Main menu

রাবিয়া সাহিন হকের কবিতা

প্রিন্টের শাড়ি
~

বিষ্টির পরে এতটাই নরম হয়ে আছে মন
যেন ধান রোয়া যাবে এখন….
তোমারে ডাকার মতন স্বর জেঁকে আছে চাতকের গলায়।
মেঘ মেঘ করা এইসব দিনে
তোমার ঘুম হয়ে থেকে যাই আমি
ঘুম নাই যার জানলায় মুখ—

জানি না জন্ডিস হইছে কি না
চুনগলা পানিতে কখনো বামনী এসে ঘষলো না ত গা।
কত রছম যে আছে গেরামে—
বুবুরে,
হলুদ পানি কি কখনো গা বেয়ে নামবে না পায়ে?
দেশী মুরকা যেরকম বাড়ির কিনারেকানারে খুঁটে খুঁটে বিছরাইতে থাকে আদার, আমিও তারে—
যেন জীবনটাই এক শবে কদরের রাইত।
যেন আঙুলের কড়ে কড়ে বেজোড় অংকের ভিতরেই আমরা চক্কর মারতেছি।

অন্ধকার গায়ে মেখে
আড়াআড়ি পার হয়ে যাইতে যাইতে কখন যে একটা ধাড়ি বোনা হয়ে যায়—
যা বিছায়ে ব্যাঙের মতন বসে থাকা যায় উঠানে
যেখানে পানি জমে না বরং ছামারা ছড়ায়ে ছিটায়ে গায়ে জড়ায়ে থাকে—
যেন বুবুর গায়ে থাকা প্রিন্টের শাড়ি।


হুদহুদ পাখি

~
তোমার লগে
কথা কইতে নিলে
ভিতরে এমন
বাতাস বাতাস করে
আমার ইমোশানগুলা
গোলাপি গোলাপি
অর্মতলের ফুলের মতন
ঝরঝরায়ে পড়ে…
ঘনজঙ্গলে
সন্ধ্যার মতন তুমি
আমি হুদহুদ পাখি এক
মিথ না কী!
বুয়াজিদের মনে
যেন শোক হয়েই থাকি…


মেহেদীর রঙ

~
চোখেমুখে এমন অন্ধকার—
তবু অসংখ্য তারা যেন বুলেটের মতন ফুটে আছে গায়ে
যেন চানরাইত, চাঁদ না দেখেও ঈদ আসে যেমন—

ঈদ ভেবে ভেবে
আইসক্রিমের মতন গলতে থাকা উত্তাপে
একটু কি হাসবো আমি?
একটু কান্দন—?
রইদ আর বিষ্টির মিশেলে যে ঝড় আসে জৈষ্ঠে তেমন—
ছুটাছুটি আর
উড়তে থাকা ওড়না বারবার তুলতে থাকা মাথায়
খোঁপা খুলে কে যেন মমতায়
শ্যাম্পুর ঘ্রাণ ছড়ালো কাঁঠালতলায়…

আম্মার ফোন বাজতে বাজতে সানাই হয়ে গেলো!

নতুন কাপড়ের ভাঁজ খুলতে খুলতে দেখি,
এমন ছলছল একটা মুখ
যেন কোলে কোন শিশু শুয়ে আছে!

দুয়ারে বসে কে যেন মোড়া বানায়
গাইশ্যা ছোলে দরুদের সুরে

কুটুম পাখির ডাকে
আমতা বানায়ে তুলে তুলে রাখে

অচ্ছুৎ স্নেহেই—পাতার মত এমন ঘন হয়ে থাকে কাছে
ও খোদা! দূরে গেলেও ওরা মিশে থাকে যেন—
যেমন মিশে থাকে নখে মেহেদীর রঙ…


গাবের মতন আল লেগে আছে গায়ে

~
ঝড়ের বাতাসটারে যদি মটকা ভরি রাখতে পারতাম
যদি পারতাম তোমারেও—
কত যে যদি নিয়ে ঘুরি
বলতে গিয়েও চুপ করি
যেন ঝড়ের লগে উড়ে আসা খড়কুটা কতক

ব্যাঙের ডাকের ভিতর ডুবি গেলো রাইত!
মিষ্টি একটা ভোর আসবে আসবে এমন—
ক্রমাগত বিরতি
আর
শামুকে কাটা পায়ের থমকানি
যেন লেগে থাকে তাও…
কতবার যে ব্রিজ হইলো সন্দ্বীপের ঘাটে
তাও যেন যত হাঁটি তত চর পড়ে
আরো আরো পথ লোদেহড়ে
সামনে উত্তাল দরিয়া..

