Main menu

মন্টগোমেরি বাস বয়কট: মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের ভাষণ Featured

১৯৫৫ সালের ডিসেম্বর মাসের ৫ তারিখে ৫ হাজার লোকের একটা জমায়েতে, মন্টগোমেরি’র হল্ট স্ট্রিট বাপিস্ট চার্চের সামনে মার্টিন লুথার কিং এই ভাষণ দিছিলেন। মনটগোমরি’র সিটি বাস সার্ভিসে নিজের সিট ছাইড়া দিতে রাজি না হওয়ায়  মিসেস রোজা পার্কস’রে পুলিশ এরেস্ট করার ৪ দিন পরে। এই এরেস্টের ফলে  আম্রিকার দক্ষিণ অঞ্চলে পয়লাবারের মতো সিভিল রাইটস ক্যাম্পেইন শুরু হয়। এই ভাষণে কিং অডিয়েন্সরে বাস বয়কট করার লাইগা বলেন, এবং একটা টার্গেট সেট কইরা দেন যে, মন্টগোমেরি বা অন্য কোন জায়গা’তে কালা মানুশদের বাসে বসা নিয়া জাস্টিস না পাওয়া পর্যন্ত এই বয়কট চলতে থাকবে। ১ বছরের বেশি সময় ধইরা তাদের এই প্রটেস্ট চলছিল, ব্ল্যাক পিপল’রা বাসে উঠেন নাই এই সময়, মন্টগোমরি’তে আর আম্রিকার অন্য অনেক জায়গায়।… তো, যে কোন মুভমেন্টেই এই ‘ওয়ান পয়েন্ট’ ঠিক করা; তার পক্ষে যুক্তি দেয়া, ব্যাকগ্রাউন্ডটারে ক্লিয়ার কইরা পিপল’রে এনগেইজ করা এবং দাবি আদায়ে একসাথে ফাইট করতে থাকা – এই তিনটা জিনিসই জরুরি। আর  মার্টিন লুথার কিং এই কাজটাই করছেন। 

আর যেইভাবে করছেন সেইটাও খেয়াল করার মতো ঘটনা। দেখবেন, মার্টিন লুথার কিং’য়ের কথা খুবই লিরিক্যাল। পারফর্মেটিভ কবিতার মতন। মানে, খালি শুনলেই না, বরং পড়তে গিয়াও টের পাওয়ার কথা অনেকের। ইমোশন যখন ইনটেন্স হয় তখন একটা সুর চইলা আসে; খুব কাছের কেউ মারা গেলে কেউ যখন বিলাপ কইরা কান্দে দেখবেন সুর কইরা বিলাপ করতেছে; এইটা কেউ তারে বইলা দেয় না যে, সুর কইরা কান্তে হবে; আবেগ’টা, ইমোশন’টা তারে অই জায়গাতে নিয়া যায়। যারা ভালো বক্তা, ভালো ওয়াজ করেন, ভাষণ দিতে পারেন খেয়াল কইরা দেখবেন শব্দের রিদমগুলারে উনারা ধরতে পারেন, ইউজ করতে পারেন। পাবলিক স্পিকিংয়ে এই জিনিসটা জরুরি।…

আরেকটা খেয়াল করার মতো ব্যাপার হইতেছে, মার্টিন লুথার কিং’রে মনে হইতে পারে ক্রিশ্চান পাদ্রী, খ্রিস্টধর্ম নিয়া ভাষণ দিতেছেন! বাংলাদেশে হইলে তো তারে ‘ইসলামী মৌলবাদী’-ই বলতেন সেক্যুলার ও বামাতি’রা। কিন্তু দেখেন এইখানে ক্রিশ্চিয়ানিটি খালি ধর্ম না, ব্ল্যাক-পিপলদের, আম্রিকার মজলুমদের একমাত্র আশ্রয়েরও জায়গা। ধর্মের এই শিকড়টারে মার্টিন লুথার কিং উপড়ায়া ফেলার জন্য বলেন নাই বা এড়ায়া যাইতে বলেন নাই, বরং এই যে শক্ত, ডিপ-রুটেড একটা বিশ্বাসের জায়গা আছে তারে আরো পোক্ত করার জন্য বলছেন।… ‘রাষ্ট্র খুনী’ 🙂 – এই টাইপের ফাইজলামিও করেন নাই; বরং বলছেন, আম্রিকাতে ডেমোক্রেসি আছে বইলা আমরা আজকে মিছিল-মিটিং করতে পারতেছি, কমিউনিস্টদের মতো টোটালিটেরিয়ান রিজিমে থাকলে তো পারতাম না!

তো দেখেন, মানুশের দাঁড়ানোর জায়গাগুলা কই, বিপদে পড়লে কার কাছে সে বিচার দিবে? – সমাজের কাছে, ধর্মের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে; মার্টিন লুথার কিং-ও এইটাই করতেছেন। সমাজের পক্ষে দাঁড়াইছেন, ধর্মবিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়াইছেন, রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়াইছেন; এইখানে যা যা ভুল আছে, গাফিলতি আছে, তারে কারেক্ট করার আর্জি জানাইছেন। 

হিস্ট্রিক্যাল জিনিসগুলার বাইরেও উনার এই ভাষণে এই তিনটা জিনিস খেয়াল করার স্কোপ আছে বইলা আমি মনে করি। 

ই.হা.

…………………………………

বন্ধুরা আমার, আপনাদের প্রত্যেকরে আজকে এই বিকালে এইখানে দেইখা খুশি হইছি আমরা। খুবই জরুরি একটা কারণে আজকে এইখানে একসাথে হইছি আমরা। একটা জেনারেল সেন্স নিয়া আমরা এইখানে আসছি, পয়লা আর প্রধান কারণ হইলো, আমরা আম্রিকান সিটিজেন আর ঠিক করছি যে, আমাদের সিটিজেনশীপের পুরা মানে আমরা এপ্লাই করতে চাই। ডেমোক্রেসির লাইগা ভালোবাসার জন্যও আমরা এইখানে আসছি, কারণ মনের-গভীরে আমরা বিশ্বাস করি যে, পাতলা কাগজ থিকা মোটা অ্যাকশনে ট্রান্সফর্ম হইতে পারা ডেমোক্রেসি হইতেছে দুনিয়াতে সবচে মহান গর্ভমেন্টের ফর্ম।

