Main menu

“দ্যা নর্থ এন্ড” উপন্যাসের অংশ

[ দ্যা নর্থ এন্ড উপন্যাস’টা ছাপা হইছিল ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। বইটা আবার নতুন পাবলিশারের মাধ্যমে বাজারে আসতেছে। বইটাতে তিনটা পার্ট আছে। এই অংশটা সেকেন্ড পার্টের সেকেন্ড চ্যাপ্টার।]

*
শাওন আর আমি শেষ যেবার বাসে করে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা গেলাম, আমাদের ধারণাই ছিল না যে ফেরার পথে আমাদের নয় ঘণ্টা লেগে যাবে। অফিসের কাজে আমার প্রায়ই ঢাকা যাওয়া পড়তো – মাসে-দুইমাসে একবার তো হবেই। ডক্টরস্ কনফারেন্স, আত্মীয়স্বজনের বিয়ে-শ্রাদ্ধ-সামাজিক অনুষ্ঠান এবং ঢাকায় পোস্টিং-এর দেনদরবার করতে শাওনেরও যাওয়া পড়তো বছরে কয়েকবার। এমন নয় যে আমাদের ঢাকা যাওয়ার অভ্যাস ছিল না – কিন্তু স্থলপথের যাত্রা যে দিনকে-দিন সমস্যাসঙ্কুল হয়ে উঠছিল, সেটা অনেক বুঝেও হয়তো বুঝতে আমাদের কিছুটা বাকি ছিল। শাওন আমাকে বয়েলিং ফ্রগের উদাহরণ দিলো – সেই চিরাচরিত রিডার্স ডাইজেস্ট-মার্কা উদাহরণ – কী? একটা ব্যাঙকে পাত্রভর্তি পানিতে চুবিয়ে সিদ্ধ করতে থাকলে সে মানিয়ে নিতে থাকে। অল্প অল্প তাপমাত্রা বাড়াও, ব্যাঙটাও অল্প অল্প সয়ে নেবে। এইভাবে ধীরে স্ফুটনাঙ্ক পার হয়ে যাবে, আর ব্যাঙটাও জ্যান্ত সিদ্ধ হয়ে যাবে। আমার বন্ধুরা শাওনের এইসব বক্তব্যকে আড়ালে বলতো ‘চালাকচোদা কমেন্ট’। সেইদিন বাসে বসে আমার মনে হয়েছিল শাওনকে জিজ্ঞেস করি এত ফ্যান্সি উদাহরণ আমাদের কেন প্রয়োজন। মনে হচ্ছিল বলি, ও, মানে ঐ উটপাখির গল্পটার মতো? উটপাখিটা যে বালিতে মুখ গুঁজে থাকে – ঐরকম? উটপাখির সুবিদিত একখানা প্ল্যাটিচিউড থাকতে কেন আমাদের সিদ্ধ ব্যাঙের গল্প দরকার? মনে আছে সেইদিন আমার মাসিক চলছিল – সম্ভবত প্রথম বা দ্বিতীয় দিন। মাসিকের সময় আমি সমস্ত পৃথিবীর ভার শরীরে বহন করতে থাকি; অল্পেই হাসি, কাঁদি, রাগি এবং বিচার করতে বসি। নিজের এই অভ্যাসের প্যাটার্ন ভাল জানা থাকায় আমি সাধারণত মাসিকের সময়টায় নিজের মনের সব ডাকে সাড়া দেই না।

সেইদিন বাসে বসে থাকতে থাকতে হাইস্কুলের এক সহপাঠিনীর একটা ফেসবুক পোস্ট শাওনকে পড়ে শুনিয়েছিলাম। সেই পোস্টের সারমর্ম ছিল এইঃ ইংরেজি ভাষা এক অভূতপূর্ব কাজ করেছে। তেইশ রকমের আবেগ – যেগুলি মানবসমাজের বেশিরভাগ সদস্যই অনুভবে সক্ষম – সেই আবেগগুলির নামকরণ করেছে। এতদিন এই আবেগগুলির কোনো নাম ছিল না – এক শব্দে প্রকাশ করার মতো কোনো উপায় ছিল না। অর্থাৎ অনুভূতিগুলিই শুধু ছিল, সেইগুলি প্রকাশের ভাষা ছিল না। বিষয়টা আমার কাছে চমৎকার লেগেছিল। আমরা যে একটু একটু অবোলা প্রাণীই, কিন্তু প্রতিদিনই ভাষা আমাদেরকে বিবর্তনের দৌড়ে এগিয়ে রাখছে – এটাও মনে হয় একটু বিস্ময় জাগিয়েছিল। শাওন মশকরার সুরে বলেছিল, তেইশটা? আচ্ছা, প্লুভিওফিলিয়া ছাড়া বাকিগুলা বলো। আমি বলেছিলাম, এই লিস্টে প্লুভিওফিলিয়া নাই। ঐটা ২০১৭তেই শেষ। তাইলে কী আছে? (আছে পিরিওডের ব্যাদনা। শাওনকে হাসতে হাসতে মনে করিয়ে দেওয়া গেল যে তখন মাসের সেই সময় যখন সাবধানে কথা বলতে হয়)।

