Main menu

তর্ক: চমস্কি এবং ফুকো (পার্ট টু)

প্রথম পার্টে চমস্কি’র পরিচয় প্রচার করা হইছিল। এই পার্টের আলাপ ফুকো’রে নিয়া।

__________________________________

 

তিন

মিশেল ফুকো (১৯২৬ – ১৯৮৪) কাঠামোবাদ ও উত্তরকাঠামোবাদের সাথে জড়িত ফরাসি দার্শনিক ও ইতিহাসবিদ। ১৯৬৯ সালে ফ্রান্সের সবচে সম্মানিত কলেজ ডি ফ্রান্সে ‘হিস্ট্রি অব সিস্টেম অব থট’ এর প্রফেসর নির্বাচিত হওয়ার পূর্বেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে বিদ্যাজগতে ফুকো নিজের আসন পাকা করে নিয়েছিলেন। সত্তরের দশকের শুরু থেকে ফুকোর রাজনৈতিক সক্রিয়তা বেড়ে যায়। তিনি কয়েদীদের অধিকার আদায়ের জন্য একটা সংগঠন গড়ে তোলেন এবং সমকামী ও অন্যান্য প্রান্তীক গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ হয়ে নিয়মিত প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। এই সময়েই তিনি এইডস আক্রান্ত হন এবং ১৯৮৪ সালের জুন মাসে অকালমৃত্যু বরণ করেন।

প্রাদেশিক একটা প্রভাবশালী পরিবারে পল মিশেল ফুকোর জন্ম। শল্যচিকিৎসক বাবা পল ফুকো চেয়েছিলেন মিশেল বড় হয়ে তার পেশা গ্রহণ করবেন, কিন্তু ফুকো হয়ে উঠলেন দর্শন-জগতের বাসিন্দা। খ্যাতিমান ইকোল নর্মাল সুপিরিয়র-এ ১৯৪৬ সালে ভর্তি হবার আগ পর্যন্ত ফুকোর শিক্ষাজীবন বিশেষ উজ্জ্বল ছিল না। ইকোল নর্মালে পড়ার সময় তিনি এতোটাই বিষন্নতায় ভুগতেন যে একবার আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করেছিলেন। তখন তাকে একজন মনঃচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সম্ভবত এসময় থেকেই তিনি মনস্তত্ত্বে বিশেষভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তাই, ইকোল নর্মাল সুপিরিয়র থেকে দর্শনে ডিগ্রি অর্জনের সাথে সাথে তিনি, ফ্রান্সে তখন পর্যন্ত নতুন জ্ঞানকান্ড, মনস্তত্ত্বেও একটা ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। শিক্ষা-উপদেষ্টা কাঠামোবাদী মার্কসবাদী লুই আলথুসারের পরামর্শে ফুকো ১৯৫০ সালে ফরাসী কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু অচিরেই ১৯৫৩ সালে তিনি দল ত্যাগ করেন; বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়নে স্ট্যালিনের স্বৈরতান্ত্রিক নীতির কারণে তার মোহভঙ্গ হয়। এরপর ১৯৬৮ সালের আগে আর তার মধ্যে রাজনৈতিক সক্রিয়তা দেখা যায়নি। এসময়টা ছিল অস্তিত্ববাদী ফেনমনলজির স্বর্ণযুগ। মার্কসবাদ ও ফেনমেনলজির প্রবক্তা দার্শনিক মোরিস মার্লু-পন্টি ও মার্টিন হাইডেগার-এর প্রবল প্রভাব ছিল উঠতি বুদ্ধিজীবীদের ওপর। আলথুসার ও মার্লু-পন্টি সরাসরি ফুকোর শিক্ষক ছিলেন। সেকারণেই সম্ভবত ফুকোর প্রথম দু’একটি লেখাতে অস্তিত্ববাদ ও মার্কসবাদের প্রবল প্রভাব লক্ষ করা যায়। অবশ্য অচিরেই তিনি দর্শনের এই দুটো ধারা থেকে চূড়ান্তভাবে মুখ ফিরিয়ে নেন। তৎকালীন প্যারিসের সবচে প্রতাপশালী অস্তিত্ববাদী দার্শনিক জাঁ পল সার্ত্রর প্রভাবও ফুকো এড়িয়ে যান। যদিও, সার্ত্রর মতো করেই মিশেল ফুকো বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন শুরু করেছিলেন বুর্জোয়া সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি ক্লান্তিহীন তীব্র ঘৃণা এবং বুর্জোয়া সমাজের প্রান্তবাসী শিল্পী, সমকামী, কয়েদী প্রভৃতি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি স্বতস্ফুর্ত সহমর্মিতা প্রকাশের মাধ্যমে। সাহিত্য, মনঃস্তত্ত্ব ও দর্শনের প্রতি দু’জনের আগ্রহ ছিল একই রকমের এবং সক্রিয় রাজনীতিতে সাময়িক নিষ্ক্রিয়তা সত্ত্বেও শেষ জীবনে তারা প্রবল এ্যক্টিভিস্ট হয়ে ওঠেন। কিন্তু দার্শনিকভাবে ফুকো শেষপর্যন্ত সার্ত্রর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নেন। ফুকো সার্ত্রর কর্তাকেন্দ্রীকতাকে (subject) প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি সার্ত্রর ব্যক্তিনির্ভর অস্তিত্ববাদকে ‘অতিলৌকিক আত্মরতি’ (transcendental narcissism) বলে উপহাস করতেন।

