Main menu

সিলেক্টেড টেক্সট: আত্মস্মৃতি – আবু জাফর শামসুদ্দীন (লাস্ট পার্ট)

১।। ২ ।। ৩ ।।

১৯৬৫-এর পর থিকা মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত – এই পার্ট। এই টাইমটাতে আইসাই বইটা শেষ হইছে। ঢাকায় আইসা বেশ কিছুদিন দৈনিক আজাদ-এর চাকরিটা করছিলেন, আবু জাফর শামসুদ্দীন। পরে ইব্রাহীম খাঁ’র সাথে ঝামেলা হওয়ায় চাকরি বাদ দিতে হয় উনার। কিছুদিন বইয়ের ব্যবসা করার ট্রাই করছিলেন, পারেন নাই। শেষে বাংলা একাডেমিতে অনুবাদ বিভাগে কাজ করছেন অনেকদিন। উনি যখন জয়েন করেন তখন বাংলা একাডেমী’র পরিচালক আছিলেন সৈয়দ আলী আহসান, পরে কবির চৌধুরী। চাকরির পাশাপাশি লেখালেখিও করছেন বিভিন্ন পত্রিকায়।

—————————————————————-

 

অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের পলিটিক্যাল আলাপ

১১.৮.৬৫ তারিখে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক বাংলা একাডেমীতে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সরদার ফজলুল করিম। বেলা ১০ থেকে ১২.৫২ পর্যন্ত রাজ্জাক সাহবের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনায় কাটলো। রোজনামচায় আলাপ-আলোচনার সারবস্তুরূপে লেখা আছে,

১. তাঁর (রাজ্জাক সাহেবের) মতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির এ প্রতিযোগিতা বিগত ১৭ বছর ধরে চলছে, পাকিস্তান এজন্য কখনও দায়ী নয়। পাকিস্তান বহুবার joint-defence of the sub continent-এর প্রস্তাব দিয়েছে, ভারত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারতের বর্তমান সামরিক ব্যয় ১২০০ কোটি টাকা, পক্ষান্তরে পাকিস্তানের সামরিক ব্যয় ১৫০ থেকে ২০০ কোটির বেশি নয়। ভারতের ২০/২১ ডিভিশন সৈন্য। পাকিস্তানের সাড়ে সাত ডিভিশন।

২.P.L. 480 সাহায্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘরোয়া Price support scheme, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপন্ন কৃষিজাত দ্রব্য সরকারকে ক্রয় করতে হবে। ক্রয়ের পর হয় সেগুলো পুড়িয়ে দিতে হবে অথবা সাগরে ফেলে দিতে হবে। ঐ খাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দৈনিক গুদাম ভাড়া দিতে হয় ১০ মিলিয়ন ডলার। এ গম খাদ্য ঘাটতি দেশে পাঠানো হয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, P.L. 480 সাহায্য শুধু আমাদের অনুরোধে দেয়া হয় না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গরজেও দেয়া হয়। যে গম ফেলে দিতে হতো তার দাম, জাহাজ ভাড়া, বিদেশে অবস্থিত মার্কিন উপদেষ্টাদের বেতন ভাতা, rupee counterpart fund দিয়ে গোয়েন্দা পোষণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু অফিস চালিয়ে যাওয়া প্রভৃতি বাবদে শতকরা ৬০ ভাগ আদায় করে নেয়া হয়, বেকি চল্লিশ ভাগ গচ্চা দিতে হলেও-এতদ্বারা যে রাজনৈতিক চাপ বিদেশের ওপর দেওয়া হয় তার মূল্য ঐ চল্লিশ ভাগের চেয়ে বেশি।

৩. চীনের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের তুলনা হয় না। রুশ বিপ্লবসহ প্রতিটি দেশের বিপ্লবের নেতারা পারস্পরিক দ্বন্দ-কলহে লিপ্ত হয়েছেন, খুনও হয়েছেন। চীনে তা ঘটে নি, নেতাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। তাছাড়া কর্মী হিসেবে চীনাদের সঙ্গে পৃথিবীর কোনো জাতের লোকের তুলনা হয় না। পৃথিবীর বহু স্থানে তাদের settlement (উপনিবেশ) আছে। শিল্প ও বাণিজ্যে নিযুক্ত এসব লোক স্থানীয় অধিবাসীদেরও হারিয়ে দেয়। সুতরাং চীন যেভাবে তাদের খাদ্য ও অন্যান্য সমস্যার সমাধান করেছে সেটা পাকিস্তান পারবে কিনা সন্দেহ।

পাকিস্তানের মূল সমস্যা হলো অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপন্ন করা-সেটা খাদ্যদ্রব্য বাঁ অন্য যে-কোনো জিনিস হোক। এই উদ্বৃত্ত এতো বেশি হতে হবে যাতে এটা বহির্বিশ্বে বিক্রয় করা তদ্বারা দেশের সকল প্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানি করা যায়। এতে সাফল্য লাভের একমাত্র উপায় ২৫ জনের কাজ একজনে করার মতো যন্ত্রপাতি স্থাপন করা – যন্ত্রপাতির অর্থ হচ্ছে accumulated labour. উদ্ধৃত লোক অন্য কাজে নিযুক্ত হবে।

