Main menu

সিলেক্টেড টেক্সট: আত্মস্মৃতি – আবু জাফর শামসুদ্দীন (২)

পার্ট ১ ।।

—————————————————-

এই টেক্সটগুলি আবুল জাফর শামসুদ্দীনের কলকাতা থাকার টাইমের, বিফোর পাকিস্তান পিরিয়ড। নিউ স্কীম মাদ্রাসা থিকা পাশ কইরা কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে পড়াশোনা কনটিনিউ করেন নাই উনি।  চিটাগাংয়ে গিয়া রেলওয়েতে চাকরি নেয়ার ট্রাই করছিলেন, পারেন নাই। কলকাতা গিয়া কয়েকটা পত্রিকায় কাজ করছিলেন। মাঝখানে একটা সরকারি চাকরি নিয়া খুলনায় আসছিলেন বছরখানেকের লাইগা। পরে পাকিস্তান হওয়ার আগে পারমানেন্টলি কলকাতাতেই ছিলেন। এই ব্যাকগ্রাউন্ডটা জানা থাকলে উনার কথাগুলি রিলেট করতে সুবিধা হইতে পারে। এমনিতেও মনেহয় বোঝা-ই যায়।

ই.হা.

———————————————————-

 

কাজী নজরুল ইসলাম

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের দিনটির কথা এখনও মনে পড়ে। তখন পত্র পত্রিকায় আমার কয়েকটি গল্প ছাপা হয়েছে। কাঁচা হাতের প্রথম উপন্যাস ‘পরিত্যাক্ত স্বামী’ সম্ভবত লিখছি, কবি তখন সঙ্গীতের জগতে। রেকর্ড কোম্পানির জন্য সঙ্গীত রচনা করেন, সুর দেন।

উত্তর কলকাতার একটা গলিতে তাঁর বাসা। কবি আবদুল কাদির সাহেব একদিন সকালে তাঁর নিজ কাজেই নজরুলের কাছে যাচ্ছিলেন। কেমন করে যেন তাঁর সঙ্গী হয়ে গেলাম। আমাকে বসার ঘরে রেখে তিনি চলে গেলেন কবির স্ত্রী ও শাশুড়ির সঙ্গে দেখা করতে। কবির স্ত্রীকে তিনি বৌদি ডাকতেন। বিদ্রোহী কবি তখন রেকর্ড কোম্পানির অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। কবি তখন একটি গাড়ি কিনেছিলেন, গাড়িটি সম্ভবত লাল রঙের ছিল। নিচে সেটি অপেক্ষা করছিল।

আবদুল কাদির সাহেবের সঙ্গে কবির সেদিন কি কথাবার্তা হয়েছিল আজ আর তার কিছুই মনে নেই।

কবি আবদুল কাদির। ছবি: বাংলাপিডিয়া থিকা নেয়া।

কবি আবদুল কাদির। ছবি: বাংলাপিডিয়া থিকা নেয়া।

শুধু এটুকু মনে আছে, আমার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছিলেন, এই নাম, গল্প-উপন্যাস লিখছে। কবি স্নেহমাখা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। উৎসাহ দিয়ে দু’চার কথা বলেছিলেনও। আমাদের দু’জনের সন্দেশ-রসগোল্লা এলো, রেকাবিতে এলো কাচের গেলাস ভরা জল। আমরা খেলাম। কবি তাঁর ঘরে গেলেন, একটু পরে সেজেগুজে বেরিয়ে এলেন। যতোদূর মনে পড়ছে, তাঁর পরনে ছিল ফকফকে সাদা খদ্দরের ধুতির ওপরে সিল্কের পাঞ্জাবি এবং গলায় ঝুলানো সাদা উড়ানি, মাথায় খদ্দরের টুপি। পায়ে বোধ করি ছিল নাগরা জাতের জুতো। তিনি গায়ে দামি সেন্ট এবং পাউডার মাখতেন। তার সুগন্ধ ঘরময় ছড়িয়ে পড়লো। আমার মনে হলো, সত্য সত্যই সাধারণ মানুষের সমাজ হতে আগত একজন অসাধারণ মানুষ দেখছি। অসাধারণতা তাঁর চোখেমুখে পোশাকে-পরিচ্ছদে দেহের প্রতিটি অঙ্গে এবং বাচনভঙ্গিতে। নজরুলের মতো এমন সুপুরুষ সিংহপুরুষ আমি কখনও দেখি নি। আমাদের বললেন, চলো। গাড়িতে চড়ার সময় বললেন, তোমরাও ওঠো। আমরা খুশি হলাম। রেকর্ড কোম্পানির অফিসের কাছাকাছি একটা জায়গায় নামিয়ে দিয়ে বললেন, তোমাদের অসুবিধে হবে না তো? আমরা হেসে বললাম, না। আমরা কিছুটা হেঁটে এবং বাকি পথটা ট্রাম ধরে যার যার বাসায় চলে এলাম। তারপর কবিকে বহু জায়গায় দেখেছি, তাঁর সঙ্গীতের জলসায় উপস্থিত হয়েছি, কিন্তু কবির সঙ্গে এক গাড়িতে আর কখনও ভ্রমণ করি নি। নজরুল চরিত্রের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি উঠতি লেখকদের উৎসাহ দিতেন। ছোট-বড় কোনো লেখককে নজরুল ঈর্ষার চোখে দেখতেন না। উচ্চমন্যতা প্রকৃতপক্ষে হীনম্মন্যতারই নামান্তর। নজরুলের মধ্যে কোনোরকম কমপ্লেক্সবোধ ছিল না। ধনী দরিদ্র উঁচু নিচু নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে তিনি স্বাভাবিকভাবে মিশতেন, সমান আচরণ করতেন। তিনি যখন খ্যাতির শিখরে তখনও খ্যাতির আলাদা পরিমণ্ডল তাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠে নি; হতে দেন নি সে সুযোগ। তাঁকে খোঁচালে অবশ্য তিনি তার জবাব দিতেন।

