Main menu

বাকের কাছে আমার যা চাওয়া ছিল

 

ড্রাগন সিডঃ

১৯৩৭ সালের ডিসেম্বর মাসে জাপানী সেনারা পঙ্গপালের মত প্রবেশ করে চীনের প্রাচীন নগরী নানকিং-এ। জাপানী সেনারা মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লুট করে, জ্বালিয়ে, পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়নি কেবল, প্রণলীবদ্ধভাবে নির্যাতন, ধর্ষণ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে চায়নার বেসামরিক অসহায় নাগরিকদের উপর। এই ঐতিহাসিক পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে পার্ল এস বাকের অন্যতম জনপ্রিয় উপন্যাস “ড্রাগন সিড”। “ড্রাগন সিড” নানকিং নগরীর বাইরের একটি গ্রামের সচ্ছল চাষী পরিবারের গল্প। যুদ্ধের দীর্ঘ বছরগুলোতে নগর জীবনের জটিলতা বিবর্জিত গ্রামীণ জীবন কিভাবে আমূল পালটে যায় তার নিবিড় বর্ণনা “ড্রাগন সিড”। নিরক্ষর চাষী লিং তান, স্ত্রী লিং সাও, তিন পুত্র, পুত্র বধূ, দুই কন্যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় ঘটনা। জামাতা উ লিয়েন নানকিং নগরের সচ্ছল ব্যাবসায়ী। যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে বিদেশী পণ্য রাখার দোষে ছাত্ররা তার দোকান ধ্বংস করে। প্রিয় নগরী নানকিং লাশের শহরে পরিনত হোলেও সে তার ব্যবসা চালিয়ে যাবার জন্য বদ্ধ পরিকর থাকে। এই মহৎ সিদ্ধান্তে সে মনে মনে নিজেকে সেই ছাত্রদের চাইতেও বড় দেশ প্রেমিক ভেবে আত্নপ্রসাদ লাভ করে। উ লিয়েনের শ্বশুর বাড়ির লোকেরা অর্থাৎ লিং তানের পরিবার গোপনে গ্রাম বাসীকে নিয়ে জাপানী সেনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে থাকে। উ লিয়েনের বৃদ্ধ ধর্ষিতা মায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন লিং তানের পরিবার। মায়ের ধর্ষণের খবর তার অজানা থাকে কিন্তু কৃতজ্ঞতাবশত উ লিয়েন তাঁদের খবর জাপানী সেনা শাসকদের কাছে গোপন রাখে। গল্পের অন্যতম শক্তিশালী চরিত্র জেড, আরেকটি উজ্জ্বল চরিত্র মেজ পুত্র লাও অরের স্ত্রী সে। নারী চরিত্র হিসেবে তার সৌন্দর্যের গুণে সে অসাধারণ নয়, সে অনন্য তার আকাঙ্খায়, মননে এবং প্রজ্ঞায়। গ্রামে ছাত্ররা জাপানী সেনাদের উদরপূর্তি না করে মাঠের ফসল জ্বালিয়ে দিতে বললে গ্রামবাসীর মধ্যে সবার আগে এগিয়ে আসে জেড। কোন মেয়েলী আত্নরতিতে আক্রান্ত না হয়ে সে তার মাথার লম্বা কাল চুল কেটে ফেলতে পারে একটা বই কেনার আশায়। মুক্তাঞ্চলে গিয়ে সে যুদ্ধবিদ্যায় প্রশিক্ষণ নিতে চায়, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়। বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও সে স্বামী লাও অরের কাছে থাকে আপাদমস্তক রহস্য। তার উপস্থিতি দিয়ে সে যেন পাঠককে জানান দিতে চায় শরীরের ভেতরে তার একটা মন, একটা সচল মস্তিষ্ক আছে এবং তা বিয়ের সাথে উপরি হিসেবে পাওয়া যায় না, অর্জন করতে হয়। যুদ্ধের প্রাথমিক ভয়াবহতা কেটে যাবার পর লিং তানের পরিবার গোপনে জাপানী সেনাদের প্রতিরোধ করতে সংকল্পবদ্ধ হয়। তিন ছেলে পাহাড়ে আত্নগোপন করে, প্রশিক্ষিত হয়। তারা ফাঁদ পাতে, শত্রুর উদরপূর্তিতে যেন গবাদি পশু, পুকুরের মাছ, মাঠের ফসল না যায় তার জন্য তারা সেগুলো মেরে ফেলে, প্রয়োজন মত বিষ মেশায়। নিজের বাড়িতে গোপন কুঠুরি গড়ে তুলে নারী, শিশু ও অস্ত্র লুকিয়ে রাখে।

প্রয়োজন মত ছদ্মবেশ নিয়ে শহরে যায়, খবর সংগ্রহ করে আবার ফিরেও আসে। নারীরাও শেখে শত্রুর চোখকে ফাঁকি দিতে। সাধারণ চাষী পরিবারের তিন ছেলে পরিণত হয় দক্ষ গেরিলা যোদ্ধায়। কিন্তু এত করেও শেষ কূল রক্ষা হয় না। যুদ্ধের দীর্ঘ পাঁচটি বছর বদলে দেয় সবাইকে। অসম্ভব আশাবাদী লিং তান অন্তরাত্মায় একজন খাঁটি সৃষ্টিশীল কৃষক। মায়ের মত মমতায়, আশাবাদ নিয়ে সে মাঠে ফসল ফলায়। তার কাছে তার পুত্রত্রয় তার নিজের প্রতচ্ছবি। তাই সে যখন দেখে তার ছেলেরা নির্বিকার চিত্তে মানুষ খুন করতে পারছে সে আমূল কেঁপে ওঠে। বোধয় সে তাঁদের আর খুনি জাপানী সেনাদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না। আন্তর্জাতিক সেফটি জোন থেকে ফিরে আসে স্ত্রী লিং সাও। বড় ছেলে প্রথম স্ত্রীর শোক ভুলে আরেক অসহায় নারীকে স্ত্রী হিসেবে পান, ছোট মেয়ে পানসিয়ান মিশনারি স্কুলে নিরাপদে, জেড জন্ম দিতে যাচ্ছে ২য় সন্তান, জাপানী সেনার দ্বারা ধর্ষিত কিশোর পুত্র লাও সান তরুন যুদ্ধবাজ বিদ্রোহী নেতায় পরিনত হয়েছে। আবার ভরে ওঠে লিং তানের পরিবার কিন্তু তবুও হতাশায় আক্রান্ত হন তিনি। মাটির মায়া, পরিবার, পুত্র, কন্যার মায়া কিছুই আর তার মনে আশার সঞ্চার করতে পারে না। বুদ্ধিমান পুত্র লাও অর তাকে মিথ্যা আশা দিতে চান না। তার বাস্তব জ্ঞান দিয়ে সে বোঝে চায়নার হতভাগ্য মানুষের সম্বল তারা নিজেরাই। কোন আন্তর্জাতিক মহলই তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসবেনা। ছদ্মবেশে পিতা পুত্র নানকিং নগরে খবর আনতে গেলে আন্তর্জাতিক সাহায্যের গুজব শুনে লিং তান অনাবশ্যক খুশি হয়ে উঠলে লাও অর তার ভুল ভাঙ্গায় না। সে বোঝে যুদ্ধের এই ভয়াবহ বছরগুলোতে তার বৃদ্ধ পিতাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে কেবল আশা।