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্ট বাগদাদ (পরবর্তীকালে সেন্টো প্যাক্ট) এবং সিয়াটো প্যাক্টে পাকিস্তানের যোগদান করার বিষয়টা আলোচনায় আনেন নি।

(প. ৩৩৪ – ৩৩৫)

 

জামাতে ইসলাম

৯.৩.৬৯ তারিখে লাহোরে অনুষ্ঠিত মওলানা ভাসানীর সভায় মওদুদীর জামাতে ইসলামী বাধা দিতে চেষ্টা করলে জনতা ওদের তাড়িয়ে নিয়ে যায় এবং তাদের একটি অফিস পুড়িয়ে দেয়। জামাতের লোকেরা বলে, কোরান পোড়াচ্ছে। উদ্দেশ্য লোকজন যেন ক্ষিপ্ত হয়ে ন্যাপ কর্মীদের আক্রমণ করে। কিন্তু লোকজন এ কথা বিশ্বাস করেনি : পরীক্ষা করে দেখতে পায় ওগুলো হিসাবপত্রের কাগজ। মওলানা ভাসানী সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন : গৃহযুদ্ধের জন্য আমরা প্রস্তুত। জামাতে ইসলামী লাখ লাখ টাকা (মার্কিনী টাকা) খরচ করে আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার চালাবে আর আমরা বসে থাকবো! মুসলমান হিসাবে চড় খেয়ে অন্য গাল বাড়িয়ে দেয়ায় বিশ্বাস করি না। মওলানা ভাসানী আরো বলেন, জামাতে ইসলামীর এই ঘৃণ্য কার্যাবলীতে সরকারি সহায়তা বিদ্যমান।

তিনি আদমজী প্রভৃতি বড় capitalist এবং জমিদারদের উদ্দেশে সাবধানবাণী উচ্চারণ করে বলেন, ওরা নিহত হবে, ওদের খেয়ে ফেলা হবে।

পিন্ডিতে মওলানা ভাসানীকে সংবর্ধনা জ্ঞাপনের জন্য বিমানবন্দরে আগত জনতাকে জমিয়াতে ইসলামীর লোকেরা লাঠিসোঁটা নিয়ে আক্রমণ করে। দু’দলে সংঘর্ষ বাধে, কিছু লোক জখমী হয়।

জামাতে ইসলামীর লোকেরা জনৈক সংবাদপত্রের ফটোগ্রাফারকে মারপিট করে। এক মৌলভী চিৎকার করে বলে, এ ব্যক্তি কাফের : তসবীর গ্রহণ করছে।

(প. ৩৭৩)

 

চীন-এর প্রধানমন্ত্রী চৌন এনলাইন এর সাথে আলাপ করতেছেন মৌলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ঢাকা, ১৯৫৬।

চীন-এর প্রধানমন্ত্রী চৌন এনলাইন এর সাথে আলাপ করতেছেন মৌলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ঢাকা, ১৯৫৬।

 

বাংলা একাডেমি পুরষ্কার

১৪.৪.৬৯

১৪ এপ্রিল ১ তারিখে, ’৬৮ সালের বাংলা একাডেমী পুরষ্কার প্রাপ্তদের নাম প্রকাশিত হয়। তার মধ্যে আমার নামও দেখলাম। ডায়েরিতে লেখা আছে, “মাঝে মাঝে ভেবেছি বাংলা একাডেমী পুরষ্কার গ্রহণ করব না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করলাম। প্রধান কারণ দু’হাজার টাকা। দু’হাজার টাকার মধ্যে এক হাজার টাকা ব্যয় করলে আমার জন্য লেখাপড়ার একটি ঘর নির্দিষ্ট এবং মোটামুটি সুসজ্জিত ও আরামদায়ক করতে পারি। বাকি এক হাজার টাকা পারিবারিক বাসগৃহের দরজা-জানালা মেরামত এবং ছাপড়ার উপরটা ঠিকঠাক করার কাজে ব্যয় করলে বৃষ্টিবাদলের ঝাপটা থেকে রক্ষা পেতে পারি। এই হচ্ছে আমাদের জীবন। ৫৮ অতিক্রম করে ৫৯-এ পড়েছি। এখন পর্যন্ত দু’হাজার টাকা বর্জন করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারলাম না। অথচ চোরচোট্টা বদমাশ এবং জালেম মোনাফেকদের টাকা পয়সা ও স্বাচ্ছল্য সীমাহীন।

দ্বিতীয় কারণ কিছুটা মানসিক দুর্বলতাও বটে। কিন্তু বাংলা একাডেমীর চাকরিতে নিযুক্ত না থাকলে এবং দু’হাজার টাকাকে মূল্যবান জ্ঞান করতে না হলে এই মানসিক দুর্বলতা অবশ্যই পরিহার করতে পারতাম। এরূপ মনের জোর ছিল এবং আছে।…

(প. ৩৯১)

 

