Main menu

ব্রিটিশ-ভারতে মুসলমান-আইন: আবুল হুসেন

১৯৩০ সালে এই লেখা ছাপা হইছিল ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’র মুখপত্র ‘শিখা’ পত্রিকায়। ‘শিখা’ পত্রিকার ৫টা সংখ্যা ছাপা হইছিল, ১৯২৭ থিকা ১৯৩১ সাল পর্যন্ত; বছরে একবার কইরা। ২০০২ সালে ঢাকার একুশে পাবলিকেশন্স লিমিটেড ‘নির্বাচিত শিখা’ নামে আবদুল মান্নান সৈয়দের সম্পাদনায় একটা বই ছাপান। এই লেখাটা ওই বইয়ে (২৭৬ – ২৭৯) রিপ্রিণ্ট করা হয়।

রাইটার আবুল হুসেন (১৮৯৭ – ১৯৩৮) কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি করতেন। ১৯২৬ থিকা ১৯৩০ পর্যন্ত তিনি ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর সাথে জড়িত আছিলেন।

এইখানে ব্রিটিশ ন্যাশনালিস্টদের উনি ক্রিটিক করতেছেন উনারা এনাফ ন্যাশনালিস্ট না বইলা: আরবদেশের আইন তো বাংলাদেশে (এই শব্দটাই লিখছেন উনি) চলতে পারে না! মে বি ‘শিখা’ পত্রিকাটাই একটা এক্সপোজার, যেইটা স্পষ্ট করে যে বাংলাদেশের মুসলমানরাও ইউরোপিয়ান র‌্যাশনালিটির বেসিসেই আলাপ করতে রাজি আছেন। এই র‌্যাশনালিটির কারণেই হয়তো মালিকানার ব্যাপারটারে লিনিয়ার হিসাবে ভাবতে পারছেন, ওই সময়ের কনটেক্সটে যেই কয়েকটা এক্সাম্পাল উনি দিছেন, সেই জায়গাগুলিতে।

এমনিতে, আইন নিয়া পাবলিক স্পেইসে কথা-বার্তা দেখা যায় না তেমন। কি কি আইন আছে আর সোসাইটিতে এর ইমপ্লিকেশনগুলি কি রকম – সেইটার বাইরেও আইনের বেসিসগুলি নিয়া কথা-বার্তা তো হইতেই পারে।

– ই.হা.

__________________________

মানুষ আপনার শক্তি বিকাশ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আইন গঠন করে। তাই আইন ও মানুষে অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ। একে অপরকে এড়িয়ে যেতে পারে না বরং একে অপরের হাত ধরাধরি করে চলে। তাই বলে যে আইন ও মানুষ সনাতন অপরিবর্তনীয় হয়ে থাকে তা নয়। মানুষ তার আপনার প্রয়োজনে আইন গড়ে, ভাঙ্গে, পরিবর্তন করে ও ছেড়ে দেয়-সঙ্গে সঙ্গে আইন মানুষকে ক্রমেই বিকাশের পথে এগিয়ে নিয়ে চলে। মানুষের এগিয়ে চলা যেমন স্বাভাবিক আইনের পরিবর্তন করবার শক্তিও তার তেমনি অনিবার্য। কিন্তু যে মানুষ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে চায় ও আইনকেও ধরে রাখতে চেষ্টা করে সে মানুষ তার জীবনস্রোত হারাতে বাধ্য।

যুগেযুগে মানুষ তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার তাড়নায় আপনার স্বত্বার প্রয়োজনে আইন গড়েছে। সেই অবস্থা বিশেষই আইনের জন্ম দিয়েছে। কাজেই অবস্থার পরিবর্তন হলে আইনের পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।

হজরত মুহম্মদের যুগে আরব দেশের প্রয়োজন অনুসারে যে আইন রচিত হয়েছিল সে আইন জগতের সর্বত্র সর্ব অবস্থাতেই প্রযোজ্য বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। কিন্তু সে বিশ্বাস মানুষের সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিহাস সমর্থন করতে পারে না। সেই ভ্রান্ত বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে এদেশের মুসলমানদের জন্য ব্রিটিশ-প্রভু যে মুসলমান আইনের প্রচলন করেছেন তার জন্মভূমি ছিল আরব-মরু, বোখারা, খোরাসান ও সমরকন্দ-যার পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে আধুনিক ভারতীয় মুসলমানের পরিপার্শ্বের আদৌ মিল নাই। এই জীবন্ত পরিপার্শ্বকে তুচ্ছ করে জোরজবরদস্তি খোরাসান-বোখারার আইন হুবহু প্রবর্তন করবার চেষ্টা করা হয়েছে।