কিন্তু আমরা এইখানে আসছি একটা স্পেসিফিক কারণে, আসছি মন্টগোমেরি’র বাসের ঘটনাটার কারণে। আমরা এইখানে আসছি কারণ এই ঘটনা’টারে কারেক্ট করবো বইলা আমরা ঠিক করছি। এই ঘটনা নতুন কিছু না। শত শত বছর ধইরা এই প্রব্লেম জারি আছে। এখন থিকা অনেক বছর আগে মন্টগোমেরি’র আর অন্য অনেক জায়গার নিগ্রোরা খোঁড়া ডরগুলার প্যারালাইসিস দিয়া আক্রান্ত হইছে আমাদের কমিউনিটি’তে, বাসগুলাতে। কত শত বার নিগ্রোদেরকে ডর দেখানো হইছে  আর অপমান করা হইছে আর আতংকিত-নির্যাতিত করা হইছে খালি এই কারণে যে, তারা হইতেছে নিগ্রো। আজকে বিকালে আমার সময় নাই সেই অগুনিত ঘটনার হিস্ট্রি বলার। আজকে তাদের অনেকেই হারায়া গেছে বিস্মৃতির ঘন কুয়াশার ভিতর কিন্তু এটলিস্ট একজন আমাদের সামনে দাঁড়াইছে তাঁর পুরা রাগ’টা নিয়া।

জাস্ট কয়দিন আগে, জাস্ট গত বিষুদবারে ঠিক কইরা বললে, মন্টগোমেরি’র একজন ভালো সিটিজেন, নিগ্রোদের মধ্যে একজন ভালো সিটিজেন না, মন্টগোমরির মধ্যে একজন ভালো সিটিজেনরে বাস থিকা নামায়া দেয়া হইছিল আর তারে জেলে ঢুকানো হইছিল, কারণ শে তাঁর সিট একজন শাদা লোকরে ছাইড়া দিতে রিফিউজ করছিল। এখন প্রেস আমাদেরকে বিশ্বাস করাইতে চায় যে, শে নিগ্রোদের জন্য রিজার্ভ করা একটা সিট ছাড়তে রিফিউজ করছিল, কিন্তু আমি আপনাদেরকে এই বিকালবেলায় বলতে চাই যে, এইখানে কোন রিজার্ভ সেকশন নাই। আইন এতদূর পর্যন্ত কখনোই ক্লিয়ার কইরা বলে নাই। এখন আমি মনে করি আমি লিগ্যাল অথরিটি নিয়া কথা বলতে পারি – এই কারণে না যে আমার লিগ্যাল অথরিটি আছে, বরং আমি মনে করি আমার পিছনে যেই লিগ্যাল অথরিটি আছে সেইটা নিয়া আমি কথা বলতে পারি – যে, এই আইন, এই অর্ডিন্যান্স, সিটি অর্ডিন্যান্স কখনোই পুরাপুরি ক্লিয়ার আছিলো না।

মিসেস রোজা পার্কস একজন ভালো মানুশ। আর, যেহেতু এই ঘটনাটা ঘটছে, আমি খুশি হইছি যে, এইটা ঘটছে মিসেস রোজা পার্কসের মতো একজন মানুশের লগে, যার সীমাহীন বিস্তৃত ইন্ট্রিগ্রিটিরে কেউ সন্দেহ করতে পারবে না। তাঁর চরিত্রের ধার নিয়া কেউ সন্দেহ করতে পারবে না, তাঁর ক্রিশ্চিয়ান কমিটমেন্ট নিয়া কেউ সন্দেহ করতে পারবে না আর জিসাসের শিক্ষার প্রতি তাঁর যে ভক্তি সেইটারে কেউ সন্দেহ করতে পারবে না। আর আমি খুশি যে এইটা ঘটছিল, এইটা ঘটছিল এমন একজন মানুশের সাথে যারে কেউ কমিউনিটিতে একটা ডিস্টাবিং ফ্যাক্টর বলতে পারবে না।  মিসেস পার্কস একজন ভালো ক্রিশ্চিয়ান লোক, কোন অনুমান ছাড়াই, আর এইখানে ইন্ট্রিগ্রিটি আছে আর এইখানে ভালো চরিত্র আছে। আর শে যেহেতু খালি উঠতে রিফিউজ করছে, তারে এরেস্ট করা হইছে।

আর আপনারা জানেন, বন্ধুরা আমার, এমন একটা সময় আসে যখন মানুশ আর জুলুমের লোহার জুতার নিচে পদদলিত হইতে রাজি হইতে পারে না। এমন একটা সময় আসে, বন্ধুরা আমার, যখন মানুশ জুলুমের অতল গহ্বরে পইড়া থাকতে থাকতে টায়ার্ড হয়া যায়, যেইখানে তারা গভীর হতাশার নির্জ্জলতারে এক্সপেরিয়েন্স করতে পারে। এমন একটা সময় আসে যখন মানুশ জীবনের জুলাই মাসের ঝলমলা সূর্যের আলোর বাইরে থাকতে থাকতে টায়ার্ড হয়া যায় আর একটা নভেম্বরের আলপাইনের কনকনা ঠান্ডার বাইরে একটা ছিদ্র দিয়া আইসা দাঁড়ায়। এমন একটা সময় আসে। Continue reading

বারীন বাবু বলেছেন কোলকাতা থেকেই সব করে দেয়া যাবে (১৯৭২) Featured

আবদুল হামিদ খান ভাসনাীর ‘সাপ্তাহিক হক-কথা’ পত্রিকার প্রথম বর্ষ, ২২ তম সংখ্যায় (শুক্রবার, ১১ই শ্রাবণ ১৩৭৯, ২৮শে জুলাই, ১৯৭২) এই রিপোর্ট’টা ছাপা হইছিল।

রির্পোট’টাতে অভিযোগ করা হইছে যে, কয়েকজন এমপি ১৯৭২ সালে, স্বাধীনতার পর পর সরকারি টেক্সট বুক ছাপানোর কাজ ইন্ডিয়াতে দিয়া দিতে চাইতেছেন; পরে কি ডিসিশান হইছিল, সেইটা আর জানা যায় নাই, কারণ এর কয়দিন পরেই ‘হক-কথা’ পত্রিকার রেজিস্ট্রেশন বাতিল কইরা সার্কুলেশন বন্ধ কইরা দেয় অই সময়ের গর্ভমেন্ট। তবে খোঁজ-খবর নিলে জানা তো যাইতেই পারে – কি হইছিলো শেষে, আগুন লাইগা সরকারি নথি-পত্র যদি পুইড়া না যায় বা কোনভাবে যদি মিসিং না হয়া যায়।…

তো, এই ইয়াং এমপি’রা (এখন হয়তো বুড়া হইছেন বা মারা গেছেন) দেশের ব্যবসায়ীদের কাজ না দিয়া কলকাতার প্রেসগুলাতে কাজ কেন দিতে চাইতেছিলেন? উনারা ‘ইন্ডিয়ার দালাল’ এবং মানুশ হিসাবে ‘খারাপ’ বইলা?… জিনিস’টারে এতোটা ‘সরলভাবে’ দেখাটা মনেহয় ঠিক হবে না। পলিটিক্যালি এইরকমভাবে তো দেখা যাইতেই পারে, কিন্তু এইরকম’টা কেন ঘটছিলো (বা এখনো ঘটতেছে), সেইটা মেবি পলিটিক্স জিনিসটারে আমরা যেইভাবে দেখি, সেইটারই একটা রেজাল্ট।

