Main menu

বইমেলা ২০১৫ এর বই: আম্মা ও দূরসম্পর্কের গানগুলি – বর্ণালী সাহা।

বইয়ের নাম: আম্মা ও দূরসম্পর্কের গানগুলি।

ক্যাটাগরি: ছোটগল্প।

প্রকাশক : শুদ্ধস্বর।

গল্প-সংখ্যা: ১১।

প্রচ্ছদ: আরিফুল ইসলাম।


ব্যাক পেইজের টেক্সট

একজন বৃহন্নলা আত্মহত্যা করে প্রান্তিক জনোচিত অহংকারে। সমকামী স্বামীর হাতে খুন হওয়ার পর খেয়ালিয়া শান্তি মেননের ‘আত্মহত্যা’ ঘটে দিল্লির চাহনেওয়ালাদের মুখে মুখে। একজন বীরাঙ্গনা আত্মহত্যা করেন কারণ তাঁর গর্ভ আর তাঁর শরীর নিয়ে তিনি স্বাধীন। জলে কাদায় কোনো এক মায়ের ছেলে ডুবে যায়। তামাকের ধোঁয়া আবেদাকে মা বানিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়; এদিকে প্রবাস মৌসুমীকে বানিয়ে দেয় জীবন তৃষিত আম্মা। সেক্সটিং-এর চক্করে তবলাশিল্পী এষার বিদেহী শিল্প হারিয়ে যায়। অন্ধ পর্বতারোহী জীবনের প্রতিযোগিতায় লাগাতার দ্বিতীয় হওয়ার মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন। হাউজ বোটের ধারে বসে এক তাড়া প্রত্যাখ্যাত ছবি ভাসাতে থাকে বিশাখা।

বর্ণালীর গল্প বলার উপকরণ– জন্তুর কৌতূহল, শিশুর পর্যবেক্ষণ এবং শিল্পীর চিত্রকল্প। প্রায়-সাংগীতিক শৈলী ও পরিমিতিবোধ পাওয়া যাবে তীব্র গম্ভীর চিন্তার এই এগারটি গল্পে।

________________________________________________

 

ডুরি ছেঁড়া ঘুড়ি লো

*

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর নাতি যে রাতে মারা গেলেন, তার পরের দিন গেস্টহাউজে আমাদের সবাইকে শাকাহারী বানিয়ে দেওয়া হল। কিংবা ঐ গেস্টহাউজে শুধুউত্তর ভারতীয় ঘরের শাকাহারী খাবারই পরিবেশন করা হত মনে হয়। এখন পরিষ্কারমনে নাই।

এক এক গ্রাসের সাথে সাথে টেবিলের উপর ঢপ-ঢপ করছিল অসমতলদেশের স্টিলের থালি; আর থালির বুকের উপরে টুকুর টুকুর ভাত, রুটি, উরদ ডাল, রাজমা ছোলার বাটি। “রাতে নিজামে খাব। আচ্ছা? শাহী টিক্কা আর কড়াই চিকেন!”, সেলিম ভাই পাঁপড়ের কোণা ভিজাচ্ছিল টকদইয়ের বাটিতে চুবিয়ে চুবিয়ে। এই পাঁপড় এত বাজে! মনে হল মাড় দেওয়া কাপড় সারাদিন রোদে দিয়ে খরখরে শুকনা করে নিয়ে তারপর গুটিয়ে ঘরে এনে চিবুচ্ছি।

সেলিম ভাই তার আগের রাতে একটা গর্ভবতী ছারপোকা মেরেছিল। বিছানা তোশক আর খাটের চারধারে ব্লিচিং পাউডার ছিটানো; বেচারা ডিমওয়ালা পোকাটা খাবে কী? সারারাত ধরে অল্প অল্প করে সে সিলিং বেয়ে উঠেছিল; ডাইভ দিয়ে বিছানায় পড়বে বলে। আমরা দুইজনই ক্লান্ত ছিলাম। আমি আর সেলিম ভাই। দিল্লির পথে পথে সারাদিন সেলিম ভাইয়ের বউয়ের জন্য কেনাকাটা করেছিলাম। সেলিম ভাই দিল্লি বলতেই ‘নাল্লি’ বুঝত। মাদ্রাসী শাড়ির দোকান। কেন? সাউথ কটন, সাউথ কাতান। বোবা বোবা সোনালী জরির কাজ। মাপা আভিজাত্য। সেলিম ভাই খাদির কুর্তা পরত। সেলিম ভাই ছাড়া আমার কেউ নেই; তাই আমি সেলিম ভাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে আমার হবু বিয়ের হবু স্যুটকেস ভর্তি করে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত শাড়ি কিনেছিলাম। আমার স্যুটকেসের জন্য বেনারসী। আমার স্যুটকেসের জন্য জনপথ মার্কেটের চুন্দ্রির বর্ণালীফোয়ারা। রামুকাকারা গলার গামছা ফেলে সাফারি পরে ক্যাশবাক্সের পিছে বসে “হেহ্‌ হেহ্‌…আপকি ভয়েসকা টোন সে হি পতা চলতা হ্যায় কে আপ কলকাত্তা-সে হ্যায়!” বলতে বলতে মোটা মোটা লাভ রেখে শাড়ি গছানোর ধান্ধা করছিলেন। দুই পা একত্র করার সময় পাই নাই আমরা সেদিন। বিছানায় গা রাখতেই ঘুম।

সেলিম ভাইকে বুঝি পোকায় কেটেছিল। জায়গাটা জংলা হলেও ঝিঁঝি টিঁঝি ডাকছিল না। রাত দুইটার বাতিজ্বলা ঘরে জগন্নাথের মতো চোখ করে ঘাড়বেঁকিয়ে আমি বসে বসে দেখলাম অত উঁচুতে উঠে ডেসপারেট প্রেগন্যান্ট পোকাটাকীভাবে আত্মাহুতি দিল সেলিম ভাইয়ের হাতে। বাহাদুর শাহ জাফর মার্গ, ম্যাক্সম্যুলার মার্গ, কস্তুরবা গান্ধী মার্গ – দুনিয়ার সব মার্গের শহর দিল্লিতে তখন রাত। প্রয়াত নানীদের আটপৌরে শাড়ি হঠাৎ মহার্ঘমতো হয়ে উঠলে মা-খালাম্মারা যেমন করে রাখে, রাস্তায় রাস্তায় মার্গে মার্গে তেমন ভাঁজ করে রাখা ছিমছাম রাত। গর্ভবতী পোকাটা মরে যাওয়ায় যন্ত্রণায় আমার গলা ব্যথা করতে লাগল। শুয়ে শুয়ে ভোর হওয়া দেখতে দেখতে সেই পোকার কথাটা সেলিম ভাইকে বললাম আমি। ও ঘুমের মধ্যে কেঁদে ফেলল। ছারপোকাটা যতটা ব্যথা পেয়ে মরেছিল, আমরা দুজন মিলে তার চেয়েও বেশি ব্যথায় সজল হয়ে রইলাম।

পরদিন এম কে গান্ধীর নাতি অষ্টমার্গ লাভ করে গেস্ট হাউজ থেকে বেরিয়ে গেলেন — গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মতো দেবে যাওয়া চোয়াল, আর তুলসীপাতা গোঁজা অক্ষিকোটর নিয়ে পুরোদস্তুর পারলৌকিক জীবের বেশে।

 

 

“সেলিম ভাই, আমার কাছে পরকীয়া ভাল লাগে না। পরকীয়া মানেই মুনির-খুকু; ‘চাঞ্চল্যকর’ রিমা হত্যাকাণ্ড; পত্রিকার এপিঠ-ওপিঠ ফুঁড়ে ক্রিসক্রস হয়ে বয়ে যাওয়া খবর –- অমুক পৃঃ তমুক কঃ দ্রষ্টব্য। অফিসে দোকানে রান্নাঘরে হাহাকার — মুনিরের লগে খুকুর ক্যান্‌ ফাঁসি হইল না? পুতুল বিয়ে যেমন, ঐরকম ভাবেই নির্ধারিত পুতুল ফাঁসি ভেঙে গেল বলে কতজনে কেঁদে ভাসাইল বুক!”

“হুঁ, খুকু একটা বয়স্ক মহিলা ছিল। মুনিরের থেকেও বড়। আমি ভাবতাম, এই বুড়ির নাম ক্যান্‌ খুকু হইল?”

“ছোটবেলায় আমারও ডাকনাম ছিল বুড়ি।”

“পত্রিকায় খুকুর ছবি দেখছিলা? জঘণ্য দেখতে!”

চশমার ফ্রেম, আর রাধাবল্লভীর মতো দেখতে মুখটা শুধু মনে আছে। ছিট-ছিট তিল ছিল কি মুখে? দুইটাকার আইসক্রিমের আঁশ-ওঠা, ছিবড়ে হয়ে যাওয়া কাঠি ছিল যেন চিকনা শরীরটা। পত্রিকার খবর পড়ে সেইবার আমি প্রথম জানলাম যে ফান্টার বোতল দিয়ে মানুষ খুন করা যায়। আর নিহতের রক্ত কমলা রঙের। আর ঢাকার গলিতে গলিতে ভাঙা মাটির হাঁড়ির কানা ঘষে এক্কাদোক্কার ইটরঙা ঘর টানছে জ্যাক দ্যা রিপারের মতো একটা শাদাকালো লোক। এইরকম সব। আর আমার রোদের দিনগুলি ভর্তি করে থাকত কেমন অকপট মৃত্যুভয়! হন্তারক প্রেম এমন একটা জিনিস! নিজে মরো। নয়তো মারো। নয়তো বেহুদা অস্বীকারের হাঁটুছিলা পঙ্গু জীবনকে বয়ে বয়ে চল। আমি অলরেডি মরে প্রেতাত্মা হয়ে গেছি। আর সেলিম ভাই, তুমি পঙ্গু।

“মেয়েরা সব এই ঘরে শোও”, কোনো একদিন গমগম করে বলেছিলেন সেলিম ভাইয়ের বউ। ইভা ভাবী। সেইন্টমার্টিনের হোটেলে রুমভাড়া বাঁচাতে এই ডরমিটরি-মার্কা সিস্টেম করেছিলেন মাতব্বর ইভা ভাবী। একদল চারকোণা চারকোণা হুমদা ছেলে একটা ঘরে; আর গোল গোল মেয়েরা পরিষ্কার টাওয়েলবাথরুমওয়ালা আরেকটা ঘরে। ঐখানে ডানে-বামে মিল হওয়া কিছু নতুন-পুরাতন কাপল ছিল। কিন্তু পয়সা-কম যাদের জীবনে হুড়মুড় করে প্রেম ঢুকে যায়, ইভা ভাবী তাদের কথা কখনো ভাবেন নাই। তোমার পয়সা নাই? সতী থাক। চ্যাস্টিটি কই তোমার?