আমি ঐ তেইশটা ইমোশনের নাম, তাদের সংজ্ঞাসহ শাওনকে পড়ে শুনিয়েছিলাম। শাওন মন দিয়ে শুনেছিল। সেই ইমোশনগুলি আমরা নিজেরাও নিজেদের মতো করে অনুভব করে এসেছি। এর মধ্যে কয়েকটা অবশেষে ভাষায় ধরতে পারবো জেনে খুব ভাল লাগছিল। শাওন বলল ওরও ভাল লাগছিল নামগুলি পেয়ে। সেই ইমোশনগুলির মধ্যে থেকে আমাদের যার-যার পছন্দের একটা মৌখিক লিস্ট করেছিলাম আমরা দুইজনে মিলে।

আমার লিস্ট শাওনের লিস্ট
১) Sonder: পথে চলতে গিয়ে হঠাৎ এই অনুভূতি হওয়া যে আমার মতোই বাকি পথচারীদের জীবনেও তীব্র, জটিল, উজ্জ্বল, বাঙ্ময় সব অভিজ্ঞতা আছে Vellichor: পুরানো বইয়ের দোকানে গেলে যে নস্টালজিয়া জন্মে
২) Opia: কারো চোখের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকার সময় যখন অপরপক্ষের দৃষ্টিকে একইসাথে আঘাতে উদ্যত ও আঘাতের সামনে নিরুপায় বলে মনে হয় Kenopsia: সচরাচর লোকের ভিড় থাকে, এমন কোনো স্থানকে নিস্তব্ধ, পরিত্যক্ত দেখলে যে অনুভূতি জন্মে
৩) Ellipsism: ইতিহাসের পথ আসলে শেষমেশ কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তা কখনোই জানতে না-পারার দুঃখবোধ Vemodalen: ইতোপূর্বে অসংখ্য লোকে অসংখ্যবার তুলেছে এমন কোনো সুন্দর জিনিসের ফোটো আরেকবার তোলার পর যে ব্যর্থতাবোধ হয়
৪) Exulansis: লোকে বোঝে না, এই কারণে কোনো একটা অভিজ্ঞতা আর কখনোই শেয়ার করতে না-চাওয়া
৫) Occhiolism: বৃহত্তর বিচারে আমার নিজের দৃষ্টিভঙ্গী কতটা ক্ষুদ্র ও সীমাবদ্ধ, সেই বোধ

 

বাসে বসে থাকতে থাকতে সেই তেইশ রকমের ইমোশনের লিস্ট আমি ডেনিশকেও পাঠিয়েছিলাম। মেসেজে লিখেছিলাম কোন্‌ ইমোশনগুলির সাথে আমি পূর্বপরিচয়ের নৈকট্য বোধ করি। উত্তরে ও শুধু লিখেছিল ‘Very interesting indeed’.

আমি আরো জানতে চেয়েছিলাম ও ঘুম থেকে উঠেছে কিনা, খেয়েছে কিনা, বাকি দিন কী করবে – যদিও আসলে বোঝাতে চেয়েছিলাম যে ওদের পরিবার যে দুর্যোগের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে, সেইখানে সমবেদনা জানানোর মতো ভাষা আমার জানা নাই। এই তেইশ রকম ইমোশনের মধ্যে এই বিশেষ ইমোশনটা – এই সমবেদনা না-জানাতে পারার বিষয়টা – এখনো জায়গা করে নিতে পারে নাই কেন, এই ভেবে খারাপ লাগলো। এমনও মনে হলো যে ডেনিশের দাদী রোজম্যারি অন্য অনেকের চেয়ে অনেক বেশি রকমের, অনেক বেশি বিচিত্র বর্ণের আবেগের কাছে সহজে পৌঁছাতে পারতেন দেখেই হয়তো জীবনসায়াহ্নে এসে অল্প কয়েকটা দিন বেঁচে থাকার আঘাতটুকুও নিতে সক্ষম হলেন না। বিরানব্বই বছর বয়সে আমি, বা আমরা, কবে পৌঁছাব? সেইখানে আমাদের জন্য কী লেখা থাকবে? সকল দুর্যোগের সামনে অম্লান, অবিনশ্বর, অচল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিলীভূত হৃদয়? নাকি প্রস্তরাকীর্ণ নদীখাতে থেঁতলে যাওয়া মাথা?

ডেনিশ আমাকে জানিয়েছিল ওদের দুই ভাইবোনের মধ্যে তর্কাতর্কি একটা চরম অপ্রীতিকর বিবাদের দিকে গড়াচ্ছে। রোজম্যারির ময়নাতদন্ত থেকে আত্মহত্যার প্রতিবেদন আসার পর থেকে ওর বোন আভা মিডিয়ায় কমপক্ষে বিশটা ইন্টারভিউ দিয়েছে – ইউকে’র লাইভ টিভির টকশো’তে গোটাতিনেক চ্যারিটির হোমরাচোমরা মুখপাত্রকে ধরাশায়ী করেছে, এবং কোপেনহেগেনের ট্রান্সপোর্ট ডিপার্টমেন্টের চাকরি থেকে খণ্ডকালীন ছুটি নিয়ে আপাতত লন্ডনে আইনি সহায়তা, বিশিষ্টজনদের সমর্থন ও পাবলিক সহানুভূতি আদায়ের পিছনে সময় ব্যয় করছে। ডেনিশ ওর মা এবং লন্ডনের আত্মীয়দেরকে জানিয়েছে এই বিষয়ে ওকে যেন কোনোভাবে না-জড়ানো হয়। আভা লন্ডন থেকে ডেনিশকে ফোন করে প্রচণ্ড মারমুখী গলায় বলেছে যে ও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সত্যের জন্য লড়বে – এবং এই লড়াইয়ে ভাইয়ের নীতিগত কিম্বা আর্থিক সমর্থন না-থাকলেও ওর কিছু যায়-আসে না।