ফলে ভারতীয় মুসলমান-মানুষ ও মুসলমান-আইনের মধ্যে যে বিরোধ দিন দিন প্রবল হয়ে উঠেছে এবং তাতে ভারতীয় মুসলমান সমাজের যে অবস্থা হয়েছে তা চক্ষুষ্মান ব্যক্তি মাত্রই ইচ্ছা করলে দেখতে পারেন। আজ আমি ব্রিটিশ ভারতের মুসলমান-মানুষ ও মুসলমান-আইনের মধ্যে পরস্পরের সম্বন্ধ কি ও তার তার ফলাফল কি হয়েছে ও হচ্ছে সে সম্পর্কে সামান্য কিছু ইঙ্গিত করেই ক্ষান্ত হব। এ সম্বন্ধে যোগ্যতম ব্যক্তি বিস্তৃতভাবে আলোচনা করলে ভারতীয় মুসলমান সমাজের বহু ব্যাধি দূরীকরণের পথ উন্মুক্ত হবে বলে আমার বিশ্বাস।

গোড়াতেই স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, ব্রিটিশ-রাজ ভারতীয় মুসলমানের মাত্র ওয়ারিসী স্বত্ব, দান, বিবাহ, তালাক, ওয়াকফ ও হকশোফা সম্পর্কিত আইনের প্রচলনে সম্মতি দিয়েছেন, কিন্তু অপরাপর আইনের প্রচলন বন্ধ করেছেন। তারপর ঐ সমস্ত প্রচলিত আইন পরিচালনার জন্য মুসলমান আইন সঙ্গত যে বিধি বিধান প্রচলিত ছিল, যেমন ইজমা, কেয়াস, ইজতিদাহ, তাও বন্ধ করেছেন। তাতেও পক্ষান্তরে ব্রিটিশ-অনুমোদিত মুসলমান আইনের ব্যবহার (practice) অনেকখানি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তাতে মুসলমান সমাজে মুসলমান-আইনের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা ও ভয় অনেকখানি কমে গেছে এবং সে জন্যই মুসলমান সমাজের শ্রী ফুটতে পারছে না। আর একদিক থেকে ভারতীয় মুসলমানদের জীবন বিকশিত হতে পারছে না। আরবি না জানার দরুণ অনেক ক্ষেত্রেই মুসলমান আইনের প্রকৃত মর্ম বিচারকগণ উপলব্ধি করতে না পেরে ভুল অর্থে আইনের প্রয়োগ করায় মুসলমান সমাজের বর্তমান অবস্থার সাথে মুসলমান আইনের সামঞ্জস্য হারিয়ে গেছে ও প্রতিনিয়ত যাচ্ছে। কথাটি বেশি বিস্তৃত করে বলবার ইচ্ছা প্রবল হলেও এ প্রবন্ধে বলতে পারলাম না বলে দুঃখিত। এ কটি কথা কেবল বন্ধুদের পুনঃ পুনঃ তাকিদের জন্য লিখতে বাধ্য হয়েছি।

দুই একটি দৃষ্টান্ত দিই। হকশোফার (Right of Pre-emption) আইন বলেছে, যদি কোনো তৃতীয় ব্যক্তির নিকট হতে কিনে নিতে বা ফিরিয়ে নিতে পারেন। উদ্দেশ্য-আপনার কোনো শত্রু বা অপ্রীতিকর পড়শী এসে আপনার সংসারকে বিপর্যস্ত না করে। এলাহাবাদ হাইকোর্টের নজির অনুসারে যদি কোনো হিন্দু আপনার শরিকের অংশ খরিদ করে তবে আপনি তাঁর থেকে সেই অংশ ফিরিয়ে নিয়ে আপনার সংসার শান্তিময় রাখতে পারবেন; কিন্তু বাংলাদেশে হকশোফার আইন হিন্দু খরিদ্দারকে আপনার শরিকের অংশ খরিদ করতে অনুমতি দিয়েছে। মুসলমান আইনের উদ্দেশ্য এখানে অনেকখানি ব্যর্থ হয়ে গিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের সমস্ত শহরে মুসলমানের সম্পত্তি হিন্দুর হাতে চলে গেছে ও যাচ্ছে; কিন্তু মুসলমান ইচ্ছা থাকলেও ফেরাতে পারে নাই ও পারছে না। তাই দেখতে পাবেন অনেক শহরে আজ যেখানে হিন্দুর বড় বড় এমারত উঠেছে সেখানে অতি নিকট-অতীতে মুসলমানের বসতি ছিল। মুসলমান সম্পত্তি বিক্রয় করেছে বা করছে কেন তার কারণ ঢের আছে, কিন্তু হকশোফার আইন এমনি করে ক্ষুণ্ণ হয়ে যাওয়ায় মুসলমান একেবারে শহর থেকে বিতাড়িত হচ্ছে।

তারপর ধরুন ওয়াকফ আইন। মুসলমান তার বংশধরদের জন্য সম্পত্তি ওয়াকফ করতে পারে। মুসলমান বাদশাহদের আমলে এই আইন অনুসারে বহু মুসলমান বড় বড় সম্পত্তি আপন বংশধরদের জন্য ওয়াকফ করে গিয়েছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ আমলের বিচারকগণ ঐ প্রকার ওয়াকফকেবাতিল করে দিলেন। ফলে শত শত সম্পত্তি হস্তান্তর যোগ্য হয়ে গেল। বংশধরগণ নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য ঝগড়া বিবাদে প্রবৃত্ত হল-মহাজন জমিদার নিলাম করে ওয়াকফ সম্পত্তি গ্রাস করতে লাগল। ক্রমশ এক নজিরের বলে শত শত মুসলমান পরিবার অনিবার্য দারিদ্র্যের পথে দ্রুত অগ্রসর হতে লাগল। তার গতি এখনও প্রতিহত হয় নাই।