এইসব দেখে রাগে আমার সেলিম ভাইয়ের সাথে প্রেম হয়ে যায় সেইন্টমার্টিনে। ছেঁড়াদ্বীপে আমি একমাত্র মেয়ে হয়ে সেলিম ভাইকে একমাত্র পুরুষ বানিয়ে লাল টুকটুকে আপেল হাতে মনে মনে বিবস্ত্র বসে থাকি; সেই বসে-থাকার বালির উপর প্যাঁচকষা গুল্মের বাগানে বেগুনী বেগুনী শিঙা বাগিয়ে শয়ে শয়ে ধুতরা ফুল ফুটে থাকে ইত্যাদি।

saint martin_1

সেন্ট মার্টিনের দুটি ছাগল, এবং অন্যান্য। ফটো ক্রেডিট: রেজাউল করিম।

আমরা ফোন নম্বর চালাচালি করেছিলাম। সেলিম ভাই বিয়েতে সুখী ছিল না। সেলিম ভাই “মি অ্যান্ড মাই স্পাউজ” মর্মে ফেইসবুক স্টেটাস লিখতেন। বউকে স্পাউজ বলে ডেকে সেলিম ভাই তার এবং বিশালাক্ষী ইভা ভাবীর মোহহীন সঙ্গমহীন সংসর্গহীন বৈবাহিক যুগ্মাবস্থার ঘোষণা দিত নিজের অজান্তে। তারপরও দীর্ঘদিন সেলিম ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে আমি ভয় পেতাম। ভাবীকে ভয় পেতাম না। নিজেকে ভয় পেতাম; নিজের অনভিজ্ঞতা, প্রগলভতা, কাঁচা শরীর এবং খুনী মনকে ভয় পেতাম। এইসব ভয় পেতাম কারণ আমি তখন ছায়াসদৃশ ফিক্‌ল মানবিক আচারের প্রতিও গভীর বিশ্বাস ধারণ করতাম। সেই প্রেম পার হয়ে যখন এই প্রেমে এলাম, সেই প্রেমের সময়টার মতোই মনে করতে লাগলাম যে এই প্রেমটা– ইয়েস ইয়েস এই প্রেমটা – বিয়ে পর্যন্ত অবশ্য অবশ্যই গড়াবে। তখনো আমি মনে করতাম বিশ্বাসের শাক দিয়ে নিজের সব ক্ষুদ্রতা আর সীমাবদ্ধতাকে ঢাকা যায়।

“হাই, দিস ইজ মি। হোয়াট ইজ দ্যা বেস্ট টাইম টু কল ইউ?”

“লেট মি কল ইউ। হোয়েন শুড আই?”

“স্যরি, আই ফেল অ্যাস্লিপ। ইজ ইট ওকে ইফ আই কল ইউ টুমরো?”

“ইউ নেভার কল্‌ড! আই উইল ট্রাই টু কল ইউ আফটার ফাইভ পিএম।”

তুমি আসবে? না, আমিই বরং আসি। কখন আসব? বললে না তো! আচ্ছা কাল আবার জিজ্ঞেস করব কখন আসব। কাল কখন জিজ্ঞেস করব? এখন এটা জিজ্ঞেস করছি দেখে বেজায় অসুবিধা হচ্ছে, না? কখন জিজ্ঞেস করলে সুবিধা হবে? হুঁ। এমন কত চাইলেই-হয় তবু শুধু-চাইলে-হয়-না গোছের পায়ের চিহ্ন আমরা একে অন্যের জীবনে ফেলতে গিয়েও ফেলতে পারি নাই! দীর্ঘদিনের অদৃশ্য অভিভাবক আমাদের নিয়তির কাছে কতকাল লজ্জাস্থানের মতো ঢেকে ঢেকে চলেছি আমাদের হৃদয়কে!

তখন আমরা দিল্লিতে। আর নিয়তি দেশে। সেদিন আমাদের গেস্ট হাউজে মাইক্রোবাস ঢুকে গেল। আমি সেজেগুজে সেলিম ভাইয়ের হাত ধরে গাড়িতে উঠে পড়লাম। নানারকম চামড়ার রঙে ট্যুরিস্টবাহী গাড়িটা ঘিঞ্জি লাগতে থাকল। গাড়ি চলতে লাগল আর আমরা আমাদের সহযাত্রীদের খুব কাছের গরীব বন্ধুর মতো বেশি বেশি ইংরেজি বলতে লাগলাম। শুধু নিজেদের ভিতরকার ঠেস-মারা ঠোনা-মারা কথাগুলি বললাম বাংলায়। “আগেই বলছিলাম বৃষ্টি পড়বে। হুদাই সানস্ক্রীন মেখে গন্ধ মাদন হইয়া রইছ!”, “এত বুঝলে ছাতা আনতা! নাকি বউ ছাতা প্যাক করে দেয় নাই?”, “বালের আলাপ বন্ধ কর” – এইসব আমরা কর্কশ বাংলাভাষায় এমনভাবে চেঁচিয়ে বললাম যেন এই ভাষায় পৃথিবীর কেউ কখনো কাউকে ভালবাসে নাই। এক একটা দর্শনীয় স্থানে আমরা এবং আমাদের বিদেশী সহযাত্রীরা ভারতীয় দর্শনার্থীদের তুলনায় দশগুণ বিশগুণ টাকার টিকেট কেটে ঢুকলাম। আমাদের ট্যুরিস্ট গাইড ছিলেন কপাল জোড়া তিলক-কাটা কাঁচাপাকা চুলের এক ফটকা ডলার-দোয়ানো বান্দা। তাঁর পৃথিবীটা হিন্দু, স্বর্গটাবিগত, আর বিদেশীরা ছাত্র। তাঁর হিটলারের পতনের মূল কারণ পবিত্র স্বস্তিকাচিহ্ন পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি রোটেট করে পতাকায় ঝুলানো। তাঁর সম্রাট হুমায়ূনের বিশেষত্ব দানবাকৃতি চরণযুগল। তাঁর গাড়ির প্যাসেঞ্জার মেয়ের নাম ‘টারা’, যার দিকে তিনি পিতার মতো তাকিয়ে বললেন, “তারা ইট মিনিংস্টার”। এনআরআই একটা পরিবার ছিল, তাদের দুই বাচ্চা আমেরিকা থেকে আনা পানি খাচ্ছিল। ডায়াপারের ভারে ছোটটার পাছা ঝুলে ছিল। কুতুবমিনারে নেমে বড়টা –- বছর দশেকের হবে — বলতে লাগল, “ইউ গট ড্রুপি অ্যাস্‌!”। ছোটটা রাগ করে গরগর করল। বড়টা আবার বলল, “ইফ সামবডি ওয়্যার টু কল মাই অ্যাস্‌ ড্রুপি, আই উড টেইক দ্যাট উইথ আ পিঞ্চ অফ সল্ট। অ্যান্ড আ স্লাইস অফ লেমন। অ্যান্ড আ শট অফ টেকিলা”।

qutab-minar

কুতুব মিনার। ফটো: গুগুল সার্চ-এর রেজাল্ট থিকা নেয়া।

আমি ওর কথা শুনে বেআক্কেল বনে সেলিম ভাইকে ঠেলতে লাগলাম। সেলিম ভাই ওদের কথা বুঝল না।

হুমায়ূনের সমাধির অন্দরসজ্জার স্থায়ী অংশ হয়ে গেছে ঝুলকালি, ক্যামেরা আর অন্ধকার। সমাধিফলকের বাইরে ঝলমলে সবুজ দিল্লিটা বাউন্ডারি দেয়াল পর্যন্ত যতখানি গেছে, ততটুকু পর্যন্ত হুমায়ূনের নতুন রাজধানী। “সেলিম ভাই, ছোট হতে হতে অতটুকু? নাকি বড় হতে হতে এত্ত বড়?”।

ইব্রাহিম খাঁ লোদি সম্ভবত সেনাপতির হেডগিয়ার পরে আমাদের তিলককাটা গাইডের রাতের দুঃস্বপ্নে ছোরা নিয়ে আসে। কুতুবমিনারের পাদদেশে বিষ্ণুমন্দিরের থামের গায়ে গভীর করে খোদাই করা লতাপাতা আর পদ্মফুলের অলিতে গলিতে চাপিয়ে দেওয়া আরবি হরফ আর পীনস্তনী দেবদাসীদের ঘষে সমান করে দেওয়া বুক দেখাতে দেখাতে আমাদের গাইড বললেন তাঁর দুঃস্বপ্নের ইতিহাস। “দি মুসলিমস ওয়্যার ব্রুটাল!”। সেলিম ভাই ছাড়া আমাদের মধ্যে মুসলমান আর কেউ ছিল না। সেলিম ভাই কনফ্রন্টেশন পছন্দ করে না। সেলিম ভাই গান করতে লাগল, “আয়ে কুছ আব্‌র, কুছ শরাব আয়ে, উস্‌কে বাদ আয়ে যো আজাব আয়ে!”। এই গানের একটা লাইন সেলিম ভাইয়ের দারুণ পছন্দ, “হাম যাহাঁ পহুঁচে, কামিয়াব আয়ে”। ‘পহুঁচে’ শব্দটা রেখাবের উপর দাঁড়িয়ে এমনভাবে উচ্চার করতে হয়, যেন মনে হয় রেখাবের বিশাল দিগন্তের কোনো এক মধ্যবিন্দুতে একদম পহুঁচে গেলাম। সেলিম ভাই তো আর ঐসব জানত না। এমনিতে কোথাও ঠিকঠাক না পৌঁছে কামিয়াব হওয়া কারো শিখতে হলে সেলিম ভাইয়ের কাছে শেখা উচিত।

আমরা লালকেল্লার বাইরে এমনি এমনি দাঁড়িয়ে ছিলাম। কলকাতার এক দম্পতি নিম্বুপানি খাচ্ছিল আমাদের পিছে দাঁড়িয়ে। “একফোঁটা ভি বরফ মত ডালিয়ে। ইন্‌কা গলা খুব খারাপ হ্যায়!”, বরটা বলছিল বিক্রেতাকে।

“সেলিম ভাই, নয়াদিল্লির মানুষ কেমন কমিউনাল। না?”

