Main menu

প্রথম দশকের কবিতায় একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধ: মার্শাল ম্যাকলুহানের ‘পুনঃগোত্রীকরণ’ ধারণা যাচাই

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন গবেষণা হয়, এতে পয়দা হওয়া থিসিস পেপারগুলি স্টাডি করলে একাডেমির লেখাপড়ার ধরন সম্পর্কে একটা অনুমান করা যায়। কিন্তু এগুলি সাধারণত অপ্রকাশিত থাকে, কারণ অবশ্য বোঝা শক্ত।

বাছবিচারে এ ধরনের কিছু গবেষণাপত্র পাবলিশ করা হবে; আশা করবো, এগুলির মাধ্যমে স্টুডেন্টরা একাডেমিক গবেষণার রীতি-নীতি বুঝতে পারবেন, বা একাডেমির বাইরের চিন্তক, বুদ্ধিজীবীরা একাডেমি সম্পর্কে আরো পরিষ্কার ধারনার দিকে যাইতে পারবেন।–রক মনু

ঋণ স্বীকার

‘গবেষণা মানে গল্প বলা’—এই কথাটি বহুবার ক্লাশে বলেছেন আমার শিক্ষক এবং এই গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ড. কাবেরী গায়েন। গবেষণা কাকে বলে? কীভাবে লিখতে হয় গবেষণাপত্র–তা একেবারে হাতে ধরে ধরে শিখিয়েছেন তিনি।

কেমন করে গল্প বুনতে হয়, গল্প বলতে হয়; কতো তার ধরণ-ধারণ, রকম-ফের ইত্যাদি তিনি বলেছেন। তাঁকে ধন্যবাদ। তাঁর অনুপ্রেরণাতেই আমার মধ্যেও জেগে উঠে গল্প বলার আগ্রহ।

যোগাযোগের এই বিপুল উন্নতির মধ্যে থেকেও অজস্র মানুষ আজ একা, নিঃসঙ্গ। এই নৈসঙ্গের রূপটিও খুব আলাদা রকমেরই বলে বোধ হয়। মানুষের একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধের সেই গল্পটিকে একুশ শতকের প্রথম দশকের কবিতার আধেয় বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে অন্য সকলের সাথে ভাগ করে নিতে চেয়েছি আমি।

২০১০ সালে গবেষণা সম্পন্ন করে গবেষণাপত্রটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে স্নাতোকোত্তর পরীক্ষার আংশিক শর্ত পূরণের জন্য মনোগ্রাফ হিসেবে জমা দেয়া হয়ে যায়। তার প্রায় বছর তিনেক পর আমার বিভাগেরই আরেক শিক্ষক ড. শেখ আব্দুস সালাম আমার এই গবেষণাটির কথা শুনে আগ্রহী হন এবং এটিকে গবেষণা প্রবন্ধে রূপ দেবার জন্য তাগিদ দেন। অতঃপর তার তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয় এই প্রবন্ধ। তাঁকে ধন্যবাদ।

প্রবন্ধ সম্পন্ন হবার পর এটিকে পর্যবেক্ষণ করেছেন বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. বিশ্বজিত ঘোষ। তাঁকেও ধন্যবাদ। :: আফরোজা সোমা

 

সার সংক্ষেপ

জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি মানুষ যোগাযোগের মধ্যে বসবাস করে। এতদসত্ত্বেও সমাজের একক হিসেবে ব্যক্তি মানুষকে কখনও কখনও একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নিতাবোধ এবং সমাজবিমুখীনতা আক্রামণ করে। আবার সেই মানুষই সময়ের বির্বতনে গোত্রীভূত হয়ে যোগাযোগ নেটওয়ার্কের আওতায়চলে আসে। যোগাযোগ-পন্ডিত মার্শাল ম্যাকলুহান তাঁর ‘টেকনোলোজিকেল ডিটারমিনিজম’ তত্ত্বে পুনঃগোত্রীকরণ ধারণার মাধ্যমে বিষয়টির বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর মতে, আদিম গোষ্ঠীবব্ধ জীবনে মানুষ ছিল ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু‘লেখন আবিষ্কার’ এবং ‘ছাপার অক্ষরেবইয়ের প্রচলন’-এর পরেতা হারিয়ে গেছে। আর এই পরিস্থিতিকে তিনি উল্লেখ করেছেন, মানুষের ‘বিগোত্রীকরণ’হিসেবে। ম্যাকলুহান আরো মনে করেন, মানুষের মাঝে ‘মুদ্রণ যুগ’ (১৫শ থেকে ১৯শ সাল) যে দূরত্ব বা বিচ্ছিন্নতা তৈরি করেছিল, ‘ইলেক্ট্রনিক যুগ’ (১৯শ’ সাল পরবর্তী সময়) তা দূর করে দিয়েছে। এই প্রক্রিয়াকেইম্যাকলুহান মানুষের ‘পুনঃগোত্রীকরণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

মার্শাল ম্যাকলুহান এর পাশাপাশি গবেষক, কবি, সাহিত্যিকদের লেখায়ও বিচ্ছিন্নতাবোধের ধারণাটি বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে নানা মাত্রিকতায়। বর্তমান প্রবন্ধে কবিতায় একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধের আলোকে মার্শাল ম্যাকলুহানের ‘পুনঃগোত্রীকরণ’ ধারণাটি যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। গবেষণায় মূলত দু’টো বিষয় দেখা হয়েছে।

  • একুশ শতকের প্রথম দশকের কবিতায় একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতার উপস্থিতি আছে কিনা? থাকলে- সেটি কী পরিমাণে আছে এবং এই একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতার কারণগুলো কী?
  • মার্শাল ম্যাকলুহানের ‘পুনঃগোত্রীকরণ’ ধারণা বর্তমান সময়ে কতটা প্রাসঙ্গিক- তা যাচাই করা।

২০০১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত কবিতা নিয়ে ঢাকা থেকে প্রকাশিত মোট ছয়টি সংকলনের মধ্য থেকে স্তরীভূত নমুনায়নের মাধ্যমে তালাশ তালুকদার সম্পাদিত ‘শূন্যের করতালি’ সংকলনটিকে চূড়ান্ত নমুনা হিসেবে গ্রহণ করে, একাত্তর জন কবির ৩৭৩টি কবিতাকে বর্তমান গবেষণার নমুনা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে এবং আধেয় বিশেস্নষণের মাধ্যমে গবেষণাকর্মটি সম্পন্ন করা হয়েছে। গবেষণাটি মূলত করা হয়েছে গুণগত আধেয় বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে। বলা হয়ে থাকে, সাহিত্য হলো সমাজের আয়না। আর সাহিত্যের সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রকাশভঙ্গি হচ্ছে কবিতা। তাই, ইন্টারনেটের এই যুগে মার্শাল ম্যাকলুহানের ‘পুনঃগোত্রীকরণ’ ধারণাটি কবিতায় কীভাবে প্রতিবিম্বিত হয়েছে তা যাচাই করাই এই গবেষণাকর্মের লক্ষ্য।

গবেষণার নমুনায় অর্ন্তভুক্ত চলমান শতাব্দির প্রথম দশকের মোট ২৪.১৩ শতাংশ কবিতায় একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মার্শাল ম্যাকলুহানের ‘পুনঃগোত্রীকরণ’ ধারণা একরৈখিকভাবে প্রযোজ্য নয়। বরং সমাজে অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সামাজিক সচেতনতার পার্থক্যভেদে পুনঃগোত্রীকরণের মাত্রাও ভিন্নতর হতে পারে।