একটা সাদা পর্দার দুলুনি সারাক্ষন আমার ভিতরে
মানুষ কতটা আর বুঝতে পারে
আমার দীর্ঘ না বলার ভান তুমি বুঝে নিও তাও
বুঝে নিও ক্রমাগত বিরতি
আর কুমকুম ধ্বনি—
আমাদের সরে যাওয়া ক্ষণ
মেঘের মতন এমন
সরে যাওয়া দিন
ঝড়ের বাতাস
যদি রাখতে পারতাম মটকা ভরি
যদি পারতাম তোমারেও—

পানির অভাবে অভাবে কত মাছ যে মরলো এই খরানে
না জানি কয়টা যে বেঁচে আছে আর
সামান্য কাদায় লেপ্টায়েও যদি থাকতে পারে
বিষ্টি এলে নিশ্চয় ফুটাবে ডিম
নিশ্চয়!
না জানি এই ফাঁকে মাছমরা বাস কতদূর ছড়ায়ে গেছে…

লাগে যে গাবের মতন আল লেগে আছে গায়ে!
চুলকায় গরমে
বিচুটির মতন ঘা সারা মনে
যারা এসি কিনে ঘরে ঢুকি গেছে খরার তেজে
তারাও ভিজবে একদিন, একসাথে গাছতলে।

থকথকে ঘার মতন
এমন লাল লাল ফুল ফুটে আছে বনে
সব বেটে যদি মাথায় লাগানো যেতো!
সিল্কি চুল উড়াতে উড়াতে
শব্দে কান পেতে বুঝতে পারতাম যদি খোদার ইশারা…
বাগিচায় শুয়ে শুয়ে তাই পাখির কূজন
পাতার নড়ন
মেঘের উড়ন
দেখি আর সবর করি
বুঝতে চাই হাওয়ার বাও!

যেন বিষ্টি মানেই
স্বপ্নের মতন ঘন সবুজ কামিজ—
ভিজতে ভিজতে আমাদের যত ঝাপসা হওয়া মুখ!


কুটুকুটু পাখি

~
গামছার মতন প্রতিদিন ভিজে যেই চোখ
তালের হোঁশের মতন গোপন শিশুমন
এইসব লই যে কই যাই আমি?
পুকুর ঘাটে বসি বসি
ফড়িং উড়ানো
ডাহুক ছুটানো
এত এত তিড়িংবিড়িং
কার লগে যে নির্ভাবনায় রাখি!

কৃষ্ণচূড়া ফুলের মতন কেউই ছিঁড়িবিড়ি না পড়ুক ঝরি।
কিছুই না লেখা দেয়ালগুলা যেরকম খালি খালি লাগে
আম্মার কানের মারকি হারানো সকালও এমন..

ষোলআনার দিনগুলা এখনও টুকরাটাকরা যতটুকু আছে
মরিচ খেলার ডুবের মতন
ভিতরে এমন লম্বা এক দম ধরি থাকা
ঝিঁ ঝিঁর ডাক মাথায় ঢুকি গেলে
লাগে যে আমি খুব ভালো বাঁশি বাজাইতে পারতাম
সাধে না বিষাদে
ঘরের কোণায় পাখি দেখলেই যে আমি শিস দিয়ে ডাকি
ঘুমঘোরে সে কি না নাম দিলো তারে কুটুকুটু পাখি!


কইমাছের ঝোল

~
কইমাছের হরান আঙগো!
আমরা এক পাতিলের ভিত্রে
এখনো কান চালাইতেছি…
কখনো ঝিমানি ধরলে
আওয়াজ না পাইলে
কেউ আসি
বাকশালির হুকুমে
ঢাকনাটা উদাম করে
দেখে, কেমন ছটফটাই
কয়জন জিন্দা আছি না আছি
একটু নতুন পানির জন্যে
আবারও সাঁতরানোর জন্যে
কতটা পথ ডিঙ্গায়ে যে….

আমাদের নিজেদের একই কথা
আর একই গল্পে
একই সময়ের নিঃশ্বাস
আর একই সময়ের হতাশায়
যে পানিগুলা ছিল পাতিলে
সব লোট হয়ে গেছে
আর পারতেছি না আমরা
এমন যাঁতা দেওয়া দিছে
আমাদের গরমে
আমাদের সংস্পর্শে আমরাই
শেষ হয়ে যাইতেছি
পচন ধরি গেছে আমাদের
মাথায়
পেটে
ও পাখনায়
আমরা সাঁতার ভুলি যাইতে যাইতে
এমনকি ভুলি গেছি লোকমার স্বাদও
আমাদের মাথা হ্যাঙ হয়ে আছে

তাও আমরা ভাবি,
পাতিলটা যদি দরিয়ায় থাকতো!
কোন জেলের উছিলায় না হয়
ভাতের প্লেটে একদিন আমরা
উজায়ে উজায়ে দিতাম
কইমাছের ঝোল!


