Main menu

আবিদ আজাদের কবিতা

‘৭০-এ বাংলাদেশে ‘কবিতা’ হয় নাই, শ্লোগান হইছে – এইরকমের একটা প্রপাগান্ডা চালু আছে বাজারে আর আবিদ আজাদ হইতেছেন এর মেইন ভিক্টিম। আবিদ আজাদের কবিতা পড়লে উনার কবিতারে কেন এক রকমের ‘পাতলা’ হিসাবে ট্যাগ দেয়া হইছে সেইটা এক রকম আন্দাজ করা যাইতে পারে। এক হইলো, সংস্কৃত শব্দ বা জিভ দিয়া দাঁত ছুঁইতে হয়, এইরকম ওয়ার্ড অলমোস্ট মিসিং উনার কবিতায়, যেইটারে ‘কবিতা’ বইলা পারসিভ করতে পারি আমরা। দুসরা হইলো, উনার কবিতার জায়গা’টা। আল মাহমুদ যেইভাবে কলকাতার দেখা বাংলাদেশের ‘গ্রাম-বাংলা’রে আপহোল্ড করতে পারছেন বা শহীদ কাদরি ইউরোপিয়ান একটা শহর-ধারণারে, সেইটা কমবেশি মিসিং আবিদ আজাদের কবিতায়; উনি এমন একটা পারসোনালিটি থিকা কথা কইতেছেন, যে কিনা মফস্বল থিকা আসছে, ঢাকা শহরে থাকতেছে আর কলকাতার কোন ড্রিম ছাড়াই (কেমনে পসিবল!)।

কিন্তু আবিদ আজাদ নিজে খুব কনশাস আছিলেন এই জায়গাগুলি নিয়া, এইটা মনেহয় নাই। ‘কবি’ আইডেন্টিটি’টা স্টিল উনার কাছে ‘ফেইলওর’ একটা ঘটনাই; একটা সোসাইটিতে উনি ‘কবি’ হয়াই বাঁচতে চাইছেন আর মরতেও চাইছেন কবি হওয়ার বেনিফিটগুলি নিয়াই।

কবি আবিদ আজাদের কবিতাগুলি আবার পড়ার সাজেশন হিসাবে কয়েকটা কবিতা রাখা হইলো এইখানে।

ই. হা.

………………………………………………………………………………………

।। তোমার জন্য বহুকষ্টে ।। ভয় ।। চুমু ।।  যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না ।। অভিজ্ঞতা ।। ভ্রমণকাহিনী ।।  কোনো মহিলার জন্য এগারোটি প্রেমের কবিতা ।। উড়ে যাবে র্তকে বহুদূর ।। গোলাপ-প্রসঙ্গ ।। ডালিমের নিজস্ব সংবাদ ।। তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে?  ।। বৃষ্টির ফোঁটা ও পাতাবাহার গাছ নিয়ে ।। মোরগ ।।  বোতাম ।। কাটপ্রোজ বা চিলতে গদ্য সিরিজের কবিতা ।।  স্পষ্ট হচ্ছে ।।

Url for Comments box can not be empty

………………………………………………………………………………………

 

তোমার জন্যে বহুকষ্টে

তোমার জন্য বহুকষ্টে ফুটেছি লাল টবে
ও ফুল তুমি তুলতে আসবে কবে?

বাতাসে মুখ তুলে কাঁপি রোজ সাময়িক ডালে-
আমার কাঁটা স্বপ্ন দেখে সুন্দর দস্তানাপরা
তোমার দুটি আসন্ন হাত প্রিয়
স্বপ্ন দেখে কীটদষ্ট অযত্নে ডালটিও।

নতুন ভাগ্য লিখে দিয়ো গাছপালাদের একাকী কপালে
দাঁড়িয়ে তুমি তুলবে যখন আমায়
তোমার ভুলোমনের ঝুঁটি ধরে
ঢুকব আমি অসম্ভবের জামায়।

তোমার জন্য বহুকষ্টে ফুটেছি লাল টবে
ও ফুল তুমি তুলতে আসবে কবে?

 

ভয়

ভয় করে…

খালাম্মা, তোমার গন্ধে ঘুম আসে না যে!
এখন ওপাশ ফেরো, অন্যদিকে মুখ করে শোও।
তোমার ভিতরে কী যে হাওয়া কী যে জ্যোৎস্না কী যে নোনা বাদাড়ের ঘ্রাণ!
ভূতের পায়ের মতো শোঁ শোঁ শব্দে বড়-বড় পাতা ঝরে,
তোমার চোখের মধ্যে লণ্ঠনের শিখা নাচে কেন?
তুমি কি খেলার মাঠ? চিলেকোঠা?  খোসাহীন বাদামের ছড়াছড়ি?
উদামবুদাম শরীরে তোমার কী যে তাপ! কী যে জ্বর!
আমাকে এমন করে কেন তুমি জাপটে ধরেছ?
আমি কি শিমুল ফুল? লেপের ভিতর শীত? দলামচা বালিশ?
খালাম্মা, তোমার বুকে সরিষা ফুলের গন্ধ! চড়ুইয়ের পাখার ভিতরকার ওম!
তোমার নাকের কেশরের তাপে আমি পুড়ে যাব… পুড়ে যাব…
আমি পুড়ে ছাই হয়ে গেলে তুমি কি ফুঁ দিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দেবে সেই ছাই?
খালাম্মা, আমার ভারী ভয় করে, আমাকে নামিয়ে রাখো পাশে-

মা দেখলে বকবে না?

