবে একটা ফিউশন তৈরি করার একটা ব্যাপার ছিল আলাউদ্দিন আলী এবং আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মধ্যে।

আর এই জনরা’গুলা যে সবসময় আলাদা আলাদা ছিল – তা না, বরং বাংলা-সিনেমার যেই পপ সং সেইগুলা ছিল অনেক সময় ‘সুফি পপ’ টাইপের ঘটনা। যেইটারে ‘ফোক সং’ বা ‘গ্রামের গান’ বলা হইতেছে সেইটা দেখা যাইতেছে কালচারাল মিডিল-ক্লাসের লগে মিশতে চাইতেছে; যেমন, ফেরদৌস ওয়াহিদের একটা গান আছে “আমার প্রেমের তরী বইয়া চলে…”; অইটা তিনটা জনরা’রেই মোটামুটি টাচ কইরা যায়।

 

তো, ব্রিফলি বলা এই জিনিসগুলা একটা ডিটেইল আলাপের জায়গা হয়া উঠতে পারে আসলে।

সিঙ্গারদের কথাতে যদি আসেন, সাবিনা ইয়াসমীন তো সিনেমার গান গাইয়াই পপুলার হইছেন। রুনা লায়লাও সিনেমার গানে ছড়াইতে পারছেন বেশি, পাবলিকের কাছে। শাহনাজ রহমতুল্লাহ, সামিনা চৌধুরী, বেবি নাজনীনদের পাশপাশি উনারা দুইজনই ছিলেন এবং আছেন বাংলা-সিনেমার গানের স্টার, মমতাজ আইসা মার্কেট দখল করার আগ পর্যন্ত, এমনকি, তার পরেও। ন্যান্সিও হিট ছিলেন একটা সময়।… আবদুল জব্বার, বশির আহমেদ, সৈয়দ আবদুল হাদী, সুবীর নন্দী, খুরশিদ আলম একটা সময় অনেক পপুলার এবং সুন্দর গানগুলা গাইছেন। পরে এন্ড্রু কিশোর বাংলা-সিনেমার গানের অনেকদিনের রাজা ছিলেন। খালিদ হাসান মিলু, আগুন, হাবিবও হিট হইছিলেন। (আরো কিছু নাম অ্যাড করতে হবে এইখানে।)

 

তো, এমন একটা সময় ছিল, বাংলাদেশে যারা সিঙ্গার, তারা বাংলা-সিনেমা গান গাইয়াই সিঙ্গার হইছেন, বা বাংলাদেশের এমন কোন সিঙ্গার নাই যারা বাংলা-সিনেমা গান গাওয়াটারে একটা বাজে কাজ বইলা ভাবছেন। মিউজিক ইন্ডাষ্ট্রি ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রির লগে ক্লোজলি কানেক্টেড একটা ঘটনাই ছিল।

কিন্তু খান আতাউর রহমান, সত্য সাহা, আমজাদ হোসেন, আলাউদ্দিন আলী, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল এইরকম মিউজিশিয়ানরা, মানুশগুলা বাংলা-সিনেমার গান বইলা একটা জায়গারে তৈরি করছেন বইলা আমি মনে করি। আর উনাদের কন্ট্রিবিউশনরে যে রিকগনাইজ করা হয় নাই – এইটা কোন ভুল না, এইটা বাংলা-সিনেমা বইলা কোন জায়গারে আইডেন্টিফাই না করতে পারার লগে খুবই রিলেটেড একটা ঘটনা।

গ্রসলি, আমি এই কথাটাই বলতে চাই যে, বাংলা-সিনেমার গান বাংলা-সিনেমার জায়গাটাতে যত কন্ট্রিবিউট করছে, তার চাইতে বেশি করতে পারতো আসলে। গান জিনিসটারে সিনেমার বাইরের ব্যাপার বইলা ভাবার কারণে এইটা হইতে পারে নাই। আর এই নিয়া কোন আলাপ যে নাই, সেইটা এই জিনিসটারে আরো মার্জিনালাইজ করার একটা ঘটনাই।

৯. পোস্টার, প্রচারণা, ডিস্ট্রিবিউশন… 

বই যেমন বুক-কাভার ছাড়া হয় না, এইরকম সিনেমার জন্য পোস্টার মাস্ট। দুনিয়াতে মেবি এমন কোন সিনেমা রিলিজ হয় নাই, যার কোন পোস্টার নাই। সিনেমার পোস্টার হইতেছে সিনেমার ফেইসটা। ট্রেইলার হইতেছে আসলে ব্যাকপেইজটা। 