ভূমিকা

চারদিকে সবকিছু তার নির্যাস হারিয়ে ফেলেছে
এই নিরস মানুষের হৃদয় ক্ষয়ে ক্ষয়ে,
এখন পড়ে আছে শুধু তাদের পরিত্যক্ত ছায়ার খোলশ।
ওহ! সবকিছু বিভক্ত সত্তায়; নিঃস্ব হৃদয় নিয়ে প’ড়ে আছে
::প্রবর রিপন

প্রথম দশকের কবি প্রবর রিপন তাঁর ‘অতিক্রম’ কবিতায় বলছেন, তাঁর চারপাশে সবকিছু নির্যাস হারিয়ে ফেলেছে; মানুষের হৃদয় ক্ষয়ে ক্ষয়ে এখন পড়ে আছে শুধু ছায়ার খোলশ। অর্থাৎ চতুর্দিকের অনভিপ্রেত ঘটনা, বাস্তবতা কবির হৃদয়েও ক্ষতের সৃষ্টি করেছে; আর সেই সময়, সেই ক্ষত, বিষাদের ছায়া হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে এই কবিতায়। কবিতায় ছড়ানো এ বিষাদই মূলত ব্যক্তির সমাজ-বিচ্ছিন্নতার বহিঃপ্রকাশ।

বলা হয়, সাহিত্যে পাওয়া যায় সমসাময়িক সমাজ-বাস্তবতার ছাপ। চর্যাপদের কবিতাগুলো থেকে যেমন সেই সময়েরসমাজ-বাস্তবতার চিত্র পাওয়া যায়, তেমনি বর্তমান সময়ের কবিতাও ধারণ করে এই সময়ের সমাজ-বাস্তবতার। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কবি জীবননান্দ দাশ সম্পর্কে বলা হয় যে, তিনিও তীব্রভাবে আন্দোলিত হয়েছিলেন তাঁর চারপাশের ঘটমান বাস্তবতার দ্বারা। বিশ শতকে- দু’ দু’টি বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে অন্য অনেক কবির মতো জীবননান্দ দাশের মানসপ্রান্তরও হয়েছিলো সন্দিগ্ধ, শেকড় উন্মূলিত, বিশ্বাসবিচ্যুত এবং কখনো বা সত্তা বিচ্ছিন্ন। (ঘোষ এবং রহমান, ২০০৯)।

একইভাবে একুশ শতকের প্রথম দশকের কবিতাও তার সমকাল দিয়ে আলোড়িত হচ্ছে, সমকালীন সমাজ-বাস্তবতা উঠে আসছে কবিতায়। ‘শূন্যের কবিতা’ সংকলনের সম্পাদক সোহেল হাসান গালিব-এর ভাষায়- ‘আধুনিকতাবাদের সার্বজনীনতা নামক ভণ্ডামি, আন্তর্জাতিকতার আড়ালে আগ্রাসনের পায়তারা ঔপনিবেশিক শাসনযন্ত্রে উৎপাদিত ধর্মনিরপেক্ষ উদার মানবিকতার ছদ্মাবরণে উত্তর-ঔপনিবেশিক কালের সাংস্কৃতিক আধিপত্য কায়েম, সর্বোপরি ব্যক্তি-বিচ্ছিন্নতার আঁচড় কিছু মাত্রায় হলেও এই সময়ের কবিতায় এসে পড়েছে।’ (গালিব, ২০০৮)

বিশ্বব্যবস্থায় একদিকে চলছে বিশ্বায়নের তুমুল জোয়ার; অন্যদিকে, পাবলভ ইন্সিটিটিউটের মনোবিজ্ঞানীদের মতো কেউ কেউ বলছেন, বিচ্ছিন্নতা মূলত টেকনোলোজিকেল সোসাইটির আর্তি-বিবৃতির ফল (গঙ্গোপাধ্যায়, ১৯৯২)। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে,বর্তমান গবেষণার মূল উদ্দেশ্য হলো- প্রথম দশকের কবিতার একটি বিশেষ উপাদান বা বৈশিষ্ট্য- একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতা আছে কি-না তা খুঁজে দেখা। এই বিষয়গুলো খুঁজতে গিয়ে গুণগত বিশ্লেষণ করার সময় আধেয়’র স্পষ্ট অর্থ র্নিণয়ের পাশাপাশি (manifest meaning) অর্ন্তনিহিত বা সুপ্ত অর্থ (latent meaning) উদ্ধার এবং যোগাযোগ পন্ডিত মার্শাল ম্যাকলুহানের ‘পুনঃগোত্রীকরণ’ ধারণার সাথে তা যাচাই করার চেষ্টা নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই গবেষণাকর্মটিকে বিবেচনা করা যেতে পারে- প্রথম দশকের কবিতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিচার এবং তার সাথে সমাজ বাস্তবতা ও পুনঃগোত্রীকরণ ধারণার একটি সম্পর্ক খুঁজে দেখার প্রয়াস হিসেবে।

গবেষণার উদ্দেশ্য

সময়ভেদে বাংলা কবিতার বৈশিষ্ট্যে অনেক ভিন্নতা এসেছে। গত শতাব্দিতে বাংলা কবিতার ষাটের দশক ছিল মুক্তি-আকাঙ্ক্ষাপ্রবণ। সত্তরে প্রবল হয়ে ছিলো দেশপ্রেম।আশির দশকে বাংলাদেশের কবিতা ছিল আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিকঘূর্ণাবর্তে চঞ্চল। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশে হাজারো টানাপোড়েন, ক্যু দেতা, সেনানিবাসে পাইকারী খুন, গুপ্ত হত্যা, প্রহসনের বিচার, পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িকতা ও রাজাকার পুনর্বাসন, অর্ন্তঘাত ও অরাজকতায় বিপন্ন বিধ্বস্ত দেশ-জাতি- তখনই রচিত হয় গণজাগরণের শ্রেষ্ঠ পংক্তি- ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’। জাতি-মানসের এই ইতিবাচক প্রবণতায় তরুণ কবিরা হয়ে উঠেছিলো আত্মসচেতন ও স্তিতধী, দূরদর্শী ও শিল্প সন্ধানী। তাই, নববইয়ের কবিতা আত্মোপলব্ধির কবিতা। (কবীর, ১৯৯৯: ৭-৮)।

মাহবুব কবীর তাঁর ‘নববইয়ের কবিতা’ সংকলনের ভূমিকায় লিখেছেন, নববই দশকের কবিতায় একধরনের শিল্পগুণ সমৃদ্ধ, সমাজ নিরপেক্ষ- ঐতিহ্যে অর্ন্তমুখিন ধারা প্রবাহিত হয়েছিলো। এসময়ের কবিতায় প্রচল ছন্দের বাইরে বেরিয়ে নতুন সমীক্ষাধর্মী একটি গদ্য ভাষ্য-ধারার কাব্য শৈলী নির্মাণের প্রবণতা দেখা যায়; যেখানে ধ্বনিময়তার প্রাবল্য ছিল স্পষ্ট। তাঁর ভাষায়, নববই দশকের কবিতায় আদর্শবোধের উদ্দেশ্যহীনতা, ব্যক্তিগত অনুভূতি, কবিকৃতির উগ্রতা, নৈঃসঙ্গ্যবোধ প্রভৃতির প্রকটতা দেখা যায়(কবীর, ১৯৯৯:১০)।পূর্বের দশকগুলোর মতো, এই একুশ শতকের প্রথম দশকের বাংলাদেশের বাংলা কবিতায়ও চলমান দেশীয় ও বিশ্ব-বাস্তবতার প্রভাব পড়েছে। অতীতে বিভিন্ন দশকের কবিতা থেকে যেমন বিশেষ কিছু প্রবণতা চিহ্নিত করা গেছে, তেমনি একুশ শতকের প্রথম দশকের কবিতায়ও কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন- কবিতায় অর্থহীনতা, কবিতার মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও বিমুখতা, ছন্দহীনতা ইত্যাদি (গালিব, ২০০৮:১১)। এছাড়াও পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি এসময়ের কবিতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ‘একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধ’। কবিতার এই বিচ্ছিন্নতাবোধ বৈশিষ্ট্যটি কী কারণে কবিতায় উঠে আসছে এবং তার সমাজ-বাস্তবতা কী – এসব নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয় নি।