“হুঁ।”

“আমাকে ঐদিন কনট প্লেসে নামানোর সময় ট্যাক্সিওয়ালা বলল, বেহেনজি, আপ কিসি বাংলাদেশী মাউন্ডন-সে শাদি মত কিজিয়েগা! মুসলমানদের মাহুন্ড বলে। হি হি হি। আমাদেরকে যেমন দেশে মালাউন বলে। ‘ম’ দিয়ে গালি দেখি দুনিয়ার সব…”

“হা হা। ভাল একটা ওয়ার্ড শিখাইলা! তবে বম্বেতে শুনছি কাট্‌লু বলে। ইসলাম ওদের কাছে একটা হাজাম-নির্ধারিত মজহব।”

“ইশতিয়াকের বাপ আমাকে মালু বলেছিলেন। আমার সাথে ইশতিয়াকের প্রেমটা ভাঙাতে চেয়েছিলেন উনি। ইশতিয়াক কোরিয়া চলে যাওয়ার পর প্রথম আমি উনাদের বাসায় গেছিলাম। লালবাগের দিকে। বহু ঘুরপথ পেরিয়ে পৌঁছেছিলাম। পাগলা ঘণ্টি ঝোলানো কারাগারের ফটক আর পাঁচিল ডাইনে রেখে। ছোট ছোট দোকানে সার সার শস্তা পারফিউম আর কেমিক্যালের বোতল পেরিয়ে। গলির ভেতরকার ট্যানারির গন্ধ ইত্যাদি ডিঙিয়ে।”

“শ্যামার কথা তোমাকে বলছিলাম? শ্যামারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেয়ে। মগবাজারে আমাদের প্রতিবেশী ছিল। ওর মা আমাদের স্কুলের টিচার ছিলেন। আম্মা মারা যাওয়ার পর ওর মা আমাদের দুইভাইকে স্কুল থেকে আনা নেওয়া করতেন। শ্যামা ভাল গান করত। ওদের বাসায় মাগরিবের আজানের সময় টিভির ভলিউম কমিয়ে সন্ধ্যারতি হত।”

“ইশতিয়াকের মা কাঁদছিলেন। খুব অপ্রস্তুত হয়ে কাঁদছিলেন। উনার ছেলে কত দূর-দূরান্তে ছেয়ে গেছে; উনি কতদিন দেখেন না ছেলেকে! ছেলের বান্ধবীকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখলেন। উনার আঙুলে ছিল আদাবাটার গন্ধ। সূর্যের আলো কম ঢোকে, এমন একটা জংলা বাড়িতে স্নেহের মতো চকমকি পাথর কুড়িয়ে পাওয়া যায়! আমি এমন বাড়িতে আগে কখনো ঢুকি নাই।”

“শ্যামার নানার ছিল আটাময়দার মিল আর মশলা ভাঙ্গানোর দোকান। সেটা আমরা জানতে পারছিলাম খুব অদ্ভুতভাবে। রেড ক্রিসেন্ট অফিসের পাশে একজন টকটকা ফর্সা বুড়ালোক শুয়ে থাকত নিজের হাগুমুতুবমির মধ্যে। আমরা স্কুল থেকে ফিরতেছিলাম। শ্যামার মা’কে একদিন দুপুরে শুয়ে শুয়ে ডাকতেছিল লোকটা “গৌরী! গৌরী!” করে। প্রথমে শুয়ে শুয়ে, তারপর মাথাটা একটু তুলে — মানে যতটুকু তোলা যায় – আহারে কী আকুল হয়ে ডাকতেছিল! রেড ক্রিসেন্টের টিকাকেন্দ্রের আন্টিরা সার বেঁধে রাস্তা ক্রস করতেছিল। তাদের পরণে ইউনিফর্ম শাড়ি। মনে হয় শাদা জমিনে নীল পাড়। আমি শ্যামার মায়ের হাত ধরে পিছে তাকাচ্ছিলাম সারি সারি আন্টিদের শরীরের ফাঁক দিয়ে ঐ লোকটাকে দেখার জন্য। আমি চিৎকার করে শ্যামার মা’কে বললাম, আন্টি, ঐ যে লোকটা আপনাকে ডাকে। আপনার নাম কি গৌরী? ডাকতেছে দেখেন!”

“ইশতিয়াকের আম্মা বললেন, আম্মাগো তোমারে চা দিই। তুমি তারপরে চলে যাও। একটু পরেই ওদের আব্বা আসবে অফিস থেকে। উনাকে আমার আম্মা ডাকতে ইচ্ছা করল, জানো সেলিম ভাই? মুসলমানদের মায়েরা একদম ভীরু সাদামাটা পাখির মতো হয়। কিন্তু উনারা এমন যে উনারা মরে গেলে মোহম্মদ রফির গানের মতো ফাগুন-টাগুন বিদায় নেবে।

আচ্ছা, স্যরি, তোমার আম্মাও তো চলে গেছেন…”

“তো শ্যামার মা হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে আমাকে বললেন, থেমো না। ঐ লোকের কথা শুনো না। পরে উনি আমার ফুপুদেরকে বলতেছিলেন যে ঐ বুড়ালোক নাকি উনাদের দেশের বাড়ির তালুকদারের পোলা। কোন্‌ মেয়ের প্রেমে ধরা খেয়ে পয়সা খোয়ায়া পাগল হয়ে গেছিলেন। বহু আগেই। নজরুলের মতো সিফিলিস হইছিল এরকমও শুনা যায়। যাই হোক, উনি কোনো একভাবে ঢাকা চলে আসছিলেন। আর এত্ত বড় জালবিছানো শহরের পথে পথে পাইছিলেন শ্যামার মা’কে…হয়তো শুধু শ্যামার মা ছাড়া উনার এই জগতে আর কেউ নাই, কিচ্ছু নাই! কিন্তু শ্যামার মায়ের আর কী করার আছে? উনার নাম তো আর সত্যি সত্যি গৌরী না।

আমি ফুপুর পায়ের কাছে খেলতেছিলাম। টয় ট্রেন। আর বুড়াটার গল্প শুনতে শুনতে আমার থুতনি বেয়ে কালো পিঁপড়ার মতো নামতেছিল আমার চোখের পানি। আমি বললাম, ফুপু, আমি বাথরুমে যাই? পা ধুব। ময়লা লাগছে।”

“ইশতিয়াকের আব্বা অফিস থেকে আসার আগেই ইশতিয়াকের মেজবোন ঢুকল কলেজ থেকে। আমাকে দেখে সম্ভবত মনে করল ওদের কোনো কল্পিত রাজ্যের কল্পিত প্রজা ওদের বৈঠকখানায় বসে আছে। আমি এই ধরণের অ্যাটেনশন চাচ্ছিলাম। ঘরটা ছিল আধো অন্ধকার। মুখটা যথাসম্ভব করুণ করে আমি ইশতিয়াকের বোনের দিকে চাইলাম। কেন যেন সে খুশি হল। ঝপ্‌ করে আমার পাশে রাখা ল্যান্ডফোনে নাম্বার ঘোরাতে শুরু করল। ফোনে বলতে লাগল, “শুন্টুনো বন্টড় আন্টাপি! ওন্টই মেন্টেয়েটা আন্টাসছেন্টে। তুন্টুমিও আন্টাসো! মন্টজা হন্টবে!”। বুঝলাম ওদের বড়বোনকে ফোন করেছে মেজবোন। ওর সৌজন্যহীনতায় অসুস্থ জানোয়ারের মতো আমার মাথা নিচু হতে থাকল। ইশতিয়াকের আম্মা রান্নাঘরে চামচ ঘোরাতে লাগলেন। কোত্থেকে যেন কাঁচা মেহেদি বাটার গন্ধ আসতে থাকল।

এই স্যাঁতসেঁতে তীব্র বাড়িটা আমার ভালবাসার ভালমানুষটার।”

“শ্যামার নানার আটার মিলের নাম ছিল গৌরীশংকর আটামিল। শ্যামার মায়ের নাম গৌরী না। শ্যামার মামার নাম শংকর না। কেউ কিছু না। আমি আমি না। তুমি তুমি না। আমাদের শহরের হিন্দুরা অলরেডি হাশরের ময়দানে থাকে। তোমার তাই মনে হয় না?”