রবীন্দ্রনাথ

৮.৫.৬৯

সকালে বাংলা একাডেমীতে রবীন্দ্রনাথের জন্মোৎসব। সৈয়দ আলী আহসান সভাপতি। উপস্থিত ছিলাম। রবীন্দ্রনাথ বাংলাভাষাকে আধুনিক ভাব প্রকাশের অনেকখানি উপযোগী করেছেন এবং তাঁর রচনার পরিমাণও বিপুল-সঙ্গীত, গীতিকাব্য, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ প্রভৃতি সর্বক্ষেত্রে তাঁর ডান অসামান্য, কিন্তু তবু কেন জানি আমার মনে হয়, প্রতিভার বিচারে তাঁর চাইতেও বড় বঙ্কিমচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন এবং কাজী নজরুল ইসলাম – কাজী নজরুলের মন ও রচনা কোনোটাই পরিশীলিত নয়-ঘষামাজা নেই। কিন্তু তাঁর আবেদন হুইটম্যানের মতো প্রত্যক্ষ জোরালো এবং উৎপীড়িত মানুষের জন্য উৎসাহ।

(প. ৩৯১ – ৩৯২)

 

আওয়ামী লীগ এবং জামাতে ইসলাম

১১.১.৭০

আজ পল্টন মাঠে এ বছরের সর্ববৃহৎ জনসভা হলো : উদ্যোক্তা আওয়ামী লীগ। লোকসংখ্যা রক্ষণশীল অনুমান মতে দু’লাখ। প্রধান বক্তা শেখ মুজিবর রহমান ঘোষণা করেন, তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে (১) ২৫ বিঘা পরিমান ভূমির মালিককে ভূমিরাজস্ব থেকে রেহাই দেয়া হবে (২) পাটের ব্যবসা জাতীয়করণ করা হবে এবং পাটের সর্বনিম্ন মূল্য ধার্য করা হবে ৪০ টাকা মণ। (৩) ইন্সিউরেন্স কোম্পানি, ব্যাঙ্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্পসমূহ জাতীয় সম্পত্তি করা হবে। (৪) ছ’দফা প্রশ্নে আপস করা হবে না। (৫) পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশের) নাম বাংলাদেশ করা হবে। (৬) বঞ্চিত পূর্ববাংলা তার ন্যায্য পাওনা-গণ্ডা সম্পুর্ন আদায় করার পূর্বে secede বাঁ পৃথক হওয়ার চিন্তাও করতে পারবে না।

 

১৮.১.৭০

জামাতে ইসলামী বা মওদূদীর দলের জনসভা পল্টন ময়দানে। সমাগত লোক কয়েক হাজার। সভা শুরু হওয়ার অনেক আগে পল্টন মসজিদ সংলগ্ন স্থানে একটি লাল সালুঘেরা জায়গায় জামাতীরা বিপুল সংখ্যক বাঁশের লাঠি, লৌহদণ্ড ও ছোরা স্তূপীকৃত করে। বলা হয়, ওখানে মওদূদী এসে বসবেন।

সভার শুরুতেই বক্তাগণ মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবর রহমান, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ প্রমুখ নেতা এবং তাঁদের দলগুলোকে ইসলাম বিরোধী, বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং কাফের ইত্যাদি বলে গালিগালাজ শুরু করে। ফলে শ্রোতারা অসহিষ্ণু হয়ে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে উদ্যত হলে জামাতে ইসলামীর “স্বেচ্ছাসেবকগণ” সেই লালসালুঘেরা সংরক্ষিত স্থান থেকে লাঠি, ছোরা এবং লৌহদণ্ড নিয়ে জনতার ওপর আক্রমণ শুরু করে। তখন জনতা বনাম জামাতীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। জনতা স্টেডিয়াম ও অন্যান্য দিক হতে ইষ্টক বর্ষণ করতে থাকে। মঞ্চ থেকে অধ্যাপক গোলাম আজম তার অনুসারীদের ডান বা উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিমে সমবেত ‘কাফেরদের’ ওপর আক্রমণ চালাবার নির্দেশ দেন। নির্দেশ অনুযায়ী তারা জনতার ওপর বেশ সুশৃঙ্খলভাবে আক্রমণ চালায়। বেশ কিছু সংখ্যক লোক ধরাশায়ী ও জখমি হয়। বেশ কিছুসংখ্যক জখমি লোককে মঞ্চের দিকে টেনে নিয়ে গিয়ে বেদম প্রহার করে প্রায় মৃতকল্প করে ফেলে। পরদিন ১৯.১.৭০ তারিখের দৈনিক সংবাদে মুদ্রিত একটি ছবিতে দেখা যায়, জনৈক জামাত কর্মী উন্মুক্ত ছোরা হস্তে বেগে জনতার দিকে ধাবমান : তার কোটের লেজ উড়ছে। পাতলুন ও কাবুলি স্যান্ডাল পড়া লোকটির চেহারা দেখলে মনে হয়, সে মোহাম্মদপুরবাসী অবাঙালী গুণ্ডা।

কিছুক্ষণ পরে অবস্থা পরিবর্তিত হয়। বিক্ষুব্ধ জনতার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, ওরা জামাতীদের চতুর্দিক থেকে আক্রমণ করে। জামাতীদের অস্ত্রশস্ত্র কেড়ে নিয়েই জমাতীদের বেদম প্রহার করতে থাকে। গোলাম আজম, মওদূদী প্রমুখ জামাতী নেতারা মঞ্চ ফেলে পলায়ন করে। মওদূদীর বক্তৃতা দেয়া হয় না। এই সংঘর্ষে প্রায় ৫০০ লোক জখমি হয়।

