Main menu

আমার কথা – বিনোদিনী দাসী। (২)

১ ।।

ফিমেইল সেলিব্রেটি বিনোদিনী দাসী’র ‘আমার কথা’ বইটার পুরাটা আপলোড করবো আমরা। সেইটার সেকেন্ড পার্ট হিসাবে নিচের টেক্সটটা রাখা হইলো।

————————————-

১ম কথা (পর্ব) রঙ্গালয়ে প্রবেশের সূচনা

বাল্য-জীবন

আমার জন্ম এই কলিকাতা মহানগরীর মধ্যে সহায় সম্পত্তিহীন বংশে। তবে দীন দুঃখী বলা যায় না, কেননা কষ্টে-শ্রেষ্টে এক রকম দিন গুজরান হইত। তবে বড় সৃশৃঙ্খলা ছিল না, অভাব যথেষ্টই ছিল। আমার মাতামহীর একখানি নিজ বাটী ছিল। তাহাতে খোলার ঘর অনেকগুলি ছিল। সেই কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীটের ১৪৫ নম্বর বাটী এখন আমার অধিকারে আছে। সেই সকল খোলার ঘরে কতকগুলি দরিদ্র ভাড়াটিয়া বাস করিত। সেই আয় উপলক্ষ করিয়াই আমাদের সংসার নির্ব্বাহ হইত। আর তখন দ্রব্যাদিসকল সূলভ ছিল; আমরা ও অল্প পরিবার। আমার মাতামহী, মাতা আর আমরা দুঢী ভ্রাতা ভগ্নী। কিন্তু আমাদের জ্ঞানের সহিত আমাদের দারিদ্য দুঃখ বাড়িতে লাগিল, তখন আমার মাতামহী একটী মাতৃহীনা আড়াই বৎসর বালিকার সহিত আমার পঞ্চমবর্ষীয় শিশু ভ্রাতার বিাহ দিয়া তাহার মাতার যৎকিঞ্চিৎ অলঙ্কারাদি ঘরে আনিলেন। তখন অলঙ্কার বিক্রয়ে আমাদের জীবিকা চলিতে লাগিল। কারণ ইহার অগ্রেই মাতামহীর ও মাতাঠাকুরানীর যাহা কিছু ছিল, তাহা সকলই নিঃশেষ হইয়া গিয়াছিল।

আমার মাতামহি ও মাতাঠাকুরানী বড়ই স্নেহময়ী ছিলেন। তাঁহারা স্বর্ণকারের দোকানে এক একখানি করিয়া অলঙ্কার বিক্রয় করিয়া নানাবিধ খাদ্র-সামগ্রী আনিয়া আমাদের হাতে দিতেন, অলঙ্কার বিক্রয় জন্য কখন দুঃখ করিতেন না।

আমার সেই সময়ের একটা কথা মনে পড়ে, আমার যখন বয়স বছর সাতেক তখন আমার মাতা কাহাদিগের কর্ম্ম-বাড়ী গিয়া আমাদের জন্য কয়েকটী সন্দেশ চাহিয়া আনিয়াছিলেন। অনুগ্রহের দান কিনা, তাহাতেই দশ পনের দিন তুলিয়া রাখিয়া, মায়া কাটাইয়া আমার মাতার হাতে দিয়াছিলেন; এখন হইলে সে সন্দেশ দেখিলে অবশ্য নাকে কাপড় উঠিত। আমার মাতা তাহা বাটীতে আনিয়া আমাদের তিনজনকে আনন্দের সহিত খাইতে দেন। পাছে সেই দুর্গন্ধ সংযুক্ত সন্দেশ শীঘ্র ফুরাইয়া যায়, এইজন্য অতি অল্প করিয়া খাইতে প্রায় অর্দ্ধঘন্টা হইয়াছিল। এই আমার সুখের বাল্যকালের ছবি।

আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা অতি অল্প বয়সেই আমার মাতাকে চিরদুঃখিনী করিয়া এ নারকীদের সঙ্গ ত্যাগ করিয়া গিয়াছিলেন। আমার ভ্রাতা অসুস্থ হইলে অর্থের অভাবে তাহাকে দাতব্য চিকিৎসালয়ে লইয়া যাইতে হয়। আমরা দুটি ক্ষুদ্র বালিকা বাটীতে থাকিতাম। আমাদের একটি দয়াবতী প্রতিবেশিনীর জন্য আমাদের আহারাদির কোন কষ্ট হইত না। তিনি আমাদের সঙ্গে করিয়া আমার মাতার ও মাতামহীর আহার লইয়া ডাক্তারখানায় আমার ভ্রাতাকে দেখিতে যাইতেন। কোন দিন তাঁহাদের আহার করিবার জন্য বাড়ী পাঠাইয়া দিয়া তিনি নিজে আমার ভ্রতার নিকট বসিয়া থাকিতেন। পরে আবার তাহারা আহার সমাপন করিয়া সেইখানে যাইলে আমাদের সঙ্গে করিয়া বাটী আসিতেন। কেবল আমাদের বলিয়া নহে, তিনি স্বভাবতই পরোপকারিণী ছিলেন। যদি রাত্রে দ্বিপ্রহরের সময় কেহ আসিয়া তাঁহাকে বিপদ জানাইত; তখন অমনি কিঞ্চিৎ অর্থ সঙ্গে তাহাদের বাটী যাইতেন। পরে নিজের শরীর দ্বারাই হউক আর পয়সার দ্বারাই হউক লোকের উপকার সাধন করিতেন। তাঁহার নিজের কিছু সম্পত্তি ছিল, সংসারে তাঁহার আর কেহ ছিল না। পরোপকারই তাঁহার ব্রত ছিল।