অবশ্য ফরাসী বিজ্ঞানের ইতিহাস ও দর্শনধারার কিছু ইতিবাচক প্রভাব ফুকোর ওপর আজীবনের মতো ছাপ রেখে যায়। বিশেষত, প্রাণীবিদ্যার দর্শন ও ইতিহাস নিয়ে জর্জ ক্যাঙ্গুইলহাম-এর কাজগুলো পরবর্তীকালে ফুকোর বেশিরভাগ কাজের ক্ষেত্রে মডেল হিসেবে ভুমিকা পালন করে। বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে কাঙ্গুইলহামের দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে ‘ধারণা’র (concepts) ঐতিহাসিক ভুমিকা সম্পর্কে ‘যুক্তিবাদী’ উপলব্ধি তাকে অতিলৌকিক চৈতন্য ধারণার বিপরীতে অবস্থান নিতে সহায়তা করে। সেইসাথে ফার্দিনান্দ ডি. সসিউরের কাঠামোবাদী ভাষাতত্ত্ব ও জাঁ জ্যাঁক লাকার মনঃসমীক্ষণের দৃষ্টিভঙ্গি ফুকোর ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বা কর্তাবিরোধী অবস্থান এবং তার ব্যবহৃত প্রত্মানুসন্ধান ও উৎপত্তিসন্ধান পদ্ধতির জন্য শক্তিশালী প্রেক্ষাপট হিসেবে কাজ করে।

 

দার্শনিক অবস্থান

গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসের সময় থেকেই চলমান সমাজের স্বীকৃত জ্ঞানকে প্রশ্ন করা দর্শনের একটা অনন্য বৈশিষ্ট্য হয়ে আছে। তবে আধুনিক কালে জ্ঞানের সমালোচন হিসেবে দর্শনকে ধারণায়িত করার কৃতিত্ব জন লক, ডেভিড হিউম এবং বিশেষত ইমানুয়েল কান্ট-এর। কান্টের অনন্য জ্ঞানতাত্ত্বিক (epistemological) প্রস্তাবনা হলো, যে সমালোচনা আমাদের জানার ক্ষমতার সীমা চিহ্নিত করে সেই একই সমালোচন ক্ষমতা চর্চায় আবশ্যক শর্তগুলোকেও উন্মোচিত করতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে যেটাকে কেবলই মানব-প্রজ্ঞার (human cognition) সম্ভাব্য বৈশিষ্ট্য বলে মনে হয় (যেমন কোনো বিষয় বা বস্তুর পরিসর ও সময়গত ধারণা) তা শেষ পর্যন্ত সমাজের কাছে আবশ্যক সত্য বলেও প্রতীয়মান হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু, ফুকো কান্টের এই প্রস্তাবনাকে উল্টো দিক থেকে বিবেচনা করার প্রয়োজনের কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রশ্ন ওঠানো দরকার সমাজে যা কিছু আবশ্যক সত্য (জ্ঞান) হিসেবে স্বীকৃত তা কীভাবে মানব-প্রজ্ঞার সাথে সংযুক্ত হয়। এজন্যই মূলত তার প্রশ্নের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে মানববিজ্ঞানসমূহ (জীববৈজ্ঞানিক-মনস্তাত্বিক-সামাজিক)। তার মতে, এসকল বিজ্ঞান মানবপ্রকৃতি সম্পর্কে সর্বজনীন বৈজ্ঞানিক সত্য বলে যেসব দাবী হাজির করে তা বস্তুত সমাজবিশেষের নৈতিক ও রাজনৈতিক সংকল্পের প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। এই দাবীগুলো যে প্রকৃতপক্ষে ঐতিহাসিক শক্তিসমূহের সম্পর্কের ফসল বৈজ্ঞানিক ভিত্তিসম্পন্ন সত্য নয় সেটা প্রদর্শনের মাধ্যমে ফুকোর ‘ক্রিটিক্যাল ফিলসফি’ এধরনের দাবীর অন্তঃসারশূন্যতা প্রতিপন্ন করে।