 

বইয়ের কাভার

বইয়ের কাভার

 

আইরিশ চ্যাঙ এর বর্ণনা অনুযায়ী নানকিং-এ যা ঘটেছিল:

আইরিশ চ্যাঙ এর নানকিং হত্যাযজ্ঞের উপর লিখিত গবেষণা ধর্মী বই “দি রেপ অব নানকিং” এ বলেছেন শুধুমাত্র নিহতদের সংখ্যা ব্যাবহার করলে দি রেপ অব নানকিং অবশ্যই ছাপিয়ে যাবে যুগে যুগে ইতিহাসে যেসব বর্বরতম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তাদের অনেকগুলিকে। জাপানীরা হাসতে-খেলতে পেরিয়ে গিয়েছিল কার্থেজ নগরীতে রোমানদের কৃত রেকর্ডকে, যেখানে খুন হয়েছিল ১৫০,০০০ কার্থেজ বাসী, স্প্যানীশ ইনক্যুইজিশনের কালে খ্রীস্টান বাহিনীর হাতে, এবং এমনকি তৈমুর লং-এর পৈশাচিকতা যা সংঘটিত করেছিল ভারতের রাজধানী দিল্লী নগরীতে ১৩৯৮ সালে, যেখানে সে নির্বিচারে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল ১০০,০০০ বন্দীকে, কিংবা সিরিয়ায় যে দুটি সুউচ্চ স্তম্ভ সে তৈরী করেছিল মানুষের মাথার খুলি দিয়ে ১৪০০ ও ১৪০১ সালে- এগুলোর সবকটিকে পিছনে ফেলেছে জাপানীদের নানকিং হত্যাযজ্ঞ। সুজান ব্রাউনমিলার, যিনি Against Our Will Men, Women and Rape গ্রন্থের লেখিকা তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, দি রেপ অফ নানকিং ছিল যুদ্ধকালীন ধর্ষণ কাণ্ডের সম্ভবত একক জঘন্য দৃষ্টান্ত, যা চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল বেসামরিক জনগণের উপর, এবং যেটির একমাত্র ব্যতিক্রম হলো বাঙ্গালি-নারীদের সঙ্গে পাকিস্তানী সৈনিকরা যেসব অপকর্ম করেছিল ১৯৭১ সালে, সেইটা। নানকিং নগরীতে তখন ধর্ষিত হওয়াটা ছিল খুবি সহজ। ধনী গরীব ও বয়স নির্বিশেষে সকল নানকিং নারীকেই জাপানীরা ধর্ষণ করেছে। চাষী বৌ, ছাত্র, শিক্ষক, বাবু ও শ্রমিক শ্রেণী পেশার নারী, YMCAর কর্মচারীদের বউ-মেয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের পরিবারভুক্ত নারী, এমনকি বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনীও রেহাই পানি, যাদের অনেকেই গণধর্ষণ ও খুনের শিকারও হয়েছে। বৃদ্ধ বয়স নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা ছিল না জাপানীদের। হাসপাতালের প্রবীণা মেট্রন, দাদী, দাদীর-মা, এমন বর্গের মহিলারাও ধর্ষণের শিকার হয়েছে বারবার। বৃদ্ধা নারীদের সাথে জাপানীরা যে ধরনের আচরন করেছে সেটা যদি শোচনীয়ভাবে ভয়ঙ্কর হয় তাহলে বালিকা বা কিশোরী মেয়েদের সঙ্গে তাঁদের আচরন ছিল অচিন্তনীয়ভাবে ভয়ঙ্কর। ছোট ছোট বালিকাদের এমন নিষ্ঠুরতার সঙ্গে ধর্ষণ করা হয়েছে যে, তাঁদের অনেকেই পরবর্তীতে হাঁটতে পারেনি সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে। অনেককে সার্জিক্যাল চিকিৎসা দিতে হয়েছিল, তাঁদের অনেকের মৃত্যুও ঘটেছে। চীনা প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীরা বলেছে, জাপানী সেনারা রাস্তায় ফেলে ধর্ষণ করেছে দশ বছরেরও কম বয়েসী বালিকাদের, এবং তারপর তাদেরকে দুটুকরো করে ফেলেছে তরবারির এক কোপে। কিছু কিছু ঘটনায় দেখা গেছে জাপানীরা বহু বালিকার যোনিপথ আরও চিরে ফাঁক করে নিয়েছিল যাতে করে তাদের ধর্ষণ অধিকতর কার্যকরভাবে সম্পাদিত হয়। অন্যান্য মেয়েরা সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় বাঁধা ছিল চেয়রে, বিছানায় অথবা খুঁটির সঙ্গে দুপা ফাঁক করে এমন যৌন আসন ভঙ্গিমায় যথাস্থানে নিবদ্ধ অবস্থায় যেন ধর্ষণ সম্পাদন করা সহজ ও আরামদায়ক হয়। এদের অনেকেই এত নির্যাতন সহ্য করেবেঁচে থাকতে পারেনি। প্রত্যক্ষদর্শী চীনা সাক্ষীরা এগারো বছর বয়েসী এক চীনা বালিকার দেহের বর্ণনা দিয়ে বলেছেন যে, ঐ মেয়েটি শেষ পর্যন্ত মারা গিয়েছিল তাকে একটানা ভাবে দুদিন ধর্ষণ করার ফলে।ঐ সাক্ষীরা বলছেন, “বালিকাটির দুপায়ের মাঝখানটা ছিল রক্তজমাট বাঁধা, ফোলা ফোলা ও ফাটিয়ে ফেলা অবস্থায় যা এমন একটি ভয়ঙ্কর বীভৎস ঘৃণ্য দৃশ্যের সৃষ্টি করেছিল যার দিকে সরাসরি দৃষ্টিপাত করা ছিল যে কোন ব্যক্তির পক্ষে অত্যন্ত কঠিন।” জাপানী সৈনিকদের আমোদ প্রমোদের সম্ভবত সবচেয়ে বর্বর পদ্ধতি ছিল মেয়েদের যোনিতে বর্শা বিদ্ধ করা। নানকিংএর রাস্তায় রাস্তায় যেসব নারীর মৃত দেহ পড়ে থকতো তাদের পা দুটো থাকতো ফাঁক করে ছড়ানো, তাদের গুহ্যদ্বারে বিদ্ধ করা থাকতো গাছের ডাল, শাখা প্রশাখা, ইক্ষুদণ্ড, বাঁশ, নানারকম আগাছা ইত্যাদি দ্রব্য। একটা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক, দেহমন অসাড় করে দেয়ার মতো ব্যাপার যে, জাপানীরা নানকিংয়ের চীনা নারীদের যন্ত্রণা দেওয়ার জন্য ব্যাবহার করেছে ভিন্নতর এমন কিছু জিনিসপত্র যা তার জন্য আদৌ নিদৃষ্ট করা হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, ধর্ষণের শিকার হয়েছে এমন এক নারীকে দেখা গেল সে পড়ে রয়েছে প্রকাশ্য রাস্তায়, যার যোনি পথে জাপানী ধর্ষক সৈনিকটি ঢুকিয়ে দিয়েছে একটি বীয়ারের বোতল, এবং শেষ পর্যন্ত তাকে সে ছড়ে গেছে গুলি করে তাকে হত্যা করে। অপর একটি ধর্ষিতা নারীকে দেখা গেছে যার যোনি পথে ঢুকিয়ে দেয়া ছিল একটি গলফ স্টিক। এবং ২২শে ডিসেম্বর টম জিং গেটের নিকটবর্তী এক এলাকায় জাপানী সৈনিকরা এক নাপিতের স্ত্রীকে ধর্ষণ করে এবং তারপর তার যোনিপথে ঢুকিয়ে দেয় একটি বড় আকারের পটকা, আর সেটার বিস্ফোরণে মৃত্যু ঘটে ঐ স্ত্রীলোকটির। জাপানীদের লালসার শিকার শুধুমাত্র যে নরীরাই ছিল তা নয়। চীনা পুরুষদের উপরও তারা চালাতো পুংমৈথুন, চীনাদেরকে বাধ্য করতো নানারকম বীভৎস ও ঘৃণ্য বিকৃত যৌনকর্ম চালাতে হাস্যকৌতুকরত জাপানী সৈনিকদের সম্মুখে। মনে হয় নানকিং নগরীতে জাপানীরা যেসব মানবিক অধঃপতন ও বিকৃতির সামর্থ্য দেখিয়েছে তার কোন সীমা পরিসীমা নেই। হত্যাকর্মের একঘেয়েমি কাটিয়ে তোলার জন্য কিছু জাপানী সৈনিক উদ্ভাবন করেছিল কিলিং কনটেস্ট তথা হত্যা প্রতিযোগিতা, তেমনি মাত্রাতিরিক্ত ধর্ষণ কর্মের একঘেয়েমি কাটিয়ে ওঠার জন্য তাদের আরেকদল উদ্ভাবন করেছিল ধর্ষণের খেলা। মানবিকতার এমন বিপর্যয়ের কারনেই হয়তো নানকিং নগরের পতনের ঘটনাটাই ইতিহাসে দি রেপ অফ নানকিং বা নানকিংয়ের ধর্ষণ হিসেবে পরিচিত।

