Main menu

ফুল্লরা’র কবিতা

সংসার

এই যে কাক ডাকা দুপুরের রোদে মেয়েটি হাঁটছে— পিচঢালা রাস্তার মতো তপ্ত থেকে তপ্ততর হতে হতে ফেলে এসেছে সংসার—
এরকম যেন এ নতুন নয়;
সেই শৈশবেও সে ছেড়েছে সংসার।
একা নয়; সাথে আরো কেউ ছিলো—
এরপর আরো কতবার।
এরকম ছেড়েছুঁড়ে এসেও—
যেখানে যখন বসতি করেছে বাধ্য হয়ে—
সেখানেই আবার গড়ে উঠেছে সংসার।
সংসার মানেই আগুন দেয়া চুলায় বসে থাকা ভাতের পাতিল;
যার ভিতরে ফুটতে থাকে আমাদের অস্তিত্ব।
যেখানে আগুন বেশি হলেই ভাত—
পুড়ে মরার ডরে যেন নিজেই লাফিয়ে মরে!

 

ড্যাডবডি অফ এ কিশোরী

কারোর ছায়াতলেও নয়;
কারোর মায়াজালেও নয়;
নিজের কবরখানা—
নিয়তি কুঁড়েই শোয়ায় রাখছে;
ঢুকতে পারতেছে না!
কুক্কুরেরা তারে
মাটি আঁছড়ে—
এসে—ঢুকায়ে
—ঢেকে দিলো মাটিরদানা।

 

বয়ঃসন্ধির চোখ

দর্জি হয়ে মাপতে থাকা সেই ছেলেটা
বয়ঃসন্ধি পার না করেই যেই ছেলেটা
গার্লস স্কুলের মোড়ে—
ড্যাবড্যাব করে উঁকি মারে
বারান্দাতে ছুঁড়ে।
কী যেন নাম সেই ছেলেটার!?
যেই ছেলেটা ছাতাওয়ালির পিছে পিছে
দলের সবার কথার নিচে
হাঁটতে থাকে মুচকি হেসে—
বাড়ি কোথায় সেই ছেলেটার?
যেই ছেলেটার
ব্রণের দাগে মুখ ভর্তি,
মোচের দাগে লাজ ভর্তি,
হাত দিয়ে তাই মুখ ঢেকে রয়;
কথা যা হয়—সব ইশারায়।
ছুটির ঘন্টা বেজে উঠলে—
সপ্তসুরে চুল আঁচড়ে
যেই ছেলেটা পথ আগলায়—
সেই ছেলেটা কলেজ রোডে
আর থাকে না;
হারিয়ে যায়।

লতির মত ডিগডিগিয়ে
বাড়তে থাকা মেয়ে—
ছাতা মাথায় স্কুলে যায়
তেমাথার লাইন দিয়ে।
চোখগুলো যে কী সুন্দর!

কাজলডাঙ্গার মেয়ে—
দরিয়া উছলায় বুকের ভিতর
এক পলকে চেয়ে!
প্রথম কোন ছুটি নেয়া
মনে জাগলে ডর—
লুকাতে থাকে ওড়না দিয়ে
বয়ঃসন্ধির ঝড়।
কে দেখে যায়!
কে দেখে হায়!

ভিড়ের ভিতর ভীরু চাহনি নিয়ে—
রাস্তা ধরে যায় হেঁটে ঐ সেতারা বানুর মেয়ে!
রাস্তা থেকে নাই হয়ে যায়
ঝড় থামে না তাও;
ঘরের ভিতর
রোদের আদর—

লোক দেখলেই পালাও।
রাস্তায় আর খুঁজে পায় না
চিলের মত চোখ—
খুঁজতে খুঁজতে বাড়ির পাশে
পর্দাতে উম্মুখ।

সুপারি পাতার বেড়ার ভিতর
সাঁতার কাটা মেয়ে—
গোসলখানায় লুকিয়ে যায়
ভিজা কাপড় নিয়ে।

গুনতে গুনতে এমন করে
স্কুল শেষ হয়;
কলেজ রোডে যাওয়ার আগেই—
একি পরিণয়!

 

প্রেম একটা ফিনিক্স পাখি

প্রেম একটা ফিনিক্স পাখি;
বিশ্বাসের এত আকাল—
তবু সে আকাশ ছোঁয়!
হেঁশেলে ঢুকেও
সালিশে —
কত বিবাহ-বিচ্ছেদ!
তবু তার ডানায় এত উম
আর
চোখজুড়ে আকাশ-কুসুম।
তবু কূলহীন সংসার
প্রেমের গভীরে—
সন্তর্পণে
মারতে থাকে ভ্রুণ।

 

