Main menu

পিয়াস করিমের ইন্টারভিউ: পার্ট ২

 পিয়াস করিমের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট কইরা দিছিলেন মৃদুল শাওন। ভারবাল এগ্রিমেন্টটা এইরকম ছিল যে, আমরা উনার সাথে কথা বলবো এবং পরে ইন্টারভিউটার ভিডিও বা ট্রান্সক্রিপ্ট করা টেক্সটটা আমাদের ওয়েবসাইটে রাখবো। ভিডিওটার একটা পার্ট কিছুদিন পরেই আপলোড করতে পারছিলাম আমরা। এইখানে সেকেন্ড পার্ট’টা রাখা হইলো; কিছু বাছাই করা জায়গার ট্রান্সক্রিপ্টসহ।

ইন্টারভিউ’টা নেয়া হইছিল এপ্রিল ১৫, ২০১৩-তে, পিয়াস করিমের ধানমন্ডির বাসায়, সন্ধ্যা আটটা থেকে দশটা পর্যন্ত। ভিডিওটা করা হইছিল স্যামসং ব্রান্ডের নোট-ওয়ান মোবাইলফোনের ক্যামেরা দিয়া।

– ই.হা.

————–

পার্ট ১ ।।

————–

 

 

হেজিমনি, কালচারাল রেভিউলেশন এবং শাহবাগ-হেফাজত

 

পিয়াস: …মার্কসের মধ্যে এক অর্থে কিন্তু ওই হেগেলের এক ধরণের লেফট ইন্টারপ্রিটেশনের জায়গা আছে যে নেগেশন অফ নেগেশন চলতে থাকবে; ইতিহাসকে এক ধরণের ওপেন-এন্ডেড প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার একটা ব্যাপার আছে। অপরদিকে মার্কসবাদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত একটা রক্ষণশীল ব্যাপারও আছে, যেইখানে কোথাও একটা ভারসাম্যের জায়গায় পৌঁছাতে হবে। ট্রটস্কি যেমন রেভিউলেশন অফ পারমানেন্সের কথা বলছেন, স্তালিন আবার একদেশের সমাজতন্ত্রের কথা বলে একটা ভারসাম্যের জায়গা তৈরি করতে চেয়েছেন। আজকের বাংলাদেশে আমার মনেহয় আমরা যারা একটু পোস্ট-মার্ক্সসিস্ট জায়গা থেকে (দেখি), এই ভারসাম্যের ধরণটা আমাদের ভাবা দরকার বলে মনে করি। ভারসাম্যের যে এক ধরণের চিরন্তন, অ্যাবসুলেটিজম না, পারমানেন্সের জায়গা থেকে না, আগামী দশবছরের জন্য, পনের বছরের জন্য… এইটা না হলে আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্থ হবো বলে আমার ধারণা।

ইমরুল: এই ভারসাম্যটা আপনার কি ধারণা, কিসের ভিত্তিতে হতে পারে?

রেজাউল: সাজেশন আকারে যদি চাই, আমাদের কর্মপন্থা।

পিয়াস: একটা হতে পারে, যেটা আমি একটু আগে বলছিলাম। আমি একটু এলোমেলো বলছি… একটা হতে পারে যে, গ্রামশি’র টার্মে একটা হেজিমনিক ফোর্স তৈরি করা। শাহবাগ যেমন একটা হেজিমনিক শক্তি… যে তার মতাদর্শগত আধিপত্য বাকি সমাজের ওপর আরোপ করতে চায়। আসলে কি শাহবাগ তা পারছে? তা তো পারছে না। প্রথমদিকে যে বিস্ফোরণটা দেখা গেছিল, শাহবাগে তারপর ভাটা পড়ে গেছে, প্লাস ঢাকার নাগরিক মধ্যবিত্তের বাইরের যে বাস্তবতা, সেখানে তো শাহবাগের হেজিমনিক অবস্থান (কাজ করে না)… অপরদিকে হেফাজতে ইসলাম কি সেইটা পারবে? তাও ত পারবে না। হেফাজতে ইসলাম ত নাগরিক মধ্যবিত্তের বিরাট অংশকে ধারণ করতে পারবে না। জামাত পারবে না। প্রচলিত দুইদল পারবে না।… আমাদের বামপন্থীরাও… ওই হেজিমনির জায়গাতে পৌঁছতে পারে নাই। ফলে একটা উত্তর হতে পারে একটা হেজিমনিক শক্তি তৈরি করা। এটাকে আমি ওয়ার্কিং-ক্লাস রেভিউলেশনারি পার্টি বলি, ন্যাশনালিস্টিক পার্টি বলি, ন্যাশনাল কালচারাল ব্লক বলি…

 

…………….