বিপুল অধ্যাবসায়সহ ফুকো ডিসকার্সিভ সিস্টেম (৪নং টীকা দেখুন) হিসেবে প্রাণ, শ্রম ও ভাষার বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকান্ডগুলোকে অধ্যয়ন করেছেন। এই জ্ঞানকান্ডগুলো যেসব সত্য আবিষ্কার করেছে বা যেসব প্রকল্প মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে চেয়েছে তা খতিয়ে দেখা তার লক্ষ্য নয়। বরং, জ্ঞানকান্ড হিসেবে এগুলোর কার্যকর ক্রিয়াশীলতার প্রশ্নটি তার অনুসন্ধানের লক্ষ্যবস্তু: কীভাবে এবং কোনসব ধারণাকে কেন্দ্র করে এসব জ্ঞানকান্ড গড়ে উঠেছে, কীভাবে এগুলো ব্যবহৃত হয়েছে ও বিকশিত হয়েছে। অর্থাৎ তার কাছে প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়, মানববিজ্ঞানসমূহ গড়ে ওঠার ঐতিহাসিক শর্তসমূহ এবং তাদের টিকে থাকার শর্তসমূহ। ফ্রিডরিখ নিৎসেও অবশ্য তার জিনিওলজি অব মরালস গ্রন্থে সমরূপ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। তবে ফুকোর আগে অন্য কেউই এতোটা প্রণালীবদ্ধভাবে অনুসন্ধান করেননি। হিস্ট্রি অব সেক্সুয়ালিটি (১৯৬৭) গ্রন্থ প্রকাশের সময় ফুকো ভূমিকা হিসেবে নিজের কাজের সার্বিক পর্যালোচনামূলক একটা ভূমিকা লিখেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে ফরাসী ভাষায় প্রকাশিত ‘ডিকশনারী অব ফিলসফি’তে ফুকো ভুক্তির জন্য তিনি ‘মরিস ফ্লোরেন্স’ ছদ্মনামে লেখাটি প্রেরণ করেন। সেখানে বলা হয়: দার্শনিক ধারার সাথে ফুকোর সম্পৃক্ততা বিচার করলে বলা চলে তিনি কান্টের ক্রিটিক্যাল ধারার অনুসারী। তার প্রকল্পকে বলা যায় ‘ক্রিটিক্যাল হিস্ট্রি অব থট’। চিন্তনরীতি (thought) মানে যদি এমন এক ক্রিয়াকে বুঝানো হয় যেখানে একজন কর্তা ও অনুসন্ধানবস্তু/বিষয় (object) তাদের সকল সম্পর্কসমেত নির্দেশিত হবে তাহলে বলা যায় ‘ক্রিটিক্যাল হিস্ট্রি অব থট’ এর কাজ হলো কর্তা ও অনুসন্ধানবস্তুর মধ্যে যেসব শর্তসাপেক্ষে সম্পর্ক গড়ে ওঠে ও পরিবর্তিত হয় জ্ঞানের বিষয়বস্তু হিসেবে সেই শর্তগুলোকে বিশ্লেষণ করা। এখানে, অনুসন্ধানবস্তুর সাথে কর্তার সম্পর্কের কাঠামোগত শর্তগুলো নির্ধারণের প্রশ্ন নয়; কিংবা কোনো বিষয়ের সাথে, বিশেষ কোনো সময়ে, যেসব বাস্তব শর্ত সাধারণভাবে কর্তাকে পরিচিত হয়ে উঠতে সাহায্য করে সেগুলো চিহ্নিত করার প্রশ্নও নয়। বিভিন্ন ধরনের জ্ঞানের ‘বৈধ্য কর্তা’ হয়ে ওঠার লক্ষ্য হাসিল করতে গিয়ে কর্তা অতিঅবশ্যই কী হবেন, কোন্ শর্তসাপেক্ষে তিনি কর্তা হয়ে ওঠেন, কোন্ মর্যাদা তিনি অবশ্যই আয়ত্ত করেন এবং বাস্তবের বা কল্পজগতের কোন্ অবস্থান তিনি দখল করেন সেটাই এখানে বিচার্য বিষয়। সংক্ষেপে বলা যায়, ‘কর্তাকরণের’ পদ্ধতিগুলো নির্ণয় করাই এর কাজ। মূলত এই পদ্ধতিগুলোর সুবাদেই তার জ্ঞান ধর্মীয় কোনো টেক্সট বা প্রাকৃতিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণ বা মানসিক রোগীর আচরণ বিশ্লেষণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্যাখ্যাকারের ভূমিকা গ্রহণ করে। একইসাথে, কোন্ সব শর্তাধীনে কোনোকিছু সম্ভাব্য জ্ঞানের অনুসন্ধানবস্তু হয়ে ওঠে, আমাদের কাছে জানার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয় এবং বিশেষ বিশেষ কর্মপ্রণালীর অধীনস্ত হয় তাও এখানে নির্ধারণ করতে হয়। সুতরাং, ‘অনুসন্ধানবস্তু/বিষয়করণের’ পদ্ধতিগুলোও (mode of objectivation) বিচার্য হয়ে ওঠে ।

কর্তাকরণ ও বস্তুকরণের পদ্ধতিগুলো স্বনির্ভর নয়। তাদের পারস্পরিক বিকাশ ও আন্তনির্ভরশীলতার সূত্র ধরেই মূলত ‘সত্যতার খেল’ সক্রিয় হয়ে ওঠে – কোনো বিষয় সম্পর্কে ব্যক্তি যাকিছু বলেন তা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে সত্যত্ব ও মিথ্যাত্ব নির্ধারণী কিছু বিধানের ওপর। হিস্ট্রি অব থট, সংক্ষেপে বলা যায়, সত্য উদ্ধার বা সত্য গোপন করার ইতিহাস রচনা করে না; এটা এমন এক ইতিহাস যা বিশেষ কোনো পরিসরের বস্তু বা বিষয় সম্পর্কে কোনো ডিসকোর্স যে-সব কারণে সত্য বা মিথ্যা হিসেবে গণ্য হয় তা উদ্ধার করে।

 

ব্যক্তিকে কর্তাকরণ ও অনুসন্ধানবস্তুকরণ

মৃত্যুর দুইবছর আগে নিজের কাজের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে যেয়ে ফুকো দ্যা সাবজেক্ট এন্ড পাওয়ার (১৯৮২) লেখাটিতে বলেছিলেন, “ক্ষমতার প্রসঙ্গ বিশ্লেষণ করা বা ওই ধরনের বিশ্লেষণের ভিত্তিভূমি রচনা করা নয় বরং গত বিশ বছর ধরে আমার কাজের লক্ষ্য ছিল, আমাদের সংস্কৃতিতে মানবসত্তাকে যে-সব পদ্ধতিপ্রকরণে কর্তা বানানো হয়েছে তার ইতিহাস রচনা করা”। এখানে পাঠককে স্মরণ রাখতে বলি, কর্তাকরণের প্রশ্নটি বিচার করতে গেলে অনিবার্যভাবেই অনুসঙ্গ হিসেবে জ্ঞান/ক্ষমতা ধারণাটি বিশ্লেষণও আবশ্যক হয়ে পড়ে।