 

যুদ্ধ বিষয়ক আইনে নারীর প্রতি সহিংসতাঃ
যুদ্ধকালে নারীর প্রতি সহিংসতাকে সু্র্নিদৃষ্টভাবে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে আইনে স্বীকৃতি দেয়া হয় গত শতকের নব্বইয়ের দশকে। তার আগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইনে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন দিক নির্দেশনা ছিলো না। নারীর প্রতি যুদ্ধকালের সহিংসতা ঐতিহাসিকভাবে উপেক্ষিত একটি বিষয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী হোল পুরুষের সম্পত্তি। ফলে ব্যক্তি নারীর শরীর ও মনের উপর ঘটা নৃশংসতা হয়ে পড়ে গৌণ। মুখ্য হয়ে ওঠে পরিবারের ইজ্জত ও সন্মানহানির বিষয়। সনাতন যুদ্ধ বিষয়ক আইনগুলোতে এই ভাবধারা প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯০৭ সালে হেগ কনভেনশন এবং ১৯৪৯ সালের জনেভা কনভেনশন সমূহে নারীর প্রতি লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতা পরিবারের সন্মান ও মর্যাদার সাথে যুক্ত ছিল। অর্থাৎ আইনেও ধর্ষণের নির্যাতনমূলক নৃশংস চেহারাটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়নি বরং পরিবারের সন্মান বোধটাই তাতে মুখ্য হয়ে পড়ে। ১৯৯৮ সালে রোম সংবিধিতে একটি স্থায়ী আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। এই আদালতে বিচার্য অপরাধগুলোর মধ্যে ধর্ষণ, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি ও গর্ভধারণে বাধ্য করা, জোর পূর্বক বন্ধ্যাকরণ ইত্যাদি যৌন সহিংসতাকে সুস্পষ্টভাবে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বীকৃতি দেয়া হয়। ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন নির্যাতন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যুদ্ধের প্রথানুযায়ী নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উনিশ শতকের শেষার্ধে যখন আন্তর্জাতিক যুদ্ধ বিষয়ক আইন বিধিবদ্ধ চেহারা নিতে শুরু করে তখন ধর্ষণ যুদ্ধাপরাধ হিসবে পরোক্ষভাবে ও সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। ১৯৩৭ সাল নাগাদ ধর্ষণ যুদ্ধ বিষয়ক আইন ও প্রথা অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ হিসেবে স্বীকৃত হয় এবং সেনা কমান্ডারদের সুর্নিদৃষ্ট দায়িত্ব ছিল নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ করার।