উক্ত দাতব্য চিকিৎসালয়েই আমার ভ্রাতার মৃত্যু হয়। সে দিন আমার স্মৃতি-পটে জাজ্বল্যমান আছে। তখন ভাবিতে লাগিলাম আবার আমার ভাই আসিবে না কি? যমে নিলে যে আর ফিরাইয়া দেয় না, দৃঢ়রূপে তখন হৃদয়ঙ্গম হয় নাই। আমার মাতামহী আমার ভ্রাতাকে অতিশয় স্নেহ করিতেন কিন্তু অতিশয় ধৈর্য্যশালিনীও ছিলেন। তাঁর শুনা ছিল, ডাক্তারণায় মরিলে মড়া কাটে, গতি করিতে দেয় না! যেমন আমার ভ্রাতা প্রাণত্যাগ করিল, তিনি অমনি সেই মৃতদেহ বুকে করিয়া তিনতলার উপর হইতে তড়তড় করিয়া নামিয়া গঙ্গার গাটের দিকে যেন ছুটিলেন। আমরা আমার মাতার হাত ধরিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে যাইতে লাগিলাম। আমার মাতাঠাকুরানী কেমন বিকৃত হৃদয় হইয়াছিলেন, তিনি হাঃ হাঃ  করিয়া মাঝে মাঝে হাসিতে লাগিলেন। আমাদের অবস্থা দেখিয়া ডাক্তারখানার বড় ডাক্তার বলিতে লাগিলেন, “ব্যস্ত হইও না, আমরা ধরে রাখিব না।কিন্তু দিদিমাতা শুনেন নাই, তিনি একেবারে কোলে করিয়া লইয়া গঙ্গার তীরে মৃতদেহ শয়ান করাইয়া দেন। গঙ্গার উপর সেই ডাক্তারখানা। তখন একজন ডাক্তার সেইখান পর্য্যন্ত দয়া করিয়া আসিয়া বলিয়াছিলেন যে এখনই সৎকার করিও না, অতিশয় বিষাক্ত ঔষধ দেওয়া হইয়াছে, আমি আবার আসিতেছি। পরে তাঁহারা ঘন্টাখানেক সেই গঙ্গাতীরে সেই মৃতদেহ কোলে লইয়া বসিয়াছিলেন। সেই ডাক্তারবাবু আসিয়া আবার অনুমতি দিলে তবে কাশী মিত্রের ঘাটে এনে তাকে চিতায় শয়ন করান হয়। ইতিমধ্যে আমাদের সেই দয়াবতী প্রতিবেশিনী তথায় উপস্থিত হন। তিনি বাটী হইতে কিছু অর্থ আনিতে গিয়াছিলেন। ভ্রাতার অবস্থা খারাপ দেখিয়া তার আগে রাত্রে আমি ও ভ্রাতবধু সেইখানেই ছিলাম। এর ভিতরে আর একটী দুঘর্টনা ঘটিতে ঘটিতে রক্ষা হয়। ভ্রাতার সৎকারের জন্য আমার মাতামহী ও সেই প্রতিবেশিনী যখন ব্যস্ত ছিলেন, সেই সময় মা আমার আস্তে আস্তে গঙ্গার জলে কোমর পর্য্যন্ত নামিয়া গিয়াছিলেন। আমি মার কাপড় ধরিয়া খুব চিৎকার করিয়া কাঁদিতে থাকায় আমার দিদিমাতা দৌড়ইয়া আসিয়া মাতাকে ধরিয়া লইয়া যান। ইহার পর মা আমার অনেক দিন অর্দ্ধ-উন্মাদ অবস্থায় ছিলেন। মোটে কাঁদিতেন না বরং মাঝে মাঝে মাঝে হাসিয়া উঠিতেন। সে কারণ আমার দিদিমাতা বড়ই সাবধান ছিলেন। মায়ের সম্মুখে কাহাকেও আমার ভ্রাতার কথা কহিতে দিতেন না। যদিও আমার দিদিমাতা আমাদের সকলের অপেক্ষা আমার ভ্রাতাকেই অধিক স্নেহ করিতেন, কেন না আমাদের বংশে পুত্র সন্তান কখন হয় নাই; মেয়ের মেয়ে, তাহার মেয়ে নিয়েই সব ঘর। কিন্তু নিজ কন্যার অবস্থা দেখিয়া একেবারে চুপ করিয়া গিয়াছিলেন। একদিন রাত্রে আমরা সকলে শুইয়া আছি, আমার মা ওরে বাবারে কোথা গেলিরেবলিয়া উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন। আমার দিদিমাতা বলিলেন, “আঃ বাঁচলেন।আমি মা মাকরিয়া উঠিতে দিদিমাতা বলিলেন যে, “চুপ-চুপ উহাকে কাঁদিতে দে,” আমি ভয়ে চুপ করিয়া রহিলাম। কিন্তু আমারও বড় কান্না আসিতে লাগিল।

শুনিয়াছি আমারও বিবাহ হইয়াছিল এবং এ কথায় যেন মনে পড়ে যে আমার অপেক্ষা কিঞ্চিৎ বড় একটী সুন্দর বালক ও আমার ভ্রাতা, বালিকা ভ্রাতৃবধু আর প্রতিবেশিনী বালিকা মিলিয়া আমরা একত্রে খেলা করিতাম। সকলে বলিত ঐ সুন্দর বালকটী আমার বর। কিন্তু কিছুদিন পরে আর তাঁহাকে দেখিতে পাই নাই। শুনিয়াছি যে আমার একজন মাস্শ্বাশুড়ী ছিলেন; তিনিই আমার স্বামীকে লইয়া গিয়াছিলেন,আর  আসিতে দেন নাই। সেই অবধি আর তাঁহাকে দেখিতে পাই নাই। লোক পরস্পরায় শুনিতাম যে তিনি বিবাহাদি করিয়া সংসার করিতেছেন, এক্ষণে তিনিও আর সংসারে নাই। আমার ভ্রাতার জীবদ্দশায় আমার স্বামীকে আনিবার জন্য কয়েকবার বিশেষ চেষ্টা হইয়াছিল। আমি একটী মাত্র কন্যা বলিয়া মাতামহীর ও মাতার ইচ্ছা ছিল যে তিনি আমাদের বাটীতেই থাকেন। কেন না তিনিও আমাদের ন্যায় দরিদ্র ঘরের সন্তান কিন্তু তাঁহার মাসী আর আসিতে দেন নাই।