“You know, I too would go out of my way to look for the truth, even though I’m less certain that we will ever have all of it. It is not skepticism about the very idea of truth that exists and guides us; it is realism about how hard the truth is to find.” সত্যের খোঁজে বহুদূর যেতে ডেনিশেরও আপত্তি নাই, কিন্তু সত্য কখনো তার সম্পূর্ণ রূপ নিয়ে সত্যি সত্যি ওর কাছে আসবে কিনা, সেই বিষয়ে ও সন্দিহান। কিন্তু তাই বলে ও সত্যে অবিশ্বাসী না, সংশয়ীও না। সংশয়বাদিতা আর বাস্তববাদিতা তো দুইটা আলাদা জিনিস, তাই না?

ডেনিশ আমাকে আরো লিখেছিল যে বাদ-বিসম্বাদের এক পর্যায়ে আভা ওকে ভণ্ড বলে গালি দিয়েছে। জিজ্ঞেস করেছে দাতা সংস্থার আমন্ত্রণে রোহিঙ্গা বাচ্চাদের ন্যাংটা ছবি তুলতে ওর কেমন লেগেছে – ঐজাতীয় ছবিই যে ওদের দাদীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে, এইটা জানার পর ওর ঘুম কেমন হচ্ছে; জানতে চেয়েছে বাংলাদেশীরা ওকে পাঁচতারা হোটেল, এসইউভি গাড়ি, আর সুন্দরী লোকাল নারীসহকারে যথাযথ খেদমত করেছে কিনা (ফিল্ড-অফিসে নিছক সহকর্মী হিসাবেই আমার সাথে কিছু সেলফি তুলেছিল ডেনিশ, ফেসবুকে শেয়ারও করেছিল – আভা হয়তো ঐদিকেই ইঙ্গিত করলো)।

বিরাট লম্বা একটা টেক্সট মেসেজে ডেনিশ এইসব কথা আমাকে লিখে পাঠিয়েছিল। কষ্টে, লজ্জায়, অপমানে আমার চোখ জ্বালা করছিল। শাওন পাশে বসে ছিল, আমার মাথা ওর কাঁধে ঠেকানো – তাই কাঁদতে পারি নাই – কাঁদলেও হয়তো স্পষ্ট বুঝতাম না সেই কান্না আমার নিজস্ব ব্যথায়, নাকি ডেনিশের ব্যথায়, নাকি অসংখ্য অদৃশ্য সংযোগে আবদ্ধ জ্ঞাত-অজ্ঞাত মানুষগুলির জন্য, যাদের ভিতরে-বাইরে সুখ নাই, প্রেম নাই, ক্ষমা কিম্বা অনুতাপ – কোনোটাই নাই – এবং সঙ্গত কারণেই নাই। একটা মৃত্যু যদি শুধু একটা মৃত্যু – এমনকি শুধু একটা অপঘাতে মৃত্যু হয়েই থেমে থাকতো, তাহলে হয়তো এইরকম ঘাতক মর্মবেদনার জায়গা থাকতো না। এত সব মর্মবেদনার মধ্যে যেই ছোট ভাগটা আমার, সেই ভাগের ভিতর খানিক অপরাধবোধ আমারও ছিল – একপোঁচ পেশাদারিত্বের আস্তর দিয়ে যদিও সেইটাকে ঢেকে রাখাই যেতো। চাইলে বলাই যেতো যে আমি তো রোজম্যারির মতন আরো যাদের দয়ার শরীর, তাদেরকে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করে ফান্ড সংগ্রহ করি না। আমি বরং সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করি – অর্থাৎ ফান্ডের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করি – যাতে করে যেই মানুষগুলি আমাদের সাহায্যের আশায় বসে আছে, তাদের জন্য কিছু করতে পারি। হ্যাঁ, এইরকম বলাই যেতো, এবং আমি নিজেকে এইরকমই বললাম। অপরাধবোধ আমাকে আর অতখানি পীড়া দিচ্ছিল না, যতখানি দিচ্ছিল অপমানবোধ। আভার চোখে এবং ডেনিশের বাকি পৃথিবীর চোখে আমি শুধু একজন ‘লোকাল নারী’। ঐ মুহূর্তে আমার মগজের স্বার্থপরায়ণ প্রকোষ্ঠটার ভিতর থেকে সজোরে বের হয়ে একটা লাঠির আগায় একটা নোটিশের মতন ঝুলছিল শুধু এই আপ্তবাক্য – ‘ডেনিশের সাথে তোমার প্রেম অসবর্ণ’। আমি যে বিবাহিত, এইটা আমাদের জীবনে জেগে থাকা সবচেয়ে বড় কাঁটা না। মূল বিষয় হলো, আমরা ভিন্ন জাতের মানুষ। এখন এই সত্য বদলাবে কে? এই সত্য তো বদলানোর নয়। দুনিয়ার শাদা-কালো, উঁচু-নিচুর তুলনামূলক মাপকাঠি দিয়ে মাপতে গেলে এমন হাজারো বিষয় খুঁজে পাওয়া যাবে যার ভিতর একাধারে ওর সম্মান এবং আমার অসম্মান নিহিত। সেইদিনই প্রথম আমার ধারণা হচ্ছিল যে এই প্রেমে সব সঙ্গীত সুরে গাওয়া যাবে না, কিছু কিছু গান বেসুর হবেই।