মানে, লোকজন পলিটিকস কেন করে? দেশ ও দশের ‘সেবা’ করার লাইগা? 🙂 সেইটা তো আছেই, তার বাইরেও ক্ষমতা তো একটা ঘটনা; কিন্তু আপনার যদি টাকা-পয়সা না থাকে, ক্ষমতা দিয়া কি করবেন; মানে, ‘ক্ষমতায় থাকার’ একটা মানে হইতেছে টাকা-পয়সা কামাই করা। যদি টাকা-পয়সাই না বানাইতে পারলেন, তাইলে পলিটিকস কইরা আপনি কি করলেন! (এই ধরণের পলিটিশিয়ানদের আমরা ‘ভালো’ না বইলা বেকুব-ই বলবো এখন, যে কিনা নিজের ভালো’টাও বুৃঝে না!) এখন অবশ্য উল্টাটাও হয়, অনেক টাকা-পয়সাঅলা লোকেরাও পলিটিকসে ‘নামেন’, কারণ ক্ষমতার রুলস-রেগুলেশন ছাড়া টাকা-পয়সা সিকিওর করা বা বাড়ানো সম্ভব না।…

তো, অই সময়ের প্রেস-মালিক ও প্রিন্টিং ব্যবসায়ী’রা ভাবছেন দেশ যেহেতু স্বাধীন, আমরা পলিটিশিয়ানদেরকে টাকা-পয়সা কেন দিবো! অরা তো আমাদের লোক! কিন্তু পলিটিশিয়ানদেরও তো টাকা দরকার, আর খেয়াল কইরা দেখবেন যারা ঘুষ খায় পরিচিত লোকজনদের কাছ থিকা খাইতে চায় না, কারণ কে সাইধা পইড়া ‘খারাপ লোক’ হবে, একটা আড়াল থাকলে তো বেটার। এই কারণে দেশি ব্যবসায়ীদের চাইতে বিদেশি ব্যবসায়ী’রা পলিটিশিয়ানদের কাছে সবসময়ই প্রেফারেবল হওয়ার কথা। আমি শিওর, ঢাকার প্রেস-মালিক ও পুস্তক ব্যবসায়ী’রা তাদের এই ‘ভুল’ পরে বুঝতে পারছেন এবং তাদের বিজনেস ধইরা রাখতে পারতেছেন।

২.
নিউজপেপারের বাইরে, প্রেস, প্রিন্টিং এবং পুস্তক-ব্যবসা মেইনলি সরকারি বই ছাপানো ও কেনার উপরেই ডিপেন্ডেড, এমনকি বইমেলায় ছাপানো বইও সরকারি নানান লাইব্রেরি’র নামে কিনে বইলাই ছাপানো যায় বেশিরভাগ সময়। (সেবা প্রকাশনী, হুমায়ূন আহমেদ ও ‘ইসলামী বইয়ের’ কিছু মার্কেট আছে…)  এখন অবশ্য প্রাইভেট কোম্পানি ও এনজিওদের ছাপাছাপি বাড়ছে; কিন্তু বই এবং প্রিন্টিং ইন্ড্রাষ্ট্রি’টার বড় অংশের কাজ গর্ভমেন্টেরই।… মানে, ‘বই ছাপানো’ ও ‘জ্ঞান’ জিনিসটাও যে একটা উৎপাদন ও ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমের ঘটনা, এইটা মাথায় রাখতে পারলে মনেহয় ভালো।…

তো, আমাদের এইখানে বাংলা একাডেমি’র বইমেলা হইতেছে পাবলিশারদের বুক ডিস্ট্রিবিউশনের একটা অল্টারনেটিভ সিস্টেম, যেইখানে প.বাংলা’র পাবলিশারদের একসেস না দেয়ার আন্দোলন করছিলেন আহমদ ছফা; ব্যবসার দিক দিয়া চিন্তা করলে ভালো জিনিস ছিল সেইটা; যে, ইন্ডিয়া যেহেতু বাংলাদেশের বই এবং কালচারাল ম্যাটেরিয়ালগুলা ইন্ডিয়াতে এক রকমের রেস্ট্রিক্ট কইরা রাখছে, আমাদেরকেও সেইটা করতে পারা দরকার; কিন্তু এইটা কোনভাবেই পাওয়ারের জায়গাটারে পুরাপুরি স্পষ্ট করতে পারে না, ডমিনেন্সটা এইখানে খালি বাজার দখলের না, বরং কালচারাল হিস্ট্রিটারে কলোনিয়াল লিগাসির জায়গা থিকা রিড করার যেই তরিকাটা চালু আছে, সেইখানে অনেক বেশি।…   

৩.
আর এই জায়গা থিকা, কলকাতা মানে যে ইন্ডিয়া, এইটা মনেহয় আমরা অনেকেই নিজেদেরকে মানাইতে পারি না। কিন্তু বাংলাদেশে দিল্লী’র দালালি করার ভিতর দিয়াই কলকাতা যে পলিটিক্যালি নিজেদেরকে এখনো রিলিভেন্ট রাখতে পারে, এইটারে বাস্তবতা হিসাবে না মানলেই নাই হয়া যায় না আর কি! 

ই. হা.