 

চুমু

চুমুর টিলায় দাঁড়িয়েছিলাম
মনে আছে, মনে?
দুলল আকাশ দুলল পাতাল
পায়ের নিচের পৃথিবী মাতাল
মনে আছে, মনে?
কেবল আমরা টলিনি দুইজনে।

 

যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না

যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না সে শহরে যুদ্ধ শেষের ভাঙা পোড়া একটা এয়ারপোর্টের মতো বেঁচে থাকবে তুমি
তোমাকে ঘিরে সারা ক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে স্কার্টপরা বুড়ি বার্মিজ মহিলার মতো ভৌতিক নির্জনতা
তোমাকে ঘিরে সারা ক্ষণ ঝুলে থাকবে তছনছ তারের জটিলতা
লতাগুল্মময় ক্রেনের কঙ্কাল, জংপড়া লোহালক্কড় আর হিংস্র ঘাসের মধ্যে ধু–ধু করবে তোমার জীবন
ভয়ার্ত সব মিলিটারি ভ্যান আর উল্টে থাকা ট্রলির পাশে ক্ষত–বিক্ষত একটা চাঁদ ওঠা রানওয়ের মতো
তুমি মুখ লুকিয়ে রাখবে গা–ছমছম করা জ্যোৎস্নায়।

যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না সে শহরে জনহীন কোনো পেট্রোল পাম্পের দেয়াল ঘেঁষে একটা মরা শিউলি গাছের মতো বেঁচে থাকবে তুমি –
তোমাকে ঘিরে হা–হা করবে নিদাঘরাত
দেখবে পর্যুদস্ত একটা হেলমেটের ফাটল দিয়ে মাথা তুলছে একগুচ্ছ সবুজ তৃণ
শুনবে ধ্বংসস্তুপের মধ্যে অর্ধডোবা সূর্যাস্তের মতো আগুন লাগা বিলুপ্তপ্রায় লাউঞ্জ থেকে ভেসে আসছে প্রেতহাসির শব্দ
আর তোমাকে ঘিরে নামবে এক জোড়া জনশূণ্য বুটের স্তব্ধতা।

যে শহরে আমি নেই থাকব না সে শহরে প্রতিদিন দুর্ঘটনা দিয়ে শুরু হবে তোমার ভোর
সকাল সাতটা থেকেই অনবরত টেলিফোনে আসতে থাকবে সানস্ট্রোকের সংবাদ
তোমার পাশের সাততলা জানালা থেকে লাফিয়ে পড়বে কোঁকড়াচুলের যুবক
একদিন গলায় ক্ষুর চালাতে–চালাতে ঘুমিয়ে পড়বেন সেই বুড়ো
সবুজ রঙের গলাবন্ধ পরে চকচকে বেতের স্টিক হাতে যিনি মনিংওয়াকে বেরুতেন রোজ
একটি কিশোরী তার আব্বার রেজর থেকে লুকিয়ে খুলে নেবে ব্লেড
গভীর জ্যোৎস্নাঙ্কিত স্ট্রিটের মাথায় হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়বে কালো রঙের গাড়ি
একজন মানুষ শিরীষ গাছের ভিতরে টিপে ধরবে আর একজন মানুষের গলা
পার্কের ঝরাপাতার উপর সারা রাত ধরে শিশিরে ভিজে যাবে মৃত তরুণীর হাঁটুর ভাঁজ

যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না সে শহরে চরম দুর্বোধ্যতম হয়ে বেড়ে উঠবে তোমার বিষণ্ণ সন্তান
বারবার করে বদলাতে হবে তার ঝাপসা চোখের চশমার গ্লাস
তুমি তাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে ভোরের ইস্কুলে
কিন্তু কাঁধে ব্যাগ নিয়ে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না নীল হাফপ্যান্টপরা তোমার ছেলে, আসবে না
তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে ইস্কুল–বাড়ির সামনে :  রাস্তার ওপারে –

যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না সে শহরে নিয়মিত দুধের বোতল দিয়ে যাবে ডেইরি ফার্মের গাড়ি
কিন্তু সেই দুধে মেশানো থাকবে গুঁড়োবিষ
তোমার ফ্রিজের ভিতরে মরে পড়ে থাকবে সাদা ইঁদুর
তোমার ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় বসে থাকবে একটা তেলাপোকা তার রং হবে মারাত্মক রকম লাল
তোমার ওয়ারড্রোবের ভিতর থেকে হ্যাঙ্গার শুদ্ধ ঝাঁপিয়ে পড়বে মধ্যরাতের কাপড়চোপড়
তুমি পালাতে চাইবে পালাতে চাইবে
ছুটে পালাবে
ছুটবে

ছুটতে ছুটতে তুমি তিনতলার জানলার একখন্ড পরদার মতো আটকে যাবে বারবার
তুমি ঊধ্বশ্বাসে ছুটে পালাবে ঘুমের ভিতর
কিন্তু মৃত শহর শাণিত করে রাখবে তার সমস্ত রাস্তার বালি
তারার ভিতর থেকে সারা রাত ধরে খসে পড়বে চুন
হঠাৎ লক্ষ–লক্ষ হাতের করতালি বেজে উঠবে আতঙ্কিত মোড়ে–মোড়ে
দেখবে সাদা ট্রাফিক দাঁড়িয়ে আছে বাজপড়া তালগাছের মতো
তার হাত দুটো ঝুলছে চাঁদহীন মরা ডালের মতো
চোখের লোমহর্ষক দুটো গর্তের ভিতর দিয়ে চলেছে বিষাক্ত পিঁপড়ের বাহিনী
তার মাথার ফাটলে গজিয়েছে একটা বটচারা
তোমার ভয়ার্ত চিৎকারে শুধু সেই মৃত ট্রাফিকের লাল
হা–এর ভিতর থেকে উড়ে যাবে একটা সন্ত্রস্থ বনটিয়া।

যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না সে শহরে লিফট তোমাকে নিয়ে সোজা নেমে যাবে পাতালে
তোমাকে নিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো পার্কের ধারের খাদে ছিটকে পড়বে বাস
লেকের হাঁসগুলি গুগলির মতো ঠুকরে খাবে মানুষের চোখ
আর খুব বিকেলবেলায় তুমি ক্লান্ত হয়ে
ক্লান্ত হয়ে
ক্লান্ত হয়ে
ফিরবে ঘরে
কিন্তু তোমার ঘরের নিঃসঙ্গ দরোজা তোমাকে খুলে দেবে হুহু শীতার্ত প্রান্তর
তোমার সোফা তোমাকে বসতে দেবে না পাঠিয়ে দেবে বেডরুমের বিছানায়
তুমি বাথরুমে যাবে, শাওয়ার খুলে দিলে ঝরবে রক্ত তুমি বেসিনে নুয়ে পড়বে, পানির ঝাপটা দিতেই মনে হবে
কার গলা যেন কাশতে–কাশতে পাঠিয়ে দিচ্ছে যক্ষার ফুল
তুমি ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে,
দেখবে বীভৎস একটা চিড় ধরে আছে আয়নায়।
সেই চিড়–ধরা আয়নার ভিতরে তারপর ক্রমশ হারিয়ে যাবে তোমার আর্তনাদ
আর তোমার মনে হবে, আমি নেই।

 

অভিজ্ঞতা

নৌকাভ্রমণে গিয়ে অভিজ্ঞতা হলো,
একবার দুজন খুব জলের কাছে সরে
এসে
নুয়ে তাকিয়েছিলাম নিচে
যেখানে থির জলে ফুটেছিল আমাদের নৌকার গলুই
আর
কান্তিমান চলন্ত চোখে–চোখে তাকিয়ে
মনে হয়েছিল আমার
নৌকার গলুইটা যেন জলের নিচের গলুইটাকে
চুমু খাবে বলে ভেসে গেল সারা দিন ধরে –
কিন্তু সারা জীবনে কোনোদিন চুমু খাওয়া হবে না তার
আমি বুঝেছিলাম, তুমিও বুঝেছিলে
তবু তো সেই নৌকাযাত্রার দুপুরে
আমরা আমাদের জীবনের দীর্ঘতম চুমুটি খেয়েছিলাম, মনে আছে?

 

ভ্রমণকাহিনী

৪.
আমি ছুঁয়েছিলাম তার স্তন
এমন মর্মরিত নৈঃশব্দ আমি জীবনে ছুঁইনি
আমি ছুঁয়েছিলাম তার আঙুলগুচ্ছের অন্ধকার
এমন অসাধারণ ব্যর্থতার পাশে আর আমি কোনোদিন দাঁড়াইনি
আমি নাক ডুবিয়ে দিয়েছিলাম তার চুলে
এমন পল্লবিত গাছের ঘ্রাণ আমি আর কখনো পাইনি
আমি মুখ গুঁজে দিয়েছিলাম তার কাঁধে
এমনভাবে আর আমি ভেঙে পড়িনি কোনোদিন
আমি চুমু খেয়েছিলাম তার ঠোঁটে
এমন দীর্ঘ নৈঃসঙ্গের কবলে আমি আর কোনোদিন পড়িনি

 

কোনো মহিলার জন্য এগারোটি প্রেমের কবিতা

৬.
এস, চুটিয়ে বৃষ্টির মতো কথা বলি
এস, আকাশের মতো চুপচাপ বসে কথা বলি
ঠান্ডা হয় কাপের চা, পত্রিকার পাতাটি ওল্টাল
পরমাণুযুদ্ধের আতঙ্ক ঐ তো নিমেষে জুড়াল
কাঁপিয়ে চশমার কাঁচ আমি হেসে ওঠি, তুমিও হাসো
রানু, দেখ–দেখ, ঐ যে ছবিতে দুজন বুড়োবুড়ি…
সুন্দর যে হলুদ ঘাসও।

 

উড়ে যাবে র্তকে বহুদূর

“দেখ, দেখ কী সুন্দর মাছি! ”
বলতে–বলতে তুমি হেলে
বসলে এমনভাবে যেন
তোমার কলেজে পড়া মেয়ে
তুমি – আর বললেও  এমন
ভাবে যেন আর কেউ শুনে
ফেলে ঠিক–ঠিক বলে দেবে–
“বাঃ ভারি তো স্বচ্ছ দুটি মাছি!“

অথচ কতটা কাছাকাছি
আছ তুমি আমার এবং
ভেবে দেখ এক টেবিলের
এই যে দূরত্ব–স্রোতহীন
কোনো কথা ছাড়া একা–একা
ভোঁ–দৌড়ে পেরিয়ে যেতে পারি
আমিও–যখন তুমি এই
ডিসেম্বরেই পেরুলে চল্লিশ
আর আমি ক্লান্ত বায়ান্নতে
অপেক্ষায় জেগে বসে আছি
কখন আসবে থার্ড স্ট্রোক।

তবু এই ভোরবেলা, এই
আজকেরই ভোরের বেলায়
তোমার আমার অসমাপ্ত
চায়ের কাপের দেশে কেন
উড়ে এল এই অতি স্বচ্ছ
অতি নীল ডানাঅলা মাছি?