তখন শাওন আমার পাশেই বসা – একটু আগেই আমার শরীরের উপর দিয়ে নিজের অর্ধেকটা শরীর গলিয়ে জানালার উপর ঝুঁকে ছিল ও, আর ভারী পর্দা সরিয়ে দেখছিল বাস সেই মুহূর্তে কোথায় আটকা-পড়া।

জ্বি ম্যাডাম, আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, আমি বলব যে চট্টগ্রাম পৃথিবীর একমাত্র শহর…. পৃথিবীতে আর কোন শহর নাই।

চট্টগ্রাম খুবই ভাল লাগে আমারও। তবে আমি আসলে পুরাপুরি ঢাকার মেয়ে।

ঢাকার মেয়েরা তো শুনি ঢাকাতে মোটেও সেইফ চলাফেরা করতে পারে না। আমাদের বাসায় যদি কখনো আপনাকে নিয়ে যাই ম্যাডাম, দেখবেন স্বাধীনভাবে থাকা কাকে বলে। লোকজন সভ্য এইখানকার। পঁচিশ টাকা রিক্সাভাড়া দিয়ে জিইসি বেড়াতে যাবেন। গোলপাহাড় মোড়ে জ্যামে আটকালে অর্ধেক ভাড়া দিয়ে হেঁটে চলে যাবেন। কেউ কিছু বলবে না।

চিটা-গং খুবই কনজারভেটিভ বলে জানি।

কনজারভেটিভ অবশ্যই – বললাম না সভ্য পুরুষমানুষের শহর চট্টগ্রাম? ভদ্রতা-সভ্যতা-আদব-লেহাজ এইসব তো অতি অবশ্যই সম্ভ্রান্ত, কনজারভেটিভ ব্যাপার।

আমি হেসে ফেললাম। তারপর গলা নামিয়ে শাওনকে বললাম, হইতেছে না, শাওন। তুমি তোমার রোল থেকে বাইর হয়ে যাইতেছ।

মোটেও রোল থেকে বাইর হই নাই। গুছায়া যুক্তি দিতেছি – তোমার রোল তো ঢাকার ওভারস্মার্ট মুখরা মেয়েলোকের, যে একা একা বাসে করে চিটাগাং যাইতেছে বান্ধবীদের সাথে কক্সবাজার বেড়াইতে যাবে বলে। তুমি কোনো মুখরা অ্যাক্টিংই পারতেছ না। টাইট-লিপ্ড সুশীল ভাব চোদাইতেছ। আমার রোল হইতেছে খাসা চাটগাঁইয়ার – যার ব্যবসা আছে, যে একটু গাঁইয়া, আর চাটগাঁ-র টোনে কথা বলে – কিন্তু কথার চমক দেখায়া তোমারে ইম্প্রেস করার চেষ্টা করতেছে। আমিই ঠিকঠাক রোলে আছি।

আমি শাওনের সাথে একমত হলাম। আমরা আবার চেষ্টা করলাম। রোল-প্লেয়িং পার্ট-টু। এই পর্যায়ে রোলে আরো পাকাপোক্ত হওয়ার জন্য শাওন বাসের সামনের দিকে হেঁটে গেলো। গিয়ে কন্ডাক্টরের সাথে হালকা খাতির জমানোর চেষ্টা করলো, তারপর কন্ডাক্টরকে বলল মোশাররফ করিমের যেই হাসির নাটকটা চলছিল, সেইটা অফ করে একটা ওয়াজের অডিও ছাড়লে কেমন হয়। কন্ডাক্টর শাওনকে বিশেষ পাত্তা দিলো না, অলসভাবে অন্যদিকে চেয়ে থাকল। শাওন এরপর কন্ডাক্টরের কাছ থেকে এক বোতল মিনারেল ওয়াটার চেয়ে নিল – বলল ম্যাডাম চাইছেন। বোতল হাতে সিরিয়াস মুখ করে শাওন আবার আমার পাশের সিটে এসে বসলো। আমি বহু কষ্টে হাসি চাপলাম। ঢাকা-টু-চট্টগ্রাম বাসের সেই দীর্ঘ, জটিল, অযৌন সফরের চেয়েও তো আমাদের বৈবাহিক পরিচয় দীর্ঘতর। সেই দীর্ঘ পরিচয়ের পক্ষে সম্ভব ছিল সমস্ত আবেগের লাশের উপর দিয়েও ছোটপাখির মতো কিচিমিচি ডাকি-ডাকি করতে করতে উড়ে যাওয়া, এবং উড়ে গিয়ে আবার পাশের সিটে এসে বসা।

তো ম্যাডাম, কন্ডাক্টর সাহেব বলতেছিলেন যে একটু পরেই খাবার বিরতি দিবে। মানে হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে নামব আমরা। খিদা নাই, আপনি খাইলে খাইয়েন। আমি কিন্তু এককাপ চা খাব।

আপনার কি চা পছন্দ নাকি কফি?

কফি। চা তো বাসাতেই হয়। যদিও এই রোডসাইড রেস্টোর্যান্টে কফি খোঁজা স্টুপিডিটি হবে। আপনাদের সিটিতে ক্যাফে আছে ভাল? নর্থ এন্ড কফি রোস্টার কি চিটা-গং’এ ব্রাঞ্চ খুলছে? জানেন? নিয়ে যাবেন আমাদেরকে?