এই তো গেল আমার বালিকা কালের কথা; পরে যখন আমার নয় বৎসর বয়ঃক্রম, সেই সময় আমাদের বাটীতে একটী গায়িকা আসিয়া বাস করেন। আমাদের বাটীতে একখানি পাকা একতলা ঘর ছিল, সেই ঘরে তিনি থাকিতেন। তাঁহার পিতা মাতা কেহ ছিল না, আমার মাতা ও মাতামহী তাঁহাকে কন্যাসদৃশ স্নেহ করিতেন। তাঁহার নাম গঙ্গা বাইজী। অবশেষে উক্ত গঙ্গা বাইজী ষ্টার থিয়েটারে একজন প্রসিদ্ধ গায়িকা হইয়াছিলেন। তখনকার বালিকা-সুলভ স্বভাবশতঃ তাঁহার সহিত আমার গোলাপ ফুলপাতান ছিল। আমরা উভয়ে উভয়কে গোলাপবলিয়া ডাকিতাম এবং তিনিও নিঃসহায় অবস্থায় আমাদের বাটীতে আসিয়া আমার মাতার নিকট কন্যা স্নেহে আদৃত হইয়া পরমানন্দে একসঙ্গে অতিবাহিত করিয়াছিলেন, সে কথা তিনি সমভাবে তাঁহার জীবনের শেষ দিন পর্য্যন্ত হৃদয়ে স্মরণ রাখিয়াছিলেন। সময়ের গতিকে এবং অবস্থা ভেদে পরে যদিও আমাদের দুরে দুরে থাকিতে হইত, তথাপি সেই বাল্য-স্মৃতি তাঁহার হৃদয়ে সমভাবে ছিল এবং তাঁহার অন্তঃকরণ অতিশয় উন্নত ও উদার ছিল বলিয়া আমার মাতামহী ও মাতাকে বড়ই সম্মান করিতেন। এখনকার দিনে অনেক লোক বিশেষ উপকৃত হইয়া ভূলিয়া যায় ও স্বীকার করিতে লজ্জা এবং মানের হানি মনে করে, কিন্তু গঙ্গামণিষ্টারের গায়িকা ও অভিনেত্রীর উচ্চস্থান অধিকার করিয়া ও অহঙ্কারশূন্য ছিলেন। সেই উন্নত হৃদয়া বাল্য-সখী স্বর্গাগত গঙ্গামণি আমার বিশেষ সম্মান ও ভক্তির পাত্রী ছিলেন।