………………………

চারজন এমসিএ বাংলাদেশের সম্ভবনাময় ও প্রতিশ্রুতিশীল প্রকাশনা শিল্প ও এর সাথে জড়িত সাথে একুশে লাখ লোককে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। ভারতে অবস্থানকালে সাত লাখ টাকা পণ দিয়ে হিন্দু কুমারীকে বিয়ে করার জন্য কেলেঙ্কারী যে এমসিএটি ঘটিয়েছে, যে কলমজীবী ফতুর এমসিএটি ৫৫ হাজার টাকা দামের কার্ডিলা গাৰ্জী উপহার পেয়েছে, তাদের কাঁধে সওয়ার হয় ভারতের প্রকাশকচক্র এবং খোদ ভারতীয় সরকারী মহল বাংলাদেশকে শোষণের আরেকটি উর্বর ক্ষেত্র হিসাবে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প ও পাঠ্যপুস্তকের বাজার দখলের জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। ভারত যাকে যেমনভাবে পেরেছে, কোন বুদ্ধকে তরুণী ভার্যা দিয়ে, ফোন উচ্চাভিলাসীকে কার্ডিলাক গাড়ি দিয়ে, কোন অপদার্থকে মন্ত্রী বানাবার আশ্বাস দিয়ে, কোন বহিরাগতকে বাংলাদেশের খোদ কর্তার প্রিয়পাত্রে পরিণত করার আশ্বাস দিয়ে প্রকাশনা সেক্টরে পঞ্চম বাহিনী সৃষ্টি করেছে। আজ এই কেনা গোলামেরা ভারতের ইঙ্গিতে এক বিরাট পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রকাশনা শিল্পকে পঙ্গু করে ভারতের হাতে তার দায়িত্ব তুলে দেবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর পরই ভারত থেকে এসে, শেখ মুজিবের প্রত্যাবর্তনের আগেই এরা দারুণ হৈচৈ করে এমন একটা ভাব সৃষ্টি করে যে, প্রকাশনা ও পুস্তক ব্যবসায়ে তাদের চাইতে বিশেষজ্ঞ আর কেউ নেই। তারাই সব ম্যানেজ করতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে প্রভুর কাছে দিয়ে আসা অঙ্গীকার পূরণের পথে না জানি কোন ব্যাঘাত হয়, এই ভেবেই তারা প্রকাশনা শিল্পের দিকটির পথ আগলে দাঁড়ায়।

শিক্ষা দফতর, শিক্ষা সম্প্রসারণ বিভাগ থাকা সত্বেও পুস্তক প্রকাশনা শিল্পকে মানুষ করার জন্য গবাদি মন্ত্রী নাজেল হবার গূঢ় রহস্য এখানেই।

ফলে টেক্সট বুক বোর্ড – পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চাবিকাঠি এদের হাতে এসে যাবার পরেই এরা আশ্বস্ত হয়ে ‘কাজ’ শুরু করে। বোর্ডের ঐ কর্মকর্তা, চাররত্ম ও দুজন প্রকাশক প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত পাঠ্যপুস্তক প্যানেল স্বাধীনতার পর প্রথম বৈঠকে মিলিত হলে অত্যুৎসাহী একরত্নের মুখ থেকে আসল কথাটি ফাঁস হয়ে পড়ে। আমরা সব বই ছেপেছুপে নেবো বলে একরত্ন তম্বি শুরু করলে অভিজ্ঞ প্রকাশকরা যখন বলেন যে, এটা কি সম্ভব? দেশব্যাপী কাঠামো নিয়ে দণ্ডায়মান সমগ্র শিল্পটিই যখন বোর্ডের বই প্রকাশনা যথা সময়ে সম্পন্ন করতে হিমশিম খেয়ে যায়, তখন আপনারা হঠাৎ করে পারবেন কিভাবে। ঠিক এ পর্যায়ে ব্রাহ্মণ ঠাকুর ও ঢাকা এমসিএদ্বয় ‘উঠে আসুন’, ‘উঠে আসুন’ হাকডাক দিতে দিতে বলে ফেলেন যে, “কোলকাতায় বারী বাবুর সাথে সব কিছু আলোচনা হয়েছে। তিনি সব বই ছেপে সরবরাহ করতে রাজী। তাঁকে এক পার্সেন্ট দিলেও চলবে, না দিলেও চলবে।’

দেশে সম্ভাবনাময় ও স্বনির্ভর প্রকাশনা শিল্প বিদ্যমান থাকতে কতিপয় এমসিএ ভারতে বারী বাবুকে দিয়ে দেশের প্রধান পুস্তকগুলি মুদ্রণের ব্যবস্থা করবেন জেনে প্ৰকাশক ও বোর্ডের প্রতিনিধিরা ‘থ’ হয়ে যান।

এ বারীন বাবু সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভদ্রলোকটি ১৯৫৮ সালের পূর্বে টাকায় গ্রেটবেঙ্গল লাইব্রেরীর কর্মকর্তা ছিলেন। ১৯৫৮ সালের কিছুদিন পূর্বে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের পুস্তকের বাজার সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ তালাস করতে এসে ভারতের প্রকাশক চক্র বারীন বাবুকে ভারতে নিয়ে যান এবং নিজেদেনা উপদেষ্টা হিসাবে পৃথক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ তাকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশ ছিল ভারতের উর্বর পুস্তক বাজার। বারীন বাবু বিশিষ্ট রপ্তানীকারক হিসাবে তখনই এখান থেকে কোটি কোটি টাকা লোপাটের কারবারে ভারতীয় প্রকাশক ও সরকারকে সাহায্য করে আসছিলেন।

Continue reading

জীবনানন্দ দাশ পাঠে যেধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে বা ঘটেঃ কয়েকটা নমুনা

যেকোনো লেখক/কবিকে একেক যুগ একেকভাবে পাঠ করতে পারে। পাঠের নতুন নতুন ধরন ওই যুগের লেখাপত্রের ভাবধারাকেও পরিবর্তন করতে পারে। দস্তয়েভস্কি কিংবা তলস্তয়, জয়েস কিংবা উলফ অথবা কাফকা বা জীবনানন্দ- এরা বারবার আবিষ্কৃত হয়। তো, আমার এই লেখা মূলত জীবনান্দকে পাঠ করার কিছু প্রচলিত প্রবণতা, কিংবা যেসব ফ্রেমের অধীনে ওরে বন্দী কইরা ফেলা হয়, তার বাইরের পথগুলারও সন্ধান করা একটু।

ফ্রেমের অধীনে বন্দী করার কথা বললাম কেন তা ক্লিয়ার করি। পূর্ববর্তী অনেক ক্রিটিকই জীবনানন্দের কবিতাকে একটা ধারণার’ আওতায় পাঠ করতে চাইছেন। এই ধারনাটা হইতে পারে ‘জীবনান্দীয় প্রবণতা’, ‘নির্জনতার চেতনা’ বা ‘পরাবাস্তবতা’র মতো বিষয়৷ ‘জীবনানন্দের একটা আলাদা জগৎ আছে’, ‘আলাদা স্বর আছে’ – এই কথা বাংলা কবিতার ইতিহাসে অনেকাংশেই সত্যি। তবে কেমলমাত্র এইসব ধারণাকে মহাসত্য ধরে সমগ্র জীবনানন্দকাব্যের কুলুজি খুঁজতে গেলে বিপদ। এতে টেক্সটের অসম্মান ঘটে, জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে আলোচনায় তা ঘটছেও৷ এইজন্যই বুদ্ধদেবের কাছে ধূসর পান্ডুলিপির জীবনানন্দ ‘প্রকৃতির কবি’ হিসেবে বিবেচিত হয়। (যদিও এর আগেই তিনি ওয়ার্ডসওর্থের উদাহরণ দিয়ে কাউরে ‘প্রকৃতির কবি’ বলার কারণে তার অন্য যে সিগ্নিফিকেন্সগুলারে অস্বীকার করা হয় অনেকসময়, সে বিপর্যয়টা নিয়ে বলছিলেন) তবে বুদ্ধদেব বসু নিজেও সেই বিপর্যয় থেকে বাইর হইতে পারেন নাই। বুদ্ধদেব বসুর কাছে জীবনানন্দের কবিতা অনেক বেশি শারিরীক, কিন্তু বুদ্ধিজাত না, উপমাগুলা অনুভূতিপ্রসূত, কিন্তু চিন্তাপ্রসূত না। আবার নির্জনতা, একাকীত্ববোধ, প্রকৃতির অজস্রতা ইত্যাদি শব্দের মধ্যেও কবিতার টেক্সটে বেঁধে ফেলাটা ঝামেলার৷

