Main menu

যারা নির্যাতিত মানুষের মুক্তির কথা বলেন, তারাও মিলিট্যান্সির কথা বলেন

আমার বাপে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর নন-কমিশণ্ড অফিসার ছিলেন। কমিশণ্ড অফিসার বলে যে একটা বিষয় আছে, সেটা আমি প্রথম বুঝতে পারি কিছুটা আজগুবি একটা যায়গায়। সেইটা হচ্ছে হাসপাতাল।

তখন আমরা কুর্মিটোলার বিমান বাহিনীর কলোনীতে থাকি। আমাদের সকল স্বাস্থ্যের সমস্যার জন্যে যাইতে হইত বিমান বাহিনীর হাসপাতালে। সেইটাকে আমরা ডাকতাম “এম আই রুম” হিসেবে। এর পুরা অর্থ এখনও জানি না।

এম আই রুমের নিয়ম ছিল মহিলাদের আর পুরুষদের আলাদা যায়গায় ডাক্তারের সাথে সাক্ষাতের জন্যে নাম লেখাইতে হইত। বাচ্চা ছিলাম বিধায় সবসময় আম্মার সাথে হাসপাতালে যাইতাম। এই কারনে মহিলাদের নাম লেখানো হয় যেখানে, সেখানকার ওয়েটিং রুম এর তৎসংলগ্ন করিডরে ডাক্তারের সাথে সাক্ষাতের জন্যে অপেক্ষা করতাম।

কুর্মিটোলার ঐখানটাতে বিমান বাহিনীর কলোনী অনেকগুলো। মানুষ বেশী হওয়াতে হাসপাতালে প্রচণ্ড ভীড় হইত। আমার মনে আছে পানি খাওয়ার জন্যে একটা নীল রঙের যন্ত্র ছিল সেইখানে। সেইখানকার পানির কলটা নিয়ে আমার খুব আগ্রহ ছিল। আমাদের বাসায় দেখতাম, পানির কল খোলার জন্যে ঘোরাইতে হয়। কিন্তু সেই নীল রঙ্গা মেশিনে উপর থেকে নীচে চেপে ধরলে পানি পরত। এই অদ্ভুত কলটা নিয়া আমার বিপুল কৌতুহল ছিল। সুযোগ পাইলে হুদাই কল চেপে ধরতাম। আম্মুর ধমকের কারণে অবশ্য সুযোগ অনেক কম আসত। তবে এই পানির কল ছাড়া সেই অপেক্ষমান যায়গায় ভালো লাগার আর কিছুই ছিল না। প্রথম বিষয়টা ছিল দীর্ঘ অপেক্ষা। আমার জীবন তখনও ঘড়ি ধরে চলা শুরু হয়নি। তাই ঠিক কতক্ষণ বসে থাকতে হত, তা বলতে পারব না। কিন্তু বসে থাকতে থাকতে যে বিরক্তির চরম সীমায় পৌছে যেতাম সেটি বেশ ভালৌ মনে আছে।

হাসপাতালের আয়ারা বেসুরো গলায় একেকটা নাম ডাকতেন। ওখানকার রীতি ছিল নাম লেখাতে হত বিমান বাহিনীতে কর্মরত স্বামীর নাম। লেখার সময় সামনে একটা মিসেস লাগানো হলেও, আয়ারা ডাকার সময় শুধু স্বামীর নামটাই ডাকতেন। অপরিসর একটা যায়গায় গাদাগাদি করে অপেক্ষা করা এতগুলো মহিলার নিজেদের নাম নেই, সেটি নিয়ে আজকে যারা সমাজে লুকানো জেণ্ডার সাপ্রেশন খোঁজেন বিদেশী পয়সায়, তারা একটু গবেষণা করে দেখতে পারেন।

এই দীর্ঘ অপেক্ষার পর আয়ার মুখে আমার বাপের নাম শুনতে পেলে হাফ ছেড়ে বাচতাম। কিন্তু খুব বেশী যে বাঁচতাম তাও না। মহিলা ওয়ার্ডে রোগী দেখতেন মহিলা ডাকতাররা। ততদিনে আমরা জেনে গেছি, মহিলা ডাক্তাররাও “অফিসার”। আমার বাপের র‍্যাংকের সাথেও একসময় একটা “অফিসার” জুটেছিল। কিন্তু ছোটবেলায় আমি বুঝে গিয়েছিলাম, আমার বাপে “অফিসার” না। সেই “অফিসার” ডাক্তারনীরা বেশ কড়া গলায় কথা বলতেন। ভালো ব্যবহারের ছিটেফোঁটাও তাদের মধ্যে ছিল না। কেমন যেন ধমকের সুরে কথা বলতেন। ছোটবেলায় এইসব ডাক্তারনীর বাইরে আর কোন ডাক্তার আমি চিনতাম না। সেই কারণে আমি ধরে নিয়েছিলাম ডাক্তার মাত্রই বদরাগী।

