Main menu

বাংলাদেশের ছায়াছবি: আলো, অন্ধকার এবং আলো! – সালাহউদ্দিন Featured

সালাউদ্দিন সাহেব’রে নাম বললে তেমন কেউ চিনার কথা না, কিন্তু বাংলা সিনেমা নিয়া যারা টুকটাক জানেন, তারাও উনার কাজের কথা বললে, উনারে চিনতে পারার কথা। উনি হইতেছেন ‘রূপবান’ সিনেমার ডিরেক্টর। ‘রূপবান’ বানানোর আগে বানাইছিলেন ‘যে নদী মরুপথে’ (১৯৬১) ‘সূর্যস্নান’ (১৯৬২), ‘ধারাপাত’ (১৯৬৩); রূপবানের পরে বানাইছেন ‘আলোমতি’ (১৯৬৯), ‘মেঘের অনেক রঙ’ (১৯৭৬)। (মেঘের অনেক রঙ হইতেছে বাংলাদেশের একমাত্র সিনেমা যেইখানে নায়িকা হইতেছেন একজন ‘পাহাড়ি’, বাঙালি বা বিহারি না।) ‘১৩ নাম্বার ফেকু ওস্তাগার লেনে’র কাহিনিও উনার লেখা। মানে, বাংলাদেশে সিনেমা বানানি’রে যারা প্যাশন হিসাবে নিছিলেন, তাদের শুরুর দিকের একজন হইতেছেন সালাহউদ্দিন।  

বাংলাদেশের সিনেমা খালি জহির রায়হান, আলমগীর কবির আর ঋতিক ঘটকের বানানো একটা সিনেমা না, বরং (মিডল-ক্লাসের রুচির জায়গা থিকাও) ‘বাংলাদেশি সিনেমা’ বইলা যদি কোন জায়গারে ধরতে চান সেইটা হইতেছে, সালাউদ্দিন, খান আতা, আমজাদ হোসেন – এনারা। মুশকিল হইলো উনাদের কাজকামরে তো আমরা ইগনোর করছিই, উনাদের কথা-বার্তারেও কখনো আমলে নেয়া হয় নাই বা কন্সিডার করা হয় নাই। চিপাচাপায় যেই কয়টা লেখা পইড়া আছে সেইগুলা দেখলেও আমার ধারণা, উনাদের কাজের জায়গাগুলা সম্পর্কে কিছু আন্দাজ করা যাবে ।

উনার এই লেখার এটলিস্ট তিনটা সিগনিকেন্সরে খেয়াল করার জন্য বলবো আমরা।

এক হইলো, ১৯৮৬ সালে এইটা লিখছিলেন উনি তখনকার অবস্থা আর এখনকার অবস্থা একই না। তখন বাংলা সিনেমা পুরাপুরি ইন্ড্রাষ্ট্রি না হইলেও বিজনেস ছিল, কালচার হিসাবে মিডল-ক্লাস সোসাইিতেও ‘গ্রহণযোগ্য’ ছিল। ১৯৮০ সালে ছুটির ঘন্টা ছিল হিউজ সাকসেস। লোকজন সিনেমাহলে গিয়া সিনেমা দেখতো – এই সুখস্মৃতির বাইরেও বাংলা সিনেমার নায়ক-নায়িকারাই ছিলেন স্টার: কবরী, ববিতা, শাবানা’র টিভি নাটকে অভিনয় কইরা ‘কালচারাল রেসপেক্ট’ কামাই করতে হয় নাই, সুবর্ণা মুস্তফা, শম্পা রেজাদের মতন।…

মানে, টিভি তো তখন ছিল, কিন্তু সিনেমায় খালি টাকা ছিল, স্টারডম ছিল না – এইটা ভাবলে ভুল হবে। সালাহউদ্দিন বলতেছিলেন এই স্টারডম এমনে এমনে টিইকা থাকবে না, যদি কালচারাল এসেট তৈরি করা না যায়।

সিনেমা বানায়া বিজনেস করা লাগবে, কিন্তু কালচারাল এসেটও বানাইতে হবে – এইটা হইতেছে উনার সেকেন্ড পয়েন্টটা। ভালো সিনেমা এবং ব্যবসা-সফল সিনেমা দুইটাই কন্টিনিউ করার ভিতর দিয়া এই কাজ করতে হবে – এইটা উনার কথা:

তবে কোন ব্যবসা সফল ছবিতে কিছু সগুণ থাকলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। বা কোন ভাল ছবি কিছু দর্শক সমাদৃত হলে চমকাবার কিছু নেই।”

“…যে ব্যক্তি বলেন, ‘আমাকে টাকা দিন। আমি একটি ভাল ছবি তৈরী করে দিই।’ তিনি চলচ্চিত্রকার নন। ভাল ছবি তৈরী করা ফরমায়েশী ব্যাপার নয়, ঠিকাদারীও নয়। ভাল ছবির ফর্মুলা বা সূত্র নেই।

ভাল ছবিকে চিহ্নিতকরণ, সাহ যোগান এবং সহযোগিতা প্রদান হচ্ছে ভাল ছবি তৈরীর ক্ষেত্র প্রস্তুতের একমাত্র উপায়।” 

‘ভালো ছবি’ আর ‘বাণিজ্যিক ছবি’ – দুইটা দুই দুনিয়ার ঘটনা না! এইটা নতুন কোন আর্গুমেন্টও না, কিন্তু এই জায়গাটারে সেন্টার ধইরা কেমনে আগানো যায়, সেইটা নিয়া উনার ভাবছেন, কাজও করছেন। এই জায়গাটা দরকারি।