(প. ৪১০ – ৪১১)

 

প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক। ছবি: দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার অনলাইন ভার্সন থিকা নেয়া।

প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক। ছবি: দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার অনলাইন ভার্সন থিকা নেয়া।

 

প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক

১৪.৬.৭০

মেডিক্যাল কলেজ থেকে এলাম ইউনিভারসিটি ক্লাবে। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে রাত নয়টা পর্যন্ত আলাপ। তিনি বললেন, মওলানা ভাসানী দু’দিক থেকে শেখ মুজিবকে শক্তিশালী করছেন। ১. জমাতে ইসলামী এবং অন্যান্য ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে লড়ার ক্ষমতা একমাত্র তাঁরই আছে, কেননা তিনিও মওলানা। এজন্যই তিনি Socialism-এর পূর্বে ‘ইসলাম’ যোগ করছেন এবং খেলাফায়ে রাশেদিনের কথা বলছেন। ২. তিনি লাহোর প্রস্তাবের উল্লেখ করছেন এবং বিক্ষোভ ও মিছিলের মাধ্যমে জনসাধারণকে অধিকার সচেতন করছেন -পার্লামেন্টারি ফ্রন্টে আপস না হলে জনতার চাপ। আওয়ামী লীগের উচিত মওলানার সাথে সমঝোতা রাখা। আলাপের এক পর্যায়ে আমি বললাম, ধর্ম যে জাতিসত্তার ভিত্তি নয় তাই প্রমাণিত হচ্ছে পাকিস্তানে। তিনি বললেন, ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত ধর্মীয় ভিত্তিতে ভারত ভাগ করার থিওরি উপস্থিত করা হয়নি। আমি একমত হইনি। মি. জিন্নাহ এবং তার চেলাগণ আন্দোলনের শেষের দিকে ধর্মকেই জাতির ভিত্তি বলতেন, যদিও বাস্তবে তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

রাজ্জাক সাহেব প্রখর বুদ্ধির লোক। আজকের পাকিস্তান অবজার্ভারের সম্পাদকীয় সম্বন্ধে মন্তব্য করলেন, ছাত্র এ্যানার্কি এবং গণ-অ্যানার্কি isolate করে দেখা যায় না। সমগ্র বিশ্বে এ বিক্ষোভ ও অসন্তোষ চলছে। আমরা আমেরিকা এবং ব্রিটেনের অনুসারী, সুতরাং এ ব্যাপারে আমাদের পথ আলাদা হতে পারে না। খুব এক চোট হেসে যোগ করলেন, “১৯৬৯ সালে আইয়ুবশাহী খতম করেছে এই এ্যানার্কি-ওদের কাছে আমরা ঋণী। সে ঋণ শোধ করতে হবে তো। কিছু সুদ চাচ্ছে এবং চড়া সুদই চাচ্ছে। সমঝোতা করেই শুধু এ ঋণ শোধ করা সম্ভব।”

(প. ৪৫৭)

 

ট্রেনে

২৮.৬.৭০

সকাল আটটায় ‘দ্রুতযানে’ ময়মনসিংহ যাচ্ছিলাম। বৃষ্টিতে ভিজে মাটি আবার উর্বর হয়েছে। কোথাও ধূসরতা নেই-সবুজ কেবল সবুজ।… পূর্ব বাংলার জনবসতির এ সবুজ, শস্যের পুষ্পের এবং ফলের সঙ্গে মিলিয়ে এক বিশিষ্ট সবুজ। মনে হলো, রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা দর্শন করছি। বর্ষার পানি আসছে, মাঠ-ঘাট ডোবাচ্ছে-ধানের চারারা তার ওপরে অপূর্ব জীবনোন্মাদনায় সাঁতার কাটছে। জোয়ারের জলে পল্লীবধূরা স্নান করছে। বালক-বালিকারা বাইছালি খেলছে।…

শ্রীপুর স্টেশনের প্লাটফরমে কাঁঠালের হাট জমেছে, দু’জন নারী দেখলাম হাটের মধ্যে। একজনের বেশ পুষ্ট দেহ। বয়স ২৫/৩০ হবে। মুখে পান। সে সময়ও পুরুষদের মধ্যে স্বাধীনভাবে অসংকোচে বিচরণ করছে। প্রয়োজনবোধে ঠেলেও দিচ্ছিল কাউকে। মনে হলো স্ত্রীলোকটি বেশ চালাক-চতুর। যৌন ব্যাপারে কিঞ্চিৎ শিথিল কিনা বলা যায় না! তার চালচলন দেখলে অনেকের তাই মনে হবে; কেননা এ-দেশের হাটের মধ্যে যুবতী নারীর এ-ভাবে চলাফেরা এখনও পুরোপুরি স্বীকৃত নয়। কিন্তু আগমন যদি হয়ই তাহলে কেউ যে রোধও করে না, তার প্রমাণ এ নারী। বেশ লাগলো আমার।

আর এক ব্যক্তিকে দেখলাম-এক ঠ্যাং কিঞ্চিৎ খাট-রাবারের জূতো পায়ে ছাতা বগলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। লুঙ্গি পরনে গায়ে পাঞ্জাবি-মাতব্বর ভাব-কাঁঠালের হাটে দালালি করে বোধ করি।