অনেক ক্যাফেই আছে। আরমান ক্যাফেতে খুব ভাল ফিরনি পাওয়া যায়। তারপর ক্যাফে সোহাগ, ক্যাফে ইম্পেরিয়াল…

এইগুলি কি ভাতের হোটেলের নাম বলতেছেন ভাইয়া?

রাস্তার কফিও কিন্তু নট ব্যাড, ম্যাডাম। ছয় টাকা দিয়ে নেসকফি দেয়। চাইলে চা আর কফি মিলায়া চা-ফি বানায়া দেয়। আমাদের বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তার মোড়েই পাবেন। সুজনের দোকান। আমার হেভি খাতিরের লোক। মাঝে মাঝে পয়সাও নেয় না।

আপনি দেখি পুরা চিটা-গং অঞ্চলের পপুলার বড়ভাই। এই দেখেন যেই ক্যাফেটার নাম বলতেছিলাম, ঐটার ফেসবুক পেইজ। এইরকম কফি কই পাবো চিটা-গং’এ?

আচ্ছা। দেন তো দেখি!

শাওন আর আমি সত্যি সত্যি আমার ফোন দিয়ে নর্থ এন্ড ক্যাফের ফেসবুক পেইজ ঘাঁটাঘাঁটি করতে লাগলাম। দেখলাম পেইজে আমাদের বেশ কয়েকজন মিউচুয়াল ফ্রেন্ডের লাইক। আরো অসংখ্য লোকের চেক-ইনে সমৃদ্ধ সেই পেইজ। ফোমড্ মিল্ক দিয়ে কফির উপরিতলে কী সুন্দর লাটে আর্ট – গোলাপের কুঁড়ি, হার্ট, মৎস্যকন্যা, ‘মহান বিজয় দিবস’, ‘ঈদ মুবারক’ – সাথে বুমেরাং ভিডিও। আমি আর শাওন আমাদের রোল-প্লে’র মধ্যেই সত্যিকারী কৌতূহলে ‘লোকেশন্স’ ট্যাবে ক্লিক করলাম। দেখা গেলো নয়টা শাখা আছে নর্থ এন্ডের। বাংলাদেশের মানচিত্রের উপরে শাখাগুলিকে স্থানিক চিহ্ন দিয়ে রাখা। আশ্চর্য ব্যাপার, আটটা শাখাই ঢাকায়, আর নবম শাখাটা – চট্টগ্রাম বিভাগেই – কিন্তু চট্টগ্রাম শহরে নয়, কক্সবাজারে! আল-আমিন ভবন, মোহরি পাড়া, উখিয়া।

আমি মনে মনে ধাক্কা খেলাম। দুইশ’ টাকায় এককাপ কফি নিশ্চয়ই কক্সবাজারের ‘লোকাল’রা খায় না, রোহিঙ্গারাও না। ট্যুরিস্টরা? হয়তো বা, কিন্তু তারাও নিশ্চয়ই হোটেল-সংলগ্ন অঞ্চল বাদ দিয়ে কফি খেতে উখিয়া যাবে না, তাই না? নাকি যাবে?

আমার মনটা তিতা হয়ে গেল – উখিয়া, শরণার্থীদের জন্য প্রায় একটা যাবজ্জীবন দণ্ডের নাম – কিন্তু এরই মাঝে গড়ে উঠেছে সংরক্ষিত শাদা অভয়ারণ্য। এতবার ফিল্ডে গেছি, তবু আমি কি দেখি নাই পেট্রিডিশে সবুজ অণুজীবের মতো বদলাতে থাকা উপশহর কক্সবাজার? নাকি জলে থাকতে মাছ যেমন বুঝতে পারে না সে জলে আছে – এমনকি সেই জল তাকে খেতেও হয় না, কারণ অভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় দেহ তার এমনিতেই জল শুষে নেয় – তেমন আমিও এতদিন বুঝতে পারি নাই কক্সবাজারকে কে বা কারা বদলে দিয়েছে?

ম্যাডাম, আপনারা ফ্রেন্ডরা তো এমনিতেই কক্সবাজার ঘুরতে যাবেন – উখিয়ার কফি খেয়ে জানায়েন। কেমন? তবে চট্টগ্রাম যখন যাওয়া হচ্ছেই, সুজনের দোকানে আপনাকে নিয়ে যাবই। তারপর শুনেন না, আপনার যদি মোবাইলের টাকা শেষ হয়ে যায়, আর ফ্লেক্সিলোডিং-এর দরকার হয়, সেইটার জন্য ধরেন আপনার দোকানেই যেতে হবে না। রাসেলকে ফোন দিবেন – ও করে দিবে, যত রাতই হোক। পরে টাকা দিয়ে দিলেই হবে।