কিন্তু আমার ধারনা ভেঙ্গে যায় নতুন কিছু পর্যবেক্ষণে।

মাঝে মাঝে দেখতাম কিছু মহিলা সেখানে আসতেন। তাদের পোশাক আশাক, চাল চলন দেখে বোঝাই যেত তারা এই গাদাগাদি করে বসে থাকা মহিলাগুলোর চেয়ে আলাদা। তারা আসলে আয়া থেকে শুরু করে নার্সদের মুখে ত্যালত্যালে একটা ভাব চলে আসত। যে আয়ারা অথবা নার্সরা অন্যদের সাথে মুখ ঝামটা ব্যতিত কথা বলতো না, তারাও সবাই লাইনে চলে আসত। তারা রাণীর মত আসতেন। রাণীর মত চলে যেতেন। ভিড়ের মাঝখান দিয়ে এই রানীরা যখন হেটে যেতেন, তখন তাদের মুখের ভাবে একটি বিরক্তি ফুটে উঠত। এই বিরক্তির কারন যে আসলে সেই ভিড়টি, তা পরে বুঝতে পেরেছিলাম। তবে তাদের মুখের ভাবের সাথে ডাক্তারনীর মুখের ভাবের কিছুটা মিল আছে তা বুঝতে পেরেছিলাম।

পরে শুনতে পেলাম, তারা কোন গ্রুপ ক্যাপ্টেন অথবা স্কোয়াড্রন লীডারের বউ। তখন থেকেই সচেতন হওয়া শুরু করি গ্রুপ ক্যাপ্টেন কিংবা স্কোয়াড্রন লীডার বলে ভিন্ন কিছু একটা আছে। যাদের লাইনে অপেক্ষা করতে হয় না। যাদেরকে আয়া-নার্সরা ধমকায় না। ধীরে ধীরে কলোনীর কাছাকাছি এই “কমিশণ্ড” মানুষগুলোকে চিহ্নিত করতে শিখলাম। তাদের র‍্যাংকগুলো ভিন্ন এবং সুন্দর ছিল। আমাদের বাপেরা যে র‍্যাংক কাঁধে পরতেন, সেগুলো যাকে বলে ugly and poorly designed. কিন্তু “কমিশণ্ড” মানুষদের র‍্যাংকগুলো দেখতেও সুন্দর। কুর্মিটোলা শাহীন স্কুলের পাশে অফিসার্স কলোনী ছিল। বাইরে থেকে তাকিয়ে বুঝতাম তাদের বাসাগুলোও সুন্দর। মনে মনে বিশ্বাস জন্মালো তারা হয়ত মানুষ হিসেবেও উন্নত।

মানুষ হিসেবে এতই উন্নত তারা, যে তাদের অসুখেরও মর্যাদা আছে। তাদের শরীরের জীবানুগুলোও “র‍্যাংক” পরে থাকে। সেই জীবানুগুলো তাই “নন-কমিশণ্ড” লোকজনের জীবানুর থেকে প্রায়োরিটি পায়।

একটি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন হায়ারার্কি থাকে। সকলের মর্যাদা একই থাকে না। কিন্তু সাধারনত সকল প্রতিষ্ঠানে এই হায়ারার্কির একটি ডিফাইণ্ড সীমানা থাকে। অর্থাৎ জীবনের সবগুলো যায়গায় এই হায়ারার্কি হানা দেয় না। কলোনী করে থাকার ফলে, সামরিক বাহীনির জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই হায়ারার্কি হানা দেয়। হাসপাতাল থেকে স্কুল থেকে খেলার মাঠ। অফিসার্স কলোনীর খেলার মাঠে খেলতে যাওয়ার কথা আমরা কখনও ভাবতেও পারতাম না। স্বর্ণালীর ভেতরের খেলার মাঠে খেলতে গেলে অনেক হ্যাপা পোহাতে হত আগে। আমাদের নন-কমিশণ্ড কলোনীর খেলার মাঠে খেলতে গেলে কাউকে বেশী ঝামেলা পোহাতে হত না। আমাদের সাথে অনেকেই খেলত যারা ক্যানটনমেন্টের বাইরে থেকে এসেছে।