তো, এইটা কেমনে হবে? উনি অন্য অনেক কিছুর লগে ‘চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন’, ‘শিক্ষিত লোকজনরে’ গুরুত্ব দিতে চাইছেন। এইটা উনার লেখাটার থার্ড আর ক্রশিয়াল সিগনিফেকন্স। এইখানেই উনি মেইন ভুলটা করছেন।

উনি ভাবছেন, এই ‘চলচ্চিত্র সংসদ’অলারা আসছে এফডিসি’র হাত থিকা বাংলা সিনেমারে বাঁচাইতে। অথচ কালচারাল একটা হেইট্রেটের জায়গা থিকা তারা সবসময় অপারেট করছেন (এবং করতেছেন)। ব্যাপারটা এইরকম না যে, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কোন ‘ভালো’ বাংলা সিনেমা বানানো হয় নাই (এইটা তো আছেই), বরং যা কিছু পাবলিক ‘খায়’ সেইটা তো কোনভাবেই ‘ভালো’ সিনেমা হইতে পারে না! (এইরকম একটা জায়গা থিকা অপারেট করে।) যেইখানে পাবলিক সবসময় ফিক্সড এবং সিঙ্গুলার একটা আইডেন্টিটি এবং ‘ভালো’ সিনেমারও যেন স্ট্যান্ডার্ড একটাই!

তো, ব্যাপারটা এইটা না যে,  উনারা ‘ভুল’ বুঝছেন; বরং ‘ভুল-বোঝার’ জায়গাগুলা থিকাই এর শুরু। সালাহ্উদ্দিন সাহেব বাঁইচা থাকতে বাংলা-সিনেমার এই দুশমনদেরকে দোস্ত বইলা ভাবছেন। উনি নিজেও ‘ভালো’ সিনেমাই বানাইতে চাইছেন। কিন্তু উনি যে ‘ভুল’ কইরা একটা ‘জনপ্রিয়’ সিনেমা বানাইছিলেন সেইটারে যে বেশিদূর পর্যন্ত ভুল উনি ভাবতে পারেন নাই এবং এর-ও দরকার আছে, এইটা উনি যেমন ভাবছেন; ভাবছেন ‘শিক্ষিত’ লোকজন তো তার সমাজের মানুশের কথা আরো বেশি কইরা ভাববেন! কিন্তু উনারা যে তা করেন নাই – সেইটা সময়ের সাথে সাথে আরো স্পষ্ট হইতে পারতেছে বইলা আমরা মনে করি।… 

তো, বাংলা সিনেমা যারা বানাইতেছেন, ইন ফিউচারে বানাইবেন, আমাদের মনে হইছে সালাউদ্দিন সাহেবদের মতো যারা ট্রাই করছিলেন, আর পারেন নাই, ফেইলওর বইলা তাদেরকে ইগনোর না কইরা কেন আর কিভাবে উনারা পারেন নাই, সেই জায়গাগুলারে খেয়াল করতে পারেন। 

 

/এডিটর, বাছবিচার।

……………………………..

 

এ বছর ১৯৮৬।

তিরিশ বছর আগে আমরা প্রথম সবাক ছায়াছবি নির্মান করি।

আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প অনেক বিস্তৃতি লাভ করেছে। এ বিস্তৃতি ছায়াছবির উৎপাদনে, শিল্পী ও কুশলীর সংখ্যায়, মূলধন বিনিয়োগের পরিমাণে। প্রযোজকের ঘরে যথেষ্ট মুনাফা আসছে। শিল্পীদের অনেকে তারকা হয়েছেন। চলচ্চিত্র-নির্ভর অনেক পত্র-পত্রিকা ছাপা হচ্ছে।

তাই বলতে হবে, আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের অনেক উন্নতি হয়েছে । কিন্তু কিছ সমালোচক বলেন, বিদেশী ছবি আমদানী বন্ধ করে এ সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে । আসলে আমাদের ছবি চলার মত নয় ।

প্রযোজকরা বলেন, ভিডিও ক্যাসেট যখন সারা দুনিয়ায় চলচ্চিত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং আমাদের এখানে যখন বিনা বাধায় ভিডিও চলছে তখনও আমাদের ছবির অগ্রগতি থেমে নেই। সুতরাং বলতেই হবে, আমাদের চিত্রশিল্প এগিয়ে চলছে।

আবার অনেকে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, ‘এর নাম কি এগিয়ে চলা? বস্তাপচা কাহিনী, স্হূল ভাঁড়ামো, অশ্লীল নাচ-গান – এ সকল উপাদানে তৈরী নিম্নমানের ছায়াছবি নিয়ে গর্ব করার। কিছু নেই। বরং লজ্জা পাওয়ার আছে।’

চলচ্চিত্র শিল্পের কর্ণধারগণ বলবেন, আপনারা লজ্জা পেতে থাকুন। আমাদের বাংলাদেশে তৈরী ছবি চলছে এবং দর্শক উৎসাহের সঙ্গে তা দেখছেন।

প্রযোজক পয়সা পাচ্ছেন। তাদের নাম ইনকাম ট্যাক্সের খাতায় উঠছে।

শিল্পীরাও পয়সা পাচ্ছেন। তারকারাও যথেষ্ট সম্মান ও সম্মানী পাচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তাদের নিমন্ত্রণ হচ্ছে। সে নিমন্ত্রণে তারা নিজেদের গাড়ী চড়ে যেতে পারছেন। রাজনীতিতে তাদের ডাক পড়ছে, কারণ তারা জনপ্রিয়।