“ফাইনালি ইশতিয়াকের বাপ। উনি অফিস থেকে আগে আগে চলে আসলেন। হাঁপানির কুয়া থেকে উঠে আসলেন যেন। উনি ইংরেজি ভাল বলেন না। কিন্তু উনার স্পষ্ট করে বলা ‘অর্থোডক্স মুসলিম’ শব্দ দুইটা আজও কানে লেগে আছে, সেলিম ভাই। আমি উনার চিড়িয়াখানায় বসে ভেউভেউ করে কাঁদলাম। কিন্তু উনাকে কেউ থামতে শেখায় নাই। তালের শাঁসের মতো চোখ করে কাশতে কাশতে শুধু “ছেড়ে দাও” “ছেড়ে দাও” “ছেড়ে দাও” করতে থাকলেন। যাকে ছাড়ব, সে ততদিনে কত কী ছেড়ে…যাই হোক।

আমি সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় উনাকে শেষবার সালাম দিলাম। উনি সুর করে বলে উঠলেন, “বল কী! তুমি সালামও দিতে পারো?”। উনার চোখ দেখতে মাছের চোখের মতো ছিল। শাদা শার্টটা খুললে হয়তো দেখা যেত রেইনবো ট্রাউটের মতো মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেছে একটা লালাভ রেখা। মুখটা হাঁ হয়ে ছিল উনার। আমি নামছিলাম; আর উনি দেয়ালে হেলান দিয়ে আস্তে ধীরে আয়েস করে দীর্ঘসময় ধরে একটা হাই তুলতে শুরু করলেন। সেই হাঁ করা মেছো মুখটা বন্ধ হবে কিনা দেখার আগেই আমি নেমে গেলাম নিচে। চোখের জলে আমার ওড়না ভিজে গেছিল। মানে স্বখাত সলিলে। ওদের চারতলা বাড়ির তলে দাঁড়িয়ে আমি চোখের জলে ডুবতে ডুবতে দেখলাম ট্যানারির কাঁচা চামড়া রাস্তার এইপার ঐপার করছে। রিকশা সিএনজি কিচ্ছু নাই। ছিল শুধু একটা টুকটুক। নাকি ময়ূরী? আঠালো মধুতে পা আটকে যাওয়া মাছির মতো টেনে টেনে ঘন্টায় পাঁচ মিটার বেগে আমি চলতে লাগলাম। টুকটুক বা ময়ূরীতে বসে বসে কাঁদতে কাঁদতে আমি ঠিক করলাম কোরিয়া যাব। এই হৃৎপিণ্ড দলে-পিষে পাঁজরা ভেঙে-চুরে শুধু গর্ভে বাড়তে থাকা, নাইটকুইন আর ঢোলকলমীর আরবান লেজেন্ডওয়ালা মনমরা শহরের অনন্ত জরায়ু থেকে আমি যদি টুপ করে খসে পড়ি? যদি খসে পড়ি? যদি খসে পড়ি?

ইশতিয়াক আমাকে ধরবে। ধরবে। ধরবে।”

 

*

বিবিমবাপের ঘ্যাঁট। তোফুর ছক্কা। দুপুরে এইসব খেয়ে সোল থেকে হংকং এসে থেমেছিলাম। বাড়ি ফিরব। বাড়ি। আস্তে দৌড়ানো মুরগির মতো ইশতিয়াককে ছেড়েছুড়ে ছুটে এসেছিলাম আজীবনের জন্য, আর পিছন ফিরে বারবার তাকাচ্ছিলাম ফোনে-ইমেইলে-ফেইসবুকের দিকে, মোরগাটা পিছে পিছে আসছে কি? আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম, আসছে না; আসার কোনো চিহ্ন নাই। সারাজীবনের জন্য একটা ক্ষত বয়ে বেড়াতে হবে; কারণ আমি দেখতে পাচ্ছিলাম ওর আসার কোনো চিহ্ন নাই। আমি বুঝতে পারছিলাম, ও একদমই মনে করে না আমি ওর জীবনের শ্রেষ্ঠতম জিনিস ছিলাম। আমি ভুলে গেছিলাম ও আমার চেয়ে বারো বছর বড়, তাই ও জানত জীবনে কোনো জিনিসই শ্রেষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আসে না।

আমার খুব শান্তি লাগে কোনো মানুষকে দেখিয়ে দেখিয়ে কাঁদতে। কারুণ্যের মধ্যে একটা শিল্প যে আছে, একটা আকুল সৌন্দর্য যে আছে, কিন্তু হায়রে এই এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে তার দর্শক ছিল না। ইশতিয়াক মোরগাটা দৌড়াচ্ছে না, দৌড়াবে না আমার পিছে।

পঞ্চাশ-ষাটটা ঘুমের ওষুধ কোথায় পাওয়া যায়?

হংকং এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে একটা বাচ্চা লুডো খেলছিল একা একা। পাশে ওর মা বসে ম্যাগাজিন পড়ছিল। বাচ্চাটার মাথা ন্যাড়া। অতিকায় বামনতারার মতো মাথাটা ওর; যদি কিছু মনে না করেন-এর রবিউলের মতো লিকলিকে শরীরের ফ্রেইম। ফেলে দেওয়া কুড়িয়ে পাওয়া একটা ওষুধের কৌটার ভেতর ছক্কাটা বুটুর-বুটুর করে নাড়িয়ে তারপর গড়িয়ে দিচ্ছিল বারবার ও।

কবে যেন বাবার সাথে নাপিতের দোকানে গিয়ে মাথা ন্যাড়া করে ফিরেছিলাম। ছবিতে দেখেছি — দাবদাহে বিলীন হয়ে যাওয়া বনভূমির সীমানার মতো আমার কপালের উপর জেগে ছিল কালো লোমের বলয়রেখা। ক্ষুর আর কতদূর যাবে? মা আজও বলে সেইসময় নাকি আমাকে দেখলে তার কান্না পেত। “এতটুক একটা মানুষ ছিলি – কিন্তু পুরাটাই চোখ!”।

আমি এতদিনে বুঝলাম কেন মায়ের কান্না পেত। আহারে, লুডো খেলা ন্যাড়া বাচ্চাটা! ও খেলছিল, আর ওর ছক্কাটা আটকে গেছিল ওর কুড়িয়ে পাওয়া ওষুধের কৌটাটার মধ্যে। নাড়ছে নাড়ছে…কোনোভাবেই বের হচ্ছে না। ছক্কাটা আটকে পড়েছিল দেখে আর বুটুর বুটুর আওয়াজটাও হচ্ছিল না। ছোট্ট আঙুল যতদূর যায়, ততদূর পর্যন্ত বাচ্চাটা ঢুকিয়ে দিয়েছিল কৌটার ভিতরে। লাভ হচ্ছিল না। কী ভেবে ছিক্‌ করে কৌটাটার ভিতরে থুতু ফেলল। তাতেও হল না দেখে নিজের হাঁটুর উপর কৌটাটাকে ভোঁতা শব্দ করে আছড়াতে লাগল। আ-আ…আ-আ…

“হোয়াট!?”

“মাম…মাম, প্লিজ গেট মি আউট। গেট মি আউট!! প্লিজ!!!”

মা’টা ম্যাগাজিন থেকে চোখ না সরিয়ে আঙুলের এক গুঁতায় ছক্কাটা বের করে আনল। আমি আর বাচ্চাটা দুজনই আনন্দে ক্যালক্যাল শব্দ করে হেসে ফেললাম। মা’টা প্রথমে অবাক হয়ে, তারপর ভীষণ লজ্জা পেয়ে আমার দিকে তাকাল। তারপর হাসল। তারপর বাচ্চাকে লুডোর বোর্ডসহ ভাঁজ করে গুটিয়ে জড়িয়ে ধরে চম-চম করে চুমু খেতে লাগল। আমিও মায়ের কাছে যাব। আমার মা’কেও লাগবে। এখনই। আমার বুকের ভিতর গুমগুম করে অন্ধকার হতে লাগল। আমার মা যদি জানত, কোনোদিন আমাকে ইশতিয়াকের সাথে মিশতে দিত না। কোনোদিন ওদের স্নেহের পাথরে বাঁধানো জেনোফোব বাড়িতে যেতে দিত না। কোনোদিন কাঁদতে কাঁদতে টুকটুক বা ময়ূরীতে উঠতে দিত না। বিশ্রী বকাঝকা দিয়ে হাতে টিস্যু পেপার ধরিতে দিত, আর বোকার মতো ভেউভেউ করে মনে মনে “আমার বাপন…আমার বাপন” করে কাঁদত, আর আমি মনে-মনের ব্যাপার বুঝতে না-পারার লাইসেন্স নিয়ে জন্মেছি দেখে ভাবতাম এমন ডাইনিবুড়ির পেটে কী করে এসেছিলাম আমি। খালি বকে!

কিন্তু, যেমন ইশতিয়াকরা — ওরা কেমন করে যেন জন্মায় মায়েদের সমস্ত ব্যাপার বুঝতে পারার ডিগ্রি নিয়ে। তাদের মায়েরা ভালবাসার অধিষ্ঠাত্রী দেবী, এবং পৃথিবীর সকল ভালবাসার শুরু এবং শেষ তাদের মায়েদের মাঝেই –- এমন একটা বোধ শুধু তাদের নয়, তাদের মায়েদেরকেও আচ্ছন্ন করে রাখে। (যাঁরা বারুদ বানান, তাঁরা প্রায়ই মনে করেন আগুন তাঁদের আবিষ্কার।) অতএব তাদের মায়েদের নিবিড় কোলে তারা যখন ঢুকে বসে থাকে, তারা কখনো তাদের মায়েদের ডাইনিবুড়ি ভাবে না। ঐখানে তারা মমতার সৌধ গড়তে হাত লাগায় পুরা জগৎসংসারকে সাথে নিয়ে। আর এইখানে-ঐখানে-সেইখানে দুনিয়ার কত্ত সৌধ অক্লেশে ভেঙে দিয়ে তারা দিয়ে এগিয়ে যায়, সেইসব ভেবে আর অযথা বিদ্বেষে ডুবি কেন? সেলিম ভাইকে পরে একসময় বলেছিলাম, কত কত মানুষ তাদের অসীম ভালবাসা আঁতুড়ঘরেই খুঁজে পেয়েছে; খুঁজে পেয়েছে তাদের মায়েদের চুলের গন্ধে, শিশুদের উলের মোজায়! আর আমি কত্ত বড় অবোধ যে পথে পথে হাঁটছিলাম, গড়াচ্ছিলাম, হামা দিচ্ছিলাম, ক্রল করছিলাম, নাক টেনে টেনে কাঁদছিলাম।

সেলিম ভাই দুনিয়ার কোথাও কিচ্ছু খুঁজে পায় নাই। আমার মধ্যেও না। তাই আমি, ইশতিয়াক আর সেলিম ভাই –- আমাদের তিনজনের মধ্যে লাভের হিসাবে ইশতিয়াক ফার্স্ট, আমি সেকেন্ড, আর সেলিম ভাই লাড্ডু গুড্ডু।