পল র‌্যাবিনো দ্য ফুকো রিডার (১৯৮২) সংকলন-গ্রন্থের4222388153556988996.400_600r ভূমিকা অংশে এ-প্রসঙ্গে বলেন, কর্তাকে অনুসন্ধানবস্তু করে তোলার তিন ধরনের পদ্ধতি সম্পর্কে ফুকোর রূপরেখা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করলে তার কাজের প্রধান বিষয়বস্তু সংক্ষেপে তুলে ধরা সহজ হতে পারে। ফুকোর বিচারে, কর্তাকে অনুসন্ধানবস্তু করে তোলার প্রথম ধরনের পদ্ধতি হলো ‘বিভাজনের চর্চা’ (dividing practices)। তার কাজগুলোতে বিভাজন-চর্চার বিখ্যাত উদাহরণের মধ্যে আছে মধ্যযুগের বিভিন্ন সময়ে কুষ্ঠরোগীদেরকে পৃথক করার ঘটনা; ১৬৫৬ সালে প্যারিসে হসপিটাল জেনারেল কর্তৃক দরিদ্র, পাগল এবং ভবঘুরেদেরকে আটকে রাখার ঘটনা; ফ্রান্সে উনিশ শতকের শুরুতে রোগসমূহের নতুন শ্রেণীকরণ ও ক্লিনিকনির্ভর নিদানব্যবস্থা (clinical medicine) গড়ে ওঠার ঘটনা; আধুনিক মনঃচিকিৎসাবিদ্যার উদ্ভব এবং উনিশ ও বিশশতকজুড়ে হাসপাতাল, কারাগার ও ক্লিনিকগুলোতে মনঃচিকিৎসা চর্চার সূত্রপাতের ঘটনা; এবং আধুনিক ইউরোপে যৌন-অস্বাভাবিকতাকে চিকিৎসাধীনস্ত করা, কলঙ্কচিহ্নিত (stigmatization) করা ও স্বাভাবিকীকরণের ঘটনা।

সাবজেক্ট এন্ড পাওয়ার প্রবন্ধে ফুকো বলেন, বিভিন্নরকম কায়দায়, নানান পদ্ধতিপ্রকরণ ব্যবহার করে এবং প্রতি ক্ষেত্রে বিশেষ রকমের দক্ষতায় বিভাজন প্রক্রিয়ার সাহায্যে আভ্যন্তরীণভাবে বা অন্যদের থেকে আলাদা করার মাধ্যমে ব্যক্তিকে/কর্তাকে অনুসন্ধানবস্তু করে তোলা হয়। সামাজিক অনুসন্ধানবস্তুকরণ ও বর্গীকরণের এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানবসত্তাকে যেমন একটা সামাজিক পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয় তেমনই একটা ব্যক্তিক পরিচয়ও তার দেওয়া হয়। মূলত, ‘বিভাজনের চর্চা’ হলো নিয়ন্ত্রণের কৌশলবিশেষ যা স্বার্থোদ্ধারে সমন্বিতভাবে বিজ্ঞান (বা ছদ্ম বিজ্ঞান) ও বর্জন-প্রথাগুলোর মধ্যস্ততার আশ্রয় নেয়। ফুকোর প্রথমদিকের গ্রন্থগুলো যেমন ম্যাডনেস এন্ড সিভিলাইজেশন ও দ্য বার্থ অব দ্য ক্লিনিক এবং সেইসাথে ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ গ্রন্থেও বিষয়বস্তু হিসেবে বড় একটা অংশজুড়ে আছে বিভাজন-চর্চাসমূহের বিশ্লেষণ। প্রথমে নির্বিশেষে সকল জনগণের মধ্য থেকে (যেমন সতেরো শতকে প্যারিসে ভবঘুরেদেরকে আলাদা করার ঘটনা) এবং পরে পরিকল্পিতভাবে পূর্বনির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে (যেমন শ্রমজীবীদের মধ্য থেকে দুষ্কৃতীদেরকে) আলাদা করে ব্যক্তিকে অনুসন্ধানবস্তুকরণের ইতিহাস এখানে আলোচ্য বিষয়।

ব্যক্তি/কর্তাকে অনুসন্ধান-বস্তু বা বিষয় করে তোলার দ্বিতীয় পদ্ধতিটিকে ‘বৈজ্ঞানিক শ্রেণীকরণ’ বলা যায়। প্রথম পদ্ধতিটি থেকে এটি স্বতন্ত্র তবে সম্পর্কিত। এই পদ্ধতির উৎপত্তি ঘটে বিজ্ঞানের মর্যাদা দাবীকারী অনুসন্ধান ধারাগুলোর বিকাশের সুবাদে। যেমন তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বা ভাষাবিজ্ঞানে বাকসম্পন্ন কর্তাকে অনুসন্ধান-বস্তু করে তোলা, কিংবা সম্পদ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উৎপাদক ও শ্রমশীল ব্যক্তিদেরকে অনুসন্ধানবস্তুকরণ, কিংবা প্রাকৃতিক ইতিহাস বা প্রাণীবিদ্যায় প্রাণসম্পন্নতার ভিত্তিতে অনুসন্ধানবস্তুকরণ। ফুকোর সবচে বিতর্কিত কিন্তু একইসাথে সবচে গ্রহণযোগ্য গ্রন্থ অর্ডার অব থিংস এর বিষয়বস্তু হিসেবে আছে এসব শ্রেণীকরণের জ্ঞানকান্ডগুলো। কীভাবে প্রাণ, শ্রম ও ভাষার ডিসকোর্সগুলো এক একটি স্বতন্ত্র জ্ঞানকান্ডরূপে গড়ে উঠেছে, ক্রমান্বয়ে অভ্যন্তরীণ সাতন্ত্র্য ও স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে, এবং কখনো কখনো আকস্মিকভাবে রূপান্তরিত হয়েছে সেটা ফুকো এই গ্রন্থে দেখিয়েছেন।