প্রচুর শিল্পী-কুশলী তৈরী হচ্ছে।

সরকার প্রচুর প্রমোদকর পাচ্ছেন।

উন্নতির এতকিছু ঘটছে, তবুও আপনাদের চোখ টাটাচ্ছে কেন বুঝি না। Continue reading

ইন্টারভিউ: মার্গারেট এটউড

মার্গারেট এটউডের কাজ সাধারণত ফেমিনিস্টরা খুব গুরুত্বপূর্ণ আকারে দেখেন, তুলে ধরেন৷ প্রথমত, তার উপন্যাসে নারীর অবস্থান খুব শক্তিশালী। আবার এও সত্য তার উপন্যাসে পুরুষের অবস্থান আছে । এ বিষয়ে সুজি বাল্ডউইন ১৯৯৭ সালের এক ইন্টারভিউয়ে এটউডকে জিগাইলে, এটউড জবাব দেন, আমার উপন্যাস নারীবাদী কারণ এইটা যে সময়ে পাবলিশ হইছে, ১৯৭২ সালে, তখন যেকোন উপন্যাসে যদি কোন নারী চরিত্র থাকে তাইলে তো অইটা নারীবাদিই হইব! আমার উপন্যাসে নারী চরিত্র আছে, আবার পুরুষ চরিত্রও আছে। আপনি নারী চরিত্র বাদ দিয়া যেইভাবে কোন উপন্যাস লিখতে পারবেন না, তেমনি পুরুষ চরিত্র বাদ দিয়াও কোন উপন্যাস লিখতে পারবেন না। এটউড তার স্বভাবসুলভ নরম, মিষ্টি ভাষায় অবশ্য এই কথাগুলা বলতেছিলেন। তবুও মনে হইলো, হয়তো এটউড নিজেকে কোন নির্দিষ্ট জেন্ডারের ভিড়ে দেখতে চান নাই। এমনকি ফিমেইল রাইটস মুভমেন্ট যেই অর্থে ‘নারী’ ধারণাটারে সংজ্ঞায়িত করে, এটউড সম্ভবত সেইভাবে নারীকে দেখেন না। বরং জেন্ডার ধারণাটারে এটউড ক্রিটিকালি দেখার একটা আয়নাতে রাখতে পছন্দ করেন। ইন্টারভিউয়ের একটা জায়গায়, নারীসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি, পুরুষালী দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে তিনি আপত্তি জানান। তার কাছে এই দুইটা ধারণাই ধোঁয়াটে কিংবা অস্পষ্ট। বরং ‘পয়েন্ট অফ ভিউ’ বা দৃষ্টিভঙ্গিরে একটা সেপারেট ধারণা হিসাবে বিবেচনা করলে কোন জেন্ডার যে এই ধারণাটারে নিজের রঙ মাখায়া নিতে পারে সেই সম্ভাবনার জন্যেই হয়তো পুরুষালী, নারীসুলভ কোন ব্যাপার এটউডের কাছে অর্থহীন। এইটা অনেকটা স্টেরিওটাইপড ধারণার বিরুদ্ধে, তার একটা অভিযান। কিন্তু প্রচলিত স্টেরিওটাইপের বিরোধিতার ক্ষেত্রেও এটউডকে ভিন্ন বলে মনে হয়। একটা জায়গায় তাকে প্রশ্ন করা হইছিলো, বাচ্চাজন্ম দেয়াতে বাধ্য করাকে আপনে কীভাবে দেখেন? তার কথা হইতেছে, যেকোন অধিকারের আন্দোলন আসলে খুব বেশি সময়নির্ভর, সিচুয়েশন নির্ভর। অনেকসময় মানুষই নির্ধারণ করে আমরা হয়তো ‘জন্ম দিতে বাধ্য করার’ যুগে আছি। আমরা যদি নিজেরাই জন্মদানের সিস্টেম বন্ধ কইরা দিই, জন্ম তখন বাধ্য হইয়াই দিতে হবে। এটাকে যেমন একজন শিশুর জন্যে জন্মানোর অধিকার হিসাবে চিহ্নিত করা যায়, অন্যভাবে বাধ্য কইরা জন্ম দেয়ার একটা ঘটনাও বলা যায়। অর্থাৎ শিশুরও তো জন্মাবার অধিকার আছে, সেই অধিকার মিটাবার জন্যে আমিও তো একজনরে জন্ম দিতে বাধ্য করতেই পারে। লেজিটিমেসির কথা এইখানে মুখ্য না। বরং একেকটা সিচুয়েশনাল ফোর্স, আমাদের কীভাবে বাধ্য করে নতুন ধারণার জন্ম দিতে অথবা নতুন ধারণার বিরোধিতা তৈরি করবার ‘খোঁচা’ দিতে পারে সেইটার দিকেই এটউড ইঙ্গিত করছিলেন।

এই উদাহরণ টানা হইছে, এটউডের চিন্তাপ্রক্রিয়ার ভিন্নতা বুঝানোর লাইগা। এটউড ‘সহজ’ বলতেও সহজ বুঝান না, অন্যকিছু বুঝান, ‘সেক্স’ বলতেও সেক্স বুঝান না, অন্যকিছু বুঝান এবং যখন দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেইল পড়া হয়, লোকে যা ভাবে ‘ভবিষ্যতের বর্ণনা’, এটউড সম্ভবত তাও বুঝান না। এটউড ‘ভবিষ্যতের বর্ণনা’ করেন না বরং তিনি এমন একটা পৃথিবীর কথা ভাবেন, যেইখানে ‘সম্ভবত’ আমাদের বাস করতে হতে পারে। উমবের্তো একোর সেই কথা, ইন্টেলেকচুয়ালরা ভবিষ্যতের জন্যে কাজ করে— মার্গারেট এটউডও ভবিষ্যত নিয়া কাজ করছেন, বর্ণনা করতে আগান নাই। এইজন্যেই তিনি ইন্টেলেকচুয়াল, জ্যোতিষী নন। তিনি বরং আগ্রহী আমরা কিরকম ভবিষ্যতে থাকতে পারি সেই চিন্তায়। এইজন্য তিনি বর্তমানে টেকনোলজি নিয়া চরম উচ্ছ্বসিত। টেকনোলজির সম্ভাবনা নিয়া তার আগ্রহ বর্তমান সময়ে তার টুইট, কর্মকাণ্ড দেখলেই বোঝা যায়। এই থেকে আরেকটা জিনিস প্রমাণিত হয়, তিনি কোন একটা ‘ভবিষ্যত’-এ আগ্রহী নন বরং তার সম্ভাবনা যেগুলা অনেকরকম হইতে পারে তাতে চোখে দিতে তার ইচ্ছা বেশি।