রেজাউল: আরেকটা ফোর্স তৈরি হওয়া মানে ত আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কোন একটা ফোর্সকে ইরেজ করা দরকার। এখন সেইটাও কঠিন নাকি… যেমন আপনি সাজেস্ট করছেন, তেমন একটা ফোর্স হিসেবে ক্রিয়েট করা বা তৈরি করবার চেষ্টা করা, কোনটা সহজ হবে?

পিয়াস: না, আমাদের কাছে দুইটা অপশন। এই হেজিমনির অপশনটা আমার কাছে খুব ওয়ার্কেবল মনে হচ্ছে না। আমি বোধহয় আপনার সাথে একমত পোষণ করছি সেইখানে। গ্রামশি যেই কনটেক্সটে মতাদর্শগত পাথর্ক্যের কথা বলেছিলেন; গ্রামশি পরবর্তীকালের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক-অর্থনীতি-সংস্কৃতির ইতিহাস তো প্রমাণ করেছে যে ঠিক ওইরকম একটা হেজিমনি কোথাও তৈরি হচ্ছে না। ইউরোপের দেশগুলোতে তৈরি হয় নাই।… আমার মনে আছে সত্তরদশকে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে যখন দেখলাম, পোল্যান্ডের সলিডারিটি মুভমেন্ট হচ্ছে; এইটা কি করে সম্ভব! আমি তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্রে শ্রমিকশ্রেণী বিদ্রোহ করছে। হেজিমনি তৈরি হয় নাই। তারপর আমরা তো আশির দশকের শেষদিকে গিয়ে দেখলাম যে, পুরো সোভিয়েত ব্লকের পতন…

রেজাউল: হেজিমনি তৈরি’র জন্য আমার মনেহয় একটা নেসেসারি জিনিস হচ্ছে পুরো দেশের সকল নাগরিককে কিছু অভিন্ন জিনিস কনজিউম করা… যেইটা অভবিয়াসলি একটা কালচারাল প্রোডাক্ট হওয়ার কথা।… যেইটা তারা কনজিউম করে এবং তার মধ্য দিয়া… এক ধরণের হেমোজেনাইজেশন হচ্ছে সমাজে। তো, আমার আইডিয়া হচ্ছে যে, হলিউডের ক্ষেত্রে বা ইভেন বলিউডের ক্ষেত্রে মুভি একটা ভালো ভূমিকা রাখতেছে… বাংলাদেশে ত ওইভাবে মুভি হচ্ছে না।… আর কোন রাস্তা আছে কিনা। মানে, সকল নাগরিক যদি একই ধরণের জিনিস কনজিউম না করে; সবাই যদি কন্ট্রাডিক্টরি ধরণের জিনিস কনজিউম করতে থাকে, তাইলে ত আসলে ওইরকম একটা কোন হেজিমনি তৈরি হওয়ার উপায় নাই।

পিয়াস: রাইট। খুবই চমৎকার পয়েণ্ট। এই ব্যাপারটাকে আরেকভাবে দেখা যায় যে, আদৌ আজকের পৃথিবীতে হেজিমনি একটা বাস্তব সম্ভাবনা কিনা।…

…সোভিয়েত ইউনিয়নে ত কালাচারাল রেভিউলোশনটা হয়নি। লেনিনের একদম শেষদিকের কিছু লেখা আপনি দেখবেন।… মাও করার কথা চীনে; (ওইটা) ব্যাক-ফায়ারড। এখন হেজিমনি আদৌ সম্ভব কিনা কিংবা গ্রামশি’র মধ্যে যে ইঙ্গিতটা আছে… গ্রামশি যেইভাবে থিয়োরাইজ করেন, হেজিমনি ত পারমানেন্ট হেজিমনি না… আজকের হেজিমনি ত দশবছর পরের হেজিমনি না… পাল্টাচ্ছে…

… আজকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমার কাছে যেটা মনেহয় যে, আমরা ইতিহাসের যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, কতগুলো কনফ্লিক্টিং ফোর্সেস আনলিস করে গেছে, যেগুলো ইচ্ছা করলেই কিন্তু আমি ইরেজ করতে পারবো না। আজকে আমি যতই অপছন্দ করি হেফাজতে ইসলামকে আই ক্যাননট ওয়াশড দেম এওয়ে।