ফুকো সবসময়ই বিচার করতে আগ্রহী হয়েছেন কীভাবে মানব-শরীর ও তার সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক সম্পর্কের জালে আবদ্ধ হয়। প্রথম ধরনের অনুসন্ধানবস্তুকরণ (বিভাজনের চর্চা) প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিকে বস্তুকরণের বা নিয়ন্ত্রুণ ব্যবস্থার বলি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে –  যেমন কয়েদি ও মানসিক রোগীরা। এর সমান্তরালে দ্বিতীয় প্রকারের অনুসন্ধানবস্তুকরণে ব্যক্তির ওপর কর্তৃত্ব অনেকটা পরোক্ষভাবে চর্চিত হয়। যেমন উনিশ শতকে চিকিৎসাশাস্ত্রে মানবদেহকে বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়। তৃতীয় ধরনের অনুসন্ধানবস্তুকরণের নাম দেয়া যায় ‘কর্তাকরণ’। এটা এমন এক পদ্ধতি যার মাধ্যমে মানুষ স্বয়ং নিজেকে কর্তা বানিয়ে তোলে। এই প্রক্রিয়াটি পূর্ববর্ণিত পদ্ধতি দুটো থেকে গুণগতভাবে স্বতন্ত্র। এক্ষেত্রে ফুকোর অবদান অত্যন্ত মৌলিক। বিভাজনের চর্চাসমূহ মূলত আধিপত্যের কৌশলবিশেষ এবং প্রধানত ভবঘুরে, শ্রমজীবী ও অন্যান্য প্রান্তীক শ্রেণীগুলোর ওপর এটা প্রয়োগ করা হয়। আধিপত্যের কৌশল এবং বিভিন্ন প্রকারের সামাজিক-বৈজ্ঞানিক শ্রেণীকরণকারী জ্ঞানকান্ডগুলোর আন্তক্রিয়াশীলতার কথা ফুকোর আগেও অন্যান্য চিন্তকরা বলেছেন। এই দুটো পদ্ধতিতেই ব্যক্তি মূলত অক্রিয় এবং অধীন অবস্থানে থেকে বস্তুকরণের শিকার হয়। কিন্তু অন্যদিকে ‘কর্তাকরণ’ পদ্ধতিতে ফুকো সেইসব কৌশলের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন যেখানে ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে আত্ম-নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।

 

প্রত্মানুসন্ধান ও উৎপত্তিসন্ধান পদ্ধতি

ফুকো তার যাবতীয় অনুসন্ধান চালিয়েছেন এই দুটো পদ্ধতিতে। প্রত্মানুসন্ধান (archeology) হলো কোনো ডিসকোর্সের স্বীকৃত বক্তব্য ও বিবৃতিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণের (syncronic) পদ্ধতি। এর কেন্দ্রীয় প্রস্তাবনা হলো: প্রতিটি চিন্তা-ধারা ও জ্ঞানব্যবস্থা (এপিস্টিম বা ফুকোর ভাষায় ডিসকার্সিভ ফর্মেশন), ব্যাকরণ ও যুক্তিবাদী নিয়মের বাইরেও, বিশেষ বিশেষ বিধান দ্বারা শাসিত হয়। এই বিধানগুলো ব্যক্তি/কর্তার চৈতন্যের তলদেশে ক্রিয়াশীল থাকে এবং বিশেষ বিশেষ পরিসরের ও সময়ের চিন্তাধারার সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। অর্থাৎ, প্রতিটি ডিসকোর্সেরই বিশেষ রকমের ‘গঠন-রীতি’ (rules of formation) থাকে যা কী বলা যাবে বা না যাবে তার প্রকৃতি নির্ধারণ করে দেয় ও সীমানা টেনে দেয়। এই গঠন-রীতিগুলো লেখকের বা বক্তার আয়ত্বে থাকে না, কিন্তু তার লেখা টেক্সট বা বক্তব্যের গভীরে অনিবার্যভাবে সক্রিয় থাকে। প্রত্মানুসন্ধান পদ্ধতিকে অনেকটা কাঠামোবাদী বিশ্লেষণ ভাবা যেতে পারে যা টেক্সটের অভ্যন্তরীণ অসঙ্গতিগুলো উদ্ধার করে। যেমন প্রথমদিকের হিস্ট্রি অব ম্যাডনেস গ্রন্থ সম্পর্কে ফুকোর বক্তব্য হলো, এটা পাঠ করতে হবে একেবারে ভিন্ন রকমের ডিসকার্সিভ ফর্মেশন উদ্ধারের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা হিসেবে, যা সপ্তদশ থেকে উনবিংশ শতক পর্যন্ত পাগলত্ব সম্পর্কে আলাপআলোচনা ও চিন্তাভাবনার প্রকৃতি নির্ধারণ করে দিয়েছিল।

প্রত্মানুসন্ধান পদ্ধতির বিশ্লেষণ ক্ষমতা ভিন্ন ভিন্ন সময়ের ভিন্ন ভিন্ন ডিসকার্সিভ ফর্মেশন-এর পারস্পরিক তুলনা করার মধ্যেই সীমিত। শুধুমাত্র প্রত্মানুসন্ধান পদ্ধতি ব্যবহার করে এক ধরনের চিন্তাধারা থেকে অন্য ধরনের চিন্তাধারায় উত্তরণের কারণসমূহ শনাক্ত করা যায় না।

এই সীমাবদ্ধতা কটিয়ে উঠে সামাজিক চর্চাসমূহ ও ক্ষমতার প্রশ্নটি বিচার করতে যেয়ে ফুকো পরবর্তীতে উৎপত্তিসন্ধান পদ্ধতি (genealogy) গড়ে তোলেন। এটা ঐতিহাসিক বিকাশ অনুসন্ধানের একটা কৌশল যা ডিসকোর্সগুলোর উৎপত্তি ও বিকাশ বিচার করে দেখিয়ে দেয় যে সেগুলোর শেকড় আসলে বিভিন্ন সামাজিক শক্তির আন্তক্রিয়ার মধ্যে নিহিত, কোনোকিছুই সর্বজনীন বা ইতিহাসোর্ধ নয়। ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ গ্রন্থে ফুকো এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।

প্রত্মানুসন্ধান ও উৎপত্তিসন্ধান পদ্ধতি দুটো সামাজিক চর্চাসমূহ ও ডিসকোর্সের আন্তক্রিয়া অনুসন্ধানে ফুকোর জন্য শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