 

চরিত্রগুলোর নির্যাতনের অভিজ্ঞতাঃ

উপন্যসে ধর্ষিত উ লিয়েনের বৃদ্ধা মা, লিং তানের বেয়ান একটি প্রান্তীয় চরিত্র। বর্ণনা অনুযায়ী তিনি চলতে ফিরতে অক্ষম এমন স্থূলদেহী, এবং বৃদ্ধা। অর্থাৎ তারুণ্য এবং ক্ষীণদেহী হবার আদর্শ সৌন্দর্যের যে মাপকঠি নারীর জন্য পুঁজিবাদী পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বর্তমান সেই মাপকাঠিতে তিনি একেবারে নীচের দিকে অবস্থিত। এই কারণেই তার ধর্ষন যতটা না মর্মান্তিক তার চাইতে বেশি নানকিং এ আদর্শ রূপবতী নারীদের সাথে কি হয়েছে তার ইঙ্গিতবাহী হিসেবে কাজ করে। একবার কল্পনা করি মূল নারী চরিত্র জেড ধর্ষণের শিকার হয়েছে। যে তরুণী, রূপবতী এবং একইসাথে বুদ্ধিমতী অর্থাৎ পুরুষের চাহিদার মাপকাঠিতে যিনি উপরের দিকে আছেন। তার ধর্ষণের নৃশংস অভিজ্ঞতা পাঠককে এমন জটিল এবং নারী বিদ্বেষী বাস্তবতার মুখোমুখি করতো যা আমার অনুমানে বইটিকে হয়তো এতটা জনপ্রিয়তা দিত না। পাঠক মন এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারতেন যার ভার কেবল ধর্ষণের শিকার এবং তার নিকটজনেরাই অনুমান করতে পারেন। নানকিং-এর ইতিহাসের একজন নিবিষ্ট পাঠক হিসেবে পার্ল এস. বকের কাছে আমি ঠিক এটাই আশা করেছিলাম। আমি আশা করেছিলাম তিনি নানকিং-এ ধর্ষিত, নির্যাতিত নারীদের ইতিহাসের কবর খুঁড়ে পুনর্জীবন দান করবেন, তাদের দাঁড় করাবেন বিশ্ব বিবেকের সামনে যারা যুদ্ধে ধর্ষিত নারীকে আজো কোন সুবিচার দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
লিং তান আর লিং সাও এর বড় পুত্র লাও তার স্ত্রী অর্কিডও ধর্ষণের শিকার হন। তিনি তার শাশুড়ির সথে বাচ্চাদের নিয়ে নানকিং শহরের ভেতরে আন্তর্জাতিক সেফটি জোনে আশ্রয় নেন। তিনি অতি সাধারণ এক গ্রামীণ নারীর প্রতিচ্ছবি, জেডের তুলনায় প্রায় কাণ্ডজ্ঞানহীন। এর প্রমাণ পাওয়া গেল যখন দশদ্রোহী উ লিয়েনের সচ্ছলতার খবর শুনে ভাবলেন দেশে শান্তি ফিরে এসেছে, মিথ্যাই তাদের সেফটি জোনে আটকে রাখা হয়েছে। এক সকালে তিনি গ্রামের সকলের সাথে দেখা করবেন ভেবে সেফটি জোন থকে গোপনে বেরিয়ে আসলেন। পরিনতিতে তিনি জাপানী সেনার দ্বারা গণ ধর্ষণের শিকার হলেন। আলবার্তো মোরাভিয়ার “টু উইমেন” এর একটি দৃশ্য মনে পড়ে আমার। মা এবং কন্যা যুদ্ধের পুরো সময়টা গ্রামে নিরাপদেই পার করেন। কিন্তু শেষ দিনে নিজের দেশের সেনার দ্বারাই ধর্ষণের শিকার হন। মনে পড়ে মা ধর্ষণের যন্ত্রণায় অচেতন হয়ে পরেন, কিন্তু জ্ঞান ফিরলে তিনি করুন কষ্টে উপলব্ধি করেন দুর্ভগ্যবশত তার কন্যা ধর্ষণের সময় জ্ঞান হারায়নি। অর্কিডের মৃত্যু দৃশ্যটাও ঠিক তেমন করুন। পার্ল এস. বাক একজন সদয় লেখক তাই অর্কিডকে ধর্ষণের নির্যাতন কেবল একবারই সহ্য করতে হয়। তারপর তার মৃত্যু ঘটে।

বইয়ের কাভার

বইয়ের কাভার

সুজান ব্রাউনমিলার তাঁর “এগেইনস্ট আওয়ার উইল, মেন ওইমেন অ্যান্ড রেপ” বইতে বলেছেন “আমার বিশ্বাস প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে আজ পর্যন্ত ধর্ষণ একটা সূক্ষ ভূমিকা পালন করেছে। এটা সচেতনভাবে ত্রাস সৃষ্টির প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে পুরুষ সকল নারীকে একটা আতঙ্কের মধ্যে রাখে…” আইরিশ চ্যাঙ এর বর্ণনা অনুযায়ী নানকিং-এ বেসামরিক নাগরিক, বিশেষ করে নারী এবং কন্যা শিশুর উপর যে নৃশংস যৌন নির্যাতন করা হয় তার একাংশ ভয়াবহতাও ড্রাগন সিডে পাওয়া যায় না। কিন্তু নারী পাঠক হিসেবে ধর্ষণের আতঙ্ক ঠিকি আমার মনে নতুন করে হানা দেয়। আমি মনে করি এটা যতটা না পার্ল এস বাকের লেখনীর গুন তারচেয়ে বেশি নারী হিসেবে আমার সাংস্কৃতিক নির্মাণ।