তারপর ওয়ারিশী স্বত্বের আইন। এই আইন প্রচলিত থাকায় ভারতীয় মুসলমান বিশেষত বাংলার মুসলমান, বাটোয়ারা (partition) মোকদ্দমা করতে করতে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। একদিন আমার জনৈক senior হিন্দু উকিল বন্ধু মুক্ত চিত্তে বলছিলেন, ‘Thanks to the great Prophet of the Desert. Because but for this Law of Inheritance 60% litigation of our courts would have been diminished and half of our Judges would have been discharged.’ এতেই আপনারা বুঝতে পারবেন এই আইনের ব্যবহার বাংলার মুসলমানকে দিন দিন অশান্তি ও দারিদ্র্যের চরম সীমায় নিয়ে যাচ্ছে।

অবশেষে বিবাহ ও তালাকের আইনের প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষন করছি। বিবাহের ভিত্তি হচ্ছে স্বামী স্ত্রীর সম্মতি ও উভয়ের স্বাধীন ব্যক্তিত্ব। এই সম্মতি ও ব্যক্তিত্বে সামঞ্জস্য যখন হারিয়ে যায় তখনই তালাকের আইন ব্যবহৃত হওয়া উচিত। এই আইন ব্যবহার করবার অধিকার মুসলমান স্বামী স্ত্রী উভয়েরই সমান। কিন্তু ব্রিটিশ-ভারতে মুসলমান-স্ত্রী এই সমান অধিকার হতে বঞ্চিত হয়েছে। ফলে স্ত্রীর উপর অত্যাচার ও নির্যাতনের অবধি নাই। স্ত্রী আজ মূক নিরুপায়। সমাজের অর্ধাঙ্গ যদি এমনি করে আইনের অধিকার হতে বঞ্চিত থাকে এবং তার জন্য অপর অর্ধের স্পর্ধা যদি বৃদ্ধি পায় তবে সমাজের স্বাভাবিক স্ফুর্তি প্রতিহত হতে বাধ্য। আজ মুসলমান সমাজের আভ্যন্তরীণ অবস্থা লক্ষ্য করলে এই তালাকের অধিকার পুরুষের একচেটে হয়ে পড়ায় কতখানি ক্ষতি হয়েছে ও হচ্ছে তা স্পষ্ট বোঝা যায়।

উপসংহারে, এই কথা বলতে চাই যে, বর্তমান ব্রিটিশ-ভারতের প্রচলিত মুসলমান আইন সম্পুর্নরূপে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা দরকার। নতুবা মুসলমান সমাজের স্বাভাবিক বিকাশ সম্ভবপর হতে পারে না। সে আইন আধুনিক ভারতের অবস্থার সাথে মুসলমান-মানুষের সামঞ্জস্য সাধন করবে। তা করতে হলে আমাদের দেখতে হবে মুসলমান বাদশাহদের আমলে মুসলমান আইনের অবস্থা কি ছিল। আমি যতদুর জানতে পেরেছি তাতে মনে হয় এ দেশের অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মুসলমান বাদশাহগণ আইন রচনা করেছিলেন। গজনীর বাদশাহ মাহমুদের ফতওয়া-ই-মহম্মদী ও ফিরোজশাহ তোগলকের ফতোয়া-ই-ফিরোজশাহী হতে আরম্ভ করে টিপু সুলতানের ফতোয়া-ই-আহমদী ও যাখিরা-ই-ওয়ারেন হেস্টিংস পর্যন্ত যে সমস্ত আইনের পুস্তক রচিত হয়েছে তাতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় এ দেশের মুসলমানদের জীবনের প্রয়োজনে ঐ সমস্ত আইন রচিত হয়েছিল। আরব, পারশ্য, সিরিয়া প্রভৃতি দেশের মধ্যযুগীয় ফিকাহবা ব্যবহার শাস্ত্রের বিধি বিধান তাঁরা অন্ধভাবে প্রবর্তন করেন নাই। বর্তমানে এ দেশের রচিত ও প্রবর্তিত ব্যবহার-শাস্ত্রের মধ্যে একমাত্র ফতোয়া-ই-আলমগিরি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু ফতয়া-ই-আলমগিরি হতে মুসলমান বাদশাহদের আইন রচনার অধিকার ও তার স্বাধীন ব্যবহার সম্বন্ধে কিছুই পাওয়া যায় না। ফতোয়া-ই-আলমগিরি Reaction-এর যুগে রচিত ও প্রবর্তিত হয়েছিল। সে সময় বাদশাহ আলমগির ভারতকে না দেখে দেখেছিলেন মক্কার মরুভূমির পবিত্রতা। সেই মনোভাব ফতোয়া-ই-আলমগীরিকে অনেকখানি technical ও artificial করেছে। সেই মনোভাব ব্রিটিশ-ভারতে আজও আমাদের রাজা ও প্রজা উভয়কেই মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে।

 

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য