(প. ১৩১ – ১৩২)

কাজী নজরুল ইসলামের মোটরকার। ছবি: ডেইলি স্টার পত্রিকার অনলাইন ভার্সন থিকা নেয়া।

কাজী নজরুল ইসলামের মোটরকার। ছবি: ডেইলি স্টার পত্রিকার অনলাইন ভার্সন থিকা নেয়া।

 

 

এস. ওয়াজেদ আলী

১৯৩৩-৩৪ সালের কোনো এক সময়ে মরহুম এস. ওয়াজেদ আলী বি. এ. কেন্টাব বার-এ্যাট ল (১৮৯০-১৯৫১) তৃতীয় প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তিনি তখন লোয়ার সার্কুলার রোডের একটি বাড়ির দোতলায় থাকতেন। পোশাকে-পরিচ্ছদে তিনি ছিলেন পাকা সাহেব, তাঁর বিলেতি মেম স্ত্রীও ছিল।

এস. ওয়াজেদ আলী (১৮৯০ - ১৯৫১)। ছবি: গুগুল সার্চ থিকা নেয়া।

এস. ওয়াজেদ আলী (১৮৯০ – ১৯৫১)। ছবি: গুগুল সার্চ থিকা নেয়া।

কিন্তু ঘরে তিনি ছিলেন পুরো বাঙালি। বাংলা সাহিত্যের ছিলেন তিনি একজন নিয়নিত এবং একনিষ্ঠ সেবক। তাঁর অর্থে ও পরিচালনায় ‘গুলিস্তা’ নামক একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছিল। হুগলী জেলার শ্রীরামপুর মহকুমার বড় তাজপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ভদ্রলোক ছিলেন মজলিসী মানুষ। তাঁর বৈঠকখানায় সাহিত্য ও সঙ্গীতের বৈঠক হতো। এসব বৈঠকের কোনো কোনোটিতে যোগ দিয়েছি। খরচপত্রের দিক থেকেও তিনি ছিলেন দরাজ দিল। বৈঠকে উপস্থিত সকলকেই তিনি চা-নাশতায় আপ্যায়িত করতেন। গল্প, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী, ইতিহাস, সাহিত্য সমালোচনা, নাটক, রম্যরচনা প্রভৃতি বহুক্ষেত্রে তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গেছেন। চিন্তার দিক থেকে তিনি ছিলেন মুক্ত মানুষ। তাঁর কিছুসংখ্যক গল্প এবং ভ্রমণকাহিনী বাংলাসাহিত্যে ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়েছে। ভাঙা বাঁশি, গল্পের মজলিস গুলদাস্তা, মানুষের দরবার, দরবেশের দোয়া প্রভৃতি গল্প গ্রন্থ গ্রানাডার শেষ বীর, জীবনের শিল্প, ভবিষ্যতের বাঙালি, প্রাচ্য ও প্রতীচ্য, আমাদের সাহিত্য প্রভৃতি প্রবন্ধ পুস্তক এবং পশ্চিম ভারত ভ্রমণ তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। এক সময়ে তাঁকে এক অদ্ভুত খেয়াল পেয়ে বসে। তিনি নিজেকে নয়া জমানার মোজাদ্দেদ বলতে থাকেন। তাঁর স্ত্রী তাঁকে ত্যাগ করে চলে যান। পারিবারিক অশান্তির মধ্যে তাঁর পক্ষাঘাত হয়। বিখ্যাত পাকিস্তানি সাংবাদিক বেগম জেবুন্নিসা হামিদুল্লাহ তাঁর কন্যা।

(প. ১৫৪)

 

আবুল কালাম শামসুদ্দীন

আমাদের আড্ডা জমত প্রথমে মোহাম্মদী অফিসে, ১৯৩৭ সালে আজাদ প্রতিষ্ঠার পর আজাদ-মোহাম্মদী অফিসে। আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাহেব। তাঁর মতো দিলখোলা আপনভোলা মানুষ তখনও ছিল বিরল, এখনও বিরল। তাঁরই গ্রামবাসী ‘আয়না’ ও ‘ফুড কনফারেন্স’ প্রভৃতি বইয়ের লেখক আবুল মনসুর আহমদ শুধু সাহিত্য ও সাংবাদিকতা করে সন্তুষ্ট ছিলেন না, তাঁর আরো অনেক উচ্চাভিলাষ ছিল। সেসব উচ্চাভিলাষ তিনি চরিতার্থও করেছিলেন। শামসুদ্দীন সাহেব ছিলেন অকৃত্রিম সাংবাদিক এবং লেখক। তাঁর অন্য কোনো উচ্চাভিলাষ ছিল না। তিনি অবসর সময়ে ফুটবল-ক্রিকেট খেলা দেখতেন এবং দেখতেন থিয়েটার এবং ছায়াছবি। চার্লি চ্যাপলিন এবং হ্যারল্ড লয়েড দুই মানিক-জোড় ছিলেন তাঁর প্রিয় চলচ্চিত্রাভিনেতা।