জনসমাগম দেখে মনে হলো-আবহমানকাল থেকে এই চলছে। হাটে বাজারে জনসমাগম-স্থির-কালাতীত-স্থবির-ব্যক্তিগুলো অপসৃত কিন্তু জনতা কায়েম মোকাম।

এই Theme-এর ওপর একটা ছোট উপন্যাস শুরু করা যায়। যে মেয়েটাকে অসংকোচে বিচরণ করতে দেখলাম সে নায়িকা এবং ঐ খোঁড়া লোকটি নায়ক।… মানুষের মুখের আদল যে কত বিচিত্র হতে পারে আশ্চর্য! গাড়ির একটা লোকের মুখের সাথে আর একজন লোকের মুখের মিল নেই। মুখটাই পরিচয়পত্র।

মশাখালী স্টেশন ছাড়াতে লাইনের পার্শ্বে দণ্ডায়মান একটা বালক কিছু ইটের গুঁড়ো ছুঁড়ে মারল জানালা লক্ষ্য করে। আমার মুখে এসে পড়ল-বেশ আঘাত করল, অল্পের জন্য চশমা বেঁচে গেল। বালকটার এই অদ্ভুত প্রবণতার পশ্চাতে কি আবেগ ক্রিয়া করছিল? চলমান গতিশীল ট্রেনের বিরুদ্ধে আক্রোশ, না কি গাড়ির ভিতরের সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বঞ্চিতের পুঞ্জীভূত আক্রোশ? সে কি প্রতিশোধ নিল যাদের আছে তাদের বিরুদ্ধে? ধন্য তুমি উদোম গা বালক।

(প. ৪৬২ – ৪৬৩)

 

উপন্যাসের প্লট

২৭.৮.৭০

আজ তিনি দিন যাবৎ ভাবছি : উপন্যাস রচনায় এমন একটি টেকনিক ব্যবহার করা যায় কি না, যদ্দারা, কর্তা, কর্ম, উত্তম পুরুষ, দ্বিতীয় পুরুষ, তৃতীয় পুরুষ নামও রচনায় আসে না-আসে কেবল তাদের কর্ম অথচ উত্তম পুরুষের স্বগতোক্তি থাকবে না। পরিচিত কয়েক ব্যক্তি যখন বাক্যালাপ করে তখন একে অপরের নাম ক্বচিৎ উচ্চারণ করে : তাদের কর্মটাই শুধু দেখা যায়। অর্থাৎ মানুষের কর্ম যেভাবে চলে-তার হুবহু রূপ ভাষায় দেওয়া যায় কি না আমার পরীক্ষার বিষয় তাই। যেমন, স্বামী স্ত্রী ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়ার একটা দৃশ্য ধরা যাক।

তোমাকে কতবার বলেছি, এ্যানগ্যাজমেন্টের অন্তত আধ ঘণ্টা পূর্বে প্রস্তুত হয়ে থাকবে।

অত অবসর আমার নেই।

এ্যানগ্যাজমেন্ট না করলেই পারো।

কেন? কেন?

যা রাখতে পারবে না তার মধ্যে নাক গলানো কেন?

অত করে বাঁধলাম তবু খোঁপাটা জুতসই হলো না, শুধু আয়না সম্বল করে একা একা পারা যায় না কি? কি সংসারে এলাম, কেউ সাহায্য করার নেই। বুড়িটা ছিল, কিন্তু না না তাকে খেদিয়েছি, বেশ করেছি। যেমন কুকুর তেমন মুগুর-মাতৃত্ব ফলাতে চায়। মা আবার কবে স্ত্রীর চেয়ে বেশি হলো! Now it is alright. শালার খোঁপা! সেক্সই হচ্ছে একমাত্র প্রত্যক্ষ সম্পর্ক-The man is absolutely worthless, but in…, বলছি শিগগিরই ওঠো-তোমার তো আবার বাথরুম-সেখানে আধ ঘণ্টা, ওঠো।

ছাড়ো বলছি, এমন কাহিনী হয় না, বইটা শেষ করতে দাও।

না, আমি বলছি ওঠো। তোমাকে এই মুহূর্তে উঠতে হবে।

না, উঠবো না, বই শেষ না করে উঠবো না।

কি বললে?

বললাম।

ভালো হবে না কিন্তু-

মন্দটা হবে কি শুনি? রাতে দেখে নেবে-এই তো। চাই না। রোজ রোজ ভালোও লাগে না। ঘুমাতে পারি না তোমার যন্ত্রণায়-(দ্যা বিচ)

আমার যন্ত্রণায় ঘুমোতে পারো না! আমি কুত্তি? হোয়াট এ্যা লায়ার-সহ্য করবো না, সহ্য করবো না?

উঃ অযথাই পাউডারগুলো ফেললে-কৌটোটা ভাঙলো! হাঃ হাঃ! খামচাতে শুরু করেছ? ছাড় বলছি কুত্তির বাচ্চি কুত্তি-এ্যা হারলট। তবে রে… দুম!