আমার কথা হইলো, জীবনানন্দের ‘ক্যাম্পে’ কিংবা ‘নগ্ন নির্জন হাত’কে নিছক প্রেমের কবিতা বলে, এর টেক্সটের ভিতরের মূলকে সন্ধান না করে পড়ার যে বিপর্যয় ঘটে, সেটা কবুল করে জীবনান্দকে আবার পড়তে পারার প্রয়োজন এসে গেছে৷ এইজন্যই কবিতার টেক্সটের ভিতরে হাত পাতবো।

আসুন, আমরা বুদ্ধদেবের ভাষায় সবচেয়ে কম ‘বুদ্ধিগত’; সবচেয়ে বেশি ‘শারিরীক’ এবং কম ‘ভাবাত্নক’,রূপাত্নক’, ‘চিন্তাপ্রসূত ; সবচেয়ে বেশি অনুভূতিপ্রসূত জীবনানন্দ দাশের ‘ধূসর পান্ডুলিপি’ থেকে একটা কবিতা পড়ি৷

 

পঁচিশ বছর পরে

শেষবার তার সাথে যখন হয়েছে দেখা মাঠের উপরে-
বলিলাম- ‘একদিন এমন সময়
আবার আসিয়ো তুমি- আসিবার ইচ্ছা যদি হয়-
পঁচিশ বছর পরে।’
এই ব’লে ফিরে আমি আসিলাম ঘরে;
তারপর, কতোবার চাঁদ আর তারা
মাঠে-মাঠে ম’রে গেল, ইঁদুর-পেঁচারা
জ্যোৎস্নায় ধানখেত খুঁজে
এলো গেল; চোখ বুজে
কতোবার ডানে আর বাঁয়ে
পড়িল ঘুমায়ে
কতো-কেউ; রহিলাম জেগে
আমি একা; নক্ষত্র যে-বেগে
ছুটিছে আকাশে
তার চেয়ে আগে চ’লে আসে
যদিও সময়,
পঁচিশ বছর তবু কই শেষ হয়!

তারপর- একদিন
আবার হলদে তৃণ
ভ’রে আছে মাঠে,
পাতায়, শুকনো ডাঁটে
ভাসিছে কুয়াশা
দিকে-দিকে, চড়ুইর ভাঙা বাসা
শিশিরে গিয়েছে ভিজে- পথের উপর
পাখির ডিমের খোলা, ঠাণ্ডা- কড়্‌ কড়্‌;
শসাফুল- দু-একটা নষ্ট শাদা শসা,
মাকড়ের ছেঁড়া জাল- শুক্‌নো মাকড়সা
লতায়- পাতায়
ফুটফুটে জ্যোৎস্নারাতে পথ চেনা যায়;
দেখা যায় কয়েকটা তারা
হিম আকাশের গায়- ইঁদুর-পেঁচারা
ঘুরে যায় মাঠে-মাঠে, খুদ খেয়ে তাদের পিপাসা আজো মেটে
পঁচিশ বছর তবু গেছে কবে কেটে!

এই কবিতা উত্তম পুরুষে লেখা। কথক এখানে কারো সাথে (কিংবা কিছুর সাথে) শেষবার দেখা করেছেন, এবং বলতেছেন ‘আবার আসিয়ো তুমি- আসিবার ইচ্ছা যদি হয়- পঁচিশ বছর পরে।’ এটা একটা শুদ্ধ আহবান, বা অনুরোধও বলা যাইতে পারে। তবে যিনি আসবেন তার মর্জির উপর ছেড়ে দেওয়া হইছে অর্থাৎ ‘ইচ্ছা যদি হয়’ তাহলে আসতে পারো৷’ এদ্দুর বলার পর তিনি ঘরে ফিরা আসলেন। কাহিনী তো এখানেই শুরু, কথক কারো মর্জির উপর ছেড়ে দিছেন পুনরায় আসাটারে, তবে তিনি কিন্তু ঠিকই অপেক্ষা করতেছেন। এই কবিতায় কথক তাই অপেক্ষা করবেন।

অপেক্ষা কি বস্তু? অনেককিছুই বলা যায়। তবে অপেক্ষার সাথে সময়ের একটা ব্যাপার আছে৷ ধরেন কেউ শাহবাগ মোড়ে দাঁড়ায়ে আছে বাসের জন্য, আধা ঘন্টা হয়ে গেল বাস আসলো না। কিন্তু সে আশা করতেছিলো বাস আসবে সাথেই সাথেই, আর সে উঠে যাবে। এইযে আশা করতেছিল, কিন্তু তারমাঝে বাস আসলো না, আধা ঘন্টা সময় বয়ে গেল- তারে অপেক্ষা বলা যায়৷ সেই লোক হয়তো বলবে ‘আমি বাসের জন্য আধা ঘন্টা অপেক্ষা করলাম, কিন্তু বাস আসিলো না৷ ‘ তো, আমরা বুঝলাম সময়ের সাথে অপেক্ষার সম্পর্কটা খুব পোক্ত।

এবার আসি কবিতায়৷ কথক এখনো অপেক্ষা করতেছেন!

এই অপেক্ষার সময়কালটাও উনি জানেন, ২৫ বছর। কিন্তু এই কালটা যাবে কেমনে? এইবার জীবনানন্দ আশ্রয় নেবে প্রকৃতির অনুষঙ্গের। কারণ প্রকৃতি বা আমাদের আশেপাশের প্রাণজগতের পরিবর্তনই তো সময়রে ভালো করে চিত্রিত করতে পারে৷ জীবনানন্দের কবিতায় তো প্রকৃতির পরিবর্তন আসে বারবার। কিন্তু এই পরিবর্তনকে উনি এখানে কেমনে ইউজ করবেন?