আবুল কালাম শামসুদ্দীন। ছবি: বাংলাপিডিয়া থিকা নেয়া।

আবুল কালাম শামসুদ্দীন। ছবি: বাংলাপিডিয়া থিকা নেয়া।

আজাদ প্রতিষ্ঠা এবং মওলানা আকরম খাঁর দ্বিতীয় পক্ষের জ্যেষ্ঠ পুত্র খলিল মিয়াকে (সদরুল আনাম খাঁ) পরিচালনার দায়িত্ব দেয়ার পুর্ব পর্যন্ত আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাহেবের সর্বোচ্চ মাসিক বেতন ছিল ৬০ টাকা, মুজিবর রহমান খাঁ এবং বার্তা সম্পাদক মোদাব্বের পেতেন ৪০ কি ৫০ টাকা। আবুল কালাম শামসুদ্দীন কোনো দিন আয়-ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করার চেষ্টা করতেন বলে মনে হয় না। আড্ডার চা, সিগারেট, বিড়ি, পান প্রভৃতির ব্যয় তিনিই বহন করতেন। ১৩৩০-৩১ সনের লবণ আইন ভঙ্গ এবং অসহযোগ আন্দোলনের সময় আমরা অনেকেই বিড়ি এবং খদ্দর ধরেছিলাম। আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাহেব ১৯২০-২১ সালের আন্দোলনের সময় কলকাতার বি. এ শেষ বর্ষের ছাত্র। থাকতেন কারমাইকেল হোস্টেলে। তিনি পড়া ছেড়ে দিয়ে স্বগ্রামে খাদি আন্দোলন শুরু করেন। শুনেছি, তিনি নাকি নিজ হাতে চরকায় সুতো কাটতেন এবং তাতে কাপড় বুনোতেন। সে সময়ে অনেক তরুণ মুসলিম শিক্ষা ছেড়ে চরকা ও তাঁত ধরেছিলেন। আমাদের প্বার্শবর্তী গ্রাম বাহাদুর সাদীর তালেব আলী পণ্ডিত হাই স্কুলের ওপরের শ্রেণীতে পড়েছিলেন। তিনি পড়া ছেড়ে চরকা ও তাঁত ধরেছিলেন। পরে জি. টি. পাস করে পণ্ডিতি করতেন। কিন্তু মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি তাঁত ছাড়েন নি। সৎ লোক ছিলেন তিনি। মওলানা আকরম খাঁ আজীবন খদ্দরের টুপি পাজামা পাঞ্জাবী উড়ানি পরে গেছেন। মুসলিম লীগও তাঁর পোশাক বদলাতে পারে নি।

আজাদ প্রতিষ্ঠার বহু পরে, খুব সম্ভবত ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময়, আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাহেবের বেতন ১৫০ টাকা ধার্য এবং অফিসে অতিথি আপ্যায়নের জন্য সামান্য কিছু এ্যালাউন্স বরাদ্দ করা হয়। ঐ সময়ে অন্যদের বেতনও কিছু বৃদ্ধি পেয়েছিল। চট্টগ্রামের মৌলবী নজীর আহমদ চৌধুরীর কথা মনে পড়ে। সাপ্তাহিক মোহাম্মদীর প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই তিনি মওলানা আকরম খাঁর সহকর্মী ছিলেন। সাপ্তাহিক মোহাম্মদীর সম্পাদনাও করতেন তিনি। প্রথম পক্ষের পুত্র খায়রুল আনাম খাঁর কাছে সাপ্তাহিক মোহাম্মদীর স্বত্বাধিকার হস্তান্তরিত করার পর আজাদ প্রতিষ্ঠান থেকে ভদ্রলোক বিতাড়িত হন। কলকাতায় তাঁর কোনো বিষয়-সম্পত্তি ছিল না। স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের নিয়ে তিনি ভয়ানক বিপদে পড়েন। শুনেছি, গুরুতর অভাব-অনটনের মধ্যে তাঁর জীবনাবসান হয়। দেশবিভাগের পর আজাদ ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হলে নজীর আহমদ চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র মওলানা আকরম খাঁর কাছে তাঁর উচ্চশিক্ষায় সহায়তা করার জন্য এসেছিল। তাঁর আশা পূরণ হয় নি। শুনেছি, মৌলবী নজীর আহমদ চৌধুরীর সঙ্গে নাকি মওলানা আকরম খাঁর সাপ্তাহিক মোহাম্মদীর অংশীদারিত্বপ্রদানের মৌখিক চুক্তি ছিল। মাসিক মোহাম্মদী আজাদ অফিসের আড্ডায় কাজী নজরুল ইসলাম ব্যতীত প্রায় সকল মুসলিম কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক আসতেন। আসতেন কোনো কোনো হিন্দু লেখকও। নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখের কথা মনে পড়ে। অদ্বৈত মল্লবর্মণ মাসিক মোহাম্মদীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। তাঁর উপন্যাস তিতাস একটি নদীর নামমাসিক মোহাম্মদীতেই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। অর্থানটনের মধ্যে অকালে এই প্রতিভাবান লেখকের মৃত্যু হয়। তাঁর কথা মনে হলে এখনও বেদনাবোধ করি। কাজী আফসারউদ্দিনও কিছু দিন মাসিক মোহাম্মদীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন।