মারলে! কত বড় সাহস! হাত তুললে? ও মাগো! মা! আমার শিরদাঁড়া… গেছি রে গেছি! মাগো! মা! অত বড় থাপ্পড়টা মারলে গালে? মাগো! মা! মেরে ফেললে গো! রাখবো না, রাখবো না, হারামজাদা কুত্তা তোর কিছুই রাখবো না গায়ে-এই যে এক শাড়ি, দুই ব্লাউজ, তিন সায়া, চার চুড়ি, পাঁচ নেকলেস, ছয় কানফুল, সাত জূতো-নাউ, দেখ আমার দিকে চেয়ে দেখ হারামজাদা! আসবি আর কখনও আমার কাছে? ও মাগো। বাবাগো গেলাম গো! মরলাম গো।

মাইগড! গডেস কালী। তৌবা আস্তাগফিরুল্লাহ। নারী দেহ এমন বিদঘুটে বিশ্রী! ইটস বেটার টু… দেনটু এন্টার ইনটু দিস আগলি এ্যান্ড রটেন বডি।…

এভাবে লিখে যাওয়া যায়, কিন্তু তিন ব্যক্তি বা ততোধিক সংখ্যক লোকের আচরণ ও ক্রিয়াদি ভাষায় প্রকাশ সম্ভব কি?

(প. ৪৭৫ – ৪৭৭)

 

কবি জসীমুদ্দিনের পরিবার

১৮.৯.৭০

বিকেলে শওকত ও আমি কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের রেস্তোরাঁয় চা-নাস্তা করে অবসরপ্রাপ্ত এ্যাসিস্টান্ট সেক্রেটারি জিয়ায়ুল হক সাহেবের বাড়ি যাই। অমায়িক ভদ্রলোক। লেখাপড়া করেন। কবি জসীমউদ্দীন সাহেবের বাড়ির পাশে তাঁর বাড়ি। জসীমউদ্দীন সাহেবের পরিবারের অনেক খবর শুনলাম। এক ছেলে নাকি আত্মহত্যার চেষ্টায় দু’দিন আগে বড়ি খেয়েছিল। জসীমউদ্‌দীনের স্ত্রী নাকি দুধের ব্যবসা করেন। কয়েকটি গাই পালেন এবং দুধে পানি মিশিয়ে বেচেন।

পৃথিবীতে আশ্চর্য হওয়ার মতো কিছু নেই-একমাত্র “জীবিত আছি” এ ছাড়া।

(প. ৪৭৯)

 

আবুল কালাম শামসুদ্দীন

১৫.৪.৭১

আজ রাত্রে ঢাকা রেডিয়োতে বক্তৃতা দিলেন দৈনিক পাকিস্তান সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন। সারমর্ম : পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হিন্দুস্তান গোড়া থেকে শত্রুভাবাপন্ন ছিল। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে পাকিস্তান জয়লাভ করে (একটি সর্ব্বৈ মিথ্যা)। এখন ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে পাকিস্তানের অস্তিত্ব বিপন্ন করতে চায়।

সমগ্র বক্তৃতা ভারতবিরোধী tirade। শেষ কথাটি অবশ্য সত্য : অন্যায়ের বিচার একদিন হবেই। পাকিস্তানের অস্তিত্ব কে বিপন্ন করেছে? এয়াহইয়াহ এবং তার সহকারী নরপশুগণ? না কি ভারত? ইতিহাস অবশ্যই সাক্ষী হয়ে থাকবে।

আবুল কালাম শামসুদ্দীনের বয়স ৭৫/৭৬ বৎসর। এই ভাঁড়ামি এবং ভাড়াটিয়াগিরি না করেও কি পারতেন না? স্বাভাবিকভাবেও তাঁর মৃত্যু যে কোনো দিন ঘটতে পারে।

এই হচ্ছে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা। বেশ্যাবৃত্তি!

(প. ৫৪০)

 

সামরিক আদালতে

২.৯.৭১

আজ সংবাদপত্র মারফত (পাকিস্তান অবজার্ভার)আমাকে মার্শাল ল’ রেগুলেশনের ২৫’খ এলাকার সামরিক প্রশাসকের ১২০ নং ধারায় অভিযুক্ত করে ৮.৯.৭১ তারিখে বেলা আটটায় সামরিক আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়েছে।

এ নির্দেশ জারি করা হয়েছে, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক এবং অধ্যাপক মাজহারুল ইসলামের ওপরও। অনুপস্থিতিতে ১৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ড।

ফকিরাপুলে বাজার করছিলাম। পুত্র পারভিজ বাজারে গিয়ে বললো, আজই হাজির হওয়ার তারিখ। বাসায় ফিরে কাগজ পড়ে দেখলাম আজ নয়, ৮.৯.৭১ তারিখে হাজির হওয়ার নির্দেশ।

১২০ নং ধারা যারা অফিসে উপস্থিত হচ্ছেন না তাদের ওপর প্রযোজ্য। আমি অফিস করছি। তার মধ্যে এ মুসিবত কেন আল্লাহ জানেন।

বাংলা একাডেমীতে কিছু জামাতে ইসলামী আছে। বোধ করি তাদের কাজ।

(প. ৫৭৬)

 