ইন্টারভিউটাতেও এই এটউডকে আমরা বারবার পাবো— ভিন্ন ধারণা নিয়া, তার শৈশব নিয়া, তার অনেকগুলা প্যারালাল জীবন নিয়া, লেখালেখির তরিকা, জেন্ডারসহ বিভিন্ন দিক নিয়া এটউডের সংবেদনশীল আলোচনা। এটউডের কবিতার মতোও যা অনেক ইন্টারেস্টিং।

তৌকির হোসেন
১০ মার্চ ২০২০
যাত্রাবাড়ি, ঢাকা

………………………………………………………………

ফ্রগলেস’ কবিতার ম্যানুস্ক্রিপ্ট যেইটা এই ইস্যুতে ছাপা হইছে, কবিতাটা মার্গারেট এটউড সুইডেনের গথেনবার্গে থাকাকালীন এসএএস হোটেলের বেডসাইড নোটপ্যাডে লিখছিলেন। সেইখানে এটউড নর্ডিক বইমেলার জন্যে গত সেপ্টেম্বরে গেছিলেনঃ ‘আমি এই ধরণের পরিস্থিতিতে প্রচুর লিখে গেছি। হয়তো এইটা হোটেল রুমে কিংবা প্লেনে থাকার কারণে সম্ভব হয়, যেইখানে ফোনের ক্রিং ক্রিং শব্দ নাই অথবা কারো কোন নজরদারি নাই। আর সেইসাথে জেটল্যাগের ধকল তো আছেই, সে ধকলে সব বাধা কাইটা যায়।

মার্গারেট এটউড জন্ম নিছিলেন ১৯৩৯ সালে, অন্টারিওর অটাওয়াতে। শিশুকালে উত্তর কুইবেকের বন্য পরিবেশের সংস্পর্শ তিনি পাইছিলেন। একই সাথে অটাওয়া, সল্ট সেইন্ট মারি এবং টরেন্টোতেও তার অনেক সময় কাটছে। স্কুলে পুরা এক বছর কাটাবার আগে তার বয়স ছিলো এগার বছর। হাইস্কুলে থাকতে এডগার অ্যালেন পো থিকা ইন্সপায়ার্ড হইয়া তিনি কবিতা লিখতে শুরু করছেন। ষোল বছর বয়সে তিনি লেখালেখির ক্যারিয়ারে নিজেরে সাব্যস্ত করেন, ছয় বছর পরে তার প্রথম কবিতার বই ‘ডাবল পার্সিফোন’ প্রকাশিত হয়।

তার দ্বিতীয় কবিতার বই ‘দ্য সার্কেল গেইম’ তারে গভর্নর জেনারেল’স এওয়ার্ড (কানাডার সর্বোচ্চ সাহিত্যিক সম্মাননা) আইনা দেয়— এবং সেইখান থেকে এটউড কানাডার লেখাপত্রে একজন প্রধান ফিগারে পরিণত হন। ১৯৭২ সালে এটউড কানাডার সাহিত্যের উপর বিতর্কিত এক ক্রিটিকাল স্টাডি বাইর করেন— সার্ভাইভাল: আ থিমাটিক গাইড টু কানাডিয়ান লিটারেচার— যা তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়। সেই বইয়ে তিনি দাবি তুলেন, কানাডার সাহিত্য, দেশটার  ‘সার্ভাইভাইভাল’ এবং ‘সাবমিসিভনেস’-এর জায়গা দুইটারে বারবার রিফ্লেক্ট করে। এই সাবমিসিভ ব্যাপার আসছে দীর্ঘদিন আমেরিকার দ্বিতীয় সারির মিত্র, কলোনি থাকবার কারণে। দেশটার বিস্তৃত জমির অশান্ত রূপের কারণেও হয়তো কানাডিয়ান সাহিত্য এমন চেহারা পাইছে। এই ভলিউম পাবলিশ হবার কারণে এটউডরে টরোন্টো ছাড়তে হয়, যেইখানে আনাসি প্রকাশনী সংস্থাতে এডিটর হিসাবে তিনি কাজ করতেন। সেইখান থেকে তিনি চলে আসেন অন্টারিওর অ্যালিস্টনের একটা ফার্মে, যেখানে এটউড ফুল টাইম লেখালেখির কাজ শুরু করেন।