আরিশ চ্যাঙ এর বর্ণনা অনুযায়ী সংখ্যায় অল্প হলেও নানকিং এর কিছু নারী নিতান্তই উপস্থিত বুদ্ধির জোরে জাপানী সেনার নৃশংস যৌন নির্যাতন থেকে মুক্তি পান। গ্রামের অনেক নারীই মাটির নীচে গর্তে লুকিয়ে থাকেন, লাশ ভর্তি গর্তে মৃতের মত পড়ে থাকার ভান করেন, চোখে-মুখে কালি ঝুলি মেখে বৃদ্ধা, রোগাক্রান্তের ভান করেন, মানুষের ভিড়ে লুকিয়ে চলা ফেরা করার দক্ষতা ইত্যাদি বিভিন্ন উপায়ে তারা জাপনী সেনার চোখ ফাঁকি দিতে পারেন। বাকের “ড্রাগন সিড” উপন্যাসটিকে অনেকে সেই বুদ্ধির জোরে বেঁচে যাওয়া মানুষদের গল্প বলতে পারেন, অন্তত জেড আর তার সন্তানের গল্প এমনই। কিন্তু লি শৌইং নামের নারীরাও চায়নাতে আছেন যিনি জাপানী সেনার ধর্ষণ চেষ্টায় অসীম সাহসিকতায় বাঁধা দিয়ে নিজের শরীরে সাইত্রিশটি বেয়োনেটের খোঁচা খেয়েছিলেন এবং তিনি শেষ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন এবং শক্ত সমর্থ ছিলেন। নানকিং-এর একজন স্কুল শিক্ষিকা নিজে গুলি খেয়ে মরার আগে পাঁচজন জাপানী সৈনিককে গুলি করে হত্যা করেছিলেন। নানকিং-এর “অন্যরকম” গল্পই যদি পার্ল এস বাকে বলতে চান তবে তার কাছে আমি চায়নার এমন নারীর গল্পও শুনতে চাই।

লিং তানের সর্ব কনিষ্ঠ কিশোর পুত্র লাও সান জাপানী সেনার দ্বারা গণ ধর্ষণের শিকার হন। পুরুষ পুরুষকেও ধর্ষণ করে। কিন্তু বেশিরভাগ সময় এই ঘটনাগুলোকে যতটা না সহিংসতা তার চাইতে বেশি দেখা হয় সমকামীদের “বিকৃত” যৌনতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। আমেরিকান নারীবাদী আন্দ্রিয়া ডরকিনের মতে “বিশেষভাবে ছেলেদের প্রকৃত, সুপ্ত, অভিক্ষিপ্ত অথবা আশঙ্কিত যৌন হয়রানীর সমকামভীত উদ্ধৃতি একটা গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে ঘোলাটে করে পুরুষ আধিপত্য বজায় রাখেঃ পুরুষের যৌন আগ্রাসন পুরুষের যৌনতার ঐক্যবদ্ধকারী বিষয়ানুগ (থিমাটিক) ও আচরনগত বাস্তবতা; এটা সমকামি পুরুষের সাথে বিষমকামি পুরুষের বা বিষমকামি পুরুষের সাথে সমকামি পুরুষের পার্থক্য করেনা।” অর্থাৎ যুদ্ধ বা তথাকথিত শান্তির সময়ে ছেলে, কিশোর, যুবার বিরুদ্ধে পুরুষের যৌন নির্যাতন সমকামীদের যৌন নির্যাতন হিসেবে নয় বরং দেখা উচিত পুরুষের যৌনতার অন্তর্গত সহিংসতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। জাপানী সেনারা সমকামী বলেই লাও সানের মত পুরুষদের ধর্ষণ করে এমন নিশ্চিতভাবে বলা যায়না। একই সাথে পুরুষ কর্তৃক পুরুষের ধর্ষণের ঘটনা শ্রেণী হিসেবে নারী যে পুরুষের অব্যাহত যৌন নির্যাতন, ধর্ষণের প্রধান লক্ষ্য সে সত্য লুকাতে ব্যাবহার হতে দেয়া যাবে না।

লাও সান “ড্রাগন সিড” উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র। জাপানী সেনার দ্বারা তার ধর্ষণের ঘটনা গল্পের একটা গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। লিং তানের পরিবারের ভাগ্যাকাশে যেন সত্যিকার অন্ধকার নেমে আসে এই ঘটনার পরে। গল্পের এই অংশে এসেই পাঠক হিসেবে আমি যেন প্রথমবারের মত উপলব্ধি করতে পারি নানকিং-এ ঠিক কি ধরনের মানবিক বিপর্যয় দেখা গিয়েছে। অর্থাৎ পরিবারের পুত্র সন্তান যখন আক্রান্ত হন তখনি কেবল ঘটনার ভয়াবহতা আমাদের স্পর্শ করে। ধর্ষিত লাও সান যখন রাতের অন্ধকারে পাহাড়ে চলে যেতে চান এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। “একটি ছিপছিপে ছেলে একা রাতের অন্ধকারে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পাহাড়ের দিকে চলেছে-” যন্ত্রণাগ্রস্ত পিতা, ভাইয়ের সাথে সাথে পাঠকের মনও সেই ধর্ষিত কিশোরকে অনুসরন করতে থাকে। ডরকিনের অনুমানের প্রতিফলন দেখতে পাই কি এখানে? “…ছেলেদের যৌন হয়রানী একটা নৃশংস অপরাধ হিসেবে দেখা হয় তার মূল কারণ মেয়েদের জীবনের মূল্যের চেয়ে ছেলেদের জীবনের মূল্য অনেক উপরে…”
“…যেখানে শ্রেণী হিসেবে নারীকে সবসময় যৌন নিপীড়নের জন্য উদ্দেশ্য করা হয়, ছেলে এবং পুরুষকে বিশেষভাবে পুরুষের ক্রমোচ্চ শ্রেণীতে, তাদের অবমূল্যায়িত অবস্থানের জন্য লক্ষ্য করা হয়। কৈশোর, দারিদ্র, জাত (বর্ণ) হোল বিশেষ বৈশিষ্ট্য যা পুরুষকে অন্য পুরুষের সাম্ভব্য শিকার হিসেবে লক্ষ্য করে। কৈশোর পুরুষকে লক্ষ্য হতে কাজ করে কারন একজন কিশোর এখনো পুরোপুরি নারী এবং শিশু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। যৌন আগ্রাসনের অভিজ্ঞতা প্রারম্ভিক; ছেলেটা নির্যাতনকারীর আগ্রাসন উল্লঙ্ঘন করেতে পারে, শুষে নিতে পারে এবং অন্যের বিরুদ্ধে ব্যাবহার করতে পারে। ছেলেরা যাদের এই অভিজ্ঞতা আছে তারা তবুও পুরুষ হিসেবে বেড়ে ওঠে, যারা প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের বিশেষ যৌন অধিকার রক্ষা করে, সেই বিশেষ অধিকারের অপব্যাবহার যে পরিণামই আনুক না কেন। শিকারিতে পরিণত হয়ে এই পুরুষেরা নিজেদের শিকারে পরিণত হওয়া থেকে এমনকি শিকার হবার স্মৃতি থেকে নিজেদের রক্ষা করে।”