বলা হয়ে থাকে, সাহিত্যে নিবিড় ভাবে সময়ের ছাপ পাওয়া যায়। সাহিত্যের প্রাচীনতম শাখা কবিতা। তাই, এই গবেষণাকর্মেমূলত ২টি বিষয় দেখতে চেষ্টা করা হয়েছে:

  • চলমান শতাব্দীর প্রথম দশকের কবিতায়‘একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধ’-এর উপস্থিতি আছে কি-না?একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতার উপস্থিতি থাকলে- এর কারণ কী এবং তার সাথে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অবস্থার সম্পর্ক কোথায়?
  • প্রথম দশকের কবিতার একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতার কারণগুলোর নিরিখে এবং সময়-বাস্তবতারপরিপ্রেক্ষিতে যোগাযোগপন্ডিত মার্শাল ম্যাকলুহানের ‘টেকনোলোজিকেল ডিটারমিনিজম’ তত্ত্বের আলোকে ‘পুনঃগোত্রীকরণ’ ধারণা আজ কতটুকু কার্যকর তা খতিয়ে দেখা।

গবেষণার পূর্বানুমান

বর্তমান গবেষণার প্রধান দু’টো পূর্বানুমান হচ্ছে-

  • একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে বাংলাদেশের কবিতায় ‘একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধ’ একটি উল্লেখযোগ্য প্রবণতা।
  • ইলেক্ট্রনিক তথা ইন্টারনেট যুগ মানুষকে ‘পুনঃগোত্রীকরণ’ করেছে বলে মার্শাল ম্যাকলুহান যে তত্ত্ব হাজির করেছেন তা একরৈখিকভাবে পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়।

পূর্বপাঠ পর্যালোচনা

বিংশ শতাব্দির তৃতীয় দশকের কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতা নিয়ে কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ তাঁর গবেষণাধর্মী ‘শুদ্ধতম কবি’ গ্রন্থে জীবননান্দ দাশকে ‘বাংলা কবিতা রাজ্যের নিঃসঙ্গতম বরপুত্র’ বলে উল্লেখ করেছেন। কারণ জীবনানন্দ দাশের কবিতায় নিঃসঙ্গতা ও বিষাদময়তা একটি অনন্য উপাদান। জীবনানন্দ দাশের আগে ও পরের সময়ের অনেক কবির কবিতাতেও বিষাদময়তা ও নিঃসঙ্গতার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সাহিত্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এ বিষয়ে হয়তো অনেকেই গবেষণা করে থাকতে পারেন।

কবিতা যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সেক্ষেত্রে কোনো যোগাযোগ তত্ত্বের আলোকে কবিতার নিঃসঙ্গতা, বিষাদময়তা ও বিচ্ছিন্নতাকে নিয়ে বাংলাদেশে কোনও গবেষণার সন্ধান পাওয়া যায় নি। তবে, ‘প্রথম দশকের কবিতা: শক্তি ও সম্ভাবনা’ নামে প্রথম দশকের কবিতার কিছু প্রবণতা চিহ্নিত করে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন তারেক রেজা। প্রথম দশকের কবিতার সংকলন ‘শূন্যের কবিতা’ বইটির উপর ভিত্তি করে এই প্রবন্ধ লেখা হয়েছে। সেখানে তিনি এই সময়ের কবিতায় প্রযুক্তি নির্ভরতা, ইংরেজি শব্দের ব্যবহার, কবিতায় বক্তব্যহীনতা, বিবৃতিধর্মী কবিতা রচনা, ছন্দবিমুখতার প্রবণতাগুলোকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রসঙ্গে তারেক রেজা কিছু বলেন নি। (রেজা, ১৪১৬)

যতদূর জানা যায়, সম্ভবত- প্রথম দশকের কবিতায় একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধ: মার্শাল ম্যাকলুহানের ‘পুনঃগোত্রীকরণ’ ধারণা যাচাই বিষয়ক এই গবেষণাকর্মটিই বাংলাদেশে এ ধরণের প্রথম গবেষণা। এ কারণে এ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা পর্যালোচনা করা কঠিন বৈকি।

প্রথম দশকের কবিতা নিয়ে ‘প্রথম দশকের কবিতা’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন চঞ্চল আশরাফ। সেখানে তিনি বিমূর্তায়ন এবং চিত্রাত্মকতাকে প্রথম দশকের অন্যতম প্রবণতা বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু একাকিত্ব বা বিচ্ছিন্নতা সম্পর্কে তিনি কিছু বলেন নি। (আশরাফ, ২০০৯)

প্রথম দশকের কবিদের কবিতার সংকলন ‘শূন্যের করতালি’ গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন তালাশ তালুকদার। সম্পাদকীয়তে তিনি প্রথম দশকের কবিতার কিছু প্রবণতা চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, শূন্য দশকের (প্রথম দশক) কবিতার প্রধান অর্জন হলো চিত্রাত্মকতা, বিমূর্তায়ন, চমকপনা ও কখনো কখনো জীবনমুখী হয়ে ওঠার প্রয়াস। (শূন্যের করতালি, ২০১০: ভূমিকা)। এসবের পাশাপাশি একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে- শূন্যের কবিতায় অর্থাৎ প্রথম দশকের কবিতায় কোনো ইউনিফায়েড রূপ নেই। সেখানে উৎকন্ঠা, অনাস্থা, অবিশ্বাস, অ্যাবসার্ডিটির উপলদ্ধি যেনো বিচ্ছিন্নতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে। তিনি আরো বলেছেন, এ বিছিন্নতা তৈরিতে বিশ্বায়নের গোলকধাঁধাঁও এক অভূতপূর্ব ভূমিকা পালন করে চলেছে। এ জটিলতার দায় যতোটা কবিতার, তারচে’ বেশি বিজ্ঞানের ও শিল্পতত্ত্বের, কবিতা নিয়ে তত্ত্বের এবং সমাজ ও সময়ের। (তালুকদার, ২০১০: ভূমিকা)

প্রথম দশকের কবিদের কবিতার সংকলন ‘শূন্যের কবিতা’ বইয়ের ভূমিকাতে সম্পাদক সোহেল হাসান গালিব প্রথম দশকের কবিতার কিছু লক্ষণ চিহ্নিত করেছেন। গালিবের মতে, এই সময়ের কবিতার সবচেয়ে বড় ঝোঁক ছন্দহীনতা। এছাড়া এই সময়ের কবিতায় সচেতন মন অপেক্ষা অচেতন মনের উপস্থিতি অনেক বেশি। ফলে, এই সময়ের কবিতায় আধুনিকতার ‘কন্ট্রাডিকশান’ বা বৈপরিত্য ও ‘ইনকনসিসটেন্সি’ তথা সামঞ্জস্যহীনতা আরো ব্যাপক হয়ে ওঠেছে। (গালিব, ২০০৮: ৯)

তবে, এই সময়ের কবিতায় বিচ্ছিন্নতা উপাদানটি আছে- ‘শূন্যের কবিতা’ বইটির ভূমিকায় পরোক্ষভাবে এমন একটি আভাসও দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আধুনিকতাবাদের সার্বজনীনতা নামক ভন্ডামী, আর্ন্তজাতিকতার আড়ালে আগ্রাসনের পাঁয়তারা ও ঔপনিবেশিক শাষণযন্ত্রে উৎপাদিত ধর্মনিরপেক্ষ উদার মানবিকতার ছদ্মাবরণে উত্তর উপনিবেশিক কালের সাংস্কৃতিক আধিপত্য কায়েম, সর্বোপরি ব্যক্তি-বিচ্ছিন্নতার আঁচড় কিছু মাত্রায় হলেও আমাদের উপর এসে পড়েছে। (গালিব, ২০০৮:৭)