এটউড উনিশটার মতো কবিতাসংগ্রহের বই পাবলিশ করছেন— দ্য সার্কেল গেইম (১৯৬৪), দ্য জার্নালস অফ সুজানা মুডি (১৯৭০), পাওয়ার পলিটিক্স (১৯৭১), ইউ আর হ্যাপি (১৯৭৪), ট্রু স্টোরিজ (১৯৮১) এবং ইন্টারলুনার (১৯৮৪)— কিন্তু তিনি সবচেয়ে পরিচিত তার উপন্যাসের জন্যে যেগুলার ভিতর নাম করা যায়— সারফেসিং (১৯৭২), লেডি ওরাকল (১৯৭৬), ক্যাট’স আই (১৯৮৮) এর। তার সর্বাধিক পঠিত উপন্যাস হইতেছে দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেইল (১৯৮৬), যেইখানে তিনি গোঁড়া ধর্মতন্ত্রের মধ্যে নাগরিক জীবনযাপনের দুর্দান্ত চিত্র তুইলা ধরছেন, যে উপন্যাস এটউডকে দ্বিতীয়বারের মতো গভর্নর জেনারেল’স এওয়ার্ড আইনা দেয় এবং যা থেকে সাম্প্রতিককালে ওয়েবসিরিজও বানানো হইছে। তিনি বাচ্চাদের জন্যে দুইটা বই লিখছেন— আপ ইন দ্য ট্রি (১৯৭৮), অ্যানা’স পেট (১৯৮০) এবং দুইটা ছোট গল্পের বই— ড্যান্সিং গার্লস (১৯৭৭), ব্লবিয়ার্ড’স এগ (১৯৮৩)। অক্সফোর্ডের কানাডিয়ান কবিতা এবং ছোটগল্পের এন্থোলজি সম্পাদনা করছেন। শ্যানন র‍্যাভেনেলের সাথে যৌথভাবে সম্পাদনা করছেন দ্য বেস্ট আমেরিকান শর্ট স্টোরিজের ১৯৮৯ সালের ভল্যুম।

এটউডের কাজে সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর অবস্থানের প্রশ্ন সবসময় আসছে এবং ফেমিনিস্টরা প্রায় তার কাজকে তাদের আন্দোলনের জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করছে। এটউড তার কাজে অন্যান্য পলিটিকাল এবং ফিলোসফিকাল ইস্যুরেও থিম হিসাবে নিয়া আসছেন, যেমন কানাডার আইডেন্টিটি তৈরি করার স্ট্রাগল কিংবা সাম্প্রতিক বছরগুলায় তার মানবাধিকার নিয়া আলাদা কনসার্ন— এইসব।

প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির কাছেপিঠে একটা বাড়িতে ইন্টারভিউটা নেয়া হইছিলো। ইউনিভার্সিটিতে মাঝেমধ্যে এটউড বইপুস্তক সাজেস্ট করতে এবং লেকচার দিতে যান। এটউড লেখা পইড়া আমরা যেমনটা তারে ভাবি, তিনি ব্যক্তি হিসাবেও সেইরকম— তীক্ষ্ণ।  দুইটা দিন, ঘন্টার পর ঘন্টা ধইরা, যখন বাইরের মাঠে টিনএজ পোলাপান বাস্কেটবল খেলতেছিলো কিংবা গানবাজনা করতেছিলো, মানুষজন এক ঘর থেইকা আরেক ঘরে হাঁটাচলায় ব্যস্ত আছিলো, পাশের রুমে টিভিতে ফুটবল খেলা হইতেছিলো, এটউড তখন বসা, মনোযোগ তার তীব্র, কোনরকম পাশ কাটানি ছাড়া প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর ধৈর্য সহকারে দিতেছেন। পয়েন্ট থিকা তিনি কখনোই সরে যান নাই কিংবা তারে ক্লান্তও লাগে নাই। বরং মনে হইতেছিলো, তার বইগুলার ন্যারেটরদের একজন বাস্তবে উঠে আসছে, সামনে বইসা প্রশ্নের উত্তর দিতেছে শান্ত ভঙ্গিমায়।

ম্যারি মরিস
১৯৯০ 

 

ইন্টারভিউয়ারঃ আপনার কাজে সার্ভাইভালের থিম কি ন্যাচারালি আসছে?

মার্গারেট এটউডঃ আমি কানাডার উত্তরাঞ্চলের বনজঙ্গলের পরিবেশে বড় হইছি। সেইখানে টিকে থাকবার লাইগা আপনারে ন্যাচারালি কিছু জানা লাগেই৷ আমি যখন বড় হইতেছিলাম, তখনও এই সার্ভাইভাল জিনিসটারে ফর্মাল কোর্সের মাধ্যমে শিখানো হইতো না, কিন্তু কিছু বেসিক জিনিস যেমন যদি কখনো বনে হারায়া যাওয়া  তখন কী করতে হয় এইগুলা আমারে এমনিতেই শিখানো হইছে। এই জিনিসগুলা অটোমেটিক ওয়েতে আসে, সহজে এবং নগদে। আমার জীবনের শুরু থেকেই এই সার্ভাইভাল একটা অংশ হয়া দাঁড়াইছিলো। Continue reading

এডিটোরিয়াল: উত্তম, শত্যজিৎ, শোমিত্র

১.
এই ছিনামায় অমিতাভ হইলেন ইনডিয়ান, ভারতনগর নামে মুম্বাইর ১টা বস্তির লিডার; এই বস্তির ৪টা ছেকশন–বাংগালি, মাদ্রাজি, পান্জাবি আর মোছলমান ! বস্তির বাংগালি ছেকশনের হেড হইলো উত্তম; এই ৪টা ছেকশনের (হেড) ডনেরা ঝগড়া ফেছাদ করে, তারা বাংগালি বা মোছলমান হইয়াই থাকতে থাকে, ইনডিয়ান হইতেছিল না ঠিক! ইনডিয়ান অমিতাভ তখন ওনাদের মোটিভেট কইরা ইনডিয়ান বানাইয়া তোলেন।

তো, এই ছিনামায় পাটের গুরুত্ত হিশাবে অমিতাভের থিকা জতোটা নিচে উত্তম, নিজেরে উত্তম তাই ভাবতেন অমিতাভের তুলনায়, তাই তো রাজি হইলেন অমন একটা ইস্ক্রিপ্টে; অমিতাভের তুলনায় নিজেরে এমন ভাবার কোন নজির কি তামিল রজনিকান্তের দেখছেন কেউ?