ডরকিনের লেখার উদ্ধৃত অংশটুকু থেকে আমরা লাও সানের চরিত্র ব্যাখ্যা করতে পারি। পিতা এবং ভাইয়েরা বাড়ির সব নারীদের লুকিয়ে ফেলতে সমর্থ হয়, লাও সানকে তারা সরল বিশ্বাসে তাদের সামনেই রাখেন। লাও সানের অসামান্য রুপ এবং বয়স যার কারনে সে সকলের প্রিয় এবং স্নেহের পাত্র, তা তাকে তার পিতা এবং ভাইয়ের মত “পুরুষ” হিসেবে পরিচিতি দিতে ব্যর্থ হয়। নারী সুলভ সৌন্দর্য এবং বয়সের কারনে সে পুরুষের ক্ষমতার মাপ কাঠিতে নীচের দিকে অবস্থিত, আর “শত্রু জাত” অর্থাৎ চীনা হিসেবে জাপানীদের কাছে তার মর্যাদাতো একদফা আগে থেকেই অধপতিত! জাপানী সেনারা কোন নারীর খোঁজ না পেয়ে ক্রোধে উন্মত্ত অবস্থায় ধর্ষণ করে লাও সানকে। কিশোর লাও সান ধর্ষণের পরে পাহাড়ে পালান। বাবা লিং তান তাকে অনুনয় করেন যেন সে এমন কোন ডাকাত দলে যোগ না দেন যারা অসহায় গ্রামবাসী নির্যাতন করে বরং এমন কোন দলে যেন সে যোগ দেয় যারা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ে। সে তাই করে, দুর্ধর্ষ তরুন যোদ্ধায় পরিনত হয় লাও সান। ভয় জাগানো নৃশংস নির্লিপ্ততায় সে শত্রু খতম করে, বর্ণনা পড়ে মনে হয় নৃশংসতার সাথে মানুষ খুন করে সে এক রকম তৃপ্তি লাভ করে। লিং তানের অহিংস মনোভাবের প্রেক্ষিতে লাও সানের নৃশংসতা মানবিক অধঃপতনের মত উপস্থাপিত হয়। কিন্তু পাঠকের মনে অসহায় কিশোর লাও সানের ধর্ষণের স্মৃতি তার আচরণের বৈধতা অর্জন করে। অর্থাৎ শেষপর্যন্ত লাও সান পুরুষালী সহিংসতার ধারক ও বাহকেই পরিনত হন, যে সহিংসতা সে ব্যাবহার করতে পারে ধর্ষক জাপানী সেনার বিরুদ্ধে যা ধর্ষিত নারীর জন্য কখনই পথ হিসেবে খোলা থাকে না। শত্রু সেনার বিরুদ্ধে সহিংসতা ব্যাবহার করার মধ্যে দিয়ে লাও সান কৈশোরের অসহায়ত্বের স্মৃতি থেকে মুক্তি পায়। ধর্ষণের দুর্বিষহ মানসিক যন্ত্রণা সে অতিক্রম করতে পারে শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে, শিকার থেকে শিকারি হবার পথ অতিক্রম করে। বলা বাহুল্য উপন্যাসে, বাস্তব জীবনে কোথাও বেশিরভাগ নারীর জন্যই এমন কোন পথ খোলা থাকেনা। পুরুষ চরিত্র বলেই হয়তো তাকে যোদ্ধার ভুমিকায় দেখি, ধর্ষিতা নারী চরিত্রের জন্য একমাত্র উপযুক্ত পরিনতি হয়তো মৃত্যুই! পার্ল এস বাকও ব্যতিক্রম হতে পারলেন না।

বাস্তব, কল্পিত বা যে কোন যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতাকে বিন্দু মাত্র খেলো না করে বলতে চাই, জাপানী সেনার দ্বারা ধর্ষণের ঘটনা চরিত্র হিসেবে লাও সানের বিকাশের একটি স্তর হিসেবে দেখতে চাই আমি। ধর্ষিত ও ধর্ষিতার জটিল, দুর্বিষহ, বহুমাত্রিক মানসিক সংঘাত প্রথমবারের মত একটি কাল্পনিক চরিত্রের মধ্যে দিয়ে আমার চোখের সামনে ফুটে উঠবে এমন আকাঙ্খা ছিল আমার পার্ল এস. বাকের কাছে। ভেবেছিলাম প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ নারী, শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে জীবন চালিয়ে নিয়ে যাবার যে শক্তি পান তার শুরুটা একটা চরিত্রের ভেতর থেকে দেখবো আমি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য লাও সানকে এত উজ্জ্বল, প্রজ্ঞাময় চরিত্র হিসেবে পাই না। চরিত্রের বিকাশে, ঔজ্জ্বল্যে কোনভাবেই লাও সান জেডকেও নিষ্প্রভ করতে পারে না। বাকের লেখনীর একটা স্বতঃস্ফূর্ত স্নিগ্ধতা আমাকে মুগ্ধ করে। তার উপন্যাসের চরিত্রের ভেতরে চলতে থাকা জটিল সংঘাত তার লেখার স্নিগ্ধতা কি নষ্ট করতো? কিন্তু এর উত্তরে আমার তার “মা” উপন্যাসের প্রধান নারী চরিত্রকে মনে পরে, বিয়ের বাইরে গর্ভধারণের শাস্তির আতঙ্কে তিনি বিষ খেয়ে নিজের ভ্রুন নষ্ট করেন। বর্ণনায় পাই, শরীর মন কেঁপে ওঠার মত শারীরিক যন্ত্রণা মা সহ্য করেন সম্পূর্ণ একা। বাক কি পারতেন না ধর্ষিতা নারী, শিশুর ভেতরে চলতে থাকা বহুমাত্রিক দ্বন্দ্ব সংঘাতের চিত্র উন্মোচন করতে?