আড্ডায় ইউরোপীয় ও দেশীয় সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি প্রায় সবকিছুই আলোচিত হতো। চটে গেলে শামসুদ্দীন সাহেব টেবিলে মুষ্টাঘাত করতেন। কিন্তু তিনি ছিলেন অজাতশত্রু। মতানৈক্যের কারণে তাঁর সঙ্গে কারো বন্ধুত্ব নষ্ট হতো না। অপরদিকে ছিলেন আত্মসম্মানজ্ঞানী। মওলানা আকরম খাঁ অফিসে এলে মুজিবর রহমান খাঁ তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করতেন। কিন্তু আবুল কালাম শামসুদ্দীন এবং মোহাম্মদ মোদাব্বের কখনও এ কাজটি করেননি। ওঁরা দু’জন এ জাতীয় হীনম্মন্যতাবোধ হতে সম্পুর্ন মুক্ত ছিলেন।

আবুল কালাম শামসুদ্দীন জীবনের প্রায় শেষ দিন পর্যন্ত সাংবাদিকতা করেছেন। কিন্তু তাঁর অতি বড় ঘোর শত্রুও এ অপবাদ দিতে পারবে না যে, তিনি আপন পেশার সুযোগ নিয়ে নিজের আখের গুছিয়েছেন। তিনি ছিলেন সকল প্রকার দুর্নীতিমুক্ত। সম্পাদক হিসেবেও আবুল কালাম শামসুদ্দীন ছিলেন তৎকালীন মুসলিম সম্পাদক এবং সাংবাদিকদের মধ্যে সবচেয়ে যোগ্য এবং দক্ষ ব্যক্তি। ঢাকায় দু’বছর আমি আজাদের সহকারী সম্পাদক ছিলাম। একবার আমার একটি সম্পাদকীয় কিছুটা সংশোধন করে প্রেসে পাঠাবার পর আমাকে বলেছিলেন, কলেবর যতো কম করা যায় ততোই ভালো। মনে রাখা দরকার যে, পাঠকদেরও জ্ঞানবুদ্ধি ও বিচার-বিশ্লেষণ শক্তি আছে। তাঁর সেই মূল্যবান উপদেশ এখনও মনে পড়ে। কিন্তু সত্যের খাতিরে এ-কথা বলতেই হবে যে, তাঁর মধ্যে উদ্যোগ-ইংরেজিতে যে বস্তুকে এনট্র্যাপ্রেনারশিপ বলে, তার অভাব ছিল। তিনি অবস্থাপন্ন ঘরের সন্তান ছিলেন। তাঁর পিতার আমলে বাড়িতে হাতি ছিল। পিতার মৃত্যুর পরও তাঁর ভূসম্পত্তির ভাগ নিতান্ত তুচ্ছ ছিল না। তিনি যে সময়ে সাহিত্যকর্ম ও সাংবাদিকতা শুরু করেন সে সময়ে তাঁর মতো যোগ্য লোকের পক্ষে মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন অথবা মওলানা আকরম খাঁর মতো নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব ছিল মনে করি। কিন্তু সে চেষ্টা না করে তিনি কখনও বৈঠকখানা রোডের অন্ধকার দু’কামরার ফ্ল্যাটে, কখনও বেনেপুকুরে আবুল মনসুর আহমেদের সঙ্গে মিলে এক ফ্ল্যাটে অভাব-অনটনের মধ্যে পারিবারিক জীবন কাটিয়ে দিলেন। চাকরি করলেন সওগাত, ছোলতান, মোহাম্মদী এবং আজাদে। আজাদ থেকে বিতাড়িত হওয়ার অসম্মানও শেষ জীবনে তাঁর মেনে নিতে হলো। অথচ সমবয়সী আবুল মনসুর আহমদ এবং বয়সে কনিষ্ঠ মোহাম্মদ মোদাব্বের পাকিস্তানে এসে বড় বড় বাড়িঘর ও বিষয়-সম্পত্তি করলেন-মোটর গাড়িও দৌড়ালেন।

(প. ১৫৬ – ১৫৮)

 

জাহানারা চৌধুরী

জাহানারা চৌধুরী তখন কলকাতার খ্যাতনাম্নী সুন্দরী মডার্ন মুসলিম মহিলা। অবিবাহিতা জাহানারা চৌধুরীর অর্থবিত্ত ছিল। তিনি ‘বর্ষবাণী’ নামক একটি উঁচুমানের পাক্ষিক পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছিলেন। বেনজীর সাহেব ঐ পত্রিকাটির জন্য লেখা সংগ্রহ হতে শুরু করে সম্পাদনা ও মুদ্রণ পর্যন্ত সকল কার্যে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। এ কার্যে তিনি কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। প্রায় রোজ যেতেন জাহানারা চৌধুরীর বাড়িতে। বর্ষবাণী কলকাতার সুধী মহলের প্রশংসা অর্জন করেছিল। এ. এম. মোরাদ নামক এক যুবক বাঙ্গালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি যিনি বিমান চালনার লাইসেন্স পেয়েছিলেন। যতোদূর মনে পড়ছে, জাহানারা চৌধুরী তাঁকে বিয়ে করেছিলেন।