“ওমা, দেখ, একটি কোথায়
উড়ে এল আরো একটি যে “–
কেমন অবাক লাগে – নাকি
তোমার কষ্টের লতা দুলে
উঠে হালকা কৌতুকে, তাকিয়ে
দেখি সত্যি–সত্যি আরেকটি
সত্যিকার মাছি উড়ে এসে
বসেছে তোমার পিরিচের
কিনারে–ফুরফুরে ডানাঅলা–
তবে তর্ক যদি না-ই করি
বলব আমি দ্বিতীয় মাছিটি
আরো বেশি নীল। খুব নীল।
নেহাতই দুটিতে মিলঝিল
খুঁজতে যাওয়াটাই বাতুলতা –
পৃথিবীর এক ভোরবেলা –
যখন অনেক ভোর ফেটে
চৌচির হয়েছে – ফেটে – ছেটে
টুকরো-টুকরো হয়ে গেছে
পৃথিবীতে যখন আবারো
নতুন সিগারেটের মতো
রাংতা ছিঁড়ে বের হয়ে আসে
ভোর-সাদা-শুভ্র-কান্তিমান
ভোর-এবং আমরা যখন
নক্ষত্রযুদ্ধের বিস্ময়ের
দিক থেকে সাধারণ দুটি
মাছির ডানার নীলিমার
বিস্ময়ে মজেছি: তুমি জানো
জীবন সহজ ততটাই
যতটা পেরিয়ে আসা যায়
চোখ বুজে – আবার চোখ না
বুজে-
তবু একটি নীল মাছি ছিল
এখন আবার দুটি হলো
হয়তো তৃতীয় মাছিটিও
নীল হয়ে আছে আরো বেশি-
কোথাও না কোথাও আছে, দেখ
খুঁজে –
এমনকি উড়েও আসতে পারে
এখানে, চাই কী এখানেই –
আমাদের এই দায়সারা
ভোরের কথোপকথনের
কিছু কানাকড়ি শুনতেও
পারে আড়ি পেতে; পারে নাকি?
না পারুক-
আমরা তো দুজনেই জানি
আজকের ভোরবেলা ঠিক
আজকেরই ভোরবেলা, আর
আজকের তুমিও আগের
তুমি নও – আজকেরই তুমি
এবং তুমি কখনোই দুজন
নও বলে ঘাড় কাত করে
দেখে নিলে সকাল-সকাল
হকার ছেলেটা দিয়ে গেল
আজকের খবর কাগজ
এবং আমিও এতক্ষণে
যেন খুব জরুরি একটা
কাজ পাওয়া গেল – দৃশ্য পাওয়া
গেল – যা নিয়ে একটু নড়ে –
চড়ে বসা যায় –
এইভাবে
তোমার বারান্দা-জুড়ে-পড়া
রোদ দেখি পত্রিকার পাশে-
দেখি রোদ ও পত্রিকা, দুই-ই
বারান্দায় বাসি হয়ে যায়,
আমরা দুজন কেউ গিয়ে
ছুঁয়েও দেখি না। মনে হয়
পৃথিবীতে সংবাদপত্রের
সভ্যতার যুগ বুঝে শেষ
হয়ে এল –
তবুও আমরা জানি নাকি
হৃদয় এবং মানুষের
জনগণ আর সরকারি
উন্নতির খবর অশেষ –
বিজ্ঞান, নক্ষত্র, রাষ্ট্রযন্ত্র,
পরাশক্তি, নভযানখেয়া
নড়েচড়ে পাতা উল্টে চোখে
ঘেঁটে দেখি শেষের পৃষ্টার
অষ্টম কলামে পৌঁছে গিয়ে
তবু দেখি
মানুষই মূলত খবর
মাছিদের ডানা বা সূর্যের
খবরাখবর মাঝে-মাঝে
দেশে-দেশে রক্তাক্ত উত্থান
এবং জান্তাদেরই জয়ে তবু
নগরীতে আলোকসজ্জার
জয়োল্লাসে-
ভিতরের পাতায় নেহাত
কখনো-কখনো হৃদয়ের
সংস্কারের সংবাদ আজো
সংবাদ মূল্য দাবি করে-
এবং কুকুর, ভেড়া, পাখি,
ছাগল, মানুষ নির্বিশেষে
সবার দাবির প্রতি ক্লান্ত
সমর্থন জানিয়ে-জানিয়ে
ব্যর্থ – তবু আর্থ-সামাজিক
পুনর্বিন্যাসের পাশে দেখি
‘আলাদা হাসপাতাল চাই’
শিরোনামে কোনো একদল
গ্রামবাসী চিঠি লিখে ফেলে
সহৃদয় কর্তৃপক্ষ আর
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের
করুণা প্রার্থনা করে গেছে।
দেখে শুনে মনে হয় আজ
বাংলাদেশে বুঝি কোনো
প্রত্যন্ত অঞ্চল বলে এক-
ফোঁটা নির্জনতা বাকি নেই
কোনোখানে-
তুমি বোঝো- আমিও তো বুঝি
তার মানে –
বুঝি রিলিফ সর্বত্রগামী
এমনকি হৃদয় অবধি
চলে গেছে বিকেন্দ্রীকরণ।
বলো তো তবু কেন আজো
হৃদয়ে-হৃদয়ে গড়ে উঠল না
পাকারাস্তা-প্রধান সড়ক?
এও কি তথ্য-সাম্রাজ্যবাদের
তথ্য চালাচালি? দেখে আজ
পিঁপড়ে ও পোকারা সমিতির
ছত্রছায়া খূঁজে ফেরে-তাই
পঁয়ষট্টি হাজার গ্রামের
নিরন্ন মিছিল নিয়ে আজ
বাংলাদেশ একটি নির্বাক
গ্রাম। হৃদয়ের মতো চুপ –
প্রচন্ড নিশ্চুপ –
নৈরাজ্যে নিখিল হানাহানি
পড়ে বসে মুদ্রণ নির্ভর
সভ্যতার টাউট-সন্তান
সংবাদপত্রের পৃষ্টায়।
রমরমা ব্যবসা বেড়ে যায়
পাইকারি সংবাদ বিক্রেতা
এবং খুচরো যারা ক্রেতা
তাদের চাহিদা অনুযায়ী
আমরাও কিনে আনি নিত্য
নতুন প্রযুক্তি; বিপ্লবের-
নিউক্লিয়ার ভালবাসার,
মানব ও মানবীর কাছে
আল্ট্রাথিন সম্পর্কের আর
আগামী সন্তানসন্ততির-
অথচ ‘নিজস্ব সংবাদ
দাতা’ নেই হৃদয়ের – আছে
তবু এক্সক্লুসিভ খবর
অনেক পতিতালয় থেকে
শুরু করে বাস্তু উচ্ছেদের
কাহিনী সংবাদ – আরো কত
সচিত্র মৃত্যুর সংবাদ –
অদ্ভুত সংবাদ-ক্ষুধা আজ
মানুষের – কিছুতে মেটে না;
দাও আরো সুন্দর ভাষায়,
নিখুঁত মনোজ্ঞ বর্ণনায়,
দাও হে চমৎকার গাঢ়
ঠসঠসে আতঙ্ক মাখিয়ে-
আতপচালের সাথে দাও
হলুদ আটার সাথে দাও
রেশনের কার্ড প্রতি দাও
তেল, চিনি. পিয়াজ, রসুন
সোয়াবিন, ডালডায়, সাবানে,
কাঁকড়ে মাখিয়ে দাও – দেখ
তবুও মিটবে না এই ক্ষুধা –
মনে হলো নীরবতা যেন
বলছে হঠাৎ মুখ তুলে
মায়েদের মতো মাথা নেড়ে:
“সংবাদ চাও না তুমি আর?
কোনোই সংবাদ? গুম খুন,
রাহাজানি, ধর্ষণ, শান্তির
জন্যে জনপ্রিয় খুনিদের
সর্বশেষ গুপ্ত-বৈঠকের,
হাসিনার, খালেদা জিয়ার,
এরশাদের, ম্যারডোনার,
রিগ্যানের, গরবাচেভের,
সাম্প্রতিক গদ্যের পদ্যের”?
না, না, না, হঠাৎ দেখি দূরে
উত্তরের শীতের হাওয়ায়
বরফযুগের পৃথিবীর
মতো মাথা তুলে খবরের
পত্রিকাটি আর্ত চিৎকারে
বলতে চাইছে আমাদের;
এ বিশ্ব তবু কি কোনোদিন
মানুষের বসবাসযোগ্য
হবে না? সিরাজ মাষ্টারের
ছেলের লাশের খোঁজ তবে
নিয়ে আসবে কি সিরাজ
মাষ্টারেরই পচা-গলা-লাশ?
পুলিশের হেফাজত থেকে
মুনিরুদ্দির কিশোরী কন্যা
ফিরে আসবে কি তবে স্বাধীন বাংলার
ভয়ার্ত পতাকা হয়ে আজো
বারবার?
কেউ এলে তবু এক সের
ছোট আলুর যোগাড় হয়,
তাই আজ সায়েমুদ্দিনেরা
প্রতিদিন গণভোট চায়
প্রতিদিন দলাদলি চায়
পোস্টার, ফেস্টুন চায়, জন-
নেতাদের কাছে গিয়ে, ডাক-
সাইটে আমলাদের কাছে
গিয়ে রেখে আসে ফরিয়াদ,
যদিও এখন ওরা জানে
আমলা এবং নেতারা সবাই
লুটেরার মতো
বিত্ত-বেসাতির বখরা নিয়ে
জল খোঁজে – যোগ দেয় দলে –
ক্ষমতার এই
লড়াই কখনো ফুরাবে না;
তবু নাদু, রমিজ এবং
মালেকেরা ঘুরে-ঘুরে কোর্টে
যায়, কাচারিতে যায়, সাব-রেজেষ্ট্রি অফিসে গিয়ে ওরা
দাঁড়ায় এজলাসে –
স্বত্ব এবং আত্মবিক্রয়ের
দলিলে, সাবকাওলায়
সই ও টিপসই করে আসে –
হঠাৎ আবাক হই আরো:
দেখি তুমি তুলে নিচ্ছ কাপ
মুহূর্তে আমার মনে হলো
একটি ছিদ্রের মতো ভোর
আর শিশিরেরা ডানা মেলে
উড়ে আসছে
উঠে আসছে অফুরন্ত মাছি
মাছি … মাছি …
কুয়াশায় ঘাসের মাছির
উড়ন্ত প্রবাহ থেকে ছিঁড়ে
নিঃসঙ্গ উজ্জ্বল দুটি মাছি
বিমানের অবতরণের
মতো ঘুরে-ঘুরে উড়ে-উড়ে
পৃথিবীতে কোথাও একটি
নিরাপদ বিমানবন্দর
না পেয়ে নামল অবশেষে
আমাদেরই ভোরের টেবিলে।
দেখি: ডানার স্পন্দন রেখে
বসে আছে ফুরফুরে তারার
মতো দুটি তর্কাতীত মাছি –
একটি আমার কাপে আর
অন্যটি তোমার পিরিচের
কিনারে: হয়তো যাবে উড়ে
এখনই, খবরের কাগজের
পাতা উল্টানোর শব্দ শুনে
খসখসে হাওয়ায় –