আমার আর শাওনের সাথে খেলতে ইচ্ছা করছিল না, কিন্তু একবার কোনো স্রোতে ঢুকে গেলে আমি বের হতে পারি না। (আমার সৌভাগ্য যে স্রোতই আমাকে কোনো না কোনো চোরাপথ দিয়ে বের করে নিয়ে এসে সযত্নে ডাঙার কাছে রেখে যায়।) তখনো আমার হাতে ফোন ধরা – শাওন অবিকল চট্টগ্রামের মানুষের মতো সুর করে করে আমার সাথে ফ্লার্ট করে যাচ্ছিল, আর আমি কথা কম বলে শুধু নাটুকে মুখভঙ্গি আর অভ্যস্ত মুগ্ধতা সহকারে ওকে ‘চক্ষে হারাই’-রকমের প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছিলাম। নর্থ এন্ডের শাখা আবিষ্কার করতে গিয়ে আমাদের যেহেতু একবার গুগল ম্যাপ খুলতেই হয়েছিল, সেহেতু শাওন ভাবল গুগল ম্যাপ ধরে ধরেই আমাকে চট্টগ্রামের একটা সিটি-ট্যুর দিয়ে দিলে কেমন হয়। গুগল ম্যাপ জুম-ইন করে শাওন আমাকে দেখালো চকবাজার, জিইসির মোড়, জামালখান, শিল্পকলা, মেডিক্যাল রোড, আর দেখালো চেরাগী পাহাড় – যেন আমি জীবনেও ওর সাথে ঐসব জায়গা ঘুরি নাই, ঐখানে পাশাপাশি বসে হাত ধরি নাই, রোদ উঠলে বুকের ওড়না মাথায় দিয়ে মুখ ঢাকি নাই, যৌথ জীবন নিয়ে বড় বড় ডিলিউশনাল পরিকল্পনা করি নাই। যেন আমি জানতামই না কর্ণফুলি ব্রিজ পার হয়েই – সাক্ষাৎ ছোড-ছোড-ডেউ-তুলা কর্ণফুলি নদীর তীরে ওদের গ্রামের বাড়ি । যেন কখনোই শুক্রবার বিকালে পতেঙ্গা বীচে বসে জাহাজঘাটার সামান্য জাহাজের অসামান্য আলো দেখি নাই, কিম্বা সাগরের কাছের ক্ষীণ পয়ঃপ্রণালীতে ইতস্তত নৌযান দেখে এই ভাবনায় মজি নাই যে আলেকজান্দ্রিয়ার পোতাশ্রয়ে জুলিয়াস সিজারের জাহাজ নোঙর করলো বুঝি। সবশেষে আমার শ্বশুরবাড়ি, অর্থাৎ আমাদের নর্থ খুলশির বাসার সামনে এসে যখন শাওন গুগল ম্যাপ জুম-আউট করলো – গেইটের সামনে রাস্তার ঠিক সেই জায়গাটায়, যেখানে একই কুকুর-মায়ের দুইটা বাচ্চা সন্ধ্যায় শাওনের ফেরার অপেক্ষায় – আর ওর জুতার ফিতা নিয়ে আর ওর ব্যাগের বেল্ট নিয়ে খেলার অপেক্ষায় – বসে থাকতো, আর বসে থাকতে থাকতেই একদিন শাদা বাচ্চাটা গাড়িচাপা পড়ে মরলো – আমি অভিনয়ে বোঝালাম যেন ঐসব কিছুই মরলোকে ঘটে নাই, কারণ ঐসব কিছুই ঐ রোল-প্লে’র অংশ না। আপাতত এইটাই মহত্তম সত্য ছিল যে গুগল ম্যাপের ঐ স্পট থেকে দুইকদম হাঁটলেই সুজনের দোকান, যেখানে বাকিতে ‘নেসকফি’ দেয়, আর যেখানে ঢাকার উন্নাসিক, বেলেল্লা মেয়েদেরকে কনজারভেটিভ, লোকাল ছেলেরা কফি খেতে নিয়ে যায়।

আমি ‘সত্যিকারী’ শাওনের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, ভাইয়া, আপনার নামটা কিন্তু জানা হলো না।

ঐ পর্যায়ে শাওন আমার হাত ধরে ফেলল ফোনসহ – যেই ফোনে আমরা এতক্ষণ গুগল ম্যাপ ঘাঁটছিলাম ঘন হয়ে বসে। আমি এমন অতর্কিতে স্পর্শের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না – সত্যিই ছিলাম না – কারণ শাওন তো সুর করে কথা বলা এক চাটগাঁইয়ামাত্র। সে কেন আমার হাত ধরবে? যদিও নাম জানতে চেয়ে প্রশ্নটা সত্যিকারী শাওনকেই করেছিলাম, হাত-ধরে-ফেলা শাওনটা তো আসলে রোল-প্লে’র শাওন। চমকে ওঠায় আমার হাত থেকে ফোনটা ছিট্কে বাসের ফ্লোরে পড়ে গেল। আর এমন ঘটলে যেমন হয় – ফোনটা স্লাইড করে আমাদের দুই সিট সামনের এক ভদ্রলোকের পায়ের কাছে গিয়ে থামলো। কতবার বাসযাত্রার সময় পায়ের দুইপাটি জুতা খুলে ঘুমিয়ে গেছি, আর ঘণ্টাখানেক পরে বাসের কোনো এক সুদূর প্রান্তে আমার পায়ের জুতা আবিষ্কার করে কুড়িয়ে এনেছে শাওন। এবারও শাওন উঠে গিয়ে – এবং ওর চাটগাঁইয়া রোল থেকে একটুও বিচ্যুত না-হয়ে – ভদ্রলোকের পায়ের কাছ থেকে আমার ফোন তুলে আনল। বলল, স্যরি ভাই, ম্যাডামের ফোনটা। লোকটা দেখলাম ওকে বিড়বিড় করে কী যেন বলল। শাওন লোকটার দিকে তাকাতে তাকাতে ওর সিটে ফেরত আসলো।

বাসে ওঠার সময় রোদ ছিল দেখে আমি শাল আনি নাই। আমার একটু একটু শীত করতে লাগল। শাওনকে কিছু বলা গেল না – কারণ এই রোলের মধ্যে এইরকম ডায়ালগ ঠিক জমবে না। শীতে মনে হয় আমি মৃদু কেঁপে উঠলাম।

ম্যাডাম, আপনার মনে হয় শীত করতেছে, না? এসি’র ডাক্টটা ঘুরায়া দিব?