এই উত্তমের চাইতেও নাকি ছোট একজন এক্টর আছিলেন শৌমিত্র; শেই শৌমিত্র ঢাকায় আইলে তার ভাপে মাখনের মতো গইলা জান নুর-জাকের-রামেন্দু-ফেরদৌসিরা! এই এরাই জাগো নায়ক, তারা তাইলে কোন ছাইজের ?

 


২.
‘হিরক রাজার দেশে’, এই ছিনামা শত্যজিৎ বানাইতেছেন ১৯৮০ শালের ইনডিয়া নামের একটা মর্ডান রাশ্টে। মর্ডান রাশ্টের কিছু কি বুঝতেন শত্যজিৎ?

ছিনামার রাজা তার পোরজাদের শিক্ষা ঠেকাইতে চায়, নো ইশকুল। এমন রাজার একটা রাশ্টো মেটাফর হিশাবে মর্ডান রাশ্টের কিছু কি ধরতে পারে?

এই ছিনামায় শত্যজিৎ রাজার জেই মগজ ধোলাইখানা দেখাইতেছেন, ইশকুল জেইটার কাউন্টার, মর্ডান রাশ্টে ইশকুলই শেই জন্তর-মন্তর ঘর, ইশকুল দিয়াই মর্ডান রাশ্টো মগজ ধোলাই কইরা থাকে।

এগুলা বুঝতে অনেক অনেক থিয়োরি গিলতে হয় না আর্টিশের, দুনিয়ার দিকে একটু নজর দিলেই হয়; ১৯৮০ শালের ইনডিয়াতেও গনশিক্ষার বেপারে শরকারের নজর আছিল, বাচ্চাদের ইশকুলে নেবার জন্য ভর্তুকি দিতো রাশ্টো; এবং এইটা কেবল ১৯৪৭ শালের পরে শুরু হয় নাই, রাজা/রানির আমল থিকাই শুরু হইছে, শেই ইংরাজ আমলেই!

এই ইশকুলের ফলও রাজা পাইছে নগদ নগদ; ইশকুলে পড়ুয়ারাই ১৮৫৭ শালের ছিপাই-হুল ঠেকাইয়া দিছে অনেকখানি, তারা কেউ হুলে জয়েন করে নাই, ইংরাজকে জারা খেদাইতে চাইছে, তাগো ডাকাইত-বদমাশ হিশাবে খোদাই করছে নিজেদের খবরের কাগজে!

এখনকার ইনডিয়াতেও দেখেন, বিজেপি-শিবশেনার শবচে রেডিকেল হিন্দুরা শবাই শিক্ষিত, ইশকুলে পয়দা/ধোলাই হওয়া মগজ! ইশকুলের কারিকুলাম দিয়াই দরকারি ধোলাইয়ের কামটা করে বিজেপি। বিজেপি তো খারাপ, কিন্তু মর্ডান রাশ্টের তরিকাই অমন, ইনডিয়ার চাইতে ভালো রাশ্টোগুলা ছেরেফ ভালোর দিকে মগজ ধোলাই করে, ইশকুলের ভিতর দিয়াই!

Continue reading

এডিটোরিয়াল: হুমায়ূন আহমেদ

১.
হুমায়ূন আহমেদের নভেল/নভেলাগুলারে ‘সমালোচকদের’ অপছন্দ করার একটা মেজর কারণ হইতেছে, উনার উপন্যাসগুলা’তে খেয়াল কইরা দেখবেন ‘বর্ণনা’র চাইতে ডায়লগ বেশি। আমাদের ‘সমালোচনায়’ উপন্যাসের স্ট্রেংথ হইতেছে বর্ণনায়; মানে ‘বর্ণনা-ই উপন্যাস’ না হইলেও, মেজর একটা জিনিস। তো, হুমায়ূন আহমেদে যে বর্ণনা নাই – তা না, বর্ণনা উনার স্ট্রেংথের জায়গা না; উনার স্ট্রেংথ হইতেছে, কনভারসেশন, ডায়লগ। কিন্তু এইটা তো নাটকের জিনিস! – এইটা মনেহয় ভাবতে পারি আমরা, যার ফলে ‘উপন্যাসের মানদন্ডে’ জিনিসটা বাজে হইতে পারে।…

মানে, খেয়াল কইরা দেখেন, একটা বা কিছু ‘মানদন্ড’ আছে এইখানে, বিচার করার; খালি উপন্যাস না, নাটক-সিনেমা-গান-কবিতা, অনেক জিনিস নিয়াই। সিনেমার মানদন্ড যেমন, একটা ভালো স্টোরি থাকতে হবে, একটা ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ থাকতে হবে, এইরকম; তো, এইগুলা বাজে জিনিস না, কিন্তু আর্টের এই ‘মানদন্ড’গুলাই যে আর্ট না – এইটা মনে রাখাটাও দরকার। মানে, আর্টের বিচার তো আপনি করবেন-ই; কিন্তু যেই বাটখারা দিয়া বিচার করতেছেন, শুধু সেইটা দিয়া মাপতে গেলে ঝামেলা হবে, সবসময়ই।…

/জুলাই ৩১, ২০২০

 

২.
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আর হুমায়ূন আহমেদ

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়’রে নিয়া হুমায়ূন আহমেদ একটা লেখা লিখছেন ‘যদ্যপি আমার গুরু’ নামে। লেখাটা ছাপা হইছে উনার ‘হিজিবিজি’ নামে একটা বইয়ে (অন্যপ্রকাশ, ২০১৩, পেইজ ৫৫ – ৫৯)।