আমি যেদিন কোরিয়ায় পা রাখি, ইশতিয়াক আমাকে এয়ারপোর্টে নিতে আসে নাই। ঠিকানা টেক্সট করে দিয়েছিল। ফেলে আসা পোষা কুকুরের মতো কীভাবে যেন আমি ঠিকঠাক পৌঁছেও গিয়েছিলাম। গলির মুখে ওকে দেখতে পেয়ে আমার হাতপা কাঁপছিল। আমি এই দেখার মুহূর্তটা কতরকম আলোয়ই না ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখেছিলাম ওর পর্যন্ত আসবার আগে! এক ঝলক এপিফ্যানির মতোও হয়েছিল– ওর ঘরে, ক্লজেটে, বিছানার চাদরে অন্য মেয়ের গন্ধ পাব একটা। এতদিন ধরে ও বিদেশে! ভেবেছি আহা, এমন হলে ও নিশ্চয়ই ধরা পড়ে মাফ চেয়ে সব মিটিয়ে ফেলবে। আমি এতে ক্ষতিপূরণ হিসাবে ওর অনেক অনেক ভালবাসা পাব। আর সাথে সাথে সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে।

অফিসপাড়ার কাছে রোদ উঠেছিল সেদিন। স্যুট-টাইপরা ইংরেজি না-জানা লোকেরা গ্যাংনাম অঞ্চলের স্কাইলাইনের জমিনে নিভু নিভু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইশতিয়াক আমার হাতটাও ধরল না। “এইদিকে” বলে বাড়ির গেটের দিকে হাঁটতে লাগল। আমি কিন্তু-কিন্তু করে ওর পিছু নিলাম।

ইশতিয়াকের স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট ছিল একটা বদ্ধ বিল্ডিং-এর মধ্যে; কুকুর বা শুকর বা কোন নাম-না-জানা অস্পৃশ্য খাবার রান্নার পূতিগন্ধে পুরো দালানের বাতাস সান্দ্র হয়ে ছিল। তিনতলা বেয়ে উঠলাম আমার চারচাকার স্যুটকেস নিজ হাতে বয়ে বয়ে। মনে পড়ছিল না, ইশতিয়াক শিভালরাস ছিল, নাকি কখনোই ছিল না। “না, না…আমি মেয়ে, তো কি? আমি বুঝি স্যুটকেস তুলতে পারি না?”; “না, না…ও এখনো আমাকে ভালবাসে”; “যদি না-ও বেসে থাকে, তাহলে এখন বাসবে”। হুঁ, আমি এসে গেছি। এবার আমাদের সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। ওর মা, ওর বাবা, ওর বোনেরা, ওর লালবাগের বাসা –- সবকিছু আমি ফেলে এসেছি। বিশাল দামের টিকেট কেটে নিজের অ্যাকাউন্ট খালি করার দামে সবকিছু আমি পিছে ফেলে আসতে পেরেছি।

ইশতিয়াক এক সপ্তাহ টানা অফিস করল। বাড়ি ফিরে আমার রান্না খেল, জীবনে প্রথমবারের মতো; অথচ এমনভাবে খেল যেন এটাও ওর রুটিন। তারপর ঘুমাল। ভোরবেলা আমার ঘুম ভাঙার আগেই প্রতিদিন অফিসে চলে গেল। আমার গালে একফোঁটা চুমুও পড়ে নাই কোনোদিন। এই দুঃখে আমার সহজে ঘুম ভাঙতে চাইত না।

সকালে উঠে আমি ভাষাসংগ্রামে নামতাম। দোকানে গিয়ে ফলমূল, সবজি, তোফু, ডিম, মাশরুম, শাকপাতা কিনতাম পুরাপুরি বোবা হয়ে। পথেঘাটে দোকানে বাজারের মানুষেরা ওদের নিজেদেরকে ছাড়া কাউকে বুঝত না। আমার কান্না পেত। নিজের জমানো পয়সায় প্রতিদিনের কেনাকাটা সারতাম। ও কেন পয়সা দেবে? ও তো এইসব চায় নাই। আমি চেয়েছিলাম। ও দুইবেলা কেএফসি খেয়ে খেয়ে মরা মুরগি হয়ে যাচ্ছিল দিনকে দিন। আমি ওর বউ হতে চেয়েছিলাম। ওকে মৃত্যু থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। ও তো সত্যবান হতে চায় নাই। ওর কিছু যায়-আসত না। অফিস যাওয়ার আগে বাথরুমের উত্তল দর্পণে চিমটা দিয়ে নিজের ভুরু প্লাক করতে করতে এক সকালে ও জিজ্ঞেস করে বসল আমি কবের ফ্লাইটে ঢাকা ফেরত যাচ্ছি। আমি কিছু বললাম না। ঘুমের ভাব ধরে রইলাম। কেন যাব? আমি কেন যাব?

ও অফিসে চলে গেলে আমি এক নিষ্ঠুর খেলা মক্‌শো করতাম। খেলাটার নাম ছিল ‘ফাইন্ড আ পেয়ার’। ইশতিয়াকের বাড়ির ভিতর খুঁজে খুঁজে পেয়েছিলাম কতই না একান্ত জিনিসপাতি –- সব জিনিস ছিল একজোড়া করে, এবং প্রায়-আইডেন্টিকাল। পুরানো হয়ে যাওয়া বাথরুমের স্লিপার –- এক জোড়া। কফির মগ –- এক জোড়া। ছিবড়া হয়ে যাওয়া টুথব্রাশ –- এক জোড়া; একটা লাল, একটা নীল। ওর সাথে এই বাড়িতে কে থাকে? আমি আসার আগ পর্যন্তও কি ছিল? এখন আমি কী করব? ওকে জিজ্ঞেস করব? থাক। নিজের আঠালো অশ্রুতে আমার গা ঘিনঘিন করতে থাকল। শুধু মনে হতে থাকল রোজ –- কোথায় ধর্ম? কোথায় শৈশব? যদি পারতাম, আমার শিউলি ফুলবেলপাতা বা ওর আতর-গোলাপের গন্ধে নিজেকে ঘষে ঘষে ফর্সা করে নিতাম। কোথায় আমার দেশ? পুবে না পশ্চিমে? ফিরে যাব? টিকেট কাটব? তিনহাজার ডলার দূরে আমার দেশ। আমার ভাষা। আমার লোকজন। মাই ফোক্‌স। আমাকে চষে খাওয়া সুবিন্যস্ত লালবাগ-নীলবাগের বাড়ি।

কেন যাব? তার চেয়ে বরং রয়ে যাই। নবজাতকের মতো সুন্দর চকচকে একটা শহর। এইটার নাম সিউল না; সোল। একটা ঘুঘু ডাকছিল। একটা বাচ্চা মাকড়সা দেয়াল বাইছিল। নিষ্কাম প্রেমে মরে যাওয়ার শান্তিতে আমার বুক ভেঙে গেল। বউ হয়ে না পারি, ট্যুরিস্ট হয়ে রয়ে যাই তবে; যতদিন পারি। টিকেটের টাকা উসুল করি। আমি জানি না প্রেমে নিহত হয়ে কেন দিনরাত খালি আমার মাথায় টাকা উসুলের চিন্তা ঘুরত তখন। দিন দিন আমার হাত খালি হয়ে যাচ্ছিল।

প্রথমেই গেলাম গাইনির ডাক্তারের কাছে চেক-আপ করাতে। দেশের চেক-আপ তো ভুলভাল হয় শুনেছিলাম। (তাছাড়া ইশতিয়াক আমাকে ভ্যাজাইনাল ওয়ার্ট দেয় নাই তো? কিংবা ক্ল্যামিডিয়া? দিয়ে থাকলে ভাল হয়। চেক-আপের রিপোর্ট দেখে লজ্জায় এবং অপরাধবোধে নিজেকে পুরাপুরি আমার করুণার উপর ছেড়ে দেবে হয়তো! আমি অনেক ভালবাসাবশত ওকে মাফ করে দেব। এমন হবে না?) কত রকমের ভাঙা-ভাঙা ট্যাড়াবেঁকা টু-বি ভার্ব শুনলাম ডাক্তারের চেম্বারে! বলল রিপোর্ট নিতে আরেকদিন আসতে হবে। আচ্ছা, আসব। তারপর গেলাম শিন্‌সা দং। প্রবালের কানের দুল, রঙ করা ক্লে-পট, পেপার ম্যাশের পুতুল –- এইসব বেছে বেছে পছন্দ করলাম আর সমানে শপলিফ্‌ট করলাম। একদলা চটচটে ক্যারামেল থেকে সুচন্দার খোঁপার চেয়েও ফ্লাফি স্পান-শুগার তৈরির সার্কাস দেখলাম। ব্ল্যাক-বীন পেস্টের প্রলেপ দেওয়া শস্তা বাদাম পাপড়ি খেলাম দং-এর চত্বরে বসে বসে। ঐটা আমার লাঞ্চ। একজোড়া ককেশিয়ান ট্যুরিস্ট প্রেমিকের কোরিয়ান কায়দায় বিবাহ অনুষ্ঠান দেখলাম চত্বরে। কনের গালে বসানো লাল কাগজের বৃত্তাকার টিপ, বরের দামী রেশমের নীলাম্বর, ধুপধুনার ধোঁয়ার ওপারে টেকো হলুদ পুরোহিত, ড্রাগনখচিত চকচকে পালকি –- এইসবের ছবি তুললাম ফটাফট। ওদের জগৎ কী ভাল! কারো জন্য অবহেলা নাই। না চাইতেই সবার মুঠিতে ভালবাসা ভরে দেবার কী অদ্ভূত আগ্রহ। কেমনে সীমানা উপচে ছড়িয়ে পড়বার একটা টইটম্বুর বাসনা! আর আমি, কিংবা ইশতিয়াক –- যেখানেই গেলাম, ফুসফুস ভর্তি করে রাজরোগের মতো বদ্ধ ঘরের বাতাস নিয়ে গেলাম।

 

“হাই সেক্সি অ্যানা উইথ সেক্সি ট্যাটু!”—এর পর মেসেজের বাকি অংশে আরো কী যেন লেখা ছিল। মাস তিনেক আগে ইশতিয়াক পাঠিয়েছিল অ্যানা নামের কোনো একটা মেয়েকে। কে অ্যানা? কারেনিনা? ইশতিয়াকের সাথে ঘোরাঘুরি করে? রাত কাটায়?