জ্বি না, তেমন শীত করতেছে না। অসুবিধা নাই।

শাওন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। বাসে ঘোষণা দেওয়া হলো হাইওয়ে রেস্টোর্যান্টে আমাদের নামার সময় হয়ে গেছে, আমরা যেন দশ মিনিটের মধ্যে নাস্তা এবং আমাদের প্রয়োজনীয় ‘কাজ-গুলু’ সেরে আবার গাড়িতে উঠে বসি। যানজটে দীর্ঘ কালক্ষয়ের কারণে আমাদেরকে বেশি সময় দেওয়া গেল না বলে উনারা দুঃখিত। যানজটের কারণ হিসাবে বলা হলো যে হাইওয়েতে বাস-পিক আপের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছিল। আশা করা হচ্ছিল আমাদের বাকি যাত্রা মঙ্গলময় হবে ইনশাল্লাহ্।

বাসের যাত্রীরা নড়েচড়ে উঠল – অনেকেই দৃশ্যত অস্থির। বাচ্চাদের তারস্বরের কান্না ততক্ষণে কানে সয়ে গিয়েছিল আমাদের – এইবার কেউ কেউ নতুন করে কান্না জুড়ল কারণ তাদের বাধ্যতামূলকভাবে নামতে হবে। আমার পায়ে খিল ধরে গিয়েছিল। হাতব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। এমন সময় আমাদের দুইসারি আগের লোকটা, যার পায়ের কাছে আমার মোবাইলটা পিছলে চলে গেছিল একটু আগে, ঘুরে আচমকা আমার দিকে তাকালো। তারপর অনেকে শুনতে পাবে এতটা উচ্চগ্রামে এবং বেশ শ্রুতিকটুভাবে বলল, কি ম্যাডাম, এই ভাইয়ের সাথেই না গতকাল ঢাকা গেছিলেন?

লোকটা, এবং হয়তো বাসের অন্যান্য যারা কান পেতে আমাদের এতক্ষণের কথোপকথন শুনছিল, তাদের চোখে যে আমরা একজোড়া অবৈধ, সমাজবহির্ভূত, যৌনতাবুভূক্ষু নারীপুরুষ – আমার তৎক্ষণাৎ এই উপলব্ধি হলো। আমার হঠাৎ নিজেকে অনাবৃত ও আক্রান্ত মনে হলো। আমি মুখ কালো করে শাওনের দিকে তাকালাম। আমার দৃষ্টির অর্থ ছিল, এইবার খেলায় ক্ষান্ত দেওয়া হোক। এইবার না হয় গলা খাদে নামিয়ে দায়িত্বশীল গৃহস্থের মতো বলা হোক যে আমি ওর বিয়ে করা বউ। এইবার না হয় অসম্মানের পৃথিবীতে অসম্মানের ভাষাতেই অসম্মানীর কাছ থেকে সম্মান প্রার্থনা করা হোক।

শাওন সেইসবের মধ্যে গেলো না। লোকটাকে বলল, জ্বি। আপনি আগান দেখি। সময় নাই।

আমার মুখ থমথম করছিল। এর মাঝেই আমরা বাসের বাকি সবার সাথে বেশ শৃঙ্খলা সহযোগে বাস থেকে নামলাম। খোলা বাতাসে বড় বড় দানার বালি পাক খাচ্ছিল – পাশেই নতুন দালান উঠছে দেখলাম – সেই দালানের গায়ে বিশাল নীল পলিথিন, স্থানে-স্থানে গিঁঠমারা, বাতাসে সেইগুলিও উড়ছে। বিভিন্ন কম্পানির আরো অসংখ্য বাস, লাইন ধরে দাঁড় করানো। শাওন একটা সিগারেট ধরালো, তারপর আমার মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ম্যাডাম, আপনি আমার নাম জিজ্ঞেস করছিলেন। আমার নাম শাওন।

সত্যিকারী শাওন।

আমাদের আশেপাশে প্রচণ্ড ভিড় – আমি অনেকক্ষণ বাথরুম চেপে ছিলাম। আমি যন্ত্রের দ্রুততায় শাওনকে বললাম, হাই, শাওন ভাই। আমার নাম বর্ণালী। ওহ্, একটা কথা – আমার কিন্তু বয়ফ্রেন্ড আছে।

শাওন প্রাণ খুলে হাসলো। রোল-প্লে’র চাটগাঁইয়া শাওন হাসলো, নাকি সত্যিকারী শাওনই হাসলো – বুঝে কিম্বা না-বুঝে – সেইটা আমি বহুদিন পরে অনেক নব-নব দৃষ্টিকোণ প্রয়োগ করেও ভেদ করতে পারি নাই।

আমাদের আর হাইওয়েতে চা খাওয়া হলো না। বাথরুম সারতে গিয়ে আমি শাওনকে হারিয়ে ফেললাম। দেখলাম আমার হাতব্যাগ আমার সাথে নাই, মানে বাথরুমে যাওয়ার আগে ওর হাতে দিয়ে ঢুকেছিলাম। খুব বেশি চিন্তিত না-হয়ে আমি বাসে উঠে বসলাম। একে একে বাসের বাকি সব যাত্রীরাও বাসে উঠে বসলো। বাস দ্রুততার সাথে আবার ভরে উঠলো।

শাওনের দেখা নাই।

আমার মোবাইলও আমার সাথে নাই। ওটা ওর কাছে রাখা হাতব্যাগে। ফোন করে নিশ্চিত হওয়ার উপায় নাই যে ও কোথায়।

কন্ডাক্টর বলল, দুইজন এখনো আসে নাই। দাঁড়ান, দাঁড়ান। বাথরুমে হবে হয়তো।

কোনো একজন যাত্রী হই-হই করে বলে উঠল, হাগতে গিয়া মরছে নাকি?