মানিকের জন্মের একশ বছর হইছে, এইরকম কোন অকেশন ছিলো মনেহয়। তো, হুমায়ূন আহমেদ যেহেতু পপুলার রাইটার বইলাই ভাবতেন নিজেরে, এই জায়গাটা নিয়াই কনসার্নড হইছেন, পয়লা। কোন এক ক্রিটিক লিখছেন যে, মানিক বন্দ্যোপধ্যায় পরাবাস্তব, জাদুবাস্তব জিনিসপত্র লেখছেন; তো, হুমায়ূন আহমেদ কইতেছেন, মানিক শরৎচন্দ্রের লেখা অনেক পছন্দ করতেন, তারে নিয়া একটা লেখাও লেখছেন।

মানে, উনার ক্লেইমটা হইতেছে যে, পপুলার ভার্সেস সিরিয়াস এইরকম কোন প্রেজুডিস মানিকের ছিলো না। কিন্তু এই যে ছিলো না, এইটা বইলা হুমায়ূন এই ক্যাটাগরিটারে স্পেইসই দিছেন। যেমন, বলতেছিলেন, পরাবাস্তব, জাদুবাস্তব এইসব নিয়া সিরিয়াস অধ্যাপকরা (এই প্রফেশনটারে ধসায়া দিয়া গেছেন জীবনানন্দ দাশ) লেখবেন। পরে লেখার শেষে, এই লেখাটা লেখার লাইগা উনি যে কিছু বইপত্র পড়ছেন সেইটা মেনশন করছেন কয়েকজনরে কৃতজ্ঞতা জানায়া। 🙂

মানে, এনিমি চুজ করার ব্যাপারে সাবধান থাকা দরকার। উনারে পপুলার বইলা ক্রিটিক করা হইছে আর উনি সিরিয়াসদেরকে নিয়া একটু মশকরাই করছেন। কিন্তু এই ক্যাটাগরিটার কোন ক্রিটিক করেন নাই, উইথইন দ্য ক্যাটাগরিতেই রয়া গেছেন।

সো-কল্ড মার্কসিস্ট সাহিত্য-বিচারের জায়গা থিকাই মেবি এই সিরিয়াস ভার্সেস পপুলার জায়গা’টা তৈরি হইতে পারছে। যেইটা খুবই এলিটিস্ট একটা ভঙ্গিমা, স্নবারি’র জায়গা। তো, এইটার এগেনেস্টে অন্য কোন ক্যাটাগরি উনি সাজেস্ট করতে পারেন নাই, একসেপ্ট যে, পুপলার রাইটার’রাও রাইটার। (মানে, গরিব’রাও তো মানুষ, এইরকম!)

পারসোনাল মিথের জায়গাটাতে গিয়াও হুমায়ূন আহমেদ থতমত খাইছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোন ফ্রেন্ড ছিলো না, কাউরে উনি বই ‘উৎসর্গ’ করতে পারেন নাই… এইরকম পারসোনাল ফেইলিওরের কথাগুলি কইতে গিয়া আবার ভাবছেন, মিথ বানাইতেছেন না তো? তো, সেইটা এক ঘটনা। আরেকটা জিনিস হইলো, এক রকমের ইলিসিট প্লেজার কি পান নাই উনি? যেমন, আজকেই কইতেছিলাম, ধরেন কোন প্রোগ্রামে মেয়েদেরকে দিয়া  গেস্টদেরকে যে ফুল দেয়া হয়, এইটা তো মিনিংলেস কোন ঘটনা না! মানিক গরিব আছিলেন, এইটা একদিক দিয়া যেমন উনার পারসোনাল লাইফের মিথ হিসাবে কাজ করে, আবার মিথ হিসাবে না মানলে সোশ্যালি ‘অসহায় মুক্তিযোদ্ধা’ ক্যাটাগরিতেই ভাবতে পারার কথা, যখন ইনফরমেশন’টা আমাদের জানা আছে যে, শেষ লাইফে বস্তি’তে থাকতে হইতো উনারে। Continue reading

ক্রাইমের পানিশমেন্ট ও দস্তয়ভস্কি

ক্রাইম কি আর পানিশমেন্ট কেন? ব্যক্তির ক্রাইম করার অধিকার আছে কিনা। তাইলে পানিশমেন্টের এজাজতও কেন ক্রিমিনালের কোর্টে রাখা হয় না?

এইসব প্রশ্নগুলারে জবাব খুঁজলে একটা জায়গায় এনার্কিস্ট ছাড়া প্রায় সবাই একমত হবার কথা, সোশাল কন্টাক্ট থিওরী। যে, মানুশের বৃহত্তর কল্যাণে রাষ্ট্র বানাইছি আমরা। যেহেতু সবাই শাসক হওয়াতে লস ছাড়া লাভবিশেষ পাইতেছি না। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে মানুশরে নিয়ন্ত্রণ আর শোষণের কাজকাম নাই তা না, বাট শাসনের দরবার করলে তো শোষণ মিলবেই! তো, নিজেরারে সুখে রাখতে শাসিত হওয়াতে মত দিলাম আমরা, কিছু ব্যাপাররে ক্রাইম নাম দিয়া পানিশমেন্ট দেবার অধিকার দিলাম আমরা শাসন করার এক কিসিমের অথরিটিরে। রুশদেশের দস্তয়ভস্কি যাতে ঠ্যাং দিয়া নিজের নভেলের কাহিনী বানায়, ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট। যদিও কাহিনীটা সবটুকু না, তবুও কইলাম আরকি! কথার কথা, ক্যারেক্টারের পিছেই নিজের সব পর্যবেক্ষণ ঢালছেন উনি, বা কায়দা কইরা বলা যাইতে পারে পুরানা সমাজে ফিকশনাল এক্সপেরিমেন্ট কইরা নয়া রিয়ালিটির আমদানি..!