এইবার ইমেজগুলা দেখেন। কতবার চাঁদ আর তারা মাঠে মরে গেল (চাঁদ-তারা মরে যাওয়া অভিনব ইমেজ), ইঁদুর -পেচারা এলো গেল, আরো অনেককিছু ঘটতে থাকলো। সময়ের যে ধারাবাহিকতা আর পরিবর্তন- তা-ই আসতে থাকে প্রকৃতির নানা ঘটনার মাধ্যমে। কিন্তু কথকই কেবল ‘রহিলাম জেগে আমি একা’। কারণ ওইযে অপেক্ষা। নক্ষত্রের যে বেগে আকাশে ছুটে, তারচেয়ে আগে সময় ছুটে, তবুও ২৫ বছর আর শেষ হয় না। আহারে অপেক্ষা!

এবার কবিতার পরের অংশে পাশার দান উলটে যাইতে দেখবো আমরা। প্রকৃতির একই জিনিস এভাবে চলতে থাকে। কবিতার পরের অংশ শুরু হয় ‘তারপর-একদিন’ বলার মাধ্যমে। এইযে এরমধ্যে সময় বয়ে যাইতেছে, কথকের অপেক্ষা চলতেছে – সেটা ফিল করাবার জন্যই ‘তারপর-একদিন’ আসে। প্রকৃতির অনেকগুলা ঘটনার ইমেজ দেখা যায়। কিন্তু এবার এই ইমেজগুলা মলিন। ২৫ বছর ধরে এই বিশাল অপেক্ষার ব্যাপারটাও তো মলিন? সবকিছু যেন ক্ষয়ে যাইতেছে বিলুপ্ত নগরের মতো। এই অপেক্ষার চেতন আর প্রকৃতির অনুষঙ্গ মিলে এক করুণ অভিজ্ঞতার কথা মনে করায়ে দেয় এবার। সমুদ্রসমান অপেক্ষার করুণ অভিজ্ঞতা৷

Continue reading

টিওবি (Travelers of Bangladesh – ToB) নিয়া চাইর কথা

টিওবি নিয়া কথা কওয়ার আগে, গেম থিউরি নিয়া হালকা বাতচিত করা যাইতে পারে মনে হয়। গেম থিউরির মূল সিগনিফিকেন্সটা ডিসিশন মেকিংয়ের ক্ষেত্রে। একটা গিভেন কন্ডিশনে সবগুলা শর্ত বিবেচনায় আইনা বেস্ট ডিসিশনটা নেয়ায় গেম থিউরি কাজে লাগবে। অন্য সকল থিউরি যেইখানে একটা আইডিয়াল সিনারিওর ভিতরে ডেমনস্ট্রেট করতে হয়, সেইখানে গেম থিউরি বিবেচনায় নিতে হয় ভেরিয়েবলগুলিরে। নট দ্যাট আর সকল থিউরি কামের না, একটা বেটার থিউরি ভাবনার একটা নতুন পার্সপেক্টিভ অফার করতে পারে, সেইটা সব সময়ই আমাদের একটা বেটার জায়গায় নিয়া যাইতে কাম করতে পারে। গেম থিউরির ব্যাপারটা হইল, এইটা এমনকি অন্য সকল থিউরি গুলির ইমপ্লিমেন্টেশন থিউরি হিসাবেও কামে লাগানো যাইতে পারে। এই থিউরির গাণিতিক হিসাব নিকাশের একটা স্পেস আছে। সেইটা আমার আয়ত্বের বাইরেই। আমি বরং থিউরিটা বুঝার ইন্ট্যুটিভ এপ্রোচ নিয়া কথা কইতে পারি; অবশ্যই আমার ধৈর্যশক্তির সমানুপাতে 😛। ভুলত্রুটি সহই।

বিষয়টা হইল, মানুষ রাইট ডিসিশান সব সময় নিতে পারেনা। এইটা সকল সময় এই কারণেই না যে সে জানে না যে রাইট ডিসিশানটা কোনটা, বরং অনেক সময় এই কারণেও যে তার আশপাশের মানুষ কেমনে ভাবতেছে, কোন ডিসিশান নিতে পারে সেইটা তার বিবেচনায় নিতে হয়। এইটা পুজি ব্যবস্থায় সবচে বেশি খেয়াল করা যায় শেয়ার মার্কেটে। শেয়ার মার্কেটে আইডিয়ালি পয়সা খাটানোর কথা সেইসব কোম্পানিতেই যাদের রিয়েলি প্রফিট করার পটেনশিয়াল আছে, যাদের প্রোডাক্ট ভালো, কোম্পানির কাজকাম ফ্রেশ, ক্লিয়ার দুই নাম্বারি নাই। কিন্তু অফেনটাইম সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পয়সা খাটাইতে এইসব প্যারামিটার ঘাটায় না, বরং দেখে কোন শেয়ারটার মার্কেটে বিক্রিবাট্টা অলরেডি বেশি। মানে মার্কেটে অন্য প্লেয়াররা কেমনে ভাবতেছে সেইটাই সে বিবেচনায় নিয়া থাকে। এই যে ডিসিশন নেয়ার ক্ষেত্রে আদার স্টেকহোল্ডারেরা কেমনে ভাবতে পারে সেইটা কারেক্টলি বিবেচনায় নিতে পারলেই বেস্ট ডিসিশানটা নেয়ার উপায় তৈরি হইতে পারে। গেম থিউরি সেই অপটিমাম জায়গাটাই ফর্মুলেট করে, যার ফলে আকাইম্মা কারেক্ট ডিসিশন নেয়ার চে ইম্পর্টেন্ট হয় কামের একটা ডিসিশান নিতে পারা যেইটা আল্টিমেটলি যেই জায়গাটায় আমরা যাইতে চাই সেই জায়গার দিকে আমাদের আগায় নিয়া যাবে। গেম থিউরি ভেরিয়েবল বেজড থিওরি। এইটা রিকগনাইজ করে দুনিয়ায় কোন আইডিয়াল কন্ডিশন নাই যেইটা ট্রুলি কোন ইউনিভার্সাল স্থিতাবস্থারে আপহোল্ড করতে পারে। এইটারে অনেকেই ভুলভাবে বোঝে যে তাইলে মনে হয় দুনিয়ার সকল খারাপরে এইভাবে নর্মালাইজ করা হইল। না। ঘটনা হইতেছে খারাপ আর ভালোও ডিসকভারেবল কোয়ালিটি; নতুন নতুন ভেনচারে খারাপের উৎখাতে ও ভালোর প্রতিষ্ঠায় নতুন নতুন এপ্রোচের শরণাপন্ন হইতে হবে তাই, সিম্পলি এই জায়গাটাই ইন্ডিকেট করতেছে এইটা। গেম থিউরি তাই রোড সিষ্টেম হইতে কম্যুনিকেশন হইতে এডুকেশন সিষ্টেম হইতে সাইকোলজি হইতে ইকোনমিকস হইতে পলিটিক্স হইতে সোসাইটি হইতে খাওয়াদাওয়া হইতে বিনোদন-ঘোরাঘুরি পর্যন্ত যে কোন কিছু আরেকটু বেটার বুঝতে ও বেটার করতে কামে লাগানো যাইতে পারে। তাই ওয়েলইন্টেনশানড লোকজনের এইটা ইউজ করতে পারার কেপাসিটি থাকতে পারা উচিত।