“সিনেমার পোস্টার” নামে একটা বই আছে, সেইখানে অনেকগুলা বাংলা সিনেমার পোস্টার আছে। অইগুলা দেখলেও টের পাওয়া যায়, পোস্টারের জায়গাটা কেমনে পাল্টাইছে। শুরুর দিকে জিনিসটা ছিল  পেইন্টিং – নায়ক-নায়িকার আঁকা ছবি, তারপরে অইখানে ক্যামেরায় তোলা ছবি আসছে। ১৯৪৭’র আগে কলকাতাতে যেইসব ছবি হইছে, সেইখানে এইসব থাকতো না, খালি নাম-ধাম থাকতো। বাংলাদেশেও দুই ধরণের পোস্টারই ছিল, একটা ছিল ছবিসহ – মেইন পোস্টার, আরেকটা হইতেছে খালি নাম-টাম দিয়া – কমন পোস্টার। পেইন্টিংয়ের পোস্টারে নায়ক, নায়িকা ও ভিলেন – এই তিনটা কারেক্টারই হাইলাইট হইতো। যখন ছবি-প্রিন্টিং শুরু হইলো তখন, আরো ছোটখাট কিছু কারেক্টারের মাথাও দেখা যাইতো। পেইন্টিং ও প্রিন্ট-ছবি দুইটাই একইসাথে চলছে সত্তর আর আশি’র দশকে। ‘৯০-এর পর থিকা বা এর আগেই পেইন্টিং-করা সিনেমার পোস্টার ছাপানোর ঘটনা বাতিল হয়া গেছে মনেহয়।

কিন্তু পেইন্টিং হোক বা ফটো, বাংলাদেশের সিনেমার পোস্টারে ভ্যারিয়েশন কমই। কমন একটা কয়েকটা ফরম্যাটই ছিল সবসময়। নায়ক-নায়িকা বা মেইন কারেক্টারগুলারে হাইলাইট করা, দুয়েকটা সাইড-কারেক্টারের ছবি রাখা, এইরকম। ডিফরেন্সের জায়গা’টা হইতেছে ইমোশন। কোনটা দুঃখের ছবি, কোনটা নাচ-গানের, সেইটা পোস্টার দেইখাই যাতে দর্শক আন্দাজ করতে পারে – এইরকম ডিমান্ড মেবি থাকতো ডিরেক্টের, ডিস্ট্রিবিউটর, হলমালিকদের। মানে, যারাই সিনেমার পোস্টার ডিজাইন করতেন বা করেন, উনারা নিজেদের ক্রিয়েটিভিটির জায়গারে খুব বেশি ইউজ করার চান্স পাইছেন বা করতে চাইছেন – এইরকম আমরা জানি না। যেহেতু সিনেমা বানানো টাকা-পয়সার একটা ঘটনা, এইখানে অনেক আর্টিস্টরাই আসতে পারতেন, কিন্তু কোন আর্টিস্টরা আমরা চিনি না যাদের কাজকামরে আলাদা কইরা লোকেট করা যাইতে পারে। কেন সেইটা হইতে পারে নাই – এইটা একটা ইনকোয়ারির ঘটনা হইতে পারে।  

দুয়েকটা একসপেশন যে নাই – তা না; অনন্ত প্রেম সিনেমার পোস্টার’টা খুবই পপ টাইপের একটা ব্যাপার ছিল। কাজী হায়াত উনার খোকন সোনা সিনেমার পোস্টার অই সময়ের দেয়ালে টানানো আজাদ প্রডাক্টসের যেইসব ছবি পাওয়া যাইতো, সেইগুলার একটা দিয়া করছিলেন। আমজাদ হোসেনের ভাত দে, গোলাপী এখন ট্রেনেের পোস্টারও রিমার্কেবল। এইরকম কিছু কিছু এক্সপেরিমেন্টের ঘটনা আছে। কিন্তু খুববেশি ভ্যারিয়েশন আমরা পাই নাই।

ভাত দে (১৯৮৪) সিনেমার পোস্টার

 

খোকন সোনা (১৯৮২) সিনেমার পোস্টার

 

এর কারণ মেবি পোস্টার’রে একটা আর্ট-ওয়ার্ক হিসাবে কন্সিডার করা হয় নাই। মানে, একটা কর্মাশিয়াল কাজ যে আর্ট-ওয়ার্ক হইতে পারে এই চিন্তাটা ডিরেক্টর এবং আর্টিস্টদের ভিতরে ছিল বইলা মনেহয় না। যার ফলে কিছু প্রটো-টাইপই আমরা বারবার পাইছি এবং পাইতেছি। অথচ একটা সময়ে গান দিয়া যেমন সিনেমা হিট হবে কিনা বুঝা যাইতো, এইরকম পোস্টার দিয়াও একটা সিনেমার জায়গারে আলাদা করার, প্রচারণা চালানোটাও মনেহয় কিছুদূর পর্যন্ত সম্ভব হইতে পারতো।