…এখন ওদের আমি যতই অপছন্দ করি… ব্যাপারটা আমার পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার না। এই একটা শক্তি ইরির্ভাসেবল না। আমি চাইলেও আমার সমগ্র সেক্যুলার শক্তি দিয়েও আমি হেফাজতকে মুছে ফেলতে পারবো না।… শাহবাগ একটা মোমেন্টটাম তৈরি করেছে; এখন রক্ষণশীল ধর্মের জায়গা থেকে দেখলে আমি শাহবাগকে ইরেজ করতে পারবো না। এখন কী করবো আমি তাহলে? আমার একদিকে শাহবাগ দাঁড়িয়ে আছে, একদিকে হেফাজত দাঁড়িয়ে আছে। এই বাইনারি অপজিশনের দুই প্রান্ত নিয়ে এখন আমি কী করবো?

রেজাউল: এখন এই দুইটাকে যদি আমরা সমাজের দুই ধরণের এডুকেশনাল সিস্টেমের ফল হিসেবে দেখি; এই দুইটা প্লাটফর্মকে। তো, সেই দুইটা এডুকেশনাল সিস্টেমের কোন সংহতিকরণের সম্ভাবনা কি দেখা যায়?

পিয়াস: ইন ফ্যাক্ট সম্ভাবনা তো আছেই। এই স্পেসিফিক বিষয়ে ত আমরা কথা বলতেই পারি। কিন্তু মূল রূপরেখা হিসেবে যেইটা মনেহয় যে, এক ধরণের ডায়ালগ দরকার হবে। একবারে খুবই স্বপ্ন-বিলাসের মতো মনে হবে যে, শাহবাগ হেফাজতের ডায়ালগটা কোথায়… শাহবাগ ত গেছিল হেফাতের সাথে ডায়ালগ করতে, তাকে ফেনী থেকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। এইসব কথা আমরা বলতে পারি, এইসব কথাগুলা ভ্যালিডও হয়তো। কিন্তু আমি বলছি বিভিন্ন প্রসেসে সমাজে যে, আমি যার মতো করে আমি ভাবছি না, তার সঙ্গেও যে আমার একটা আলোচনা সম্ভব; এই জিনিসটা তৈরি করতে না পারলে আমাদের কপালে দুঃখ আছে বলে আমার মনেহয়।

…কিন্তু যেটা সমস্যা হচ্ছে আমাদের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর, পৃথিবীর সবখানেই, মূলধারা বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর… এদের সমস্যা হচ্ছে কি এরা এদের নিজস্ব ক্ষমতার শর্ট-টার্ম স্বার্থ নিয়ে এতবেশি ব্যস্ত থাকবে যে এরা এই লং-টার্ম ভ্যালুগুলো তৈরি করতে পারবে না। শেখ হাসিনা মদিনা সনদের কথা বলেছেন, দ্যাট কুড বি অ্যান ইর্ম্পটেন্ট ইলিমেন্ট ইন দ্য ডায়ালগ। কিন্তু শেখ হাসিনার চোখ ত আগামী নির্বাচন। কিংবা খালেদা জিয়ার চোখ ত আগামী নির্বাচন। কিন্তু আমরা বলছি, আমাদের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নতুন বিন্যাস ঘটানোর…

…এখন যে কথাটা বলতে গিয়ে আমি শাহবাগের কাছে বিপদে পড়লাম। আমি সত্যি কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম, যে আন্তর্জাতিকভাবে, জাতীয়ভাবে ইসমালিস্ট মুভমেন্টের একটা ক্ষেত্র তৈরি হয়ে আছে, সামাজিকভাবে তৈরি হয়ে আছে। এখন এই ক্ষেত্রটার একটা অংশকে যদি আমরা লিবারাল, কন্সেটিউশনাল স্পেসের মধ্যে না আনতে পারি, এটা মিলিট্যান্ট হয়ে যাবে। আমি জামাতকে নিষিদ্ধ করতে চাচ্ছি, আমি পেলাম হেফাজতে ইসলাম, (উইচ ইজ) মোর ডেঞ্জারাস। এখন এই চয়েসটাকে বোঝা আর কি। এখন এইটা বলামাত্র কি আমার জামাত হয়ে যাওয়া না, এখন যারা আমার ধর্মচর্চাটাকে জানে বা আমার ব্যক্তিগত ধর্ম চর্চা কিংবা অচর্চাটা জানে, তারা আমাকে জামাত বলবে না। কিন্তু এখন আমি শাহবাগের আঠারো বছরের ব্লগারটাকে কি করে বোঝাবো যে এই কথাটা বলা মানে জামাতপন্থী হওয়া না।…