“আই ক্যান এক্সপ্লেইন”, বলল ইশতিয়াক।

নাহ্‌। আমি শুনতে চাই না। আমরা সোল থেকে চারঘণ্টা দূরের এক বিশাল ফুলবতী মাঠ দেখতে যাচ্ছিলাম, যেখানে নাকি সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত লাখে লাখে প্রজাপতি বসে থাকে। মনার্ক প্রজাপতি। টাইগার সোয়ালোটেইল প্রজাপতি। সেদিন ইশতিয়াকের উইকএন্ড। কেন জানি হঠাৎ প্রতি মুহূর্তে ও আমার সাথে সৌজন্যমূলক, এমনকি প্রায়-প্রেমময় ব্যবহার করছিল। এখন আমি কোনো ব্যাখা শুনব না। শুনব না। কেন শুনব? কেন দৈবক্রমে প্রাপ্ত মুহূর্তটা খোয়াব? কেন যে আমি ওর ফোন হাতে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছিলাম! আমি স্যরি। ভীষণ স্যরি।

“অ্যানার ব্যাপারটা শোন। অ্যানা আসলে কোনো মেয়ে না। না, না, তোমার শুনতে হবে!”

“মেয়ে না?”

“ও মেয়ে না। হিজড়া। অ্যানা ইজ আ ট্রান্সজেন্ডার।”

“হিজড়া?”

“ইয়েস। হিজড়া। আই মেট অ্যানা অ্যাট মাই বসেস ফেয়ারওয়েল পার্টি।”

“তাই?”, আমি কেন যেন নার্ভাস হয়ে ফ্যাকফ্যাক করে হাসতে থাকলাম।

ইশতিয়াক ভীষণ আহত হয়ে হাবার মতো আমার দিকে চেয়ে রইল। বাস চলছিল ধূসর সব কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টের পাশ দিয়ে। দেশের কথা মনে হল। মনে হল বাসে করে কুমিল্লা যাচ্ছিলাম। চার বা পাঁচ বছর বয়সে। বাসের ভিতর বাজছিল মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে। কেউ যে কাউকে পিছু ডেকে থাকে, আমার সেই অভিজ্ঞতা হওয়ার আগেই হেমন্ত আমাকে বললেন উনার দিন নাকি উনাকে পিছু ডাকে। সেদিন কুমিল্লাগামী বাসে বসে কেমন গা-শিরশিরে কান্না একটা তড়িৎস্রোতে বয়ে গিয়েছিল আমার ভিতর। “কাঁদ কেন, বাপন?”। “বাপির কথা মনে হচ্ছে”। মিথ্যা কথা। আমার মনে হচ্ছিল আমার জীবনের কষ্টে সঞ্চয় করা দিনগুলি আঁজলার ভিতর আঁটছে না, ফ্রকের কোঁচায় আঁটছে না, তাই ডাইনে বাঁয়ে ফেলতে ফেলতে আমি এগোচ্ছি ঠাকুমার মতো বুড়ি হতে হতে; আর দিনেরা নিজেদের ছিন্নভিন্ন শরীরগুলোকে একত্র করে ইয়োইয়োর মতো স্পিন করে করে পড়তে গিয়েও লাফিয়ে উঠছে কোনো এক মহাশক্তিতে আর সাংঘাতিক করুণ “এই-এই” শব্দ করে পোষা জন্তুর মতো ডাকছে আমাকে। হেমন্তের মতো আমার দিন মুছে যায় নাই, উল্টা তারা অধিকার হারিয়ে আরো জ্যান্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু আমি যে দূরে চলে যাচ্ছি; এতদূরে! এখন আমাকে ডাকলে আমি কী করি? আমার কী হবে এখন?

“ইশতিয়াক, আমি দেশে যাব। কাজের নাম করে এসেছি। আর ফেরত যাই নাই। ফেরার টিকেট নতুন করে কাটতে হবে।”

“কিন্তু…আমার ভাল লাগছে। আমার ভীষণ ভাল লাগছে যে তুমি আমার কাছে চলে এসেছ। প্লিজ ডোন্ট গো!”

“তুমি একটা দিন আমার সাথে ভাল মতো কথা বল নাই। আমি দুপুরে কী খাই, আমার পথে-ঘাটে সমস্যা হচ্ছে কিনা, একটা দিন জিজ্ঞেস কর নাই। আর এখন…”। কথা শেষ করলেই আমার বুকের সব অভিমানের কান্না ভেউভেউ করে বের হয়ে আসবে, এই ভয়ে আমি থেমে গেলাম।

“দেখ, তুমি আসার পর প্রথম প্রথম আমার মনে হয়েছিল হাউ ফুলিশলি ইউ আর ইমপোজিং ইয়োরসেলফ অন মি! আমার নিজের একটা স্পেইসের আইডিয়া তৈরি হয়েছিল…সেই স্পেইসে মাংশ আর সবজির স্টক রাখা হয় না, মাটিতে মেয়েদের চুল পড়ে থাকে না, চায়ের দাগ পড়লে বিছানার চাদর ধুতে দিতে হয় না। সেই স্পেইসে কেউ রান্না করে আমার জন্য ভূতের মতো বসে থাকে না। ক্ষ্যাৎ ট্যুরিস্টদের মতো সেই স্পেইসে কেউ ফ্রিজ-ম্যাগনেট আটকায় না। আরো অনেক কিছু হয় না। আমি বিরক্ত ছিলাম। তুমি কেন আমার প্লেইট ধুচ্ছ? কেন আমার বাথরুমে গুনগুন করে গান করছ? কেন আমার ঘরে পর্দা খুলে রোদ আসতে দিচ্ছ? কেন আমার জন্য লাল নাইটি পরছ? যে মেয়ে রান্না করবে, সে রান্না করবে বুঝলাম। কিন্তু সে কেন লাল নাইটি পরবে? আর যে লাল নাইটি পরবে, সে কেন পরদিন সকালে রেডি হয়ে চলে যাবে না? না…আমি ঐসব নিতে পারি নাই। কিন্তু এখন…এখন আমি চাই আমার সেই স্পেইসটাকে তোমার সাথে শেয়ার করতে। সত্যিই চাই। বিশ্বাস কর।”

ইশতিয়াক মনে হয় জনম জনম পরে আমার হাত ধরল। আমি বাসের জানালার দিকে মুখ করে রইলাম। বাইরের দিকে তাকানোর ভান করে জানালার কাঁচে নিজের জলে ভরে ওঠা চোখ দেখতে লাগলাম নির্লজ্জের মতো। ইশ, এত সুন্দর দেখতে লাগছিল কেন আমাকে? “কেন চাও? এখন কেন চাও আমাকে?”, আমি নরম করে জিজ্ঞেস করলাম।

“জানি না। এমন না যে আমি লোনলি। লোনলিনেস ফিল করার মতো রগ আমার শরীরে নাই। কিন্তু আমি এমন একজন মেয়ে দেখি নাই, তোমার মতো…মানে একটুও জেলাসি নাই। একটুও ইগো নাই। ভালবাসা নিয়ে কোনো বাড়তি ডিমান্ড নাই। সবচেয়ে বড় কথা…জেলাসি নাই। আমার বাসা দেখে কি তুমি বুঝ নাই যে আমার একটা একরকম সম্পর্ক আছে কারো সাথে? তবু তো ঐসব পেটি জিনিস নিয়ে তুমি হইচই কর নাই। নীরবে গ্রেইসফুলি রয়ে গেছ। আসলে তোমাদের ফ্যামিলিগুলি যেমন…মানে তোমাদের মেয়েরা যে অনেক রিফাইন্‌ড আর কালটিভেটেড মনের হয়, সেইটা অনেকসময়ই শুনেছি; আম্মারাও স্বীকার করে…”

“আমাদের ফ্যামিলিগুলি?”

মানে কী? আমার রক্তসম্পর্ক আমি মুছে যাওয়া দিনের সাথে চুকিয়ে বুকিয়ে আসলাম, ইশতিয়াকের জন্য, কিন্তু ইশতিয়াক আমার পূর্বপুরুষদের গোত্রপরিচয় দিয়ে আমাকে একনামে চেনে! সেই গোত্রের মেয়েদের বিষয়ে প্রচলিত জনশ্রুতি পরখ করে দেখতে নিজের ঘরের ভিতরে বাহিরে অন্দরে অন্দরে পদে পদে আমার জন্য বিছিয়ে রেখেছে ল্যান্ডমাইনের মতো যৌথজীবনের চিহ্ন!

আমার চোখের সামনে কোরিয়ান সহযাত্রীদের হাসি-হাসি মুখ আস্তে আস্তে লালবাগবাসীদের করালবদনে বদলে যেতে লাগল। শুধু ইশতিয়াকরা তিনজন চারজন নয়, ওরা তেত্রিশ কোটি দেবদেবী –- যারা সবাই কোনো না কোনোভাবে দেখতে ইশতিয়াকের বাপের মতো, একত্রে বিকট মুখব্যাদানে অট্টহাসি দিতে লাগল। হাসির বাতাসে ওদের পেট ফুলতে লাগল হাপরের মতো। পারিবারিক বিনোদনের বিরাট আসর বসেছিল যেন। আর ইশতিয়াকের বাপের কালো ইলাস্টিকের সাসপেন্ডার আসরশেষে ঢিলা হয়ে কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছিল ক্রমাগত হাসতে থাকার ক্লান্তিতে। যেই সিঁড়ি দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আমি নেমে গেছিলাম ওদের বাসায়, সেই সিঁড়ি বেয়ে হাসতে হাসতে নেমে যেতে দেখলাম ইশতিয়াকের বাপকে, পরিবার-কোলে। বাইরের আকাশে বুঝি অন্ধকার মতো ব্যাপার-স্যাপার তখন। ইশতিয়াকের বাপকে দেখতে লাগল যেন একটা রেশমপোকার গোলমত গুটি, যেটা আলটপ্‌কা পড়ে গেছে আলকাতরার টিনে। গুটিটা হাসছে তো হাসছেই, আর আপ্রাণ হাবুডুবু খেয়ে চলেছে শ্বাস নেবার জন্য।