ডানা মেলে – তর্কে বহুদূর।

 

গোলাপ-প্রসঙ্গ

বেশ কয়টি গোলাপ ফুটে আছে বারান্দার টবে
ভিতরে ভিসিআরে চলছে ব্লুফিল্ম–
গোলাপফুলের মতো একটি মেয়ে
গোলাপের পাপড়ির মতো গা থেকে ঝলমলে সব জামাকাপড় খুলে
দাঁড়িয়ে আছে ঘরের ফুটফুটে নির্জনতার মাঝখানে –
ঘন কার্পেটের লাল রঙের মধ্যে ডুবে আছে
তার দুটি পা –
তার পায়ের পাতা থেকে হাঁটু পর্যন্ত গোলাপের মতো
তার হাঁটু থেকে ঊরু পর্যন্ত গোলাপের মতো
তার কোমর থেকে পেট পর্যন্ত গোলাপের মতো
তার পেট থেকে স্তনজোড়া পর্যন্ত গোলাপের মতো
তার স্তন থেকে চিবুক পর্যন্ত গোলাপের মতো
আর মেয়েটি অদ্ভুতভাবে একটু ঝুঁকে তার আঙুলে
গোলাপের দুটো নিঃশব্দ পাপড়ির মতো ফাঁক করে দিল তার যোনি
টিভি পর্দার বাইরের পৃথিবীর সব দর্শকের মুখ
গোলাপফুলের মতো আগুনের আঁচে
তখন হয়ে উঠল কেমন দগদগে লাল
বারান্দার টবের গোলাপগুলোকে আড়াল করে কখন এসে দাঁড়িয়েছে
গোলাপগাছের মতো আর একটি মেয়ে
কেউ দেখেনি

 

ডালিমের নিজস্ব সংবাদ

ডালিম বিকীর্ণ হয়ে পড়ে আছে ঘরে
ডালিমের নিজের সংসারে।

 

তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে? 

তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে?
বলো থামে?
হাসো কেন? প্লিজ, বলো নামে –
নামে বৃষ্টি হুশহুশ ধোঁয়ায়?
ঘরের ফুসফুস ভরে ওঠে হঠাৎ উত্তুরে হাওয়ায়!
নামে বৃষ্টি ঝরঝরে খোয়ায়?
সবজি ক্ষেত পাতা ভরে তুলে রাখে ছাই?
পাটকরা শাড়ির ভাঁজের মতো সাদা ছাই?
ইস্ত্রি–ভাঙা জামাকাপড়ের মতো কালো ছাই?
মখমলের মতো পাছা তুলে হঠাৎ এক লাল গাই
চেনায় ভিজিয়ে দেয় সুপারিসারির একলা পথ?
পসলা–বৃষ্টি ধুয়ে দেয় মাটি?
ছাইগাদা?
ডানা থেকে আগুন ঝরিয়ে দিয়ে সোনার মোরগ
দাঁড়ায় পাখ–টান করে হঠাৎ কোক্‌কোরো কোক্?
বলো, পাহাড়তলির মতো লাগে জানালার কাছে শুয়ে?
আকাশ উপুড় করে ঢেলে দেয় কাঁচের জামবাটি?
উঠোন চকচক করে ওঠে আয়নার মতো? অবিশ্রাম জানালার পাশে?
ছাই ওড়ে ?
ধুলো যায় দুপুরের হাওয়া গাড়ি চড়ে?
খড়খড়ি মাতিয়ে বৃষ্টি ঝরে?
বলো বৃষ্টি নামে মনে? বৃষ্টি নামে বরবটিপুর জংশনে?
চশমার কাঁচের মতো বৃষ্টির ঘষায় মনে পড়ে?
মটরশুঁটির মতো চুপি–চুপি এক গুমটি–ঘরে
স্বর্ণলতা হঠাৎ দুহাত টেনে পথিক বসায় আশেপাশে?
তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে?
থামে রেলগাড়ি?
ধোঁয়া ছাড়ে থইথই মাটি?
আবার ঝরঝরে লাগে রোদ, ধুলো, ছাই?
মন থেকে বনসাঁই পথ ঘুরে আবার বৃষ্টির ঝালর নামিয়ে রাখে দিন
তুমি উঠে বসো সর্বাঙ্গীন
মেঘে–মেঘে হারায় চেকনাই?
উপরন্তু শোন তুমি ছেঁড়া–বৃষ্টি করমচা পাতার
ঠিকানা হারিয়ে ফেলে মাছির ডানায় রাখে তার
হাজার সাঁতার?
ওকি! হাসো কেন? বলো নামে?
তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে?
মন–গড়া বৃষ্টি নিয়ে মন–গড়া ট্রেন
মন–গড়া রেললাইন ছেড়ে দিয়ে ঝিকঝিক খোঁয়ার বহর নিয়ে থামে এসে
তোমার ঘুমের মশারির কাছে? বালিশের পাহাড়ের কাছে?
ঘাসের কাছের কোনো এক ইস্টিশনে?
ঘাসের হাতের কাছে অচিরাৎ তুমিও বসে পড়ো
ঘাসের ফুলের মতো অতিসাধারণ কোনো প্যাসেঞ্জার হয়ে এককোণে
বসে থাকো কুয়াশায়? ধুলোর কাঁকরও
পায়ের চপ্পলসহ পায়চারি রেখে বসে পড়ে,
নিমের গাছের নিচে হাঁটুমুড়ে বসে থাকে শীত –
হাঁফ ছাড়ে গাড়ির মতন?
চোখ বোজো।
চোখ বুজে দেখ তুমি ব্রীজ –
রেলওয়ের দিগন্ত নিয়ে যায় ঐ দূর প্রবল নীলিমার সুপারিবাড়ির সদরের
রেলগাড়ি নিয়ে যায় শীত
যায় বেঁকেচূরে
অড়হড় ক্ষেতের পাশ ঘেঁসে
কাঁটামেহেদির ঝোপ ফেলে
ছাঁটা–মাথা–নতুন সুরকির পথ – যেন সিঁথি লাল
শীতের চুলের ফাঁকে কনকনে বাতাসে এলোমেলো
উত্তুরে হাওয়ার হুহু টান
পথে–পথে বিলি করে যায় কার নিঃসঙ্গ দিনের পত্রাবলি
এরই মধ্যে টালির বাড়ির ছাইগাদা
ফোটায় অতীব্র তীব্র ফুল
চায়ের লিকারের মতো টগবগে লাল
শালিকের চেহারার মতো ঠিক – মনে হয় মৃত আজ সমস্ত রুমাল
শালিকের চেয়ে বেশি নির্জন মাস্তুল :
তার মানে, তোমার গলায় এখন খয়েরি মাফলার
মানে ঠান্ডা খুব, শীত খুব–নিচু স্বরে
শীতের নদীর মতো কে যে কাকে ডাকে!
শোন তুমি – এসে পড়ে ঝাপসা রেলগাড়ি
বৃষ্টি আরো তড়িঘড়ি
তুমি হাসো। এ কি হাসো কেন?
বলো থামে রেলগাড়ি? বলো নামে জোর বৃষ্টি? নামে?
হাতিশুঁড় ঝোপে
পাখি ও পাপড়ি বুঝি এক হয়ে যায়?
পাতা থেকে পাখি বুঝি জেগে ওঠে সকালের ডালে?
সমপাপড়ির মতো ভেঙে যায় কাছের কুয়াশা?
অসংখ্য পাতার উদগমে
পথিক এখনো পথ ভ্রমে
অবশেষে এই পথে চলে আসে দুরন্ত উপত্যকায়?
এই খাড়া পথে?
বলো,
সকাল বিকাল দলমত নির্বিশেষে
নির্জন এখনো একা পায়
তোমাকে? ইস্কুল থেকে ফেরাপথ
একাকী তোমাকে পেয়ে যায়?
বারো মাস
ছুটি চাও? অবসর চাও?
নাকি
লেট হয়ে গেলে
তোমাদের অফিসের স্টাফবাস
তোমাকে কদাচিৎ একা করে যায়?
ছুটি মেলে
অর্জিত? আমার কবিতার
বাকি
ছত্রগুলি পড়ে ফেলতে চাও, অবসর চাও
বলো, ঘুম পায়?
হাতের তলায় হাই তুলে
দাঁড়াও জানালায়?
আবার বৃষ্টির ছাঁট লাগে সারা মুখে?
আবার রেলের গাড়ি উঠোনের কাদায় দাঁড়ায় এসে রুখে?
ধুলো ও কাপড় ওড়ে? দেখ চোখের চশমা খুলে
একটি গাছ রৌদ্র ও ছায়ার কাপড়চোপড়গুলি গুছিয়েগাছিয়ে রাখে
আর একটি গাছের হতশ্রী সংসারের
সবুজ আলনায়?
বান্ধবী পাঠায় পাতা ভরে
নিরুত্তর?
শিরীষের পাতায় প্রচুর
কাটাকাটি হয়?
তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে?
রেলগাড়ি থামে?
স্কুল ফাইনাল শেষ তোমার মেয়ের
ফিরে আসে ফের জানুয়ারি
ছুটি নিয়ে চলে যাও গ্রামে –
ওখানে কি সমস্ত দুপুর বৃষ্টি নামে?
কাঁঠালপাতারা ভেজে ঘামে
ঝোঁপে রোদ পড়ে সারা দিন?
হঠাৎ উঠোন জুড়ে ওড়ে ঝরাপাতা
ধুলোয় জুড়োয় গাছপালা
রেলগাড়ি থামে?
ইস্টিশানে
শালুক পাতায় ভাসে বিল
বর্ষায়? হলুদ ব্যাগ কাঁধে বয়ে খামগুলি আনে
গত সিজনের?
তোমার ছেলের ক্রিকেটের বল ভেঙেছে উইন্ডস্ক্রিন ঝকঝকে গাড়ির?
পাশের ফ্ল্যাটের মেয়েটির মতো বুঝি ছাদে গিয়ে আকাশ দাঁড়িয়ে থাকে একা?
তোমার পায়ের কাছে শুয়ে সাদা কুকুরের মতো
ঘুমায় পত্রিকার এলোমেলো পাতা?
তুমি কি এখনো খুব মানে
খোঁজো?
বল অবসর পাও? দূরে গিয়ে
চোখ বোজো?
বলো কান পেতে শোনো নাকি বৃষ্টি নামে,
রেলগাড়ি থামে –
জ্যোৎস্নায় চাকার ঝড় তুলে
চাঁদ পড়ে ঝুলে –
পশমের মাফলারের মতো চাঁদ
অনিদ্র ছাদের নিঃসঙ্গ কোণের মতো একফালি চাঁদ
বলো, চোখ বুজে দেখ নাকি ক্যাম্বিসের ব্যাগ হাতে
একজন নির্জন মানুষ
পথে নামে?
তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে?