৮.৯.৭১

সকাল আটটায় মার্শাল ল’ অফিসে উপস্থিত হলাম আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের জবাব দিতে। অফিস হয়ে যাই। কবীর চৌধুরী পরিচালক। তিনি কর্মাধ্যক্ষ অধ্যাপক মোসলেহউদ্দীনকে আমার পার্সোনাল ফাইল নিয়ে আমার সঙ্গে যেতে অনুরোধ করলেন। মোসলেহউদ্দীন সাহেব আরবির অধ্যাপক। অত্যন্ত অমায়িক এবং একজন ধর্মনিষ্ঠ লোক। তিনি সানন্দে আমার সঙ্গে গেলেন।

প্রথমে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো মেজর মুশতাক আহমদের কামরায়। তিনি কিছুক্ষণ জেরা করলেন বটে কিন্তু ভদ্র ব্যবহার করলেন। পরে নিয়ে যাওয়া হলো একজন কর্নেলের কামরায়। তিনিও বেশ কিছুক্ষণ নানা প্রশ্ন করলেন। তার কথাবার্তায় কিছুটা উগ্র মেজাজ থাকলেও অভদ্র আচরণ করেন নি। সবশেষে নিয়ে যাওয়া হলো ব্রিগেডিয়ার বশীর আহমদের কাছে। বুঝলাম, আমার বিরুদ্ধে কেউ দুশমনি করেছে, যে জন্য এই মিথ্যা কেস। ব্রিগেডিয়ার বশীর প্রশ্ন করলেন, আমি কোনটা আগে? মুসলমান, পাকিস্তানি না বাঙালি। আমি বললাম, আমি প্রথমে মুসলমান, তারপর পাকিস্তানি এবং যেহেতু বাংলাদেশে আমার জন্ম সুতরাং বাঙালিও। তার দ্বিতীয় প্রশ্ন : আমি বাংলা একাডেমীতে চাকরি করি কেন? জবাব দিলাম, চাকরি যেখানে পেয়েছি করছি। চাকরিজীবীর পছন্দ-অপছন্দ নেই। বশীরের আর এক অভিযোগ, আমি একজন লেখক, বর্তমান জেনারেশনকে ইসলামি ও পাকিস্তানি করার জন্য কলম ধরি না কেন? আমি বললাম, গল্প উপন্যাস লিখি-তাতে মুসলিম সামাজিক জীবনই স্থান পায়-অন্য সমাজকে চিনি না, তাই লেখার প্রশ্ন ওঠে না।

বশীর বললেন, বর্তমান জেনারেশনকে সঠিক নেতৃত্ব দিতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আমি বললাম, ব্যক্তিগতভাবে আমি ইসলাম ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কিছু লিখি নি। তবে collectively we may have failed. বশীর বললেন, ছেলেরা নাকি সব নাস্তিক হয়ে যাচ্ছে। তিনি ওদের ইসলামাইজ করতে চান।

আমার সঙ্গে সৌজন্যমূলক ব্যবহার করলেন ওরা। প্রথমেই ওরা বলেছিলেন, ওরা জানেন আমি মাদ্রাসার ছাত্র। সম্ভবত সে কারনেই তারা কিছুটা নরম হয়েছিলেন।

ব্রিগেডিয়ার বশীর চা খাওয়ালেন এবং মুক্তি দেয়ার সময় দাঁড়িয়ে করমর্দন করলেন। বললেন, নির্ভয়ে কাজ করো। আমাদের কথাবার্তা বেশিরভাগ ইংরেজিতে এবং কখনও কখনও উর্দুতে হয়।

মেজর মুশতাক আহমদের ভদ্র ব্যবহারের তুলনা হয় না। পরে শুনলাম, তিনি Army Intelligence-এর লোক। Army Intelligence-এর লোকদের ভদ্রাচরন ব্যাপারে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেউয়া হয়। তথ্য সংগ্রহ করার উত্তম পন্থা বটে।

জি.এ. খান আরো দু’শ টাকা নিলেন। বাড়ি ফিরে এলাম বিকেল প্রায় চারটায়। স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা তখনও অভুক্ত অবস্থায় উদ্বিগ্নভাবে আমার প্রত্যাগমন প্রতীক্ষা করছিল।

(প. ৫৭৮)

 

বাঁচা

১৮.১২.৭১

কবীর চৌধুরী বাঁচলেন বাসস্থান বদল করে। কবি শামসুর রাহমানও তাই করে বাঁচলেন। এখলাসউদ্দীন বাড়ির পাঁচিল ডিঙিয়ে, দু’তিন বাড়ির ছাদ ডিঙিয়ে পানির ট্যাঙ্কের আড়ালে আশ্রয় নিয়ে বেঁচেছেন। আমিও বোধ করি বাসস্থান বদল করেই বাঁচলাম। আমাদের পাড়াটাই খালি হয়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো বাড়ির মালপত্র বুধবার বিকেলেও লুট করেছে দুর্বৃত্তরা। কিন্তু কোনো লোক না থাকায় বেঁচে গেলাম।

কবীর চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করার জন্য ওয়াপদা হাউজে (মিন্টু রোড-ওখানেই তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন) রওয়ানা হই। সঙ্গে এখলাসউদ্দীন। গেটে পৌঁছে এখলাসউদ্দীন শিশুর মতো অঝোর কান্নায় ভেঙে পড়লেন-বললেন, “জাফর ভাই, এত করেও কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারলাম না। আর দুটো ঘণ্টা সময় পেলে তাঁদের বাঁচাতে পারতাম।” এখলাসউদ্দীন আমার কাঁধের ওপর মাথা রেখে অবিরত কাঁদতে লাগলেন।