রাসকলিনভের নজরে যদি পুরা ক্রাইম দেখি তাইলে পানিশমেন্টে স্বস্তি পাওয়া যায়। কিন্তু পিটার্সবার্গের মহাজনের দিক দিয়া তাকাইলে জাস্টিস কতটুকু কায়েম হইলো? একজন হৃদয়বিদারক মহিলা, সোসাইটি’ই হয়তো তারে ওইরকম বানাইছে, নিজের লাভ নিজে ভালো বুঝতেন বইলা দস্তয়ভস্কির হিরো তারে লাঠি দিয়া মাইরা ফেললেন..! সাক্ষী হবার অপরাধে খুন করলেন ‘অমানবিক’ মহাজনের বোনরে..! অথচ অথরিটি তেনারে সাজা দিলেন কি, সাইবেরিয়ায় সশ্রম কারাদণ্ড! বহু প্রমাণ হাতে রাইখাও ক্রিমিনালের স্বীকারোক্তির অজুহাতে, চোখা নজরে দেখলে দেখবেন, দস্তয়ভস্কি ক্যাপিটাল পানিশমেন্টরে উতরাইয়া যাইতে চাইতেছেন..! মজার ব্যাপার হইলো, পাঠকের তাতে ঝামেলা হইতেছে না, মব সেখানে জাস্টিস হিসাবে জেলান্তর হইয়া সশ্রম কারাদণ্ডে সন্তুষ্টই আছেন। ক্রিশ্চিয়ানিটির দোহাই দিয়া দস্তয়ভস্কি এইখানে রাইটারের এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেন, মৃত্যুদণ্ড থেইকা পাঠকের দৃষ্টি সরায়া নিলেন।

পরার্থপরতা ও গ্রেটার গুডের যে য়ুরোসেন্ট্রিক সমসাময়িক ডমিন্যান্ট ফিলোসফি, দস্তয়ভস্কির ড্রামার হাত তারেও ডীল করলো ক্রিমিনাল সাইকোলজি দিয়া। জর্ডান পিটারসন যেমন ক’ন, তলস্টয় পড়বা সোশিয়লজিস্ট হিসাবে, আর দস্তয়ভস্কিতে সাইকোলজি ঠাসা। রাসকলিনভ ওই বুড়ি প’নব্রোকাররে হত্যা করে কিন্তু উপযোগবাদিতার দোহাই দিয়া, যে, ওই টেকাটুকা তো উনার লোভ ছাড়া কোন কাজে লাগতেছে না, সো, আমি যদি ওইগুলার মালিক হই ঠিকমতো পড়া শেষ কইরা দেশের সেবা করা যাবে, প্রেমিকার আর বেশ্যালয়ে যাবার দরকার র’বে না, বুড়ির বইনরেও মানবিক লাইফ লীড করানো যাবে..। “For one life, thousands of lives saved from decay and corruption.” তো, দস্তয়ভস্কি আমরারে দেখান, দশজনরে বাঁচায়া একজনরে মারাটাও ক্যামনে অনৈতিক। যেইটারে পরে আমরা ‘প্যারেটো এফিসিয়েন্স’ টার্মে চিনবো আমরা, খোদ ওয়েস্টার্ন ফিলোসফিতেই! অবশ্য ব্যাপারটারে সোসাইটি থেইকা এলাইনেশন হবার একটা কারণ হিসাবেও দেখা যাইতে পারে, যে, গ্রেটার গুডের ডিসিশন নিতে আপনেরে তো অথরিটি হতে হয়, না?, এবং সেই ‘সুপারম্যান’গিরিতে প্রোটাগনিস্টের কপালে সেই পুরানা, গ্রিকযুগের, প্রাইড’ই ভর করে। যেই প্রাইড সর্বনাশ করে ট্রাজিক হিরোর। কিন্তু দস্তয়ভস্কি এইখানে নয়া কিছুর সাজেশান দিতেছেন, প্রাইডে মরা লাগতেছে না নায়কের, যীশুর দরবারে ধর্না দিলেই হইতেছে..! মানে, ক্রিশ্চিয়ানিটির দাওয়াত দিতেছেন দস্তয়ভস্কি, যেন মানুশের ক্রুয়েলিটিরে কাউন্টার দেবার মতোন দুনিয়ায় জিনিস আছে ওই একটাই..। সোনিয়া হলেন রাসকলিনভের মেরী ম্যাগডিলেন, যে নয়া যীশুর পুরানা ট্রান্সফরমেশনের সাক্ষী হইতে চলতেছেন। যেই রূপান্তরের ভিত্তি হইলো, সবকিছুই ক্ষমার যোগ্য।” যেইটা ইসলামেরও গোড়ার কথা, যে, বহু সাহাবীর ‘পাহাড়ের,থেইকা বড়ো অপরাধ ও পাপ’ এর থেইকা নিষ্কৃতি মিলতেছিল।

বহুত সিনেমা হইছে এইটারে বেইজ কইরা। ছাড়া ছাড়া কাহিনীর এক ফিল্ম দেখলাম ১৯৩৫ সালের। যেইখানে ডিরেক্টর দস্তয়ভস্কির হইয়া ‘রিমান্ড’প্রথার ক্রিটিক করতেছেন। যে, ডান্ডা কি আসলেই জানে ক্রিমিনাল কে..! পরে, ক্রিমিনালের স্বীকারোক্তি মিললেও তা যে মাইরের চোটে, এবং তা দিয়া অথরিটির জালেমি দেখান তিনি। Continue reading

  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য