উপন্যাসের শেষের দিকে একটি নতুন নারী চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে। মায়েলি যেন মাটি ফুঁড়ে আবির্ভূত হয় লাও সানের মত দুর্বল চরিত্রকে উদ্ধার করতে। পাঠক হিসেবে উপন্যাসের এই অংশ আমার কিশোর কিশোরীর জন্য লিখিত জনপ্রিয় উপন্যাস বলে মনে হয়। আমার মতে লাও সান শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিল বিষমকামী যৌনগন্ধী সৌন্দর্য আর হিংস্রতা দিয়ে চালিত দুর্বল একটি কাল্পনিক চরিত্র। তার নির্মিত চরিত্রের প্রেক্ষিতে একটি নারী চরিত্রের আগমন ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। লাও সানের মধ্যে দিয়ে মুক্তিকামী নিরক্ষর চীনা পুরুষের সহিংস, অনিয়ন্ত্রিত, পাশবিক শারীরিক শক্তি আর দেবতা তুল্য সৌন্দর্যের যে ভাবমূর্তি অঙ্কিত হয় মায়েলি তাকে শান্ত করতেই যেন হাজির হয়। এখানে লক্ষণীয় যে মায়েলিকে আরবীয় এবং চায়নিজ বংশোদ্ভূত বলা হয়েছে কিন্তু সে পুরোপুরি পাশ্চাত্যের আধুনিক শিক্ষা এবং জীবন যাপনে দীক্ষিত। মায়েলি চরিত্রের সুচনাকালে পার্ল এস বাক তার শারীরিক সৌন্দর্য এবং বৈশিষ্ট্যের এমন চিত্র অঙ্কন করেন যে তাকে কোনভাবেই আর চায়নার নারী বলা চলেনা। মননে সে যতটা পাশ্চাত্যের, শারীরিকভাবেও সে ততটাই চায়নার নারী পুরুষ থেকে বহু বহু দূরের। শরীরে প্রাচ্যের, আরও স্পষ্ট করে বললে আরব জাতের বৈশিষ্ট্য থাকলেও সে মূলত পাশ্চাত্যের আলোকবর্তিকাবাহী বৈ আর কিছু নয়। সে উপনিবেশি প্রভুর মতই চায়নার মানুষকে রক্ষা করতে চায়। চায়নার মুক্তিকামী মানুষ, (এখানে পুরুষ) এখানে লাও সানের মধ্যে দিয়ে প্রতিভাত। তারা অশিক্ষিত কিন্তু ভীষণভাবে যৌন উত্তেজক। লাও সানের লেখা পড়া না জানার খামতি যেন তার দেবতা তুল্য সৌন্দর্য আর অনিয়ন্ত্রিত শারীরিক শক্তি তথা পাশবিক যৌনতা দিয়ে কমাবার চেষ্টা করেছেন লেখক। চায়নার পুরুষদের এভাবে দেখবার ভঙ্গীর মধ্যে অপমানের সাথে প্রশংসাও আছে! প্রশংসা তার অনিয়ন্ত্রিত পাশবিক পৌরুষের প্রতি যাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শরীরে, মননে পাশ্চাত্যের জ্ঞানে দীক্ষিত আলোকবর্তিকাবাহীর প্রয়োজন হয়। উপনিবেশী শক্তির আধুনিক শিক্ষা, জীবনাচার নারী-পুরুষ সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে এভাবেও বৈধতা পায়। লাও সানকে নিয়ে সে ভাবে “শত্রুকবলিত পাহাড়ের পাথুরে গুহায় গেরিলা বাহিনীর এক তরুন ক্যাপ্টেন দাঁড়িয়ে আছে যেন; গভীর একটা ছায়া, এক শক্তিমান প্রেতমূর্তি-… ভাবল সে, বড় লজ্জার কথা, এরকম একজন মানুষও অন্ধ। লেখাপড়া জানলে সে কি আরও সাহসী হতো না? শত্রুর বিরুদ্ধে কি আরও সাহসের পরিচয় দিতে পারত না?… মায়েলি তাকে ড্রাগন কল্পনা করে; মায়েলির চেয়েও শক্তিমান অথচ লেখাপড়ার জন্য ওর উপর নির্ভরশীল। ও চায় সে এমন একজন হোক- যাকে পোষ মানানো যায়নি, পোষ মানানো যাবেও না। তাহলেও তাকে গড়ে তোলার একটা পথ থাকে। এমন উদ্দাম আর শক্তিমান মানুষকে বশ মানানো কী মধুর অভিজ্ঞতাই না হবে! প্রাসাদ, নগরে আর রাজসভায় শুধু কোমল, অমায়িক মানুষরা জড় হয়; সেখানে বীর পুরুষ কমই দেখা যায়।” আবার আরেক জায়গায় সে সীমাহীন বিতৃষ্ণা নিয়ে ভাবে “ওঃ! শিক্ষিত নিরীহ লোক দেখলে আমার বিতৃষ্ণা জাগে। তার হাত দুটো কী বলিষ্ঠ! যুদ্ধে আহত হয়েছে সে। সেই যুদ্ধে জয়ীও হয়েছে।” স্পষ্টভাবেই মায়েলির রোমাঞ্চকর দিবাস্বপ্ন তৎকালীন উপনিবেশি প্রভুর ইচ্ছার সাথে মিলে যায়। দুজনি চায়নার মানুষকে (এখানে মূলত পুরুষ) দীক্ষিত এবং তার বর্বর যৌনতাকে শান্ত করার প্রয়োজন বোধ করে। আন্দ্রিয়া ডরকিনের ভাষায় “শ্বেতাঙ্গ পুরুষের যৌনতা দেখানো হয় সংবেদনশীলতায় উচ্চতর হিসেবে… জাতিগতভাবে অধপতিত পুরুষকে আসলে ধারাবাহিকভাবে এভাবেই দেখানো হয়ঃ তার বর্বর তাই নৃশংস হবার তথাকথিত যৌন প্রকৃতিই বর্ণবাদী আদর্শ কাঠামোয় তার বিরুদ্ধে সহিংসতা বৈধ করে। তার যৌনতা একটা বর্বর পৌরুষ, যেখানে সাদা লিঙ্গ (বা ফ্যালাস) অন্ধকার জায়গাগুলোতে সভ্যতা বহন করে।” লৈঙ্গিক এবং বর্ণবাদী রাজনীতির এটাই বন্ধন। মায়েলির পাশ্চাত্যের আধুনিক শিক্ষাই এখানে উপনিবেশি প্রভুর (শ্বেতাঙ্গ পুরুষ) চায়নার পুরুষের বর্বর যৌনতা নিয়ন্ত্রণের অভিসন্ধি চরিতার্থ করে, শারীরিকভাবে তার পুরুষ হওয়া তাই বাঞ্ছনীয় নয়। প্রাচ্যকে রহস্যময় যৌনতার আলোকে দেখবার যে পশ্চিমা উপনিবেশিক শক্তির রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা পার্ল এস. বাক চায়নাকে ঠিক সেভাবেই দেখলেন।