(প. ১৬০)

 

কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: দ্য ডেইলি স্টারের অনলাইন ভার্সন থিকা নেয়া।

কাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: দ্য ডেইলি স্টারের অনলাইন ভার্সন থিকা নেয়া।

 

কাজী নজরুল ইসলাম

কাজী নজরুল ইসলাম পুরোপুরি অসুস্থ হওয়ার পুর্বে তাঁর সঙ্গে আরো দেখা হয়েছে। অসুস্থ হওয়ার পরেও উত্তর কলকাতার বাসায় তাঁকে দেখতে গিয়েছি। ঝাউতলা রোডের একটি বাড়ির দোতলার ফ্ল্যাটে বাস করতেন সস্ত্রীক জুলফিকার হায়দার (সূফী জুলফিকার হায়দার)। জুলফিকার সাহেব বি আই এস এন (ব্রিটিশ ইন্ডিয়া স্টিম নেভিগেশন) কোম্পানিতে চাকরি করতেন। তিনি কবিতা লিখতেন, ছিলেন নজরুল ভক্ত। জুলফিকার সাহেবের সঙ্গে আমাদের অনেকের খাতির-প্রণয় ছিল। নিঃসন্তান জুলফিকার হায়দার সেকালে সকল প্রকার প্রগতিবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি কাজী সাহেবকে তাঁর বাসায় দাওয়াত করেছিলেন। আমি এবং তাঁর আরো কিছু বন্ধু-বান্ধব দাওয়াত পেয়েছিলাম। জুলফিকার সাহেবের ফরাশ-পাতা বৈঠকখানায় নজরুল হারমোনিয়ামযোগে কয়েকটি গান গেয়েছিলেন। তাঁর একটি বোধ করি ছিল, “দিতে এলে ফুল হে প্রিয় কে আজি সমাধিতে মোর।”

পাকিস্তানপন্থী এবং পাকিস্তানবিরোধী নির্বিশেষে প্রায় সকল মুসলিম রাজনীতিক অসুস্থ নজরুলকে ত্যাগ করেন। নজরুলের অসুস্থতার প্রথম দিকে অর্থাৎ দেশ বিভাগের পূর্ব পর্যন্ত মুসলমানদের মধ্যে জুলফিকার হায়দার তাঁর সাধ্যমত কবির খোঁজখবর নিতেন। হিন্দু মহাসভার ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ব্যক্তিগতভাবে কয়েক মাস কবির পরিবারকে মাসিক পাঁচশ’ টাকা সাহায্য করেছিলেন। নজরুলকে বিলেতে চিকিৎসা করাবার উদ্যোগ নেয়া হয়, দেশবিভাগের পর উদ্যোগ নিয়েছিলেন রবিউদ্দিন আহমদ এবং কিছু হিন্দু-মুসলিম যুবক কর্মী। অর্থসংস্থান এবং অন্য ব্যবস্থাদিতে বিশেষভাবে সহায়তা করেছিলেন কংগ্রেস-নেতা এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রধানমন্ত্রী ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়। নজরুলের সঙ্গে বিলেত গিয়েছিলেন রবিউদ্দিন আহমদ এবং সেকালের তরুণ ডাক্তার অশোক বাগচী। অশোক বাগচী এখন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিউরোসার্জন। বিলেতে নজরুলের চিকিৎসা এবং দেখাশোনার জন্য প্রবাসী ভারতীয় এবং পাকিস্তানি বিদগ্ধজন এগিয়ে আসেন। বিখ্যাত উর্দু লেখক কুররাতুল আইন হায়দরের ‘আগ কে দরিয়া’ নামক উপন্যাসে তার বিবরণ পাওয়া যায়। লেখিকা নিজেও নজরুলকে ঐ সময়ে দেখাশোনা করেছিলেন। ‘আগ কে দরিয়া’ বিভাগকালীন ভারতের বেদনার করুণ কাহিনী। আদমজী পুরস্কার পাওয়ার পর বইটির কাহিনী আইয়ুব সরকারের নজরে পড়ে। কুররাতুল আইন হায়দর নির্যাতন এড়ানোর জন্য ভারতে চলে যান।