তো টিওবি নামের একটা গ্রুপ আছে। এই গ্রুপের পোস্টগুলি দেইখা গেম থিউরির কিছু কথা কওয়ার দরকার মনে হইল। ওইখানে দেশের বিভিন্ন স্পট নিয়া নানান পোস্ট দেয়। অনেক পোস্টেই অনেকে দেশের মাইনষেরে গাইলায়, কারণ দেশের মানুষ সব জায়গায় চিপসের পেকেট ফালায় আসে; কয়দিন আগেও যেইসব জায়গা ফকফকা ছিল, তা দেশী জানোয়ারগুলির কারণে হইয়া যাইতেছে ভাগাড়। তো এরা আমার মনে হইছে ভেরিয়েবলগুলি হিসাবে নিতে পারে নাই। একটা নাম্বার কী রিপ্রেজেন্ট করে এই আইডিয়াও এদের কাছে নাই। এই আইডিয়া থাকলে এরা বরং টিওবি গ্রুপটারেই নতুন নতুন ট্যুরিস্ট স্পট ভাইরাল করতে ক্ষান্ত দিতে কইত, ঘোরাঘুরির এক্সপেরিয়েন্স নিয়া যে সব পোস্ট সেগুলিরে মোডিফাই করতে কইত, অথরিটিরে আরেকটু একাউন্টেবল করতে চাইত। এদের বুঝা দরকার, কোন একটা স্পটে যদি প্রতিদিন তিরিশ জন কইরা লোকও যায়, সবচেয়ে আইডিয়াল কন্ডিশনেও দুই তিনজন লোক পাওয়া যাবে যারা স্পটে পলি ব্যাগ, বোতল প্যাকেট এগুলি ফালায় আসবে। এইভাবে বেশি না মাত্র চাইর মাসের এগ্রিগেশনেই কোন ট্যুরিস্ট স্পট নোংরা হইয়া যাইবে। সুতরাং যে কোন জায়গায়ই ক্লিনিং স্টাফ লাগবে, ডাস্টবিন লাগবে। শুধু এই দেশ না পৃথিবীর যে কোন দেশেই এইটা ঘটবে। অন্যান্য দেশে পরিষ্কার রাখতে পারে অথরিটি, কারণ অরা ভেরিয়েবলগুলি যতটা সম্ভব হিসাবে আনে, সিম্পলি পাবলিক গাইলায়ে বইসা নাই। তারপরও অনেক দেশেই এখন ম্যাস ট্যুরিজমরে ডিসকারেজ করতেছে। আর টিওবিতে ইন দা মিনটাইম কি হয় দেখেন। ঘোরাঘুরির নতুন নতুন স্পট এরা বাইর কইরা দিতেছে, সেইখানে যাওয়ার পথ বইলা দিতেছে এবং এই সবই ম্যাটার করে, কারণ গ্রুপটা হিউজ! মুহুর্তেই ভাইরাল হইয়া যায় খবর। তো নতুন নতুন স্পটগুলিতে তো এমনিতেই লিটার হ্যান্ডেল করার মেকানিজম নাই, ফলে প্রথম দুই তিন মাসের ধাক্কাতেই যা সর্বনাশ হওয়ার হইয়া যায়। তখন শুরু করে এরা গালি। অথচ এত বড় গ্রুপ আরও রেসপন্সিবলি জিনিসটা হ্যান্ডেল করতে পারত। এরা মনে করে প্রত্যেকটা পোস্টের নিচেই কোন জায়গায় ময়লা ফেলবেন না বললেই হইয়া গেল। আর তারপরও ময়লা হইলে পাবলিক গাইলায়ে দিলেই হইল!
Continue reading

না-বলা জিনিসের বয়ান: আল-মাহমুদের অটোবায়োগ্রাফি নিয়া আলাপ

এই লেখাটা ছাপা হইছিল “কবি” নামে বইয়ে, ২০২০ সালে। বইটা কিনতে পারবেন রকমারি‘তে বা ফেসবুক পেইজে (নন-ফিকশন | Facebook) 

……………………………………..
বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ। আল মাহমুদ। একুশে বাংলা প্রকাশন। বইমেলা, ২০০৭। প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ। ১৯২ পেইজ। ২০০ টাকা।
……………………………………..

আল মাহমুদ-এর বইটা পড়ার পর থিকাই ভাবতেছিলাম যে, এইটা নিয়া লিখবো। কিন্তু লিখার কথাগুলি বলতেছিলাম পরিচিত মানুষজনকে তাই আর লিখা হইতেছিল না। যার ঠিক উল্টা কাজটা আল মাহমুদ করছেন। উনি বলার কথাগুলিরেই লিখিত করছেন। খালি রাজনৈতিক ও সামাজিক না, সাহিত্যেরও নিজস্ব ঘটনা ও ইতিহাস আছে, এইগুলি যে কীভাবে সম্ভব হইতে পারে, তার একটা ধারণা হয়তো এই বইটা পড়লে টের পাওয়া যাইতে পারে।

পারসোনাল দিক থিকা বিচার করলে মনে হইতে পারে যে, একটা ‘পাপ’ না করতে পারার সাফল্যই উনারে বাঁচাইয়া দিছে। বইটাতে উনি নিজের বিয়া’র কয়দিন পরেই আরেক মেয়ের প্রতি তাঁর ‌’লোভ’-এর কথা বলছেন, এই ধরনের কনফেশন করতে গেলে এক তো হইলো বুকের পাটা লাগে; কারণ বিয়া করা মানেই তো ‘কাম’-এর শেষ না। যেইরকম আমরা ভাবতে পারি যে, ফ্রি সেক্সের অভাবেই সোসাইটিতে রেইপের ঘটনা ঘটতেছে। অথচ ঘটনাটা কোনভাবেই এইরকম না। সিমন দ্য বেভোয়াও কইতেছিলেন, সো-কল্ড “নারী স্বাধীনতার”র পরে ফ্রান্সে হ্যারাসমেন্টের ঘটনা আরো বাইড়া গেছে যে, তুমি তো ফ্রি, তুমি কেন আমার সাথে শুইবা না! এইরকম। মানে, রেইপের ঘটনারে পাওয়ার রিলেশনের জায়গা থিকা না দেইখা ‘সেক্সের অভাব’ – এই জায়গা থিকা দেখতে গেলে মুশকিলই হওয়ার কথা। ডিজায়ার, মোরালিটি আর লাভ – এইগুলা যে একই জিনিস না, এইটা একটা ব্যাপার। আরেকটা হইলো, বলার ইটসেলফ একটা প্লেজার আছে। কনফেশনের একটা আনন্দ আছে। শেষমেশ আল্লা তো উনারে বারবার বাঁচায়াই দিছে! এইটা ধরলেও উনার বলতে পারাটা কিছু জিনিস খোলাসা করে যৌনতা বিষয়ে। কট্টুক বলা যায় আর কট্টুক বলা যায় না – এই বেরিয়ারগুলি। শেষমেশ, বলতে পারাটা একটা ঘটনাই। বিয়া’র পরপরই অন্য মেয়ের প্রতি ‘লোভ’-এর লাইগা তিনি যে চড় খাইছেন, সেইটা যে বলতে পারছেন, এইরকম একটা ট্রান্সপারেন্সি’র বোধই হয়তো সোনালী কাবিন-এর জন্ম দিছে। বা কবিতার এই ট্রান্সপারেন্সিটারে উনি কোন না কোনভাবে লাইফেও নিতে পারছেন। 