সঞ্চয়ে নাই স্বস্তি

ভাঙ্গনমুখি দোচালা ঘরে—
ভাঙ্গন ঠেকাতে এনজিও আসে।
(কৃষির কান্ডারী, কবিত্বে পারঙ্গম)
পতিভক্ত তবু জিভকাটা যার,
সেই খনার সূত্র না শিখেই
যারা শিখে ফেলে সঞ্চয়—
ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে শেষে
তাদের গ্রামীণ সংসার
ছাড়খার হয়ে যায়।
তবুও তো সন্ধ্যা নামলে—শহরের বাজার ঘুরে এসে
খেলনাবাটি খেলা হয় সংসারের ক্ষুধা নিয়ে।
এদিকে, একা, দীর্ঘপথ
হাঁটার পা দুইটা খেয়ে যায় গার্মেন্টস।
তবু দুই টাকার ভাড়া বাঁচিয়েও
চলতে হয় নির্ঘুম পথ।
যতদিন না ডাক আসে পিতৃত্বের,
মায়ের চোখেই ফুটতে থাকে ফুল।
সব ব্যথার অনুভূতি জানে না বাবারা।
উঁকিঝুঁকিমারা পাড়ার ছেলেরা-
পথ আরো ছোট করে দেয়।
ফিরে যেতে ভয় করে—
তবু ফিরে যেতে হয় একচালা ঘরে;
যেখানে সঞ্চয় নেই,
নেই আহামরি কোন জীবন;
স্বস্তি আছে কেবল যার যার পুরুষের বুকেই।

 

মিউচুয়াল

শহরের লগে মিউচুয়াল হইতে হইতে যেন নাই হয়ে গেছে—বাড়ির উঠান,
জোড়ের সীমানা,
ষোলআনার গাছ।
যার তার লগে মিউচুয়াল রাখতে রাখতেই যেন পইচ্চা গেছে—
গিরস্তের ভাগের তাল,
পুকুরে করা ওযুর জল।
একজনের ঠ্যালায় আরেকজনও যেন দৌড় মারে— বেবুঝে।
এদিকে গ্লোবাল আড্ডার ক্যাঁচালে—গেরামের কাছারী ঘরটাও হারায় গেলো যেন-জঙলিগাছে।
শহরের মত হইতে গিয়ে—গেরামের বাড়িঘরেও যেন
বিশাল বিশাল ফটক,
থাইগ্লাস,
তলার উর্ফে তলা,
নাগালের বাইরে একেকটা ঘরের টুয়া।
ইটভাটায় ভরা চরাচর।
নতুন মাটিতে নতুন চালার ঘর উঠার আগেই নতুন নতুন ইটভাটার চুঙ!
গুপ্তছড়া ঘাটে ভিড়ার আগেই যেন দৃশ্যমান
তালগাছের মত দিগ্বিজয়ী মাথা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নয় নয়টা ইটভাটা।
চিকন চিকন রাস্তাগুলা ভাঙ্গি দমদমাইয়া বেড়ায় ইটের গাড়ি।
এমন একটা ভাব যেন বাড়ির উঠানে ধান কে শুকায় আর!
চারপাশেই ইটের বহর,
টালকে টাল বালু,
বারান্দাটাইট সিমেন্ট।
কোন কোন ছাদেই যেন উড়তেছে
গেঁয়োবালার শাড়ি,
কিশোরীর কামিজ।
পাকনা কাঁঠালের ঘ্রাণ ঠেলেই যেন—
নাকে লাগে ছাদে মেলে দেওয়া ছুরি শুঁটকির ঘ্রাণ।
কোন কোন ছাদের একপাশেই—
চালকুমড়ার লতা,
আকড়ির ঝাড়,
পেঁপেঁর সারি।
যেন বিকেল হলে বাড়ির উঠানে কে খেলে আর!
ব্যক্তিগত ছাদেই যেন সবার ব্যক্তিগত খেলা ব্যক্তিগতদের নিয়ে।
লেপা উঠান ভরে যাক
মরিচা গাছের ফুলে;
নকশিকাঁথা না সিলাক কেউ আর
ডিমা শাকের তিতায়;
কথারা আর শব্দ না করুক
গুজবের থানকুনি পাতায়।
একেকটা ঘরের কোণায় যে গইয়ম আর বরই গাছ-
তাতে বুলবুলি ডাইক্কা মরুক;
হইকগুলা খাইতেই থাকুক-
বিষ্টির পরপরই টসটসে হওয়া
গইয়ম কিংবা আমবুরুজ!
যেন গাছে উঠে ফল খাওয়ার মত কোন মানুষই নাই আর; কে ছুটবে আর হইকের পিছে পিছে?
পিছলা গাছ দেখে কে পাড়বে ফল আর টোঁডা বান্ধি ছিবার মাথায়?
গাব গাছের গাব,
ডেউয়া গাছের ডেইয়া,
সুয়ারী,নাইরকল,আতল
সবই আড়াখাউয়া দেখা যাক গাছের তলায়।
কুড়ানোরও যেন কেউ নাই আর মহল্লায়।
কই গেছে সবাই?
বিদেশী পয়সার গরমে,
গ্যাসের চুলার আরামে,
যেন কেউ কারো ড্যাঙ্গাও মাড়াতে চায় না আর।
ঝরা পাতা পচে—যেন বিধবা কোন;
শুকনা ডাল পচে—যেন ডিভোর্সী কোন;
ক্ষেতের শাক ক্ষেতে বুড়া হয়—
যেন আইবুড়া কোন;
ক্ষেতের তরকারি ক্ষেতেই পইচ্চা যায়—যেন ডুবাইআলার বউ কোন।
বাজারে নিলেও চাহিদা নাই;
যেন খাওনের মানুষই নাই আগের মত।
এমন একটা কেদ্দানি সবার—যেন কার তরকারি কে খায় আর?
ব্যারামের ডরে যেন কেউ ঠ্যাংও বাড়ায় না আর কারোর আইলের কোণায়।
বইন কান্দে শ্বশুর বাড়ি,
মা কান্দে ছটফডাই,
ভাতিজীরাও শেষমেষ কেরিয়ার ছেড়ে গেরামে ফেরে।
কোথাও যাওয়ারও যেন কোন উপায় নাই আর।
রাস্তায় রাস্তায়
নৌবাহিনীর বহর,
বের হলেই যেন খাওয়া লাগবে
পুলিশের ডান্ডার বারি।
নিরুপায় সবাই যে যার মত—যেন যার যার চোখের পানি
যার যার কাপড়ের কোণায়।
নাই, নাই—
যেন মিউচুয়াল বলতে কোনকিছুই আর ঘরের বাইরে নাই।