…………………………

 

ডায়ালগের সম্ভাবনা, এডুকেশনাল স্টিটেম এবং ইসলামি মিলিট্যান্ট

 

রেজাউল: আমার একটা আগ্রহ, বাংলাদেশের যে শিক্ষাব্যবস্থা… এইরকম ডিসট্যান্ট একাধিক শিক্ষাব্যবস্থা, যেভাবে কওমী মাদ্রাসার সাথে আলিয়া মাদ্রাসা বা স্কুল বা ইংলিশ মিডিয়াম সবগুলি এত দূরবর্তী জায়গায় বসে আছে… এইরকম আর আছে কি কোথাও… যদি থাকে তাইলে হয়তো একটা মডেলের সন্ধান আমরা পাবো আর যদি না থাকে তাইলে বাংলাদেশ ত একটা ইউনিক কান্ট্রি… অন্য কোন দেশের কোন এক্সম্পাল কাজে আসবে কি?…

ইমরুল: এখানে আমি ছোট একটা জিনিস অ্যাড করতে চাই।… শিক্ষাব্যবস্থার একটা জায়গাতে যদি আমরা পরিবর্তন নিয়া আসি তাইলে এই যে আনলিস করে যাচ্ছে বিভিন্নরকমের সংস্কৃতি… এইগুলারে হয়তো একটা বাউন্ডারি’র মধ্যে নিয়া আসতে পারবো। এই ধরণের একটা অ্যাজম্পাশন থেকে মনেহয় কথাটা আসছে।… শিক্ষাব্যবস্থাগুলা যেহেতু বিভিন্ন হয়ে আছে, ডিফারেন্সসগুলি আরো ছড়াইয়া যাচ্ছে, ওপেন হচ্ছে।… কিন্তু রাজিব হত্যার ব্যাপারটাই যদি দেখি; এইটা কিন্তু ঘটতেছে নর্থ সাউথ থেকে, আইইউবি থেকে। …যে বাউন্ডারিগুলি আছে সেইগুলার মধ্যেও সমস্যাগুলা তৈরি হচ্ছে। নট নেসেসারিলি যে লোকটা বিজ্ঞান বুঝে না, সেক্যুলারিজম জানে না, সে ইসলামি মিলিট্যান্ট হয়ে উঠতেছে; বরং দেখা যাচ্ছে যে পড়াশোনা করতেছে, যে লাদেনের হিরোজম নিয়ে ইনফর্মড, সে বরং মোর মিলিট্যাণ্ট। যে মাদ্রাসাতে আছে সে বরং চাচ্ছে সোসাইটিতে তার রিকগনিশন। মাদ্রাসা থেকে পাশ করে যদি সে চাকরি পায় তাইলে সে মিলিট্যান্ট হবে না। যে ইউনির্ভাসিটিতে পড়তেছে… যে তালাল আসাদ সম্পর্কে ইনফর্মড, রাইটলি অর রংলি ইন্টারপ্রেট করতে পারতেছে, তার মনে কিন্তু ইসলামি মিলিট্যাণ্ট হওয়ার আকাংখা বেশি, এইটাকে কিন্তু আপনি এড়াইতে পারবেন না।