 

বৃষ্টির ফোঁটা ও পাতাবাহার গাছ নিয়ে

বৃষ্টি ধরে এসেছে অনেকক্ষণ।

দোতলার ছাদ থেকে এখনো একটার পর একটা অনবরত বৃষ্টির ফোঁটা আমার বারান্দার টবের পাতাবাহর গাছের হলুদ আর লাল–সাদার ছিটপড়া একটা চৌকো ও চিরল পাতার ওপর ঝরে পড়ছে আল্লাহর আরশের মণিমুক্তোর মতো

অনেকক্ষণ ধরে আমি বসে বসে দেখছি এই শিথিল–স্বভাবের বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর ঝরা আর আমার প্রিয় পাতাবাহার গাছের পাতার সেই ঝরন্ত বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকে নীরবে গ্রহণ করার অনবরত কাঁপা দৃশ্যটি

আমার মনে হলো মানুষের জীবন এরকমই এক ধরণের অবর্ণনীয় আর অলৌকিক একটা অপ্রতিরোধ্য বিনিময়

আমার জীবনের ভিতরেও কোথায় যেন এমনি একটি উৎসুক পাতাবাহারের গাছ আছে যার অনেক পাতার ভিড়ের মধ্যে হলুদ আর লাল–সাদার প্রিণ্টআঁকা একান্ত ইন্দ্রিয়প্রবণ একটি পাতার ওপর কোনো এক অদৃশ্য কারনিস থেকে চুঁয়ে–চুঁয়ে বৃষ্টিফোঁটার মতো অনবরত তোমাকে চাওয়ার তোমাকে পাওয়ার তোমাকে হারাবার গতানুগত সেই দিনগুলোর অনেক চুম্বন আর অনেক গ্লানির অনেক আলিঙ্গন আর অনেক যৌনমিলনের শরীরী তীব্রতার আনন্দের ক্লান্তির আর অবসাদের স্মৃতির ফোঁটাগুলো ঝরে পড়েছে প্রচন্ড নিঃশব্দে – ভয়ংকর শ্লথতায় –