 

ফিডব্যাক

এই যে আমি তোমাকে নিয়ে ভাবছি—
যেখানে
তুমি কোন ব্যক্তি নও; তুমি আমার দ্বিতীয় সত্ত্বা।
তোমাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমি জীবন আঁকছি।
যেখানে
তুমি আমার হৃদয় আর আমি তোমার প্রাণ।
যেহেতু
হৃদয়হীন বাঁচা যায় না; আর প্রাণহীন জীবন হয় না।
এই যে আমি ‘বাঁচতে চাই’ বলে তুমি তুমি করে পাগলামো করছি—
যেখানে
বেঁচে থাকাটা একটা শিল্প; আর পাগলামো তার রঙ।
পাগল তো সেই—
যে আপন ধ্যানে আপন কর্ম করে যায়।
এখানে
তুমি আমার কর্ম; আর আমি কর্ম করে বাঁচি।
তুমি তো জানো না—
কতবার আমি মরতে চেয়েছি!
কতবার আমি বুকের ওড়না গলায় ঝুলিয়েছি।
কতবার আমি ঘর ছেড়েছি মৃত্যুর কাছে পৌঁছাবো বলে।
অথচ
আমি মৃত্যুর কাছে পৌঁছাতে পারি নি।
দিগন্তের দিকে হাঁটতে হাঁটতে
আমি দিগন্তকে পিছনে ফেলে এসেছি।
তবু—দিগন্তে দাঁড়াতে পারি নি পৃথিবী থেকে গড়িয়ে পড়বো বলে।
গোলাকার পৃথিবীতে ভাবনার গোলকে যাযাবরের মত ঘুরতে ঘুরতে—
পথিমধ্যেই আমি জেনে গেছি—
সবুজ মলাটে জড়ানো বইয়ের ভিতর তুমি আছো। তোমাকে আমি নিঃশ্বাস ভরে পড়তে পড়তে—
বুকের ভিতর একটা বৃক্ষ গজিয়েছি। যার নাম হৃদয়। যে হৃদয় আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। আমি এখন নিজেকে ভালোবাসতে জানি। আর ভালোবাসতে জানি বলেই ভালোবেসে যাই।
যেখানে
ভালোবাসার নাম—
পাগলামো নিয়ে বেঁচে থাকা। আর
পাগলামোর নাম তুমি।
তুমি তো জানো না—
আমার ভিতরে কতটা শিকড় গেড়েছো তুমি;
কতটা সতেজ করেছো আমায়;
কতটা শক্তি দিয়েছো বাঁচার;
আমার ভিতরে তুমি আছো বলেই আমি আছি;

সবুজের সজীবতায় সৃজন নিয়েই আমি বাঁচি।

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
ফুল্লরা

ফুল্লরা

জন্ম: ১৯৯৭, ২ মার্চ। বাড়িঃ শিবেরহাট, সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম। পড়ালেখাঃ রাজনীতি বিজ্ঞানে অনার্স। বর্তমানে একই বিষয়ে মাস্টার্সে পড়তেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইলঃ [email protected]
ফুল্লরা

লেটেস্ট ।। ফুল্লরা (সবগুলি)

  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য