পিয়াস: …ইসলামি মিলিট্যান্সি কিন্তু ভেরি মাচ অ্যা মর্ডান ফেনোমেনা। এই মুহূর্তে ইসলামি মুভমেন্টকে একদম মোটাদাগে তিনটা ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়। একটা হচ্ছে ওল্ড ফ্যাশনড তালেবান সমর্থক; এখন যারা রাজিবকে মেরেছে তাদের সাথে তালেবান কানেকশন আছে আমি তাদের কথা বলছি না; (বলছি) জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ, আফগানিস্তানে যুদ্ধ করে আসছে… দ্বিতীয় হচ্ছে জামাত, আমাদের হেজিমনিক ডিসকোর্সে জামাতকে বেশ মিলিয়ে ফেলা হয়, জামাত হচ্ছে খুবই মর্ডানিস্ট অর্গানাইজেশন… যে অর্থে জেএমবি, হরকাতুল জিহাদ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, জামাত কিন্তু তা না; জামাতের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা সম্পর্ক (আছে)… আর তৃতীয় গ্রুপটা হচ্ছে আরবান মিডল ক্লাস, আপার মিডল ক্লাস, ইংরেজি মিডিয়ামে পড়া ছেলেরা কিংবা মেয়েও হয়তো… এরা হচ্ছে এলিনেটেড ছেলে-মেয়ে; এদের এলিয়েনেশনের কিছু সাংস্কৃতিক ব্যাপার… এই তিনটার মধ্যে কিন্তু একটা সময় ঐক্য তৈরি হয়ে যায়… আবার এদের মধ্যে এক ধরণের অনৈক্যও আছে। এই ঐক্য এবং অনৈক্যের দ্বান্দ্বিকতাকে বোঝা দরকার। আমাদের অফিসিয়াল ডিসকোর্সে এদেরকে এক করে দেখা হয়। এইটা একটা মুশকিলের জায়গা।

রেজাউল: আপনি (ইমরুলকে) যেইটা বলছেন ঠিক। কিন্তু আমাদের আলাপটা ছিল যে বিগার ফোর্সগুলা নিয়া। যেইখানে হচ্ছে যে সমাজের যে ডিভিশনগুলা, এখানে একটা ইউনিফাইড ব্যবস্থার ভিতর দিয়াও যে সবাই একই চিন্তা করবে তা ত না। কিন্তু যখন অলরেডী শর্তগুলা আপনি ইচ্ছা কইরা হাজির রাখতেছেন, তখন তারা ডিভাইডেড থাকতে বাধ্য।… ডায়ালগের মধ্য দিয়া এইরকম কতগুলা জায়গা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু যখন সিস্টেমগুলা এইরকমভাবে ডিভাইডেড ডায়ালগটা আসলে গতিই পায় না। আলাপটা আসলে এই কারণে। বাংলাদেশে ত ইউনিক ধরণের শিক্ষাব্যবস্থা; এইখানে আসলে ডায়ালগটা কিভাবে হওয়া সম্ভব? কোন মডেল পাওয়া যায় কিনা।

……………………………

 

মুক্তিযুদ্ধ, ধর্ম এবং সেক্যুলারিজম

 

পিয়াস: …সেক্যুলারিজম নিয়ে আমি একটা লিগ্যাল এক্সম্পাল দেই; ভিনদেশের বলে লিটারালি নিতে হবে না।… আমাদের দেশে এইরকম করে হতে হবে এইরকম কোন কথা নেই। একটা প্যারালাল ড্র করার জন্য বলছি। ইউনাইটেড স্টেটস সুপ্রিম কোর্ট দুইটা রুলিং দিয়ে বলেছে সেক্যুলারিজম একটা রিলিজিয়ন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যে ড্রাফট করা হলো যে আপনার বয়স আঠারো হলে আপনাকে যুদ্ধে যেতে হবে। তখন এই আন্দোলনের মুখে কংগ্রেস একটা আইন পাস করলো যে আপনার ধর্মবিশ্বাস যদি আপনাকে বলে যে আপনি যুদ্ধে যাবেন না তাহলে আপনাকে যুদ্ধে যেতে হবে না।… সেই প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট একটা রুল দিলো, শুধু ধর্মবিশ্বাস না, আপনার যদি মোরাল কনভিকশন থেকেও আপনি মনে করেন যুদ্ধে যাওয়া ঠিক না, তাহলে আপনাকে যুদ্ধে যেতে হবে না। আপনার সেক্যুলার মোরাল ফর্মও এইখানে রিলিজিয়ন। সুপ্রিম কোর্ট আরেকটা রুলিংয়ে বললো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হিস্টোরিক্যাল অনেক ধর্মের বিকাশ দেখেছে যে ইনক্লুডিং সেক্যুলারিজম…

……………………..

রেজাউল: আমরা একটু অন্য প্রসঙ্গে আলাপ করতে চাই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাথে রিলিজিয়নের সাথে সম্পর্কটা কি রকম ছিল?