আমাদের আর কোন উপায় না দেখিয়া আমার মাতামহী উক্ত বাইজীর নিকটেই আমার গান শিখিবার জন্য নিযুক্ত করিলেন। তখন আমার বয়ঃক্রম ৭ বা ৮ বৎসর এমনই হইবে। আমার তখন গীত বাদ্য যত শিক্ষা করা হউক বা না হউক তাঁহার নিকট যে সকল বন্ধুবান্ধব আসিতেন, তাঁহাদের গল্প শুনা একটী বিশেষ কাজ ছিল। আর আমি একটু চালাক চতুর ছিলাম বলিয়া আমাকে সকলে আদর করিতেন। তখন বালিকা-সুলভ-চপলতাবশতঃ তাঁহাদের আদর আমার ভালো লাগিত। কি করিতাম, কি করিতেছি, ভালো কি মন্দ কিছুই বুঝিতে পারিতাম না। কিন্তু খুব বেশী মিশিতাম না, কেমন একটা লজ্জা বা ভয় হইত। দুরে দূরে থাকিতাম, কেন না আমি বাল্যকাল হইতে আমাদের বাটীর ভাড়াটিয়াদের রকম সকমের প্রতি কেমন একটা বিতৃষ্ণ ছিলাম, যাহারা আমাদের খোলার ঘরে ভাড়াটিয়া ছিল; তাহারা যদিও বিবাহিত স্ত্রী-পুরুষ নহে, তবুও স্ত্রী-পুরুষের ন্যায় ঘর সংসার করত; দিন আনিত দিন খাইত এবং সময়ে সময়ে এমন মারামারি করিত যে দেখিলে বোধ হইত বুঝি আর তাহাদের কখনও বাক্যলাপ হইবে না। কিন্তু দেখিতাম যে পরক্ষনেই পুনরায় উঠিয়া আহরাদি হাস্য পরিহাস করিত। আমি যদিও তখন অতিশয় বালিকা ছিলাম, কিন্তু তাহাদের ব্যবহার দেখিয়া ভয়ে ও বিস্ময়ে অভিভুত হইয়া যাইতাম। মনে হইত, আমি তো কখনও এরূপ ঘৃণিত হইব না। তখন জানি নাই যে আমার ভাগ্য দেবতা আমার মাথার উপর কালমেঘ সঞ্চার করিয়া রাখিয়াছেন। তখন মনে করিতাম বুঝি এমনি মাতৃকোলে সরল সুখময় হৃদয় লইয়া চিরদিন কাটিয়া যাইবে। সেই মনোভাব লইয়া আমার বল্যসখীর বন্ধুদের সহিত বাহিরে বাহিরে আনন্দ করিয়া খেলা করিয়া, রাত্র হইলে স্নেহময়ী জননীর কোলে শুইয়া আনন্দ লাভ করিতাম। আমার ভ্রাতার মৃত্যুর কিছুদিন পর গঙ্গামণির ঘরে বাবু পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও ব্রজনাথ শেঠ বলিয়া দুইটী ভন্দ্রলোক তাঁহার গান শুনিবার জন্য প্রায়ই আসিতেন, শুনিতাম তাঁহার নাকি কোনখানে সীমার বিবাহনামে গীতিনাট্য অভিনয় করিবার মানস করিয়াছিলেন। তিনি একদিন আমার মাতামহীকে ডাকিয়া বলিলেন যে তোমাদের বড় কষ্ট দেখিতেছি তা তোমার এই নাতনীটিকে থিয়েটারে দিবে? এক্ষণে জলপানি স্বরূপ কিছু কিছু পাইবে, তারপর কার্য্য শিক্ষা করিলে অধিক বেতন হইতে পারিবে।তখন সবে মাত্র দুইটী থিয়েটার ছিল, একটী শ্রীযুক্ত ভুবনমোহন নিয়োগীর ন্যাশনাল থিয়টার”, দ্বিতীয় স্বর্গীয় শরৎচন্দ্র ঘোষ মহাশয়ের বেঙ্গল থিয়েটার। আমার দিদিমাতা দুই চারিটী লোকের সহিত পরামর্শ করিতেন, অবশেষে পূর্ণবাবুর মতে থিয়েটারে দেওয়াই স্থির হইল। তখন পূর্নবাবু আমাকে সুবিখ্যাত ন্যাশনাল থিয়েটারে, দশ টাকা মাহিনাতে ভর্ত্তি করিয়া দিলেন। গঙ্গা বাইজী যদিও একজন সুদক্ষ  গায়িকা ছিলেন, কিন্তু লেখাপড়া কিছুমাত্র জানিতেন না, সেইজন্য আমার থিয়েটারে প্রবেশের বহুদিন পরে তিনি সামান্য মাত্র লেখাপড়া শিখিয়া কার্য্যে প্রবৃত্ত হন, পরে উত্তরোত্তর উন্নতি কয়িা শেষ জীবন পর্য্যন্ত অভিনেত্রীর কার্য্যে ব্রতী ছিলেন।