নিগ্রো সাহিত্যে বিচ্ছিন্নতা (alienation) নিয়ে ১৯৫০ সালে ‘ফিলন’ (Phylon) নামের একটি কাগজে আলোচনা করেছেন চার্লস আই ক্লিক্সবার্গ (Charles I. Glicksberg)। তিনি দেখিয়েছেন, আমেরিকান সমাজে ‘কালো’ বর্ণের কবি, সাহিত্যিক, লিখিয়েদের লেখায় বিচ্ছিন্নতা প্রসঙ্গটি নানাভাবে ঘুরে ফিরে এসেছে। এর পেছনে মূল কারণ হলো, গায়ের ‘সাদা’ ‘কালো’ রং নিয়ে আমেরিকায় বিরাজমান জাতিগত বর্ণ বৈষম্য। বর্ণ বৈষম্যের কারণেই আফ্রো-আমেরিকান কালো মানুষেরা, কালো বর্ণের লেখকেরা নিজেদের মাঝে একধরনের হীনমন্যতা বোধ করেন। ফলে, তারা মনে মনে পুরোদস্ত্তর আমেরিকান হতে পারেন না। বরং নিজেদের জাতিগত সাংস্কৃতিক বিষয়াবলীকে অতিমাত্রায় আঁকড়ে ধরেন। এই আঁকড়ে ধরার মধ্য দিয়েই বৃহৎ সমাজের সাথে তাদের মানসিক, সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার রূপ প্রকাশ পায় বলে উল্লেখ করেছেন ক্লিক্সবার্গ। (Glicksberg, 1950)

গবেষণা কর্ম না হলেও- বিচ্ছিন্নতা নিয়ে ‘বিচ্ছিন্নতা প্রসঙ্গ’ বইটিতে বিস্তর আলোচনা করেছেন ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। বইটিতে বিপরীতধর্মী দুই গোষ্ঠীর মতের উল্লেখ আছে। প্রথমত, ফ্রয়েড পন্থীদের কথা। ফ্রয়েডবাদীরা মনে করেন, শৈশবের অস্বাস্থ্যকর পারিবারিক অবস্থান, ইডিপাস-গূঢ়ৈষার জটিলতা, অবদমিত কামেচ্ছা, ব্যক্তিগত ব্যর্থতা ইত্যাদির জন্যে শৈশবে পরিবারের সাথে ব্যক্তি নিজেকে অন্বয় করতে না পারার দরুন বড়ো হয়ে সমাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করে। দ্বিতীয়ত, পাভলভীয় মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন- বিচ্ছিন্নতা এই টেকনোলোজিকেল সোসাইটির আর্তি-বিবৃতির প্রতিক্রিয়া। (গঙ্গোপাধ্যায়, ১৯৯২: ১১)

বিচ্ছিন্নতা বিষয়ে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত করা হয়েছে সুধীর চক্রবর্তীর ‘ধ্রুবপদ (বুদ্ধিজীবীর নোটবই)’ (২০০০) বইটিতে। সেখানে বলা হয়েছে, দর্শনের ইতিহাসে বিচ্ছিন্নতা বিষয়টি আলোচিত হয়েছে প্রাচীনকাল থেকেই। বইটিতে বলা আছে, প্লোটিনাস, অগাস্টিন ও লুথারিয় ধর্মতত্ত্বে বিচ্ছিন্নতার প্রসঙ্গটি এসেছে ঈশ্বর ও জাগতিক মানুষের বিচ্ছিন্নতাকে কেন্দ্র করে। তবে, দার্শনিক হেগেল এবং ফয়েরবাখ ‘বিচ্ছিন্নতা’ বিষয়টিকে ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনার জায়গা থেকে সরে এসে খানিকটা সেক্যুলার ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। হেগেলের মতে, বিচ্ছিন্নতা হলো বিভক্তির একটি পর্যায়। একই মানুষের মধ্যে তিনি ‘অ-বিচ্ছিন্ন মানুষ’ এবং ‘আত্ম-বিচ্ছিন্ন মানুষ’ খুঁজে পেয়েছেন। হেগেলের মতে, মানুষের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো বস্তুউৎপাদন করা, নিজেকে বস্তুর মাধ্যমে অভিব্যক্ত করা। এইসব বস্তুর মাধ্যমে মানুষ নিজেই বস্তু হয়ে ওঠে এবং এই প্রক্রিয়ায় নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। (চক্রবর্তী, ২০০০)

দার্শনিক ফয়েরবাখ বিচ্ছিন্নতাকে ব্যাখ্যা করেছেন ঈশ্বর এবং মানুষের সম্পর্কের আলোকে। ফয়েরবাখ মনে করেন, মানুষ নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই ঈশ্বরকে সৃষ্টি করে। অতঃপর অদেখা, অচেনা ঈশ্বরকে নিজের মাথার উপর বসিয়ে, তাকে নানারকম গুণ আরোপ করে এবং একসময় নিজে সে ঈশ্বরের দাস হয়ে পড়ে। ফলে, মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয় বিচ্ছিন্নতার। তাই, ফয়েরবাখ মনে করেন, ঈশ্বরকে বিলোপ করার মধ্য দিয়েই মানুষের বিচ্ছিন্নতার মুক্তি সম্ভব। (চক্রবর্তী, ২০০০)

বিচ্ছিন্নতা বিষয়টিকে দার্শনিক জাক লাকাঁ ফিরিয়ে এনেছেন তাঁর মনোবিশ্লেষণিক রচনায়- ‘এক্রিটস’ গ্রন্থে। লাকাঁ মনে করেন, আধুনিক বৈজ্ঞানিক সভ্যতায় ভাষার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মধ্যেই বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে গভীর কারণগুলো লুকিয়ে আছে। (চক্রবর্তী, ২০০০)

‘মার্কসবাদ ও সাহিত্য’ বইটিতে তানভীর মোকাম্মেল র্মাক্সীয় তত্ত্বে যে বিচ্ছিন্নতা আছে তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। বইটিতে বলা হয়েছে, শ্র্ম বিভাজনের ফলে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে মানুষের মাঝে। ধনী দরিদ্র দুই শ্রেণীতে সমাজ বিভক্ত হবার ফলে সমাজে বিরাজ করেধনবৈষম্য। শ্রম বিভাজিত সমাজে পণ্য যারা উৎপাদন করেন তাদের সাথে মুনাফার কোনো সম্পর্ক নেই। মুনাফা যায় মুষ্টিমেয় মালিকের ঘরে। ফলে, বিচ্ছিন্নতা বাড়ে প্রলেতারিয়েত মানুষের অমত্মরে। (মোকাম্মেল, ১৯৮৫)

উপর্যুক্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিচ্ছিন্নতা সাহিত্য এবং দর্শনের একটি অবিচ্ছেদ্য উপাদান হলেও বাংলাদেশের প্রথম দশকের কবিতায় তার উপস্থিতি কতটা ক্ষীণ কিংবা প্রবল সে ব্যাপারে তেমন কোনো গবেষণাকর্ম আমাদের চোখে পড়ে না। এই বিষয়ে একটি সম্যক ধারণা পাওয়ার জন্যে বর্তমান গবেষণাটি সম্পন্ন করা হয়েছে।

তাত্ত্বিক কাঠামো

যোগাযোগ-পন্ডিত মার্শাল ম্যাকলুহান ‘টেকনোলোজিকেল ডিটারমিনিজম’ তত্ত্বে গণমাধ্যমের ইতিহাস তথা মানব ইতিহাসকে চারভাগে ভাগ করেছেন। যথা-

  • The Tribal Age: Oral culture(Sense of hearing, touch, taste and smell more developed than the visual; Encourages high involvement, passion, and spontaneity in interactions; Importance of stories; Personal interaction and attention).
  • The Age of Literacy: Writing(Visual sense becomes more dominant; Encourages contemplation; private detachment rather than tribal involvement; Promotes logical, linear thinking; mathematics, science, philosophy)
  • The Print Age: The printing press(Made visual dependence widespread; Converting personal writing into technical printing; Standardization of national languages produced nationalism; Prototype of the industrial revolution).
  • The Electronic Age: Electronic media(Emergence of the “Global Village”; Cool medium of TV encourages spontaneity and defined involvement; retribalization of humanity; Passive spectator effect; Linear, logical thinking becomes useless in the electronic culture).