পিয়াস: আমার বয়স বারো ছিল তের হয়েছে যুদ্ধের সময়।… আমি যে প্রতিটা ঘটনা স্পষ্ট করে মনে করতে পারবো, তা না।… কিন্তু আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ দোয়া করেছে যাতে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের জয় হয়, দোয়া করেছে যাতে পাকিস্তানি বাহিনির পরাজয় হয়, দোয়া করেছে যাতে শেখ মুজিবুর রহমান ফিরে আসে। ফলে সেখানে কিন্তু সেক্যুলার আর ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে কোন বিরোধিতা ছিল না।…

রেজাউল: আমার একটা অনুমান হচ্ছে, (মানুষ) আওয়ামী লীগেরে যে ভোট দিল (১৯৭০-এ) তার একটা বড় কারণ হচ্ছে, পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিদেরকে পর্যাপ্ত মুসলমান ভাবতো না। এটা বাঙালিদের গায়ে লাগতেছে। যে, বাংলায় কথা বলে, তাইলে সাচ্চা মুসলমান না; আমি সাচ্চা মুসলমান, মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে এইটা ক্লেইম করাও। আমি মুসলমান, তুমি এইটা মানতেছো না, তোমার লগে আমি থাকবো না।

পিয়াস: আমি জানি না, বাঙালি মধ্যবিত্তের কোন কোন অংশ হয়তো মনে করতে পারে; সাধারণ সাব-অল্টার্নদের মধ্যে ওই মেসেজটা গেছে কিনা যে পাকিস্তানিরা আমাদেরকে সাফিসিয়েন্টলি মুসলমান মনে করে না; আমি নিশ্চিত না, মানে আমার এই বারো-তের বছর বয়সে তখনকার অভিজ্ঞতা বলাটা সম্ভব না।

………………….

পিয়াস: সত্তর সালে কিন্তু আওয়ামী লীগে নির্বাচনী কর্মসূচীতে ছিল যে কোরান ও সুন্নাহের বিরুদ্ধে কোন আইন পাস করা হবে না; কোন নীতিমালা প্রনয়ন করা হবে না। বাহাত্তরের দশই এপ্রিলের যে ঘোষণা, সেখানেও কিন্তু সেক্যুলারিজমের কথা বলা হচ্ছে না। সেক্যুলারিজম সতেরোই এপ্রিল এবং তার পরে বলা হচ্ছে।… বাঙালি জনগণ সেক্যুলারিজমের উপর ভিত্তি করে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন এইটা আমরা বিশ্বাস করি না। যে কথা শাহরিয়ার কবির, মুনতাসীর মামুনরা বলেন; তারা মিথ্যা কথা বলেন। বাঙালি জনগণ ধর্মের বিরুদ্ধতা করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেনি।

রেজাউল: …মিনিংয়ের যে দোদুল্যমানতা শব্দের…যারা এইগুলা বলে; কম্যুনাল না, এই অর্থে সেক্যুলারিজমকে বলে। হার্ডকোর অর্থে সেক্যুলারিজম বলতে ওরাও যে এইটা বুঝে তা না। তারা স্রেফ সম্প্রদায়ের পরিচয়ের ভিত্তিতে ভাগ না হওয়া, এইটারেই সেক্যুলারিজম বলে।

পিয়াস: এইরকম অসাম্প্রদায়িকতার পরিচয় তো বাঙালি দিয়েছে।…

…………………

 

মুসলমান-হিন্দু, পাকিস্তান এবং ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ

 

রেজাউল: সম্পত্তি দখলের ভিতরে ধর্মকে একটা ফেনোমেনা হিসেবে দেখাটাও ভুল। সম্পত্তি দখল ত আওয়ামী লীগ বিএনপি’র টা করছে, বিএনপি আওয়ামী লীগেরটা করছে, হিন্দু হিন্দুরটা করছে।

পিয়াস: একটা মজার ব্যাপার কি জানেন, পাকিস্তানি দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রবক্তা বলা হচ্ছে জিন্নাহকে, জিন্নাহ আজীবন একটা সেক্যুলার লোক ছিলেন, মদ খেতেন, নামাজ পড়েন নি। বাঙালি ন্যাশনালিস্ট সেক্যুলারিজমের যে প্রবক্তা শেখ মুজিবুর রহমান উনি রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছেন হিন্দুদেরকে মেরে… এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত উনি হিন্দুদেরকে মালাউন বলেছেন। এখন এই তথ্য যদি আপনি বলেন অনেক লোক আপনাকে মারতে আসবে। আমার আপন চাচা শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম গণহত্যা তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন।…