এই সময় হইতে আমার নুতন জীবন গঠিত হইতে লাগিল। সেই বালিকা বয়সে, সেই সকল বিলাস বিভূষিত লোকসমাজে সেই নুতন শিক্ষা, নতুন কার্য্য, সকলই আমার নতুন বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। কিছুই বুঝিতাম না, কিছুই জানিতাম না, তবে যেরূপ শিক্ষা পাইতাম, প্রানপণ যত্নে সেইরূপ শিক্ষা করিতাম। সাংসারিক কষ্ট মনে করিয়া আরও আগ্রহ হইত। মাতার শোকদুঃখপূর্ণ মুখখানি মনে করিয়া আর ও উৎসাহ বাড়িত। ভাবিতাম যে মায়ের এই দুঃখের সময় যদি কিছু উপার্জ্জন করিতে পারি, তবে সাংসারিক কষ্ট ও লাঘব হইবে।

যদি ও রঙ্গালয়ে শিক্ষামত কার্য্যে করিতাম বটে, কিন্তু আমার মনের ভিতর কেমন একটা আগ্রহ আকাঙ্খা সতত ঘুরিয়া বেড়াইত। মনে ভাবিতাম, যে আমি কেমন করিয়া শীঘ্র শীঘ্র এই সকল বড় বড় অভিনেত্রীদের মত কার্য্য শিখিব! আমার মন সকল সময়েই সেই সকল বড় বড় অভিনেত্রীদের কার্য্যের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরিয়া বেড়াইত। তখন সবে মাত্র চারিজন অভিনেত্রী ন্যাশন্যাল থিয়েটারে ছিলেন। রাজা, ক্ষেত্রমণি, লক্ষ্মী ও নারায়ণী। ক্ষেত্রমণি আর ইহলোকে নাই। সে একজন প্রসিদ্ধা অভিনেত্রী ছিল। তাহার অভিনয় কার্য্য এত স্বাভাবিত ছিল যে লোকে আশ্চর্য্য হইত, তাহার স্থান আর কখন পূর্ণ হইবে কিনা সন্দেহ! বিবাহ-বিভ্রাটেঝীর অংশ অভিনয় দেখিয়া স্বয়ং ছোটলাট টমসনবলিয়াছিলেন যে এ রকম অভিনেত্রী আমাদের বিলতেও অভাব আছে। চৌরঙ্গীর কোন সম্ভ্রান্ত লোকের বাটীতে এক সময় অনেক বড় বড় সাহেব ও বাঙ্গালীর অধিবেশন হইয়াছিল, সেইখানেই আমাদের থিয়েটারে বিবাহ-বিভ্রাট” অভিনয় হয়, তাহার অভিনয় ছোট লাইসাহেব দেখিয়াছিলেন। যাহা হউক, মহাশয় অধিক আর বলিতে সাহস হইতেছে না। যে হেতু সেই গত জীবনের নিরস ও বাজে কথা শুনিতে হয় তো আপনার বিরক্তি জন্মিতে পারে, সেইজন্য এইখানে বদ্ধ করিলাম। তবে এই পর্য্যন্ত বলিয়া রাখি যে যত্ম ও চেষ্টা দ্বারা আমি অতি অল্প সময় মধ্যেই তাঁহাদের ন্যায় সমান অংশ অভিনয় করিতে পারিতাম।

 

আগের/পরের পর্ব<< আমার কথা – বিনোদিনী দাসী। (১)আমার কথা – বিনোদিনী দাসী। (৩) >>
শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
বিনোদিনী দাসী

বিনোদিনী দাসী

বিনোদিনী দাসী (১৮৬২/৩ - ১৯৪১): থিয়েটার অভিনেত্রী, রাইটার। ১৮৭৪ থেকে ১৮৮৬ এই ১২ বছর তিনি কলকাতার বিভিন্ন থিয়েটারে অভিনয় করেন। কবিতার বই – বাসনা এবং কনক ও নলিনী। আত্মজীবনী - ‘আমার কথা’ (১৯২০)।
বিনোদিনী দাসী

লেটেস্ট ।। বিনোদিনী দাসী (সবগুলি)

  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য