তো, সিনেমার প্রচার-প্রচারণার একটা টুল ছিল হইতেছে এই পোস্টার। এইটিইসের দিকে লিফলেটও ছাপানো হইতো। মফস্বলে এবং ঢাকা শহরেও হয়তো ব্যান্ড পার্টি দিয়া, রিকশা মাইকিং দিয়া নতুন সিনেমা যে রিলিজ হইতেছে, সিনেমাহলে আসতেছে সেইটা জানানো হইতো। রেডিও টিইকাই ছিল সিনেমার গান ও ট্রেইলার দিয়া। সিনেমা নিয়া ডেডিকেটেড পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকাও ছিল কয়েকটা। পরে যেইগুলা বিনোদন পত্রিকা হিসাবে টিভি-নাটকরে হাইলাইট করতে গিয়া নিজেরাও বন্ধ হইতে পারছে। এখন এই মিডিয়ামগুলা আর খুব একটা কাজ করে না। ইন ফ্যাক্ট, সিনেমাহলগুলাই তো নাই খুব একটা।

সিনেমাহলের বাইরে নতুন যেইসব প্লাটফর্ম ও ডিভাইসগুলাতে মানুশজন সিনেমা দেখতেছে, সেইসব জায়গা বাংলাদেশি সিনেমা নিয়া প্রচার-প্রচারণা, আলাপ-আলোচনা অইভাবে আসতে পারতেছে না। নতুন সিনেমা অইভাবে বানানো হইতেছে না, তার বাইরেও অডিয়েন্স হিসাবে সিনেমার দর্শক আসলে সিনেমা হলে – এই জায়গাটা থিকা বাইর না হইতে পারাটাও মনেহয় একটা কারণ। মেইনস্ট্রিম মিডিয়াতে হলিউড-বলিউড, ইভেন কলকাতার আর্টিস্টদেরকে নিয়া যেই মাতামাতি আছে সেই তুলনায় বাংলাদেশি সিনেমার লোকজনরে নিয়া ট্রল করাটাই নিয়ম। এইটা যেমন বাংলাদেশি সিনেমার জন্য ভালো হয় নাই, মিডিয়ার জন্য ভালো হয় নাই। মানে, একজন সিনেমার স্টার যেহেতু নাই, এই না-থাকাটা মিডিয়ার নিউজ-কাটতি’র কথা ভাবলেও নেগেটিভই হইছে। 

এখন ডিম আগে না মুর্গি আগে, সেইটা নিয়া কথা হইতেই পারে যে, আগে “ভালো” সিনেমা তৈরি হবে, তারপরে মিডিয়া কাভারেজের জায়গাগুলা হবে নাকি মিডিয়া-কাভারেজের জায়গাগুলা তৈরি হইতেছে না বইলা অইভাবে “ভালো” সিনেমা আমরা রিকগনাইজ করতে পারতেছি না; তার চাইতে বড় কথা হইতেছে, দুইটা জিনিস খুবই ইন্ট্রিগ্রেটেড ঘটনা। একটা আরেকটার কাজে লাগতে পারে। কিন্তু ভালো সিনেমা বানানো আর সিনেমার ভালো মার্কেটিং করা, প্রমোশন বানানো – দুইটা দুই ঘটনা।

আমার সন্দেহ এইটাও যে, এই জায়গাগুলাতে খুববেশি নজর দেয়া হয় নাই, খেয়াল করা হয় নাই। যার ফলে এই ইন্টার-রিলেশনের জায়গাগুলা এখনো অনেকবেশি দূরের ঘটনা হয়া আছে। সিনেমারে রিলিভেন্ট রাখতে হইলে, এই জায়গাগুলারে খেয়াল করতে পারাটাও জরুরি।

৩.
যেই জিনিস খুব খোলাখুলিভাবে বলা হয় না, সেইটা হইতেছে বাংলাদেশি সিনেমার ডিস্ট্রিবিউশনের জায়গা’টা। বাংলাদেশে সিনেমা বানানোর আগেও শুরু হইছে সিনেমার ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবসা। একজন ডিরেক্টর বা প্রডিউসার সরাসরি তার সিনেমা সিনেমাহল মালিকদের কাছে বেচতে পারেন না, তারে ডিস্ট্রিবিউটদের মাধ্যমে যাইতে হয়। এই ডিস্ট্রিবিউটর’রা সিনেমা হিট হওয়া, মাইর খাওয়ানো, কোনটারে জোর কইরা চালানোর, কোনটারে ডিমান্ড থাকার পরে না ছাড়ার মতন পাওয়ার এক্সারসাইজ করছেন। এমনকি বাংলা-সিনেমার যেই “অশ্লীল যুগ” সেইটা মোস্টলি সিনেমার ডিস্ট্রিবিউটর এবং হলমালিকদেরই একটা ঘটনা ছিল বইলা আমার ধারণা। উনারা মনে করতেন, কোন সিনেমা বেশি চলে, কেন চলে, এই জিনিসগুলা উনারা জানেন এবং সেই জানার জায়গা থিকা হিট সিনেমা বানাইতে গেছিলেন। কিন্তু কালচারাল কনজামশনের ঘটনাগুলা এইরকম স্ট্রেইট-কাট কোন ঘটনা না।… 