……………………

ইমরুল: আমি আপনার মাঝখানের একটা কথায় বলতে চাচ্ছিলাম… আপনি বলতেছিলেন সিক্সটিইজে যখন নতুন মধ্যবিত্তের বলয় তৈরি হইতেছে, আওয়ামী লীগের তৈরি হওয়াটা ওইসময়ের কালচারাল জায়গাগুলাতে এসোসিয়েটেড হওয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ গইড়া উঠছে। আবার আশির দশকের দিকেও কিন্তু একটা মধ্যবিত্তের এক্সটেনশন ঘটছে; যখন বাকশালের পরে আবার প্রাইভেটাইজেশন শুরু হইলো, জিয়াউর রহমান আসলেন, তখন মধ্যবিত্তের আওতা বেড়ে গেছে; তখন বিএনপি কিন্তু ওই স্বচ্ছল মধ্যবিত্তের সাথে এসোসিয়েটেড হয়ে গেছে। এই কারণে দেখা গেছে, যারা এইটিসদের দিকে বড়লোক হইতে শুরু করছেন ইকোনমিক্যালি উনারা মোর অ্যাসোসিয়েটেড উইথ বিএনপি।

পিয়াস: তাদের সঙ্গে যারা পুরানো ঘরানার… যেমন ধরেন, যেই কথাটা আমাকে বারবার শুনতে হয়েছে, এই বেহগ যে, রাজাকারের পোলা। আমার বাবা পাকিস্তান রাষ্ট্র সার্পোট করতেন; তার দায়-দায়িত্ব আমার না, কিন্তু উনি করতেন। এখন এরা কারা? এরা হচ্ছে মুসলমানদের মধ্যে প্রথমদিককার স্বচ্ছল যারা হয়েছিল… যার দাদা জমিদার ছিল, বাবা প্রথম ডাক্তার হয়েছে, কুমিল্লা জেলার প্রথম মুসলমান ডাক্তার… একাত্তরে হেরে গেছেন।…

একদম শ্র্রেণীগতভাবে দেখতে গেলে মুসলমানের প্রথমদিকের যারা জাতে উঠেছে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরে যে ছিঁটেফোটা পেয়েছে, এরা মুসলিম লীগে এসে যোগ দিয়েছে, এরা একাত্তরে হেরে গেছে, যার জন্যে এখন আমাকে গালাগালিগুলি শুনতে হচ্ছে…

রেজাউল: আপনি যদি তার যে উত্তরাধিকার সম্পত্তি অর্থে ভোগ করছেন, তার ওই জায়গায় আপনার ভোগ নাই কেন?

পিয়াস: সেটা হবে না ত। আমি যদি কমিউনিস্ট হতাম তাহলে হয়তো করতাম। কিন্তু আদর্শের উত্তরাধিকার তো আমি কখনো করতে পারি না।

রেজাউল: তার যে শ্রেণীগত সুবিধার জায়গাগুলা এইগুলা আপনি অ্যাচিভ করছেন জন্মসূত্রেই। তাইলে তার যে জায়গাগুলা যেটা আপনি বললেন…

পিয়াস: সমাজতত্ত্বের ভাষায় যদি বলি, এইটা একটা অ্যাচিভড অ্যাসক্রাইবড স্ট্যাটাস, আমার উপরে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমার যে আদর্শগত জায়গা…

রেজাউল: কিন্তু ওইটা ত আপনি ডিনাই করেন নাই, কিন্তু অন্য যেটা নিন্দার জায়গাগুলা সেইগুলা আপনি ডিনাই করতে আগ্রহী হচ্ছেন।

পিয়াস: ট্রু। ট্রু। এরমধ্যে একধরণের পেটিবুর্জোয়া সীমাবদ্ধতা আছে। আমি সাচ্চা কমিউনিস্ট হতাম তাহলে আমি বলতাম, আমার বাবার বাড়িঘর আমি নিবো না। এটা আমি বলতে পারতাম।