পার্ল এস. বাক

পার্ল এস. বাক

আমার অন্যতম প্রিয় লেখক পার্ল এস. বাক। অনেকে তাকে নারীবাদী লেখক বলেন, আজকের দিনে নারীবাদের সংজ্ঞা যেভাবে, যত স্তরে আবর্তিত হয়েছে সেই বিবেচনায় তাকে ফার্স্ট ওয়েভের নারীবাদী লেখক হয়তো বলা যেতে পারে। নারীবাদী ধারার বিভাজনের এই পদ্ধতি আমার অনেক সময়ই সংকীর্ণ মনে হয়েছে। তবুও বাকের লেখনীতে নারীর অভিজ্ঞতা আমলে নেবার একটা স্বতঃস্ফূর্ত প্রবনতা আছে এই সত্য আমি সবিনয়ে স্বীকার করি। কিন্তু আজকের দিনের তরুন নারীবাদীরা তাঁদের জীবনের সকল এলাকার নির্যাতনের প্রতিফলন দেখতে চান তাঁদের পূর্বনারীদের কাজ থেকে, সেটা সাহিত্য কিংবা অন্য যে কোন শিল্প মাধ্যমই হোক না কেন। সেই আকাঙ্খা থেকেই, যে লেখকের অন্তরাত্মায় নাকি চায়নায় গরীব চাষীরা মিশে আছে, আশা করেছি তার লেখায় নানকিং-এ নৃশংস নির্যাতনের শিকার নারী পুরুষ আবার কথা বলে উঠবে। আমি এশিয়ার সেই লক্ষ কোটি নারীর একজন যারা জীবনের কোন না কোন ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, আমার দেশ যদি অল্পকাল হোল উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হয়ে থাকে তাহলে আমার পূর্বনারীরা নিশ্চিতভাবে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আমার পূর্বনারী, আমি এবং আমার বোনের ধর্ষণ, যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন যে লেখক করতে পারবে না, যে লেখক, যে শিল্পী প্রতি মুহূর্তে নির্যাতনের অপমান, যন্ত্রণা কাটিয়ে ওঠার সংগ্রাম দেখতে পারবে না তাঁদের সেই নারীরা একদিন বর্জন করবে নিশ্চই।

 

 

তথ্যসূত্রঃ
১) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিস্মৃত এক ধ্বংসযজ্ঞ, দি রেপ অব নানকিং, মুলঃ আইরিশ চ্যাঙ, অনুবাদঃ দাউদ হোসেন।
২) ড্রাগন সিড, মুলঃ পার্ল এস বাক, অনুবাদঃ বুলবুল সরওয়ার।
৩) যুদ্ধাপরাধ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ২০০৯।
৪) PORNOGRAPHY MEN POSSESSING WOMEN, ANDREA DWORKIN.
৫) Against Our Will, Men Women And Rape, Susan Brownmiller.

 

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
হাবিবা নওরোজ

হাবিবা নওরোজ

প্রশিক্ষণে জেন্ডার এক্সপার্ট, আলোকচিত্রি। কল্পনায় শিল্পী যে সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষায় একাধিক মাধ্যম নিয়ে ভাবতে চায়।
হাবিবা নওরোজ

লেটেস্ট ।। হাবিবা নওরোজ (সবগুলি)

‘click worthy’ ক্যাটেগরি বিষয়ে

সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন পার্সোনাল স্পেস/ব্লগ থেকে লেখা এই বিভাগে পাবলিশ করবো আমরা; ক্যাটেগরি নামেই একভাবে ক্লিয়ার করা হইছে যে, আমাদের বিবেচনায় যেগুলি আরো বেশি রিডারের মাঝে ছড়ানো দরকার এবং আর্কাইভিং ভ্যালু আছে সেগুলিই রাখা হবে এই ক্যাটেগরিতে। যে লেখাগুলিকে অমন মনে হবে তার সবগুলি ছাপাইতে পারবো না মে বি; এখানে আমাদের চোখে পড়া বা আওতা এবং রাইটারের পারমিশন–এইসব ইস্যু আছে; ইস্যুগুলি উতরাইয়া যেইটার বেলায় পারবো সেগুলিই ছাপাতে পারবো মাত্র।--বা.বি.
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.