সামরিক বাহিনীর স্বর্বব্যাপী “হায়ারার্কি”র পক্ষে প্রচুর যুক্তি আছে। বলা হয় এইভাবে কঠিন সেগ্রেগেশন চালু না রাখলে বাহিনী টিকে থাকবে না। যুদ্ধে পরাজিত হবে। আমি এইসব তর্কে যাবো না।

যুদ্ধ তথা একগ্রুপের অন্যগ্রুপের মাথায় বাড়ি মারার প্রবনতা মানুষের অনন্য নয়। আমাদের কাছাকাছি কাজিন এবং “হান্টার গ্যাদারার” পূর্বপুরুষদের মধ্যে এই প্রবনতা ভালো ভাবেই আছে। সত্তরের দশকে গোম্বিতে জীববিজ্ঞানী জেইন গুডওয়াল শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ পর্যবেক্ষণ করেন। সত্তরের দশকের শুরুতে ওখানে একটি গ্রুপ ছিল। গ্রুপের একজন বর্ষীয়ান এবং প্রভাবশালী শিম্পাঞ্জী ১৯৭০ সালে মারা যায়। পরের তিনবছর গ্রুপটিতে কিছুটা ভাঙ্গন ধরে। উত্তর এবং দক্ষিণে দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়ে আলাদা খাদ্য সংগ্রহ অথবা বাচ্চাদের দেখাশোনা শুরু হয়। ৭৪ সালে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। হত্যা, ধর্ষণ, বাচ্চাকাচ্চা অপহরন, গুপ্তহত্যা ইত্যাদির মাধ্যমে অনেক রক্তক্ষয়ের পরে একটি গ্রুপ অন্যগ্রুপকে সম্পূর্ণ ধবংস করে দেয়। গুডওয়াল তিন বছর জুড়ে প্রতিদিনের যুদ্ধের আপডেট পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। বিশেষত একটি গ্যাং-রেইপ এবং সেই মেয়ে শিম্পাঞ্জীর বাচ্চাটিকে মেরে খেয়ে ফেলার দৃশ্য দেখে তিনি মানসিকভাবে অবসাদ্গ্রস্ত হয়ে পরেন। তার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণিত আছে এই বইয়ে –Goodall, Jane. Through a window: My thirty years with the chimpanzees of Gombe. Houghton Mifflin Harcourt, 2010.

 

Through a window: My thirty years with the chimpanzees of Gombe

Through a window: My thirty years with the chimpanzees of Gombe

 

সুতরাং এক জাতির প্রতিরক্ষার জন্যে, ভিন্ন অর্থে অন্য জাতিকে হত্যার-গনহত্যা-ধর্ষণের উদ্দেশ্যে সামরিক বাহিনী পোষার মধ্যে অবাক হবার কিছুই নেই। এমনকি যারা নির্যাতিত মানুষের মুক্তির কথা বলেন, তারাও মিলিট্যান্সির কথা বলেন। ফরহাদ মজহারের মত উত্তরাধুনিক বই লেখেন “গনপ্রতিরক্ষা” নামে। সকল এন্টিকলোনিয়াল রেজিস্টেন্সে ভায়োলেন্সের স্থান আছে। স্থান আছে মিলিট্যান্সির। কমিউনিস্ট থেকে ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স, ক্রিশ্চিয়ান মিলিশিয়া, বালাকা-এন্টিবালাকা, ডান থেকে বাম, উত্তর থেকে দক্ষিণ, সকলেই বলেন রেজিস্ট্যান্সের কথা। হত্যার কথা। তাই আমি অবাক হই না।

গণপ্রতিরক্ষা বইয়ের কাভার।

গণপ্রতিরক্ষা বইয়ের কাভার।

 