::http://oregonstate.edu/instruct/comm321/gwalker/media.htm

ম্যাকলুহানের মতে, আদিম গোষ্ঠীবব্ধ জীবনে মানুষ ছিল ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু ‘লেখন আবিষ্কার’ বা ‘এজ অব লিটারেসি’-তে এসে মানুষের ‘private detachment’ বা ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য’ অর্থাৎ গোত্রের সঙ্গে ব্যক্তির বিযুক্তি ক্রমশই প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য প্রবল হবার কারণেই গোষ্ঠী-ভুক্ত জীবনের পারস্পরিক সম্পর্কগুলো শিথিল হয়ে আসতে থাকে বা চির ধরতে থাকে। ‘এজ অব লিটারেসি’-তে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের যে উন্মেষ ঘটেছিল, তা তীব্র হয়ে সমাজে মানুষের মাঝে বিচ্ছিন্নতার তৈরি করেছিল ‘The Print Age’ বা ‘ছাপার অক্ষরেবইয়ের প্রচলনে’-এর পর।

মার্শালের মতে, ছাপাখানা আবিষ্কার হবার পর মানুষ একটি বইয়ের হাজারটা অনুলিপি উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু যখন ছাপাখানা ছিল না, তখন হাতে লেখা বইয়ের খুব বেশি অনুলিপি তৈরি করা সম্ভবপর হতো না। যার ফলে, একটি বই অনেকের উদ্দেশ্যে হয়তো একজন সশব্দে পাঠ করতো, আর অন্যরা এক সঙ্গে বসে শ্রোতা হয়ে সেই বইয়ের কাহিনী শুনতো। কিন্তু ছাপাখানায় যেহেতু মানুষ একটা বইয়ের শত শত অনুলিপি উৎপাদন করতে পারছে, তাই মানুষ এখন নিজের প্রয়োজন মতো বই নিয়ে ইচ্ছেমত আলাদা জায়গায় বসে বসে পড়তে পারছে। অর্থাৎ ছাপাখানা মানুষকে সহজেই একাধিক বা ততোধিক পুস্তক পুনরুৎপাদনের স্বাধীনতা দেয়ার প্রক্রিয়াটির মধ্য দিয়ে- বিনষ্ট করেছে সমাজের গোত্রভুক্ত জীবনের প্রয়োজনীয়তা। আর এই প্রক্রিয়া বা বাসত্মবতাকে ম্যাকলুহান উল্লেখ করেছেন মানুষের ‘বিগোত্রীকরণ’(Detribalisation) হিসেবে।

তবে, ম্যাকলুহান আরো মনে করেন, মানুষের মাঝে যে দূরত্ব বা বিচ্ছিন্নতা তৈরি করেছিল ‘মুদ্রণ যুগ’ (১৫শ থেকে ১৯শ সাল) তা দূর হয়ে গেছেমানব ইতিহাসের চতুর্থ ধাপ অর্থাৎ ‘The Electronic Age’ বা ‘ইলেক্ট্রনিকযুগ’ (১৯শ’ সাল পরবর্তী সময়ে) এসে। ইলেক্ট্রনিকযুগে ইন্টারনেট, বিশ্বায়ণ ধারণা, স্যাটেলাইটের প্রবতর্নের পর বিশ্ববাসী এখন বাস করছে বিশ্বগ্রামে। তাঁর মতে, এই বিশ্বগ্রামে কেউ আর বিচ্ছিন্ন নয়। কেননা এই যুগে এসে সাত মহাদেশের মানুষ টিভির রিমোট ও ইন্টারনেট-এর কল্যাণে পরস্পর পরস্পরের কাছে এসেছে। অর্থাৎ যে বিচ্ছিন্নতার সূত্রপাত করেছিল মুদ্রণ যুগ, সেই বিচ্ছিন্নতা আজ ঘুচিয়ে দিয়েছে ইলেক্ট্রনিক যুগ। আর এই প্রক্রিয়াটিকেইপন্ডিত ম্যাকলুহান উল্লেখ করেছেন ‘পুনঃগোত্রীকরণ’ (Retribalisation) হিসেবে। (রিয়াজ,১৯৮৪)

দার্শনিক কার্ল মার্কসকে উদ্ধৃতি করে তানভীর মোকাম্মেল লিখেছেন যে, মার্কস তাঁর ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ তত্ত্বে বলছেন, অর্থনৈতিক বৈষম্য মানুষের মাঝে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করেছে। শ্রেণী বৈষম্য পীড়িত সমাজে পণ্য উৎপাদন করে শ্রমিক শ্রেণী। কিন্তু সেই উৎপাদিত পণ্যে তাঁর কোনো অধিকার নেই। পণ্য বিক্রি করে সমস্ত মুনাফা যায় মালিকের ঘরে। শ্রমিক এখানে পুঁজির দাস মাত্র। আর এখান থেকেই মানুষের মৌলিক বিচ্ছিন্নতার সুত্রপাত বলে ব্যাখ্যা করেছেন মার্কস। (মোকাম্মেল, ১৯৮৫)

লেখক বিনয় ঘোষ বিচ্ছিন্নতা প্রসঙ্গে যদিও কোনো তাত্ত্বিক কাঠামো দেন নি, কিন্তু তার ব্যাখ্যা হলো- বিচ্ছিন্নতা মূলত অটোমেশনের ফল। তিনি বলেছেন, কম্পিউটার, সাইবারনেটিক্স ও আটোমেশনের এই যুগে যন্ত্র ও মানুষের সম্পর্ক এক নতুন মাত্রা অর্জন করেছে। অতি যান্ত্রিকতার চাপে, নাগরিক প্রতিযোগিতার চাপে মানুষের মন মরে যাচ্ছে, মানুষে মানুষে বাড়ছেবিচ্ছিন্নতা। তৈরি হচ্ছে হতাশা, জীবন বিমুখতা। (ঘোষ, ১৯৭৩)

‘স্পাইরাল অফ সাইলেন্স’ বা ‘নীরবতার কুন্ডুলি’ তত্ত্বে এলিজাবেথ নোয়েলে নিউমান বলেছেন, সবার মতের সাথে বা অধিকাংশের মতের সাথে ব্যক্তির মতের যখন অমিল ঘটে, ব্যক্তি তখন একা বোধ করে। এই একাকিত্ব থেকে তার ভেতর জন্ম নেয় আরো বেশি একা হয়ে যাবার ভয়। ফলে, যেসব ক্ষেত্রে সমাজের অন্যান্য মানুষের সাথে তার মতের অমিল হয়, দ্বন্দ্ব দেখা দেয়- সেখানে ব্যক্তি নিজের মত আর প্রকাশ করে না। বরং নীরব থাকে। এভাবে ব্যক্তির নীরবতার পরিমাণ বাড়তে থাকে, এবং এই নীরবতা কুন্ডলী পাকিয়ে ক্রমশ আরো বেশি ঘন হতে থাকে। (Griffin, 1991)

Lowery and Fleur তাঁদের ‘মাইলস্টোনস ইন কমিউনিকেশন রিসার্চ’ বইয়ে শিল্পায়ন (Industrialization), নগরায়ণ (Urbanization), এবং আধুনিকায়ন (Moderanization) নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যন্ত্রের আবিষ্কারের পর মানুষ বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে। তাঁরা দেখিয়েছেন যে, এই আধুনিকায়নের যুগে মানুষ এখন ‘লোনলি ক্রাউড’ এর ভেতর বাস করে।

উল্লেখিত বইটিতে Industrialization সম্পর্কে বলা হয়েছে,

‘The idea of producing goods for entrepreneurs to market was well-established in Europe long before the mid 1700s. Developments inscience and engineering were about to yield new power sources and machinery. The next major step was to combine investment capital with the new machines that could spin, weave, grind, stamp and cut with a stamina and precision that no craftsman could match.With this devices replacing human hands and muscles, goods could be produced far more rapidly, uniformly, and cheaply than ever before. … The social significance of this process is that it greatly changed relationships between people in terms of there work. Earlier, human beings made things for each other.’