ইমরুল: আমি বরং রেজাউলের উল্টা জায়গা থিকা আসি। আপনার যে চিন্তা সেইটা আপনার সামাজিক ব্যক্তিগত অবস্থানের সাথে এতবেশি রিলেটেড হয়ে উঠে কেন?… আপনি যখনই শাহবাগ সম্পর্কে আপনার চিন্তা প্রকাশ করলেন, এইটার সমস্যা সীমাবদ্ধতাগুলিক আইডেন্টিফাই করতে চাইলেন, তখনই কিন্তু আপনার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গগুলি আসছে। কিন্তু এই প্রশ্নগুলি আপনি মনেহয় আগেও করছেন মেহেরজানের সময়ে বা বিভিন্ন সোশ্যাল ইস্যুতে আপনার পয়েণ্ট অফ ডিফরেন্সেস জায়গাগুলি ছিল। কিন্তু ইস্যুগুলা যখন একস্ট্রিম পর্যায়ে পলিটিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ হয়া উঠছে তখন এই ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলাতে আসছে যে, আপনি কার ছেলে… মানে এই জিনিসগুলা সার্টেন মোমেন্টে কেন জরুরি হয়া উঠে?

পিয়াস: এখানে একটা ইন্টারেস্টিং সোশ্যাল সাইকোলজি কাজ করে।… আমার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে সচ্ছল পিতা-মাতা… বড় হয়েছি ষাটের দশকে, কাজিনরা বামপন্থী রাজনীতি করেছি। পিতা থ্রেট মনে করছেন না আমাকে। আমার পিতা সোশ্যাল লিবারাল। আমার হাতে প্রথম শেক্সপিয়ার তুলে দেন আমার বাবা। প্রথম রবীন্দ্রনাথ পড়ান আমার বাবা। আমার বাবার হিউজ কালেকশন অফ বুকস। পলিটিক্যালি হি ওয়াজ কনজারভেটিভ। মডারেট মুসলিম। নামাজ-টামাজ পড়েন। একসময় কড়া নাস্তিক ছিলেন। াআমি যখন বড় হচ্ছি তখন মডারেট মুসলিম হয়ে উঠেছেন। প্রচুর পড়াশোনা করেন। কিন্তু পলিটিক্যালি পাকিস্তানে বিশ্বাস করেন। আমার বামপন্থাকে উনি উপহাস করেছেন। কিন্তু থ্রেট মনে করেন নি।… আমি ত ক্লাস এইট থেকে বোর্ডিং স্কুলে, তারপর ঢাকায় কলেজ, ইউনির্ভাসিটি। আমি এইখানে একটা বৃত্তের মধ্যে, আমি ক্লাশ সেভেন থেকেই বামপন্থীদের সাথে মেলামেশা করি। অনার্স পাশ করার পর দেশের বাইরে চলে গেলাম। ওইটা একটা বড় ট্রানজিশন। তারপর ওইখানের কালচারাল আইসোলেশন, ওইখানের বামপন্থীদের সাথে মেলামেশা করি। ওইখানের সোল সার্চিং। একটা মজার ব্যাপার এই যে মিথ, এই ব্যাপারে আমার আগ্রহের জায়গায় এসেছে পাশ্চাত্যের জ্ঞানতত্ত্বের হাত ধরে এবং তারপর যে ফিরে এলাম দুইহাজার সাত সালে পঁচিশ বছর পরে… তখন আমার বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার সাথে এইগুলোকে মিলানোর চেষ্টা করা। এরমধ্যে কোথাও না না কোথাও আমার পিতা বসে আছেন কি, কোথাও না কোথাও আমার পিতার মুখ আছে কিনা, আমি জানি না।…

লোকে রাজাকারের পোলা বলে গালাগাল দিলে কিছু আমি মাইন্ড করি না আর। আমার বাবা সত্যি মজার কথা বললে, হি ওয়াজ নট অ্যাক্টিভ। উনি পাকিস্তান মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। কুমিল্লায় পাকিস্তান মুসলিম লীগের দু্ইজন লোক ছিল। উনি প্রেসিডেন্ট আরেকজন সেক্রেটারি। উনি শান্তি কমিটির মধ্যে কিছু হন নাই, কিন্তু যেহেতু কাউন্সিলার ছিলেন, মুসলিম লীগ করতেন পাকিস্তান সার্পোট করেছেন। উনি সারাটা একাত্তর সালের নয় মাস বাড়িতে বসে তাস খেলেছেন আর বই পড়েছেন। বাট ডিডন্ট ম্যাটার। উনি পাকিস্তান মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আমি এটা জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছি না। ইট রিয়েলি ডাজেন্ট ম্যাটার। কিন্তু বলি, কোথাও না কোথাও তো; আমার বিকাশের কোথাও না কোথাও তো আমার পিতা বসে আছেন। সেইটাই আর কী।

 

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য