ছোটপাখি

~
ছোটপাখি,
তোমার এত সুন্দর নাম
আমি মনে মনে ডাকি!
তুমিও ডাইকো যখন তখন..

একটা গানের ভিতর
প্রতিটা অন্তরায়
একটা ফড়িং ধরেও
আবার
ফুঁ দিয়ে ওড়াই!
তোমারেও দিলাম..

ছোটপাখি,
দূরে দূরে থাকো
সুরের ভিতর এমন মউজ করে রাখো..

ভাতের মাড় যেমন ফুটায়ে দিয়ে ফুল
জুদা হয়ে পড়ে
আমাদের কথারাও যেন
কান্দার মতন গোপনীয়তা করে।


লুপের ভিতর আটকে থাকা দিন

~
একঘেয়েমি যখন আর নিতে পারি না
আমরা ঘুরেফিরে ওই হাপ্পেন পরা দিনগুলারে আওড়াই
মেলায় যাই
গজা, জিলাপি খাই

যা কিছু মনে থাকে, তা থাকেই
যদিও
পেরেকগুলা জোড়া ছেড়ে দেয়
আলগা আলগা লাগে যাবতীয় রসম
কাঠমিস্তিরীর এমন অভাব
তাও কানে খালি বাজতে থাকে
পেরেক মারার শব্দ
ঠুসঠুস, ঠুসঠুস
প্রতিটা পেরেক যেন আমার চুলের গোড়ায় গোড়ায়

কিছু কিছু দিন শুধু গানের একটা লাইনের ভিতরেই আটকে থাকা…
থাকতে থাকতে
কানতে পারারেই যখন প্রেম লাগে
তখনও ভাবা লাগে
কানবো কি কানবো না জৈষ্ঠ্যমায়্যা মেঘের মতন

কিছু কিছু দিন শুধু এক ঝলক রোদের ভিতরেই মোলায়েম হয়ে থাকা…
একটা গান বারবার শুনতে থাকার ভিতর
একটা বিরহ আজীবন পোষার মতন
প্রেম আমাদের ভিতর টলটলায় তখনও
যেন একটা পুকুরঘাট আমাদের বসে থাকা নিয়ে
সবসময় রসিকতা করে।

কিছু কিছু দিন শরীর এত ভারী লাগে
আর এত কাতর হয়ে যাই
খালি মনে হয় আরো ভারী কিছুর নিচে
নিজেরে চাপা দিয়ে রাখতাম!
স্মৃতির ভিতর থেকে উঠে আসতো যদি
প্রেমিকের স্বর!
হাত পা বা আরো আরো যা
কিন্তু, টের পাই পিঠে হেলান দিয়ে হাসতেছে আমার ভাতিজা।

একটা লুপের ভিতর
নিজের আটকে যাওয়া নিয়ে
তোমার মুখখানা
ক্যামেরায় বসাবো ভাবতে ভাবতে
দেখি, এত লেবুফুল
বিবিধ ফলের পাশে যেন ডাকতেছে বুলবুলি!

সোরিয়াসিসের মতন তুমি থেকে গেলে সারা বাড়ি…
রঙ্গনফুল ফোটার মতন আরো কী কী যে ভাবলে
তা না জেনেও

তোমার চোরাহাসি এমন কাঁপালো মন
লুপের ভিতর আটকে থাকলাম আমি
জাস্ট একটা পাতার মতন!


নেইলকাটার

~
বিলাসিতা থেকে এতটা দূরে দূরে থাকি
যা কিছু আসতে চায় ভরা জৌলুশে
তাদের থেকেও
ছাতার আউড়ে
গুঁজাই রাখি মুখ
আর এমন এক জায়গায় দাঁড়ায়ে
থাকি
যা আসে সব আমার পিছন থেকেই
যেন ওটুকুই চমক!

কোল্ডড্রিংস খাইতে খাইতে
এমনকি প্রেমের সময়ও
যেখানে নেকাব ছাড়াই নিঃশ্বাস নেয়া যায়
আলাপে আরেকজনকে রেখে
দুপুরের রইদে ঠেস দিয়ে
এতটা দূরত্বে আমরা
ইজি হয়ে বসি
মুখোমুখি ঘাসের উপর

যে কেউ প্রেমিক ভাবতে পারে
এমন সৌভাগ্যওয়ালার
নখগুলা যেন
প্রেমিকাদের সন্দেহের মতন
কাটার পরেও
যেখানে থাকতে থাকে স্পট…

The following two tabs change content below.

ফুল্লরা

জন্ম: ১৯৯৭, ২ মার্চ। বাড়িঃ শিবেরহাট, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম। পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স। বর্তমানে একই বিষয়ে মাস্টার্সে পড়তেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইলঃ [email protected]

Latest posts by ফুল্লরা (see all)

[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য