নজরুল তাঁর প্রথম জীবনেও ফজলুল হক সাহেবের সঙ্গে মিলে সংবাদপত্র প্রকাশ করেছিলেন। ১৯২০ সালে প্রকাশিত সান্ধ্য দৈনিক নবযুগের প্রকৃত মালিক ছিলেন ফজলুল হক। কমরেড মুজাফফর আহমদ এবং নজরুল ইসলাম পত্রিকাটি সম্পাদনা করতেন। দেশবিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশে নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি। ১৯৩৭ সাল হতে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন যথাক্রমে ফজলুল হক, নাজিমুদ্দীন এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী। প্রজা পার্টির এবং কৃষক প্রজা পার্টির নেতা ছিলেন স্যার আবদুল রহিম, মওলানা আকরম খাঁ, ফজলুল হক, খান বাহাদুর আবদুল মোমিন, মওলানা বাকী, আবুল মনসুর আহমদ, শামসুদ্দীন আহমদ প্রমুখ। উক্ত তিন প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভা, তিন প্রধানমন্ত্রী এবং পরে উল্লিখিত নেতাদের মধ্যে কোনো এক ব্যক্তি যথাসময়ে কাজী নজরুল ইসলামের সুচিকিৎসার কার্যকর ব্যবস্থায় এগিয়ে আসেন নি। আবুল মনসুর আহমদ শুধু রাজনীতি করেন নি, সাহিত্যও করেছেন। কাজী নজরুল মূলত ছিলেন কবি। কিন্তু রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে তাঁকে জেলে যেতে হয়েছিল। জেলে অনশন করেছিলেন তিনি। তাঁর রাজবন্দীর জবানবন্দী এখনও বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। কাজী সাহেব একবার প্রত্যক্ষ রাজনীতিতেও প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন। যতোদূর মনে পরছে, তিরিশের দশকের গোড়ার দিকে নজরুল ঢাকা বিভাগ হতে আইন পরিষদের সদস্য পদপ্রার্থী হয়েছিলেন। তখন ভোটাধিকার ছিল খুবই সঙ্কুচিত। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জনৈক জমিদার। বলাবাহুল্য, নজরুল পাস করতে পারেন নি। সুতরাং নজরুল রাজনীতির সম্পুর্ন বাইরে ছিলেন না।

আবুল মনসুর আহমদ। ছবি: দৈনিক প্রথম-আলো'র অনলাইন আর্কাইভ থিকা নেয়া।

আবুল মনসুর আহমদ। ছবি: দৈনিক প্রথম-আলো’র অনলাইন আর্কাইভ থিকা নেয়া।

আবুল মনসুর আহমদ দ্বিতীয় পর্যায়ে নবযুগে নজরুলের অধীনে চাকরি করেছেন। আশ্চর্যের বিষয়, আবুল মনসুর আহমদের ‘রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ নামক গ্রন্থে কাজী নজরুল ইসলামের নামোল্লেখমাত্র নেই। অথচ এটাই তো প্রকৃত সত্য যে, আবুল মনসুর আহমদ নামোল্লেখ না করলেও, বাঙালি মুসলমানের সাত-আটশ’ বছরের ইতিহাসে একমাত্র অসাধারণ প্রতিভাবান ব্যক্তি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি পাথরের মতো অচল সমাজে গতির সঞ্চার করেছিলেন। বিশ্বের বিদগ্ধ মহল বাঙালি মুসলমানের মধ্যে একমাত্র কাজী নজরুল ইসলামকেই কিছুটা চেনেন জানেন।

(প. ১৬৬ – ১৬৭)

 

বেনজীর আহমদ এবং আবুল হাশেম

কবি বেনজীর আহমদ শুরু থেকেই আবুল হাশেম উপদলে যোগ দেন। একদিন তিনি আমাকে বললেন, মুসলিম লীগে একজন বিদ্বান ও বিপ্লবী নেতার আবির্ভাব হয়েছে। তিনি আবুল হাশেম। যাবেন তাঁর সঙ্গে মোলাকাত করতে। আমি রাজি নই। কুমিল্লার এ্যাডভোকেট মফিজউদ্দীন আহমদ (অবিভক্ত বাংলায় পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি এবং বিভাগ-পরবর্তী বাংলায় মন্ত্রী) এবং বেনজীর সাহেব আমাকে নিয়ে গেলেন আবুল হাশেম সাহেবের লোয়ার সার্কুলার রোডের বাসাবাড়িতে। নাশতার পর বেলা ন’টার দিকে উপস্থিত হয়েছিলাম। বেনজীর সাহেবের উদ্দেশ্য বোধ করি ছিল, আমাকে মুসলিম লীগের এই বিপ্লবী গ্রুপে রিক্রুট করা। ঘণ্টা দু’ঘন্টা আবুল হাশেম সাহেবের বৈঠকখানায় কাটলো। তিনি একাই কথা বললেন। আমরা কথা বলার ফাঁক পাই নি। হাশেম সাহেব চমৎকার বাংলা বলতেন। মুসলিম লীগে যোগদান করার পূর্বে তিনি মিহি শান্তিপুরী ধুতি গিলে করা মিহি পাঞ্জাবী-উড়ানি প্রভৃতি পোশাক পরতেন। তাঁর দৃষ্টিশক্তি দুর্বল ছিল। মোটা চশমায়ও তিনি সমুখের সকলের চেহারা-সুরত ও মুখের ভাবভঙ্গি দেখতে পেতেন না। সম্ভবত এজন্যই অপরের কথা শোনার তাগিদ তাঁর মধ্যে অনুপস্থিত ছিল।

কবি বেনজীর আহমেদ। ছবি: বাংলাপিডিয়া থিকা নেয়া।

কবি বেনজীর আহমেদ। ছবি: বাংলাপিডিয়া থিকা নেয়া।

তাঁর বৈঠকখানা হতে বিদায় নেয়ার পর আমি আমার সঙ্গীদ্বয়কে বললাম, আবুল হাশেম সাহেব তাঁর কথাবার্তায় ফার্স্ট পারশন সিঙ্গুলার নাম্বার অর্থাৎ আমি শব্দটি বড় বেশি ব্যবহার করেছেন। তিনি একাই সবকিছু করছেন এবং সবকিছু করার ক্ষমতা একমাত্র তাঁরই আছে, দীর্ঘ সময় বক্তৃতা শোনার পর আমার এ কথাই মনে হয়েছে। এ জাতের অহংবাদীরা দার্শনিক বিচারে ফ্যাসিস্ট। এই স্পষ্ট কথা শোনার পর আমার সঙ্গীদ্বয় আর কখনও আমাকে মুসলিম লীগে রিক্রুট করার চেষ্টা করেন নি।