বলতেছিলাম সাহিত্যের ঘটনা ও ইতিহাস-এর কথা। আসলে এইটা তো উনার নিজের লাইফের ঘটনা, এইখানে ঘটনাগুলি তিনিই সিলেক্ট করছেন এবং বর্ণনা দিছেন, একইসাথে তিনি নিজেও এই ঘটনা-প্রক্রিয়ার অংশ ছিলেন, তাই এই ঘটনা ও বর্ণনাগুলির নৈর্ব্যক্তিক হওয়ার কোনো কারণই নাই, তাঁর অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি-ই এর মূল নিয়ন্ত্রক, অর্থাৎ যেইটা ন্যারেশন, সে-ই কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ঘটনার ডিরেকশনটারে ঠিক কইরা দিতেছে। যেমন ধরেন, উনি ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের কয়েকদিন আগে শামসুর রাহমানের সাথে দৈনিক পাকিস্তানের (বাংলার) সামনে এবং ২৫ শে মার্চের পরে ইত্তেফাকের সামনে শহীদ কাদরী’র সাথে দেখা হওয়ার ঘটনার কথা, যেইখানে তিনি নিজেই উপস্থিত, সেই বর্ণনা দুইটা খেয়াল কইরা পইড়া দেখেন:

“কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রগতিবাদী কবিরা প্রকৃতপক্ষে শেখ সাহেবের পক্ষাবলম্বন করেননি।…এ সময়কার একটি ঘটনা আমি উল্লেখ করতে চাই। অন্যত্রও করেছি। সেটা হলো, রিকশায় আমি তখনকার দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। গেটে শামসুর রাহমানের সাথে দেখা হলে আমি রিকশা থেকে নেমে এলাম। শামসুর রাহমান বেশ উত্তেজিত হয়ে আমাকে বলতে লাগলেন, আমি আওয়ামী লীগকে সমর্থন করি। শেখ মুজিবকে সমর্থন করি। তারপর তিনি যে মন্তব্য করেছিলেন তা এখানে আমি উল্লেখ করতে চাই না।অথচ আজকালের প্রেক্ষাপট কাকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।” (প. ৯১)

“এখানে একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করি, আমি ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার আগে ইত্তেফাকের ধ্বংসাবশেষ দেখার জন্য টিকাটুলি গিয়েছিলাম। মতিঝিলের যেখানে শেষ সেখানে একটি ওষুধের দোকানে জরুরি ওষুধ কিনে বাসায় ফিরে যাওয়ার সময় শহীদ কাদরীর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। আমাকে দেখে তিনি উচ্চহাস্য করেছিলেন। সে হাসির অর্থ আমার কাছে তখনো যেমন দুর্বোধ্য ছিল আজও দুর্বোধ্য।” (প. ৯৫)


এইটা আল মাহমুদেরই ন্যারেশন। কিন্তু এই ন্যারেশন এটলিস্ট ক্লিয়ার করতে পারে যে, মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাটা যখন ঘটতেছে তখনো শামসুর রাহমান আর শহীদ কাদরী উনাদের এলিটিস্ট সাহিত্যিক-বোধের জায়গা থিকা পুরাপুরি সাবস্ক্রাইব করতে পারেন নাই কমন পিপলের বাংলাদেশ ধারণাটাতে। এতোটা বিচ্ছিন্নতা হয়তো আশ্চর্য লাগতে পারে এখন আমাদের কাছে, কিন্তু মিথ্যা হওয়াটা মনেহয় পসিবল না। কারণ এখনো পর্যন্ত একসেপশনাল বা আলাদা হইতে পারাটাই আর্ট বা সাহিত্য আমাদের কাছে, কমন বা সাধারণ হইতে পারাটা না। তো, পাবলিকের লগে একমত হইতে পারাটা এখনো যেমন কঠিন, তখনো একইরকমই হওয়ার কথা। 

তবে শামসুর রাহমান বা শহীদ কাদরী একই ঘটনার কথা বললে হয়তো একইভাবে বলতেন না। মানুশের চিন্তা-ভাবনা, কাজ-কাম একটা জায়গাতে আটকায়াও থাকে না সবসময়। কিন্তু মজার ব্যাপারটা হইতেছে, শামসুর রাহমান বা শহীদ কাদরী এই ঘটনাগুলিরে কখনোই লিখিত করেন নাই এবং সম্ভবত এইগুলারে সাহিত্যের বাইরের ব্যাপার বলেই মনে করতেন বা করেন। আর আল মাহমুদ তারে বলবার মতো মনে করছেন এবং বলছেন। এই বলতে পারটা যে কতোটা জরুরী তা তিনি তাঁর অস্তিত্ব দিয়াই জানছেন:

“আমাদের অনেক অসাধারণ কাব্য প্রতিভা বক্তৃতা দিতে সারা জীবনেও সম্মত হননি। হয়তো এই ভেবে সম্মত হননি যে, এতে কবির ধ্যান ও জ্ঞানের নীরবতা অনেক সময় ব্যর্থ হয়ে যায়। আমি এটা এক সময় নিজেও ভাবতাম। কিন্তু আমি যদি বলতে না জানতাম তাহলে আমাকে শেয়াল ও শকুনের খাদ্য হতে হতো।” (প. ৮২)

Continue reading

[facebook url="https://www.facebook.com/WordPresscom/posts/10154113693553980"]
  1. ক্রিয়েটিভ আর্ট
  2. ক্রিটিকস
  3. তত্ত্ব ও দর্শন
  4. ইন্টারভিউ
  5. তর্ক
  6. অন্যান্য