ফুকো’র ওপর একটা ডকুমেন্টারি

 

ক্ষমতা/জ্ঞান

ব্যক্তি/কর্তাকে অনুসন্ধানবস্তুকরণের তিনটি ধরন (অর্থাৎ, যেগুলোর মাধ্যমে বর্গ করা, ভাগ-বণ্টন ও স্বার্থোদ্ধারে অপরদেরকে পরিচালনা করা হয়; যে-জ্ঞানকান্ডগুলোর মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝতে শিখি; এবং যে-কৌশলগুলো ব্যবহার করে আমরা নিজেদেরকে অর্থপূর্ণ সত্তা হিসেবে গড়ে তুলি) ফুকোর অনুসন্ধানের কেন্দ্রীয় পরিসর। যদিও কর্তাকে অনুসন্ধানবস্তুকরণ ফুকোর জিজ্ঞাসার কেন্দ্রীয় পরিসর, এরূপ জিজ্ঞাসার উত্তর সন্ধানের জন্য তিনি কিছু সম্পূরক ধারণা ও প্রসঙ্গ সামনে নিয়ে এসেছেন। কর্তার প্রশ্নটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে ক্ষমতা/জ্ঞান ধারণাযুগল।

ফুকো একদিকে অনুসন্ধান করেছেন পাশ্চাত্যের সমাজে কীভাবে বিভিন্ন ধরনের কর্তা তৈরী হয়েছে, তেমনই ক্ষমতার প্রসঙ্গটিও তিনি নতুনভাবে ধারণায়িত করেছেন। সাবজেক্ট এন্ড পাওয়ার প্রবন্ধটিতে তিনি বলেন, ‘ষোড়শ শতক থেকে এক নতুন ধরনের রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলেছে। সকলেই জানেন, এই নতুন রাজনৈতিক কাঠামো হলো রাষ্ট্রব্যবস্থা। তবে অধিকাংশ সময় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এমন এক ক্ষমতাতন্ত্র ভাবা হয়েছে যা কিনা ব্যক্তিক বিষয়াদি উপেক্ষা করে এবং মূলত সামগ্রীক স্বার্থের দিকে নজর দেয়, কিংবা বলা চলে বিশেষ কোনো শ্রেণী বা নাগরিকদের ভিতর থেকে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ দেখে। এমন ভাবাটা অযথার্থ বলবো না, কিন্তু আমি যে বিষয়টার ওপর জোর দিতে চাই তা হলো রাষ্ট্রের ক্ষমতা আসলে একইসাথে ব্যক্তিকীকরণবাদী (individualizing) ও সমগ্রতাকরণবাদী (totalizing) ধরনের। মানবজাতির ইতিহাসে – এমনকি প্রাচীনতম চীনা সমাজেও – একই রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে এরূপ ব্যক্তিকীকরণ কৌশলসমূহ ও সমগ্রতাকরণ পদ্ধতিগুলোর চতুর সমন্বয় আগে কখনো দেখা যায়নি’।

কর্তাকে অনুসন্ধানবস্তুকরণ প্রসঙ্গে ‘ব্যক্তিকীকরণ কৌশলগুলো’ সম্পর্কে পূর্বেই আলাপ করেছি, এখন ‘সমগ্রতাকরণ পদ্ধতিগুলো’ বুঝে নিতে চেষ্টা করি। এক কথায় বললে, সমগ্রতাকরণ কৌশলগুলো প্রায় সকল ধরনের মানব-কর্মকান্ডের ওপর প্রশাসনিকতার বিস্তৃতি ঘটায়। মূলত, ষোড়শ শতক থেকেই উত্তম রাষ্ট্রব্যবস্থা বলতে জনসম্পদ-ব্যবস্থাপনা ও পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী ব্যবস্থাপনা ও খুঁটিনাটি মনোযোগ দেওয়াকে বুঝানো হতে থাকে। ফলে, রাষ্ট্রের শীর্ষপর্যায় থেকে শুরু করে সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী পরিকল্পনা ও প্রশাসনিকতার বিস্তৃতি ঘটে। সমাজ রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে।

জনগণের তত্ত্বাবধান, লালনপালন ও উন্নতি রাষ্ট্রের প্রধান বিবেচনার বিষয় হয়ে ওঠার সূত্র ধরে এক নতুন শাসনক্ষমতা কায়েম হয়। ফুকো এটাকে আখ্যায়িত করেন ‘প্রাণ-ক্ষমতা’ (‘bio-power’)। ফুকো এ-প্রসঙ্গে বলেন, প্রাণ-ক্ষমতা মানবজীবন ও তার যাপনরীতিকে প্রকাশ্য হিসেবনিকেশের আওতায় টেনে আনে এবং জ্ঞান/ক্ষমতাকে মানবজীবন পরিবর্তনের এজেন্ট বানিয়ে তোলে। প্রাণ-ক্ষমতা চর্চার একপ্রান্তে, প্রজাতী হিসেবে মানব-অধ্যয়নের জ্ঞানকান্ডগুলো নিয়মিত ও অব্যাহতভাবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের শিকার হয়। অন্যপ্রান্তে, মানবশরীরকে (জৈবিকভাবে নয়) অনুশাসন কলাকৌশলের (Disciplinary technologies) অধীনস্ত করে তোলা হয়; যাতে তাকে অধীনস্ত করা যায়, রূপান্তর করা যায়, এবং বিকশিত করা যায়।

ফুকোর বিশ্লেষণ থেকে এই রাজনৈতিক ক্ষমতার তিনটি পৃথক মাত্রা বেরিয়ে আসে: সার্বভৌমত্ব, অনুশাসন (discipline), এবং প্রশাসনিকতা (Governmentality)।