আমি শুধু হত্যার জন্যে তৈরী সুশৃঙ্খল বাহিনী, হতে পারে সেটি সেনাবাহিনী অথবা আধাসরকারী মিলিশিয়া, তৈরীর জন্যে যে ডিহিউম্যানাইজেশন প্রয়োজন তা অনুধাবন করে কষ্ট পাই। কষ্ট পাই এই সকল প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের যেভাবে indoctrinate করা হয় তা ভেবে। স্ট্যানলি কুবরিকের “ফুল মেটাল জ্যাকেটে” এই পদ্ধতিটি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। সহজ হিসেব হচ্ছে সামরিক শক্তির উৎস হচ্ছে “ডিহিউম্যানাইজেশন”। এইটা ছাড়া সামরিক-আধাসামরিক বাহিনী তৈরী হতে পারে না। যারা এই indoctrination এর মধ্যে দিয়ে যায়, তাদের জন্যে আমার বরং খানিকটা করুণা হয়। হত্যাকে ভয় পাওয়া, অগ্রহনযোগ্য মনে করা একটি সাধারণ অনুভূতি। কিন্তু সেই অনুভূতিকে সাপ্রেস করতে হলে অনেক কিছু করতে হয়। কখনও দেশপ্রেম, কখনও স্বজাতিপ্রেম, কখনও স্বধর্ম্প্রেমের দোহাই দিয়ে শত্রুকে ডিহিউম্যানাইজেশন করতে হয়। সিলেক্টিভ ডিহিউম্যানাইজেশন আসলে কখনও পুরোপুরি সম্ভব নয়।

 

 

এই কারনেই হয়ত আমরা জীবানুকে র‍্যাংক পড়াতে দেখি। খেলার মাঠকে মেডেল পরাতে দেখি। এমনকি মসজিদও র‍্যাংক এর হাত থেকে রক্ষা পায় না। মাঝখানে আমরা ৩ বছর চট্টগ্রামে ছিলাম। সেসময় বেশ মুমিন মুসলমান ছিলাম। বাসার কাছের মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করতাম। রোজার সময়ে খতমে-ত্বারাবী। যেদিন খতমে-ত্বারাবী শেষ হবে-সম্ভবত ২৬ বা ২৭ রোজার দিন-সেদিন ছোট একটা অনুষ্ঠানের মত আয়োজন করা হয় মসজিদে। ইমামের পেছনে সেই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জনৈক গ্রুপ ক্যাপ্টেন দাড়ান। এই গ্রুপ ক্যাপ্টেনকে কোনদিনও মসজিদে দেখি নাই, ত্বারাবীর সময়ে তো দুরের কথা। কিন্তু তিনি খতমে ত্বারাবীর রাজকীয়ভাবে আসেন। ইমাম-থেকে মুয়াজ্জিন থেকে আম-ননকমিশণ্ড মুসুল্লী, সকলের মুখ ত্যালে ত্যলে হয়ে পরে। তিনি খতমে-ত্বারাবী পড়িয়েছে মাদ্রাসার যেই দুই ছেলে, তাদের জন্যে আলাদা পুরষ্কার ঘোষণা করেন। চারদিকে আলহামদুলিল্লাহ গম গম করতে থাকে।

কয়েকদিন আগে এলার্জিক রিএকশনে আমার বাপে গভীর রাতে সিএমএইচ গেছিলো। বাপে বিমান বাহিনী ছেড়ে দিছেন অনেক বছর হয়েছে। তার ছেলের, অর্থাৎ আমার, কাছের বন্ধুরা এখন সেনাবাহিনীর মেজর পদে কর্মরত। কিন্তু কিছু কিছু জিনিস পরিবর্তন হয় না। যেমন এখনও তিনি লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। এখনও র‍্যাংক-মেডেল ওয়ালারা কষ্টে কাতরাতে থাকা বাপের থেকে বেশী গুরুত্ব পায়। কারন এখনও তিনি “নন-কমিশণ্ড” অফিসার।

 

এপ্রিল ০৬, ২০১৫।

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
আরিফ হোসেন
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র, তবে কোন বিষয়েই অরুচি নাই।

‘click worthy’ ক্যাটেগরি বিষয়ে

সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন পার্সোনাল স্পেস/ব্লগ থেকে লেখা এই বিভাগে পাবলিশ করবো আমরা; ক্যাটেগরি নামেই একভাবে ক্লিয়ার করা হইছে যে, আমাদের বিবেচনায় যেগুলি আরো বেশি রিডারের মাঝে ছড়ানো দরকার এবং আর্কাইভিং ভ্যালু আছে সেগুলিই রাখা হবে এই ক্যাটেগরিতে। যে লেখাগুলিকে অমন মনে হবে তার সবগুলি ছাপাইতে পারবো না মে বি; এখানে আমাদের চোখে পড়া বা আওতা এবং রাইটারের পারমিশন–এইসব ইস্যু আছে; ইস্যুগুলি উতরাইয়া যেইটার বেলায় পারবো সেগুলিই ছাপাতে পারবো মাত্র।--বা.বি.
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য