‘In his classic analysis, Marx maintained that this system resulted in serious alienation of the industrial worker, not only from the worker itself but from the other people and even from himself.’

‘The new types of human relationships resulting from the growth of bureaucracy were very different from the older forms based on friendship, kinship, or traditional loyalty. As the traditional society gave way to the industrial order, the bonds that united people were based less and less on such sentiments and more and more on the impersonal obligations of the legal contract. People still have families and friends, but the increasingly mobile, differentiated, and bureaucratized society was one that tended to reduce close personal ties between people rather than strengthen them.’

Urbanization সম্পর্কে এই বইটিতে বলা হয়েছে,

‘Urbanization is a process by which an increasing proportion of the population of a given area live in town and cities. The social significance of urbanization is that it changes the quality of life. Above all it brings unlike people together. …Urbanization, in other words, created great difference between people. These difference provided no basis for the older and traditional bonds, based on loyalty, trust and fealty, to develop again and keep people together.

এখানেই শেষ নয়। Modernization সম্পর্কে বইটিতে বলা হয়েছে,

Modern societies, then are media-dependent societies.The media provided information critical to economic, political, religious, and educational decisions in ways that are totally different from pre-industrial societies. This flow of information further breaks people away from traditional ways of life and trusts them into constantly changing ways of thinking about family obligations, sexual mores, basic values and other central features of human existence. (Lowery and Fleur, 1987: 5-10)

গণমাধ্যমের সমজাতীয় প্রভাব তত্ত্বে (Theory of Uniform Influence) বলা হয়েছে, শিল্পায়িত নগর সমাজে মানুষে মানুষের বন্ধন শিথিল হয়ে পড়েছে। ফলে, হাজার জনের মাঝে থেকেও ব্যক্তি মানসিকভাবে একা। অর্থাৎ হাজার জনের মাঝে থেকেও ব্যক্তি যেনো কারো সঙ্গে নেই। তাই, গণমাধ্যম তাকে প্রভাবিত করতে পারে সবচেয়ে কার্যকরভাবে।

Lowery and Fleur আরো বলেছেন,

‘It will recalled that in the assumptions of the nature of mass society, urban-industrial populations were seen as diverse, differentiated and free from binding social ties. There members were said to act less on the basis of reason and rationality and more on impulse, sentiment, and emotion. Because of these assumptions, modern society was characterized as a ‘lonely crowed’, a society composed of separate individuals not linked to each other but acting on the basis of there own individual psychological forces.’ (Lowery and Fleur, 1987:21)

ঠিক যেনো এই তত্ত্বটির মতো একই কথা কবিতায় লিখেছেন কলকাতার কবি ফালগুণী রায়। তাঁর ভাষায়-

তারপর একা মানুষের ভিড়ের ভেতর হেঁটে গেলুম নির্জন
(রায়, ২০০২: ১৫)

আর তিরিশের কবি জীবনানন্দ দাশ আরও অনেক আগেই লিখে গেছেন-

সকল লোকের মাঝে বসে/

আমার নিজের মুদ্রাদোষে/

আমি একা হতেছি আলাদা?

::করিম,১৯৯৪: ৬৭

কবি জীবনানন্দ দাশ ‘সকল লোকের মাঝে বসে’-ও বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু তার সেই সমাজ-বিচ্ছিন্নতার কোনো কারণ তিনি ব্যাখ্যা করেননি, বরং নিজের এই বিচ্ছিন্নতার জন্য তিনি নিজেকেই দায়ী করে লিখেছেন- ‘নিজের মুদ্রাদোষ’-ই তাঁর ‘আলাদা’ হবার কারণ।

নিজের স্বভাব-দোষ (মুদ্রাদোষ) ছাড়া জীবনানন্দ দাশ নিজের বিচ্ছিন্নতার আর কোনও কারণ না পেলেও, মনোবিজ্ঞানীরা যুগ যুগ ধরে মানুষের বিচ্ছিন্নতার কারণ অনুসন্ধান করে চলেছেন। সেই অনুসন্ধানের পর, পাভলভ ইন্সটিটিউটের মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিচ্ছিন্নতা মূলত টেকনোলজিক্যল সোসাইটির আর্তি-বিবৃতির ফল। (গঙ্গোপাধ্যায়, ১৯৯২)

পাভলভ ইন্সটিটিউটের মনোবিজ্ঞানীদের মতো একই কথার প্রতিধ্বনি করেছেন প্রথম দশকের কবি সুমন প্রবাহন। সুমন তাঁর এক চিঠিতে লিখেছিলেন, হ্যাঁ, বিশ্বায়ন হাতের কাছে এনে দিল পৃথিবীর অপর পৃষ্ঠ আর পাশের ফ্ল্যাটকে ঠেলে দিল মানচিত্রের অপর পৃষ্ঠে। (দাস, ২০০৮)

আজ দূরের মানুষ নিকটে এসেছে। এক দেশের সমস্যা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছে অন্য দেশের মানুষ। কিন্তু দার্শনিক জ্যাঁ পল র্সাত্র মনে করেন, যোগাযোগের এই নিপুণ জালের মধ্যে থেকেও বর্তমান দুনিয়ার মানুষ আজ যতটা বিভক্ত হয়েছে, জগতে আর কখনই তেমন বিভক্তি ছিল না কোনো দিন। এ বিষয়ে জ্যাঁ পল সার্ত্রের উক্তিটিকে ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় উদ্ধৃত করেছেন তাঁর ‘বিচ্ছিন্নতা প্রসঙ্গ’ নামক গ্রন্থে। উদ্ধৃতিটি হচ্ছে-`The world is more one than ever connected and yet man is more than ever divided. (গঙ্গোপাধ্যায়, ১৯৯২)

জ্ঞানকান্ডের বিভিন্ন শাখার পন্ডিতেরা মনে করেন, বিশ্বায়ন মানুষকে পরস্পরের সাথে যেমন যুক্ত করেছে, তেমনি বিযুক্তও করেছে। পাশাপাশি তাঁদের কেউ কেউ বলছেন, প্রযুক্তির এই চরম সাফল্যের যুগে, অটোমেশান জামানার এই ইলেক্ট্রনিক সময়ে এসে অতি দূরের মানুষ যেমন আপন হয়েছে, তেমনি অতি নিকটের জনও কখনও কখনও চলে গেছে বহু দূরে। সেই দূরে থাকার কথাগুলোই খানিকটা ব্যঙ্গাত্মক ঢঙে গানে গানে ফুটে উঠেছে ‘মহীনের ঘোড়াগুলো’ অ্যালবামে। গানের কথাগুলো এই রকম:

‘পৃথিবীটা না-কি ছোটো হতে হতে/স্যাটেলাইট আর কেবলের হাতে/ড্রয়িংরুমে রাখা বোকা-বাকসোতে বন্দী।
ঘরে বসে সারা দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ আজ হাতের মুঠোতে/ঘুচে গেছে দেশ-কাল-সীমানার গন্ডি।…

ভেবে দেখেছো কি- তারারও যত আলোক বর্ষ দূরে/তারও দূরে- তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে ।
সারি সারি মুখ, আসে আর যায় নেশাতুর চোখ টিভি পর্দায়/পোকা-মাকড়ের আগুনের সাথে সন্ধি। …

পাশাপাশি বসে এক সাথে দেখা/এক সাথে নয়, আসলে যে একা-
তোমার আমার ফারাকের নয়া ফন্দি।’

তাত্ত্বিকদের ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যাচ্ছে- ইলেক্ট্রনিক যুগ, মোবাইল আর দ্রুতগতির ইন্টারনেট-এর এই গতিময়তা মানুষকে কেবলই নিষ্কলুষ ও নির্বিষভাবে একীভূত করে নি। বরং মানুষের ভেতরে পুঁতে দিয়েছে আরেক বিছিন্নতার বীজ।

অর্থাৎ উপরের আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে, দুনিয়ার শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, মনোবিজ্ঞানী ও তাত্ত্বিকেরা যেখানে বিশ্বায়ন তথা ইলেকট্রনিক যুগের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার প্রবণতাকে মুখ্য করে তুলে ধরেছেন, সেখানে- যোগাযোগ পন্ডিত মার্শাল ম্যাকলুহান তাঁর টেকনোলোজিকেল ডিটারমিনিজম তত্ত্বে ‘ইলেক্ট্রনিক যুগ’ প্রসূত মানুষের বিচ্ছিন্নতার কথাটি একটি বারের জন্যেও স্বীকার করে নেন নি। বরং তিনি বলছেন, এই ইলেক্ট্রনিক যুগে এসেই বিচ্ছিন্ন, বিগোত্রীকৃত মানুষ পুনরায় গোত্রীভূক্ত হয়েছে; ইলেক্ট্রনিক জাদুর বলেই হারিয়ে যাওয়া কাছের মানুষ আবারও ফিরেছে কাছে। অর্থাৎ ম্যাকলুহান বলছেন, ইলেক্ট্রনিক যুগের এই পুনঃগোত্রীকরণ-এর মধ্য দিয়েই মানুষে মানুষের যোগাযোগ আগের চেয়ে বেড়ে গেছে বহুগুণ। আর এই যোগাযোগের সূত্র ধরেই- গোত্রচ্যুত মানব-সমাজ আবারও ফিরেছে গোত্রের চিরায়ত বন্ধনে। (রিয়াজ,১৯৮৪)।

‘প্রথম দশকের কবিতায় একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতা: ম্যাকলুহানের ‘পুনঃগোত্রীকরণ’ ধারণা যাচাই’ করতে গিয়ে উপরে বর্ণিত ধারণাগুলোকে বিবেচনায় রেখে এদের সহায়তায় যাচাই করে দেখা হয়েছে, মার্শাল ম্যাকলুহান ‘পুনঃগোত্রীকরন’-এর যে কথা বলেছেন তা’ কতখানি বাস্তবসম্মত? কিংবা এই ‘পুনঃগোত্রীকরণ’ বাসত্মবতার সমান্তরালে আরো কোনো বাস্তবতা সমাজে বিরাজ করে কি-না?

গবেষণা প্রত্যয়সমূহের ব্যাখ্যা

‘প্রথম দশকের কবিতায় একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধ: সমাজ-বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ম্যাকলুহানের ‘পুনঃগোত্রীকরণ’ ধারণা যাচাই’ শীর্ষক এই গবেষণায় ব্যবহৃত প্রত্যয় বা ধারণাসমূহ নিম্নরূপ:

  • প্রথম দশক: প্রথম দশক বলতে বুঝানো হয়েছে একুশ শতকের প্রথম দশক অর্থাৎ ২০০১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়কে।
  • প্রথম দশকের কবিতা: প্রথম দশকের কবিতাবলতে বোঝানো হয়েছে বাংলাদেশ ভূখন্ডে বসবাসরত কবিদের দ্বারা বাংলা ভাষায় লিখিত ২০০১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রকাশিত কবিতাকে।
  • একাকিত্ব: একাকিত্ব বলতে বুঝানো হয়েছে মানসিক নিঃসঙ্গতাবোধকে।
    বিচ্ছিন্নতাবোধ:বিচ্ছিন্নতাবোধবলতে বোঝানো হয়েছেএকাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা ও তজ্জনিত অসহায়ত্ব, বিকারগ্রস্থতা, জীবনবিমুখতা ও সমাজের সাথে মানসিক সম্পর্কহীনতাকে।
  • পুনঃগোত্রীকরণ: পুনঃগোত্রীকরণ বলতে বোঝানো হয়েছে মার্শাল ম্যাকলুহানের দেয়া ‘টেকনোলোজিকেল ডিটারমিনিজম’ তত্ত্বের একটি অংশকে। টেকনোলজিকেল ডিটারমিনিজম তত্ত্বকে ব্যাখ্যা করতে এবং তাত্ত্বিক কাঠামো দিতে গিয়ে তিনি মানব ইতিহাসকে চারভাগে ভাগ করেছেন। ম্যাকলুহান বলেছেন, ইলেক্ট্রনিক যুগে মানুষের ‘পুনঃগোত্রীকরণ’ ঘটেছে। অর্থাৎ এই ইলেক্ট্রনিক যুগ কমিয়ে দিয়েছে মানুষে-মানুষের দূরত্বের ব্যবধান। পরকে করেছে নিকট বন্ধু। যোগাযোগের সুবিধা বিস্তৃত হয়ে গড়ে ওঠেছে ‘বিশ্বগ্রাম’ ধারণা। আর এর মধ্য দিয়ে মানুষ আবারও পুনঃগোত্রীকরণের দিকে ফিরে আসছে।

গবেষণা নকশা এবং কর্ম-সম্পাদনা পদ্ধতি

গবেষণা সমগ্রক ২০০১ থেকে ২০১০ সালের কবিতা নিয়ে আমাদের জানা মতে ছয়টি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে।
যথা-

  • তালুকদার, তালাশ (২০১০), শূন্যের করতালি, ঢাকা: ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
  • সোহাগ, জাহিদ, কর, অনির্বাণ এবং দেবরায়, মৃদুল (২০১০), তিন বাংলার কবিতা, ঢাকা: লোক।
  • হেনরী, রহমান (২০০৯), পোয়েট ট্রি (লিটল ম্যাগাজিন), ভলিউম: ১, সংখ্যা: ২, ঢাকা।
  • সুজন, অনন্ত(২০০৯), শূন্যের সাম্পান, ঢাকা: সুবিল প্রকাশনী।
  • গালিব, সোহেল হাসান (২০০৮), শূন্যের কবিতা, ঢাকা: বাঙলায়ন।
  • রহমান, যুবা এবং খান, মামুন (২০০৮), শূন্য দশকের প্রেমের কবিতা, ঢাকা: টিমওয়ার্ক।

এই ছয়টি সংকলনের সকল কবিতাকে গবেষণার সমগ্রক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

গবেষণা নমুনা

আধেয় বিশ্লেষণের জন্য নমুনা বাছাই করার সুবিধার্থে বিভিন্ন ধাপে ব্যবহৃত স্তরায়িত নমুনায়ন (multi-stage sampling) পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে তিনটি স্তর ছিলো। যথা-

  • নির্দিষ্ট সংকলনের নমুনা নির্ধারণ,
  • সংকলনে ঠাঁই পাওয়া কবি সংখ্যার ভিত্তিতে সমগ্র নমুনা সংকলন থেকে যে সংখ্যক সংকলন নমুনা হিসেবে নেয়া হয়েছে তার সংখ্যা নির্ধারণ,
  • আধেয়র নমুনা নির্ধারণ।