কবীর চৌধুরীর সহোদর ভাই মুনীর। তাঁর চোখে কান্না। কিন্তু কোনোক্রমে নিজেকে দমন করে আমার সঙ্গে দু’চার কথা বললেন। মুনীরের লাশ খুঁজতে তিনি বেরিয়ে যাচ্ছিলেন সস্ত্রীক।

‘কাজলী’তে মোমেন সাহেবের (আবদুল মোমেন খান, সেক্রেটারি ওয়ার্কস) অস্থায়ী বাসস্থানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনিও আমার কাঁধে মাথা রেখে শিশুর মতো কাঁদতে লাগলেন। গিয়াসউদ্দীন (বাচ্চু), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক, তার শ্যালক। শিশুর মতো সরল ফুলের মতো সুন্দর চেহারার এ লোকটি অবিবাহিত ছিলেন। মোমেন সাহেব বললেন, “সে ছিল আমার ছেলের মতো। বাড়ি মুক্তিবাহিনীর বোমায় গেছে, কাঁদি নি। কিন্তু এ কান্না যে কিছুতেই রোধ করতে পারছি না।”

(প. ৬১৫)

 

আদমউদ্দীন

আজ বাংলা একাডেমীতে বেগম সুফিয়া কামালের সভানেতৃত্বে শোকসভা হয়।

গতকাল মুক্তিবাহিনীর লোক অফিসে ঢুকে পাকিস্তানি বাহিনীর informer বলে সন্দেহভাজন আবদুল ওয়াহাবকে মারধর করে।

আজ শোকসভায় আদমউদ্দীনকে ধরা হয়। তবে বেগম সুফিয়া কামালের অনুরোধে তাকে মারধর না করে সভা থেকে বহিষ্কার করে দেয়। ওদের বাংলা একাডেমীতে আসা বন্ধ হলো। আদমউদ্দীন আমার নাম সামরিক বাহিনীকে দিয়েছিল।

(প. ৬১৭)

 

সাগরময় ঘোষ এবং বোরহানুদ্দীন খান জাহাঙ্গীর

আজ (২৪.১২.১৯৭১) দেশ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ বাংলা একাডেমীতে আসেন। একাডেমী এবং একাডেমীর কর্মচারীদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি দুর্বৃত্ত বাহিনীর আচরণ সম্বন্ধে তাঁর সঙ্গে আলোচনা হয়।

আরো এসেছিলেন বোরহানুদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, আহমদ শরীফ, শামসুর রাহমান, কামরুল হাসান (চিত্রশিল্পী… কলকাতা চলে গিয়েছিলেন, ফিরেছেন) এবং জয় বাংলা পত্রিকার সম্পাদক ডাক্তার আহমদ রফিক মুজিবনগরে ছিলেন – ফিরেছেন।  বোরহানুদ্দীন খান জাহাঙ্গীর ভারতে প্রকাশিত পুস্তকাদির অবাধ আগমন সম্বন্ধে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তাঁর মতে বাধা না থাকলে এখানকার লেখক-প্রকাশকদের ক্ষতি হবে। আমি আমার ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করার আগেই দেশ সম্পাদক এবং দু’জন আর্মি অফিসার একাডেমী দেখতে এলেন।

আমার মতে বাধা থাকা সঙ্গত নয়। একমাত্র বাধা হতে পারে বাণিজ্যিক লেনদেন বিষয়ে, যা টাকা এলোকেশনের ওপর নির্ভরশীল। বই-পুস্তকের ওপর অন্য কোন প্রকার বিধিনিষেধ থাকা উচিত নয়।

(প. ৬১৮)

 

কবীর চৌধুরী

পরিচালক কবীর চৌধুরীর সাহসিকতাও অতুলনীয়। গণহত্যার কয়েকদিন পর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ দেশের লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে একটি বিবৃতি আদায় করে। এতে বলা হয়, “আওয়ামী মিসক্রিয়েন্টদের ভয়ে আমরা ঢাকা ত্যাগ করেছিলাম। এখন শান্তি স্থাপিত হয়েছে। আমরা ঢাকায় ফিরে এসেছি”… ইত্যাদি। ঐ বিবৃতিতে অনেকেই সই করেছিলেন কিন্তু কবীর চৌধুরী সই করেন নি। তিনি বলেছিলেন, “আমি ঢাকায় ছিলাম, নিয়মিত অফিস করেছি। তাই এতে সই করতে পারি না, সরকারের কাছ থেকে লিখিত হুকুম আসুক, দেখা যাবে।”

ঐ বিবৃতিতে সই করার জন্য আমাকেও খোঁজা হয়েছিল। কিন্তু আমাকে পায় নি। আমি তখন ঢাকায় ছিলাম না।

দুঃখের বিষয় যারা প্রাণভয়ে ঐ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছিলেন তাদের অনেককেই জামাতে ইসলামীর বদর বাহিনী, আল শাম্‌স বাহিনী রেহাই দেয় নি।

(প. ৬২৪)

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য