তো, বাংলাদেশি সিনেমার ডিস্ট্রিবিউশন নিয়া তেমন কোন লেখা-পত্র আমি পাই নাই। কিন্তু কিভাবে উনারা বাংলাদেশি সিনেমার জায়গাটারে ইনফ্লুয়েন্স করছেন, সেইটা খেয়াল করতে পারাটারে একটা দরকারি ঘটনা বইলা আমি মনে করি। এখন যেহেতু সিনেমাহলই নাই তেমন ডিস্ট্রিবিউশন বিজনেসের পাওয়ারও কইমা আসার কথা। 

কিন্তু সেইম লেভেলের পাওয়ার-প্লে করার কথা অনলাইন প্লাটফর্মগুলার। উনারা ডিকটেড করতে পারার কথা ডিরেক্টদেরকে যে কি ধরণের সিনেমা বানাইতে হবে। 🙂 তো, এইটা কখনোই পজিটিভ জিনিস না, সিনেমার লাইগা। পাবলিক একটা ফর্মূলার জিনিসই খাইতে থাকে না, বরং ক্রিয়েটিভ জায়গা থিকা যদি নতুন কিছু না থাকে, সেইটারে পছন্দ করার কথা না। আর সেইটা যাচাই করা, সিনেমার ডিস্ট্রিবিউটর বা স্ট্রিমিং প্লাটফর্মগুলার কাজ হয়া উঠলে, সেইটা একইরকমের ঝামেলা তৈরি করার কথা। এবং আমার ধারণা, করতেছেও। এই সিনেমার ডিস্ট্রিবিউশনের সাথে রিলেটেড একটা সমস্যা। সিনেমা অবশ্যই একটা এন্টারটেইনমেন্ট ম্যাটেরিয়াল, কিন্তু একই সাথে একটা আর্টও। এই দুইটারে জিনিসরে মিলানোটা ডিরেক্টরের কাজ, সিনেমার ডিস্ট্রিবিউটর বা প্লাটফর্ম ওনারদের না। এই জায়গায় একটা লাইন না টানতে পারলে সিনেমা ইটসেলফ একটা ডেড ঘটনা হয়া উঠতে পারে, দিন কে দিন।  

এই কারণে, এই জায়গাটা নিয়া আলাপ-আলোচনা করতে পারাটা দরকারি একটা ঘটনা, যেইটা ভিতরে ভিতরে হয়তো অনেকেই ভাবতেছেন, ফিল করতেছেন, সাফার করতেছেন। কিন্তু যতোক্ষণটা এই জায়গাটারে আইডেন্টিফাই করা যাইতেছে যে, মিডিয়ামটাই ইটসেলফ কন্ট্রোল করা শুরু করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এর মোকাবেলা করার রাস্তাগুলাও তৈরি হইতে পারবে বইলা মনেহয় না। তো, এইটা সিনেমার সাথে রিলিভেন্ট একটা পার্টই।

মানে, সিনেমা নিয়া টোটাল একটা আলাপ করতে গেলে ডিস্ট্রিবিউশনরে বাদ রাইখা গেলে আলাপ’টা পুরা হবে না।

………….

তো, শুরুতে যেইরকম বলছিলাম, শেষেও বলি, অনেক ইনফরমেশন না থাকার কারণে, অনেক ডিসিশান আমি নিতে পারি নাই, অনেক কিছু অনুমানের উপরে বলতে হইছে। আমি আমার জানা-বুঝার উপর বেইজ কইরা বাংলাদেশি সিনেমার একটা স্কেচ আঁকতে চাইছি, যেইটা কমপ্লিট একটা পিকচার না হইলেও কয়েকটা লাইনরে দেখাইতে পারছে যে, বাংলাদেশি সিনেমার জায়গাগুলারে কেমন দেখা যাইতে পারে। আমি শিওর দেখার এই জায়গাগুলা বদলাবে। কিন্তু এই জায়গাগুলাতে কনশাস হইতে পারাটা সিনেমার জন্য ভালো একটা ঘটনাই হইতে পারবে। এইরকম একটা আশা আমার আছে আর কি।

 

THE END

আগের/পরের পর্ব<< অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ বাংলাদেশি সিনেমা (৫)
The following two tabs change content below.
কবি, গল্প-লেখক, ক্রিটিক এবং অনুবাদক। জন্ম, ঊনিশো পচাত্তরে। থাকেন ঢাকায়, বাংলাদেশে।
[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য