আর আমি আমার কবিতায় এই অবর্ণনীয় বিনিময়ের অভিজ্ঞতাগুলোই পুনর্বিন্যস্ত করতে চেয়েছি আজীবন।

 

মোরগ

আমি একটা উজ্জ্বল ঝলমলে ডানার সুন্দর মোরগ
ছাইগাদার ভিতর থেকে ঠুকরে–ঠুকরে তুলছি লাউয়ের ফুলের মতো টগবগে আগুন
আর খুঁটে–খুঁটে খাচ্ছি তোমার বাড়ির অপরাহ্নময় হৃদরোগ

 

বোতাম

একটি ছেলে রোজ তার শার্টেরবোতাম হারিয়ে ফিরে আসত বাড়ি
আর একটি মেয়ে তার সুঁই-সুতোয় লাগিয়ে দিত আরেকটি নতুন বোতাম

ছেলেটি ছিল খুব রুগ্ন, ঝাউগাছের মতো একা
আর মেয়েটি ছিল স্বচ্ছ এবং শান্ত, কিন্তু ভীষণ একরোখা

ছেলেটির ছেঁড়া বুকের বোতাম লাগিয়ে
মেয়েটি তার দাঁতে যখন কাটত সাদা সুতো

ছেলেটির ভিতরে কাঁপতে কাঁপতে থাকত পাগল সব ডালপালা
আর মেয়েটি আকাশের মতো মুখ তুলে তখন তাকিয়ে থাকত ছেলেটির দিকে

ছেলেটি বলত, ‘ছবি, দেখিস আমার সব হারানো বোতাম একদিন
শিশির হয়ে জমে থাকবে কোনো শীতের মাঠে, ঘাসে, কাঁটাগাছে’।

মেয়েটি বলত, ‘রেণু, তুইও দেখিস, মরে গেলে
আমিও একদিন ভীষণ নীল আকাশ হয়ে যাব কোনো শীতের বিকেলের দিকে’।

সেই থেকে একটি মেয়ের মনে তারা হয়ে জ্বলছে একটি বোতাম
সেই থেকে একটি ছেলের মনে নীল আকাশ হয়ে আছে একটি মেয়ের চোখ

 

কাটপ্রোজ বা চিলতে গদ্য সিরিজের কবিতা

১০
মুস্তফা আনোয়ার এখন রাজশাহীতে। উত্তরবঙ্গের কুয়াশায় বসে
বাংলা ব্যাকরণের বনবাদাড় আরেকবার ঘুরে-টুরে
দেখবেন বলে স্থির করেছেন-
এই সংবাদটুকু দিয়েই হো হো করে হেসে উঠলেন টেলিফোনে।
বললেন, ‘আবিদ, চলে আস, শীত পড়ার আগেই এসে পড়ো –
চমৎকার উষর ও মায়াবী ভঙ্গিতে তোমাকে
স্বাগতম জানাবে এই বরেন্দ্রভূমি
আমি আর মহীউদ্দিন পথে পথে প্রস্তুত করে রেখেছি
ধুলো, উলুঝুলু পাখি এবং ধোঁয়াটে কুয়াশা –
চলে আস।
যাওয়া যাবে দিনাজপুরের দিকে ছত্রখান দুপুরে
সাঁওতালদের পাড়ার খোঁজ নিতে না হয় চলে যাব সূর্যাস্তের দিকে
দেখব আখের ক্ষেতের পাশে পা ফাঁক করে মুততে বসেছে চিনিকলের ধোঁয়া
নওগাঁর দিকেও চলে যাওয়া যাবে ফিরোজের জিপে
ওখানে তোমার বন্ধু কামাল আছে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, কামাল,
শুনেছি ওদিকে আরো বেশি ছেঁড়া ধুলো আরো বেশি কাবু জোৎস্না
এবং আরো আরো গভীরতর শীত–
চলে আস।’
শেষ হলো না কথা, ছিঁড়ে গেল এসটিডির লাইন
কিছুক্ষণ ঝুলে থাকলাম এদিকে টেলিফোনের রিসিভার কানে ধরে আমি
ওদিকে, উত্তরবঙ্গ, গোঁ গোঁ শব্দের মধ্যে ভাঙতে লাগল
আসন্ন শীতের আড়মোড়া

২৬
আমার পায়ে গামবুট
হাতে রবারের গ্লাভস্
চোখে লোহার গোল চশমা
মাথায় জংপড়া হ্যালমেট
কেরোসিন, পেট্রোল, কাদা
গ্রিজ এবং মবিলের পিচ্ছিল পথ পার হয়ে
ওয়েলডিং কারখানার ভিতরে
তোমার সুন্দর নগ্ন শরীর কোলে নিয়ে
আদর করতে–করতে
আমি লেদমেশিনের পাশে বসে–বসে কাঁদব

 

স্পষ্ট হচ্ছে

অস্পষ্ট হচ্ছে সামনের রাস্তা
মশার পিঠে চড়ে কুয়াশা নামছে
কাক ঠোকরাচ্ছে নিজের মরা ঠ্যাং
চড়ুই ঝরে পড়ছে ছাদে
টবের মাটি নষ্ট শিকড়ের পানি চাটার শব্দ শুনছে
কফ ঘন হয়ে উঠছে শীতে
কাজী পেয়ারার গাছের খসখসে পাতা গন্ধ শুঁকছে রুগ্ন ফুসফুসের
অস্পষ্ট হচ্ছে দূরের কাছের ফ্ল্যাটের জানালা বারান্দা ছাদ
স্পষ্ট হচ্ছে শুধু ফিরে যাওয়ার রাস্তা
চশমার কাচ মুছতে আর ভাল্লাগে না আমার

 

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.