তাই শুনে আমি বাসের জানালার পর্দা খামচে উঠে দাঁড়ালাম। আর সজোরে লোকটাকে ধমকে উঠলাম। এত জোরে যে আমি একজন অপরিচিত মানুষকে ধমক দিতে পারি, আমার তেমন ধারণা ছিল না। বাসভর্তি নারীপুরুষ এবং শিশুরা নীরবে আমার দিকে চেয়ে রইল।

ড্রাইভার বলল, ছাড়তে হইব, ছাড়তে হইব। কাছেই গ্যাদারিং হইছে। টান দিয়া বাইর হইতে হইব।

শেষ মুহূর্তে শাওন ফিরল। ফিরল বটে – কিন্তু ততক্ষণে আমার হৃৎপিণ্ড এমন বেগে আমার সারা শরীরের রক্ত পাম্প করছিল যে আমার কানে তালা লেগে গিয়েছিল। একটা কানে আমি টানা পাগলাঘণ্টির আওয়াজ শুনছিলাম। শাওনের কথা স্পষ্ট শুনতে সমস্যা হচ্ছিল। ওর মুখ শাদা দেখাচ্ছিল। আমার হাঁটুর উপর হাত রেখে হাতের শীর্ণ আঙুলগুলি ছড়িয়ে মৃদু চাপ দিয়ে ও বলল, একটু আগে, বুঝলা … একজনকে মেরে ফেলছে। যে মারছে, সে নাকি রোহিঙ্গা। না, স্যরি, যাকে মারছে তাকে মোস্ট প্রোব্যাবলি রোহিঙ্গা সন্দেহ করে মারছে।

আমার মাথা থেকে হাঁটু পর্যন্ত অসাড় হয়ে গেল। হাঁটুর যেই জায়গাটা শাওন চাপ দিয়ে ধরে ছিল, শুধু সেই জায়গায় কিছু রক্তসঞ্চালন হচ্ছিল বুঝি। হাগতে গিয়া মরছে নাকি? হাগতে গিয়া মরছে?

প্রলাপের মতো মাথায় ঘুরছিল ঐ জঘন্য লাইনটা।

আমি শাওনকে বললাম, তুমি এত দেরি করলা – আমি কিন্তু ভয় পাইছিলাম।

শাওনের একটা হাসি আছে, যেটার মধ্যে একটা মিহি কান্নার সুর মিশে থাকে। ও সেই হাসিটা হাসলো। তারপর অনেকক্ষণ আমরা কিছু বললাম না। যা-যা বলার থাকতে পারতো, সব যেন ঠাণ্ডা বাসের ভিতরে একরকম ওজনহীনতার ভিতরে ভাসতে ভাসতে শান্তিতে মরে গেছে। লাইকা নামের মহাকাশচারী কুকুরটার মতো।

অনেকক্ষণ পর শাওন বললো, স্যরি। তুমি চিন্তা করবা সেইটা মাথায় কাজ করে নাই আসলে।

আমি বললাম, ছিলা কই তুমি? বাথরুমে? নাকি চায়ের ঐখানে?

বাথরুমে না।

তাইলে?

মুক্তি পাইলে সেলিব্রেট করতে হয় না? একা একটা সিগারেট ধরাইছিলাম সেলিব্রেট করার জন্য।
আমার চোখের দিকে সযত্নে এবং খুব ভাল করে তাকিয়ে শাওন কথাটা বললো – যেন নিশ্চিত হতে চাইছিল যে আঘাতটা জায়গামতো ডেলিভার করা গেলো কিনা।

আমি ডেনিশকে লিখলাম। ভাঙা ভাঙা মেসেজে ওকে জানালাম যে আমার বর সব জেনে গেছে।

ডেনিশ উত্তর দিল। Fuck it. Fuck everything. Come to me. Please come to me.

বাস প্রচণ্ড বেগে বাঁক ঘুরে গেল। বাসায় যে কখন পৌঁছাব আমরা…

The following two tabs change content below.

বর্ণালী সাহা

জন্ম ১৯৮৩ সনে কুমিল্লায়; বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইন্সটিটিউট থেকে স্নাতক এবং মেলবোর্ন বিজনেস স্কুল থেকে ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তাঁর গদ্যভাষায় প্রভাব বিস্তার করে বাজার, সঙ্গীত, সংযোগ এবং প্রবাস। মেলবোর্নের অধিবাসী এই লেখক শৈশব থেকে রাগসঙ্গীতের চর্চা করছেন, এবং বর্তমানে কলকাতার আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমির সঙ্গে শিক্ষার্থী হিসাবে যুক্ত আছেন। একাধিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বিপণন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করে প্রায় একদশকের চাকরিজীবনের ইতি টানেন ২০১২তে। ভ্রমণ, রান্না, সুডোকু, তিনতাস এবং হাই ইনটেনসিটি ব্যায়ামে তাঁর আগ্রহ আছে। “আম্মা ও দূরসম্পর্কের গানগুলি” বর্ণালী সাহার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ।
[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য