থামেন থামেন থামেন!!! আমার চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছা করল।

লালবাগের ইশতিয়াক ততদিনে কোরিয়ায় এসে লাইপোসাকশন করে তলপেটের চর্বি ফেলছে। ভুরু প্লাক করা শুরু করেছিল কোরিয়া আসবার আগে থেকেই। সেলেস্টিয়াল উইংসের মতো দুই দিকে মেলে রাখা দীর্ঘ ভুরু হয়ে গেছিল ওর। আমি ঐদিকে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে পারতাম না। ওর মুখটাকে আমার মাঝেমাঝে বিকলাঙ্গ লাগত। বিকলাঙ্গ লাগার মতো একটা মায়াতেই ঐ মুখটাকে আমার আরো বেশি করে ভালবাসতে ইচ্ছা করত। চূড়ান্ত ভালবাসায় যখন যখন আমার মন আচ্ছন্ন হয়ে থাকত, তখন তখন আমি ওর দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে চেয়ে থাকতাম। ও ভীষণ কষ্ট পেত। ও কষ্ট পেত দেখে আমিও পেতাম। কেন যে এমন করতাম! যদি আরেকটু বেশি সময় চেয়ে থাকতাম ঐ মুখটার দিকে, আমি হয়তো বুঝতে পারতাম ওর দিনগুলি জ্যান্ত, আর ওর রাতগুলি ওর ঘরোয়া শরীরকে ঘিরে রুদ্ধশ্বাস কালো তন্তু দিয়ে বোনা।

মনার্ক প্রজাপতি আর দেখা হয় নাই আমার। গুটিপোকা পর্যন্তই।

আমরা পরদিন ভোরের নির্জন রাস্তায় আবার নেমে এসেছিলাম। এবার স্যুটকেস হাতে আমি আগে আগে, ইশতিয়াক পিছে। আমি ছুটছিলাম। আমি এইখানে, এই গ্যাংনাম গু’তে, আর কাঁদতে চাই না। কেন যেন ঐ মুহূর্তেই আমার মনে পড়ল, ঢাকার ডিসেম্বর মাসের কোনো এক খুশি-খুশি শীতে আমাদের যখন প্রেম হয়েছিল তখনকার কথা। আমাদের নিয়ে রিকশা চলত, আর আমরা পথে পথে জোড়া শালিক গুনতাম। রিকশায় গায়ে গা লাগিয়ে বসতাম আর ইশতিয়াক ক্রমাগত বলতে থাকত, “এত দূরে কী কর তুমি? কাছে আস!”। এক একদিন চার-পাঁচবার করে লিপস্টিক লাগাতে হত আমার সোহাগী মতন মুখ করে। দরজা বন্ধ করে ভালবাসার দিনগুলিতে ও মাঝে মাঝে আসার পথে আমাকে বলত কনডম কিনে আনতে। কেন এই ক্রূর নির্দেশ দিত কে জানে? আমি সীতার অগ্নিপরীক্ষা দেওয়ার মতো দোকানে গিয়ে চোখ বুঁজে কনডম চেয়ে বসতাম। আমি কি তখনও আঠারো পার করেছিলাম? আহারে, কত লজ্জা-ভয়-সংস্কার-সংকোচ গা থেকে ফেলতে ফেলতে নিরাভরণ হতে হতে কত না চিত্রকূট পর্বতের উপর দিয়ে উড়ে গেলাম! রামকে বলো, আমি এই পথ দিয়ে গেছিলাম।

পাছে আবার কেঁদে ফেলি, এই ভয়ে আমি তুরতুর করে ছুটছিলাম। চাকাওয়ালা স্যুটকেস নুড়িতে পাথরে গোত্তা খাচ্ছিল, আর পড়িমরি করে আমার পিছে ছুটছিল। আহা, সকালের বাতাসটা কেমন পরিষ্কার জলের মতো স্বচ্ছ! ল্যাম্পপোস্টের ডগায় বাতিগুলি তখনো অদরকারী গৃহভৃত্যের মতো জ্বলছিল। দোকানের মাথায় মাথায় কোরিয়ান ভাষায় লেখা দোকানের নাম। অক্ষরগুলি কেমন বিনা বিবাদে দূরে দূরে দাঁড়িয়ে আছে পৃথগন্ন ভাইদের মতো! ইশতিয়াক অনেক আস্তে হাঁটছে। মাথা ঝুঁকিয়ে, একটা সিগারেট ধরিয়ে। আমার সাথে ওর আর দেখা হবে না। পৃথিবী তার আরাধ্যের চারপাশে একপাক দুইপাক কতপাক ঘুরে গেল, আর এতগুলি বছর শেষে আমার একটা ভালবাসার অধ্যায় আজকে এইখানে এই উজ্জ্বল পথের ধারে শেষ হয়ে যাবে।

মহাসমারোহে সকাল জাঁকিয়ে বসছে। আলোকপরশে মরমে মরিয়া, হেরো গো শেফালি পড়িছে ঝরিয়া। এইটাও হেমন্ত গেয়েছিলেন। আমার আরেকটু বড়বেলায়।

আমি হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা এগিয়ে গেছি। রাস্তার মোড়ে ট্যাক্সি দাঁড়িয়েছিল গোটা চারেক। দুটো ড্রাইভার দুর্বোধ্য ভাষায় কী যেন বলল আমাকে। আমি কোথায় যেতে চাই, তাই জিজ্ঞেস করল? আমি কি আরেকবার পিছে তাকাব? ইশতিয়াকের জন্য দাঁড়াব? নাকি ট্যাক্সি চেপে এয়ারপোর্টের দিকে আরেকটু জোরে ছুট দেব?

সামনের ট্যাক্সিটাতে উঠে বসলাম। আশ্চর্য! চালক অপূর্ব ক্ষিপ্রতায় গন্তব্য বুঝে নিল। স্যুটকেস ঠেলে দিল ভিতরের দিকে। আজকে এমন একটা দিন, সবাই আমার ভাষা বুঝবে। সব্বাই। ইশতিয়াক দূরে দাঁড়িয়ে গেল। আর এগোলো না।

ওপাশের জানালায় একটা বিড়াল এইদিকে অপলক চেয়ে রইল। যেন অপেক্ষায় বসে আছে কোনো মানুষ।

 

*

“আমাদের পুরান বাড়ি ছায়ানীড় এখনো অ্যাপার্টমেন্ট হয় নাই। দেখে শান্তি লাগার বদলে ভয় লাগল– কবে যে শান্তি শেষ হয়ে যায়!”

“ইভা ভাবীর কী অবস্থা?”

“তেমন কোনো গুরুতর অবস্থা না। ও বোধ হয় জেনে গেছে তোমার আর আমার কথা।”

“এত দেরী লাগে কেন মেসেজ টাইপ করতে?”

“কই দেরী? লিখলাম তো।”

“ভাবী জেনে গেছে তো তাতে কী সমস্যা?”

“ও বাচ্চা চায়।”

“সেলিম ভাই, ও বাচ্চা চায় সেটা ওর ব্যাপার। তোমার কী? আমার কী?”

“এইভাবে বলতেছ কেন কথা? আমি আর ইভা তো এখনো কাগজে কলমে জামাই-বউ, নাকি?”

“তুমি কি ডিভোর্সের কথা কিছু বলেছ?”

“আমি চিন্তা করতেছি। তোমার সাথে সম্পর্ক না থাকলেও চিন্তা করতাম।”

“চার বছর ধরেই চিন্তা করছ। এখন বলছ ও বাচ্চা চায়।”

“আমার গায়ে তো অলরেডি দাগ পড়ে গেছে, জান। তুমি একটা ফ্রেশ মেয়ে। এমনকী আমরা যখন এক বিছানায় রাত কাটাই, তখনো আমি তোমাকে নষ্ট করি না। তুমি কতবার চাইছ; তাও করি নাই। আমার মতো একটা ফালতু লোকের জন্য তুমি কেন এমন কর?”

“তুমি কেন এমন কর না আমার জন্য? করতে পার না?”

“আমার তো এটাই স্বাভাবিক। কতদিন একটা আনহ্যাপি সম্পর্কে আমি আটকায়া আছি, সেইটা বুঝ?”

“কেন আছ? কেন বের হতে পার না? আমার আর কী কী করতে হবে তোমাকে বের করে আনার জন্য?”

“বাইর হইতে পারি না কারণ আমি তো তোমার সঙ্গেও আটকায়া আছি! বাইর হয়ে যাব কই? এই ফাটক হইতে ঐ ফাটক?”

“আমি তোমাকে আটকাব না সেলিম ভাই। বিশ্বাস কর! তুমি আমাদের দুইজনের ফিউচারটা নিয়ে একটুও ভাব না। আমাদের সম্পর্কের ভিতর একজন বরাবরই অ্যাবসেন্ট।”

“আমি একটা একটা করে জিনিস হ্যান্ডেল করব। তোমার মতো সবকিছু একসাথে গুলায়া ভাবা আমার স্বভাব না। তোমার তো আবার সবকিছু একসাথে লাগে।”

“মানে?”

“তুমি যখন প্রেম কর, নিজের পুরাটারে একসাথে পাঞ্চ কইরা আরেকজনের মধ্যে ঠাইসা দাও। দম নেওয়ার অবকাশ দাও না।”

“আহারে, এমন করে যদি তুমি নিজেকে আমার মধ্যে ঠাসতে পারতে!”

“এক্‌জ্যাক্টলি! ঐটাই তোমার প্রবলেম। নিজে ঠাসতেছ, তাই আরেকজনেরও ঠাসতে হবে। নিজে কানতেছ, তাই আরেকজনেরও কানতে হবে। তুমি এমন কেন?”

“তুমি যে ইতরের মতো দুই নৌকায় পা দিয়ে চলছ, সেইটা কী?”

“তোমার শিক্ষা-দীক্ষার পরিচয় এইসব গালিতে পাওয়া যায় না।”

“গালিটা নিশ্চয়ই দেখতে পাও তুমি, সেলিম ভাই। কোন জায়গাটা থেকে আসে গালিটা, সেটা বুঝতে পারবে না জীবনেও।”

“দেখ, আমার ঘুম পাইছে…”

“না…কথা শেষ না করে তো ঘুমাতে পারবে না!”