সার্বভৌমত্ব হলো সনাতন রাষ্ট্রক্ষমতা, যার এক বা একাধিক নির্দিষ্ট কেন্দ্র থাকে, যার প্রতিভু রাজা অথবা আইনানুগভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো রাষ্ট্রপ্রধান। এই সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করা হয় কোনো নির্দিষ্ট ভূখন্ডের ওপর অথবা নির্দিষ্ট প্রজামন্ডলীর ওপর। সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকাশ ঘটে আইন প্রণয়ন, সেই আইনের প্রয়োগ, আইন লঙ্ঘিত হলে লঙ্ঘনকারীকে শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে। এই অর্থে সার্বভৌমত্বের আরেক নাম দন্ড। রাষ্ট্রক্ষমতা বলতে সাধারণভাবে সার্বভৌম ক্ষমতার কথাই আমাদের মনে হয়। আধুনিক রাষ্ট্রে বহুক্ষেত্রে রাজাবাদশা না থাকলেও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতিভূ হিসেবে রাষ্ট্রপতি কিংবা রাষ্ট্রীয় পরিষদকে নির্দিষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়ে থাকে।

কিন্তু আধুনিক সমাজে ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্রক্ষমতায় সীমিত নয়। ফুকোর বক্তব্য হলো, আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্র আদৌ সার্বভৌমত্বের ছক মেনে চলে না, চলে অনুশাসন বা ডিসিপ্লিনের ছকে। এই বিষয়টি সবিস্তারে আলোচিত হয়েছে ফুকোর ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ গ্রন্থে। ফুকো আলোচনা শুরু করেছেন অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্সে এক মৃত্যুদন্ডের বর্ণনা দিয়ে। যতোভাবে পারা যায় আসামীর দেহকে ক্ষতবিক্ষত, খন্ডবিখন্ড করে শাস্তি দেওয়ার বিভৎস এক বর্ণনা। সেখানে দন্ডের অর্থ আইনবিরুদ্ধ হিংসার জবাব হিসেবে দৃষ্টান্তমূলক প্রতিহিংসা, যা ঘটবে লোকচক্ষুর সামনে বিশাল জনসমাবেশে, যাতে সকলে দেখতে পায় রাজার কতো ক্ষমতা, তার সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করলে কী ভয়ানক শাস্তি পেতে হয় অপরাধীকে। এই ধরনের দন্ডব্যবস্থা কিন্তু পরবর্তী শতকে সম্পূর্ণ বদলে গেল। এরকম শাস্তি অমানবিক, নিষ্ঠুর বলে গণ্য হলো। এবং সংস্কারের দাবী উঠলো: শাস্তির লক্ষ্য হওয়া উচিত শারীরিক নির্যাতন নয় বরং দোষীকে নজরবন্দী করে তাকে সামাজিক অনুশাসনে শিক্ষিত করে তোলা। আলোকায়ন বা রেনেসার সংস্কারগুলোর ইতিবাচক ফলাফল অস্বীকার না করে ফুকো বরং বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন যে এরূপ সংস্কার আবার অধিকতর কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কায়েমেরও সুযোগ করে দেয়। তিনি আরও দাবী করেন, দন্ডদানের এই নতুন পদ্ধতি সমাজের সকল ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের মডেল হয়ে ওঠে; কারখানা, হাসপাতাল, বিদ্যালয় গড়ে তোলা হয় আধুনিক কারাগার-ব্যবস্থার অদলে।

ফুকোর আধুনিক ‘অনুশাসনতান্ত্রিক’ সমাজে তিনটি মৌলিক নিয়ন্ত্রণকৌশল আছে: ক্রমতান্ত্রিক নজরদারি, মূল্যায়ন-ব্যবস্থার স্বাভাবিকীকরণ, এবং পরীক্ষণ। কেবলমাত্র নজরদারির মাধমেই জনগণের ওপর অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ (ক্ষমতা) কায়েম করা যায়। যেমন ফুকো দেখান, স্টেডিয়ামের থাকবদ্ধ আসনবিন্যাস দর্শকদেরকে কেবল দেখার সুবিধাই করে দেয় না, প্রহরী ও নিরাপত্তা ক্যামেরা দ্বারা অডিয়েন্সের ওপর নজর রাখার সুবিধাও করে দেয়। একটা নিখুঁত পর্যবেক্ষণ-ব্যবস্থা একজনমাত্র ‘প্রহরী’ দ্বারাই সকলের ওপর নজরদারির সুযোগ তৈরি করে। যেহেতু এমন নিখুঁত ব্যবস্থা কায়েম করা দুরূহ, তাই নজরদারির জন্য সমাজে ক্রমতান্ত্রিক রিলে-ব্যবস্থা থাকে যার মাধ্যমে তৃণমূল থেকে শীর্ষপর্যায়ে পর্যবেক্ষণের তথ্য পৌঁছে যায়। মূল্যায়ন-ব্যবস্থার স্বাভাবিকীকরণ মানে, জনসাধারণকে সমাজের প্রচলিত মান ও রীতিনীতি মেনে চলতে শেখানো। সাধারণত অসঙ্গত আচরণকারীদেরকে ‘শুদ্ধ’ করার জন্য এর প্রয়োগ ঘটে। জনগণকে অনুশাসনবদ্ধ করা হয় তাদের ওপর সুনির্দিষ্ট মানদন্ড আরোপ করে। আর, পরীক্ষণ (যেমন স্কুলে শিক্ষার্থীকে, হাসপাতালে রোগীকে) নামের নিয়ন্ত্রণকৌশলটি ক্রমতান্ত্রিক নজরদারির সাথে মান-বিচার এর সমন্বয় ঘটায় এবং এর মাধ্যমেই ক্ষমতা-জ্ঞান ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। ফুকোর বিচারে জ্ঞান ও ক্ষমতাকে আলাদা করা যায় না। জ্ঞান ক্ষমতার হাতিয়ার নয় বরং জ্ঞান ও ক্ষমতার লক্ষ্য অভিন্ন, অন্তত মানব-অধ্যয়নবিদ্যাগুলোতে। অনুশাসন চালানোর প্রতনিধি প্রতিষ্ঠান হলো হাসপাতাল, কারাগার, স্কুল, কারখানা ইত্যাদি যেখানে মানুষকে রাখা হয় নজরবন্দি অবস্থায়। অসুস্থ মানুষের শারীরিক ক্রিয়াকর্ম পরীক্ষার জন্য তাকে নজরবন্দি রাখা হয় হাসপাতালে, আইনভঙ্গকারীকে কারাগারে, ছাত্রকে স্কুলে, শ্রমিককে কারখানায়। নজরবন্দি করতে পারলে তবেই তাকে অনুশাসনবদ্ধ করা যায়। এই শাসন শারীরিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে না, বরং কাজ করে মানুষের চেতনায়। অনুশাসনের উদ্দেশ্য সার্বভৌম শক্তির ভয় দেখানো নয়, তার উদ্দেশ্য স্বশাসন। আধুনিক সমাজের নাগরিক নিজের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করেই বুঝে নেয় যে অসুস্থ হলে ডাক্তারের নজরাধীন হওয়া উচিত তার নিজের মঙ্গলের জন্য, কোনো শাস্তির ভয়ে নয়। এই একই যুক্তিতে সে সময়মতো কারখানায় কাজ করতে যায়, ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠায়। এই হলো আধুনিক সমাজব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতার আদর্শ: কেন্দ্রহীন সর্বব্যাপী এক অনুশাসনতন্ত্র। যেখানে সকলেই স্বাধীন, অথচ স্বাধীনভাবেই তারা অনুশাসনের শৃঙ্খল পরতে রাজি থাকে। মানুষের মনের মধ্যে মানসম্মত হওয়ার জন্য ‘সেল্ফসেন্সরের’ যন্ত্রপাতি বসে যায়।