বেনজীর আহমদ সাহেবের জীবনেও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন ঘটে। নিজেকে সকল প্রকার কুসংস্কারমুক্ত প্রমাণ করার জন্য বেনজীর সাহেব একদিন সকালে হিন্দুস্থান রেস্তরাঁয় এম. এন. রায়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সময় অভুক্ত অবস্থায় নিষিদ্ধ পানীয় গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বমি হয়েছিল। সেই বেনজীর সাহেব বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র তথা মার্কসিজমের বিরুদ্ধে কলম ধরলেন : লিখলেন ‘ইসলাম ও কম্যুনিজম’ নামক একটি বই। দুর্ভিক্ষের সময় একজন মাড়োয়ারির ওয়ার্কিং পার্টনাররূপে মোলাসেস (গুড়) এবং খাদ্যশস্যের ব্যবসায়ে নামলেন। মেস ত্যাগ করে পার্ক সার্কাসে বাসা নিলেন। ব্যবসায়ে তাঁর আর দু’জন সঙ্গী ছিলেন দৈনিক সংবাদ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা পরলোকগত হাজী গিয়াসউদ্দিন আহমদ এবং সান্তানপাড়া গ্রামের আবদুর রহিম খান ওরফে আমীন মিয়া। রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও বেনজীর সাহেব আমাকে স্নেহ করতেন এবং বিশ্বাসও করতেন।

মেসে থাকতে তিনি একজন লেখিকা রূপসী মহিলার প্রেমে পড়েছিলেন। পরস্পরের মধ্যে বেশ কিছুকাল পত্র বিনিময় চলছিল। একবার প্রেমিকার কাছ থেকে তিনি ১৬ পৃষ্ঠার দীর্ঘ পত্র পান। সেই পত্র আমাকে দেখিয়ে তিনি হেসে বলেছিলেন, ১৬ পৃষ্ঠার জবাব ৩২ পৃষ্ঠায় দিতে হয়, কি বলেন? আমি লজ্জাবশত তাঁর প্রেমিকার পত্র পাঠ না করেই বলেছিলাম, হ্যাঁ। ওদের বিয়ে হয় নি। কেননা বেনজীর সাহেব তখন প্রায় কপর্দকহীন বেকার। মহিলা এম. এস. সি. পাস এক যুবককে বিয়ে করেন। ভদ্রলোক মোটামুটি ভালো বেতনের সরকারি চাকরি পেয়েছিলেন। বেনজীর সাহেব এন্তেকাল করেছেন। মহিলা এখনও জীবিত আছেন। উভয়ের মধ্যে বিনিময়িত পত্রাবলি প্রকাশিত হলে সেটা হয়তো শিল্পোত্তীর্ণ সাহিত্যের মর্যাদা পেতো। ইউরোপীয় সমাজে এটা হয়। আমাদের সমাজ এখনও এসব ব্যাপারে অনগ্রসর। আমি অভাবগ্রস্ত ছিলাম। সম্ভবত আমার প্রতি স্নেহবশেই বেনজীর সাহেব আমাকেও তাঁর ব্যবসায়ে শরিক হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমি তাঁর পার্ক সার্কাসের বাসায় প্রায় যেতাম। কিন্তু তাঁর বৈষয়িক প্রস্তাবে সাড়া দিতে পারি নি।

(প. ১৭১ – ১৭২)

 

শহীদ হোসেন সোহরাওর্য়াদীর লগে লাঠি ভর দিয়া বইসা  আছেন খাজা নাজিমউদ্দিন

শহীদ হোসেন সোহরাওর্য়াদীর কিনারে লাঠি ভর দিয়া বইসা আছেন খাজা নাজিমউদ্দিন

 

খাজা নাজিমুদ্দীন

পরদিন সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খাজা স্যার নাজিমুদ্দীনের ইন্টারভিউ নিতে তাঁর বালিগঞ্জের বাসভবনে যাই। নাজিমুদ্দীন সাহেব ছিলেন শরাফতির প্রতীক। মস্তবড় লনআলা বিশাল বাড়ি। লনে ফুলবাগান। মাঝখান দিয়ে গাড়ি বারান্দা পর্যন্ত পাকা রাস্তা। তারপর রিসেপশন রুম। এক পাশে অফিস ঘর। কার্ড দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি পেলাম। ঢুকে দেখি তিনি চেয়ারে বসে ফর্সি হুঁকোয় তামাক টানছেন। সমুখে টেবিল। তার ওপরে কিছু ফাইল এবং দোয়াত-কলম। আমি ঢুকতেই তিনি দাঁড়িয়ে করমর্দন করে বললেন, তশরিফ রাখ্‌খিয়ে। বসলাম, তিনিও পুনরায় আসন গ্রহণ করলেন। তাঁকে ঘেঁসে ডানদিকের চেয়ারে বসা ছিলেন সম্ভবত তাঁর কোনো আত্মীয়। দেরাজ হতে মার্কোভিচ ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট সিগারেটের টিন বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, পিজিয়ে। আমি একটি তুলে নিলাম। তিনিই লাইটারের আগুন এগিয়ে দিলেন। সিগারেট জ্বালিয়ে মৃদু মৃদু টানছি। তিনি তাঁর পাশে উপবিষ্ট ভদ্রলোকের সঙ্গে তাঁর অসমাপ্ত আলাপ শুরু করলেন।