“আরে কী জ্বালা! কী কথা শেষ করবা? ঝগড়াঝাটি ভাল্লাগে না রে ভাই।”

“ভাই-ভাই করবে না। রাস্তায় দুই রিকশার চাকায় চাকা বেধে গেলে ভাই-ভাই করে মানুষ। আমরা কি রিকশায় বসে আছি?”

“কী কথা! হা হা হা…হা হা”

“আচ্ছা মেসেঞ্জারে তুমি যখন হাস, আসলেই কি হাস? নাকি মুখ শক্ত করে কিবোর্ডে হা হা হা টাইপ করতে থাক সমানে?”

“আচ্ছা ভিডিও চ্যাট অন কর।”

“কেন?”

“দেখতে পাবা হাসতেছি নাকি হাসতেছি না।”

“এই নাও ভিডিও চ্যাট।”

“তোমার চোখ ফোলা কেন, জান?”

“এমনি।”

“এমন কইরো না, প্লিজ। আমি খুব কষ্ট পাই। আমার দিকটা একটু বুঝ!”

“সেলিম ভাই, আমি তোমার জন্য কত কী করলাম। গরু খাওয়ার মতো হাস্যকর কাজও। বিফ স্টেক খেতে এমন কোনো ভাল না। কিন্তু ভাব করলাম কতই না মজা! মিডিয়াম রেয়ার ছিল; ভিতরে গোলাপি গোলাপি…ছিঃ!”

“দেখ জান, আমি তো তোমারে জোর করি নাই! তুমি পাগলামি করে এমন কর খালি।”

“আমি পাগলামি করে প্রমাণ করতে চাই যে আই অ্যাম অ্যাজ গুড অ্যাজ আ গুড মুসলিম গার্ল। আ প্রিটি, সুইট, কনজারভেটিভ, স্লিম, ফ্রেন্ডলি অ্যান্ড গুড মুসলিম গার্ল। দ্যা টাইপ টু টেইক হোম টু ইয়োর মাম।”

“ইউ ডোন্ট নিড টু প্রুভ দ্যাট…”

“ইয়েস আই ডু। কারণ তারপরও তুমি বললে না আমি একটা গুড এনাফ গার্ল। ভুলে গেছ, তুমি একবার বলেছিলে দেয়ার আর আদার ফিশেস ইন দ্যা পন্ড? আমি ভুলি নাই। তাই আমি তোমার চোখে বেস্ট ফিশ হওয়ার জন্য এমন করি। কিন্তু তোমার কিছু করা লাগে না। আমার চোখে তো তুমি এমনিতেই বেস্ট ফিশ। স্যরি। ফিশ না। ম্যান।”

“এইভাবে বইল না। এত আগের কথা টাইনো না প্লিজ!”

“আচ্ছা টানব না। কিন্তু তুমি এত বেশি বিবাহিত ছিলে, এত বড় মাত্রার ‘নো নো’ ছিলে, তোমার ধর্মটা চোখেই পড়ে নাই আমার!”

“বাদ দাও। আজকে কী করলা?”

“তুমি আমাকে দিল্লিতে রেখে চলে গেলে। আমার কিছু ভাল লাগছে না।”

“আরে পাগল একসাথে ঢাকা গেলে তো ইভা দেইখা ফেলত। ও তো এয়ারপোর্টে আসে রিসিভ করতে প্রত্যেকবার!”

“হুঁ।”

“তোমার রুমে আর কেউ আছে?”

“আর কে থাকবে?”

“তাহলে ভিডিওতে বুক দেখাচ্ছ না কেন?

আচ্ছা, হইছে। টিশার্ট নামাও!”

“ওকে! নামালাম।”

“আর কী কী হইল আমি চলে আসার পর?”

“বহু ঘটনা!”

“গান্ধীর নাতি মরার পর আর কী ঘটনা ঘটতে পারে? ঐটা তো এপিক।”

“উনি এইখানে একটা কনফারেন্সে এসেছিলেন। ঐখানেই শেষ। উনি অ্যাকটিভিস্ট না কী যেন ছিলেন।”

“বাহ্‌। কাজে এসে মরে গেল? ডায়িং অন দ্যা স্টেজ ইজ সাচ আ ক্লিশে! পটুয়া কামরুল হাসান পর্যন্ত ঠিক ছিল”

“কিন্তু গান্ধীর নাতির পর তো আরো ঘটনা হয়ে গেল!”

“মানে? আর কী ঘটনা?”

“ভয়াবহ ঘটনা। এবং ঘটল তো ঘটল, আমার সাথেই ঘটল…আজকে সারা সন্ধ্যা আমি শেল-শক্‌ড হয়ে ছিলাম।”

“…?”

“আমি তোমাকে ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে ঘরের চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকলাম। ঢুকে দেখি আমার বিছানায় একজন অদ্ভুত দেখতে কাল মানুষ বসা। আমার খাটের পাশে দেখি একটা হুইল চেয়ার রাখা। লোকটা সারা বিছানা রক্তাক্ত করে হাতে একটা ব্লেড নিয়ে বসে আছে।”

“অ্যাঁ? কী??”

“আমাকে দেখে সে মরণ দেখার মতো করে চিৎকার করে উঠল। আর আমিও ‘আ-আ-আ-আআআআ’!”

“মানে কী? কী বলতেছ? কীভাবে সম্ভব?”

“লোকটা মরার জন্যই কবজিতে ব্লেড বসিয়েছিল; অথচ আমাকে দেখে চোখে যেন আজরাইল দেখল! আমি বুঝলাম আমি তাকে বিরক্ত করছি। শান্তিতে মরতেও দিচ্ছি না! একপলকে আমি বুঝে ফেললাম এটা আমার রুম না। আমার দরজার দুই দরজা আগের রুম। এক চাবিতে বুঝি সব দরজা খোলে দুনিয়ার সব গেস্টহাউজে। কী অবস্থা!”

“আল্লাহ্‌! তারপর? এমন একটা ব্যাপার এতক্ষণ আমাকে জানাইলা না কেন?”

“আমি বললাম, স্যরি স্যরি! দিস ইজ নট মাই রুম! সে কালান্তক চিৎকার দিয়ে বলল, সো হোয়াট আর ইউ ওয়েইটিং ফর? গো! গো অ্যাওয়ে! তার গলার আওয়াজ, কাপড় আর শরীরের ধাঁচা দেখে আমি বুঝলাম সে ছেলেও না, মেয়েও না। আমি ভুল করে ওর ঘরে ঢুকে পড়ার লজ্জায় দৌড় দিলাম।”

“ছেলে বা মেয়ে না?”

“না।”

“বাঃ! মরতেছিল, আর তুমি দৌড় দিলা? কাউরে ডাকলা না? আসলে তুমি হিজড়া দেখার ভয়ে দৌড় দিছ। না? তোমার জায়গায় থাকলে আমিও দৌড় দিতাম।”

“সে যে আত্মহত্যা করছে, মরে যেতে বসেছে, সে যে হুইলচেয়ারে ছাড়া চলতে পারে না –- এটা অনেক পরে আমার মাথায় কাজ করল।”

“তারপর?”

“আধা ঘণ্টা বাদে আমি রিসেপশনে গেলাম। শুনলাম সে নিজেই ইন্টারকমে ফোন দিয়ে বলেছে আই অ্যাম ডায়িং। তার নাম আন্না বা উন্নি, এরকম কিছু। সাউথ ইন্ডিয়ার। দিল্লিতে একটা এলজিবিটি কমিউনিটির সেমিনারে এসেছিল। যতক্ষণ গাড়িতে তুলছিল ততক্ষণ নাকি জান লড়িয়ে কাঁদছিল কোন এক ববির জন্য।”

“লে হালুয়া! এরা কেন যে কাজ করতে আইসা টপাটপ মরে! তুই হিজড়াদের সম্মেলনে আসছস, সাহস দিতে আসছস, শক্তি দিতে আসছস। অধিকার নিতে আসছস। উল্টা নিজের হিজড়াত্বের কাছে নিজেই হাইরা গিয়া বইসা আছস! লুজার কোনখানকার!”

“সেলিম ভাই, পিপল ডোন্ট ডাই বিকজ দে আর ডিফিটেড। দে ডাই আউট অফ প্রাইড। অ্যান ইনটক্সিকেটিং প্রাইড। আ প্রাইড দ্যাট স্যুটস্‌ আ লাভার।”

“ওয়েল, হোয়াই ডোন্ট দে ট্রাই অ্যান্ড সারভাইভ? বেঁচে থাকা বেশি কঠিন, তাই? যুদ্ধ করার দম নাই, তাই?”

“আন্না উইল সারভাইভ। উন্নি উইল সারভাইভ।”

“গুড অন দেম! তুমি সাবধানে ফেরত আস। এই গেস্টহাউজটা একটা কুফা।”

 

আগের/পরের পর্ববইমেলা ২০১৫ এর বই: সকলই সকল – তানিম কবির। >>
শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
বর্ণালী সাহা

বর্ণালী সাহা

জন্ম ১৯৮৩ সনে কুমিল্লায়; বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইন্সটিটিউট থেকে স্নাতক এবং মেলবোর্ন বিজনেস স্কুল থেকে ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তাঁর গদ্যভাষায় প্রভাব বিস্তার করে বাজার, সঙ্গীত, সংযোগ এবং প্রবাস। মেলবোর্নের অধিবাসী এই লেখক শৈশব থেকে রাগসঙ্গীতের চর্চা করছেন, এবং বর্তমানে কলকাতার আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমির সঙ্গে শিক্ষার্থী হিসাবে যুক্ত আছেন। একাধিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বিপণন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করে প্রায় একদশকের চাকরিজীবনের ইতি টানেন ২০১২তে। ভ্রমণ, রান্না, সুডোকু, তিনতাস এবং হাই ইনটেনসিটি ব্যায়ামে তাঁর আগ্রহ আছে। “আম্মা ও দূরসম্পর্কের গানগুলি” বর্ণালী সাহার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য