ক. নির্দিষ্ট সংকলনের নমুনা নির্ধারণ: ২০০১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত যে সব সংকলন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং বাংলাদেশী কবিদের কবিতা প্রকাশিত হয়েছে- সেই সব সংকলনকে নমুনা হিসেবে বাছাই করা হয়েছে। বাছাই করতে গিয়ে প্রথমত, শূন্য দশকের কবিতা নিয়ে লিটল ম্যাগাজিনে যে সব সংকলন প্রকাশিত হয়েছে তাকে নমুনা হিসেবে গ্রহণ করা হয় নি। দ্বিতীয়ত, যে সব সংকলন কেবল বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে সেই সব সংকলনকেই নমুনা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

খ. সংকলনে ঠাঁই পাওয়া কবি সংখ্যার ভিত্তিতে সমগ্র নমুনা সংকলন থেকে যে সংখ্যক সংকলন নমুনা হিসেবে নেয়া হয়েছে তা নির্ধারণ: সংকলনে ঠাঁই পাওয়া কবি সংখ্যার ভিত্তিতে সমগ্র নমুনা সংকলন থেকে যে সংখ্যক সংকলন নমুনা হিসেবে নেয়া হয়েছে তা নির্ধারণকরতে গিয়ে প্রথমত, কোনো নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে (যেমন- শূন্য দশকের প্রেমের কবিতা সংকলন) যে সংকলন প্রকাশিত হয়েছে সেই সংকলনকে নমুনা হিসেবে গ্রহণ করা হয় নি। বরং কোনো বিশেষ বিষয়কে কেন্দ্র না করে, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখা একাধিক কবিতা যে সব সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে কেবল সেই সব সংকলনকেই নমুনা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, যে সব সংকলনে অন্তঃত ৩০ জন কবির কবিতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সেই সব সংকলনকে নমুনা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এভাবে নিণ্মের তিনটি সংকলনকে নমুনা হিসেবে নেয়া হয়েছে। যথা-

  • তালুকদার, তালাশ (২০১০), শূন্যের করতালি, ঢাকা: ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
  • সুজন, অনন্ত (২০০৯), শূন্যের সাম্পান, ঢাকা: সুবিল প্রকাশনী।
  • গালিব, সোহেল হাসান (২০০৮), শূন্যের কবিতা, ঢাকা: বাঙলায়ন।

গ. আধেয়র নমুনা নির্ধারণ: উল্লেখিত তিনটি সংকলনের মধ্যে সোহেল হাসান গালিব সম্পাদিত শূন্যের কবিতা সংকলনে একশো উনিশ (১১৯) জন কবির মোট ৫৪২টি কবিতা আছে। অনন্ত সুজন সম্পাদিত শূন্যের সাম্পান সংকলনে আছে তেত্রিশ (৩৩) জন কবির মোট ৪৩০ টি কবিতা। তালাশ তালুকদার সম্পাদিত শূন্যের করতালি-তে আছে একাত্তর (৭১) জন কবির মোট ৩৭৩টি কবিতা।

এই তিনটি সংকলনের মধ্যে গালিব সম্পাদিত সংকলনে কবির সংখ্যা বেশি হলেও প্রত্যেক কবির কবিতা সংখ্যা অন্য দু’টি সংকলনের তুলনায় কম। অনন্ত সুজন সম্পাদিত সংকলনে অন্তর্ভুক্ত কবিদের কবিতা সংখ্যা যদিও বেশি, কিন্তু তার সংকলনে অন্তর্ভুক্ত কবি সংখ্যা খুবই কম। তবে, তালাশ তালুকদার সম্পাদিত সংকলনটিতে কবি’র সংখ্যা যেমন প্রতিনিধিত্বমূলক তেমনি প্রায় প্রত্যেক কবিরই তিনের অধিক করে কবিতা পাওয়া গেছে। সেদিক থেকে তালাশ তালুকদার সম্পাদিত ‘শূন্যের করতালি’ সংকলনটি এই তিনটি সংকলনের মধ্যে অধিকতর প্রতিনিধিত্বশীল। সে কারণে নমুনা হিসেবে এই সংকলনটিকে গ্রহণ করে এই সংকলনের ৩৭৩টি কবিতাই আধেয়’র চূড়ামত্ম নমুনা হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। সে হিসেবে নির্বাচিত ৩৭৩টি কবিতার প্রত্যেকটিকে একেকটি একক (unit of observation) হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

গবেষণায় নমুনাগুলো অর্থাৎ ৩৭৩টি কবিতার আধেয় বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ‘হোল আইটেম রিডিং’ ফর্মুলার মাধ্যমে গুণগত আধেয় বিশ্লেষণ পদ্ধতি আশ্রয় নেয়া হয়েছে। বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাপ্ত মূলভাব থেকে কয়েকটি প্রধান প্রবণতা চিহ্নিত করে কবিতাসমূহে কোন্ ধরনের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি, কেন বেশি- এই বিষয়গুলোকে খুঁজে দেখা হয়েছে। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য ছক/টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রাপ্ত ফলাফল ও তা বিশ্লেষণ

গবেষণায় ব্যবহৃত নমুনায় অর্থাৎ ৩৭৩টি কবিতার মধ্যে মোট ৯০টি (২৪.১৩ শতাংশ)কবিতায় একাকিত্বওবিচ্ছিন্নতার কথা উঠে এসেছে। বিষিয়টি নিমেণর টেবিলে প্রদর্শিত হলো:

টেবিল-১

 

শ্রেণীকরণ কবিতা সংখ্যা শতাংশ
একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধ সম্বলিত কবিতা ৯০ ২৪.১৩%
অন্যান্য উপাদান/ বৈশিষ্ট্য সম্বলিত কবিতা ২৮৩ ৭৫.৮৭%
                        মোট ৩৭৩ ১০০%

কবিতায় বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্ব সবসময় একই রূপে বা একই চেহারায় আবির্ভুত হয় নি। একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতার কথা কখনো এসেছে হতাশার আবরণে, কখনো আবার সমাজ-বিচ্ছিন্নতা বা সত্তা-বিচ্ছিন্নতার চেহারায়। এছাড়াও প্রাপ্ত গবেষণা নমুনার ৩২টি ((৮.৫৮%) কবিতায় হতাশার অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত কবিতায়, একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতা অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রধানত ছয় ধরনের প্রবণতা (হতাশা, বিষণ্ণতা; সমাজ-বিচ্ছিন্নতা; সত্তা-বিচ্ছিন্নতা; একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা; জীবনবিমুখতা; দার্শনিক-বিচ্ছিন্নতা) লক্ষ্য করা গেছে (টেবিল-২ এ প্রদর্শিত)।

টেবিল-২

একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রধান প্রবণতাসমূহ কবিতা সংখ্যা শতকরা
হতাশা, বিষণ্নতা ৩২টি ৮.৫৮%
সমাজ-বিচ্ছিন্নতা ১৮টি ৪.৮৩%
সত্তা-বিচ্ছিন্নতা ১৫টি ৪.০২%
একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা ১১টি ২.৯৪%
জীবনবিমুখতা ১০টি ২.৬৮%
দার্শনিক বিচ্ছিন্নতা ৪টি ১.৩৪%
                                    মোট ৯০টি ২৪.১৩%

পরের অংশ

শেয়ার অন::Share on Facebook0Share on Google+0Share on LinkedIn0Pin on Pinterest0Tweet about this on Twitter0Email this to someone
আফরোজা সোমা

আফরোজা সোমা

আফরোজা সোমা। কবি ও সংবাদকর্মী। সাবেক প্রভাষক, জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট, স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়।
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য