নাজিমুদ্দীন সাহেব বললেন, বহুত খতরনাক বোম্বারি হু রহি হ্যায়। কাহিয়ে তু মেরা ফেমেলি কাঁহা ভেজু? কিয়া ঢাকা ভেজ দো? ভদ্রলোক বললেন, সেইফ নাহি, নারায়ণগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া হ্যায়, বোম্বারি হু সাকতা। বলাবাহুল্য, নারায়ণগঞ্জে তখন দুটি বস্ত্রমিল ব্যতীত অন্য কোনো ইন্ডাস্ট্রি ছিল না। নাজিমুদ্দীন সাহেব বললেন, ঠিক বাত। একটা চিন্তা করে নিজে থেকেই প্রস্তাব করলেন, রাজশাহী ভেদ দো, আপ কিয়া বোলতে? ভদ্রলোক সায় দিয়ে বললেন, সহী বাত, রাজশাহী সেইফ হ্যায়। ওদের কথা শেষ হলো। নাজিমুদ্দীন সাহেব তাঁর পরিবার সত্য সত্যই রাজশাহী পাঠিয়েছিলেন কি না জানি না। খোঁজ করি নি।

আমার সঙ্গে ইন্টারভিউ শুরু হলো, আমি তাঁকে বোমাবাজির পর কলকাতার হাল অবস্থা, জনসাধারণের আচরণ এবং আমাদের কর্তব্য কি এসব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছিলাম। নিমিষে তাঁর মস্তিষ্ক ফ্যামিলির নিরাপত্তা সম্বন্ধীয় চিন্তা-ভাবনার অবসান হলো, তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরূপে বললেন, পাবলিক মোরেল বহুত হাই হ্যায়। We will defend our country to the last drop of our blood, Govt. is fully prepared to meet all eventualities. The enemy will incur crushing defeat-এ ধরনের কথাবার্তার মধ্যে আমার জন্য চা-নাশতা এলো। ইন্টারভিউ শেষে বের হয়ে আসার সময় বাড়িটার পশ্চাদ্‌দিকে তাকিয়ে দেখলাম, এক মহিলা মোরগ-মুরগির ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরের প্রাণীগুলো দেখছেন। নাজিমুদ্দীন সাহেবের বেগম সাহেবাই হবেন, মনে হলো।

প্রকৃত সত্য ছিল বিপরীত। সরকার কলকাতাবাসীদের মোরেল (মনোবল) হাই বলছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টি এবং র‍্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি জনযুদ্ধ তত্ব এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছিল। কোনো ফল হয় নি। আতঙ্কগ্রস্ত কলকাতার মানুষ হাজারে হাজারে ছুটলো। যাঁদের নিজস্ব যানবাহন আছে তাঁরা হাওড়া পুল পেরিয়ে গ্রান্ড ট্রাঙ্ক ধরে গাড়ি ছুটালো। শিয়ালদহ এবং হাওড়া স্টেশনে রেলগাড়ির জন্য জমায়েত হলো অগণিত নারী-পুরুষ-বালক-বালিকা। যুদ্ধের প্রয়োজনে প্যাসেঞ্জার গাড়ির সংখ্যা হ্রাস করা হয়েছিল। গাড়ির ভেতরে শ্বাসরোধকর অবস্থা। ছাদে ও পাদানিতে বিপদ। সকল বিপদ-আপদ উপেক্ষা করে বুড়োবুড়ি-যুবক-যুবতী বালক-বালিকারা নিষ্প্রদীপ গাড়ি বোঝাই করে ছুটলো। কোথায় যাচ্ছে ঠিক-ঠিকানা নেই। গাড়ির গন্তব্যস্থল জানার চেয়ে কলকাতা ত্যাগ করাটাই ছিল বেশি জরুরি। প্রয়োজনের তুলনায় যানবাহন কম। পুরুষানুক্রমে নিশ্চল নির্বিবাদী জীবনের তার ছিঁড়ে গেল। এক মুহূর্ত দেরি করা যায় না। লাখ লাখ নরনারী মাথায় ঘটিবাটি গাঁটরি-বোচকা এবং কাঁখে শিশু নিয়ে হ্যারিসন রোড ধরে হাওড়া ব্রিজ পার হয়ে পদব্রজে ছুটলো। ছুটলো নৈহাটি, রানাঘাট, বনগাঁর দিকেও। কয়েকদিনের মধ্যে কলকাতা প্রায় খালি হয়ে গেল।

১৯৪১ সালের ৮ আগস্ট রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুসংবাদ জানার পর কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় শোকার্ত জনগণের ঢল নেমেছিল। তার চেয়ে অনেক বেশি জনজট সৃষ্টি করেছিল বোমাতঙ্কে পলায়নপর কলকাতাবাসী।

(প. ১৭৪ – ১৭৫)

 

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য