আধুনিক উদারনৈতিক বা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্বশাসিত গণতান্ত্রিক সমাজের যা আদর্শ, ফুকো সেটাকেই উল্টো করে দেখান। এখানে সেই ক্ষমতাই সবচেয়ে প্রবলভাবে কার্যকর যা নিজেকে স্বশাসনের চেহারায় উপস্থিত করতে পারে। হাসপাতালে বা স্কুলে নজরবন্দি হলে আমরা মনে করি না আমাদের স্বাধীনতা খর্ব করা হলো। আমরা ভাবি আমাদের মঙ্গলের জন্যই আমাদের স্বাস্থ্য বা বিদ্যাবুদ্ধির যথাযথ পরীক্ষা এবং মূল্যায়ন হওয়া উচিত। আবার যে ডাক্তার বা শিক্ষক আমাদের পরীক্ষা করছেন, তিনিও কোনো সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বলে তা করছেন, এমন নয়। তার ওপরেও নজরদারি আছে। তিনিও ঠিক করে কাজ করছেন কিনা তার পরীক্ষা হচ্ছে। এই সমাজের প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে নজরবন্দি।

প্রশাসনিকতার মূল কথা হল, ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে জনগোষ্ঠীর কল্যানের জন্য। সর্বজনীন কল্যান নয়, বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠীর বিশেষ বিশেষ কল্যানের জন্য। এই কায়দায় ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য দরকার হয় জনগোষ্ঠী সম্বন্ধে প্রশাসনিক জ্ঞান। ফুকো দেখান, আধুনিক সমাজে যতোই প্রশাসনিকতা বিস্তৃত হয়েছে, ততোই গড়ে উঠেছে জনগোষ্ঠীকে নানাভাবে শ্রেণীবদ্ধ করে তাদের সম্বন্ধে সরকারি তথ্যসংগ্রহের ব্যবস্থাসমূহ। কারণ, অধিকতর নির্দিষ্ট ও পরিসংখ্যানগত নির্ভুল তথ্য ক্ষমতাব্যবস্থাকেও অধিকতর টেকসই করে তোলে। ফুকোর মতে, আধুনিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশের সাথে অনুশাসনতন্ত্র অনন্যভাবে সম্পর্কিত। যদিও অনুশাসন কৌশলগুলো পুঁজিবাদ উদ্ভবের কারণ নয়, তবে পুঁজিবাদের সাফল্যের অন্যতম সহায়ক শক্তি – একথা বলা যায়।

আগের/পরের পর্ব<< তর্ক: চমস্কি এবং ফুকো (পার্ট ওয়ান)তর্ক: চমস্কি এবং ফুকো (পার্ট থ্রি) >>
শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
আ-আল মামুন

আ-আল মামুন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। সংঘাত-সহিংসতা-অসাম্যময় জনসমাজে মিডিয়া, ধর্ম, আধুনিকতা ও রাষ্ট্রের বহুমুখি সক্রিয়তার মানে বুঝতে কাজ করেন। বহুমত ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীল গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের বাসনা থেকে বিশেষত লেখেন ও অনুবাদ করেন। বর্তমানে সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোস্যাল সায়েন্সেস, ক্যালকাটায় (সিএসএসসি) পিএইচডি গবেষণা করছেন। যোগাযোগ নামের একটি পত্রিকা যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ফাহমিদুল হকের সাথে। অনূদিত গ্রন্থ: মানবপ্রকৃতি: ন্যায়নিষ্ঠা বনাম ক্ষমতা (২০০৬), নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যানের সম্মতি উৎপাদন: গণমাধম্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি (২০০৮)। ফাহমিদুল হকের সাথে যৌথসম্পাদনায় প্রকাশ করেছেন মিডিয়া সমাজ সংস্কৃতি (২০১৩) গ্রন্থটি।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.
An error occured during creating the thumbnail.